...

Bangla Golpo Reading | Best Bengali Story

Sharing Is Caring:

ধলো দরগার কালো মাটি – নাসির ওয়াদেন

ফুটি সকালে সূর্য উঠার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল শাকিব। ইজাজ মিয়ার কিরসান। সেই কবে থেকে মিয়ার বাড়িতেই ফাইফরমাশ খাটা। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। সমগ্র মুলুক বাংলা এক অখণ্ড বিশাল দেশ। চারিদিকে শুধু লড়াই আর লড়াই। আকাশে উড়োজাহাজের আনাগোনা। কখন কোথায় যে বোমা,গুলি পড়বে তার ঠিক ঠিকানা নেই। ইজাজ মিয়ার বাবা দৌলত মিয়া নবাবী আমলে বেশ কিছু জমিজমার মালিক ছিল। গরিব প্রজারা ঠিকমতো খাজনা দিতে পারছে না। গায়ে গতরে খেটে ঝোপঝাড় সাফ সুরাত করে তাদের বাবা ঠাকুরদারা যে সকল জমি তৈরি করে চাষাবাদ করত, সেই জমিই জমিদারেরা দখল করে নিয়েছে। জমিতে যে ফসল উৎপন্ন হয়, সেই ফসলের অর্ধেক প্রজার আর বাকি অর্ধেক রাজার। রাজা, জমিদারকে জমি দিয়ে জমির স্বত্ব হিসেবে খাজনা আদায় করত। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে,ঝোপঝাড় কেটে বানানো,খাল-ডোবা বুজিয়ে, পাহাড় ভেঙ্গে ধানি জমিতে রূপান্তরিত করেছিল যারা, তারা নাকি মালিক নয়, সবই জমিদারের। আর মাথার উপরে রাজা, নবাব, বাদশাহ এরাই মালিক। নিয়তির পরিহাসে অনেকেই জমির খাজনা দিতে না পারায় জমি চাষ-করা ছেড়ে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে লাগে। জমিদারের পাইক, বরকন্দাজগণ গরীব মানুষের ঘরে গিয়ে রাজার ফরমান কুঁড়েঘরের বাতায় গুঁজে দিয়ে আসত। নির্দিষ্ট সময়ে ফসল জমা না দিলে একদিন জমিদারের লেঠেল বাহিনী এসে বাড়িঘর তছনছ করত ও ঘরে যা থাকত, তাই লুটপাট করে সর্বস্ব নিয়ে চলে যেত জমিদারের কাচারি বাড়িতে। এসব খুব ভালো করেই দেখেছে সাকিব জোলার পূর্বপুরুষেরা। ওরাই তখন কৃষি শ্রমিকে পরিণত হয়।

ঝুঁঝকির সময়, আড়মোড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে শাকিব। হাতের আঙুল ঘষে চোখদুটোর দলাই মালাই করে। তখনও তার ঘুমের নেশা ছাড়েনি। ঘরের ভেতর খড় দিয়ে তার উপর ছেঁড়া খেজুর পাটি বিছিয়ে, ময়লা কাঁথা দিয়ে বিছানা পাতানো তার। গায়ে ছেঁড়া,আধ ময়লা লেপ জড়িয়ে ঘুমোয়। আলো-আঁধারির খেলা চলছে আকাশের বুকে। একটা ছোট্ট দোয়েল পাখি শিস কেটে উড়ে গেল। পাশের বাড়ি থেকে নয় মাসের ছেলেটার কান্না ভেসে আসে তার কানে। পাড়ার একদল কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে গতরাতে হাত-পা সেকা আগুনের ছাইয়ে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। কুকুরী তার সন্তানদের ওম দিয়ে ঠাণ্ডা নিবারণের চেষ্টা করছে। একটা পেঁচা কাচারি বাড়ির অন্ধকার ঘর থেকে উড়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে গেল।

— না! আর ঘুমালে হবে না। এখনই গোরু দুটাকে খড় খোল দিয়ে আসতে হবে। সে তো অনেক দূর, বলেই উঠে পড়েছে বিছানা থেকে।
ফজরের আজান শোনা গেল মসজিদের মাইক থেকে। আজানের ধ্বনি শুনে শাকিবের মন ভরে ওঠে। সে মূর্খ মানুষ। আজানের ধ্বনি তাকে মধুর লাগে কিন্তু তার মানে সে জানে না, বুঝতেও চায় না, সেসব বুঝেও লাভ নেই। আরবি তারবির ব্যাপার। তবে শুক্রবার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে যায় সে। মাঝে মাঝে কাজের চাপে সব জুম্মার নামাজও পড়া হয় না। যেদিন নামাজ পড়া হয়না, কেন, জানে না,সে রাতে তার চোখে ঘুম আসে না। মনে হয়, আসমান থেকে জিব্রিল ফিরিশতা এসে তাকে বলছে, কি শাকিব নামাজ পড়লে না? হাশরের ময়দানে জবাব দিতে পারবে? পুলিশি রাত পার হতে পারবে?

মনে মনে সে বলে, ‘হে আল্লা, তুমি হামাকে গরিবের ঘরে জন্মো দিলা, দুবেলা পেট চালাতে, কামকাজ করতেই তোমাকে স্মরণ করতে পারছি না। তুমি হামার সব গুনাহ মাফ করে দাও।’
— কোই, শাকু উঠ্যাছ, সানি-পানি দিয়্যাছ? শাকালো শাকালো বাহির হোতে হোবে।
— হ্যাঁ মিয়া সাহাব! হামি ঝুঁচকিতে উঠি, গরু দুটাকে ভালো করি সানি-পানি, খোল-ভুসি দিঙ্ ন্যাদ ভরি দিয়্যাছি।
— ঠিক, ঠিক।এখান থেকি পাঁচ ক্রোশ দূরে বীরখেতি। শাকালো বেহির না হতে পারলে মাথার উপর সুরুজ উঠি য্যাবে।
— কোন কিছুরই ভাবনা কোরবেন না মিয়া সাহেব। হামি ঝুঁচকি ভোরে উঠি সব কাজ সারি ফ্যালাছি। বিবিজানকে বুলি দিয়্যাছি রেডি হোতে। ব্যাস। গাড়ি জুড়ী চলি যাবো। গতরেতেই লালুকে নিঙ্ টপ্পর বেঁধে রেখ্যাছি।
ইজাজ মিয়া ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। শাকিব গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখে বলদ দুটো পরম নিশ্চিন্তে আগ্রহের সাথে খাবার খাচ্ছে। তাদের খেতে দেখে আনন্দিত হয়।
— যাক, এখন নিশ্চিন্তি,বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে কাছারি-পুকুরের পাড়ে গিয়ে একটা নিসিন্দা গাছের সরু ডাল ভেঙে দাতুন বানিয়ে দাঁত ঘষতে ঘুষতে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়।

দুই

সকালবেলায় নাস্তা-পানি খেয়ে বিবি মেহেরজান সাথে বৌমা আসমানিকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। ওরা যাবে ধলো দরগার মাজারে মানত দিতে ‌। তাদের একমাত্র পুত্র নঈমুদ্দির বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হল। নাতি-নাতনির মুখ দেখার খুব ইচ্ছে মেহেরজানের। বারবার বলে ইজাজ মিয়াকে রাজি করিয়েছে। ধলো দরগার মাজারে মানত দিতে। ইজাজ মিয়া এসব মানে না। তবুও, এই শীতে পৌষ সংক্রান্তিতে ধলো দরগার মাজারে বড় ধুম লাগে। মেলা বসে, হাজার হাজার মানুষ তাদের মনের খাস পূরণের উদ্দেশ্যে দরগায় পীর বাবার কাছে মানত করে। ওই দিনে গিয়ে সেখানে শিন্নি চরাতে হয়। মেহেরজান বিবিও তার বৌমার পুত্র সন্তান না হওয়ায় পড়শির পরামর্শে মানত করে বলেছিল, ‘বাবা পীর সাহেব, আমার একটা বংশধর যাতে হয়, তার জন্য তুমি আল্লার কাছে আমার জন্যি সুপারিশ করো। আমি তোমার দরবারে বটগাছের ডালে ঘোড়া বাঁধব, সিন্নি চড়াব।

— জোরে ডাকাও হে গাড়োয়ান। বেলা যে মাথার উপর উঠে গেল ? বলে হাঁক ছাড়ে মিয়া সাহেব।
— হট্, হট্, বলে দু’পায়ে গরু দুটোর পেটে গুঁতো মারতে মারতে দারোয়ান লেজ দুটো ধরে চটকে দেয়। গরু দুটো যন্ত্রণায় কুঁকিয়ে ওঠে। দৌড় লাগায়।
গাড়ির চাকা মাটির উপর গড়াতে থাকায় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধুলো। গামছাখানায় মুখ ঢেকে নেয় গাড়োয়ান। বলে, ‘মিয়া সাহেব ভিতরে ঢুকে যান। দেখছেন তো, ক‌্যামুন ধুল্যা উড়ছে।’

— হ্যাঁ হ্যাঁ। বলে চটপট টপ্পরের মুখে বাঁধা কাপড় সরিয়ে ঢুকে পড়ে মিয়া। ভেতরে শাশুড়ি,বউ আর তাদের পাশে রেশমি আর সোনাভান। বাঙ্গরের দিকে বসে আছে নইমুদ্দি।
নঈমুদ্দি উঠতি জোয়ান। বিশ পেরিয়ে গেছে বিয়ের আগেই। আঠারোর আসমানি, টুসটুসে যৌবনবতী। কিন্তু কিছুতেই তাদের নতুন বংশধর আসছে না। তবে কি আসমানির কোন দোষ আছে?
বাঙ্গরের দিক থেকে ভিতরে ঢুকেই নইমুদ্দি বসে সোনাভানের পাশে। সোনাভান তার কাকাতো বোন, চৌদ্দ পেরিয়ে পনেরোতে পড়েছে। বেশ ডগর-ডুগর, রং-চং বেশ ভালই। মুখের ডান পাশে ছোট্ট একটা তিল তাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। সদ্য যৌবনা সোনাভানের রূপ যৌবন নইমুদ্দিকে কিছুটা হলেও ঢলে পড়তে দেখেছে আসমানি।

— যদি সে বন্ধ্যা হয়, তবে কি নইমুদ্দি তাকে ছেড়ে সোনাভানের দিকে ঢলে যাবে? এক বুক হতাশা নিয়ে শাশুড়ির পাশে বসে তাকে আঁকড়ে ধরে। শাশুড়ি মেহেরজান বিবিও ভাইঝিকে বউ করে এ বাড়িতে এনেছিল। যাতে দু’ভাইবোনের সম্পর্ক টিকে থাকে। আবার সম্পত্তির অংশীদারও হতে পারবে নইমুদ্দি।
‘কিন্তু আল্লা বাম হলে, সব যে নষ্ট হয়ে যায়।’ এ ভাবনাও বিবিজানকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। কত হেকিম, কবিরাজ করেও যখন নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে পেল না,তখন শেষ চেষ্টা করতেই এই ধলো দরগার পথে পা বাড়ানো।

বেলা দ্বিপ্রহর। মাথার উপর সূর্য উঠেছে। মানুষের ছায়া মানুষের মধ্যে মিশে যাচ্ছে, ছায়াহীন মানুষ, গাছ, পাখি,গাড়ি। চারদিকে জনসমাগম। হই চই হুল্লোড়। বিশাল মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে হরেক কিসিমের মানুষ এসেছে আপন আপন মানত দিতে, মনের কামনা বাসনা পূরণ করতে। কেউ খাসি কাটছে তো, কেউ মোরগ জবাই করে কাটাকুটি করছে । কেউ কেউ আবার সাদা মোরগ মাজারের ভেতরে ছেড়ে দিচ্ছে, যার যেমন মানত তার তেমন ক্রিয়াকলাপ।
— হ, হ, শব্দ করে গাড়ির বলদ দুটোকে থামিয়ে দেয় গাড়োয়ান। গাড়ি থেকে নেমে জোয়ালের দু’পাশের শলি দুটো তুলে গরুর ছাদ খুলে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে মুখজিটা ধরে গাড়িটাকে আস্তে নামায়। গোরু দুটোকে একটু দূরে ছোট্ট গাছের গোড়ায় বেঁধে আসে, যাওয়ার আগে হাঁক দিয়ে বলে, ‘কই গো মা জননী! আপনারা নেমি এ্যসেন।’

— এসি গ্যেলছি। হামি বলদ দুটোকে খড় দিয়ে অ্যাসছি। বলেই বগলে কয়েকটা খড়ের আঁটি নিয়ে সেদিকে চলে যায়। গোরু দুটোকে আঁটি খুলে তাদের খেতে দেয়।।
এক এক করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে সকলেই। আট বছরের বোন রেশমির হাত ধরে নেমে আসে নইমুদ্দি। চারিদিকে লোক সমাগম দেখে নইমুদ্দি বলে, রেশমি হামার হাত ছাড়বি না। না হলে ভিড়ে হারিয়ে যাবি, তখন চাচিমাকে কি জবাব দিব?

— না দাদা! আমি তোমার হাত ছাড়ছি না, তোমার হাত ধরেই থাকবো।
— হু ঠিক আছে। এভাবেই ধরে থাকবি। সোনা, তুইও কিন্তু কাছে কাছে থাকবি।
— আর বুলতে। আমি তো তোমার হাত ধরেই যাব। বলে অন্য হাতটাকে ধরে ফেলে সোনাভান।
আড়চোখে দেখে আসমানী। তাকে খুব বিষন্ন মনে হয়। ভালো চোখে দেখে না তাদের কার্যকলাপ, বরং মনে মনে অখুশিই হয়।
— কই গো বৌমা। তাড়াতাড়ি নেমে এসো।
— এই জি, যাচ্ছি ফুফুমা। বলে সাড়া দেয় টপ্পরের ভেতর থেকে। এক এক করে সবাই নিচে নেমে এসে মাটিতে দাঁড়ায়।
গিন্নিমা বলে, চল মা, কাপড়চোপড় গুছিয়ে নাও সাগরদিঘীতে গোছল করে এসো। বুড়ো বটগাছের ডালে ঘোড়া বাঁধতে হবে।

ওদিকে মিয়া, খাদেম সাহেবকে বলে দিয়েছেন তাদের আসার উদ্দেশ্য। খাদেম সাহেব তড়িৎ গতিতে জানিয়ে দিলেন, ঠিক আছে মিয়া সাহেব। আপনি কোন কিছু চিন্তা করবেন না। নজরানা ঐ বাক্সে দিয়ে দিবেন। আমি এদিকের সব ব্যবস্থা পাকা করে দিচ্ছি।বৌমাকে গোছল করে আসতে বলবেন। ভেজা চুল আর ভেজাশাড়ি পড়ে ঘোড়া বাঁধতে হয়। ঘোড়া আর সুতোর ব্যবস্থা করা আছে। কেবল ওর মূল্যটা দিলেই চলবে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
— আর কি কিছু করতে হবে খাদেম সাহেব? জিজ্ঞাসা করেন মিয়া সাহেব।
— কি আর করবেন? যদি মনে করেন তো, কিছু শিরনী চড়িয়ে, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে একটা মুনাজাত করে আপনার মনের বাসনা পীরবাবার কাছে স্মরণ করতে পারেন। নিশ্চয়ই পীরের বরকতে আল্লার ইচ্ছেই আপনার মনস্কামনা পূরণ হবে।
–আর কিছু?
— না, না। এখন আর কিছু করতে হবে না। আল্লার ইচ্ছেই আপনাদের বংশে বাতি জ্বালাতে বংশধর এলে,আপনি সেই নবজাতককে নিয়ে এসে এই দাতার দরবারে যা খুশি দান করে যাবেন। বলেই খাদেম সাহেব অন্য দিকে চলে গেলেন।
মিয়া সাহেব দাতার দরবারে দু’ হাত তুলে মনে মনে একটা বংশধর কামনা করে মোনাজাত শেষ করলেন।

তিন

ধলো দরগার পিরানে পির শাহ শাহাবুদ্দিন-এর সমাধিস্থলে ধূপবাতি আর আতর, গোলাপজলের ফোয়ারায় মম করছে। হাজার হাজার মানুষ পরম শ্রদ্ধা করে সেই দাতার কাছে মনের কামনা জ্ঞাপন করছে। মিয়াজি তার পিতামহের মুখে শুনেছে যে, তখন দেশে নবাবদের শাসন চলছে, মুকসুদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময়ে বাংলা বিহারের জঙ্গলবেষ্ঠিত সুলতানাবাদ পরগণায় রাজা উদয় সিং নবাবের অনুমতি নিয়ে রাজত্ব করে নিয়ম মতো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে নিজ লভ্যাংশ দেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নবাবের দরবারে প্রেরণ করতেন। সে ব্ছর রাজ্যের বেশিরভাগ স্থানে বৃষ্টির অকালে কোন ফসল উৎপাদিত হয়নি। ফলে গরিব প্রজারা নিজ নিজ প্রতিশ্রুত মতো জমির খাজনা দিতে ব্যর্থ হয়।

একদিকে প্রজাদের দুরবস্থা, অন্যদিকে নবাবের খাজনা আদায়ের তাগিদ উদয় নারায়ণ সিংকে বিচলিত করে। খাজনা দিতে অস্বীকার করলে নবাবের চোখে খারাপ হন। নবাব মুর্শিদকুলি খান তাঁর প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ কালিয়া জমাদারের পরামর্শে মহম্মদ জান ও রঘুবীরকে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠান। এদিকে প্রজাদের পক্ষে রাজা, নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। নবাবের সৈন্যবাহিনী জঙ্গিপুর থেকে পশ্চিম অভিমুখে রওনা হয়ে বাদশাহী সড়ক ধরে উদয় সিংয়ের রাজধানী আক্রমণ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে। রাজা,তাঁর সৈন্যগণকে জগন্নাথপুর গড় থেকে যুদ্ধ করতে ঘোষণা করলে, ওদিকে উদয় সিংহের সেনাপতি গোলাম মহম্মদ বীর বিক্রমে যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বীর বিক্রমের যুদ্ধ চালিয়ে প্রভুভক্ত গোলাম রাজা উদয় সিংহের পক্ষে এগিয়ে এলে রঘুবীরের তীরের আঘাতে গোলাম নিহত হয়। রাজা পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিরক্ষেতি থেকে দেবীনগর দুর্গে পলায়ন করেন।

— কি মিয়াজী? আপনার লোকজন এসে পড়েছে কি? বলে তাড়া দেন খাদেম।

খাদিম এর আহবানে মিয়াজী সম্বিত ফিরে পায়। এতক্ষণ যুদ্ধের কথা তার মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল। তাড়াতাড়ি বিবিজানের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়ে, বৌমার গোসল করা হলো? এবার যে ঘোড়া বাঁধতে হবে?
মেহেরজান ততক্ষণে আসমানীকে গোছল করিয়ে ভিজে শাড়ি ও ভিজে এলোচুলে মাজারের বড় গাছটার নিচে নিয়ে আসে। কাছে এসে দাঁড়ালে খাদেম সাহেব একটা সুতোয় বাধা মাটির ঘোড়া আসমানীর হাতে তুলে দেয়। বলে, মা, এবার এটাকে তুমি এই গাছের ডালে শক্ত করি বেঁধে দাও। আর দাতার মাজারে গিয়ে একটুকরো কালো মাটি বিসমিল্লা বলি হাতে তুলি মুখে দিতে হোবে। ইনশাল্লা সামনের বছর এসি দেখবা, তুমার ঘোড়া সুতো ছিঁড়ি মাটিতে পড়্যাছে, তাহুলেই দাতার দুয়ায়, উপরওয়ালার ইচ্ছায় তুমার কোলে টুকটুকা সন্তান আস্যাছে।

গাছের ডালে কয়েকশো ঘোড়া বাঁধানো সুতোয় ঝুলছে, মনে মনে শাকিব ভাবে, হায়রে দুনিয়া! দুনিয়ার এত লোকের বাচ্চা ন্যাই।
যাদের এক বছরের মধ্যে বাচ্চা হয়না, পরের বছর তাদেরকে আবার এসে ঘোড়া বাঁধতে হয় । এভাবেই বাচ্চা না হওয়া অবধি মানত করে যেতেই হবে।

রাজা উদয় সিংয়ের কথা মনে পড়ে মিয়াজীর। প্রধান সেনাপতির মৃত্যুর সংবাদ তাকে বিচলিত করে। বিভিন্ন পথে নবাবের সৈন্য বিরক্ষেতি আক্রমণ করে লুটপাট চালায়। নারী পুরুষ যে যেদিকে পারে পালিয়ে প্রাণে বাঁচে। রাজা উদয়নারায়ণ সিং সপরিবারে বিরক্ষেতির প্রাসাদ ছেড়ে দেবীনগরে পলায়ণ করে। সেখানে সপরিবারে বিষপান করেও হংসসরোবরে আত্ম বিসর্জন করে। সলিলসমাধিতে মৃত্যু হলে মুরশিদকুলি খাঁ নবাবসেনা রঘুবীরের হাতে এই অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব দিয়ে দেয়। প্রধান সেনাপতির মৃতদেহ দাফন কাফন করা হয় এই ধলো দরগার কালো মাটিতে। প্রতিবছর এই মাজারে হাজার হাজার মানুষ এসে শিন্নি দেয়, চাদর চড়ায়, মানত করে। তিনদিনের উৎসবে লোকে লোকারণ্য থাকে।

চার

ডিম কেনাবেচা করে ইমরান খাঁ। সাদাসিধে মানুষটি যখন পাশের গাঁয়ে গিয়ে বন্ধু হক্কু শ্যাখকে বলে, শুন্যাছ হুক্কু ভ্যাই, হামাদের গাঁয়ের ইজাজ মুড়োলের ব্যাটা নইমুদ্দি তার চাচাতো বহিনকে নিয়ে গাঁ ছেড়ি পালালছে। কথাটা শুনেই হুক্কু বলে, কি বুলছ ভাই? এত্ত দূর! শুন্যাছিলাম ছুঁড়াটোর শাদী হুয়াছিলো ওরই মামাতো বোহিনের সাথে। ছুঁড়ি নাকি বাঁজা। ছেল্যাপিলা হয়নি।
— ঠিকই বুলাছো হুক্কুভাই। বলে ইমরান উৎসাহ বোধ করে। বলে, তুমিই বলো অমুন জোয়ান ছ্যালার কতদিন বিহা হলো, একটোও ছেলেপিলা হলো না, কি করবে বুলো?
— শুন্যাছি, মেয়েটোর নাকি বয়ুস হয়নি।
— বয়ুস না হোলেও মেয়্যাছেলের বয়স, গা-গতরে যৌবুন ফুটি উঠ্যাছে। অমুন পরীর মতুন ম্যায়া দেখলে কাহার মুন ঠিক থাকে তুমি বলো?
হক্কু কথা শুনে টিপ্পনী কাটে। হামরা ভ্যাই গরিবসরিব মানুষ। ইসব বড়নোকের ব্যাপার স্যাপার। ওদের কথা গাহা হামাদের সাজে না। আর অমুন ডাগর ছেলেটোর কথাটা বুলো, দুইটা বিহা করতেই পারে।

মেহেরজানবিবির সকাল থেকেই মন খারাপ।আর গুম মেরে দাওয়ার এক কোণায় বসে আছে আসমানী। মিয়াজীর লজ্জায় চোখ মুখ লাল টুকটুকে, যেন রামধনুর আলো চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। গিন্নিকে ডেকে বলে, বিবিজান, তুমি তো মা! ব্যাটার মতিগতি বুঝতে পারনি।
— ব্যাটাছেল্যার মুন কি করি বুঝবো বলো? সব সময় তোমার মুন কি বুঝতে পারি?
মিয়াজী চুপ করে যায়।
— বৌমা একটু সাবধানে থাকলে হয়তো আটকা যেত। আচ্ছা বৌমা, তুমি কি কিছু আঁচটাচ করতে পেরাছিলে?

চুপ করে বসে আসমানী। তার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসছে। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে। এতদিন ঘর সংসার করেও একটা সন্তানের জন্ম দিতে পারল না। শাশুড়ির কথার কোন উত্তর দেয় না আসমানী। শ্বশুর ইজাজ মিয়া বারান্দার একপাশ থেকে অন্য পাশে হেঁটে পায়চারি করছে। মনে মনে ভাবছে, এখন কি করা যায়? নিজের সন্তান কোথায় গেল? প্রথম প্রথম রাগ হলেও এখন সন্তানের জন্য মনটা তার ব্যাকুল হয়ে উঠছে।

সকাল থেকেই উপোষ, কোন কিছুই খেতে ইচ্ছে করে না আসমানির। বুক দোলে দোলে উঠছে। বারান্দার এক কোণে গিয়ে খ্যাক্ খ্যাক্ করে বমি করতে লাগে। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে মেহেরজান। বলে, আহারে, মেয়েটি সকাল থেকে কিছু খাইনি। উপোস থেকে থেকেই বমি করছে। গ্যাস অম্বল চাড়া দিয়্যাছে। এখনই হোগল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মিয়াজী হাঁক ছাড়ে, ও শাকিব, শাকিব রে! জলদি আয়। গাড়ি খান বাঁধ, বৌমাকে ডাক্তারখানা নিয়ে যেতে হবে, মাইল খানেক দূরে বিক্রমপুরের বাজারে হোগলডাক্তারের ডাক্তার-খানা। শাকিব তাড়াতাড়ি ছুটে আসে। হর দিন সকালে পড়শি নিধুবালা দাসী আসে গিন্নি মার কাছে। কিছু খাবার দাবার নিয়ে যায়। সেগুলোই বাড়িতে গিয়ে সময় মতো খায়।

— একি কি হলো? তোমার বৌমা অসুস্থ নাকি? বলে সহানুভূতির গলায় কথা বলে নিধুবালা।
— আর বোলো না নিধু। সকাল থেকেই বউটা উপোস, এখন বমি করছে। এখনই ওর চিকিৎসা করা দরকার। ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে হবে।
বৌমার দিকে তাকিয়ে নিধুবালা তার কাছে যায় এবং ফিসফিস করে বলে, বৌমা! তুমি কি তেঁতুল খেয়েছিলে?

অবাক হয়ে আসমানী নিধুবালার দিকে মুখ তুলে তাকায়, মনে মনে ভাবে, নিধু মাসি জানতে পারল কি করে? কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক ইঙ্গিত করে।
— ব্যাস, নিধুবালার চোখে আনন্দ ঝিলিক বয়ে উঠে। তাড়াতাড়ি গিন্নি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, একটু বেশি খাবার লাগবে গিন্নি মা।
–ক্যানে! তুমার যা বরাদ্দ তাই পাবে।
গিন্নি মার দিকে মুখ তুলে নিধু বলে, তা বুললে তো চলবে না। তুমি যে নাতি-নাতনি দিদা হতে চলেছ।
গিন্নি অবাক হয়ে বলে, মানে?
নিধুবালা বলে সত্যিই গো, তোমার বৌমা পোয়াতি।

জামিল চাচার ইফতার – নাসির ওয়াদেন

সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে পড়ছে। পশ্চিম আকাশে লাল রঙের আবরণ হলুদ বরণ ধারণ করেছে। শীত শীত ভাব নেই বললেই চলে। দিন দুয়েক থেকেই একটু একটু করে তাপ বাড়ছে। হঠাৎ একদিন এক পশলা ভারী বৃষ্টি হওয়ায় মাঠঘাট ভিজে জবজবে, গাছগুলো নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। একদল বলাকা উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে উড়ে গেল তাদের মাথার উপর দিয়ে। অকাল বৃষ্টির কারণে শীত খানিকটা জমে ক্ষীর হয়ে গেছিল, কিন্তু গতকাল থেকেই আবার সূর্যের তাপমাত্রা ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাওয়ায় গরম পড়েছে। আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, দু’দিন দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতেও তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি হতে পারে। বাতাসের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের আর্দ্রতাও বেড়ে গেছে। শ্বাস নিতে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। এমনিতেই চৈত-বৈশাখ মাসে মধ্যবঙ্গের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা চড়চড় করে বেড়ে যায়। ছোটনাগপুর মালভূমির একেবারে প্রান্ত সীমায় এই জেলা। জেলার পশ্চিম ভাগে ঢেউ খেলানো উঁচুনিচু লালমাটির ছোট ছোট পাহাড়। লালমোরামের নিচে থরে থরে সাজানো কয়লা। শোনা যায়, অষ্ট্রিক-দ্রাবিড় জাতির অধিবাসীগণ এখানকার অত্যুচ্চ পাহাড়ের মাটির নিচের কালোপাথর থেকে লৌহ নিষ্কাশন করতো। সেই লোহা দিয়েই নাকি লৌহজাত সামগ্রী তৈরি করা হতো। এসব কথা এখনও বয়স্ক মানুষদের মুখে শোনা যায়।

‘কই গো চাচা একটু জোরে রিক্সা চালাও। সাঁঝ যে হয়ে এলো।’
— চালাই ছি তো বাবা, চালাইছি। এই বুড়ো বয়সে আর কত্ত জোরে চালাইতে পারব বাপজান।
তা কাদের বাড়ি যাওয়া হোবে ?
— মোড়লদের বাড়ি গো ! দখিন পাড়ার সেকদের বাড়ির পাশে যে দোতলা পাকাবাড়িটা আছে, ওই টে।
মুখের ঘাম গামছায় মুছতে মুছতে চাচা বলল, ও, বুঝ্যাছি, মোবিন মুড়লের বাড়ি।

রিক্সার বাম পাশে বসেছিল মাকসুদা। ছেলেটাকে কোলের উপর বসিয়ে আশেপাশের আকাশ দেখাচ্ছিল। রিক্সাওয়ালার কথা কানে যেতেই বলল, কেন গো জামিল চাচা, আমাকে চিনতে পারছ না? আমি মাকসু আছি। মোবিন মোড়লের বড় বিটি।
— না রে মা! হামি তো তুমাকে চিনতেই পারছি নি।
আজকাল চোখে কম দেখত্যাছি মা, তা তুমাকে তো ওই ছোটবেলায় দেখ্যাছি। ফরগ পড়ি ইস্কুলে য্যেতা। সাতপুকুরের পাড়ে কুল গাছ থ্যেকে কুল পারতা। তখন তুমি কত্ত ছোট। এখুন তো অনেক বড়ো হুয়ে গ্যেলছিস রে মা।
— সে তো অনেক ছোটবেলার কথা গো চাচা।
— তা ক’দ্দিন পর অ্যাসছো মা’জান? বাপের বাড়ি বুঝি অনেকদিন পর এই পথ্থুম এল্যা?
— হ গো চাচা। সেই বিয়ের পর বার দুয়েক কেবল এসেছি। তোমাদের জামাই যেদিনে চাকরি পেলো, তখন থেকেই আমরা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা চলে যাই। এতদিন ওখানেই আছি। এই রুখাসুখা মাটির কথা খুব মনে পড়ে। আর ওখানকার বাতাসে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। চারদিকে ঘন জঙ্গল, সুন্দরবনের কাছাকাছি। জলে নোনতা স্বাদ, এদিকের মতো মিঠা নয়।

চাচা তোমার বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছে, এই বুড়ো বয়সে রিক্সা টানা কি ঠিক হচ্ছে? বলল জামাই।
— কি করবো জামাই, হামার নসিব খারাপ আচে। নইলে কি এই বুড়ো বয়সেও ঘানির মতো রিক্সা টানি। সব কপালের দোষ গো জামাই, সব কপালেরই দোষ।
— কেন গো ? শুনেছি তোমার দুইটা ছেলে আছে। মাকসুদা বলে।
— আছে তো মা । কথায় বোলে না, দুষ্টু গোরুর থ্যেকা শূন্য গোহাল ভালো।
জামাই শুধায়, ওরা কিছুই করে না বুঝি?
— তা আর কোরবে না ক্যানে জামাই। বড়টা বউ ছ্যালা নিঙয়ে পিথক আছে,বলে কি না তুমাদের খ্যেতি দিতে পারব না; আর ছোটটোর কুথা বুলো না, বিহ্যার পর বউ লিয়া যি শ্বশুরবাড়ি চলি গ্যালো, একবারও ফিরে এলো না। বাপ-মা বাঁচল, কি মরল তার কুনু খোঁজ খবুর ল্যাই নাই।
— তার জন্য বুঝি এই বুড়ো বয়সে রিক্সা চালান। এই বয়স তো দুনিয়াদারি ছেড়ে মসজিদে বসে ধর্ম কর্ম করে কাটানোর সময়।
— সে কি হামার কপালে আছে জামাই । তবে শুনো…

দুই

জামিলের বয়স তখন বিশ। সুপুরুষ আর সুঠাম দেহ। পড়াশোনাও অনেকখানি করেছে, তবে মেট্রিক পাস দিতে পারেনি। সেই সময়ে রোজগারের উদ্দেশ্যে বোম্বাই চলে যায়। পাশের পলসা গাঁয়ের কয়েকজন যুবকের সাথে একদিন রাতের ট্রেন ধরে বাপ মাকে না জানিয়ে একেবারে সোজা বোম্বাই। সেখানে গিয়ে রাজমিস্ত্রির সাথে রোজের কাজে লেগে পড়ে।

প্রথমে বাড়ির লোকে জানতে পারেনি। এই বয়সে প্রথম প্রথম বাড়িতে বলা-কওয়া না করে মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে হুট করে বেরিয়ে যেত, দু চারদিন এদিকে ওদিকে কাটিয়ে ঠিক বাড়ি ফিরে আসত।
— হামি তো পেরাই দিন বাড়ি থ্যেকি বদ্দমান, হাবড়া চলি যেতুম। কয়েকদিন সেখানে কাজটাজ করি বাড়ির কথা মুনে এলে সুড়সুড় করি গাধা ঘোড়ার মতুন মাথা নিচু করি বাড়ি ফিরতুম।
সেবারে, বাপমা ভাবল, ব্যাটা হয়ত কারও সুথে বদ্দমান, হাবড়া চলি গেলছে। ঠিক দুচার দিন বাদে আবার ফিরি আসবে। কিন্তু অনেকদিন হলেও ফিরে এলো না।
একদিন রাতের বেলা জামিলের মা তার আব্বুকে বলে, শুনছো মিয়াজান, ইবার ছেলেটার একটা বেবস্থা করো, টুকটুকে একটো বউ দ্যাখা শাদি দিয়া দ্যাও। দ্যাখবা, আর ও বাড়ি ছ্যাড়ি উড়নচণ্ডির মতুন কুথাও চলি য্যাবে না। আর ফি বছর য্যেতেই একটা লাল টুকটুকে সোনা পয়দা হুয়ে গেলেই ব্যস…

বউয়ের কথা শুনে জামিলের আব্বা বলে, তুমি ঠিকই কথা কহ্যাছ বিবি। তুমার কথাই ইবার ফলবে। একটো নতুন মাদীঘোড়া এনে ওর গলায় ঝুলাই দিলেই কেল্লা ফতে।

ইবার শুরু হলো বউ দ্যাখার পালা।

দিন যায়, রাত যায়। এভাবেই কেটে যায় ছ মাস। বর্ষা এলো, বিষ্টি ঝরল,ভিজল মাটি। তালদিঘির মাঠের কিরান জমির বুকে জল থৈ থৈ করছে, তা দেখেই লালজান সেখের চোখ ছলছল করে। ছেলেটার একটা গতি হলো না, চাকরি বাকরি তো হওয়ার যো নেই। কোনরকমে ম্যাট্রিক পাশ দিতে পারলে হয়ত আকরাম খাঁ-কে বলে কয়ে, না হয় হাতে পায়ে ধরে একটা কিছু করার বেবস্থা করা যেত। ছোঁড়াটা আলতু ফালতু ঘোড়াদের পাল্লায় পড়ে লষ্ট হয়ে গেলছে।
একবার ইস্কুলমাঠে লুকিয়ে চুরিয়ে বিড়ি খাওয়ার অপরাধে হাইস্কুলের মশিহুর মাস্টার অফিস ঘরে ভরে আচ্ছা করে দমাদম বার কয়েক কাঁচা শিকটির বাড়ি মেরে পিঠে দাগ তুলে দিয়েছিল। সেদিন থেকেই জামিল আর ইস্কুলে যায়নি। লালজান সেখের কাছে সেও এক ইতিহাস। অনেকেই জানে সেইটা।

মশিহুর মাস্টার জামিলের ভয়ে তো ওই সরান ধরে যাওয়া আসা একরকম ছেড়েই দিয়েছিল। কি জানি, আজকালকার ছেলেছোকড়া কখন আধলা ইঁট মাথায় বসিয়ে দেয়, তার কি কোন ঠিক-ঠিকানা আছে। বরং দূর দূর থাকাই ভালো।
ছ’মাস বোম্বাই-এ থাকার পরে বাড়ি ফিরে আসে জামিল। কয়েক হাজার টাকাও সাথে আনে, এসে টাকাগুলো তুলে দেয় লালজানের হাতে। বলে, ল্যাও,বাপ, তুমার অধম ব্যাটার পরথুম ওজগারের টাকা।
রিক্সা টানতে টানতে জামিল বলেই যাচ্ছিল কথাগুলো আর চুপচাপ শুনছিল জামাই ওয়াসিম আক্রাম। দীর্ঘ পথ। সেই সকালের দিকে ট্রেনে চড়ে বেলা দুটোর সময়ে বোলপুর স্টেশনে ওরা নেমেছে। বাস ধর্মঘট। পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়ার অভিযোগে বাসমালিকরা ধর্মঘট ডেকেছে।
বাজারে কিছু কেনাকাটা করতে করতে অনেকটাই সময় কেটে যায় তাদের। অগত্যা রিক্সা ভাড়া করে। দশ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে তবেই সোনাইদিঘি গাঁ। ওখানেই যাচ্ছে ওরা। অনেকদিন পর, এই রোজা রমজানের দিনে ওরা শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। কিছু কেনাকাটা তো থাকবেই, সেটাই বাস্তব কথা।

তিন

ধুমধাম করে জামিলের শাদি হয়ে যায় হজরতপুরের ওসমান স্যাকের বিটি ময়নামতির সাথে। ময়না লেখাপড়া কম জানা, কিন্তু গায়ের রঙ দুধে আলতা, ফিনফিনে দাদা। হরিণটানা চোখের ঝিলিক আর মুখের ফিনকি হাসি দেখেই জামিলের বুকখানা ধরাস করে কেঁপে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, ভিসুভিয়াস পাহাড়ের বুকে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে গেছে। পাহাড়ের বুক থেকে গলগল করে তপ্ত লাভা বেরিয়ে আসে, গা-গতরে ছেয়ে পড়ে। সেই উল্লাসে পাহাড়ের মাটিও আনন্দে আত্মহারা। তার গতরের ওপর জন্মে থাকা ঝোপঝাড়,গুল্মলতা যে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। ময়নার মুখে ভাসছে খিলিখিলি হাসি। অপরূপা ময়নামতির হাত ধরে যেদিনে সোনাইদিঘিতে প্রবেশ করল, কত রকম বাজনা বাজল। কত আমোদ প্রমোদ। আত্মীয় স্বজনে ভরে গেছিল ভাঙা উঠান। ভুরিভোজের আয়োজন হয়েছিল। জামিলের দুষ্টু মিষ্টু বন্ধুরাও এসেছিল বৌভাতে। আনন্দের ছড়াছড়ি, ছোটদের হৈ হুল্লোর, মাইকের কণ্ঠে আধুনিক গান।
বিয়ের রাতে শালি-শালাজদের ফোড়ন কাটা তাকে বিধ্বস্ত করে তোলে। এক শালি ছড়া কেটে বললো, বলোতো জামাইবাবু,
শুন হামার সই, লাল টুকটুকে বউ
যা দিলে তাই খায়, পানি দিলে মরি যায়। –কি হয়?
জামিল প্রশ্ন শুনে ‘থ’ হয়ে পড়েছিল। মনে মনে ভাবল, এ আবার কেমন ধারা কথা। মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকে। পাশ থেকে এক শালাজ দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ে মারে, বলো জামাই,

দু’হাতে চ্যাপি ধরি, মাজা দুলাই দুলাই করি
করার শেষে মজা, খেয়েই তরতাজা,
— ইটো কি?
লজ্জায় জামিলের কানদুটো লাল হয়ে ওঠে।
–ধ্যেত, অসভ্য তুমরা। ই গিলান আবারো পোরোশনো হলো? লাজশরম ন্যাই তুমাদের?

শালিরদল হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, হামাদের জামাইবাবু খুব বোকা। কুচছু জানে না গো, কুচ্ছু জানে না। একেবারে মুখ্খু। ‘মুখ্খু’ কথাটা শুনে আঁতে ঘা লাগে জামিলের। না হয় ম্যাট্রিক পাশ দিতে পারে নি, তাই বলে মুর্খু। লজ্জায় রাগে গজগজ করতে করতে সেই রাতেই বাড়ি চলে আসে। পরদিন শ্বশুরমশাই তার বিটিকে শ্বশুরবাড়ি দিয়ে আসে। অষ্টমুঙ্গলা করতে আর ও পথে পা বাড়ায়নি জামিল। পাশের ঘরে শুয়ে পড়েছে নতুন বউ। রাতের খাওয়া দাওয়া করে মা জামিলকে বলে,ব্যাটা ওই ঘরে যা, ওখানেই বউমা একলা আছে, জালি গতর, জ্বীন পরির আশন্যাই পড়তে পারে। কাঁচা হলুদ গায়ে, দুষ্টুদের লোভ বাড়ে। ভীষণ লজ্জা করছিল তার। তবুও নিতান্ত অবোধ বালকের মতো পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে পড়ে জামিল। হুট করে দরোজাখানা বন্ধ করে দিতেই খট্ আওয়াজে চমকে ওঠে ময়না। ‘বাবা গো, ধরলে গো,’ বলে বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে এসে দু হাতে জড়িয়ে ধরে জামিলকে। জামিল অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কি করবে, না করবে ভেবে পায়না। মুখে বলে, বিবিজান, ভয় কোরছ ক্যেনে? দ্যাখো, হামি জামিল আছি।

তখন কোন কথাই কানে ঢুকে না ময়নার। আরও জোরে চেপে ধরে তাকে। এই প্রথম জামিল কোন এক অচেনা অজানা নারীর কোমল হাতের স্পর্শে কেমন আনমনা হয়ে যায়। নরম হাতের উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে তার মনের আধারে একটা ঢেউ ওঠে উথাল পাথাল করে। এক দুষ্টু ঝড় ছুটে এসে শান্ত সমুদ্রের বুকে ভেসে-চলা ছোট ডিঙিখানাকে নাড়িয়ে দেয়। প্রবল ঢেউ-য়ের উচ্ছ্বাস দোলা দেয় ডিঙিখানাকে। দুলতে থাকে দুদিকে সমানতালে। শান্ত, নিরীহ সাগরের জল অশান্ত হয়, ক্ষেপে ওঠে, বারবার আঘাত করে ডিঙিকে। এতদিনের মজবুত পাটাতন বুঝি এখনই ভেঙে পড়বে। নিবিড় আলিঙ্গনে সাগরের শীতলজল ঘোড়াবানের মতো উথাল পাথাল করে দিচ্ছে ডিঙির দেহখানা। অন্ধকার নেমে আসে প্রকৃতির বুকে। একটা বড় জলের উচ্ছ্বাস ঢেউ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডিঙির পাটাতনের ওপর। সেই জোর ধাক্কায় ডিঙিখানা ক্রমশ গভীর জলের দিকে নামতে থাকে, এই বুঝি কোন এক সংঘর্ষ বাঁধলো, সেই সংঘর্ষে নতুন করে আলোর উদয় ঘটবে। অন্ধকারে গা ঘেঁষে জোর করে চেপে ধরল জামিল ময়নামতিকে। ময়নামতিও ভয়ার্ত চোখে আবছা আলোছায়ায় মেতে ওঠে নিবিড় বন্ধনে।
ঘুম ভাঙে ভোরের শব্দে পাখির গানে, কথায়। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক আর মিষ্টি মিষ্টি বাতাস মন প্রাণকে ভরে দিচ্ছে তাদের। এক অযাচিত যাত্রাপথের নতুন পথিক হয়ে, অজানা দূর দেশে পাড়ি দিয়ে চলেছে জামিল।

চার

— আর কতটা সময় লাগবে চাচা? জিজ্ঞেস করে মাকসুদা । কোলের ছেলেটা একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে ওঠে, মা, মা, ওই দেখো, একটা পাখি ডাকছে কু কু করে।
মা বলে, সোনা ওটা কোকিল পাখি।
ছেলে বলে ওঠে, ওটা তো দুষ্টু পাখি মা।
অবাক হয়ে মা শুধায়, কেন বাবা ? ও পাখি তো বসন্তের দূত। দুষ্টু হতে যাবে কেন?
— দূত না ভূত! বলে উঠে ছেলে। ইস্কুলে স্যার বলছিল, কোকিল সুযোগ পেলেই কাকের বাসায় ডিম পাড়ে।
— হ্যাঁ পাড়ে তো, ও যে নিজে বাচ্চা তুলতে জানে না। তাই কাক-মা তার ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা তুলে দেয়।
— তাহলে বলো, দুষ্টু নয়? অলস, কুঁড়ো, ঢেঁকি পাখি। কাক-ই তাহলে ভালো। কেমন পরের বাচ্চা মানুষ করে দেয়।

পাঁচ বছরের সোনার কথা শুনে মায়ের চোখে যেমন জল আসে, তেমনই আনন্দও জাগে মনে। এইটুকু একটা ছোট্ট বাচ্চার মনে এত চিন্তা। বড় হয়ে নিশ্চয় ও বিদ্বান হবে।
— সূর্যি যে ডুবু ডুবু চাচা। আর হাতে মাত্র বিশ মিনিট সময় আছে। এর মধ্যেই পৌঁছাতে না পারলে যে রাস্তাতেই রোজা ভাঙতে হবে।
এতক্ষণে জামিল বলে ওঠে, তুমরা রোজা করেছো জামাই! আমিও তো রোজা করেছি।
জামিলের কথা শুনে চমকে উঠে জামাই। মনে মনে ভাবে,তাদের তো খুবই অন্যায় হয়ে গেছে এই অবেলায় রোজাদার চাচাকে একটু বকাঝকা করা। একজন বুড়ো মানুষের গাড়িতে তাদের আসাটা কি ঠিক হয়েছে?
এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও তো ছিল না। কেউ এতদূর রিক্সা টেনে আনতে চাইছিল না। দুটো বেশি পয়সা দেওয়ার কথা বলতেই তো রাজি হয়েছে। তা না হলে এই ভ্যাপসা গরমে, ধ্যাড়ধ্যেড়ে গোবিন্দপুরে কেউ বুড়ো বয়সে রিক্সা টেনে নিয়ে আসে। জামিল চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয় মাকসুদার। সেও বলে, চাচা তুমি ধীরে ধীরে নিয়ে চলো।
— সমুয় যি নাই রে মা! ওই তো সুয্যি ডুবু ডুবু, ইফতারের টাইম হুয়ে অ্যাসছে।

গাঁয়ের লালমোড়ামের রাস্তা দিয়ে রিক্সাখানা ছুটে চলেছে। গুইদের বাড়ির দিকে একদল সাদা রঙের রাজহাঁস প্যাক্ প্যাক্ করতে করতে হেলেদুলে চলছে। কোলের ছেলেটা দুহাত দিয়ে হাততালি মেরে হাঁসগুলোকে তাড়াতে চাইল। এদিকে একদল ভেড়া রাস্তা পার হয়ে চলে গেল ওপারে।
গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায় রিক্সাখানা। চাচা হাঁক দিয়ে বলে, চলে এসেছি মা! সমুয় ন্যাই, ঝটপট ন্যেমি পড়ো।
রিক্সা থেকে নেমে পড়ে ওরা। পকেট থেকে ভাড়ার টাকা বের করে জামাই বলে, এই নিন চাচা।
মাকসুদা বলে, চাচা সময় নাই। ইফতারের টাইম হয়ে গেছে। বাড়িতে চলো, ইফতার করে ফিরে যাবে।
টাকা-টা হাতে নিয়েই জামিল বড়ঞ্জির ট্যাকে ভরতে ভরতে বলে, ঠিক আছে মা, ঠিক আছে। আর একদিন না হয় হবে। আমি না গেলে যে তোর চাচি রোজা ভাঙতে পারবে না। ইফতার না করলে কি রোজা যায়েজ হবে মা?
— বলেই ঝনঝন করে রিক্সাখানা নিয়ে জামিল চাচা ছুটে চলল তার বাড়ির পথে।

ধলু ও মিষ্টি-ঘাস – নাসির ওয়াদেন

এক

রোশনারা ঘর থেকে হাঁক ছাড়ে, ‘কোই রি অ্যাস ন্যা, কতি গেলি রি মা?’
কোন উত্তর না পেয়ে রোশনারা ক্ষুব্ধ হয়। রাগের চোটে বলে, মাগীটা দিন দিন ধ্যাঙড় হোছে, যখুন তখুন ইতিউতি চলি যেছে, বুলা ন্যাই, কুয়া ন্যাই। তা ও আম্ ন্যা, শুনতে পেলি?

মাটির ঘরের দাওয়া থেকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে বিবিজান। একসময় ধপ্ করে বসে পড়ে মাটিতে। মাথাটা ঘুরে যায়। গত তিন মাস হল ডান চোখটা অপারেশন করেছিল। কিন্তু কোন ফল পাইনি। উল্টো চোখটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যে চোখটাতে একটু আধটু দেখতে পেত, সেটাও দিন কয়েক থেকেই আবছা দেখছে। ডাক্তার দেখানোর একটা কানাকড়িও নেই ঘরে। থাকবে কি করে, এই বুড়ো বয়সে আব্দুল হালিমের গায়ে কি আর তেমন শক্তি আছে। জোয়ান বয়সে হালিমের যখন গায়ে ত্যাজ ছিল, জোর ছিল, তখনই ধলুকে কিনে এনেছিল ঘরে। তার গায়ে-গতরে মোষের মত শক্তি। যেদিকে ঝাঁপাত, সেদিকেই জোশ পেত, টাকাকড়ি হাতে লাগত, রোজগারপাতিও হত ভালোই। সংসার চলত বেশ ভালই, রমরমিয়ে। সংসার বলে কথা।

গহরজান বিবিকে বিয়ে করে ঘরে তোলে হালিম। পাড়ার লোকেরা তাকে ভালোবেসে ডাকত ‘আবদুল হালিম’ বলে। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করেও ডাকত ‘হালুম’। লেখাপড়া কম জানা হালিমও সেটাকে সানন্দে উপভোগ করত, আনন্দও পেত। মনে মনে নিজেকে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজউদ্দৌলা ভাবত। গহরজান দেখতে সুন্দরী ছিল বলেই পাড়ার মোড়লের ছোঁড়াটা ছোক্ ছোক্ করে ঘুরতে, গা ঘেঁষে থাকার চেষ্টা করত।
গহরজানকে ফুসলাত আর বলত, মেরি পিয়ারী জান, তুম দিল মে লাগ যাও, ও লো …
গহরজান সে-রকম নষ্ট মেয়ে নয়। রীতিমতো শরীয়ত মেনে চলা পরিবারের মেয়ে। মা ও বাবা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী। তাঁদের মেয়ে কি করে কুলাঙ্গার হতে পারে। কুসঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে না।

একদিন সন্ধেবেলায় হালিম তার সন্তানতুল্য ধলুকে মাঠ থেকে আনতে যায়। ফেরার সময় ধলু দৌড়ে বাঁশ বনে ঢুকে পড়ে। ভর-সন্ধ্যের আলো আঁধারিতে দুজনে যে লুকোচুরি খেলা চলছে তা দেখতে ভালোই লাগছে। কিছুতেই গোয়ালে গিয়ে গলায় দোড়্যা পড়তে রাজি নয় সে। তাই, এই আলো-আঁধারির খেলাটা বেশ জমে উঠেছে। আকাশে মিটমিট করে জ্বলা কয়েকটি তারা এক দৃষ্টিতে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। দুষ্টু মিষ্টু খেলা দেখতে তাদেরও লাগছে ভয়ানক মজা। পূবদিকের উত্তরকোণে তখনও চাঁদ ভাগ্নে তার গায়ের লেবাস খুলে ফেলেনি, একটা আস্ত কালো চাদর জড়িয়ে রয়েছে। উত্তর দিক থেকে শিরশির করে হিমানী বাতাস এসে হামলে পড়ছে বাঁশঝাড়ের গায়ে। ছেঁড়াফাটা গেঞ্জিখানা পড়ে হালিমও ছোটাছুটি করছে। নাছোড়বান্দা ধলুকে একটু টাইট দেবে, মনে মনে ভেবে,খুব দৌড় দৌড়াচ্ছে‌। ধলুও তার প্রিয় বাবাতুল্য হালিমকে নাকানিচোকানি খাইয়ে, মাঝে মাঝে মালিকের দিকে কটরমটর চোখে তাকিয়ে দেখছে। তারপর আবার অন্য অন্ধকারে ঢুকে পড়ছে। বাঁশের পাতায় শনশন করে বাতাস ভেসে যাচ্ছে। একটু শীত শীত ভাব জানান দিচ্ছে সন্ধ্যেটা।

— ও সুন্দরী গহরজান, মেরি জান! আ মেরে দিল মে, লাগা দে দিল – বলে অশ্লীল ইঙ্গিত করে মোড়লের ছোঁড়াটা।
— তখনও আসমিনার চোখে পৃথিবীর নরম আলোর স্বাদ এসে পড়েনি। তিন মাসের জমাট ভ্রূণ পেট ভরে আছে গহরজানের। মরদ হালিমের আদরের সন্তান। তিলে তিলে চাঁদের পলে পলে বেঁধে ওঠার মত সেও মাতৃগর্ভে রক্ত ঘাম খেয়ে বাড়ছে। মাঝে মাঝে স্ফীত পেটের উপর হাত বুলিয়ে আদর করে গহর ।
‘বাছা, তোমাকে আমরা কত যত্নআত্তি করে বড় করব । তুমি আমাদের প্রথম সন্তান। তোমার মুখ দেখেই তো আমরা বেঁচে থাকার স্বপ্নটাকে সত্যি করে রাখবো।’ মনে মনে এসব কথা ভাবছে একলা ঘরে বসে গহর। সেই সময়ে এক অসভ্য ছায়া, কামনাসক্ত নরখাদক এসে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে কুকথা, অকথা বলে বুকের কাছে টেনে নিতে চাইছে তাকে।

— কি হলো গহরজান! কুথা বুলছো না ক্যানে, হামাকে কি তুমার পছন্দ হোছে না?
চুপচাপ ভয়ার্ত চোখে দাওয়ার শক্ত খুঁটিটা হাতে ধরে চেপে বসে আছে। মনে শঙ্কা জাগছে। হয়তো এখনই ক্ষুধার্ত নেকড়েটা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। টুকরো টুকরো করে দেবে তাদের সাধের স্বপ্নটাকে। ছিঁড়ে খুঁড়ে খাবে তার ইজ্জত। মনে মনে উপায় খোঁজে। বলে, আল্লাহ, তুমি রক্ষাকর্তা। হামারে এ বেপদ থেকি অক্ষা করো।

চাঁদ একটু একটু করে তার গায়ের কালো চাদরখানা খুলে ফেলছে গৌরবর্ণ শরীর থেকে। আলো আঁধারির মাঝে একটু আলোর ঝিলিক এসে পড়ল উঠোনে। বাতাসের হিমানী উত্তাপও কমে আসছে ধীরে ধীরে।
— তাহলে হামার কথা শুনবি না মাগী। তবে দ্যাখ, এখুন তো তোর ভাতার বাড়িতে ন্যাই, কে তোকে বাঁচায় দ্যেখি– বলে দাওয়ার দিতে এগিয়ে যায় ক্ষুধার্ত নির্লজ্জ নেকড়েটা।
— খবরদার হারামজাদা! যদি একটা পা এগুয়েছিস তো, তোকে এই আঁশ বটি দিয়্যা তিন টুকরা কোরা কুত্তাদের খাওয়াবো। হামিও গোহারজান আছি, আদম মুন্সির বিটি বটে।
চাঁদের আলোয় আঁশবটিটা চিকচিক করে উঠেছে। তার লকলকে জিভেও লালা ঝরছে। কতদিন মানুষের রক্ত পান করেনি।‌ মানুষের রক্তের স্বাদ তো অপূর্ব। তাই তো, মাঝে মাঝে গহরজানের আঙ্গুলের রক্ত চেখে দ্যাখে। আস্ত একটা নোংরা মানুষের রক্ত পানের উৎসাহে বটিটা চাঁদের আলোয় ঝিকিমিকি করে ওঠে।
— আয়! দেখি তোকে আজকে কে বাঁচায়?
‘বাবা গো, মা গো’– বলে নেকড়েটা ছুটে পালাতে থাকে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বিন্দু দিয়ে আলপনা তৈরি করে উঠোনের মাটি।

দুই

আসমিনার জন্ম হওয়ার পরে পরেই মারা যায় গহরজান। মা-মরা মেয়েটাকে দূর সম্পর্কের এক পিসি-ফুফুর কাছে মানুষ করতে রেখে আসে হালিম। একদিকে না-খেতে পেয়ে ধলু হাড় জিড়জিড়ে হয়ে পড়ে। মোড়লের ছেলের রোষে মাঠের অফসল ঘাস খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ধলুর। একদিন দড়ি ছিঁড়ে গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে মোড়লের ফলন্ত পেঁপে গাছ খাওয়ার অপরাধে ধলুর কারাবাস হলো গোবিন্দপুরের খোয়াড়ে। দিন দুয়েক সেখানে জেলখাটার পর গহরজানের চাঁদির হারখানা বিক্রি করে জামিন করে আনে হালিম। দূর সম্পর্কের ওই পিসিফুফুর অকাল মৃত্যুর পরেই আসমিনা ফিরে আসে তার বাবার ঘরে, মেয়ে ও ধলুকে নিয়ে বেশ সুন্দর জীবন কেটে যাচ্ছিল হালিমের। মেয়েটাও দেখতে দেখতে সতেরটা বসন্ত পার করে পলাশ শিমুলের মত উজ্জ্বল ও চকচক করে ফুটে উঠতে লাগল গরীবের ঘরে, যেমন করে ভাঙ্গা ঘরের চাল থেকে চকচকে আলোর ঝরনা ঝ’রে সুন্দর করে তোলে সুখের চাঁদকে। বাপ-মেয়ে মিলে ধলুর সেবা যত্নে ধলু আবার নতুন করে জীবন ফিরে পায়।

হাওয়া বদল হলে যেমন স্বস্তি আছে, বাংলার মাটিতেও নতুন হাওয়া এসে মাঠঘাটের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়ে যায়। খাঁ খাঁ করা মাঠে সবুজের প্রাণ, ভালোবাসার গন্ধ, নতুন ধানের প্লাবন, সোনালী স্রোতের ইন্ধন, আকাশ বাতাস যেন কৃষিতে মশগুল। এতদিনের চাপা ভ্যাপসা গরম আবহাওয়া থেকে নতুন করে বাঁচার বাতাস, প্রেরণার উচ্ছ্বাস পল্লীবাসীর জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে তোলে,গড়তে থাকে সোনার বাংলা। মাঠে মাঠে সবুজ ঘাস ভরে ওঠে সারা বছর ধরে। ধলুকে আর বেড়া ডিঙিয়ে পড়শির ঘরের ফসলে মুখ দিতে হয় না। মাঠের ঘাস পেট পুরে প্রাণ জুড়িয়ে উপভোগ করে। কচি কচি ঘাসের স্পর্শে ধলুর ক্ষীণ শরীর স্ফীতকার হয়ে ওঠে।

সোমত্ত মেয়ে আসমিনাকে একাকী ঘরে রেখে বাইরে কাজ করতে মন বসে না হালিমের। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকে। কখন কালকেউটেগুলো এসে তার মা-মরা একমাত্র মেয়েটাকে ডালকুত্তার মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। তারই ভয়ে ভয়ে থাকে সে। অবশেষে মেয়ের প্রস্তাবেই রাজি হয় হালিম। ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরের বাপ-মরা এক বিধবা মেয়ে, রোশনারাকে শাদি করে ঘরে তোলে। তাতে একদিকে মেয়েটার একটা হিল্লে হয়, তেমনি তারও ঘর সংসার গুছিয়ে তোলার একজন মেয়েলোক জোটে। আসমিনাও বেশি বেশি সময় দিয়ে বিড়ি বেঁধে দু-চার পয়সা রোজগার করে, সংসারের খরচ জোগায়।

মাঝে মাঝে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বাপ মা-মরা মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, লক্ষ্মী মা হামার! ইবার তো তোর বয়স হলো, এ্যাকটো সুন্দর পাত্তর দেখ্যা তোর শাদি দিয়্যা দিবো।
আসমিনা লজ্জা পেয়ে বলে, কি বলো বাবজান, হামি বুঝি বোঝা হুয়ে গ্যেলছি।
— না না মা, তা বুলছি না। তবে তো জানিস সোমত্ত বিটি ঘরে রাখতে ন্যাই। কখন কার কুনজর পড়ে।
— হামি কি তুমার ভীতু মেয়ে নাকি? তুমি ভয়ডর করো না বাপ,হামি সব সামলে লিব।
— তা বুললে হয় মা, তোর ঘর সংসার হোবে, ছেলেপুলে হোবে, তাদের নিঙ্ সুখে থাকবি।
— ধ্যাত! বলে আসমিনা লজ্জায় মুখ ঢাকে। পাশের ঘরে ঘুমাতে যায়। সামনের বারান্দায় রোশনারাকে সাথে নিয়ে ঘুমায় হালিম। ভাঙাচোরা বাড়িতে কখন যে হুলোবেড়াল ঢুকে পড়বে তার কি কুনো গ্যারান্টি আছে।

তিন

— হামাকে ডাকছো মা! এইতো হামি একটু মালতি দিদির বাড়িতে গেলছিলুম। তুমি নিচে নামছো ক্যানে? পড়ি য্যাবা যি–
— হতচ্ছাড়ি মেয়ে। যখুন তখুন এদিক-ওদিক চলি য্যাছি। দাঁড়া,অ্যাজ তোর বাপ এ্যাসুক,ওকে বুলছি তোকে শীঘ্রই বাড়িছাড়া করাব। মিনসেকে‌ বলি কালকেই তোকে য্যামুন ত্যামুন যাকেই পাব তারই সাথে তোর শাদি দিয়্যা দিমু। — বলে গালি দেয় রোশনারা।

আসমিনা চুপ করে থাকে। মিষ্টি করে মায়ের গা-গতরে হাত বুলিয়ে বলে, দ্যাখো মা, হামি তো তুমাকে না বুলি কতি য্যাইনা। তবে মিছিমিছি আগ করছ ক্যেনে, হামি চলি গেলে তুমার বুঝি খুউব ভাল লাগবে?তুমি ভাত রাঁধতে পারব্যা? ভাত বেড়ে দিতে পারব্যা? ঘরদোর ঝাঁট দিতে পারব্যা? তাছাড়া হামিও তো বিড়ি বেঁধি টাকা ওজগার করি। করি না তুমিই বুলো?
এবার রোশনারা চুপ করে যায়। মনে মনে ভাবে, সত্যিই তো মেয়েটা নিজের পেটের না হলেও’ মা মা’ বলে অজ্ঞান। বিয়ে দিলে তো পরের বাড়ি চলি য্যাবে। তখুন তাদেরকে দেখভাল করবে কে?
আসমিনা তার মাকে সান্ত্বনা দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলে, মা! তুমিও হামার আপন মা। হামার আসল মা মারা গেলেও তুমিই তো মায়ের আদর দিঙেই হামাকে বড় করাছো। কেন এরকুম মিছিমিছি রাগ করছো মা?
মা ডাক শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যায় রোশনারার।

বাড়ির বাইরে হালিমের গলার স্বর শোনা যায়। গোফুর যেন কার সঙ্গে একটা কথা বলছে। মা ও মেয়ে দুজনের কান যায় ওদিকে।
— দেখো হালুম ভাই, ইবার বাজার খুব তেজি লয়। তুমি তো জানো গরু কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজ্যে কি তোলপাড় চলছে। চারিদিকে ‘চোর,চোর ‘ধ্বনিতে ভরে গেলছে। বাইরে পাচার করাও খুব রিস্কি। বলে থামে হযরত পেক্যার।
— তা তো ঠিকই বুলছো হসরত। তবে একটো কথা শুনো। ই-বছর কোরবানির বাজারে গোরুর চাহিদা কিন্তু আছে। তাছাড়া ওই কতদিনের ধলুকে বেচতে কি মন চাহে– কিন্তু ওই যে বলি, ভাগ্যে না থাকলে ঠকঠকালে কি ঘি মেলে?
— মানে বুঝলে তো ভাইয়া। তোমার দরকার টাকার, হামার দরকার লাভের। হামাকেও তো দুট্যা পয়সা কোরতে হোবে। কি বলো হালুম? হামি তো ঘরে পুষবো না, হামাকেও হাটে তুলতে হোবে, বড়লোকদের ইনিয়ে বিনিয়ে ফুসলিয়ে বিক্রি করতে হোবে। দুট্যা পয়সা রোজগার করে লাভ করতে হোবে।– বলে একটা ক্রূর হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে দাড়িতে হাত বুলাতে থাকে প্যাকার হসরত।

— কি আর করব বলো, ডাক্তারবাবু সামনের রোববারে ডেট দিয়্যাছে। তোমার ভাবির চোখের অপারিশান করাবে। একটা চোখ তো লষ্ট হলো, এটাতেও ছানি পড়্যাছে। অপারিশান না করলে নাকি ই-চোকও লষ্ট হুঙ্ য্যাবে। বলি, চোখের জন্যই তো দুনিয়া, চোখ না থাকলে দুনিয়াটা তো আঁধার, কালো পর্দার মতো।
— চলো, চলো। দেরি করোনা, কোন মাঠে আছে গরুটা। বলে তাড়া দেয় প্যাকার।
— ওই যি, উতোর মাঠে! ঘাস খেয়ে চড়ে বেড়াচ্ছে। বলেই, হাঁটতে থাকে দুজনেই।

কিছুটা দূরে যেতেই মধ্যি মাঠে সবুজ ঘাসে মুখ লাগিয়ে চড়ে বেড়াতে দেখছে ধলুকে। সে প্রাণ ভরে ঘাস খেয়ে, পেট পুরে তবেই ঘরে ফেরে।
চলতে চলতে পিলে চমকে উঠে হালিমের। একটা সময়ে গরুটার কাছে পৌঁছেও যায় তারা। প্যাকার শিং দুটো ধরে মুখখানি ফাঁক করে দাঁত দেখে।
‘চার দাঁতে। বলিষ্ঠ দেহ। বাজারে কাটবে ভালই’, মনে মনে হিসেব কষে হসরত পাইকার।
নির্বাক চোখে তাকায় ধলু হালিমের মুখের দিকে।

”কই, কোনদিন তো হালিম এভাবে মুখ হাঁ করে দাঁত দেখেনি। এক অচেনা মানুষ কেন এভাবে তাকে আঁকড়ে চেপে ধরেছে। তবে কি সত্যিই এবার তাকে চিরতরের জন্য চলে যেতে হবে।” দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ল ধলুর।
সেসময়ে, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে হালিমও তার দু চোখের জল কাঁধে ঝোলানো পুরনো গামছাখানা দিয়েই মুছতে থাকে বারবার…

অনাবৃষ্টির অবকাশে – নাসির ওয়াদেন

এক

ছেলেটার হাত ধরে বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটছে মইতুল। ছেলে বায়না ধরেছে একটা নতুন জামার; কিন্তু এই ঈদে একটা জামা কিনে দিতে পারেনি। জামা না-কেনার গ্লানি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তাই, সেই উদ্দেশ্যে ছেলেটাকে সাথে নিয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছে। তিনদিন হয়েছে মহরমের চাঁদ উঠেছে। আরবী সন শুরু হল, এ মাসের দশ তারিখ আশুরার দিন। কারবালা ময়দানে সেকি ভীষণ যুদ্ধ। ছেলেবেলায় পাড়ার সাবের চাচার মুখে কিতাব পড়া শুনতো। কত ধরণের কিতাব তার আর মনে নেই। কারবালার কাহিনী শুনতে যেত, জৈগুন্নেসা বিবির কাহিনী, সিরি-ফরহাদের প্রেমকাহিনী, হাতেমতাই, আরব্য রজনী আরো কত্ত সব। এ মাসের দশ তারিখে আরো কত্ত কী ঘটেছিল তার কথা গাঁয়ের মৌলবী সাহেব সাহানাদের বাড়িতে ওয়াজ নসিহত করার সময় বলছিল। চলতে চলতে এসব কথাই মনে আসে মইতুলের। হাঁটতে হাঁটতে চলে আর মনে মনে সে ভাবে, ‘শোকের উচ্ছ্বাস এখন কোথা? শুধুই চারদিকে হৈ-হুল্লোড়। আমোদ প্রমোদ, নাচাগানা আর ছাইপাশ গেলানো।’ এ সব দেখে দেখে, তার আর ভাল লাগে না। তবুও পাড়ার সব বাড়িতে হালুয়া রুটি, গোটাগোটা ছোলা দিয়ে খিচরি ভাত হয়। কারো কারো বাড়িতে পোলাও, বিরিয়ানিও হয়। গিন্নির শখ সরণার চাল,যা এ-মাসে ফিরিতে পেয়েছে, তাই দিয়ে শুকনো খিচুর করবে। ছেলে শুধায়, বাপ,আর কদ্দূর?

— আর একটুখানিক বাপ, তাহলেই বড়ো রাস্তা। ওখানে ইবাস পেয়ি যাব।

— শুনছ বাপ, ও পাড়ার হামিরদ্দির ব্যাটা, মনসুর, জানো ইবারের ঈদে তিন সেট জামা কিন্যাছে, হামি একটোও পায়েনি, ইবার কিন্তু হামি একটো ভাল জামা লিব বুলি দিছি। হাঁটতে হাঁটতে বলে ছেলে।
বাপ ছেলের কথায় ‘হু, হুঁ’ করে আর সামনের দিকে হাঁটে। ছেলের কথা শুনে, বাবার বুকে শ্রাবণের শিলা পাথরের কষ্ট আছড়ে পড়ে। সাত দরগা ঝেটিয়ে ছেলে পেয়েছে, এমন কপাল যি ছেলের শখ আহ্লাদ মেটানোর মতো সামর্থ্যটুকু আল্লা দেয়নি। আকালের সময়ে সংসারের অভাব ঘাড়ে চেপে বসে।

তালদীঘির পাড় দিয়ে চলার ছোট্ট সরান। মাটির রাস্তা। পঞ্চায়েতের দৌলতে কয়েক বছর আগে লালমোরাম পড়েছিল। তারপর আর কিছু নেই। অনেকদিন থেকে শোনা যাচ্ছে পি সি সি হবে। ব্যস, ওই পর্যন্ত। কথা আর এগুয়নি। ছোট কাজ বলে কোন কন্ট্রাকটর নিতে চায়নি। ওদের চোখ বড় বড় রাস্তার দিকে। ওতে মুনাফা বেশি। মুনাফা না হলে কেন বেশি টাকা ঢালবে কনট্রাক্টররা। মনে মনে ভাবে মতু আর ছেলেকে তাড়া দেয়; তাড়াতাড়ি পা চালা বেটা। বাসের টাইম হুয়ে গেল, বলে মাঝেসাঝে সূর্যির দিকে তাকায়। ছেলে এদিক ওদিক দেখছে আর হাঁটছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে হোঁচটও খাচ্ছে।

— কি রে, চোখের মাথা খেয়াছিস, ভাল করি হাঁটতে পারছিস না।
‘ও মাগো,’ বলে ছেলেটি মাটির ওপর বসে পড়ে। পঞ্চাশ টাকায় একজোড়া প্লাস্টিকের জুতো কিনে দিয়েছিল বাবা। মজুরির পয়সা বাঁচিয়ে ছেলের আবদার মেটাতে। অবশ্যি ইস্কুল থেকে একজোড়া ফুল জুতো পেয়েছে ছেলে। ওটা কেবল ইস্কুল যাওয়ার সময় পরে। বাকি সময়ে এই কিনে দেওয়া জুতোটা পরে বেড়ায়।
— কি আবার হলো, বসে গেলি যে বাপ? বলে ছেলের পায়ের দিকে দেখে মতু। ‘আহা রে, রক্ত বেরুচ্ছে । দাঁড়া,দাঁড়া, একটু মুছি দিই।’
পকেট থেকে আধময়লা রুমালটা বের করে। দেখতে পায়, সারা রুমালের গা-গতরে কালো কালো ছোপ, ঠিক যেন ন্যাবা রোগে পেয়েছে। যখন মতু বিড়ি খায়, তখন বিড়ির পেছনটা রুমালে ভরে বিড়ি টানে। মতু বলে, ও তে নাকি বিড়ির বিষ আটকে যায়।
— হামি আর হাঁটতে পারছি না বাপ! পা ব্যথা কোরছে। জুতার ফিতাও ছিঁড়ে গেলছে। ইবার কি পরব বাপ?
মতু বিভ্রাটে পড়ে। ছেলের উদ্দেশ্যে বলে — দেখেশুনে চলতি পারো না। এদিক ওদিক তাকায় হাঁটলে তো ওমনি হোবে, চ, চ বাপধুন, আর একটু কষ্ট করি চ, তাহুলেই বড় রাস্তায় এসি য্যাবো।
ছেলে উঠে দাঁড়ায়। খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটতে থাকে সামনের বড় রাস্তার দিকে।

দুই

শ্রাবণ মাস পেরিয়ে যাচ্ছে,হাতে আর গোটা তিনদিন। আকাশে একফোঁটাও বৃষ্টি নেই। রোদের তেজ দিন দিন বাড়ছে। পৃথিবীর গতিও বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। দিনরাতের হেরফের ঘটবে,তার ফলে ঋতুরও পরিবর্তন আসন্ন। চারিদিকের মাঠঘাট খাঁ খাঁ করছে। মাঝেমধ্যে আকাশে হালকা মেঘ দেখা দিলেও সেরকম বৃষ্টি হচ্ছে না। চাষীদের মাথায় হাত। কীভাবে সংসার চলবে। আকাল, অনাবৃষ্টি হলে, বাৎসরিক ফসল ঘরে না উঠলে ,আমন ধানের চাষ না হলে মানুষেরা খাবে কী। মাঠের ঘাসগুলোও জ্বলে পুড়ে হলুদ হয়ে গেছে। মাঠে মাঠে গোরু-মোষ,ছাগল-ভেড়া চড়ে বেড়াচ্ছে ইতিউতি। সবুজ ঘাসে প্রাণের স্পন্দন নেই, মাঠ ধূসর রঙের। পশুগুলো শুকনো ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেলেও জল পাচ্ছে না কোথাও। মাঠের মাঝে যে দু’একটা ডোবা আছে, তাতেও জল নেই। এবছর তিল কাটার সময়ে, জ্যৈষ্ঠ মাসে বারবার বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টিতে নাজেহাল হতে হয়েছে তাকে, আর এই আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে একবারে বৃষ্টি নেই।

বড় রাস্তায় যাওয়ার ধারে ছোট সরানটার পাশে হায়দার মিঞার শ্যালো। ভক্ ভক্ করে সেই শ্যালোতে জল বের হচ্ছে, ফলে শ্যালোর আশেপাশের কয়েক বিঘে জমিতে ধান রোয়া হয়েছে। হায়দার মিঞার বিঘে দশেক জমিতে ধান রোয়া হলেও বিস্তীর্ণ জমিতে চাষ হয়নি। বীজচারাগুলো জলাভাবে হলুদ হয়ে শুকিয়ে গেছে। এদিকে আবার ইলেকট্রিকেরও ঘাটতি চলছে। তাই শ্যালোতে ঠিকমতো জল উঠছে না। দিনেরাতে তিন-চারবার করে পাওয়ার হাউস থেকে ফেজ পাল্টাচ্ছে। তাই ঠিক মতো শ্যালোও চলছে না।

আকাশের বৃষ্টির অভাবে, বিদ্যুতের ঘাটতির ফলে শ্যালোর জলও কমে গেছে। হায়দার মিঞার কিরসান লতিবকে ডেকে মিঞাজী বলছিল, দ্যাখ, লতু! শ্যালো ঠিক মতুন চলছে না, রাত জেগে জমি কয়টাতে জল দিয়ে দিস।
লতিব বলে – সে কি আর বুলতে হবে মিঞাজী । হামি তো দিনরাত শ্যালোতে পড়ি আছি। এত খাটাখাটনিতে শরীলটো কেলান্তি আর ঘুমে পেয়ে বসছে। তবু পেরাণপণ চেষ্ঠা করি যেছি, হামি ঠিক সামলাই লিবো।
— হ্যাঁ, তাই করিস। বলে বুলেট বাইকটা স্টার্ট দিয়ে ভটভট শব্দ করে চলে যায় বাজারে।

মিঞাজীর হার্ডওয়ারের দোকান আছে বাজারে। সকালের নাস্তা পানি সেরে দোকানে যান। দুপুরে এসে স্নান খাওয়া সেরে ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নেয়। তারপর বিকেলের দিকে আবার দোকান খোলেন। মাঠঘাট কম বের হন, এই আকালের সময়ে মাঠ যেতে ভাল লাগে না কারো।
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছেলে বাবাকে জিগ্যেস করে :– আর কদ্দূর বাপ? আর চলতে পারছি না।
মইতুল বলে, এই তো, চলি এসি গেলছি ব্যাটা। তালদিঘিটা পার হলেই ওপারে বড়রাস্তা।
পিচ রাস্তা চলে গেছে সোজা ঝাড়খণ্ডের দিকে। দিনে রাতে হাতে গোনা কয়েকটা বাস যায় মাত্র এই রুটে। অবশ্যি বাস না পেলেও টোটো, অটোরিক্সা, ভ্যান গাড়ি পাওয়া যাবে। পথ যেতে যেতে আবার ছেলে বাবাকে প্রশ্ন করে, বাস না পেলে কীসে য্যাবা বাপ ?
ছেলের কথার জবাব দেয় বাবা : টোটো,অটো য্যাহি পাবো তাতেই উঠি পড়ব ব্যাটা।

রোদের তেজ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে দিনদিন। মাথার উপর সূর্যি, ভয়ানক গরম। ঘাড়ের উপর রাখা গামছাটা মাথায় জড়িয়ে নেয়। মুখের ঘাম মোছে, ছেলের মুখ মুছে দেয়। — আর যি চলতে পারছি না বাপ। এ্যসো, এই দিঘিটোর ছাঙ্হায় একটুখানিক জিরাং লিই।
বাবা বলে -‘ তুই যখুন বলছিস, তখুন তাহি কর। একটু জিরাং লে। পায়ের ব্যথাটো কমাছে?
— একটুকু কমাছে মুনে লাগছে। খানিকখুন পর আবার ব্যথা করছে, চিনচন করছে, বলে ছেলে।
তারপর শুধায়, বাপ! বুলছিলাম কী কার দোকানে জামা লিবা?
হামি কিন্তু কম দামের জামা লিব না, এখুনি বুলি দিছি। দখিন পাড়ার ধানাই-এর মতুন কিন্তু জামা লিব। হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলে ছেলে।

‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। তাহি লিস’ — বলে ছেলেকে সান্ত্বনা দেয় বাবা।

তিন

শাদা পাজামা আর শাদা পাঞ্জাবী পরে, মাথায় টুপি লাগিয়ে একদল মানুষ হেঁটে যাচ্ছে কারবালার মাঠের উত্তরদিকে। ওই মাঠে এলাকার সব মুসল্লিগণ জমায়েত হবে, দুই রাকাত এস্তেস্কার নামাজ পড়বে,আল্লার কাছে হাত তুলে বৃষ্টি চাইবে। কয়েকদিন ধরে এলাকার মহল্লায় মহল্লায় সকল মসজিদের ইমাম সাহেব মাইকে ঘোষণা করেছে সকল মানুষকে সামিল হতে। বেলা ১২টার সময়ে নামাজ শুরু হবে। সেদিন জুম্মাবারে ইমাম সাহেব খুতবা পড়ার আগে ওয়াজ নসিহত করছিল, এ বছর এখনো বৃষ্টি নামছে না। আল্লার গজব নেমে এসেছে, পাপে দুনিয়া ভরে গেছে। তাই আল্লার নির্দেশে বৃষ্টি হচ্ছে না। চাষাবাদ শুরু করা যাচ্ছে না। এস্তেসখার নামাজ পড়তে হবে। তাই এখানে আজ নামাজ পড়া আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার বিশ-পঁচিশখানা গাঁয়ের মানুষকে ডাক দেওয়া হয়েছে। কোরআনে আছে, মানুষ অত্যাচারী হলে, আল্লার নির্দেশ অমান্য করলে আল্লার দয়া দান থেমে যায়। মানুষকে সতর্ক করতেই আল্লা নাকি অনাবৃষ্টি সৃষ্টি করে।

সেদিন আসরের নামাজ শেষ করে মোসাহাবা করার সময়ে ইমামসাহেব বলছিল যে, আল্লা দয়াবান, মেহেরবানকারী। মানুষ শত অপরাধ করে তা স্বীকার করলে, কান্নাকাটি করলে সব গুনাহ মাফ করে দেয়। তাই এই বিশেষ ধরণের নামাজ পড়া খুব দরকার। আল্লার হুকুমে ‘কুন’ শব্দ থেকে সব সৃষ্টি হতে পারলে, আল্লার ইচ্ছায় বৃষ্টি হয়ে মাঠঘাট ভাসাই দিতে পারবে।

ইমামসাহেরের কথা শুনে, আলোচনা করে কারবালার মাঠে নামাজ পড়ার ডাক দেয়া হয়েছে। একখানা মাইক টোটোতে বেঁধে গাঁয়ে গাঁয়ে এলান করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকেও আসতে বলা হয়েছে, কে-জানে কার কথা আল্লা কবুল করেন। মতু এক সাদাসিধে মানুষ। দিন খাটে, দিন খায় । অতসব সাতে-পাঁচে থাকে না। খাটাখাটনি করার ফলে সব দিন জুম্মার নামাজও পড়তে যেতে পারে না।

দলে দলে লোকে নামাজ পড়তে কারবালার মাঠের দিকে যাচ্ছে। মৌলবী সাহেব সেদিন মইতুলকে বলেছিল, কি গো, মতু ভাই! তিন কাল য্যাঙ্ এক কালে ঠেকেছ, ইবার নামাজ রোজার দিকে একটু পা বাড়াও। মরার আগে পরকালের জন্য কিছু নেকী সঞ্চয় করে নাও। আখেরাতে কী জবাব দেবে। হাবিয়া দোজখে যে অনন্তকাল পুড়ে মরতে হবে।
মতু মাথা নত করে বলে, তা তো, ঠিক, ইবার থেকি চেষ্টা করব।

আজরাইল ফেরেস্তা কীভাবে আসবে, জান কবজ করে নিয়ে যাবে। নানা কথা শুনাতে থাকে মোলভী সাহেব। কোনরকম ভাবে বেরিয়ে আসে মতু মৌলভীর খপ্পর থেকে। ছেলেবেলার কথা মনে আসে মতুর। ছেলের বয়সী হবে; কিংবা দু’তিন বছরের বেশি হতে পারে। সেসময় এরকমই খরা হয়েছিল,সারা আষাঢ়-শ্রাবণ মাস জুড়ে মেঘের কোন লক্ষণ ছিল না, বৃষ্টি হয়নি। অল্পস্বল্প বৃষ্টিতে ধান রোয়া হলেও বৃষ্টির অভাবে ধানের গাছ শুকিয়ে গেছিল। মতুরা মাঠ থেকে ধানগাছ কেটে এনে ছাগল গোরুকে খাইয়েছিল। ধানের অভাবে চালের চাহিদা গেছিল বেড়ে। কালোবাজারিতে বাজার ছেয়ে গেছিল। গরীব মানুষেরা একটু ফ্যানের জন্য গেরস্তের বাড়িতে হত্যে হয়ে বসে থাকত। সেবারে গুলির আঘাতে কয়েকজনের প্রাণও চলে যায়। বাড়ির পাশে সিমরানদের বাড়িতে একটা ফিলিপ্স রেডিও ছিল। তাতে দুনিয়ার খবর পাওয়া যেত, চীন-ভারত যুদ্ধ,ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ। আরো কত দেশের যুদ্ধের কথা শোনা যেত।

মতুর বাবারা ছিল খুব গরীব। মতুর এক চাচা তার ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে পারবে না বলে বাড়ি থেকে একদিন হাপ্যিস হয়ে গেছিল আর কোনদিন বাড়ি ফিরে আসেনি। এখন মতুর চাচাতো ভাইয়েরা সবাই ব্যবসাপাতি করে দাঁড়িয়ে গেছে। ট্রাক্টর কিনে রোজগারপাতি করছে। এসব দেখে একদিন মতুর ছেলেটা, মতুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাপ! হামাদের একটো ট্যাকটোর কিনো না ক্যানে?’
মতু মনে মনে ভাবে ট্যাক্টার কেনা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা। ই কথা কি তার সাজে। প্রকাশ্যে বলে — হ হ ব্যাটা! তুই বড় হ, নেকাপড়া শিখি চাকরি করবি, তখুন হামরা একটো ট্রাকটর্ কিনব।

— সত্যি বলছো বাপ! আহা কী মজা হবে।
মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ছেলের। ছেলের মুখের লাল আভা আর উচ্ছ্বাস দেখে মতুর বুক ভরে ওঠে।
বড় রাস্তার উপর আসার আগেই হুস করে একবাসখানা বেরিয়ে গেল।
বাবা ছেলেকে বলে — যা, বাসটো চলি গ্যালো, ধরতি পারলুম না। যদি একটু পা চালাং যেতিস, তাহলে বাসখান ধরতি পারতুম। এখুন দেখি কী পায়।
ছেলের কচি মুখখানা শুকিয়ে আমচুর শুখা হয়ে গেছে। ছেলে মনে মনে ভাবে, তাহলে কি তার জামাপ্যান্ট কিনা হোবে না!

বাড়ি হতে বের হওয়ার সময়ে মীনু চাচি মতুকে পেছন থেকে ডেকে বলেছিল –ও মতু! কত্তি যাচ্ছিস বাপ! শহর যেছিস নাকি? শহর গেলি হামার লেগি দু’টাকার মিঠা পান আর খানিক সাদা আনিস তো বাছা।
মতু হাঁটতে হাঁটতে বলেছিল -‘ হ গো চাচি, শহর যেছি ছেলার লেগি লতুন জামা কিনতে, তুমার লেগি পান আনব। তুমি ভেবো না।

বাসস্ট্যান্ডের বিশ্রামাগারে গিয়ে বসে দুজনে। এই ভর দুপুরে যদি কোন যানবাহন পাওয়া যায়, অটো, টোটো যা পাবে তাতেই উঠে পড়বে বাপ-ব্যাটা। দৌড়াতে দৌড়াতে পশ্চিমপাড়ার সুজনকে ছুটে আসতে দেখে মতু। সুজন বাসস্ট্যান্ডের দিক থেকে ছুটে আসছে। সুজনকে দৌড়াতে দেখে মতু জিগ্যেস করে, হ রে, সুজন! তুই ও-রকুমভাবে ছুটছিস ক্যানে?
বড় বড় শ্বাস ফেলে সুজন বলে, আর বুলো না ভ্যাই, বাজারে খুব ঝামেলা লেগ্যাছে। দুই পার্টির লোকেদের মধ্যে মারপিট চলছে। অনেক পুলিশ, মিলিটারি পোজ এস্যাছে। বাজারে ১৪৪ জারি হলছে। পুলিশ সামনে যাকেই প্যাছে, ধরি ভ্যানে তুলি লিছে। হামি কায়দা করে বাঁকা গলি দিঙে কোনরকুমভাবে পালাঙ্ এ্যালছি। আর একটু হলেই হামি ধরা পড়ি যেতুম।

— তাহুলে কি বাজারে যাওয়া হোবে না? শুধায় মতু।
— ক্ষেপ্যাছো! জান নিয়ে পালাও এখান থেকি। পুলিশের গাড়ি এদিক ওদিক ঘুরছে। সামুনে যাকে প্যাছে, তাকেই কেস দিছে। বাঁচবা তো বাড়ি ফিরি চলো।

ছেলেটা তার বাবার মুখের দিকে একবার তাকাল। বাবাকে শুধায়, ‘হামার লতুন জামা কি কিনা হোবে না, বাপ?’
কিছুটা দূরে একখানা জীপগাড়িকে এদিকেই আসতে দেখা যাচ্ছে। সুজন দৌড় দিল গাঁয়ের দিকে। মতুও ছেলের বাম হাতটা ধরে টানতে টানতে ছোট সরানের দিকে দৌড় লাগালো।

তৃতীয় পক্ষ – নাসির ওয়াদেন

(এক)

কথায় বলে মন্দ কথা বাতাসে বয়। বাতাসের ঘন স্রোতে কর্পূরের বিকট গন্ধ মন আর শরীরকে কটু করে তোলে। পচা নর্দমার জলে হাজার হাজার ব্যাকটেরিয়া কিলবিল করে। ওদের মুখের রাক্ষুসে দাঁত চিবিয়ে খায় শিশু কিশোরের ডগডগে লালচে হৃৎপিণ্ডটা, ঝাঁঝড়া করে দেয় বুকের কাঠিগুলো আর ফুসফুসের হাপড় কাটা নলটাকে অচল করে তোলে।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আছলম চাচা। প্রতিদিন ভোরবেলায় ফজরের নামাজের আগে একবার মাঠ থেকে ঘুরে আসে। কি শীত, কি বর্ষা, কোন খামতি নেই তাতে। আপেলে রঙের সূর্যটা যখন পুব আকাশের বুকে উঁকি দেয়,তার কিছুটা আগেই চাচা মাঠ থেকে ফিরে এসে ফজরের নামাজ শেষ করে। জায়নামাজে বসে মনে মনে তসবি তেলায়ত ও দু’আ পাঠ করে এবং দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানায়। বলে, “হে পরমেশ্বর! দিন দুনিয়ার মালিক। তুমি সর্বশক্তির অধিকারী। তুমি তোমার নফর বান্দাদের সকল গুনাহ মাফ করে দাও। যাদের বুকের ভেতরে, মনের সাগরে, হৃদয়-বনে হিংসার আগুন ঝরছে, তাঁদেরও উপর জান্নাতী ঝরনার স্রোত বইয়ে দিয়ে ধুয়েমুছে পরিস্কার করে দাও।”

চাচা মসজিদ থেকে বেরিয়ে সদর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে তার বাড়ির দিকে। এমন সময় চাচার থেকে বছর দশেক ছোট মুছলিম খাঁ ওই রাস্তা দিয়েই মাঠের দিকে যাচ্ছিল। প্রতিদিন সে ওই রাস্তা দিয়ে প্রাতঃকৃত্য করতে খোলা মাঠের দিকে যায়। আকাশের দিয়ে তাকিয়ে দেখে সূর্য উঠতে আর কত দেরি।
— চাচা পিরান হাজীর কীর্তির কথা শুনেছ? বলেই দাঁড়িয়ে পড়ে মুছলিম।
— কি আবার হলো মছু, হঠাৎ এ-কথা তোমার মুখে? বিস্ময় প্রকাশ করে বলল আছলাম।
— তোবা, তোবা, বলতেই লজ্জা। বলতে লজ্জা লাগে গো চাচা। হাজী সাহেব গত রেতে আজমীর সেখের বিটি কুলছুমকে শাদী করে বাড়িতে তুলেছে।
— কি বলছো মজু, আবার বিয়ে? তাও, ওই বাপ-মা মরা ছুঁড়িটাকে। শুনেছিলাম ওই মেয়েটা ই-বছর কেলাস টেনে পরীক্ষা দিয়েছে?
— হ্যাঁগো চাচা, তুমি ঠিকই শুনেছ। এবার তো মেট্রিক পরীক্ষা দিলো। এদিকে ওর নানী লায়েকজান বিবি চায় মেয়েটির একটা গতি হোক।তার ইচ্ছেতেই বিয়েটা–
— তা, এত অল্পবয়সী মেয়েটা সত্তরের বুড়োটাকে বিয়ে করতে রাজি হলো?
— তাই তো! অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মজু।
— শুনেছি মেয়েটা নাকি অন্য একটা ছেলেকে ভালোবাসে। ওদের ভাব ভালোবাসা চলছে। বিয়েও করবে বলে ঠিক করে ফেলেছে ওরা।
— কিন্তু শুনেছি ছোঁড়াটা ভাল লেখাপড়া জানে না।
কেলাস টেরেন পাশই করতে পারেনি । বাবার পারিবারিক অবস্থাও ভালো না।
— তিন বছর আগেই ম্যাট্রিক ফেল করে ছোঁড়াট চেন্নাইয়ে কাজ করতে যায়। সেখানে আর পাঁচজন লোকের সাথে রাজমিস্ত্রির কাজ করে।

আছলাম চাচা একটু হতাশ হয়ে পড়ল। বাপ-মা মরা মেয়েটার জন্য একটু করুণা হয় তার। এই বিক্রমপুরে অনেক ধরণের লোকের বাস। গাঁয়ের অধিকাংশ মানুষই দিনমজুর,গায়ে খেটে সংসার চালায়। হত-দরিদ্র পরিবারের সংখ্যাই বেশি, তবে কয়েকঘর ধনী পরিবারের বাস আছে। বেশিরভাগ জমির মালিক তাঁরাই। গরীবেরা তাঁদের চাষের জমিতেই মজুর খাটে আর কিছু লোক দেশে-বিদেশে মজুর খাটতে যায়।

পিরান হাজী ধনী ব্যক্তি। তিনি একবার হজ ও তিনবার ওমরাহ করে এসেছেন। রঙ-করা কাঁচা পাকা দাঁড়িতে বেশ মানানসই লাগে। গাঁয়ের আচার বিচার তাঁকে ছাড়া হয় না। পরখ করা হয়নি, তবে সকলের মনের বিশ্বাস, হাজী সাহেব হজের নামে অনেক সোনাদানা এনেছে। তাঁর দু’দুখানা ট্রাক্টর আছে। প্রথম পত্নী সাজিদা বিবির ইন্তেকাল হলে, তিনি দ্বিতীয়বার শাহজাদপুরের গুলজার বিশ্বাসের মেয়ে সমিরুন বিবিকে বিয়ে করেন। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে তাঁদের এই বিয়েটা হয়। হাজীর প্রথম পক্ষের একটিমাত্র মেয়ে। তার বিয়েও হয়ে গেছে। স্বামীটা কলকাতায় চাকরি করে। সেই সুবাদে তারা ছেলেপুলে নিয়ে কলকাতায় থাকে। দ্বিতীয় পক্ষের বউ সমিরুনের কোন বাচ্চাকাচ্চা নেই।‌ সন্তানহীন পিরান হাজীর বুকখানা খাঁ খাঁ করে। কত ডাক্তার, বদ্দি, কবিরাজ করেও সন্তান হলনি। হওয়ার লক্ষণও নেই, তাই কিছুদিন থেকেই তাঁর মনটা খচখচ করছে।

Mokkhada Pishi

(দুই)

পশ্চিম থেকে একজন পীর সাহেব হর বছর এই সময়ে সফরে বের হয়ে এই বিক্রমপুরে এসে উপস্থিত হন। এখানেও তাঁর অনেকজন মুরিদ আছে। গত শীতেও তিনি এসে উঠেছিলেন হাজী সাহেবের বাড়িতে। এখানে এলেই তিনি তিনদিন অবস্থান করেন, নিয়ম বলুন, রীতি বলুন, তিনি না একদিন বেশি থাকেন, না কম, গোনা তিনদিন। গাঁয়ের লোকেরা তাঁকে বুজুর্গ বলে মান্য করে, শ্রদ্ধা করে। তিনি যেদিনে বিক্রমপুর ছেড়ে চলে যান, চলে যাওয়ার দিনে তাঁকে বিক্রমপুরের গরিব লোকেরা, অসহায় মানুষগুলো নিজের নিজের বাড়ি থেকে সাধ্যমতো চাল,ডাল, আনাজ, সবজি যা থাকে তাই সেলামি দিয়ে পুণ্য অর্জন করতে চায়। আকাঙ্ক্ষার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পীর সাহেব সেই উপহারগুলোকে একত্রিত করে তাঁর সাদারঙের মোটরগাড়িতে তুলে নিয়ে অন্য গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান।

সেদিন এশার নামাজ শেষ করে সকল শিষ্যকে নিয়ে পীর সাহেব ছহীফা করতে করতে সকলকে জানান যে, তাঁর অনেক বয়স হয়ে গেছে, তিনি হয়ত আর আসতে পারবেন না। সবই আল্লাহ ইচ্ছে, তাই সকলের কাছে নতুন বার্তা দিয়ে চলে যেতে চান ।
মুরিদ ছরিফুদ্দি বলে – হুজুর, ই-কথা বুলবেন না। আল্লাহ আপনার হায়াত দারাজ করুন।
পীর সাহেব বলেন, না হে, ছরিফ! আল্লাহ হয়তো আর চাহেন না আমি আসি। শরীরও ভেঙে গেছে। নানান অসুখও বাসা বেঁধেছে এই শরীরে। হয়তো এটাই আমার তোমাদের কাছে শেষ দিদার । দর্শন বলতে পারো। আমার খেলাফতি এবার আমার পুত্রকে দিতে চাই। সেই তোমাদের নতুন হুজুর হয়ে তোমাদের কাছে আসবে ইসলামের শান্তি পতাকা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে। তোমরা তাকে উপযুক্ত মর্যাদা দিও।
উপস্থিত সমবেত মুরিদগণ একসঙ্গে বলে উঠলেন, হুজুর ! আপনি কিছুই ভাববেন না। আমরা আপনার মতই আপনার সন্তানকে,নতুন হুজুরকে যথাযথ সম্মান জানাবো।
— আমি জানতাম। আমার বিশ্বাস, তোমরা আমার কথা শুনবে, মান্যতা দেবে । আল্লাহ বলেছেন, বিশ্বাস হচ্ছে আমানতের মতো মনের বস্তু। যাদের মনে বিশ্বাস নেই, তারা কেউই জান্নাতে যেতে পারে না। কে একজন কবি বলেছিলেন যে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমরা আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেশতাকে চাক্ষুষ করতে পারিনি ঠিকই; কিন্তু মনেপ্রাণে তাদের বিশ্বাস করি। এটা তো আমাদের একধরনের আনুগত্য প্রদর্শন।

সালাম, কদমবুসি করতে করতে একে একে সকলেই নিজের নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াতে লাগল। হাজী সাহেব এক মনে চুপ করে বসে আছেন মাটির উপর বিছানো শতরঞ্চির উপর। এতক্ষণ পীর সাহেবের আশেপাশে যারা ছিলেন তাঁরাও চলে গেলেন। সেই নির্জন কক্ষে দুজন মানুষ মুখোমুখি নিভৃতে, নিস্তব্ধ নিরালায় বসে আছেন। মোমবাতির মৃদু আলোটা বাতাসের সাথ খেলাখেলি করছে। আগরবাতি ও বিদেশী পারফিউমের গন্ধে ঘরখানি মো মো করছে। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা এসে ঘরখানাকে নীরব ও নিরুচ্চার করে রেখেছে।
পীর সাহেব একমনে চোখ বন্ধ করে আয়েত পাঠ করছেন। চারিদিকের নিস্তব্ধতা কিছুক্ষণ আগের কোলাহলকে চিবিয়ে খেলে ফেলল, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। দু’তিনটে জোনাকি পোকা বাইরের অন্ধকার মাঠ থেকে উড়ে এসে ঘরের মধ্যে পাইকারি শুরু করেছে। এক অসীম স্বর্গীয় সুধা মগ্ন-শূন্যতায় ঘরখানিকে স্বর্গীয় আনন্দে ভরে তুলেছে।

হাজী সাহেব উঠে বসলেন। তারপর হঠাৎ পীর সাহেবের পা দু’খানা চেপে ধরলেন। পীর সাহেব আতঙ্কিত হয়ে চোখ খুলে দেখে বলেন,
কি, কি করছেন হাজী সাহেব ? এরকম কেন করছেন ? কিছু বলতে চাইছেন ?
— কিছু বলতে চাই, হুজুর।। ক’দিন থেকেই মনটা আমার খচখচ করছে। বলেই কাঁদতে লাগলেন হাজী সাহেব।
হাতের উপর তাঁর হাত দুটো চেপে ধরলেন পীর সাহেব। তারপর তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমার মনের কথা বুঝতে পারি গো।
হাজী সাহেব ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, শুধালেন, কি বুঝতে পেরেছেন হুজুর?

— মনের কথা গো, তোমার মনের কথা। তোমার মনে এক অজানা প্রশ্ন বিরাজ করছে।
— ঠিকই বলেছেন হুজুর ।
— তোমার মনে খুব কষ্ট তাই না? দু-দুটো শাদী করলে। এরমধ্যে একটা তো চলেই গেল আল্লাহর রাস্তায়। একটা পুত্র সন্তান হল’না ।
— হুজুর! হুজুর!
— তোমার পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষার কথা আমি জানি। প্রায়ই আমি স্বপ্নে দেখি। বুঝি তোমার অন্তরের কথা। আমিও তো চলে যাচ্ছি, হয়তো এটাই আল্লার ইচ্ছে। আমি আর তোমাদের সাথে দিদার করতে পারব না। আমারও মনে খুব দুঃখ থেকে গেল।
— সেই দুঃখে তো আমার রাত্রে ঘুম আসেনা হুজুর। আমি বড় কষ্টে আছি।
— সব বুঝি , সব বুঝি। তবে একটা উপায় আছে?
— কি উপায় হুজুর ? দ্রুততার সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন পিরান হাজী।
— দেখো, আমাদের ধর্মে একজন পুরুষ চারবার বিয়ে করতে পারে। চারটে বিয়ে করার অনুমতি আছে। জায়েজ আছে, তুমি বরং আবার একটা বিয়ে করো।
— হুজুর, হুজুর ! এই বয়সে আবার বিয়ে?
— তাতে কি আছে? জানো না, ৭০ বছর বয়সেও সন্তানের পিতার হওয়া যায়।
তবে একটা কাজ করতে পারো।
— কি? কি কাজ করতে হবে, হুজুর? আপনি যা বলবেন, আমি তাই করবো।
— তোমাকে কিছু খরচাপাতি করতে হবে।
— আমি রাজি আছি হুজুর, বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হাজী সাহেব।
পীর সাহেব বলেন, তুমি বরং এবার একটা খুব অল্পবয়সী কিশোরীকে বিয়ে কর,যদি আল্লাহ একবার তোমার দিকে মুখ তোলেন।
একটা দমকা বাতাস বয়ে গেল ঘরের মধ্যে দিয়ে। তারই আঘাতে মোমবাতিটার শিখাটি দপ্ করে নিভে গেল। অন্ধকার এসে পেঁচিয়ে ধরল ঘরখানাকে। কেউ কাউকে তখন দেখতে পাচ্ছে না।

Natun Bangla Galpo 2023

(তিন)

নানীকে কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে বশ করেছেন হাজী সাহেব। নানী তার বাপমা মরা নাতনির জন্য বেশ চিন্তিত ছিল। সব মা-বাবাদের ইচ্ছে তার মেয়েকে একটা ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিয়ে শান্তিতে যেন মরতে পারে। সেই চিন্তায় বুড়ির চোখে ঘুম আসে না। হঠাৎ হাজী সাহেবের এমন প্রস্তাব শুনে তার মনের ভেতরে একটা আনন্দের বাতাস খেলে গেল। মনে মনে ভাবল, এত ভালো উপযুক্ত বর। বুড়ো হলো তো কি হয়েছে, কুলছুম বউ হলে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হবে। তাতে যদি কোনো রকমে একটা পুত্র সন্তান হয়ে যায়, তাহলেই কেল্লাফতে। গোটা জমিদারি তার হাতে চলে আসবে । একেবারে রাজরানী হয়ে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং তুলে হুকুম জারি করবে আমার কুলছুম।

কুসুমের নানী সেদিন রাতে নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে নাতনিকে অনেক বোঝাল। তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে বুড়ি এসব করছে, সেটাও বুঝিয়ে বলল। কুলছুম কিছুতেই ওই বুড়ো হাজীকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। মেট্রিক পাশ করে আরো পড়াশোনা করতে চায়। সে চায় গরিব মেয়েরাও লেখাপড়া শিখে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাছাড়া, তার তো বিয়ের বয়স হতে আরো কিছুদিন বাকি। লায়েকজানকে বলে, নানি জান! আর দু’বছর পড়ি, তারপর না হয় বিয়ের কথা ভেবো। এখন কন্যাশ্রী থেকে টাকা পাচ্ছি, বিয়ে হয়ে গেলে লেখাপড়া হবে না, আবার টাকাও পাওয়া যাবে না।

নাতনিকে অনেক বুঝায় নানী। বলে, — কুসুম মা। এমন বর পাবেনে, বুড়োর ছেলেপিলে নেই। যদি আল্লাহ তোর কোলে একটা ছেলে দেয়। তো তুই রাজারানী হয়ে যাবি। অনেক কথাতেও কুলছুম কিছুতেই বিয়ে করতে রাজি হয়না, তার মন দখল করে আছে যে, সে এখন অনেক দূরে চেন্নাইয়ে কাজে ব্যস্ত। চেন্নাই যাওবার সময় কুসুমকে বলেছিল, কুসুম! আমি ফিরে এসে তোকে কলেজে ভর্তি করব।

নানী নাতনিতে কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হয়। সারারাত তাদের ঘুম আসে না চোখে। সারারাত ঘুমাতে পারে না কুলছুম। তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে। এমন সময় ম’জিদের মৌলবি সাহেব ও উকিল সাক্ষীকে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢোকেন পিরান মিঁয়া।

নাসির ওয়াদেন | Nasir Waden

2023 New Bengali Article | বাংলায় মুসলিম বিজয় ও বাংলা সাহিত্য

Natun Bangla Galpo 2023 | গল্পগুচ্ছ | কুহেলী দাশগুপ্ত

Anabasarakalina besha of Jagannath | অনবসরকালীন বেশ | অভিজিৎ পাল

Shree Jagannath Bijay Kabya | ‘শ্রীজগন্নাথবিজয়’ কাব্য প্রসঙ্গে | 2023

Short bengali story | Bengali story pdf | pratilipi bengali story | Short Stories for Children | English Stories for Kids | Moral Stories for Kids | story in english | story hindi | story book | story for kids | short story | story for girls | short story in english | short story for kids | bangla golpo pdf | Bangla golpo pdf | Bangla golpo story | bangla romantic golpo | choto golpo bangla | bengali story | Sunday suspense golpo | sunday suspense mp3 download | suspense story in hindi | suspense story in english 200 words | Suspense story in english | suspense story in english 300 words | Suspense story examples | suspense story in english 100 words | suspense story writing | very short suspense stories for students | Bangla Golpo Reading | Top Bangla Golpo Online Reading | New Read Online Bengali Story | Top Best Story Blogs | Best Story Blogs in pdf | Sabuj Basinda | High Challenger | Famous Bangla Golpo Online Reading | Shabdodweep Read Online Bengali Story | Shabdodweep Writer | Bangla Golpo Online Reading pdf | Famous Story – Bangla Golpo Reading | Pdf Bangla Golpo Reading | Bangla Golpo Reading App | Full Bangla Golpo Reading Reading | Bangla Golpo Online Reading Blogs | Best Story Blogs in Bengali | Live Bengali Story in English | Bangla Golpo Online Reading Ebook | Full Bangla Galpo online | Bangla Golpo Reading 2024 | New Bangla Golpo Reading – Episode | Golpo Dot Com Series | Bangla Golpo Reading Video | Story – Bangla Golpo Reading | New Bengali Web Story Audio | New Bengali Web Story Video | Bangla Golpo Reading Netflix | Audio Story – Bangla Golpo Reading | Video Story – Bangla Golpo Reading | Shabdodweep Competition | Story Writing Competition | Bengali Writer | Bengali Writer 2024 | Trending Bangla Golpo Online Reading | Recent Bangla Golpo Reading | Top Bangla Golpo Reading | Bangla Golpo Reading Web Story | Best Read Online Bengali Story | Read Online Bengali Story 2024 | Shabdodweep Bangla Golpo Online Reading | New Bangla Golpo Reading | Bengali Famous Story in pdf | Modern Online Bangla Galpo Download | Bangla Golpo Online Reading mp3 | Horror Adult Story | Read Online Bengali Story Collection | Modern Online Bangla Galpo mp4 | Modern Online Bangla Galpo Library | New Bengali Web Story Download | Full Live Bengali Story | Bengali Famous Story 2023 | Shabdodweep Bengali Famous Story | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Live Bangla Golpo Reading – audio | Bengali Famous Story – video | Bengali Famous Story mp3 | Full Bengali Famous Story | Bengali Literature | Shabdodweep Magazine | Shabdodweep Web Magazine | Live Bengali Story Writer | Shabdodweep Writer | Story Collection – Modern Bangla Golpo Reading

Leave a Comment

Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.
Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.