...

Best Andaman Travel Story | Full Andaman Journey

Sharing Is Caring:

আন্দামান ভ্রমণ – অসীম কুমার মান্না

বঙ্গোপসাগরের মাঝে ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জ যেন একটি স্বর্গরাজ্য। এই দ্বীপপুঞ্জের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, নীল মখমলে মোড়া সমুদ্র, প্রবালের উদ্যান, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সোনালী বেলাভূমি, সবুজ বনরাশি, দূষণ মুক্ত পরিবেশ ভ্রমণপ্রেমী মানুষজনকে আকর্ষণ করে। সেই অমোঘ টানে আকর্ষিত হয়ে গত ৩০শে মার্চ, ২০২৩ আমরা সপরিবারে পাড়ি দিলাম স্বপ্নের ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে। আন্দামানে যাওয়ার আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল; আমাদের পরিবারের কেউ এর আগে বিমানে ওঠেনি। তাই বিমানে চড়ে স্বর্গরাজ্য দর্শন করার ইচ্ছে থেকেই ‘আন্দামান ও নিকোবর’ দ্বীপপুঞ্জকে নির্বাচন করা।

প্রথম দিন

৩০শে মার্চ ভোর তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে জলখাবার খেয়ে ইন-ড্রাইভার অ্যাপ থেকে ক্যাব বুক করে নিলাম। ভোর ৫টায় গড়িয়ার বাড়ি থেকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ভোরের আলোয় পাটুলির অপরূপ শোভা দেখতে পেলাম। ই. এম. বাইপাস ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল বিমান বন্দরের দিকে। সকালে যানবাহন কম থাকায় আধ ঘন্টার মধ্যে বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে গেটে আই কার্ড দেখিয়ে বিমান বন্দরের ভেতর প্রবেশ করলাম। ঢোকার মুখে বোর্ডে দেখে নিলাম আমাদের বিমান ‘গো ফার্স্ট’ এর জন্য কাউন্টার নং হল ‘A’। নির্ধারিত কাউন্টারে গিয়ে লাগেজ জমা দিলাম। লাগেজ কালেকশন স্টিকার ও বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ করলাম। এরপর সিকিউরিটি চেক এর জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। কেবিন ব্যাগ এর সব জিনিসপত্র, বেল্ট, হাতঘড়ি, পার্স একটি ট্রে তে সাজিয়ে রোলিং বেল্টে রেখে দিলাম। চেক হয়ে যাওয়ার পর সব জিনিসপত্র ব্যাগের মধ্যে গুছিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ওখান থেকে অন্যান্য বিমানকে টেক অফ্‌ করতে দেখলাম। ২১ নং গেট থেকে আমাদের বিমান ছাড়বে, সেজন্য আমরা গেটের সামনে লাইনে দাঁড়ালাম। ওয়াক ওয়ে দিয়ে হেঁটে বিমানের ভেতর প্রবেশ করলাম।

Inside Aeroplane

আমাদের প্রথম বিমান যাত্রা তাই সব কিছু আমাদের কাছে রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছিল। বিমান এর ভেতরের দৃশ্য দেখে অবাক হলাম। বাঁদিকে তিনটি আর ডানদিকে তিনটি মোট ছটি করে সিট। এরকম ৩২ টি সারি আছে। আমরা আমাদের নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসলাম। জিনিসপত্র মাথার উপর কেবিনে রেখে দিলাম। কেবিন ক্রু উপরের ঢাকনা বন্ধ করে দিল এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিতে বলল। আমরা সিট বেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরে সোঁ সোঁ আওয়াজ করে বিমানের যাত্রা শুরু হল। আমরা জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ধীরে ধীরে  কলকাতার মাটি ছেড়ে উপরে আকাশের দিকে যাত্রা শুরু হল। নীচে দমদম ও তার আশপাশের বাড়ি, রাস্তা ছোট হতে হতে বিলীন হয়ে গেল। আমরা সাদা পেঁজা তুলো দিয়ে ঘেরা মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করলাম। বিমান যখন প্রথম মাটি থেকে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছিল তখন একটা ঝাঁকুনি অনুভব করেছিলাম। মেঘের দেশে পৌঁছানোর পর মনে হচ্ছিল বিমান যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই সিট বেল্ট খুলে নিল। আমার স্ত্রী ‘মন্দিরা’, মেয়ে ‘অন্তরা’ এবং ছেলে ‘আকাশ’ অবাক চোখে চারিদিক দেখতে লাগল। ওরা  উত্তেজিত, ওদের চোখে মুখে খুশির ছাপ। কখন যে দু-ঘন্টা কেটে গেছে কেউ বুঝতে পারিনি। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলল, “নীচে পোর্ট ব্লেয়ার দেখা যাচ্ছে।” আমরা সবাই জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকালাম। বিমান থেকে নীচে আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার-এর মনোরম দৃশ্য দেখতে পেলাম। উপর থেকে চারিদিক সমুদ্র দিয়ে ঘেরা ছোট দ্বীপটাকে খুব সুন্দর লাগছিল। মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখলাম। ১৭৮৯ সালে দু’জন নাবিকের  পরামর্শে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস চাটাম দ্বীপে একটি ব্রিটিশ  উপনিবেশ স্থাপন করেন। একই বছর  লেফটেন্যান্ট রেজিনল্ড ব্লেয়ার এই দ্বীপে সমীক্ষার কাজ শুরু করেন। ওঁর নামে এই জায়গার নাম হয় ‘পোর্ট ব্লেয়ার।’    

ধীরে ধীরে বিমান আন্দামানের ‘বীর সাভারকর’ বিমান বন্দরের মাটি স্পর্শ করল। সামনে একটু দূরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কাজ চলছে। বিমান থেকে নেমে বাসে করে বিমান বন্দরের ভিতরে প্রবেশ করলাম। রোলিং বেল্টের সামনে ব্যাগ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এরপর ব্যাগপত্র নিয়ে আগে থেকে বুক করে রাখা গাড়িতে করে হোটেলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগে থেকে অনলাইনে হোটেল বুক করে রেখেছিলাম। আবেরডিন বাজারের কাছে হোটেল কোস্টাল্যাণ্ড-এ। হনুমানজির মন্দির ডানদিকে রেখে আমাদের গাড়ি আবেরডিন ক্লক টাওয়ার এর দিকে এগিয়ে চলল। ক্লক টাওয়ার থেকে বাঁদিকে একটু গিয়ে ডানদিকে ‘হোটেল কোস্টাল্যাণ্ড’। ক্লক টাওয়ার থেকে ডানদিকে সেলুলার জেল যাওয়ার রাস্তা। হোটেলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেখে ফ্রেশ হয়ে ‘আদি বাঙালি হোটেল’-এ দুপুরের লাঞ্চ সেরে সেলুলার জেল দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল থেকে প্রায় ১ কিমি. পথ। সোমবার এই জেল বন্ধ থাকে। অন্যান্য দিন সকাল ৮-৪৫ থেকে ১২-৩০ এবং ১-৩০ থেকে ৪ টা পর্যন্ত এই জেল পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশ মুল্য মাথাপিছু ৩০ টাকা। বাঁদিকে টিকিটঘর, ওখান থেকে টিকিট কেটে নিলাম।

১৮৫৭ সাল অব্দি আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ রাজত্বের মানচিত্রে একটা বিন্দুমাত্র ছিল। সিপাহী  বিদ্রোহ অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রথম বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে প্রায় ২০০ জন বন্দিকে এখানে ভাইপার  দ্বীপে  কারাগার নির্মাণ করে নিয়ে আসা হয়।

Cellular Jail
Inside Cellular Jail

এরপর থেকে ব্রিটিশ-রা এই দ্বীপপুঞ্জে নতুন কাজ খুঁজে পেল। ১৮৯৬ সালের অক্টোবর মাসে পোর্ট ব্লেয়ার সেলুলার জেলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। সম্পূর্ণ হয় ১৯০৬ সালে। আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫,১৭,৩৫২ টাকা। এই জেল নির্মাণে প্রায় ৬০০ জন বন্দিকে কাজে লাগানো হয়েছিল। তখন থেকেই এই বিশাল ও ভয়ংকর সেলুলার জেলের আশ্চর্যজনক গল্প শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এই জেলকে রাষ্ট্রীয় স্মারক হিসাবে পরিবর্তিত করেন। প্রবেশদ্বারের কাছে রয়েছে জেলের ইতিহাসের ফলক। ডানদিক এবং বাঁদিক দু-দিকে অদম্য বীরদের উদ্দেশ্যে দু’টি ফটো গ্যালারি রয়েছে। এখানে সেলুলার জেলের একটি মডেল আছে।

Cellular Jail Model

বাঁদিকে National Memorial Art Gallery- ১৯৯৩ সালের ২৮শে মে এটির উদ্বোধন হয়। এখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের আন্দামান সফরের বিভিন্ন চিত্র এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের নানা কাহিনী ছবিসহ বর্ণনা করা হয়েছে। সামনের দিকে একটু এগিয়ে দেখতে পেলাম ‘স্বাতন্ত্র জ্যোত’। দেশের জন্য যে সব বীর সন্তান প্রাণ বলিদান দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আই.ও.সি. জেলের ভিতরে এই স্বাতন্ত্র জ্যোত স্থাপন করেছেন। যার প্রজ্বলিত শিখার সামনে দাঁড়ালে শ্রদ্ধায় মাথা আপনা থেকেই নত হয়ে আসে।

Swatantraya Jyot
Oldest Banyan Tree

এর ঠিক উল্টোদিকে শহীদদের আত্মার সাথে জড়িত শতাধিক বছরের পুরানো পিপুল বা অশ্বত্থ গাছ, যেটা শহিদদের উপর অমানবিক অত্যাচারের নীরব সাক্ষী হয়ে জেলের ভিতর আজও দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ইংরেজির ‘ভি’ আকারের মত সেলুলার জেল। নীচে ডানদিকে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য দর্শকদের বসার গ্যালারি। তার পাশে ফাঁসি ঘর। এখানে তিনজন অসহায় বন্দিদের একসাথে নির্মম ভাবে ফাঁসি দেওয়া হতো। উল্টোদিকের ঘরে আমাদের বিপ্লবীরা কীভাবে অত্যাচারী ব্রিটিশ প্রশাসকদের হাতে নরক যন্ত্রণা ভোগ করত তা মডেলের মাধ্যমে প্রদর্শিত করা হয়েছে। বন্দিদের নানা মডেল, নারকেল পেশাই মেশিন। বন্দিদের দিয়ে এই মেশিনে নারকেল পেশাই করে তেল বের করা হত। বন্দিদের গলায় লোহার বেড়ি পরানো থাকত, বেড়ির নীচে লোহার পাতে বন্দিদের নাম্বার লেখা থাকত। এর পাশে ফটো গ্যালারি, “Andaman In Olden Days”। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির স্মরণে ২০০০ সালের ২৫শে এপ্রিল এই গ্যালারির উদ্বোধন করা হয়। পুরানো আন্দামানের কাহিনী চিত্রের সাহায্যে সুন্দর ভাবে এখানে দেখানো হয়েছে। এরপর আমরা সেলুলার জেলের প্রথম তলায় প্রবেশ করলাম। এখানে একটি সেলে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের একটি ছবি রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে সব দেশপ্রেমিক বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন তাঁদেরকে এখানে পাঠানো হত। হাজার হাজার দেশপ্রেমিক এখানে বছরের পর বছর বন্দি থেকেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। উল্লাসকর দত্ত, বাবা পৃথ্বী সিং, গণেশ ঘোষ, বটুকেশ্বর দত্ত, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, ইন্দুভূষণ রায়, ভাই পরমানন্দ, আজাদ, সাভারকর প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামী ডেভিড বেরি ও অন্যান্য জেলারদের হাতে অমানবিক অত্যাচার ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন। এজন্য আন্দামানের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ভয়ের জায়গা বা কালাপানি’। সেলুলার জেলের প্রতিটি ইটের গায়ে প্রতিরোধ, যন্ত্রণা ও ত্যাগের হৃদয় বিদারক কাহিনী লেখা আছে। জেলের প্রতিটি কক্ষ বা সেল ১৩.৫ ফুট x ৭ ফুট, সাথে একটি লোহার গেটওয়ালা দরজা। ৩ ফুট x ১ ফুট এর একটি ভেন্টিলেটর যেটা দরজা থেকে প্রায় ১০ ফুট উপরে। ঘরগুলো লোহার বোল্ট দিয়ে আটকানো। বাইরে থেকে এমনভাবে তালা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল যাতে কোনরকমে ভেতর থেকে বাইরে কেউ হাত না পায়। সেলগুলির সামনে সরু টানা ৪ ফুট চওড়া বারান্দা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। মোট ৬৯৩ টি সেল। একটি সেলে একজন বন্দিকে রাখা হত। ছোট ছোট খাঁচার মত সেল বা প্রকোষ্ঠ ছাড়া কোন ডরমেটরি নেই। এত সেলের জন্য এর নামকরণ হয়েছিল ‘সেলুলার জেল’। জেলের এই ছোট খুপরিগুলিতে কীরকম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমাদের বিপ্লবীরা বছরের পর বছর দিনযাপন করেছেন তা অনুমান করে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠল। জেলটি অনেকগুলি খন্ডে বিভক্ত ছিল। বন্দিরা যাতে একে অপরের সাথে কথা বলতে না পারে, একে অন্যকে দেখতে না পায় তার জন্য প্রতিটি খন্ডের সামনের দিকে ছিল অন্য খন্ডের পেছন দিক।

সেলের মধ্যে প্রাতঃকৃত্যের কোন ব্যবস্থা ছিল না। বন্দিদের অনেকক্ষণ ধরে প্রাকৃতিক কাজগুলিকে চেপে রাখতে হত। দিনের বেলায় নির্ধারিত সময়ে তাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হত। সকাল ৬টায় বার করা হত এবং বিকাল ৫টায় সেলে বন্ধ করে দেওয়া হত। রাতে প্রস্রাব করার জন্য মাটির পাত্র মতন কিছু একটা দেওয়া হত। ছোট একটি পাত্রে জল দেওয়া হত। পাত্র এত ছোট থাকত যে কেউ রাতে কোন প্রাকৃতিক কাজও সারতে পারত না। চূড়ান্ত শারীরিক শ্রম, কম খাবার, পোশাক, সময় সময় চাবুক মারার মত নির্মম অত্যাচার তো ছিলই। ১৯৪২ এর ২৩ শে মার্চ থেকে ১৯৪৫ এর ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত এই দ্বীপপুঞ্জটি জাপানিদের অধীনে ছিল। জাপানীরাও কম অত্যাচারী ছিল না। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস জাপানীদের মিলিটারি রাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। ১৯৪৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নেতাজি আন্দামানকে ‘স্বাধীন স্বরাজ’ ভূমি হিসাবে ঘোষণা করেন। সেলুলার জেলের সব বীর বিপ্লবীদের তিনি মুক্ত করেন। ১৯৪৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর থেকে মাত্র তিন দিনের জন্য নেতাজি আন্দামানে ছিলেন।

এই জেলের দ্বিতীয় তলায় ঠিক কেন্দ্রীয় টাওয়ারের নীচে জেলের আরো একটি মডেল আছে। এখানের দেওয়ালে ৩৩৬ জন বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ১৩টি নামের ফলক আছে। যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই বাঙালি। ১৯০৬ সালে যখন এই জেলের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় তখন এই জেলে তিনতলা প্রাসাদের ৭টি খণ্ড ছিল। ১৯৪১ সালের ভূমিকম্প এবং তারপর জাপানের আক্রমণ ও অধিগ্রহণের জেরে এই জেলের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। জেলের ৭টি খণ্ডের মধ্যে ৪টি খণ্ড ভেঙে ফেলা হয়। এখন তাই ৩টি খণ্ড নিয়ে এই জেল দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি খণ্ড কেন্দ্রীয় টাওয়ার থেকে স্টার ফিশের হাতের মত বেরিয়েছে। ৪টি খণ্ডের ভাঙা জায়গায় স্বাধীনতার পরে জি.বি. হাসপাতাল নির্মাণ হয়েছে। এটি এখানকার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল।

পুরো সেলের রং বেগুনে-বাদামী। সেলের তৃতীয় তলার রং অন্যান্য তলার রং-এর থেকে আলাদা। এই তলার রং সাদা। জেলের ছাদের মাঝখানে সেন্ট্রাল টাওয়ার। ৩টি খণ্ডের করিডরে ২১ জন সান্ত্রী পালা করে পাহারা দিত। এছাড়াও কেন্দ্রীয় টাওয়ার থেকে বন্দিদের ওপর নজর রাখা হত। ছাদ থেকে দূরে সমুদ্রের মাঝে রস ও নর্থ বে দ্বীপ দুটি দেখা যায়।

সেলুলার জেল দেখার পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম করবিনস্‌ কোভ বিচ এর উদ্দেশে। রাস্তার মাঝে দেখতে পেলাম Flag point। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস এখানে ত্রিবর্ণরঞ্জিত ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। এখানে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় ‘জয় হিন্দ’ কথাটি লেখা আছে। Flag point এর কাছেই শ্রী আলাইকাদাল আয়ানমান মন্দির। Flag point ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম করবিনস্‌ কোভ বিচ এর দিকে। এটি পোর্টব্লেয়ার থেকে ৭ কিমি. দূরে সুন্দর একটি সমুদ্র সৈকত।

corbyn's cove beach

এখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে সমুদ্রের অপরূপ শোভা উপভোগ করলাম, ডাবের জল খেলাম। তারপর চা ও বিকেলের টিফিন সেরে রাতে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য আবার সেলুলার জেলের সামনে হাজির হলাম।

Cellular Jail at night

রাতের অন্ধকারে জেলের সামনে নানা রঙের আলোর ঝলকানি মনকে মোহিত করল। জেলের ঠিক উল্টোদিকে বীর সাভারকর পার্ক। এখানে ৬ জন শহিদের পাথরের মূর্তি রয়েছে- ইন্দুভূষণ রায়, পন্ডিত রামরক্ষা, বাবা ভান সিং, মোহিত মৈত্র, মহাবীর সিং এবং সাভারকর। নির্দিষ্ট সময়ে লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য জেলের ভিতরে প্রবেশ করলাম। কীভাবে এই দ্বীপে প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল, কীভাবে ব্রিটিশরা এই দ্বীপ দখল করে, বিপ্লবীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য কীভাবে এই জেলের প্রতিষ্ঠা, বন্দিদের উপর জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক অত্যাচারের কাহিনী – এই শো-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। জেলের কুঠুরির ভিতর বন্দিদের আর্তনাদ, প্রতিটি বেত্রাঘাতের সাথে তাঁদের ‘বন্দেমাতরম’ চিৎকার শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে কখন যে চোখের কোণ জলে ভিজে গেছে বুঝতে পারিনি। বিষণ্ণ মনে জেলের বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে করে হোটেলে ফিরে এলাম।

এই লাইট এন্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য অনলাইনে টিকিট বুক করা যায়। আমরা অনলাইনে আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিলাম। টিকিটের মূল্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা। প্রতিদিন তিনটি করে শো হয়-সন্ধ্যা ৫-৫০, ৬-৫০ এবং ৭-৫০এ।

দ্বিতীয় দিন

আজ আমরা যাব মায়াবন্দর। পোর্ট ব্লেয়ারের হোটেল থেকে ভোর ভোর সাড়ে তিনটেয় বেরিয়ে পড়লাম জিরকাটাং চেকপোস্টের উদ্দেশে। ভোরের আলো ফোটার আগে ৪৮ কিমি. রাস্তা পার হয়ে এক ঘন্টা পর ভোর সাড়ে চারটেয় জিরকাটাং চেকপোস্টে পৌঁছে গেলাম। আমাদের গাড়ি জিরকাটাং-এ গিয়ে অন্য গাড়ির লম্বা লাইনের পেছনে দাঁড়ালো। লাইনে সামনের দিকে বাস, তার পেছনে প্রাইভেট গাড়ি, সবার শেষে ট্রাক, লরি – এভাবে সব গাড়ি দাঁড়িয়েছিল।

Jirkatang Check Post

এখান থেকে দিনে চারবার সকাল ছটা, সাড়ে নটা, দুপুর সাড়ে বারোটা এবং বিকেল তিনটেয় কনভয় করে পুলিশ পাহারায় গাড়িগুলিকে জারোয়াদের জন্য সংরক্ষিত এলাকার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের ড্রাইভার একটি এন্ট্রি ফর্ম ফিলাপ করার জন্য আমাদের হাতে দিল। আধার কার্ডের নাম্বার, নাম, বয়স, মেল / ফিমেল লিখে ফরম পূরণ করে চেকপোস্টের কাউন্টার থেকে এন্ট্রি পাস করানো হলো। এখানে বেশ কিছু দোকান ও খাবার জায়গা আছে। আমরা সকালের টিফিন করে নিলাম। এন্ট্রির কাজ সম্পন্ন করে আমাদের গাড়ি ভোর ছ-টার কনভয়ে জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্টে প্রবেশ করল। জঙ্গলের বুক চিরে দক্ষিণ আন্দামান থেকে মধ্য আন্দামান হয়ে উত্তর আন্দামানের সংযোগকারী আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড চলে গেছে বারাটাং। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ। প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক গাড়ি চলে এই রাস্তায়। এই রাস্তায় গাড়ি চলাচলের কিছু নিয়ম আছে। গাড়ির গতি প্রতি ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার এর মধ্যে রাখতে হবে, কোন কারণেই গাড়ি থামানো যাবে না; গাড়ি থেকে নামা যাবে না; ফটো তোলা বা ভিডিও করা যাবে না। মোবাইল বা ক্যামেরা বাইরে রাখা যাবে না। একটি গাড়ি অন্য গাড়িকে ওভারটেক করতে পারবে না। হর্ন বাজাতে পারবে না। জারোয়াদের খাবার দেওয়া, ছবি তোলা বা তাদের দিকে কোন আকার ইঙ্গিত করা যাবে না। এগুলি অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অমান্য করলে দশ বছরের কারাবাস এবং দশ হাজার টাকা জরিমানা বা দুটোই হতে পারে। জারোয়া অধ্যুষিত ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গাড়ি এগোতে থাকলো। রাস্তার দু-দিকে হাজার হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা গর্জন, বাদাম ও শিমুল গাছের জঙ্গল; যেমন তার গঠন তেমনি তার উচ্চতা আর শক্তি। হঠাৎ আমাদের ড্রাইভার ভাই বলল, “বলুন তো স্যর, এখানে গাছগুলি না বেঁকে সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে কেন?” হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে আমি কি উত্তর দেবো ভাবছি, ড্রাইভার ভাই উত্তরের অপেক্ষা না করে হাসতে হাসতে বলল, “এখানে জঙ্গল এত ঘন যে পাশে কোন খালি জায়গা না পেয়ে গাছগুলি সোজা উপরের দিকে উঠে গেছে।” আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাছেদের কথোপকথন শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছি আর সন্ধানী চোখ দিয়ে জারোয়া খোঁজার চেষ্টা করছি। আধুনিকতার আলো থেকে দূরে আন্দামানের এই জঙ্গলে জারোয়া গোষ্ঠীর প্রায় ৪০০ জন বাস করে। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে জারোয়াদের দেখা না পেয়ে মন খুব খারাপ, হাল প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। হঠাৎ ড্রাইভার ভাই বলে উঠলো, “সামনে দেখুন, জারোয়া।” তাকিয়ে দেখি এক জারোয়া দম্পতি গাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষটির হাতে ধনুক, পিঠে তূণীরে রাখা তির। আগের মত ভয়ংকর বা আক্রমণাত্মক মনোভাব এখন আর নেই। আগের মত নগ্ন অবস্থায় দেখা যায় না। সভ্যতার ছোঁয়াতে ওরাও এখন পোশাক পরে। ড্রাইভার ভাই জানালো, আজকাল বিভিন্ন এন.জি.ওর তরফে এদের শিক্ষিত করার কাজ চলছে। এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রতি সপ্তাহে একবার করে চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয়। জারোয়া শিশুদের জন্য বিদ্যালয় আছে। জঙ্গল দিয়ে যাওয়ার সময় ড্রাইভার ভাই ইশারা করে আমাদের স্কুলটি দেখালো। আরো কিছুক্ষণ যাওয়ার পর হঠাৎ দেখি উল্টো দিক থেকে একটি লরি আসছে। ড্রাইভার ভাই আস্তে আস্তে বলল, “লরিটার পেছনের দিকে তাকাবেন”। তাকিয়ে দেখি লরির পেছনে প্রায় জনা তিরিশেক জারোয়া মুখে একরকম আওয়াজ করতে করতে পাশ দিয়ে চলে গেল। ড্রাইভার ভাই বলল, “লরির ড্রাইভারদের সাথে এদের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, লরির ড্রাইভাররা এদের মদ ও খাবার দেয়; বিনিময়ে এরা কাঁকড়া, শূকরের মাংস ড্রাইভারদের এনে দেয়। এরা হাত দেখিয়ে লরি থামায়, তারপর লরিতে চেপে বসে। নামার সময় হলে লরির গায়ে হাত দিয়ে চাপড়াতে থাকে। ড্রাইভার গাড়ি থামালে সবাই নেমে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যায়।”

Towards Limestone Cave

জঙ্গলের শেষে দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপ। প্রায় দু’ঘন্টা পর পৌঁছালাম ‘মিডল্‌ স্ট্রেট’ জেটি। সামনে দু’টি দ্বীপের মাঝে বিশাল চওড়া খাঁড়ি-‘মিডল্‌ স্ট্রেট’। এই খাঁড়িতে একমাত্র ভেসেলের মাধ্যমে যাতায়াত করা যায়। মানুষ, গাড়ি সব এই ভেসেলের মাধ্যমে পারাপার হয়। বিশাল ভেসেল দু’টি বাস, চারটি সুমো গাড়ি সহ প্রায় শ’খানেক মানুষ পেটে পুরে খাঁড়ি পার হয়ে ওপারে মিডল্‌ আন্দামান দ্বীপের বারাটাং জেটির দিকে পাড়ি দিল। মিডল্‌ স্ট্রেট জেটিতে ফটো তোলা বারণ। ভেসেলে ওঠার পর কিছুটা দূরে গিয়ে ভেসেল থেকে জেটির ছবি তুললাম। ধীরে ধীরে ভেসেল এগিয়ে চলল বারাটাং জেটির দিকে। যাত্রাপথে বারাটাং জেটি থেকে একটি ভেসেলকে মিডল্‌ স্ট্রেট জেটির দিকে আসতে দেখলাম। একটু দূরে এই খাঁড়ির উপর নতুন ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে দেখতে পেলাম। আমরা পৌঁছে গেলাম বারাটাং জেটিতে। মানুষ, গাড়ি ধীরে ধীরে ভেসেল থেকে জেটিতে নেমে গেল। সামনে বাঁদিকে সারি সারি স্পীডবোট দেখতে পেলাম। এখান থেকে স্পীডবোটে করে যেতে হয় চুনাপাথরের গুহা বা লাইনস্টোন কেভ-এ। আমাদের টিকিট আগে থেকে কাটা ছিল। টিকিট জনপ্রতি ৮০০ টাকা। লাইফ জ্যাকেট করে স্পীডবোটে উঠে পড়লাম চুনা পাথরের গুহা দেখতে যাওয়ার জন্য। খাঁড়ির জল কেটে সশব্দে এগিয়ে চলল আমাদের স্পিড বোট। প্রতি বোটে ১০ জন করে। বোটের ছেলেটি আমাদের গাইড। দু-ধারে ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ অরণ্য, তার মধ্য দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের স্পীডবোট। আমাদের বোটের নাম ছিল ‘মিভান’।

ম্যানগ্রোভের গাছগুলি যেন জলের উপর ঝুঁকে পড়েছে। মাঝে মাঝে সরু খাঁড়ি জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেছে। মিনিট কুড়ি জলবিহারের পর বাঁদিকে সরু খাঁড়ি দিয়ে বোটটি জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল। এতটাই সরু যে একবারে একটাই বোট যেতে পারে। দু-দিকে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধতা ভেঙে দু’একটা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, সে এক অপরূপ দৃশ্য। গাছ কেটে বানানো একটা ছোট জেটির সামনে বোটটি থামল। সামনে দ্বীপের একজন রক্ষী দাঁড়িয়েছিল।

বোট থেকে কয়েক ধাপ উঠে দেখলাম কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি সরু ব্রিজ ম্যানগ্রোভের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে চলে গেছে। এখান থেকে গুহা দেড় কিলোমিটার হাঁটা পথ। ব্রিজের দু’পাশে সুন্দরী, গরান গাছের জঙ্গল ও মাটির উপর উঠে থাকা তাদের শ্বাসমূল। মাঝে মাঝে পর্যটকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছোট ছোট কুটির আছে। কিছুক্ষণ চলার পর দেখলাম জঙ্গল ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে, সামনে জঙ্গল সুরক্ষা এবং পর্যটকদের জন্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ই মার্চ উদ্বোধন হলেও এটি এখনো চালু হয়নি। সামনে সবুজ ক্ষেত। মাঠে গরু, ছাগল চরছে। এটি একটি ছোট গ্রাম নাম ‘নয়া ডেরা’, মানে ‘নতুন বসতি’। আমাদের সাথে আসা বোটের ছেলেটি আমাদের গাইড হিসাবে কাজ করছে। ওর কাছে জানতে পারলাম এই গ্রামে ছোট ছোট কয়েকটি বাড়ি আছে। এরা মূলত মাঠে চাষ-বাস করে। এছাড়াও গবাদি পশু, হাঁস, মুরগি পালন করে। এখানে আটটি পরিবার, ৪০/৪৫ জন মানুষ বসবাস করে। জেটিতে আসার সময় জেনেছিলাম এই দ্বীপের আরেকটি নাম হলো রাঁচিওয়ালা দ্বীপ। উনিশ শতকের শেষের দিকে রাঁচি শহরে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। তখন স্থানীয় লোকেদের অনেকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে মিশনারিদের কাছে আশ্রয় চেয়েছিল। ব্রিটিশরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বনাঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উপলব্ধি করে এই ধর্মান্তরিতদের ফসল চাষের জন্য বারাটাং দ্বীপে পাঠিয়ে দেয়। রাঁচি থেকে আসা শ্রমিকরা এখানে বসতি স্থাপন করে নতুন ভাবে জীবনযাপন করতে থাকে।

Inside the Limestone Cave

কিছুটা এগিয়ে বেশ কিছু লেবুর শরবত এর দোকান দেখতে পেলাম। ঠিক করলাম গুহা দেখে ফেরার পথে এখানে শরবত পান করব। খানিক পাথুরে চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম চুনাপাথরের গুহায়। গাইড তার হাতের ব্যাটারি লাইটের সাহায্যে পথ দেখিয়ে গুহার মধ্যে নিয়ে চলল। গুহার মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্ট্যালাক্টাইট ও স্ট্যালাক্মাইট পাথর দিয়ে সৃষ্ট এই গুহা। পাথরের ফাটল দিয়ে জল চুঁইয়ে চুনাপাথরের উপর পড়ে গুহার ভিতরে নানা প্রাকৃতিক ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। মানুষের কল্পনার সাথে মিশে তা কোথাও হাতির মাথা, কোথাও বাঘের থাবা, শঙ্খ, গণেশ বা অন্য মূর্তির অবয়ব। এসব কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা প্রকৃতি। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি সুনিপুণ হাতে এই শিল্পকলা গড়ে তুলেছে। গুহা দেখা শেষ করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শরবতের দোকানের সামনে এলাম। সাতটি লেবুর শরবত এর দোকান। শরবতে চুমুক দিতে দিতে ওদের সাথে কথা বলে ইতিহাস জানার চেষ্টা করলাম। সাতটি পরিবারের লোকজন বিশেষ করে পরিবারের মহিলারা এখানে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে পর্যটকদের জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে বিক্রি করে। দাম গ্লাস প্রতি ৩০ টাকা।

Lemon Juice Shop

এতে ওদের কিছু রোজগার হয় আর পর্যটকদের ক্লান্তি দূর হয়। আটটি পরিবার কিন্তু এখানে সাতটি দোকান কেন? জানতে পারলাম একটি পরিবার একটু সচ্ছল তারা দোকান দেয়নি। এরা সব ঝাড়খণ্ডের অধিবাসী। এরাই প্রথম পুরুষ যারা আন্দামানের আধিকারিকদের কাছ থেকে এখানে বসবাসের অনুমতি পেয়েছে। কাছাকাছি কোন দোকান নাই, সব কিছুর জন্য এদের বারাটাং যেতে হয়, নাহলে পোর্ট ব্লেয়ার। বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ বা চিকিৎসার জন্য বারাটাং সবথেকে কাছের সদর। যাতায়াতের জন্য স্পিড বোট ছাড়া অন্য কোন যানবাহন নেই। ওখান থেকে আবার পাথরের এবড়ো খেবড়ো রাস্তা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছোট জেটিতে পৌঁছলাম। সেখান থেকে স্পিড বোটে করে খাঁড়ি পেরিয়ে বারাটাং জেটিতে ফিরে এলাম। ওখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে ডাবের জল খেয়ে গাড়িতে করে মাড ভলকানো বা কাদার আগ্নেয়গিরি দেখতে চললাম। হেঁটে বেশ কিছুটা চড়াই ভেঙে উপরে উঠলাম। ফেটে যাওয়া মাটি থেকে তরল কাদা বুদবুদ করে বেরোচ্ছে। এটি একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। এখানে সেরকম কিছু দেখার ছিল না। মাড ভলকানো দেখে কাদার ঢিবি ছাড়া কিছু মনে হলো না।

Mud Volcano Entrance

গাড়ি ছুটে চলল আমকুঞ্জ বিচের দিকে। মাঝে পড়ল হামফ্রে ব্রিজ। এই ব্রিজের নীচে খাঁড়ি দিয়ে আগে ভেসেল চলত। ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে এই সুন্দর ব্রিজটি চালু হয়েছে। হামফ্রে ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি ছুটে চলল আমকুঞ্জ বিচের দিকে, মাঝে কদমতলাতে লাঞ্চ সেরে নিলাম। রঙ্গত থেকে মায়া বন্দরের পথে আরও একটি জারোয়া অধ্যুষিত এলাকা রয়েছে।

Humphrey Bridge

তবে এখানে কোন বাধা নিষেধ নেই। এখানের জারোয়ারা সভ্য সমাজের সাথে প্রায় মিশে গেছে। কদমতলা থেকে কৌশল্যানগরের মধ্যে তিন নম্বর এবং ১৫ নম্বর গেটের মাঝে ফুলতলা নামে একটি অঞ্চলে কিছু বাঙালি পরিবার বাস করে, জারোয়ারা খাবার সংগ্রহের জন্য মাঝেমাঝে এই বাঙালি পরিবারগুলির কাছে আসে। খাবারের বিনিময়ে তারা এই পরিবারগুলিকে মাংস ও কাঁকড়া দিয়ে যায়। কৌশল্যানগর ও মোহনপুরে জলের খুব অভাব। এখানে প্রতিটি বাড়ির সামনে জলের ড্রাম বসানো আছে। গাড়িতে করে এখানে জল সরবরাহ করা হয়। ড্রাইভার ভাই আগে বলে দিয়েছিল যে আন্দামানে একমাত্র আমকুঞ্জ বিচে সবচেয়ে সস্তায় ডাব পাওয়া যায়। দুপুর আড়াইটে নাগাদ আমকুঞ্জ বিচে পৌঁছে গেলাম। দুধের মত সাদা ছোট ছোট ঢেউ ফেনিল হয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে। বেলাভূমির সাদা বালির উপর রোদ পড়ে চিক্‌চিক্‌ করছে।

চারিদিকে ছড়ানো ঝিনুক, শামুক, সামুদ্রিক কোরাল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ঘন নীল জলরাশি। ছোট ছোট পাখিরা মাছ ধরে খাচ্ছে। তীরের সামনে কিছু কালো পাথর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, ওখানে আমরা কিছু ছবি তুললাম। বিচ থেকে ফিরে সামনের দোকানে ডাবের জল খেলাম। হলদে রংয়ের কিং ডাবের সুস্বাদু জল খেয়ে এগিয়ে চললাম ধানিনালা বিচের দিকে। বড় বড় সাইজের ডাবের দাম মাত্র ৩০ টাকা। ডাবে এত বেশি পরিমাণে জল ছিল যে আমরা প্রত্যেকে একটা করে ডাবের জলও খেতে পারছিলাম না।

Amkunj Beach

এর পরের গন্তব্য ধানিনালা বিচ। গাড়ি থেকে নেমে গহন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের স্তব্ধ নিশ্ছিদ্র ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে প্রায় ৭১৩ মিটার লম্বা কাঠের ব্রিজ অতিক্রম করে ধানিনালা বিচে পৌঁছে গেলাম।

Dhani Nallah Beach

ব্রিজের মাঝে মাঝে বিশ্রামের জন্য ছোট ছোট কুটির আছে, বসার জায়গা রয়েছে। সমুদ্রের তীরে সারি সারি বড় বড় গাছ, বিচ থেকে সমুদ্রের অপরূপ শোভা দেখলাম। ওখান থেকে আমরা চললাম মায়াবন্দরের দিকে। রাস্তার ডানদিকে টিলার মত ছোট ছোট পাহাড় যেন প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের আস্তানা হোটেল ব্লু বার্ড এ। হোটেল থেকে পেছনের খাঁড়িতে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখলাম। হোটেলে রাত কাটিয়ে কাল আমরা রওনা দেব ডিগলিপুরের উদ্দেশে রস ও স্মিথ আইল্যান্ড দেখার জন্য।

তৃতীয় দিন

আজ আমাদের আন্দামান ভ্রমণের তৃতীয় দিন। ভোর সাড়ে তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। রেডি হয়ে সকাল ৫ টায় মায়াবন্দর থেকে ডিগলিপুরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। প্রায় দু-ঘণ্টা পর আমরা ডিগলিপুর পৌঁছে গেলাম। ড্রাইভার ভাইকে বলে রেখেছিলাম আমরা মোহনপুরে হীরা হোটেলে ব্রেকফাস্ট করব। হীরা হোটেল ডিগলিপুরের একটি নামকরা বাঙালি হোটেল। এখানে পরোটা, ঘুগনি সহযোগে প্রাতরাশ সারলাম। রস এন্ড স্মিথ আইল্যান্ড দেখে ফেরার সময় এখানে দুপুরের খাবার খাব, সেইমত খাবারের অর্ডার দিয়ে এরিয়াল বে জেটির দিকে রওনা দিলাম। সকাল ন-টায় জেটিতে পৌঁছে গেলাম। এরিয়াল বে জেটির কাছে রস এন্ড স্মিথ আইল্যান্ডে যাওয়ার পারমিট কাউন্টার আছে।

Permit Counter

সকাল সাতটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত এই কাউন্টার খোলা থাকে। এখানে আই কার্ড দেখিয়ে মাথাপিছু পাঁচ টাকা দিয়ে এন্ট্রি পাস সংগ্রহ করলাম। দ্বীপে যাওয়ার জন্য স্পিড বোট এখান থেকে বুক করতে হয়, বুকিং চার্জ মাথাপিছু এক হাজার টাকা। এখানে ৬ সিট ও ১০ সিটের বোট আছে। আমরা যখন জেটিতে পৌঁছাই তখন অন্য কোন পর্যটক ছিল না। তাই আমরা ৬ সিটের একটি বোট ৬০০০ টাকা দিয়ে বুক করে নিলাম। এরপর ওয়াক ওয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলাম স্পিড বোটের কাছে। লাইফ জ্যাকেট করে বোটে উঠে বসলাম।

Speed Boat

ঘন নীল সমুদ্রের জল কেটে আমাদের স্পিডবোট এগিয়ে চলল স্বপ্নের জমজ দ্বীপ রস ও স্মিথের দিকে। আমাদের বোটের নাম ছিল ‘দীপ’। সমুদ্রের দু-পাশে ছোট ছোট বেশ কিছু দ্বীপ দেখতে পেলাম। মিনিট কুড়ি জল বিহারের পর ধীরে ধীরে সামনে যমজ দ্বীপ এবং তাদের মাঝে প্রাকৃতিক বালুর চর দৃশ্যায়মান হল। বাঁদিকে স্মিথ আর ডানদিকে রস। বালুচরের সামনে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার সমুদ্রের জল। বোট থেকে নেমে বেশ খানিক পথ হালকা জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের দ্বীপপুঞ্জের সামনে। রস ও স্মিথ যমজ দুটি দ্বীপ একটি পাতলা ৫০ মিটার লম্বা প্রাকৃতিক বালির চর দ্বারা সংযুক্ত। কুমারী সৈকত, ফিরোজা নীলজল, গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন, বালির উপর হেঁটে বেড়ানো হারমিট ক্রাব – অপূর্ব সব দৃশ্য। রস আইল্যান্ড আকারে স্মিথ আইল্যান্ডের থেকে ছোট, জঙ্গল ও জীব বৈচিত্রপূর্ণ কিন্তু মানুষের বসতি নেই। স্মিথে মানুষের কলরব বেশি। প্রথমে স্মিথে গিয়ে জনপ্রতি ৭৫ টাকা দিয়ে রসে যাওয়ার ছাড়পত্র নিতে হয়। বন বিভাগের কর্মীর কাছে জানতে পারলাম ওখানে দেখার কিছু নেই তাই আমরা স্মিথেই বাকি সময়টা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

স্মিথ দ্বীপে তিনটি পরিবার বসবাস করেন, ১০-১২ জন থাকেন সবাই বন বিভাগের কর্মী। কথা বলে জানতে পারলাম এই নির্জন দ্বীপেই ওঁরা থাকেন। স্পিড বোটের চালকদের মারফত ডিগলিপুর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনিয়ে নেন। বন বিভাগের নিজস্ব বোট আছে প্রয়োজনে তাতে করেও যাতায়াত করেন। একটি ছোট দোকান আছে সেখানে চা, বিস্কুট, কোল ড্রিঙ্কস, পানীয় জলের বোতল ও চিপস পাওয়া যায়। এঁদের বাড়ির পেছনের দিকে ঘন জঙ্গল; এই জঙ্গলে কিছু হরিণ আছে। মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। আমরা জেনে গিয়েছিলাম সাগর বক্ষে জোয়ার এলে সমুদ্রের জলরাশি এই দুটি দ্বীপকে পৃথক করে দেয়, ভাটার সময় এদের মাঝে জেগে ওঠে এই একাকী বালুরচর যা রসের সাথে স্মিথকে সংযুক্ত করে দেয়। এঁদের কাছে জানতে পারলাম অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় এই বালুচর সমুদ্রের জলের তলায় চলে যায়; জোয়ার-ভাটায় কিছু হয় না। স্মিথ দ্বীপে সমুদ্রের জলে স্নান করা যায়। পর্যটকরা এখানে এসে সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমরা অবশ্য এখানে স্নান করলাম না। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এখানে সাধারণের বসার জায়গা, সমুদ্র স্নানের পর সাধারণ স্নানের জায়গা, পোশাক বদলানোর জায়গা, বিশ্রামের জন্য ছোট ছোট কুটির – সব আছে। এখানে বেশ সুন্দর নজর মিনার ও একটি গাছ বাড়ি আছে। নারকেল গাছগুলি সারিবদ্ধ ভাবে সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে; কানে কানে কি যেন কথা বলছে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। কোথা দিয়ে যে তিন ঘন্টা কেটে গেল বুঝতে পারলাম না। আমরা আবিষ্ট ও মুগ্ধ হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম।

Rose and Smith Island

আমার ছেলে ‘আকাশ’ এই বালুচরে ঘুরতে ঘুরতে সুন্দর দুটি শঙ্খ ও একটি সী সেল কুড়িয়ে পেয়েছিল। বুকের ভেতর গভীর বেদনার অনুভূতি চেপে রস ও স্মিথকে বিদায় জানিয়ে স্পিডবোটে চড়ে এরিয়াল বে জেটির দিকে রওনা দিলাম। ওখান থেকে ফিরে হীরা হোটেলে গেলাম লাঞ্চ সারতে। কাঁকড়া ও পারশে মাছের ঝাল, ভাত, ডাল, তরকারি, ভাজা, চাটনি, পাঁপড় সহযোগে তৃপ্তি ভরে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। কাঁকড়া ঝালের প্লেট ৩০০ টাকা করে। অপূর্ব স্বাদ! না খেলে বোঝা যাবে না। এত সুস্বাদু রান্নার স্বাদ ভোলার নয়। ডিগলিপুর এলে এই হোটেলে লাঞ্চ করতে ভুলবেন না। খাওয়া দাওয়া সেরে রওনা দিলাম রঙ্গতের উদ্দেশে। রঙ্গতে ঢোকার আগে আরেকটি সুন্দর বিচ দেখে নিলাম। ‘পঞ্চবটি সি বিচ’ – পার্কের মতো সাজানো বিচে কালো কালো পাথরের সারি। পাথরের মাথায় চড়ে বেশ কিছু ছবি তুললাম।

Panchwati Sea Beach

এবার মরিচ ডেরা বিচকে পাশ কাটিয়ে আবার গেলাম আমকুঞ্জ বিচে। সস্তায় ডাব খাওয়ার লোভ ছাড়তে পারলাম না। শুধুমাত্র সুস্বাদু ডাবের জল তো নয় তার সাথে ফ্রি ডাবের শাঁস। দুটি দোকান আছে সবাই বাঙালি। এঁদের অনুরোধ করলে সুন্দরভাবে ডাবের শাঁস ডাবের খোলা থেকে তুলে দেন। একটা ডাব খেলেই পেট ভরে যায়। টিফিন খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এই বিচে আমার ছেলে ‘আকাশ’ একটি সুন্দর কোরাল দেখতে পেল। এগুলি সংগ্রহ করা যায় না, আইনত দণ্ডনীয়। আমকুঞ্জ বিচ থেকে সোজা চলে এলাম আমাদের আজকের আস্তানা হোটেল প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল-এ। হোটেলের রুমে ঢুকে জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম রঙ্গতের বাসন্তী পুজো দেখতে। বাসন্তী পূজা উপলক্ষে এখানে বিশাল মেলা বসেছিল। জনসমাগম বেশ ভালই হয়েছিল।

রকমারি নানা জিনিসের স্টলের সাথে খাবারের প্রচুর স্টল ছিল। আমরা এখানে স্থানীয় খাবার ঢাকাই পুরি চাট, পরোটা, ঘুগনি ও বোঁদে দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। পুজো প্যান্ডেলে নাচ ও গানের আসর বসেছিল, খেতে খেতে ওখানের অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম। এখানে সবাই বাঙালি। এত দূরে এসে সম্পূর্ণ বাঙালি পরিবেশে বাঙালি পুজোর অনুষ্ঠান দেখে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। হোটেলে ফিরে এলাম, পরের দিন এখান থেকে রওনা দেব পোর্ট ব্লেয়ারের উদ্দেশ্যে।

চতুর্থ দিন

আজ আমাদের আন্দামান ভ্রমণের চতুর্থ দিন। আজ আমরা রঙ্গত থেকে পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরব। ভোর পাঁচটায় রঙ্গত থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। দু’দিকে ঘন সবুজ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল। এখানে গাছগুলি সোজা খাঁড়া হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে, ডালপালা বিশেষ একটা নাই। রাস্তার দু-পাশে ছোট তালগাছের মতো কিছু গাছ দেখতে পেলাম। স্থানীয়রা এগুলিকে টোকা গাছ বলে। এই টোকা গাছের পাতা দিয়ে জারোয়ারা বাড়ির ছাউনি বানায়। এখানে আমরা যত কটেজ দেখেছি সেগুলির সবার মাথায় টোকা পাতার ছাউনি ছিল। মাঝে একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা চোখে পড়ল; নাম ফেরারগঞ্জ। এখান থেকে পোর্ট ব্লেয়ার ৩৩ কিলোমিটার। স্থানীয় অধিবাসীরা হাতে নারকেল গাছের পাতা নিয়ে লাইন করে ধর্মস্থানের দিকে চলেছে কোন এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। এরপর আবার সেই হাম ফ্রে ব্রিজ দেখতে পেলাম। গান্ধীঘাট জেটি ও উত্তরা জেটির মধ্যে এই সুন্দর ব্রিজটি অবস্থিত। মাঝে কদমতলায় প্রাতরাশ সেরে নিলাম। ঘন জঙ্গলের মাঝে মাঝে কিছু গ্রাম গড়ে উঠেছে, যেমন- কৌশল্যানগর, মোহনপুর। কদমতলা থেকে কৌশল্যানগরের মধ্যে ৩ নম্বর ও ১৫ নম্বর গেটের মাঝে ফুলতলা নামে একটি গ্রাম আছে। এই গ্রামে বেশ কিছু বাঙালি পরিবার বসবাস করে। এখানে জলের খুব অভাব। প্রতিটি বাড়ির সামনে জলের ড্রাম বসানো আছে। সরকারি গাড়ি করে এই ড্রামে জল ভর্তি করে দেয়া হয়। এই জঙ্গলেও কিছু জারোয়া বসবাস করে। এরা খাবার সংগ্রহ করতে মাঝে মাঝে এই বাঙালি পরিবার গুলির কাছে আসে। খাবারের বিনিময়ে এরা কাঁকড়া, শূকরের মাংস এই বাঙালি পরিবারগুলিকে এনে দেয়। এরা সভ্য জগতের সাথে অনেকটাই মিশে গিয়েছে। এই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোন বাধা- নিষেধ নাই।

Baratang Jeti

সকাল ৮ টায় বারাটাং জেটিতে পৌঁছে গেলাম। ওপারে জারোয়া অধ্যুষিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য সকাল সাড়ে ন-টায় গেট খুলবে। হাতে সময় থাকার জন্য বারাটাং জেটির কাছে একটি মিউজিয়াম-এ চলে গেলাম। এটি জারোয়াদের জীবন কাহিনী এবং আন্দামানের ইতিহাসের একটি ছোট সংগ্রহশালা। এখানে লাইমস্টোন কেভ-এর একটি ছোট প্রতিকৃতি রয়েছে। আমার স্ত্রী ও মেয়ে লাইমস্টোন কেভ দেখতে যেতে পারেনি। তাই দুধের স্বাদ এখানে ঘোলে মিটিয়ে নিল। আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম। সামনে খাঁড়ির কিছু ছবি তুললাম। জেটি থেকে একটু দূরে দেখতে পেলাম এই খাঁড়ির উপর নতুন ব্রিজ তৈরির কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এখানেও হাম ফ্রে ব্রীজের মত সুন্দর একটি ব্রিজ নির্মাণ হয়ে যাবে। খাঁড়ির সামনে ডানদিকে সারি সারি স্পিড বোট দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে লাইমস্টোন কেভ দেখার জন্য স্পিড বোট ছাড়ে। দূরে মিডিল স্ট্রেট জেটি থেকে একটি ভেসেলকে আসতে দেখলাম। ওই ভেসেলে চড়ে আমরা বারাটাং জেটি যাব। ভেসেলের ডেকের মধ্যে একটি সরকারি বাস, একটি প্রাইভেট বাস এবং চারটি প্রাইভেট গাড়ি ছিল। ভেসেলটি খালি হতেই আমরা উঠে পড়লাম। সিঁড়ি দিয়ে একেবারে ভেসেলের মাথায় চড়ে বসলাম। উপর থেকে বেশ কিছু ছবি তুললাম। ভেসেলের ডেকে বসে যাতায়াত করার জন্য একটি ঘর আছে। সাতটি প্রাইভেট কার, একটি বাস এবং যাত্রীদের নিয়ে আমাদের ভেসেলটি এগিয়ে চলল মিডিল স্ট্রেট জেটির দিকে। আমরা বারাটাং জেটিকে বিদায় জানালাম। ভেসেলের পাশ দিয়ে স্পিড বোট গুলি দ্রুতগতিতে লাইমস্টোন কেভ-এর দিকে চলেছে। আমরা ভেসেলের উপর দাঁড়িয়ে খাঁড়ি এবং তার দু-ধারের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করলাম। নিচে ভেসেলের কন্ডাক্টার টিকিট কেটে চলেছেন। এখানে খাঁড়ি পারাপারের জন্য মাথাপিছু ১২ টাকা ভাড়া দিতে হয়। আমরা মিডিল স্ট্রেট জেটিতে পৌঁছে দেখতে পেলাম সারিসারি গাড়ি পারাপারের জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল ৯:৩০-এ গেট খুলবে, তাই এখানে গাছের তলায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রথম কনভয় ৬:৩০ এ চলে গেছে, এর পরের কনভয় সকাল সাড়ে নটায় জারোয়া অধ্যুষিত রাস্তা দিয়ে যাবে। তখন আর কোন ছবি তোলা যাবে না।

জঙ্গলের মধ্যে রাস্তার মাঝে পোটাটং নামে একটি জায়গায় টিলার উপরে জারোয়াদের বাড়ি লক্ষ্য করলাম। এখানে জারোয়াদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্কুল বাড়ি দেখতে পেলাম। দুপুর ১২:৩০ এ পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছে কিছু মার্কেটিং করে বাসস্ট্যান্ডের কাছে ‘হোটেল কলকাতা’ নামে একটি বাঙালি হোটেলে লাঞ্চ করলাম। দুপুর ১:৪৫ নাগাদ হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যে ৬:৩০ এ বেরিয়ে পড়লাম মেরিনা পার্ক ঘুরে দেখার জন্য। এটি একটি সুন্দর সাজানো গোছানো পার্ক। রাতের আলোতে খুব সুন্দর লাগছিল। এখানে নেতাজির একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি রয়েছে। প্রায় দু-ঘণ্টা পার্কে ছিলাম। ওখান থেকে হোটেলে ফিরে এলাম। আগামীকাল আমাদের গন্তব্য রস অ্যান্ড নর্থ বে আইল্যান্ড।

পঞ্চম দিন

আজ আমাদের আন্দামান ভ্রমণের পঞ্চম দিন। হোটেলে প্রাতরাশ সেরে আমরা রওনা দিলাম রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স-এর দিকে। ওখানে রস ও নর্থ বে দ্বীপে যাওয়ার জন্য স্পিড বোটের টিকিট বুক করতে হয়। জন প্রতি ৭৭০ টাকা। ওখান থেকেই সেমি সাবমেরিনে ভ্রমণের জন্য জন প্রতি ২৫০০ টাকা দিয়ে টিকিট বুক করেছিলাম। আমাদের স্পিড বোটের নাম ছিল ‘Sea Excursion’। জেটিতে পৌঁছে স্পিড বোটে (প্রতি বোটে ১০ জন করে) চড়ে বসলাম। বোট ছুটে চলল রস আইল্যান্ডের দিকে। মাত্র ১৫ মিনিটে রস আইল্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। ২০১৮ সালের ৩০শে নভেম্বর আমাদের প্রধান মন্ত্রী এই দ্বীপটি উৎসর্গ করেছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নামে। সেই থেকে এই দ্বীপের নতুন নাম ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু’ দ্বীপ। দ্বীপে নেমেই ডানদিকে দেখতে পেলাম একটি পুরানো জাপানি বাঙ্কার। এটি একটি পরিকল্পিত সুন্দর গোছানো দ্বীপ। অনায়াসে হেঁটে ঘুরে দেখে নেওয়া যায়। দ্বীপের মধ্যে ব্যাটারি চালিত গাড়ি আছে; ৬ জন সওয়ারি নিয়ে দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেয়। রস আইল্যান্ড ঘুরে দেখার জন্য আমরা ব্যাটারি চালিত গাড়ি বুক করলাম। জন প্রতি ভাড়া নিল ১৬০ টাকা।

NSCB Dweep

দ্বীপটি একটি ছোট পাহাড়ি টিলার মতো। যখন থেকে ডাঃ জেমস্‌ প্যাটিসন ওয়াকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাষ্প চালিত জাহাজ ‘সেমিরা মিস’ চেপে ১৮৫৮ সালের ১০ই মার্চ পোর্ট ব্লেয়ার-এ নেমেছিলেন, তখন থেকে ১৯৪২ সাল অব্দি এই দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশদের অধীনে ছিল।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই দ্বীপে জাপানী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে আবার ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। ব্রিটিশ ও জাপানী সাম্রাজ্যের সময় রস আইল্যান্ড পোর্ট ব্লেয়ারের রাজধানী ছিল। প্রায় পুরো দ্বীপটাই ব্রিটিশ স্থাপত্যে ভরা। বর্তমানে পুরানো প্রাসাদ, বলরুম, সুইমিং পুল, চিফ কমিশনার হাউস, গভরমেন্ট হাউস, হাসপাতাল, বেকারি, প্রেস এবং সেনা ছাউনি গুলি ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি নিয়ে ভগ্নাবশেষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ শাসনকালে এটি ব্রিটিশদের শক্তিগড় ছিল। একটি সভ্য কলোনির জন্য যা যা করা দরকার সব রকম সুবিধা দিয়ে এই দ্বীপকে আত্মনির্ভর করে তোলা হয়েছিল। ধ্বংসাবশেষ ও ঐতিহাসিক পৃষ্ঠভুমির জন্য এই দ্বীপ পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

ব্যাটারি চালিত গাড়ি আমাদের দ্বীপের শীর্ষে টিলার উপরে পৌঁছে দিল। উপর থেকে চারপাশে নীল সমুদ্রের জল আর দু-দিকে দু’টো সবুজ দ্বীপ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। ওখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে লাইট হাউস দেখে নিলাম। ওখান থেকে ফিরে আবার গাড়ি ধরলাম। ফেরার পথে প্রচুর হরিণ দেখতে পেলাম। মাঝে কিছু ময়ূর দেখতে পেলাম। হরিণের গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম। রস আইল্যান্ডে দু-ঘন্টা কাটানোর পরে আমরা বোটে ফিরে এলাম। ওই একই বোটে করে নর্থ বে দ্বীপের দিকে চললাম। নর্থ বে দ্বীপে একটি লাইট হাউস আছে। অনেক দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। আমরা সেলুলার জেল থেকে এই লাইট হাউস দেখতে পেয়েছিলাম। মাত্র ১০ মিনিটে আমরা নর্থ বে দ্বীপে পৌঁছে গেলাম।

প্রথমেই আমরা সেমি সাবমেরিন এ চড়ব ঠিক করলাম। সেজন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। সেমি সাবমেরিন দ্বীপে আসতেই আমরা চড়ে বসলাম। এই সাব মেরিনে ৩ টি তলা আছে। আমাদের প্রথমে মাঝের তলাতে নিয়ে যাওয়া হল। এটি একটি ক্যাফে। এখানে বিভিন্ন রকমের খাবার ও পানীয় পাওয়া যায়। অনেককেই এখানে খাওয়া দাওয়া করতে দেখলাম। কিছুক্ষণ পরে সবাইকে কমপ্লিমেন্টারি ড্রিঙ্কস দেওয়া হল। এবার আমাদের নিচের তলায় যেতে বলা হল। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নিচের তলায় পৌঁছে গেলাম। আলো আঁধারি পরিবেশ। চারিদিক কাঁচ দিয়ে ঘেরা। এই অংশটি জলের মধ্যে নিমজ্জিত অবস্থায় আছে। এখান থেকে সমুদ্রের জলে ঘুরে বেড়ানো নানা রঙের মাছ ও সমুদ্রের নীচে কোরাল দেখা যায়। নীচের দৃশ্য দেখে আমরা আশাহত হলাম। সাবমেরিনের কাঁচ স্বচ্ছ নয়। বাইরে কোন কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে বলাবলি করতে শুনলাম, ‘২৫০০ টাকা জলে গেল, এতগুলো টাকা বেকার খরচ করলাম।’

নীচতলা থেকে উঠে এসে একেবারে উপরের তলায় উঠে গেলাম। ওখানে ডি. জে বাজছিল। ডি জে-র গানের সাথে সবাই নাচানাচি করছিল। সমুদ্রের মাঝে জাহাজের উপর ডি জে-র তালে নাচ, খুব একটা খারাপ লাগলো না। উপরের ডেক থেকে সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করলাম, পাওনা বলতে এ-টুকু। সাবমেরিন থেকে নেমে এসে দ্বীপে লাঞ্চ করে নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ দ্বীপে বসে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। বিকেল ৪ টায় বোটে করে রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স-এ ফিরে এলাম। নর্থ বে থেকে ফিরতে ১৫ মিনিট সময় লাগলো। জেটিতে ফিরে আমার ছেলে ও মেয়ে জেট স্কি রাইড করে নিল। ওরা এই রাইড করে খুব খুশি হল। নতুন এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হল। ওখান থেকে হোটেলে ফিরে এলাম। আগামীকাল রওনা দেব হ্যাভলক দ্বীপের উদ্দেশে।

ষষ্ঠ দিন

আজ আমরা যাব স্বরাজ দ্বীপ, যার পুরানো নাম ছিল হ্যাভলক দ্বীপ। ভোরবেলা পোর্টব্লেয়ারের হোটেল থেকে গাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম হ্যাডো জেটির দিকে। জনমানবহীন শুনসান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল। ডানদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি, অদূরে ছোট টিলার মত পাহাড়-অপূর্ব দৃশ্য!

ITT Majestic

আমরা পৌঁছে গেলাম হ্যাডো জেটি। গেটের কাছে চেকিং পর্ব সেরে আমাদের গাড়ি জেটির ভেতর চলে গেল। আমাদের জাহাজ তখনো জেটিতে আসেনি। তাই জেটির ভিতরে লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে থাকলাম। হ্যাডো জেটি থেকে স্বরাজ দ্বীপ যাওয়ার জাহাজ ছাড়ে। আমাদের টিকিট কাটা ছিল ITT Magestic নামের জাহাজে। পুরোপুরি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত নীল সাদা রং-এর সুন্দর জাহাজ। ধীরে ধীরে জাহাজের ভিতর প্রবেশ করলাম। জাহাজের ভিতরে দুটি ভাগ আছে। সামনের দিকে ৯৬টি এবং পিছনের দিকে ১০৮টি মোট ২০৪টি সিট বা বসার জায়গা আছে। দু’টি ভাগে যাত্রীদের মনোরঞ্জনের জন্য দুটি বিশাল আকারের টিভি লাগানো আছে। এই প্রথম আমরা বড় জাহাজে করে সমুদ্র যাত্রা করলাম। নর্থ বে দ্বীপকে বাঁদিকে রেখে পোর্ট ব্লেয়ার ছেড়ে ঘন নীল জলরাশির উপর দিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলল স্বরাজ দ্বীপের দিকে। আমরা বেশ উপভোগ করতে থাকলাম এই জলযাত্রা। মাঝে মাঝে ছোট বড়ো দ্বীপ, কোথাও কোথাও আবার উঁচু পাহাড়ও রয়েছে। সব সবুজ জঙ্গলে মোড়া। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে দ্বীপগুলিতে কোন বন্য পশু নেই। কিছু হাতি রয়েছে, তাও বন্য নয়। রয়েছে অজস্র্ পাখি আর সরীসৃপ জাতীয় কিছু জীব। তাছাড়া আন্দামানের জঙ্গল নিরাপদ বলা চলে।

জাহাজ স্বরাজ দ্বীপে পৌঁছে গেল। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দু-ঘন্টা সময় লাগল এখানে পৌঁছতে। পোর্ট ব্লেয়ারের উত্তর পূর্ব দিকে ৪১ কিমি. দূরত্বে এই দ্বীপ অবস্থিত। আয়তন ১১৩ বর্গ কিমি. ধীরে ধীরে জাহাজ থেকে জেটিতে নেমে গেলাম। নেমেই চারিদিকের দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে গেলাম। অপূর্ব মনোরম দৃশ্যগুলি মোবাইলের ক্যামেরা বন্দি করলাম। জেটির বাইরে বেরিয়ে এলাম। এখানে আমাদের গাড়ি আগে থেকে বুক করা ছিল, সেই গাড়ি ধরে রাধানগর বিচের কাছে আগে থেকে বুক করা হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। মাথার উপরে ঘন নীল আকাশ, দু-দিকে সবুজ জঙ্গল, সারি সারি নারকেল গাছ-সত্যিই স্বপ্ননগরী। জেটি থেকে সরাসরি রাধানগর সৈকত পর্যন্ত বাসের ব্যবস্থাও আছে।

ব্রিটিশ জেনারেল স্যার হেনরি হ্যাভলকের নামানুসারে এই দ্বীপের নামকরণ হয়েছিল হ্যাভলক দ্বীপ। ২০১৮ সালে ৩০শে ডিসেম্বর আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই দ্বীপের নতুন নামকরণ করেন-স্বরাজ দ্বীপ। এখানে লোকসংখ্যা প্রায় ৬৫০০। প্রায় সবাই পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ভারত সরকার পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের এখানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

রাধানগর বিচ থেকে হাঁটা পথে ৫ মিনিট দূরত্বে আমাদের হোটেল, Blue Ocean resort-এ পৌঁছে গেলাম। গ্রাম্য পরিবেশে সবুজ গাছপালায় ঘেরা ছিমছাম রিসর্টটি বেশ সুন্দর লাগল। বাইরে থেকে দেখে খুব সাদামাটা মনে হলেও ভিতরটা বেশ সুন্দর। হোটেলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেখে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাধানগর সমুদ্র সৈকতের দিকে। ২০০৪ সালে টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে এশিয়ার সেরা সমুদ্র সৈকত হিসাবে এটি বিবেচিত হয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে মর্যাদাপূর্ণ Blue Flag Certificate-এর শিরোপা লাভ করেছে। এটি একটি সুন্দর বালুকাময় সৈকত। সামনে গাঢ় নীল সমুদ্র আর পেছনে ঘন গাছের বন। এক অদ্ভুত সুন্দর, অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘C’ এর মত বাঁকানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর একটি সমুদ্র সৈকত। বিচ জুড়ে নারকেল গাছের সারি। সূর্যের আলোর তাপে বালিতে পা রাখা যাচ্ছে না। সামনে স্বপ্নের সমুদ্রের হাতছানি। তাই সূর্যের তাপকে উপেক্ষা করে বেলাভূমির সাদা বালি পায়ে মেখে এগিয়ে চললাম। চারিদিকে ছড়ানো ঝিনুক, শামুক, সামুদ্রিক কোরাল।

প্রকৃতির এই অনাবিল রূপ দেখে যেন আশ মেটে না-দু-হাতে উজাড় করে সাজিয়েছে এই দ্বীপমালা। এখানে স্নানের সুন্দর পরিবেশ রয়েছে, তাই সবাই নেমে পড়লাম সমুদ্রে স্নান করতে। উত্তাল সমুদ্র, নীল আকাশের স্বপ্নীল সৈকত, রূপালি বেলাভূমি, মৌন পাহাড়, গভীর জঙ্গলের সমন্বয় এই রাধানগর বিচ। দুধের মত সাদা ঢেউ ফেনিল হয়ে উপচে পড়ছে আবার পরক্ষণেই গুটিয়ে নিচ্ছে আঁচল। বেশ কিছুটা সময় সমুদ্রের জলে স্নান করলাম। এখানে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমার ছেলে ‘আকাশ’ স্নান করার আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঢেউ দেখে এমন লাফালো যে চশমাটা জলে পড়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। আমাদের কথাবার্তায় পাশাপাশি যারা স্নান করছিল তাদের প্রায় সবাই চশমা হারানোর ব্যাপারটা জেনে গিয়েছিল। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে হঠাৎ একজন চেঁচিয়ে বলে ওঠল, “দেখুন তো এটা আপনাদের চশমা কিনা?” আমরা চশমা ফেরত পেয়ে খুব অবাক হয়ে গেলাম। সমুদ্র কিছু নেয় না সব ফিরিয়ে দেয় এই আপ্তবাক্যটা কতটা সত্য তার প্রমাণ আজ পেলাম।

Radhanagar Beach

এখানে স্নানের পর ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে কলের জলে নিজেকে শোধন করে পোশাক পরিবর্তন করার সব ব্যবস্থা আছে। আমরা স্নান সেরে এখানে পরিষ্কার জলে গা হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বিচের কাছে বাঙালি হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে ডাবের জল খেয়ে আবার বিচে ফিরে গেলাম ফটো সেশনের জন্য। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্যের ভিডিও করলাম। বেশ কিছু ছবি তুললাম।

অন্ধকার ঘনিয়ে এল। বিচের আলো জ্বলে উঠল। রাতের ছবি এক অন্যরকম দৃশ্যের অবতারণা করেছিল। পরের দিন পূর্ণিমা ছিল। রাতে চাঁদের আলোয় বিচের মোহময়ী রূপ উপভোগ করলাম। বিচের কাছে হোটেল থেকে রাতের খাবার প্যাক করে হোটেলের দিকে পা বাড়ালাম। সারাদিন আজ দারুন আনন্দ করলাম। আগামীকাল আমরা যাব কালাপাথর বিচ ও এলিফ্যান্ট দ্বীপে।

সপ্তম দিন

আজ আমরা প্রথমে যাব কালাপাথর সমুদ্র সৈকত এবং তারপর এলিফ্যান্ট দ্বীপে। কালাপাথর সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার জন্য ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়িতে চড়ে মাত্র ৩৫ মিনিটে সৈকতে পৌঁছে গেলাম। তখনো চারিদিক অন্ধকার। ঘুমের রেশ কাটেনি। অধীর আগ্রহে ঢুলুঢুলু চোখে একমনে তাকিয়ে আছি দূরে সমুদ্রের সাথে মিশে যাওয়া আকাশের দিকে। একটু পরে একটা হাল্কা লাল আভা ছেয়ে গেল সেই সাগর আর আকাশের মিশে যাওয়া সন্ধি রেখায়।

বার ধীরে ধীরে অর্ধচন্দ্র আকারে সূর্য উদয় হতে শুরু করল। জল আর আকাশ লাল, গোলাপি, কমলা, বেগুনি রঙের ছটায় ছেয়ে গেল। সকলেই প্রায় বাকরুদ্ধ। এক দৃষ্টিতে প্রকৃতির মহিমা দেখে চলেছি। আমাদের মনে ও ক্যামেরার লেন্সে সেই দৃশ্যকে বন্দি করার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পরে চারিদিকে রোদ ঝলমল করে উঠল।

কালাপাথর সৈকত থেকে সোজা চলে গেলাম স্বরাজ জেটির কাছে। প্রায় ১ ঘন্টা সময় লাগল। জেটির কাছে বাজারে বিশাল আকারের একটি মাছ দেখতে পেলাম, নাম নন্দাশ্রী। মাছ কাটা এবং আঁশ ছাড়ানোর ভিডিও করলাম। ছেলে ও মেয়ে স্কুবা ডাইভিং এর জন্য প্রস্তুত হতে থাকল। বয়সজনিত কারণে আমি ও আমার স্ত্রী স্কুবা করার অনুমতি পেলাম না। ছেলে ও মেয়ে স্কুবার পোশাকে সজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল। আমরা সমুদ্রের তীরে গাছের তলায় অপেক্ষা করতে থাকলাম।

স্কুবার জন্য মেডিক্যাল ফর্ম পূরণ করতে হয়। তারপর জলে নেমে মিনিট দশেকের ট্রেনিং নিতে হয়। হাতের কিছু ইশারা শেখানো হয়। জলের ভিতরে শ্বাসজনিত বা অন্য কোন অসুবিধা হলে কিভাবে হাতের ইশারায় জানাতে হবে তা ট্রেনিং এর সময় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ডুবুরি বা স্কুবা ডাইভারের সাথে সমুদ্রের ৩৮/৪০ ফুট গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। মনে হবে কোন এক বিশাল প্রাকৃতিক অ্যাকোরিয়ামে যেন পৌঁছে গেছি।

প্রায় ৫০ মিনিট জলের নীচে রাখা হয়। অক্সিজেনের নল মুখে লাগানো থাকে। এই নলের মধ্য দিয়ে শ্বাস নিতে হয়। সামান্য কষ্ট হয়। চারিদিকে নানা প্রবাল ও রঙিন মাছ দেখার আনন্দে কোন কষ্টকে তখন কষ্ট বলে মনে হয় না। স্কুবা করে ছেলে ও মেয়ে ফিরে এল। আমার মেয়ে নিমোর দেখা পেয়ে খুব খুশি। স্কুবা করার খরচ সিজন অনুযায়ী জনপ্রতি ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়। আমরা জেটির কাছে একটি হোটেলে টিফিন করে নিলাম। কাছেই কাউন্টারে গিয়ে এলিফ্যান্ট দ্বীপে যাওয়ার জন্য বোটের টিকিট কেটে নিলাম। টিকিট জনপ্রতি ১০০০ টাকা। প্রতি বোটে ১০ জন করে। কাউন্টার থেকে জানিয়ে দিল কোন বোট আমাদের নিয়ে রওনা হবে। লাইফ জ্যাকেট পরে বোটে উঠে বসলাম। ঘন নীল সমুদ্রের জলরাশির উপর দিয়ে আমাদের বোট এগিয়ে চলল এলিফ্যান্ট দ্বীপের দিকে।

আমাদের বোটের নাম ছিল Island Rider – I। মাত্র ৩০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম এলিফ্যান্ট দ্বীপে। আমি এবং আমার স্ত্রী ঠিক করলাম আমরা এখানে জেট স্কি রাইড করে নেব। সেইমত আমরা এখানে জেট স্কি রাইড করে নিলাম। দারুণ এনজয় করলাম। বোটের টিকিটের সাথে কমপ্লিমেন্টারি স্নরকেলিং রাইড থাকে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সমুদ্র তীরের কাছে জলে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ছেড়ে দেয়। আমরা অতিরিক্ত ১০০০ টাকা করে দিলাম। হাতের তালুতে একটা নাম্বার লিখে দিল। সেই নাম্বার দেখে ডুবুরি সমুদ্র তীর থেকে বেশ কিছুটা গভীরে আমাদের নিয়ে গেল। স্নরকেলিং হল মুখে একটি নল ও মাস্ক পরে রাবারের টায়ারে ভেসে সমুদ্রতট থেকে কিছুটা দূরে সমুদ্রের নীচের প্রকৃতি দর্শন। আমাদের মুখের সামনে একজন ভিডিও ফটোগ্রাফার পোস্তর দানার মত কিছু বাঁহাতে ধরা একটা ছোট প্যাকেট থেকে জলে ছড়িয়ে দিতে থাকল। মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন সাইজের রঙিন মাছ চোখের সামনে ছোটাছুটি করতে থাকল-সে এক মনোরম দৃশ্য। প্রথমে আমি স্নরকেলিং করলাম। আমার স্ত্রী জলে নামতে ভয় পাচ্ছিল। আমি অভয় দিলাম, এ সুযোগ জীবনে বারবার আসবে না। একপ্রকার জোর করে ওকে পাঠালাম। ভয় ভয় করে এগিয়ে গেল স্নরকেলিং করতে। ফিরে এসে বলল, “না গেলে এমন সুন্দর দৃশ্য দেখার সুযোগ খুব মিস করতাম।” ছেলে ও মেয়ে স্কুবা করেছে বলে আর স্নরকেলিং করল না। স্কুবার পর স্নরকেলিং ভালো লাগবে না।

দ্বীপের মধ্যে ড্রেস চেঞ্জ করার ব্যবস্থা আছে। অনেক ছোট ছোট ঘর রয়েছে। আমরা ফ্রেশ হয়ে নিলাম। খুব খিদে পেয়েছিল, কিন্তু ওখানে কোন হোটেল ছিল না। যদিও আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম স্বরাজ দ্বীপে জেটির কাছে ‘বৌদির রেস্টুরেন্ট’-এ দুপুরের খাবার খাব। এলিফ্যান্ট দ্বীপে মহিলা পরিচালিত বেশ কিছু ফলের দোকান আছে। ওখানে আমরা ফল দিয়ে টিফিন করে নিলাম। আমাদের বোট ছাড়তে দেরি ছিল, সেই সুযোগে মোবাইলে কিছু ছবি তুলে নিলাম।

এলিফ্যান্ট দ্বীপ থেকে স্বরাজ দ্বীপে ফিরে জেটির কাছে বৌদির রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম খাবারের জন্য। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছিল, হোটেল ফাঁকা। ভেবেছিলাম এত বেলায় খাবার পাওয়া যাবে না। জিগ্যেস করে জানতে পারলাম খাবার পাওয়া যাবে। সারাদিন পেটে ভাত পড়েনি। ভেতো বাঙালি, মনটা ভাতের জন্য উসখুস করছিল। ভাত পাওয়া যাবে শুনে মন আনন্দে ভরে গেল। হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়লাম বাঙালির প্রিয় খাবার ভাত, ডাল, সবজি, মাছ নিয়ে। অপূর্ব স্বাদ, পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে Blue Ocean Resort-এ ফিরে গেলাম। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। আগামীকাল আমরা স্বরাজ দ্বীপকে বিদায় জানিয়ে চলে যাব নীল বা শহিদ দ্বীপে।

অষ্টম দিন

আজ আমরা যাব নীল বা শহিদ দ্বীপে। স্বরাজ দ্বীপ থেকে শহিদ দ্বীপে যাওয়ার জন্য আমাদের জাহাজের সময় ছিল সকাল ৯:৪৫ এ। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আর আসতে পারব কিনা জানিনা তাই আর একবার ভোরের আলোয় প্রাণ ভরে রাধানগর সমুদ্র সৈকত দেখতে একাই বেরিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা জনমানবহীন এশিয়ার সেরা সমুদ্র সৈকত। চারিদিক শুনসান, সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। সমুদ্র তীরে বসে দু-চোখ ভরে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করলাম। পূব দিকে সূর্য দেব উঁকি দিচ্ছেন। এখানে থেকে সূর্যোদয় ভালো দেখা যায় না। একটু আলো ফুটতে বিচের পাশে জঙ্গল ঘুরে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল।

জঙ্গলের ভিতর একা ঢুকতে ভয় করছিল। ফোন করে মেয়েকে ডেকে নিলাম। বাপ বেটি মিলে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বলতে পারেন একধরণের অ্যাডভেঞ্চার। দু-দিকে ঘন ঝোপঝাড়, নারকেল ও অন্যান্য গাছ, মাঝে মাটির সরু রাস্তা চলে গেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ, মাঝে মাঝে পাখির কিচিরমিচির শব্দ, নির্জন, গা ছমছম করা পরিবেশ। বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে। মেয়ের মুখ দেখে বুঝতে পারছি ও ভয় পাচ্ছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছি। সামনের রাস্তা কতদূর গিয়েছে তাও জানিনা। জঙ্গলের ভিতর যদি কোন জন্তু জানোয়ার বেরিয়ে পড়ে! যদিও জানি এখানের জঙ্গলে কোন হিংস্র জন্তু জানোয়ার থাকে না, তবুও মন মানছে না। দুরুদুরু বুকে এগিয়ে চলেছি। কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল কিছুটা হালকা হয়ে এল। সামনে আলো দেখতে পেলাম-সমুদ্র সৈকত। ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। এগিয়ে গেলাম সমুদ্র সৈকতের দিকে। সৈকতের পাশে ঘন সবুজ গাছের সারি। নির্মল শান্ত পরিবেশে ঢেউয়ের গর্জন শুনতে শুনতে বিচ ধরে এগিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যে। স্থানীয় একজনকে মাছ ধরার জাল কাঁধে নিয়ে যেতে দেখলাম। কীভাবে মাছ ধরে তা দেখার জন্য ওঁর পিছু নিলাম। সমুদ্রের পাশের খাঁড়িতে জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখলাম। ছোট ছোট মাছ, নাম জারোয়া ফিশ। জিগ্যেস করে জানতে পারলাম, এগুলো বঁড়শিতে কাঁটায় গেঁথে বড়ো মাছ ধরতে কাজে লাগে।

রিসোর্টে ফিরে এলাম। ততক্ষণে সবাই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। প্রাতরাশ সেরে গাড়ি করে পৌঁছে গেলাম স্বরাজ জেটিতে। এখান থেকে জাহাজে করে নীল দ্বীপে রওনা দেব। আমাদের জাহাজের নাম ছিল Green Ocean-I। জাহাজ পোর্ট ব্লেয়ার থেকে স্বরাজ দ্বীপে এসে পৌঁছালো। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে আগত যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর আমরা জাহাজে উঠে পড়লাম। এটি তিনতলা বিশিষ্ট জাহাজ। প্রথমে যে তলায় উঠলাম, সেটি দ্বিতীয় তলা-লাক্সারি ক্লাস। নীচে ইকোনমি ক্লাস এবং উপরে রয়্যাল ক্লাস। ইকোনমি ক্লাস থেকে সমুদ্র দেখা যায় না। এটি জাহাজের পেটের মধ্যে একেবারে নীচে। লাক্সারি এবং রয়্যাল ক্লাসে সীটে বসে সমুদ্র দেখা যায়। দেরিতে টিকিট কাটার জন্য আমরা ইকোনমি ক্লাসের টিকিট পেয়েছিলাম। সব সীট বুক হয়ে গিয়েছিল। তবে এই জাহাজের সুবিধা হল যে, এখানে উপর তলায় জাহাজের ওপেন ডেক থেকে সবাইকে সমুদ্র দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। জাহাজ ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে আমরা উপরের তলায় উঠে গেলাম। ডি.জে চলছে। যাত্রীদের অনেকেই ডিজের তালে কোমর দোলাচ্ছেন। এখানে চা, স্ন্যাকস্‌ এর ব্যবস্থা আছে। ওপেন ডেক থেকে সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম শহিদ দ্বীপের দিকে।

স্বরাজ দ্বীপ থেকে শহিদ দ্বীপে আসতে সময় লাগে ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা। আমাদের জাহাজ আজ ৩০ মিনিটে শহিদ দ্বীপে পৌঁছে গেল। জাহাজ থেকে জেটিতে নেমে চারপাশের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। আকাশের নীল রঙের সাথে সমুদ্রের জলের নীল রঙ মিলেমিশে একাকার। নীল আকাশ আর নীল জলরাশির জন্য মনে হয় এই দ্বীপের নাম রাখা হয়েছিল ‘নীল দ্বীপ’। সত্যিই সার্থক নাম। স্বচ্ছ স্ফটিকের মত জল, সমুদ্রের নীচে রাশি রাশি প্রবাল খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দ্বীপের একদিকে স্বরাজ দ্বীপ সবুজে ঢেকে রয়েছে, অন্যদিকে নাম না জানা অন্যান্য দ্বীপ। আয়তনের দিক থেকে শহিদ দ্বীপ খুবই ছোট প্রায় ১৮ বর্গ কিমি.। দ্বীপের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দৈর্ঘ্য ১০ কিমি.র মত। লোকসংখ্যা ৪/৫ হাজারের মধ্যে।

ধীরে ধীরে দ্বীপের স্থলভাগের দিকে এগিয়ে চললাম। প্রচণ্ড গরম। মাথার উপর সূর্যের প্রখর তাপ। শেডের নীচে একটু বিশ্রাম নিয়ে আগে থেকে বুক করে রাখা গাড়িতে চেপে পৌঁছে গেলাম Mayfair resort-এ। চারিদিক সবুজ গাছে ঘেরা গ্রাম্য পরিবেশে সুন্দর একটি রিসর্ট। ফ্রেশ হয়ে রিসর্টের সামনে একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম। রিসর্টে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে দুপুর ৩:৪৫ এ গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম লক্ষণপুর বিচ-১ এর উদ্দেশে।

লক্ষণপুর সৈকতের কিছুটা অংশ বালি, তারপর যেন সিমেন্ট বাঁধানো চত্বর। সমুদ্রের জল অনেক দূরে। আমার স্ত্রী হাঁটতে পারবে না বলে সামনের বালুচরে বসে পড়ল। আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে, সূর্যাস্ত দেখার জন্য। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, নির্মল শান্ত পরিবেশ-পর্যটকদের ভিড় ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। দূরে জাহাজ যাতায়াত করতে দেখলাম। মৃত কোরালগুলি এমনভাবে পড়ে রয়েছে মনে হচ্ছে যেন সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো সৈকত, যার মধ্যে রয়েছে অজস্র ছোট ছোট গর্ত। এই গর্তে রয়েছে নোনাজল যার মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে নানারকমের সামুদ্রিক জীব, ঝিনুক, ছোট শাঁখ। এখানে আমরা হাতের কাছে রঙিন জীবন্ত প্রবাল দেখতে পেলাম।

এই বিচে উপরি পাওনা হল সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। আকাশ পরিষ্কার ছিল না, কালো মেঘে ঢাকা ছিল। লাল গোল থালার মত সূর্য আমাদের নিরাশ করে মেঘের মধ্যে মুখ লুকালো। তারই মধ্যে যতটা সম্ভব সূর্যাস্তের কিছু ছবি তুলে নিলাম। ফিরে এলাম হোটেলে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। আলো আঁধারি পরিবেশে অপূর্ব সব দৃশ্য দেখে সারাদিনের ক্লান্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।

নবম দিন

শহিদ দ্বীপে আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন। আজ আমরা যাব ভরতপুর বিচ ও লক্ষণপুর বিচ-২ তে। আমরা শহিদ দ্বীপে যেখানে আছি সেই জায়গাটির নাম হল ভরতপুর গ্রাম। এখানের জায়গাগুলির নাম কেন জানিনা সব রামায়ণ মহাকাব্য থেকে নেওয়া- ভরতপুর, লক্ষণপুর, সীতাপুর, রামনগর। ভোরবেলা পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়লাম আশপাশের অঞ্চল দেখতে এবং স্থানীয় লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলে ইতিহাস জানতে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র।এখানে বাচ্চাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। সামনে ডানদিকে পাওয়ার হাউস। এখান থেকে সারা দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। বড় বড় বেশ কয়েকটি জেনারেটর আছে। এর উল্টোদিকে ইলেক্ট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ অফিস। এখানে অধিবাসীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য টাকা আদায় করা হয়। জেনারেটর ছাড়া বেশ কয়েকটি জায়গায় সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে দেখতে পেলাম। আজ আমরা Mayfair resort থেকে C.S.Empire নামে একটি বড় হোটেলে শিফট্‌ করলাম। সকালের জলখাবার খেয়ে চলে গেলাম ভরতপুর বিচে।

সুন্দর শান্ত নীল সমুদ্রের এই বিচ চারিদিক নানা বৈচিত্র্যের ঘন সবুজ গাছ দিয়ে ঘেরা-মনোরম পরিবেশ। গাছগাছালির এই বৈচিত্র্যের জন্য এই দ্বীপকে আন্দামানের সবজির পাত্র বা ভেজিটেবিল বৌল বলা হয়। সকালে সমুদ্রের জল বিচ থেকে অনেক দূরে। আমার ছেলে সমুদ্রের চরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই বিচের বাঁদিকে নীল বা শহিদ জেটি। বোটগুলো সব ডাঙ্গায় দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে পর্যটকের সংখ্যা খুব কম। ধীরে ধীরে জল বাড়তে থাকল।

আমরা গ্লাস বটম বোট রাইড করার জন্য লাইফ জ্যাকেট পরে ছোট স্পিড বোটে উঠে পড়লাম। এই স্পিড বোটের বিশেষত্ব হোল এর মেঝে বা পাটাতন কাঁচ দিয়ে বাঁধানো। এজন্য এই বোটের নাম গ্লাস বটম বোট। এই বোটে করে আমাদের গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হল। স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। জলের তলায় সে এক আশ্চর্য জগত! রঙিন জীবন্ত কোরাল দেখে অভিভূত হলাম। স্পষ্ট দেখতে পেলাম রং বেরং এর বিভিন্ন সাইজের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঝাঁক বেঁধে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ কোন জগত! কী দেখছি আমরা! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। দু-চোখ ভরে জলের তলায় প্রকৃতির অপরূপ শোভা উপভোগ করলাম। মনের মধ্যে এক অনাবিল খুশির অনুভূতি নিয়ে বিচে ফিরে এলাম। হাতে প্রচুর সময়। আজ সারাদিন আমরা এই দ্বীপে থাকব।

সবুজ গাছ দিয়ে ঘেরা স্নিগ্ধ ছায়ায় মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করার জন্য ত্রিপল বিছিয়ে বিচের বালির উপর বসে পড়লাম। টুকটাক খাওয়া দাওয়া চলতে থাকল। পর্যটকদের ভিড় বাড়তে লাগল। অনেকে নানা ওয়াটার অ্যাক্টিভিটি এনজয় করতে চলে গেল। আমরা আগেই অনেক ওয়াটার অ্যাক্টিভিটি করে নিয়েছি। এখানে এসে মনে হল সব অ্যাক্টিভিটি এখানে করলে ভাল হত। এত পরিষ্কার স্বচ্ছ জল আগে কোথাও দেখিনি। বিচের ধারে প্রচুর খাওয়ার হোটেল আছে। আমরা একটি বাঙালি হোটেলে ডিমের কারী, কাঁকড়ার ঝাল, ডাল, তরকারি দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে রওনা দিলাম লক্ষণপুর বিচ-২ এর দিকে। এই বিচের মুখ্য আকর্ষণ প্রবাল ও পাথরের মেলবন্ধনে সৃষ্ট দু’টি প্রাকৃতিক সেতু। স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ‘হাওড়া ব্রিজ’। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন ভাটা চলছে।

সমুদ্রের জল অনেক দূরে। সামনে সিমেন্ট বাঁধানো চাতালের মত এবড়ো খেবড়ো সমুদ্রতট। ধীরে ধীরে সাবধানে পা ফেলে প্রাকৃতিক সেতুর দিকে এগিয়ে চললাম। সেতুর সামনে এসে অবাক হয়ে দেখলাম কিভাবে প্রকৃতি এই সেতু সৃষ্টি করেছে। সত্যিই প্রকৃতির এ এক আশ্চর্য সৃষ্টি। এখন বুঝতে পারছি কেন দেশ বিদেশের পর্যটকরা এখানে ভিড় জমান। একটু দূরে আরো একটা প্রাকৃতিক সেতু আছে। আমরা হেঁটে ওই সেতুর কাছে গেলাম। সম্পূর্ণ তটটাই যেন কোরাল দিয়ে বাঁধানো। জায়গায় জায়গায় রয়েছে ছোট পুলের মত জমানো জল, যার মধ্যে খেলা করছে অজস্র নাম না জানা রঙিন মাছ, নানারকমের কাঁকড়া, স্টার ফিশ, আরও কত কী! যেন একটা জীবন্ত প্রাকৃতিক অ্যাকোরিয়াম। শহিদ দ্বীপের এই বিচে নানারকমের কোরাল দেখা যায়, যার জন্য এই আইল্যান্ডকে ‘কোরাল রিফ আইল্যান্ড’ ও বলা হয়ে থাকে। ফিঙ্গার কোরাল, স্পঞ্জ কোরাল, জ্যাকফ্রুট কোরাল, রঙ বদল করা ফ্লাওয়ার কোরাল, বোল্ডার কোরাল, মাউন্টেন কোরাল প্রভৃতি হরেক রকমের কোরাল বা প্রবাল এই দ্বীপের মাধুর্য বাড়িয়েছে। বেলা গড়িয়ে চলল। ধীরে ধীরে সমুদ্রের জল বাড়তে থাকল। পর্যটকদের ভিড় অনেকটা হালকা হয়ে গেল। সমুদ্র তট থেকে পুরো বিচের ছবি মোবাইলে ভিডিও করে নিলাম। এই বিচের উপরি পাওনা হল সূর্যাস্তের দৃশ্য। মোবাইলের ক্যামেরায় সূর্যাস্তের অপরূপ ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। লাল গোলার মত সূর্য পশ্চিম আকাশে সমুদ্রের মধ্যে ডুবে যেতে থাকল। পুরো ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পেলাম না। একটু নিরাশ করে কালো মেঘের মধ্যে মুখ লুকালো। আমরা ফিরে এলাম আমাদের আস্তানায়।

দশম দিন

আন্দামান ভ্রমণের আজ দশম দিন। আজ আমরা প্রথমে যাব সীতাপুর বিচে,ওখানে সূর্যোদয় দেখব। তারপর ফিরে যাব পোর্ট ব্লেয়ার। ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়লাম সীতাপুর বিচের উদ্দেশে। বিচ দেখে মনে হল কেউ যেন সাদা সিমেন্ট গুলে এখানে ঢেলে দিয়েছে। জমে যাওয়া সিমেন্টের বিচের উপর দিয়ে এগিয়ে চললাম। সমুদ্রের জল বিচ থেকে অনেক দূরে। বোল্ডারের মত বেশ কিছু পাথর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে থাকল। সূর্যোদয়ের অনেক দেরি আছে। এই সুযোগে পুরো বিচের ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। নিজেদের কিছু ছবি তুললাম। পূব দিকে মেঘের আড়ালে সূর্যদেব উঁকি মারলেন। চারিদিকে ক্যামেরা ও মোবাইলের আলোর ঝলকানি। আমরাও মোবাইলে সূর্যোদয়ের মুহূর্তের ছবি ভিডিও করে নিলাম। উপরে ও নীচে কালো মেঘের স্তর, তারই মাঝে যতটুকু দেখা যায় সেই ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। আস্তে আস্তে কালো মেঘের আড়ালে সূর্যদেব মুখ লুকালেন। কিছু স্থির চিত্র তুলে হোটেলে ফিরে এলাম। আমাদের হোটেলের পাশেই একটি বাঙালি হোটেল আছে-হোটেল অমূল্য। এই হোটেলগুলি একেবারে নীল দ্বীপের সেন্টারে বাজারের কাছে অবস্থিত।

জেটি থেকে রাস্তা সোজা এসে এই হোটেলগুলির কাছে দু’ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকে চলে গেছে সীতাপুর বিচ এবং ডানদিকে লক্ষণপুর বিচ-১। সামনে সবজি বাজার ‘সাউথ আন্দামান মার্কেট’। বাজারের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে লক্ষণপুর বিচ-২ তে, দূরত্ব প্রায় ১.৬৪৯ কিমি.। বাজারের সামনে স্বামী বিবেকানন্দের একটি মর্মর মূর্তি রয়েছে। আগেই বলেছি এখানে প্রচুর সবজির চাষ হয়, যার জন্য এই দ্বীপকে আন্দামানের ‘সবজির পাত্র’ বলা হয়। বাজারের পাশে শিব ও রাধাকৃষ্ণের মন্দির। রাস্তার ধারে মাছের বাজার। ছোট ছোট টিকলি মাছ এবং বড়ো ক্রোকারি মাছ, দাম প্রতি কেজি ২০০ টাকা। বাজারের পাশেফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও অন্যান্য অফিস। বাজারের পাশে কানাড়া ব্যাঙ্ক, আন্দামান নিকোবর স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক ও তাদের এ.টি.এম সেন্টার আছে। আর একটু এগিয়ে গেলেই পোষ্ট অফিস। ঘুরে ঘুরে সব দেখে হোটেলে ফিরে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে গাড়ি করে জেটিতে এলাম। পোর্ট ব্লেয়ার ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের জাহাজের নাম ছিল ‘Green Ocean – 2’। শহিদ দ্বীপকে বিদায় জানিয়ে আমাদের জাহাজ এগিয়ে চলল পোর্ট ব্লেয়ারের দিকে। এই জাহাজটি দোতলা। উপরে ডিলাক্স এবং নীচে প্রিমিয়াম ক্লাস। আমাদের প্রিমিয়াম ক্লাসের টিকিট ছিল। এই ক্লাসে সামনের দিকে A to J মোট দশটি সারি, একটি সারিতে বাঁদিকে চার এবং ডানদিকে চার মোট আটটি করে সিট। পিছনের দিকে K to S মোট নয়টি সারি, একটি সারিতে বাঁদিকে তিন এবং ডানদিকে তিন মোট ছ’টি করে সিট। মোট ১৩৪ টি সিট আছে।

পোর্ট ব্লেয়ারে পৌঁছে হোটেলে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে বিশ্রাম নিলাম। বিকেলে চলে গেলাম চিড়িয়াটাপুতে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ২৫ কিমি. দূরে এক অপূর্ব স্থান ‘চিড়িয়াটাপু’। এই স্থানকে মুন্ডা পাহাড়ও বলা হয়। টাপু নামের অর্থ হোল এক স্থলস্থান যার চারপাশে জল, অর্থাৎ একটি উঁচু দ্বীপ। আর চিড়িয়া বলতে বোঝায় পাখি। এই জায়গাটি পাখি প্রেমিকদের জন্য আদর্শ। এখানকার নির্মল নির্জনতা ও সায়াহ্নে সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকেরা এখানে আসে। এখানে সমুদ্র ভীষণ শান্ত। ঢেউ প্রায় নেই বললেই চলে। একটু দূরে ছোট ছোট পাহাড় রয়েছে, যাকে টাপু বলা যেতে পারে। এই পাহাড়ের পেছনে যখন সূর্য ঢলে পড়ে তখন এই স্থানের দৃশ্য হয়ে ওঠে নৈসর্গিক। প্রচুর পর্যটক অনেক আশা নিয়ে সূর্যাস্ত দেখার জন্য এখানে জড়ো হয়েছিল, কিন্তু আকাশ এতই মেঘলা ছিল যে সূর্যাস্ত দেখা গেল না। সবাই নিরাশ হয়ে ফিরে এলাম।

অসীম কুমার মান্না | Asim Kumar Manna

Param Gyan O Sadhan Tathya | পরমজ্ঞান ও সাধন তত্ত্ব | New Article 2023

Valentine Day Speciality | ভালোবাসা দিবস | Top New Bengali Article 2023

Param Gyan O Sadhan Tathya | পরমজ্ঞান ও সাধন তত্ত্ব | New Article 2023

Shikhar Chera Jiban | শিকড় ছেঁড়া জীবন | New Article 2023

Short bengali story | Bengali story pdf | pratilipi bengali story | Short Stories for Children | English Stories for Kids | Moral Stories for Kids | story in english | story hindi | story book | story for kids | short story | story for girls | short story in english | short story for kids | bangla golpo pdf | Bangla golpo pdf | Bangla golpo story | bangla romantic golpo | choto golpo bangla | bengali story | Sunday suspense golpo | sunday suspense mp3 download | suspense story in hindi | suspense story in english 200 words | Suspense story in english | suspense story in english 300 words | Suspense story examples | suspense story in english 100 words | suspense story writing | very short suspense stories for students | Andaman Travel Story | Top Bangla Golpo Online Reading | New Read Online Bengali Story | Top Best Story Blogs | Best Story Blogs in pdf | Sabuj Basinda | High Challenger | Famous Bangla Golpo Online Reading | Shabdodweep Read Online Bengali Story | Shabdodweep Writer | Bangla Golpo Online Reading pdf | Famous Story – Andaman Travel Story | Pdf Andaman Travel Story | Andaman Travel Story App | Full Bangla Golpo Online Reading | Bangla Golpo Online Reading Blogs | Best Story Blogs in Bengali | Live Bengali Story in English |Bangla Golpo Online Reading Ebook | Full Bangla Galpo online | Andaman Travel Story 2024 | New Bengali Web Story – Episode | Golpo Dot Com Series | Andaman Travel Story Video | Story – Andaman Travel Story | New Bengali Web Story Audio | New Bengali Web Story Video | Andaman Travel Story Netflix | Audio Story – Andaman Travel Story | Video Story – Andaman Travel Story | Shabdodweep Competition | Story Writing Competition | Bengali Writer | Bengali Writer 2023 | Trending Bangla Golpo Online Reading | Recent story Andaman Travel Story | Top Story Andaman Travel Story | Popular New Bengali Web Story | Best Read Online Bengali Story | Read Online Bengali Story 2023 | Shabdodweep Bangla Golpo Online Reading | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Modern Online Bangla Galpo Download | Bangla Golpo Online Reading mp3 | Horror Adult Story | Read Online Bengali Story Collection | Modern Online Bangla Galpo mp4 | Modern Online Bangla Galpo Library | New Bengali Web Story Download | Full Live Bengali Story | Bengali Famous Story 2023 | Shabdodweep Bengali Famous Story | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Live Bengali Story – audio | Bengali Famous Story – video | Bengali Famous Story mp3 | Full Bengali Famous Story | Bengali Literature | Shabdodweep Magazine | Shabdodweep Web Magazine | Live Bengali Story Writer | Shabdodweep Writer | Story Collection – Modern Online Bangla Galpo | Andaman Travel Story – Vlog

2 thoughts on “Best Andaman Travel Story | Full Andaman Journey”

  1. খুব সুন্দর তথ্য সম্বলিত বর্ণনা এবং প্রানবন্ত ছবি।

    Reply

Leave a Comment

Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.