...

দেবতা ৩৩ কোটি | 33 Crore Gods | প্রবোধ কুমার মৃধা

Sharing Is Caring:

দেবতা ৩৩ কোটি (অন্তর্নিহিত তাৎপর্য) | 33 Crore Gods

জ্ঞান হ‌ওয়া ইস্তক শুনে আসছি, দেবতা তেত্রিশ (৩৩) কোটি (33 Crore Gods)। প্রাচীন কাল থেকে সনাতন হিন্দু সমাজ-মানসিকতায় ধর্মীয় এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে। গরুর গায়ে যত সংখ্যক লোম আছে, তার প্রতিটি লোমকূপে এক একজন দেবতার অধিষ্ঠান। এজন্য হিন্দুস্তান ‘গো-দেওতাকা’ দেশ নামে অভিহিত হয়। আসমুদ্র হিমাচল, সমগ্ৰ হিন্দু সম্প্রদায় ‘গো-জতিকে’ দেবতা জ্ঞানে মান্যতা দিয়ে থাকে, যদিও এ ব্যাপারে কথায় এবং কাজে বিস্তর অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।

দেবতার সংজ্ঞা

দেবতা বলতে বোঝায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, জীব ও জগতের প্রাকৃতিক কার্য কলাপ ও ইহলোক পরলোকের নিয়ন্ত্রক উচ্চ কোটি শক্তি সম্পন্ন অতিপ্রাকৃত এক উপকারী শক্তি।

বেদে ‘দেবতা’ শব্দটির কোথাও উল্লেখ নেই। মূল সংস্কৃত শব্দটি হলো ‘দেব্‌’, যার প্রকৃত অর্থ শক্তি। যে শক্তি সঠিক পথে চালিত হলে জগত তথা জাগতিক জীবকুলের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয়। ‘কোটি’ শব্দের বাংলায় প্রচলিত অর্থ ‘শতলক্ষ’, পরিভাষায় যাকে বলে crore. সংস্কৃতে ‘কোটি’ শব্দটির একটি অর্থ হলো প্রকার বা ধরণ। অর্থাৎ তেত্রিশ কোটি (33 Crore Gods) বলতে বোঝায় ৩৩ প্রকার। অত‌এব ৩৩ কোটি দেবতার (33 Crore Gods) অর্থ তেত্রিশ (৩৩) ধরণের বৈশিষ্ট্য বা গুণ সম্পন্ন ৩৩ জন ভিন্ন ভিন্ন দেবতা বা শক্তি। ত্রয় ত্রিংশ = ৩৩ । এই তেত্রিশ (৩৩) প্রকার শক্তির মধ্যে আছে দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্ট বসু ও অশ্বিনী কুমার দ্বয়। (মতান্তরে ইন্দ্র ও প্রজাপতি) সুতরাং ১২ + ১১ + ০৮ + ০২ = ৩৩ । এখন দেখা যাক এই ৩৩ প্রকার দেবতা বা শক্তি কে বা কা’রা।

দ্বাদশ আদিত্য

ভাগবত পুরাণ অনুসারে প্রজাপতি দক্ষের কন্যা অদিতির দ্বাদশ সন্তানকে আদিত্য বলা হয়। ঋষি কশ্যপ যাঁদের পিতা। এঁরা হলেন যথাক্রমে, (১) অর্যমা (২) অংশুমান (৩) ইন্দ্র (৪) ত্বষ্টা (৫) ধাত্র/ধাতা (৬) পূষা (৭) বিষ্ণু (আদিত্য গণের প্রধান) (৮) বিবস্বান ( সূর্য) (৯) বরুণ (১০) ভগ (১১) মিত্র (১২) সবিতা । সূর্যের‌ই বিভিন্ন প্রকার রূপ এই দ্বাদশ আদিত্য। দ্বাদশ মাসে দ্বাদশ রাশিতে বিচরণ করেন এই আদিত্যগণ।

একাদশ রুদ্র

গোমাতা সুরভি ও কশ্যপ ঋষির সন্তান এই একাদশ রুদ্র। মৎস্য পুরাণ মতে একাদশ রুদ্র হলেন – (১) অজপদ (২) অহিব্রধ্ন (৩) কপালী (৪) চন্ড (৫) পিঙ্গল (৬) বিরুপাক্ষ (৭) বিলোহিত (৮) ভীম (৯) ভব (১০) শম্ভু (১১) শাস্তা । দেবাধিদেব মহাদেবের ভিন্ন ভিন্ন রূপ হলেন এই রুদ্রগণ। রুদ্র দেবগণ সংহারের দেবতা। শরীর থেকে রুদ্র নির্গত হয়ে গেলে মানুষের মৃত্যু ঘটে।

অষ্টবসু

দক্ষকন্যা বসু ও কশ্যপ মুনির আটজন সন্তান অষ্টবসু নামে খ্যাত। বহ্নিপুরাণ মতে অষ্টবসু যথাক্রমে, (১) অপ্‌ (জল) (২) অনিল (বায়ু) (৩) অনল (অগ্নি) (৪) প্রত্যুষ (সূর্য) (৫) প্রভাষ (নক্ষত্র / আকাশ) (৬) ধ্রুব (ধ্রুবতারা) (৭) ধর / ধরা (পৃথিবী) (৮) সোম (চন্দ্র) । প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বৃহদারণ্যক উপনিষদ মতে অষ্ট বসুগণ হলেন, আদিত্য, অগ্নি, অন্তরীক্ষ, চন্দ্রমা, নক্ষত্র, পৃথিবী, বায়ু ও দৌ। জ্যোতিষ গ্ৰন্থ অনুসারে এই অষ্ট বসু‌ই‌ হলেন ধনিষ্ঠা নক্ষত্রের অধিপতি।

অশ্বিনী কুমার দ্বয়

বিবস্বান ও শরণ্যু, নামান্তরে সূর্য ও দেবী সংজ্ঞার যমজ পুত্র অশ্বিনী কুমার দ্বয়। ঋকবেদ থেকে জানা যায়, সূর্য ও সঞ্জনা অশ্বরূপে মিলিত হয়েছিলেন, যার ফলে দুই অশ্বিনের জন্ম হয়। অগ্ৰজ নাসত্য ও অনুজ দস্র নামে পরিচিত। এই বৈদিক দেবদ্বয় সমগ্ৰ দেব সমাজের চিকিৎসক। জ্যোতিষ শাস্ত্রানুসারে অশ্বিনী কুমার দ্বয় অশ্বিনী নামক নক্ষত্রের অধিপতি। মহাভারতের কনিষ্ট দুই পান্ডব নকুল ও সহদেব এই অশ্বিনী কুমার দ্বয়ের মানস পুত্র। মতান্তরে ৩৩ সংখ্যক দেবগণের মধ্যে অশ্বিনী কুমার দ্বয়ের বিকল্প হিসেবে ইন্দ্র ও প্রজাপতির নাম উল্লেখ করা হয়। যেহেতু ইন্দ্রের নাম দ্বাদশ আদিত্যের অন্তর্ভুক্ত সেহেতু অধিকাংশ মত অশ্বিনী কুমার দ্বয়ের পক্ষে।

উপরে উল্লেখিত তেত্রিশ (৩৩) রকম গুণসম্পন্ন দেবতার কথা বেদে বর্ণিত আছে। এঁরা সবাই বৈদিক দেবতা। তেত্রিশ কোটি দেবতা (33 Crore Gods) সম্পর্কে ”দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম” বিষয়ক রচনায় সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন, ”হিন্দুর মুখে ত শুনি, হিন্দুর দেবতা তেত্রিশ কোটি (33 Crore Gods)। কিন্তু দেখি বেদে আছে মোটে তেত্রিশটি।” বেদ ছাড়া শতপথ ব্রাহ্মণ সহ অন্য একাধিক ধর্মগ্ৰন্থে তেত্রিশ প্রকার দেবতার বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। অথর্ব বেদের দশম অধ্যায়ে ৭ম সূক্তের ১৩ নং শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে,

‘যস্য ত্রয়স্ত্রিংশদদেবাঃ অঙ্গে সর্বে সমাহিতাঃ।
স্কম্মং তং ব্রুহি কতমঃ স্বিদেব সঃ।।’

যজুর্বেদের একটি মন্ত্রে ও ঈশ্বরের ৩৩ প্রকার শক্তির স্তুতি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

”ত্রয়স্ত্রিংশতাস্তুবতভুতান্য শাম্যন্‌ প্রজাপতিঃ।
পরমেঠ্যধিপতিরাসীত্‌।।’

আদিতে ঋকবেদে সূর্য, অগ্নি ও বায়ু, এই তিন প্রকার দেবতা বা শক্তির কথা উল্লেখ ছিল। ঋকবেদ পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় তেত্রিশ (৩৩)। এই তেত্রিশ জন দেবতা বা শক্তির মধ্যে ১১ জন বিরাজ করেন পৃথিবীতে, ১১ জন বায়ুতে এবং বাকি ১১ জন মহাকাশ বা অন্তরীক্ষে অবস্থান করেন।

প্রচলিত সনাতন ধর্ম বিশ্বাস মতে বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডকে সুশৃঙ্খলিত এবং সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে সর্বশক্তিমান পরম ঈশ্বরের আদেশে ও নির্দেশে উক্ত তেত্রিশ প্রকার ভিন্ন ভিন্ন শক্তি সম্পন্ন তেত্রিশ জন দেবতা দিবা রাত্র নিয়োজিত আছেন। মূল বিষয় হলো, মাত্র তেত্রিশ সংখ্যক বৈদিক দেবতার ইতিবৃত্ত সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তর ক্ষেত্রে জনগণের কাছে অজ্ঞাত‌ই‌থেকে গিয়েছে। মুষ্টিমেয় যারা তত্ত্বটি জানতেন, তাদের মধ্যে কতিপয়‌ই‌ এই তত্ত্বটি সীমিত সাধারণের কাছে জানাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের সেই প্রচেষ্টা সেভাবে ফলপ্রসূ হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। অনুমান করা যায় পরবর্তীকালে এই তেত্রিশ সংখ্যক দেবতা লোকমুখে বিবর্তিত হতে হতে ‘তেত্রিশ কোটি’ দেবতায় (33 Crore Gods) পরিবর্তিত হয়ে যায়। তবে এও দেখা গিয়েছে, হিন্দু ধর্মে কোন এক নির্দিষ্ট দেবতার একাধিক রূপের প্রচলন ছিল। তাছাড়া দৈবী শক্তিতে বিশ্বাসী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেবতার সংখ্যার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। যে সমাজ যত বিষয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে যত রকম দৈবশক্তির কল্পনা করেছে, মূলত তার উপর সংখ্যাটার হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করেছে। তবে এই সমস্ত দেবতাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভাগ করা হয়েছে, যেমন, আঞ্চলিক দেবতা, লৌকিক দেবতা, অপদেবতা, উপদেবতা এমন কি ঠাকুর নামেও অভিহিত করা হয়েছে। এখানে একটা বিষয় খুবই লক্ষণীয় ছিল। যথা – আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক বা আধিভৌতিক মে ধরণের দুঃখ-যন্ত্রণার মধ্যে পড়ুক না কেন, পরিত্রাণের আশায় মানুষ মাতৃশক্তির শরণাপন্ন হয়েছে বেশি, ফলে দেব অপেক্ষা তুলনামূলকভাবে দেবীর সংখ্যাই অধিক। কৌলিন্যের দিক দিয়ে বা সর্বব্যাপী অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে এই সমস্ত দেবদেবীগণ কুলীন দেব সমাজের সম পর্যায়ে উন্নীত হবার যোগ্যতা লাভ করতে পারেননি। তবে আপন আপন এলাকায় বা অঞ্চলে ভীষণ প্রভাবশালী।

বেদ পরবর্তী সময়ে ৩৩ জন বৈদিক দেবতা ছাড়া আমরা পেয়েছি শতাধিক পৌরাণিক দেবতা, যথা – ব্রহ্মা, শিব, দুর্গা, পার্বতী, লক্ষ্মী, সরস্বতী সহ অন্যান্য অনেক। এছাড়া পেয়েছি বহুসংখ্যক লৌকিক দেবদেবী। যেমন, চন্ডী, ষষ্ঠী, মনসা, শীতলা, ধর্মঠাকুর সহ আরও অনেক। তবে সব ধরণের দেব-দেবীকে একত্রিত করেও ‘তেত্রিশ কোটি’ (33 Crore Gods) তো দূর অস্ত, ‘তেত্রিশ শতক’ হ‌ওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমতাবস্থায় মান্ধাতার আমল থেকে প্রচলিত ৩৩ কোটি দেবতার (33 Crore Gods) সংখ্যাটাকে অনর্থক টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন যৌক্তিকতা দেখি না।

তথ্য সূত্র: সৌজন্যে গুগল

প্রবোধ কুমার মৃধা | Probodh Kumar Mridha

Rabindranath Tagore’s love for art and literature

Loukik Debota Masan Thakur | লৌকিক দেবতা মাশান ঠাকুর | 2022

Advantages & Disadvantages of Tattoo | ট্যাটুর উপকারিতা এবং অপকারিতা | Bengali Article 2023

Is it possible to remove tattoo | ট্যাটু রিমুভ কি সম্ভব? | 2023

ট্যাটুর ইতিহাস ও আমরা | History of Tattoo | Reasons for using tattoos | 2023

Emblem of Ramakrishna Mission | রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতীকের অর্থ | নক্‌শা ও তাৎপর্য | 2023

33 crore gods names list pdf | hindu 33 crore gods names list | 33 crore gods in hinduism | 33 crore gods reality | 33 crore gods in hindi | 33 crore gods names list in odia | 33 Crore Gods images | Shabdodweep Founder |

Leave a Comment

Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.