Best Andaman Travel Story | Full Andaman Journey

Sharing Is Caring:

আন্দামান ভ্রমণ – অসীম কুমার মান্না

বঙ্গোপসাগরের মাঝে ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জ যেন একটি স্বর্গরাজ্য। এই দ্বীপপুঞ্জের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, নীল মখমলে মোড়া সমুদ্র, প্রবালের উদ্যান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সোনালী বেলাভূমি, সবুজ বনরাশি, দূষণ মুক্ত পরিবেশ ভ্রমণপ্রেমী মানুষজনকে আকর্ষণ করে। সেই অমোঘ টানে আকর্ষিত হয়ে গত ৩০শে মার্চ, ২০২৩ আমরা সপরিবারে পাড়ি দিলাম স্বপ্নের ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে। আন্দামানে যাওয়ার আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল; আমাদের পরিবারের কেউ এর আগে বিমানে ওঠেনি। তাই বিমানে চড়ে স্বর্গরাজ্য দর্শন করার ইচ্ছে থেকেই ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জকে নির্বাচন করা।

প্রথম দিন

৩০শে মার্চ ভোর তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে জলখাবার খেয়ে ইন-ড্রাইভার অ্যাপ থেকে ক্যাব বুক করে নিলাম। ভোর ৫টায় গড়িয়ার বাড়ি থেকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ভোরের আলোয় পাটুলির অপরূপ শোভা দেখতে পেলাম। ই. এম. বাইপাস ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল বিমান বন্দরের দিকে। সকালে যানবাহন কম থাকায় আধ ঘন্টার মধ্যে বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে গেটে আই কার্ড দেখিয়ে বিমান বন্দরের ভেতর প্রবেশ করলাম। ঢোকার মুখে বোর্ডে দেখে নিলাম আমাদের বিমান ‘গো ফার্স্ট’ এর জন্য কাউন্টার নং হল ‘A’। নির্ধারিত কাউন্টারে গিয়ে লাগেজ জমা দিলাম। লাগেজ কালেকশন স্টিকার ও বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ করলাম। এরপর সিকিউরিটি চেক এর জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। কেবিন ব্যাগ এর সব জিনিসপত্র, বেল্ট, হাতঘড়ি, পার্স একটি ট্রে তে সাজিয়ে রোলিং বেল্টে রেখে দিলাম। চেক হয়ে যাওয়ার পর সব জিনিসপত্র ব্যাগের মধ্যে গুছিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ওখান থেকে অন্যান্য বিমানকে টেক অফ্‌ করতে দেখলাম। ২১ নং গেট থেকে আমাদের বিমান ছাড়বে, সেজন্য আমরা গেটের সামনে লাইনে দাঁড়ালাম। ওয়াক ওয়ে দিয়ে হেঁটে বিমানের ভেতর প্রবেশ করলাম।

Inside Aeroplane

আমাদের প্রথম বিমান যাত্রা তাই সব কিছু আমাদের কাছে রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছিল। বিমান এর ভেতরের দৃশ্য দেখে অবাক হলাম। বাঁদিকে তিনটি আর ডানদিকে তিনটি মোট ছটি করে সিট। এরকম ৩২ টি সারি আছে। আমরা আমাদের নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসলাম। জিনিসপত্র মাথার উপর কেবিনে রেখে দিলাম। কেবিন ক্রু উপরের ঢাকনা বন্ধ করে দিল এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিতে বলল। আমরা সিট বেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরে সোঁ সোঁ আওয়াজ করে বিমানের যাত্রা শুরু হল। আমরা জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ধীরে ধীরে  কলকাতার মাটি ছেড়ে উপরে আকাশের দিকে যাত্রা শুরু হল। নীচে দমদম ও তার আশপাশের বাড়ি, রাস্তা ছোট হতে হতে বিলীন হয়ে গেল। আমরা সাদা পেঁজা তুলো দিয়ে ঘেরা মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করলাম। বিমান যখন প্রথম মাটি থেকে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছিল তখন একটা ঝাঁকুনি অনুভব করেছিলাম। মেঘের দেশে পৌঁছানোর পর মনে হচ্ছিল বিমান যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই সিট বেল্ট খুলে নিল। আমার স্ত্রী ‘মন্দিরা’, মেয়ে ‘অন্তরা’ এবং ছেলে ‘আকাশ’ অবাক চোখে চারিদিক দেখতে লাগল। ওরা  উত্তেজিত, ওদের চোখে মুখে খুশির ছাপ। কখন যে দু-ঘন্টা কেটে গেছে কেউ বুঝতে পারিনি। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলল, “নীচে পোর্ট ব্লেয়ার দেখা যাচ্ছে।” আমরা সবাই জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকালাম। বিমান থেকে নীচে আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার-এর মনোরম দৃশ্য দেখতে পেলাম। উপর থেকে চারিদিক সমুদ্র দিয়ে ঘেরা ছোট দ্বীপটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখলাম। ১৭৮৯ সালে দু’জন নাবিকের  পরামর্শে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস চাটাম দ্বীপে একটি ব্রিটিশ  উপনিবেশ স্থাপন করেন। একই বছর  লেফটেন্যান্ট রেজিনল্ড ব্লেয়ার এই দ্বীপে সমীক্ষার কাজ শুরু করেন। ওঁর নামে এই জায়গার নাম হয় ‘পোর্ট ব্লেয়ার।’    

ধীরে ধীরে বিমান আন্দামানের ‘বীর সাভারকর’ বিমান বন্দরের মাটি স্পর্শ করল। সামনে একটু দূরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কাজ চলছে। বিমান থেকে নেমে বাসে করে বিমান বন্দরের ভিতরে প্রবেশ করলাম। রোলিং বেল্টের সামনে ব্যাগ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এরপর ব্যাগপত্র নিয়ে আগে থেকে বুক করে রাখা গাড়িতে করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগে থেকে অনলাইনে হোটেল বুক করে রেখেছিলাম। আবেরডিন বাজারের কাছে হোটেল কোস্টাল্যাণ্ড-এ। হনুমানজির মন্দির ডানদিকে রেখে আমাদের গাড়ি আবেরডিন ক্লক টাওয়ার এর দিকে এগিয়ে চলল। ক্লক টাওয়ার থেকে বাঁদিকে একটু গিয়ে ডানদিকে ‘হোটেল কোস্টাল্যাণ্ড’। ক্লক টাওয়ার থেকে ডানদিকে সেলুলার জেল যাওয়ার রাস্তা। হোটেলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেখে ফ্রেশ হয়ে ‘আদি বাঙালি হোটেল’-এ দুপুরের লাঞ্চ সেরে সেলুলার জেল দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল থেকে প্রায় ১ কিমি. পথ। সোমবার এই জেল বন্ধ থাকে। অন্যান্য দিন সকাল ৮-৪৫ থেকে ১২-৩০ এবং ১-৩০ থেকে ৪ টা পর্যন্ত এই জেল পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশ মুল্য মাথাপিছু ৩০ টাকা। বাঁদিকে টিকিটঘর, ওখান থেকে টিকিট কেটে নিলাম।

১৮৫৭ সাল অব্দি আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ রাজত্বের মানচিত্রে একটা বিন্দুমাত্র ছিল। সিপাহী  বিদ্রোহ অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রথম বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে প্রায় ২০০ জন বন্দিকে এখানে ভাইপার  দ্বীপে  কারাগার নির্মাণ করে নিয়ে আসা হয়।

Cellular Jail
Inside Cellular Jail

এরপর থেকে ব্রিটিশ-রা এই দ্বীপপুঞ্জে নতুন কাজ খুঁজে পেল। ১৮৯৬ সালের অক্টোবর মাসে পোর্ট ব্লেয়ার সেলুলার জেলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। সম্পূর্ণ হয় ১৯০৬ সালে। আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫,১৭,৩৫২ টাকা। এই জেল নির্মাণে প্রায় ৬০০ জন বন্দিকে কাজে লাগানো হয়েছিল। তখন থেকেই এই বিশাল ও ভয়ংকর সেলুলার জেলের আশ্চর্যজনক গল্প শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এই জেলকে রাষ্ট্রীয় স্মারক হিসাবে পরিবর্তিত করেন। প্রবেশদ্বারের কাছে রয়েছে জেলের ইতিহাসের ফলক। ডানদিক এবং বাঁদিক দু-দিকে অদম্য বীরদের উদ্দেশ্যে দু’টি ফটো গ্যালারি রয়েছে। এখানে সেলুলার জেলের একটি মডেল আছে।

Cellular Jail Model

বাঁদিকে National Memorial Art Gallery- ১৯৯৩ সালের ২৮শে মে এটির উদ্বোধন হয়। এখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের আন্দামান সফরের বিভিন্ন চিত্র এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের নানা কাহিনী ছবিসহ বর্ণনা করা হয়েছে। সামনের দিকে একটু এগিয়ে দেখতে পেলাম ‘স্বাতন্ত্র জ্যোত’। দেশের জন্য যে সব বীর সন্তান প্রাণ বলিদান দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আই.ও.সি. জেলের ভিতরে এই স্বাতন্ত্র জ্যোত স্থাপন করেছেন। যার প্রজ্বলিত শিখার সামনে দাঁড়ালে শ্রদ্ধায় মাথা আপনা থেকেই নত হয়ে আসে।

Swatantraya Jyot
Oldest Banyan Tree

এর ঠিক উল্টোদিকে শহীদদের আত্মার সাথে জড়িত শতাধিক বছরের পুরানো পিপুল বা অশ্বত্থ গাছ, যেটা শহিদদের উপর অমানবিক অত্যাচারের নীরব সাক্ষী হয়ে জেলের ভিতর আজও দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ইংরেজির ‘ভি’ আকারের মত সেলুলার জেল। নীচে ডানদিকে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য দর্শকদের বসার গ্যালারি। তার পাশে ফাঁসি ঘর। এখানে তিনজন অসহায় বন্দিদের একসাথে নির্মম ভাবে ফাঁসি দেওয়া হতো। উল্টোদিকের ঘরে আমাদের বিপ্লবীরা কীভাবে অত্যাচারী ব্রিটিশ প্রশাসকদের হাতে নরক যন্ত্রণা ভোগ করত তা মডেলের মাধ্যমে প্রদর্শিত করা হয়েছে। বন্দিদের নানা মডেল, নারকেল পেশাই মেশিন। বন্দিদের দিয়ে এই মেশিনে নারকেল পেশাই করে তেল বের করা হত। বন্দিদের গলায় লোহার বেড়ি পরানো থাকত, বেড়ির নীচে লোহার পাতে বন্দিদের নাম্বার লেখা থাকত। এর পাশে ফটো গ্যালারি, “Andaman In Olden Days”। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির স্মরণে ২০০০ সালের ২৫শে এপ্রিল এই গ্যালারির উদ্বোধন করা হয়। পুরানো আন্দামানের কাহিনী চিত্রের সাহায্যে সুন্দর ভাবে এখানে দেখানো হয়েছে। এরপর আমরা সেলুলার জেলের প্রথম তলায় প্রবেশ করলাম। এখানে একটি সেলে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের একটি ছবি রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে সব দেশপ্রেমিক বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন তাঁদেরকে এখানে পাঠানো হত। হাজার হাজার দেশপ্রেমিক এখানে বছরের পর বছর বন্দি থেকেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। উল্লাসকর দত্ত, বাবা পৃথ্বী সিং, গণেশ ঘোষ, বটুকেশ্বর দত্ত, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, ইন্দুভূষণ রায়, ভাই পরমানন্দ, আজাদ, সাভারকর প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামী ডেভিড বেরি ও অন্যান্য জেলারদের হাতে অমানবিক অত্যাচার ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন। এজন্য আন্দামানের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ভয়ের জায়গা বা কালাপানি’। সেলুলার জেলের প্রতিটি ইটের গায়ে প্রতিরোধ, যন্ত্রণা ও ত্যাগের হৃদয় বিদারক কাহিনী লেখা আছে। জেলের প্রতিটি কক্ষ বা সেল ১৩.৫ ফুট x ৭ ফুট, সাথে একটি লোহার গেটওয়ালা দরজা। ৩ ফুট x ১ ফুট এর একটি ভেন্টিলেটর যেটা দরজা থেকে প্রায় ১০ ফুট উপরে। ঘরগুলো লোহার বোল্ট দিয়ে আটকানো। বাইরে থেকে এমনভাবে তালা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল যাতে কোনরকমে ভেতর থেকে বাইরে কেউ হাত না পায়। সেলগুলির সামনে সরু টানা ৪ ফুট চওড়া বারান্দা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। মোট ৬৯৩ টি সেল। একটি সেলে একজন বন্দিকে রাখা হত। ছোট ছোট খাঁচার মত সেল বা প্রকোষ্ঠ ছাড়া কোন ডরমেটরি নেই। এত সেলের জন্য এর নামকরণ হয়েছিল ‘সেলুলার জেল’। জেলের এই ছোট খুপরিগুলিতে কীরকম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমাদের বিপ্লবীরা বছরের পর বছর দিনযাপন করেছেন তা অনুমান করে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠল। জেলটি অনেকগুলি খন্ডে বিভক্ত ছিল। বন্দিরা যাতে একে অপরের সাথে কথা বলতে না পারে, একে অন্যকে দেখতে না পায় তার জন্য প্রতিটি খন্ডের সামনের দিকে ছিল অন্য খন্ডের পেছন দিক।

সেলের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যের কোন ব্যবস্থা ছিল না। বন্দিদের অনেকক্ষণ ধরে প্রাকৃতিক কাজগুলিকে চেপে রাখতে হত। দিনের বেলায় নির্ধারিত সময়ে তাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হত। সকাল ৬টায় বার করা হত এবং বিকাল ৫টায় সেলে বন্ধ করে দেওয়া হত। রাতে প্রস্রাব করার জন্য মাটির পাত্র মতন কিছু একটা দেওয়া হত। ছোট একটি পাত্রে জল দেওয়া হত। পাত্র এত ছোট থাকত যে কেউ রাতে কোন প্রাকৃতিক কাজও সারতে পারত না। চূড়ান্ত শারীরিক শ্রম, কম খাবার, পোশাক, সময় সময় চাবুক মারার মত নির্মম অত্যাচার তো ছিলই। ১৯৪২ এর ২৩ শে মার্চ থেকে ১৯৪৫ এর ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত এই দ্বীপপুঞ্জটি জাপানিদের অধীনে ছিল। জাপানীরাও কম অত্যাচারী ছিল না। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস জাপানীদের মিলিটারি রাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। ১৯৪৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নেতাজি আন্দামানকে ‘স্বাধীন স্বরাজ’ ভূমি হিসাবে ঘোষণা করেন। সেলুলার জেলের সব বীর বিপ্লবীদের তিনি মুক্ত করেন। ১৯৪৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর থেকে মাত্র তিন দিনের জন্য নেতাজি আন্দামানে ছিলেন।

এই জেলের দ্বিতীয় তলায় ঠিক কেন্দ্রীয় টাওয়ারের নীচে জেলের আরো একটি মডেল আছে। এখানের দেওয়ালে ৩৩৬ জন বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ১৩টি নামের ফলক আছে। যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই বাঙালি। ১৯০৬ সালে যখন এই জেলের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় তখন এই জেলে তিনতলা প্রাসাদের ৭টি খণ্ড ছিল। ১৯৪১ সালের ভূমিকম্প এবং তারপর জাপানের আক্রমণ ও অধিগ্রহণের জেরে এই জেলের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। জেলের ৭টি খণ্ডের মধ্যে ৪টি খণ্ড ভেঙে ফেলা হয়। এখন তাই ৩টি খণ্ড নিয়ে এই জেল দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি খণ্ড কেন্দ্রীয় টাওয়ার থেকে স্টার ফিশের হাতের মত বেরিয়েছে। ৪টি খণ্ডের ভাঙা জায়গায় স্বাধীনতার পরে জি.বি. হাসপাতাল নির্মাণ হয়েছে। এটি এখানকার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল।

পুরো সেলের রং বেগুনে-বাদামী। সেলের তৃতীয় তলার রং অন্যান্য তলার রং-এর থেকে আলাদা। এই তলার রং সাদা। জেলের ছাদের মাঝখানে সেন্ট্রাল টাওয়ার। ৩টি খণ্ডের করিডরে ২১ জন সান্ত্রী পালা করে পাহারা দিত। এছাড়াও কেন্দ্রীয় টাওয়ার থেকে বন্দিদের ওপর নজর রাখা হত। ছাদ থেকে দূরে সমুদ্রের মাঝে রস ও নর্থ বে দ্বীপ দুটি দেখা যায়।

সেলুলার জেল দেখার পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম করবিনস্‌ কোভ বিচ এর উদ্দেশে। রাস্তার মাঝে দেখতে পেলাম Flag point। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস এখানে ত্রিবর্ণরঞ্জিত ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এখানে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় ‘জয় হিন্দ’ কথাটি লেখা আছে। Flag point এর কাছেই শ্রী আলাইকাদাল আয়ানমান মন্দির। Flag point ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম করবিনস্‌ কোভ বিচ এর দিকে। এটি পোর্টব্লেয়ার থেকে ৭ কিমি. দূরে সুন্দর একটি সমুদ্র সৈকত।

corbyn's cove beach

এখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে সমুদ্রের অপরূপ শোভা উপভোগ করলাম, ডাবের জল খেলাম। তারপর চা ও বিকেলের টিফিন সেরে রাতে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য আবার সেলুলার জেলের সামনে হাজির হলাম।

Cellular Jail at night

রাতের অন্ধকারে জেলের সামনে নানা রঙের আলোর ঝলকানি মনকে মোহিত করল। জেলের ঠিক উল্টোদিকে বীর সাভারকর পার্ক। এখানে ৬ জন শহিদের পাথরের মূর্তি রয়েছে- ইন্দুভূষণ রায়, পন্ডিত রামরক্ষা, বাবা ভান সিং, মোহিত মৈত্র, মহাবীর সিং এবং সাভারকর। নির্দিষ্ট সময়ে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য জেলের ভিতরে প্রবেশ করলাম। কীভাবে এই দ্বীপে প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল, কীভাবে ব্রিটিশরা এই দ্বীপ দখল করে, বিপ্লবীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য কীভাবে এই জেলের প্রতিষ্ঠা, বন্দিদের উপর জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক অত্যাচারের কাহিনী – এই শো-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। জেলের কুঠুরির ভিতর বন্দিদের আর্তনাদ, প্রতিটি বেত্রাঘাতের সাথে তাঁদের ‘বন্দেমাতরম’ চিৎকার শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে কখন যে চোখের কোণ জলে ভিজে গেছে বুঝতে পারিনি। বিষণ্ণ মনে জেলের বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে করে হোটেলে ফিরে এলাম।

এই লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য অনলাইনে টিকিট বুক করা যায়। আমরা অনলাইনে আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিলাম। টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা। প্রতিদিন তিনটি করে শো হয়-সন্ধ্যা ৫-৫০, ৬-৫০ এবং ৭-৫০এ।

দ্বিতীয় দিন

আজ আমরা যাব মায়াবন্দর। পোর্ট ব্লেয়ারের হোটেল থেকে ভোর ভোর সাড়ে তিনটেয় বেরিয়ে পড়লাম জিরকাটাং চেকপোস্টের উদ্দেশে। ভোরের আলো ফোটার আগে ৪৮ কিমি. রাস্তা পার হয়ে এক ঘন্টা পর ভোর সাড়ে চারটেয় জিরকাটাং চেকপোস্টে পৌঁছে গেলাম। আমাদের গাড়ি জিরকাটাং-এ গিয়ে অন্য গাড়ির লম্বা লাইনের পেছনে দাঁড়ালো। লাইনে সামনের দিকে বাস, তার পেছনে প্রাইভেট গাড়ি, সবার শেষে ট্রাক, লরি – এভাবে সব গাড়ি দাঁড়িয়েছিল।

Jirkatang Check Post

এখান থেকে দিনে চারবার সকাল ছটা, সাড়ে নটা, দুপুর সাড়ে বারোটা এবং বিকেল তিনটেয় কনভয় করে পুলিশ পাহারায় গাড়িগুলিকে জারোয়াদের জন্য সংরক্ষিত এলাকার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের ড্রাইভার একটি এন্ট্রি ফর্ম ফিলাপ করার জন্য আমাদের হাতে দিল। আধার কার্ডের নাম্বার, নাম, বয়স, মেল / ফিমেল লিখে ফরম পূরণ করে চেকপোস্টের কাউন্টার থেকে এন্ট্রি পাস করানো হলো। এখানে বেশ কিছু দোকান ও খাবার জায়গা আছে। আমরা সকালের টিফিন করে নিলাম। এন্ট্রির কাজ সম্পন্ন করে আমাদের গাড়ি ভোর ছ-টার কনভয়ে জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্টে প্রবেশ করল। জঙ্গলের বুক চিরে দক্ষিণ আন্দামান থেকে মধ্য আন্দামান হয়ে উত্তর আন্দামানের সংযোগকারী আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড চলে গেছে বারাটাং। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ। প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক গাড়ি চলে এই রাস্তায়। এই রাস্তায় গাড়ি চলাচলের কিছু নিয়ম আছে। গাড়ির গতি প্রতি ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার এর মধ্যে রাখতে হবে, কোন কারণেই গাড়ি থামানো যাবে না; গাড়ি থেকে নামা যাবে না; ফটো তোলা বা ভিডিও করা যাবে না। মোবাইল বা ক্যামেরা বাইরে রাখা যাবে না। একটি গাড়ি অন্য গাড়িকে ওভারটেক করতে পারবে না। হর্ন বাজাতে পারবে না। জারোয়াদের খাবার দেওয়া, ছবি তোলা বা তাদের দিকে কোন আকার ইঙ্গিত করা যাবে না। এগুলি অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অমান্য করলে দশ বছরের কারাবাস এবং দশ হাজার টাকা জরিমানা বা দুটোই হতে পারে। জারোয়া অধ্যুষিত ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গাড়ি এগোতে থাকলো। রাস্তার দু-দিকে হাজার হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা গর্জন, বাদাম ও শিমুল গাছের জঙ্গল; যেমন তার গঠন তেমনি তার উচ্চতা আর শক্তি। হঠাৎ আমাদের ড্রাইভার ভাই বলল, “বলুন তো স্যর, এখানে গাছগুলি না বেঁকে সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে কেন?” হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে আমি কি উত্তর দেবো ভাবছি, ড্রাইভার ভাই উত্তরের অপেক্ষা না করে হাসতে হাসতে বলল, “এখানে জঙ্গল এত ঘন যে পাশে কোন খালি জায়গা না পেয়ে গাছগুলি সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে।” আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাছেদের কথোপকথন শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছি আর সন্ধানী চোখ দিয়ে জারোয়া খোঁজার চেষ্টা করছি। আধুনিকতার আলো থেকে দূরে আন্দামানের এই জঙ্গলে জারোয়া গোষ্ঠীর প্রায় ৪০০ জন বাস করে। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে জারোয়াদের দেখা না পেয়ে মন খুব খারাপ, হাল প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। হঠাৎ ড্রাইভার ভাই বলে উঠলো, “সামনে দেখুন, জারোয়া।” তাকিয়ে দেখি এক জারোয়া দম্পতি গাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষটির হাতে ধনুক, পিঠে তূণীরে রাখা তির। আগের মত ভয়ংকর বা আক্রমণাত্মক মনোভাব এখন আর নেই। আগের মত নগ্ন অবস্থায় দেখা যায় না। সভ্যতার ছোঁয়াতে ওরাও এখন পোশাক পরে। ড্রাইভার ভাই জানালো, আজকাল বিভিন্ন এন.জি.ওর তরফে এদের শিক্ষিত করার কাজ চলছে। এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রতি সপ্তাহে একবার করে চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়। জারোয়া শিশুদের জন্য বিদ্যালয় আছে। জঙ্গল দিয়ে যাওয়ার সময় ড্রাইভার ভাই ইশারা করে আমাদের স্কুলটি দেখালো। আরো কিছুক্ষণ যাওয়ার পর হঠাৎ দেখি উল্টো দিক থেকে একটি লরি আসছে। ড্রাইভার ভাই আস্তে আস্তে বলল, “লরিটার পেছনের দিকে তাকাবেন”। তাকিয়ে দেখি লরির পেছনে প্রায় জনা তিরিশেক জারোয়া মুখে একরকম আওয়াজ করতে করতে পাশ দিয়ে চলে গেল। ড্রাইভার ভাই বলল, “লরির ড্রাইভারদের সাথে এদের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, লরির ড্রাইভাররা এদের মদ ও খাবার দেয়; বিনিময়ে এরা কাঁকড়া, শূকরের মাংস ড্রাইভারদের এনে দেয়। এরা হাত দেখিয়ে লরি থামায়, তারপর লরিতে চেপে বসে। নামার সময় হলে লরির গায়ে হাত দিয়ে চাপড়াতে থাকে। ড্রাইভার গাড়ি থামালে সবাই নেমে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যায়।”

Towards Limestone Cave

জঙ্গলের শেষে দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপ। প্রায় দু’ঘন্টা পর পৌঁছালাম ‘মিডল্‌ স্ট্রেট’ জেটি। সামনে দু’টি দ্বীপের মাঝে বিশাল চওড়া খাঁড়ি-‘মিডল্‌ স্ট্রেট’। এই খাঁড়িতে একমাত্র ভেসেলের মাধ্যমে যাতায়াত করা যায়। মানুষ, গাড়ি সব এই ভেসেলের মাধ্যমে পারাপার হয়। বিশাল ভেসেল দু’টি বাস, চারটি সুমো গাড়ি সহ প্রায় শ’খানেক মানুষ পেটে পুরে খাঁড়ি পার হয়ে ওপারে মিডল্‌ আন্দামান দ্বীপের বারাটাং জেটির দিকে পাড়ি দিল। মিডল্‌ স্ট্রেট জেটিতে ফটো তোলা বারণ। ভেসেলে ওঠার পর কিছুটা দূরে গিয়ে ভেসেল থেকে জেটির ছবি তুললাম। ধীরে ধীরে ভেসেল এগিয়ে চলল বারাটাং জেটির দিকে। যাত্রাপথে বারাটাং জেটি থেকে একটি ভেসেলকে মিডল্‌ স্ট্রেট জেটির দিকে আসতে দেখলাম। একটু দূরে এই খাঁড়ির উপর নতুন ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে দেখতে পেলাম। আমরা পৌঁছে গেলাম বারাটাং জেটিতে। মানুষ, গাড়ি ধীরে ধীরে ভেসেল থেকে জেটিতে নেমে গেল। সামনে বাঁদিকে সারি সারি স্পীডবোট দেখতে পেলাম। এখান থেকে স্পীডবোটে করে যেতে হয় চুনাপাথরের গুহা বা লাইনস্টোন কেভ-এ। আমাদের টিকিট আগে থেকে কাটা ছিল। টিকিট জনপ্রতি ৮০০ টাকা। লাইফ জ্যাকেট করে স্পীডবোটে উঠে পড়লাম চুনা পাথরের গুহা দেখতে যাওয়ার জন্য। খাঁড়ির জল কেটে সশব্দে এগিয়ে চলল আমাদের স্পিড বোট। প্রতি বোটে ১০ জন করে। বোটের ছেলেটি আমাদের গাইড। দু-ধারে ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ অরণ্য, তার মধ্য দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের স্পীডবোট। আমাদের বোটের নাম ছিল ‘মিভান’।

ম্যানগ্রোভের গাছগুলি যেন জলের উপর ঝুঁকে পড়েছে। মাঝে মাঝে সরু খাঁড়ি জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেছে। মিনিট কুড়ি জলবিহারের পর বাঁদিকে সরু খাঁড়ি দিয়ে বোটটি জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল। এতটাই সরু যে একবারে একটাই বোট যেতে পারে। দু-দিকে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধতা ভেঙে দু’একটা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, সে এক অপরূপ দৃশ্য। গাছ কেটে বানানো একটা ছোট জেটির সামনে বোটটি থামল। সামনে দ্বীপের একজন রক্ষী দাঁড়িয়েছিল।

বোট থেকে কয়েক ধাপ উঠে দেখলাম কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি সরু ব্রিজ ম্যানগ্রোভের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে চলে গেছে। এখান থেকে গুহা দেড় কিলোমিটার হাঁটা পথ। ব্রিজের দু’পাশে সুন্দরী, গরান গাছের জঙ্গল ও মাটির উপর উঠে থাকা তাদের শ্বাসমূল। মাঝে মাঝে পর্যটকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছোট ছোট কুটির আছে। কিছুক্ষণ চলার পর দেখলাম জঙ্গল ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে, সামনে জঙ্গল সুরক্ষা এবং পর্যটকদের জন্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ই মার্চ উদ্বোধন হলেও এটি এখনো চালু হয়নি। সামনে সবুজ ক্ষেত। মাঠে গরু, ছাগল চরছে। এটি একটি ছোট গ্রাম নাম ‘নয়া ডেরা’, মানে ‘নতুন বসতি’। আমাদের সাথে আসা বোটের ছেলেটি আমাদের গাইড হিসাবে কাজ করছে। ওর কাছে জানতে পারলাম এই গ্রামে ছোট ছোট কয়েকটি বাড়ি আছে। এরা মূলত মাঠে চাষ-বাস করে। এছাড়াও গবাদি পশু, হাঁস, মুরগি পালন করে। এখানে আটটি পরিবার, ৪০/৪৫ জন মানুষ বসবাস করে। জেটিতে আসার সময় জেনেছিলাম এই দ্বীপের আরেকটি নাম হলো রাঁচিওয়ালা দ্বীপ। উনিশ শতকের শেষের দিকে রাঁচি শহরে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। তখন স্থানীয় লোকেদের অনেকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে মিশনারিদের কাছে আশ্রয় চেয়েছিল। ব্রিটিশরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বনাঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উপলব্ধি করে এই ধর্মান্তরিতদের ফসল চাষের জন্য বারাটাং দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়। রাঁচি থেকে আসা শ্রমিকরা এখানে বসতি স্থাপন করে নতুন ভাবে জীবনযাপন করতে থাকে।

Inside the Limestone Cave

কিছুটা এগিয়ে বেশ কিছু লেবুর শরবত এর দোকান দেখতে পেলাম। ঠিক করলাম গুহা দেখে ফেরার পথে এখানে শরবত পান করব। খানিক পাথুরে চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম চুনাপাথরের গুহায়। গাইড তার হাতের ব্যাটারি লাইটের সাহায্যে পথ দেখিয়ে গুহার মধ্যে নিয়ে চলল। গুহার মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্ট্যালাক্টাইট ও স্ট্যালাক্মাইট পাথর দিয়ে সৃষ্ট এই গুহা। পাথরের ফাটল দিয়ে জল চুঁইয়ে চুনাপাথরের উপর পড়ে গুহার ভিতরে নানা প্রাকৃতিক ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। মানুষের কল্পনার সাথে মিশে তা কোথাও হাতির মাথা, কোথাও বাঘের থাবা, শঙ্খ, গণেশ বা অন্য মূর্তির অবয়ব। এসব কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা প্রকৃতি। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি সুনিপুণ হাতে এই শিল্পকলা গড়ে তুলেছে। গুহা দেখা শেষ করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শরবতের দোকানের সামনে এলাম। সাতটি লেবুর শরবত এর দোকান। শরবতে চুমুক দিতে দিতে ওদের সাথে কথা বলে ইতিহাস জানার চেষ্টা করলাম। সাতটি পরিবারের লোকজন বিশেষ করে পরিবারের মহিলারা এখানে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে পর্যটকদের জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে বিক্রি করে। দাম গ্লাস প্রতি ৩০ টাকা।

Lemon Juice Shop

এতে ওদের কিছু রোজগার হয় আর পর্যটকদের ক্লান্তি দূর হয়। আটটি পরিবার কিন্তু এখানে সাতটি দোকান কেন? জানতে পারলাম একটি পরিবার একটু সচ্ছল তারা দোকান দেয়নি। এরা সব ঝাড়খণ্ডের অধিবাসী। এরাই প্রথম পুরুষ যারা আন্দামানের আধিকারিকদের কাছ থেকে এখানে বসবাসের অনুমতি পেয়েছে। কাছাকাছি কোন দোকান নাই, সব কিছুর জন্য এদের বারাটাং যেতে হয়, নাহলে পোর্ট ব্লেয়ার। বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ বা চিকিৎসার জন্য বারাটাং সবথেকে কাছের সদর। যাতায়াতের জন্য স্পিড বোট ছাড়া অন্য কোন যানবাহন নেই। ওখান থেকে আবার পাথরের এবড়ো খেবড়ো রাস্তা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছোট জেটিতে পৌঁছলাম। সেখান থেকে স্পিড বোটে করে খাঁড়ি পেরিয়ে বারাটাং জেটিতে ফিরে এলাম। ওখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে ডাবের জল খেয়ে গাড়িতে করে মাড ভলকানো বা কাদার আগ্নেয়গিরি দেখতে চললাম। হেঁটে বেশ কিছুটা চড়াই ভেঙে উপরে উঠলাম। ফেটে যাওয়া মাটি থেকে তরল কাদা বুদবুদ করে বেরোচ্ছে। এটি একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। এখানে সেরকম কিছু দেখার ছিল না। মাড ভলকানো দেখে কাদার ঢিবি ছাড়া কিছু মনে হলো না।

Mud Volcano Entrance

গাড়ি ছুটে চলল আমকুঞ্জ বিচের দিকে। মাঝে পড়ল হামফ্রে ব্রিজ। এই ব্রিজের নীচে খাঁড়ি দিয়ে আগে ভেসেল চলত। ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে এই সুন্দর ব্রিজটি চালু হয়েছে। হামফ্রে ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলল আমকুঞ্জ বিচের দিকে, মাঝে কদমতলাতে লাঞ্চ সেরে নিলাম। রঙ্গত থেকে মায়া বন্দরের পথে আরও একটি জারোয়া অধ্যুষিত এলাকা রয়েছে।

Humphrey Bridge

তবে এখানে কোন বাধা নিষেধ নেই। এখানের জারোয়ারা সভ্য সমাজের সাথে প্রায় মিশে গেছে। কদমতলা থেকে কৌশল্যানগরের মধ্যে তিন নম্বর এবং ১৫ নম্বর গেটের মাঝে ফুলতলা নামে একটি অঞ্চলে কিছু বাঙালি পরিবার বাস করে, জারোয়ারা খাবার সংগ্রহের জন্য মাঝেমাঝে এই বাঙালি পরিবারগুলির কাছে আসে। খাবারের বিনিময়ে তারা এই পরিবারগুলিকে মাংস ও কাঁকড়া দিয়ে যায়। কৌশল্যানগর ও মোহনপুরে জলের খুব অভাব। এখানে প্রতিটি বাড়ির সামনে জলের ড্রাম বসানো আছে। গাড়িতে করে এখানে জল সরবরাহ করা হয়। ড্রাইভার ভাই আগে বলে দিয়েছিল যে আন্দামানে একমাত্র আমকুঞ্জ বিচে সবচেয়ে সস্তায় ডাব পাওয়া যায়। দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমকুঞ্জ বিচে পৌঁছে গেলাম। দুধের মত সাদা ছোট ছোট ঢেউ ফেনিল হয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে। বেলাভূমির সাদা বালির উপর রোদ পড়ে চিক্‌চিক্‌ করছে।

চারিদিকে ছড়ানো ঝিনুক, শামুক, সামুদ্রিক কোরাল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ঘন নীল জলরাশি। ছোট ছোট পাখিরা মাছ ধরে খাচ্ছে। তীরের সামনে কিছু কালো পাথর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ওখানে আমরা কিছু ছবি তুললাম। বিচ থেকে ফিরে সামনের দোকানে ডাবের জল খেলাম। হলদে রংয়ের কিং ডাবের সুস্বাদু জল খেয়ে এগিয়ে চললাম ধানিনালা বিচের দিকে। বড় বড় সাইজের ডাবের দাম মাত্র ৩০ টাকা। ডাবে এত বেশি পরিমাণে জল ছিল যে আমরা প্রত্যেকে একটা করে ডাবের জলও খেতে পারছিলাম না।

Amkunj Beach

এর পরের গন্তব্য ধানিনালা বিচ। গাড়ি থেকে নেমে গহন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের স্তব্ধ নিশ্ছিদ্র ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে প্রায় ৭১৩ মিটার লম্বা কাঠের ব্রিজ অতিক্রম করে ধানিনালা বিচে পৌঁছে গেলাম।

Dhani Nallah Beach

ব্রিজের মাঝে মাঝে বিশ্রামের জন্য ছোট ছোট কুটির আছে, বসার জায়গা রয়েছে। সমুদ্রের তীরে সারি সারি বড় বড় গাছ, বিচ থেকে সমুদ্রের অপরূপ শোভা দেখলাম। ওখান থেকে আমরা চললাম মায়াবন্দরের দিকে। রাস্তার ডানদিকে টিলার মত ছোট ছোট পাহাড় যেন প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের আস্তানা হোটেল ব্লু বার্ড এ। হোটেল থেকে পেছনের খাঁড়িতে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখলাম। হোটেলে রাত কাটিয়ে কাল আমরা রওনা দেব ডিগলিপুরের উদ্দেশে রস ও স্মিথ আইল্যান্ড দেখার জন্য।

অসীম কুমার মান্না | Asim Kumar Manna

Param Gyan O Sadhan Tathya | পরমজ্ঞান ও সাধন তত্ত্ব | New Article 2023

Valentine Day Speciality | ভালোবাসা দিবস | Top New Bengali Article 2023

Param Gyan O Sadhan Tathya | পরমজ্ঞান ও সাধন তত্ত্ব | New Article 2023

Shikhar Chera Jiban | শিকড় ছেঁড়া জীবন | New Article 2023

Short bengali story | Bengali story pdf | pratilipi bengali story | Short Stories for Children | English Stories for Kids | Moral Stories for Kids | story in english | story hindi | story book | story for kids | short story | story for girls | short story in english | short story for kids | bangla golpo pdf | Bangla golpo pdf | Bangla golpo story | bangla romantic golpo | choto golpo bangla | bengali story | Sunday suspense golpo | sunday suspense mp3 download | suspense story in hindi | suspense story in english 200 words | Suspense story in english | suspense story in english 300 words | Suspense story examples | suspense story in english 100 words | suspense story writing | very short suspense stories for students | Andaman Travel Story | Top Bangla Golpo Online Reading | New Read Online Bengali Story | Top Best Story Blogs | Best Story Blogs in pdf | Sabuj Basinda | High Challenger | Famous Bangla Golpo Online Reading | Shabdodweep Read Online Bengali Story | Shabdodweep Writer | Bangla Golpo Online Reading pdf | Famous Story – Andaman Travel Story | Pdf Andaman Travel Story | Andaman Travel Story App | Full Bangla Golpo Online Reading | Bangla Golpo Online Reading Blogs | Best Story Blogs in Bengali | Live Bengali Story in English |Bangla Golpo Online Reading Ebook | Full Bangla Galpo online | Andaman Travel Story 2024 | New Bengali Web Story – Episode | Golpo Dot Com Series | Andaman Travel Story Video | Story – Andaman Travel Story | New Bengali Web Story Audio | New Bengali Web Story Video | Andaman Travel Story Netflix | Audio Story – Andaman Travel Story | Video Story – Andaman Travel Story | Shabdodweep Competition | Story Writing Competition | Bengali Writer | Bengali Writer 2023 | Trending Bangla Golpo Online Reading | Recent story Andaman Travel Story | Top Story Andaman Travel Story | Popular New Bengali Web Story | Best Read Online Bengali Story | Read Online Bengali Story 2023 | Shabdodweep Bangla Golpo Online Reading | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Modern Online Bangla Galpo Download | Bangla Golpo Online Reading mp3 | Horror Adult Story | Read Online Bengali Story Collection | Modern Online Bangla Galpo mp4 | Modern Online Bangla Galpo Library | New Bengali Web Story Download | Full Live Bengali Story | Bengali Famous Story 2023 | Shabdodweep Bengali Famous Story | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Live Bengali Story – audio | Bengali Famous Story – video | Bengali Famous Story mp3 | Full Bengali Famous Story | Bengali Literature | Shabdodweep Magazine | Shabdodweep Web Magazine | Live Bengali Story Writer | Shabdodweep Writer | Story Collection – Modern Online Bangla Galpo | Andaman Travel Story – Vlog

1 thought on “Best Andaman Travel Story | Full Andaman Journey”

  1. খুব সুন্দর তথ্য সম্বলিত বর্ণনা এবং প্রানবন্ত ছবি।

    Reply

Leave a Comment