32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | পুরীর জগন্নাথ মহাপ্রভুর বত্রিশ প্রকার সাজ-শৃঙ্গার

Jagannath Idol

অভিজিৎ পাল – সূচিপত্র [32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu]

পুরীর জগন্নাথ মহাপ্রভুর বত্রিশ প্রকার সাজ-শৃঙ্গার – অভিজিৎ পাল [32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu]

অবকাশ বেশ (Abakasha besha)

শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার অবকাশ বেশ আয়োজিত হয় প্রতিদিন সকালে। রত্নসিংহাসনের দেবতাদের এই বেশে শৃঙ্গারের সূচনা হয়েছিল আচার্য শঙ্করের সময়কালে। অর্থাৎ, আনুমানিক নবম শতাব্দী থেকে জগন্নাথের অবকাশ বেশ প্রচলিত রয়েছে। সেদিক থেকে দেখা হলে অবকাশ বেশ জগন্নাথ মহাপ্রভুর অন্যতম প্রাচীন বেশ। কথিত উৎকলের অন্যতম প্রাচীন রাজা গজপতি যযাতিকেশরী মহারাজ উৎকলের রাষ্ট্রদেবতা জগন্নাথের অবকাশ বেশের প্রথম আয়োজন করেছিলেন।

জগন্নাথের অবকাশ বেশে শৃঙ্গারের বিশেষ বাহুল্য দেখা যায় না। জগন্নাথের কমবেশি ত্রিশটি বেশের মধ্যে সর্বাধিক সরল বা সাদামাটা বেশ অবকাশ বেশ। প্রতিদিন শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বার খোলার অনতিবিলম্বে পতিতপাবন বিগ্রহের মঙ্গলারতি অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়েই পুরীর শ্রীমন্দিরের প্রধান সেবক শ্রীমন্দিরের প্রবেশ করেন। উপস্থিত সকলেই পরস্পরকে ‘জয় জগন্নাথ’ সম্ভাষণ করেন। ঠিক এই অনুষ্ঠানের পরে প্রতিদিন সকাল ছ’টা থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের অবকাশ বেশের আয়োজন হয়।

জগন্নাথের অবকাশ বেশের সঙ্গে কয়েকটি আচার অনুষ্ঠান জুড়ে রয়েছে। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র দারুতনুধর হলেও তাঁরা মনুষ্যলীলা করতেই মর্ত্যে প্রকাশিত হয়েছেন। এই লীলারই প্রকাশ দেখা যায় জগন্নাথের অবকাশ বেশে। শয়ন থেকে উঠে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র দাঁত মাজেন, মুখ ধুয়ে নেন। সাধারণ মানুষে যেমন দাঁতন করেন, তেমনই আচরণ করেন পুরুষোত্তম জগন্নাথ। এরপরেই জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের স্নান হয়। জগন্নাথের বিগ্রহ স্নান হয় শুধুমাত্র জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা বা স্নানপূর্ণিমায়। বাকি সব দিন সোনার ফ্রেমে বন্দী নির্মল স্বচ্ছ দর্পণেই তাঁদের স্নান হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শ্রীবিগ্রহের বিপরীতে দর্পণ ধরে তাতে দেবতার অবয়বের প্রতিফলনকে সাক্ষাৎ দেবতার শ্রীরূপ জ্ঞান করে স্নানের আয়োজন হয়। শ্রীমা সারদা দেবীর একটি চমৎকার কথা রয়েছে, “ছায়া ও কায়া সমান।” এই ধারণাটি শ্রীমন্দিরের ভেতরেও কমবেশি প্রচলিত রয়েছে। তবে দর্পণে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শ্রীবিগ্রহের স্নানের দৃশ্যটি জগন্নাথের রথকালীন সোনা বেশ অনুষ্ঠানের দিনের সকালেও দেখা যায়। রথের ওপরে একই পদ্ধতিতে জগন্নাথের স্নান দেখা যায়। স্নানের অনতিবিলম্বে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার পূর্বসজ্জার পোশাক খুলে নিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। সাধারণত অবকাশ বেশে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সাদা রঙের কাপড় পরেন। স্নানযাত্রার দিনে মহাস্নানের পর দেবতারা একই রকমের কাপড় পরেন। এই বেশে জগন্নাথের ছবিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সুলভ। সাধারণত সাদা রঙের কাপড়, কমলা রঙের পার — এই হলো অবকাশ বেশের প্রধান সজ্জা। জগন্নাথ ও বলভদ্র ধুতি পরেন, সুভদ্রা পরেন শাড়ি। জগন্নাথ ও বলভদ্রের ডান হাত থেকে শুরু করে উত্তরীয় বাম হাতে এসে পড়ে। সাধারণত মানুষ যেভাবে হাতে সুন্দর করে গামছা ঝুলিয়ে রাখেন, যেন সেই শৈলীতেও জগন্নাথের উত্তরীয় বাম হাত থেকে ঝোলে। অবকাশ বেশের সময় জগন্নাথ বিগ্রহে ফুল ও গহনার বিশেষ আয়োজন দেখা যায় না। জগন্নাথের স্নানাভিষেক ও শৃঙ্গারের পর পঠিত হয় তাঁর স্তবাদি। যার মধ্যে অন্যতম একটি নিম্নরূপ :

যং দারুব্রহ্মা মূর্তিং প্রণবতনুধরং সর্ববেদান্ত সারং
ভক্তানাং কল্পবৃক্ষ ভবজলতরণী সর্বতখানুখম।
যোগীনাং হংসতত্ত্বং হরিহর নমিত শ্রীপতি বৈষ্ণবানাং
শৈবানাং ভৈরবাস্যাং পশুপতি পরমং শাক্ততত্ত্বে শবিতং চ‌।
বৌদ্ধানাং বৌদ্ধসাক্ষাৎ রূপ ভয়তি বলো জৈন সিদ্ধান্তমূর্তিঃ
তাং দেবো পাতু নিত্যং কলি কলুষহরং নীল শিলাধিনাথঃ।।

সাধ বেশ (Sadha besha)

জগন্নাথ ভোজনরসিক দেবতা। তিনি খেতে ভালোবাসেন। লোকবিশ্বাস রয়েছে, ভগবান বিষ্ণু প্রতিদিন দক্ষিণ ভারতের রামেশ্বরম্‌-ধামের সুশীতল জলে মহাস্নান করেন, পূর্ব ভারতের পুরীধামে ছাপান্ন রকমের ভোগ-ব্যঞ্জন ভোজন করেন, পশ্চিম ভারতের দ্বারকাধামে জগৎ সংসার শাসন করেন এবং উত্তর ভারতের বদ্রীধামের শান্ত পরিবেশে ধ্যান ও বিশ্রাম করেন। জগন্নাথ দিনে পাঁচবার বিভিন্ন রকমের নৈবেদ্য ও ভোগ গ্রহণ করেন। ভোজনের পর জগন্নাথ কাপড় পরিবর্তন করেন। এই সময়ের শৃঙ্গারই জগন্নাথের সাধ বেশ নামে পরিচিত। প্রতিদিন পাঁচবার করে সাধ বেশ আয়োজিত হয়। সাধারণত নরম রেশমের কাপড় ও ফুলের মালায় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র সেজে ওঠেন। এই বেশে ব্যবহৃত কাপড়গুলি বড়লাগী পট নামে পরিচিত। সপ্তাহের প্রতিদিনই ভিন্ন ভিন্ন রঙের বড়লাগী পটে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের অপূর্ব শৃঙ্গার হয়। তবে প্রতিটি বারের জন্য নির্দিষ্ট রঙ রয়েছে। যথা — রবিবারে ব্যবহার করা হয় নিটোল লাল রঙের বড়লাগী পট। রবিবার সূর্যের বার। সোমবার ব্যবহার করা হয় সাদা রঙের বড়লাগী পট। সোমবারের বড়লাগী পটটি সাদা হলেও এর ওপরে কালো রঙের বিভিন্ন অলংকরণ দেখা যায়। সোমবার চন্দ্রের বার। জগন্নাথ চন্দ্র-সূর্য বড় ভালোবাসেন। জগন্নাথের বিভিন্ন বেশে কাগজের বা শোলার বা ধাতুর চন্দ্র-সূর্য তাঁর মাথায় শোভা পায়। মঙ্গলবারের বড়লাগী পটটি অনেকটা বিশেষ। পঞ্চরঙ্গী রঙের বড়লাগী পটে এই দিনে জগন্নাথ সাজেন। পঞ্চরঙ্গী পটে হলুদ, নীল, লাল, সবুজ ও কালো রঙের ছড়াছড়ি থাকে। এই রেশমী বড়লাগী পটের ধুতি ওড়িশার ব্রাহ্মণসমাজে খুব জনপ্রিয়। অব্রাহ্মণ মানুষেরাও পঞ্চরঙ্গী পটের ব্যবহার করেন। বুধবারে ব্যবহার করা হয় মৃদু নীল বা আকাশী নীল রঙের বড়লাগী পট। এই রঙটি জগন্নাথের বিশালত্বের সাক্ষ্য দেয়। অনেকের মতে বুধবারে জগন্নাথ সবুজ রঙের কাপড়ও পছন্দ করেন। বৃহস্পতিবার বা গুরুবার শ্রীমন্দিরের অন্যতম বিশেষ বার। এই দিনে সমগ্র ওড়িশায় ভগবতী লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা হয়। ঘরে ঘরে জগন্নাথপ্রিয়া লক্ষ্মী বা শ্রীদেবীর আরাধনা হয়। লক্ষ্মীপুরাণ পঠিত হয় ঘরে ঘরে। বৃহস্পতিবারে জগন্নাথ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রঙ হলুদ বা পীত বর্ণের বড়লাগী পট পরেন। জগন্নাথের বন্দনায় গাওয়া হয়, “জয় শঙ্খগদাধর নীলকলেবর পীতপটাম্বর দেহিপদম্।” এবং “চন্দনচর্চিত নীলকলেবর পীতবসন বনমালিন্৷” জগন্নাথকে উজ্জ্বল হলুদ বস্ত্রে, সুভদ্রাকে রক্তিম লাল বস্ত্রে ও বলভদ্রকে ঘন নীল বস্ত্রে সাজাতে অনেক ভক্তই ভালোবাসেন। শুক্রবারের বড়লাগী পটের জন্য নির্ধারিত রয়েছে সাদা রঙ। সাদা রঙ পবিত্রতা, শান্তি, দেবপ্রীতি ও নির্ভরতার প্রতীক। শনিবারে জগন্নাথ কালচে নীল বা বেগুনী রঙের বড়লাগী পটে সাজেন। শ্রীমন্দিরের আলো-অন্ধকারে জগন্নাথের শনিবারের বড়লাগী পটের রঙটি কালো রঙ বলে ভ্রম হয়। লোকবিশ্বাস রয়েছে, জগন্নাথ সাত দিনে যথাক্রমে রবি, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করেন। জগন্নাথের শৃঙ্গারের সাত রঙ এই সাত গ্রহের রঙের প্রতীক। আরেকটি জনপ্রিয় মত রয়েছে, জগন্নাথ স্বয়ং সূর্যস্বরূপ। তাঁর সাত দিনের সাত রঙের কাপড় সূর্যের সাত রঙের প্রকাশ করে। জগন্নাথ বহুভাবময় দেবতা। তিনি বৈচিত্র্যময়, তিনি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আহ্বায়ক দেবতা। তাঁর থেকেই বৈচিত্র্যের সূচনা, তাঁর মধ্যেই বৈচিত্র্যের লয়।

The Jagannath God

বড় শৃঙ্গার বেশ (Bada shrungara besha)

জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের দৈনন্দিন বেশ ও শৃঙ্গারের মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বেশ তাঁদের বড় শৃঙ্গার বেশ। সারাদিনের শেষে জগন্নাথ বড় শৃঙ্গার বেশে সেজে ওঠেন। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথ হয়ে ওঠেন নয়নাভিরাম, নয়নবিমোহন। জগন্নাথ এমনিতেই অনির্বচনীয় সুন্দর, তার ওপর তিনি যখন বড় শৃঙ্গার বেশ ধারণ করেন তখন তাঁর থেকে চোখ ফেরানো যায় না। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বড় শৃঙ্গার বেশ প্রতি রাতে রাত্রি পহুড়ার (রাত্রির শেষ অনুষ্ঠান) ঠিক আগে আয়োজন করা হয়। বড় শৃঙ্গার বেশের মূল উপাদান দুই ধরনের। প্রথমটি হলো গীতগোবিন্দ খান্দুয়া পট (এক ধরনের রেশমী কাপড়) ও দ্বিতীয়টি ফুলের তৈরি বিভিন্ন অলংকার। ফুলের অলংকারগুলি তুলসী ও রকমারী ফুল দিয়ে তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যবাহী রীতিতে বহুকাল ধরে একই মাপের ফুলের অলংকারগুলি তৈরি করা হয়। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথের অনুরূপভাবে সেজে ওঠেন সুভদ্রা ও বলভদ্র।

জগন্নাথের মাথায় কানঢাকা টুপির মতো করে রেশমী কাপড় আবৃত করা হয়। অবশ্য জগন্নাথের মুখাবয়ব সম্পূর্ণ অনাবৃত থাকে। এই কাপড়টির নাম শ্রীকাপড়। শ্রীকাপড় শুধুমাত্র বিগ্রহের মস্তকের অংশই সাজাতে ব্যবহৃত হয়। জগন্নাথের মাথা থেকে পাশ ঘুরে হাতের অংশ পর্যন্ত শ্রীকাপড় শোভিত হয়। জগন্নাথের বাকি শরীর সাজানো হয় মিহি রেশমী সুতোয় বোনা খান্দুয়া পটে। বড় শৃঙ্গার বেশে জগন্নাথের কপালে দেখা যায় পুষ্পতিলক। ঠিক এর ওপরে থাকে চন্দ্রিকা ও অলকপান্তি। এই দুটি অলংকার কপালের মাঝখান থেকে ঝুলে থাকে সামনের দিকে। চন্দ্রিকা ও অলকপান্তির দুপাশ থেকে একাধিক মালা জগন্নাথের শিরোদেশ ঢেকে রাখে। নাকচানা ও নাকুসি সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে থাকে জগন্নাথের ডান নাকার ওপরে। এই অলংকারকে অনেকে গুনা-ঝুম্পাও বলেন। বড় শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথের বাহুতে অনেকটা পদ্মের আকৃতিতে তৈরি বিভিন্ন ফুল সমন্বিত করপল্লব অলংকার সাজানো হয়। বলভদ্রের বাহুতেও করপল্লব অলংকার দেখা যায়। তবে সুভদ্রা দেবীকে এই অলংকারে সাজানো হয় না। জগন্নাথের কানে ফুলের তৈরি মকর আকৃতির কুণ্ডল পরানো হয়। এই অলংকারের প্রথাগত নাম মকরকুণ্ডল। জগন্নাথের বুকের কাছে ঝুলে থাকে হৃদপদক নামের আরও একটি ফুলের বড় মাপের অলংকার। জগন্নাথের গলায়, বুকে দেখা যায় অজস্র ফুলের মালা। এই মালাগুলি এক একটি প্রায় বারো ফুট লম্বা। একইভাবে তুলসীর মালাও পরানো হয়। এই ধরনের মালাগুলি কোনোটি জগন্নাথের হাত থেকে শুরু করে তাঁর সমগ্র শরীর শোভিত করে অন্যহাতেও শেষ হয়। বড় শৃঙ্গার বেশে পদ্মের মালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মনে করা হয় আচার্য শঙ্করের সময়কালেই জগন্নাথের বড় শৃঙ্গার বেশ শুরু হয়েছিল। এই তথ্য যদি প্রামাণিক হয়, তবে জগন্নাথের বড় শৃঙ্গার বেশও প্রায় এক হাজার দুইশো বছরের প্রাচীন একটি বেশ। বড় শৃঙ্গার বেশের সমাপ্ত হতে অনেকক্ষণ সময় লাগে। রত্নসিংহাসনের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম বড় শৃঙ্গারের পর বিশ্রাম করেন। কিন্তু দেবতাদের শয়নের আগে শরীর শীতল করার জন্য চন্দনের সেবা গ্রহণ করেন। ভক্তরা জগন্নাথের এই ফুলের অলংকার ও পোশাক ভিত্তিক শৃঙ্গার দেখার জন্য অধীর আগ্রহে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে। বড় শৃঙ্গার বেশের সময়ে কবি জয়দেব গোস্বামীর ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে কয়েকটি পদ জগন্নাথকে শোনানো হয় :

শ্রিতকমলাকুচমণ্ডল ধৃতকুণ্ডল কলিতললিতবনমালা।
জয় জয় দেব হরে।।
দিনমণিমণ্ডলমণ্ডন ভবখণ্ডন মুনিজনমানসহংস।
জয় জয় দেব হরে।।
কালিয়বিষধরগঞ্জন জনরঞ্জন যদুকুলনলিনদিনেশ।
জয় জয় দেব হরে।।
মধুমুরনরকবিনাশন গরুড়াসন সুরকুলকেলিনিদান।
জয় জয় দেব হরে।।
অমলকমলদললোচন ভবমোচন ত্রিভুবনভবননিধান।
জয় জয় দেব হরে।।
জনকসুতাকৃতভূষণ জিতদূষণ সমরশমিতদশকণ্ঠ।
জয় জয় দেব হরে।।
জনকসুতাকৃতভূষণ জিতদূষণ সমরশমিতদশকণ্ঠ।
জয় জয় দেব হবে।।
অভিনবজলধরসুন্দর ধৃতমন্দর শ্রীমুখচন্দ্রচকোর।
জয় জয় দেব হরে।।
তব চরণে প্রণতা বয়মিতি ভাবয় কুরু কুশলং প্রণতেষু।
জয় জয় দেব হরে।।
শ্রীজয়দেকেবেরিদং কুরুতে মুদং মঙ্গলমুজ্জলগীতি।
জয় জয় দেব হরে।।

জয়দেবকৃত এই পদটি প্রাচীন গুর্জ্জরীরাগে আধারিত। এই বিষয়ে উৎকলে আরও একটি প্রাচীন লোকবিশ্বাস রয়েছে জগন্নাথ অন্যান্য সেবায় যত না তুষ্ট হন তার চেয়ে বেশি তুষ্ট হন গীতগোবিন্দ গীত হলে। মধুরগীতি পদাবলীর কবি জয়দেবের কাব্যের ভাষা মাধুর্যে ভরপুর, মনোমুগ্ধকারী। দীর্ঘদিন শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত দেবদাসীরা গীতগোবিন্দ গেয়ে জগন্নাথকে প্রীতি দিতেন। জগন্নাথের দেবদাসীরা ছিলেন জগন্নাথের জায়া। বর্তমানে শ্রীমন্দিরে কঠোরভাবে দেবদাসী প্রথা বন্ধ করা হয়েছে। এখন জগন্নাথের প্রত্যক্ষ সেবকরাই নিত্যদিন জগন্নাথকে গীতগোবিন্দ শোনান। বলা হয়ে থাকে অনঙ্গভীম দেবের রাজত্বকালে শ্রীমন্দিরে গীতগোবিন্দ গীত হওয়া শুরু হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে ভীষণ মতভেদ রয়েছে। জয়দেবের ওপর বাঙালি ও ওড়িআ জাতি সমান অধিকার দাবি করে। ওড়িআগণ বিশ্বাস করেন কবি জয়দেব কটকের কেন্দুলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বাঙালিগণের বিশ্বাস জয়দেব বঙ্গের বীরভূমের কেন্দুলির ভূমিপুত্র। এই বিতর্ক আজও চলছে। কলকাতার জাতীয় সংরক্ষণশালায় কবি জয়দেবকে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন বীরভূমের বাসিন্দা বলা হয়েছে। বস্তুত উৎকল ও বঙ্গ দুই প্রদেশই কবি জয়দেবের মতো প্রতিভাবান কবির ওপর নিজের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি নয়। তবে শ্রীমন্দিরে গীতগোবিন্দ কাব্যের এতটা সম্মান থাকার পরেও দৃঢ়ভাবে জগন্নাথের কৃষ্ণরূপের প্রতিষ্ঠার কোনো আয়োজন উৎকলে নেই। পুরীতে জগন্নাথকে বৃন্দাবনী বংশীধর কৃষ্ণ রূপে প্রতিষ্ঠার চেয়ে শঙ্খ-চক্রধারী বিষ্ণু রূপে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা রয়েছে। জগন্নাথ-কৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের বা সমাজ অননুমোদিত স্বীকৃতি নেই ওড়িশার জগন্নাথ-ধর্মসভ্যতায়। শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের অন্যতম প্রতিনিধি দেবতা মদনমোহনের সঙ্গে শ্রীদেবীর রুক্মিনী রূপে বিবাহের রীতি রয়েছে। শ্রীক্ষেত্রে রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের পরকীয়া সম্পর্ক প্রায় অননুমোদিত। জয়দেবের গীতগোবিন্দ নিত্যপাঠ্য হলেও তা শুধুমাত্র প্রিয়পাঠের বিষয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে গজপতি মহারাজ প্রতাপরুদ্র দেব ঘোষণা করেন শ্রীমন্দিরে শুধুমাত্র গীতগোবিন্দই সর্বাধিক মান্যতা ও গীত হবে, অন্য কোনো সঙ্গীত এর সমান গুরুত্ব পাবে না। সঙ্গীত রূপে জয়দেবের গীতগোবিন্দ গ্রহণযোগ্য হলেও গীতগোবিন্দের বার্তা, তত্ত্ব শ্রীমন্দিরে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমনকি কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের বর্ণনা অনুযায়ী মহাবিষ্ণুর দশাবতারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গেও শ্রীমন্দিরের জগন্নাথভাবনার মিল নেই। সিংহদ্বারের পতিতপাবন বিগ্রহের জানালার ঠিক ওপরে বিষ্ণুর যে দশাবতার পট রয়েছে সেখানে বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথকে দেখানো হয়েছে, গৌতম বুদ্ধকে নয়। একই আয়োজন ছিল সিংহদ্বারের মূল ফটকের বাইরে দিকে পাথরের ব্লকে তৈরি দশাবতার বিগ্রহেও। এই ব্লকটি মন্দির সংস্কারের সময় খুলে নেওয়া হয়েছিল, তারপর আর লাগানো হয়নি।

গজানন বেশ (Gajanana or Gaja or Hati besha)

স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডের অন্তর্গত পুরুষোত্তমমাহাত্ম্য বা জগন্নাথ কাহিনী অনুসারে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে শ্রীমৎ নারায়ণ দারুবিগ্রহে মানুষের সঙ্গে লীলাবিলাসের জন্য জ্যৈষ্ঠ মাসের পবিত্র পূর্ণিমা তিথিতে (স্নানপূর্ণিমা) ভগবান জগন্নাথ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই পৌরাণিক বৃত্তান্তের সূত্র ধরে আজও পুরুষোত্তমক্ষেত্রে পবিত্র স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথের জন্মতিথি স্মরণে বিপুল সমারোহ করে মহোৎসব পালিত হয়। শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনের দেবগণ সেদিন সকালে শ্রীমন্দির থেকে সুসজ্জিত স্নানমঞ্চে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা সেদিন বহুক্ষণ স্নানমঞ্চে বিরাজমান থাকেন ও সর্বজনগম্য হয়ে ওঠেন। স্নানপূর্ণিমায় জগন্নাথদেব পবিত্র ১০৮ কলসের সুগন্ধি শীতল জলে মহাস্নান করেন। স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিতে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের মূল বিগ্রহের মহাস্নান হয়। বছরের অন্য সব তিথিতেই জগন্নাথের নিত্যপূজার সময় বিগ্রহের সামনে রাখা ধাতুসজ্জিত নির্মল দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবিতে জগন্নাথের স্নান অনুষ্ঠিত হয়। এই রীতিতে ভারতীয় অনেক প্রাচীন মন্দিরেই দেবতার স্নানের রীতি রয়েছে। অনেক প্রাচীন মন্দিরে দর্পণে স্নান ভিন্ন শালগ্রাম শিলা, বাণেশ্বর শিবলিঙ্গ, দেব-দেবীর যন্ত্র, মূল বিগ্রহের অপেক্ষাকৃত ছোট ধাতুবিগ্রহ স্নানের রীতিও রয়েছে। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে বৈদিক ও লৌকিক রীতির মিশ্রণ রয়েছে। স্নানযাত্রায় ব্যবহৃত কলসগুলি স্বর্ণকূপের জলে ভর্তি করা হয়। স্নানমঞ্চে বিরাজমান অবস্থায় সেই জলেই জগন্নাথ স্নান করেন। বছরের বাকি সাধারণ ও বিশেষ তিথিগুলির স্নান অনুষ্ঠানের চেয়ে এই তিথির বিশেষ স্নানের গুরুত্ব এখানেই। রত্নসিংহাসন থেকে দেববিগ্রহ স্নানমঞ্চে স্নানান্তরিত করে তাঁদের স্নানমঞ্চের উপযোগী পোশাকে সাজানো হয়। মহাস্নানের পর তাঁরা অবসর যাপনের উপযোগী পোশাক পরেন ও পরে আবার শৃঙ্গার করেন। সেদিন মহাস্নানের পর দেবগণ স্নানমঞ্চেই পূজা, সেবা, ভোগ ও আরতি গ্রহণ করেন। জগন্নাথ নিজের জন্মদিনে তাঁর ভক্তদের মাঝে অনেকক্ষণ বসে থাকেন। জগন্নাথ ও তাঁর ভক্তদের পারস্পরিক মিলন-বিহ্বলতা বাড়তেই থাকে। সেদিন সন্ধ্যার আগে থেকে জগন্নাথ ও বলভদ্র গজ বেশ বা গজানন বেশ বা গণেশ বেশে সাজতে শুরু করেন। জগন্নাথ ও বলভদ্রের গজ বেশে শ্রীবিগ্রহে হাতির মাথার আকৃতির সজ্জা সংযুক্ত হয়। এই বিশেষ বেশে ব্যবহার করা হয় কাপড়, কাগজ, শোলা, বেতের লাঠি, বাঁশের লাঠি, জরি ইত্যাদি। জগন্নাথের সজ্জায় কৃষ্ণবর্ণে ও বলভদ্রের সজ্জায় শ্বেতবর্ণের প্রাধান্য দেখা যায়। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের বিগ্রহে হাতির মতো দীর্ঘ কান ও শুঁড় দেখা যায়। তবে জগন্নাথের হাতের অংশে বা পায়ের দিকে কোনো অঙ্গ সংযোজন করা হয় না। জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাতের অংশে পদ্মের পাপড়ি বিশিষ্ট বালা সজ্জিত হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের শুঁড় মুখের অংশ থেকে সোজা নেমে এসে শেষ প্রান্তে একদিকে ঝুলে থাকে। জগন্নাথ ও বলভদ্রের এই রকমের সজ্জায় জগন্নাথকে গণেশরূপে পূজা করা করা হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র গজ বেশে সজ্জিত হলেও সুভদ্রা দেবী গজ বেশে সাজেন না। তিনি একই সময়ে পদ্মবেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। সমস্ত সন্ধ্যাকালীন সেবা-পূজা তাঁরা এই বেশেই গ্রহণ করেন। পরে স্নানপূর্ণিমার মধ্যরাতে আকাশে চাঁদ প্রায় মধ্যগগনে এলে উৎকলের হৃদয়সম্রাট জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীবিগ্রহ স্নানমঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে শ্রীমন্দিরের অভ্যন্তরের গোপন অনবসর সেবাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সূর্যালোকহীন অন্ধকার ঘরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা অবসরহীন সেবা গ্রহণ করেন। লোকমুখে প্রচলিত লোকবিশ্বাস রয়েছে এই কদিন তাদের আরাধ্য দেবতা জগন্নাথ জ্বরলীলা করেন। অনবসর সেবাকক্ষে রুদ্ধদ্বার অবস্থায় তাঁরা তিন ভাইবোন একটানা চোদ্দ দিনের জন্য সাধারণ জনতার পার্থিব চোখের আড়ালে অবস্থান করেন। এই সময় ওড়িশার সকলে মনের চোখে জগন্নাথকে দেখার অভ্যাস করেন। এই কয়েকদিন দেবগণ মন্দিরের অভ্যন্তরে গোপন কক্ষে অবস্থান করেন এবং দেবগণের অনবসর কালের নির্দিষ্ট সেবায়ত ব্যতীত কাউকেই মন্দিরের এই নির্দিষ্ট কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এমনকি পুরীর গজপতি মহারাজাও এই কয়েকদিন জ্বরলীলাময় মগ্ন দেবতার দর্শন করতে পারেন না।

জগন্নাথের গজ বেশ শৃঙ্গার প্রচলনের সঙ্গে জগন্নাথের দক্ষিণ ভারতীয় ভক্ত গণপতি ভট্টের উপাখ্যান জড়িত রয়েছে। দাক্ষিণাত্যের বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের অধিবাসী গণপতি ভট্ট ছিলেন সিদ্ধিবিনায়ক গণেশের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি স্নানযাত্রায় অংশ গ্রহণ করতে জগন্নাথক্ষেত্র পুরীধামে এসেছিলেন। তিনি পুরীতে আগমনের আগে লোকমুখে শুনেছিলেন, জগন্নাথ স্বয়ং ভক্তের বাঞ্ছাকল্পতরু। তিনি স্নানমঞ্চে বিরাজমান অবস্থায় গণেশরূপে প্রকাশিত হন। গণপতি ভট্ট সবই বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি জানতেন স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিই জগন্নাথের জন্মতিথি। এমন পবিত্র তিথিতে স্নানমঞ্চে বিরাজমান জগন্নাথের মধ্যে নিজের ইষ্টমূর্তি দেখার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন গণপতি ভট্ট। কিন্তু যখন তিনি স্নানমঞ্চের সামনে এসে দেখলেন, মহাপ্রভু জগন্নাথের শীর্ষভাগে হাতির মাথা নেই, জগন্নাথের মধ্যে গণেশের প্রকাশ নেই, তখন তিনি খুবই হতাশ হয়ে স্নন ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করেছিলেন। এই জন্মে এখনও তার ইষ্টমূর্তি দর্শন হলো না বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। গণপতি ভট্টকে শান্ত করার জন্য স্বয়ং জগন্নাথ সাধারণ ব্রাহ্মণের রূপ গ্রহণ করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশেই তিনি গণপতি ভট্টের কাছে গিয়েছিলেন। স্নানমঞ্চে জগন্নাথকে গণপতি রূপে দর্শন না পেরে গণপতি ভট্ট শ্রীমন্দির অঞ্চল ত্যাগ করে গমন করেছিলেন। তিনি পুরীনগরী ছেড়ে যাওয়ার মতো পরিকল্পনা মনে মনে গ্রহণ করেছিলেন। ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে জগন্নাথ গণপতি ভট্টকে আবার জগন্নাথ বিগ্রহের সামনে যেতে রাজি করান। সন্ধ্যায় গণপতি ভট্ট জগন্নাথের সামনে গিয়ে দেখেছিলেন, জগন্নাথ মহাপ্রভু গণেশরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গণপতি ভট্ট জগন্নাথের নামসংকীর্তন করতে করতে বিহ্বল হয়ে যেতে থাকেন। জগন্নাথের গজ বেশ তাঁর ভক্তাধীন রূপের স্মারক। বাঞ্ছাকল্পতরু জগন্নাথ এই রূপে ভক্তের ঐহিক ও পারৈহিক সমস্ত সৎকামনা পূরণ করেন।

নব যৌবন বেশ (Naba Jaubana besha)

পবিত্র স্নানযাত্রা তিথিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে একশো আট ধাতব কলসের ঠাণ্ডা জলে মহাস্নান করে ও সেই অবস্থায় অনেকক্ষণ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমার রাতেই জগন্নাথ জ্বরলীলা শুরু করেন। এই সময় তিনি একটানা পনেরো দিন শ্রীমন্দিরের অতি গোপন অনবসর সেবাকক্ষে রুদ্ধদ্বার‌‌‌ অবস্থায় থাকেন। প্রথম নয়দিন তিনি জ্বরলীলা করেন ও দশম দিন থেকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। পনেরোতম দিনে এসে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই পক্ষব্যাপী সময়ে জগন্নাথ বিভিন্ন ভেষজ পাচন, ওষুধ ও পথ্য সেবা নেন। এসবের পদ্ধতি অতি গুপ্তভাবে রাখা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে অনবসর সেবার রীতিপদ্ধতি প্রকাশিত করা হয় না। জগন্নাথের এই সময়পর্বের সেবাপদ্ধতিকে অনবসর সেবা বলা হয় কারণ, এই কয়েকদিন ধরে জগন্নাথের অবসরহীনভাবে সেবাশুশ্রূষা চলে। বাস্তবিকই এই সেবাটি অক্লান্ত পরিশ্রমের। জগন্নাথের অনবসর সেবার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহের মূল উপাদান নিমদারু। স্নানযাত্রার পবিত্র তিথিতে সেই দারুবিগ্রহে জগন্নাথের স্নান, অভিষেক ইত্যাদি হয়। ফলে, দারুবিগ্রহগুলি এত কলসের জলে ভীষণভাবে আর্দ্র হয়ে ওঠে। তদুপরি আষাঢ় মাসে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমনে বাতাসে জ্বলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে দারুবিগ্রহের আগের মতো শুকিয়ে পূর্বরূপে ফিরে আসতে সময় লাগে। তাছাড়া জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীবিগ্রহের মূল উপাদান নিমদারু হলেও, নিমদারুর স্তরের ওপরে আরও কয়েকটি স্তরের বিভিন্ন উপাদান লেপন করা হয়। এর ফলে দারুবিগ্রহের যত্ন বৃদ্ধি পায় ও বিগ্রহগুলি প্রাকৃতিক ক্ষয়ের থেকেও রক্ষা পায়। পুরীধামের কতিপয় প্রাচীন বিগ্রহ শিল্পালয়ে এই ধরনের সপ্তস্তরে তৈরি শ্রীবিগ্রহ আজও সন্ধান করলে পাওয়া যায়। জগন্নাথ বিগ্রহের বাহ্যিক স্তরগুলি জলের সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগ্রহগুলি প্রাকৃতিক আলোতে বা সূর্যালোকে রেখে শুষ্ক করা হয় না। শ্রীবিগ্রহের অঙ্গরাগহীন মহাকায় ভক্তের কাছে বাঞ্ছিত নয়। ফলে এই পনের দিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের পরিচিত সর্বজনীন হৃদয়গ্রাহী রূপ ফিরিয়ে আনা হয়।

অনবসর সেবাকক্ষে একটানা পনেরো দিনের অক্লান্ত সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে ওঠার পরে মহাপ্রভু জগন্নাথ ও তাঁর ভাইবোন বলভদ্র-সুভদ্রার সঙ্গে তাঁদের যৌবনের সুশ্রী চেহারা ফিরে পান এবং তাঁরা আবার তাঁদের হৃদয়বিহারী ভক্তদের চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে দর্শন দিতে আসেন। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার এই চিরপুরাতন ও চিরনতুন চেহারায় ফিরে আসার দিনে তাঁদের সজ্জা বা রূপকে নবযৌবন বেশ বলা হয়। আরেকটি লোকপ্রচলিত মত রয়েছে, স্নানযাত্রার দিন জগন্নাথের জন্ম, সেদিন থেকে পরবর্তী পনেরো দিনে তিনি এক এক কলা করে ষোলো কলায় পূর্ণ হন। এই ষোলটি দিন এক এক বছরের স্মারক। স্নানযাত্রা থেকে পরবর্তী পনেরো দিন পার করে তিনি যৌবনে অভিষিক্ত হন। এরপরেই চলে তাঁর গুণ্ডিচা (বৃন্দাবন) বিহার। দারুবিগ্রহে জগন্নাথের দেহের সজীবতা উদযাপন করতে নবযৌবন বেশ যথেষ্ট সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। দৈতাপতিগণ জগন্নাথের ‘চকা চকা’ আঁখি রঙ করেন। ভক্তরা যেমন জগন্নাথকে চোখ বড় বড় করে দেখেও আশ মেটাতে পারেন না, তেমন মহাপ্রভু জগন্নাথও তাঁর হৃদয়ে অনাবিল আনন্দের উৎসসম ভক্তদের দেখেন বড় বড় চোখে। ভক্তের সামান্য ত্যাগ, ভালোবাসা, ভক্তিকে তিনি অনেক বড় করে দেখেন বলেই তাঁর চোখ দুটি এত বড়। তাঁর ভক্ত তাঁর দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়, তিনিও তাঁর ভক্তদের চোখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যান। ভগবান ও ভক্তের এই পারস্পরিক ভালোবাসার নির্দশন রূপে দেখা যায় জগন্নাথের দীর্ঘ অদর্শনের পর তিনি নবযৌবন বেশে প্রকাশিত হলে লক্ষ লক্ষ ভক্ত তাঁকে দেখতে ব্যাকুল হয়ে ছুটে আসেন শ্রীমন্দিরে। জগন্নাথের নবযৌবন বেশে সজ্জিত হয়ে শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে বিরাজমান রূপটির আয়োজন হয় বেলা আড়াইটের পর থেকে। জগন্নাথের নবযৌবন বেশের সময় থেকেই সিংহদ্বারে বিরাজমান পতিতপাবন বিগ্রহেরও দর্শন শুরু হয়।

তাহিয়া লাগি বেশ (Tahiya lagi besha)

শ্রীক্ষেত্রেশ্বর পুরুষোত্তম জগন্নাথ তাঁর নিত্যলীলাবিলাসে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তিথিতে বৈচিত্র্যময় হয়ে ভক্তদের হৃদয়ে অনাবিল আনন্দ প্রবাহিত করেন। তিনি কখনও সোনার অলংকারে রাজাধিরাজ রূপে প্রকাশিত হন, আবার কখনও ফুলসাজে গোপনায়ক রূপেও প্রকাশিত হন। তিনি কখনও ভাব বিমোহিত ভক্তের বয়ে আনা শুকনো ফুলকে সদ্য ফোটা ফুলে পরিণত করে সাজেন, আবার কখনও ফুলের অনুকরণে তৈরি করা শোলার ফুলের সজ্জায় সজ্জিত হয়েও সমানভাবে আনন্দ মিছিল করেন। জগন্নাথ ভাবগ্রাহী জনার্দন। তাঁর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে তদ্ভাবরঞ্জিত হয়েই ভক্তরা উল্লসিত হয়ে পড়েন। তিনি সোনায় সাজলেন কি সাধারণ উপাচারে সাজলেন তা তুচ্ছ হয়ে যায়। জগন্নাথ স্বয়ং পরশপাথরের মতো, তাঁকে যে স্পর্শ করে বা যা তাঁর স্পর্শ লাভ করে সবই সোনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে যায়।

প্রতি বছর আষাঢ় মাসে পবিত্র রথযাত্রার সময়ে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ মহাপ্রভুর তাহিয়া লাগি বেশ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। রত্নসিংহাসনের প্রধান তিন দেবতা জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র তাহিয়া নামক একটি বিশেষ ধরনের মুকুট পরেন। তাহিয়া বেশের এই মুকুট জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের একমাত্র অলংকার বা সজ্জার উপকরণ যা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের পর রত্নসিংহাসনের প্রধান দেবদেবীরা ভক্তদের মধ্যে দান করেন। জগন্নাথের তাহিয়া বেশে প্রতি বছর একাধিক তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিগুলি হলো স্নানপূর্ণিমা, রথযাত্রা, বহুড়া যাত্রা (পুনর্যাত্রা, প্রচলিত শব্দ উল্টোরথ) এবং নীলাদ্রী বিজয়ের তিথি। এই চারটি তিথিতে শ্রীমন্দিরের নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে জগন্নাথের যাত্রাকালে হাল্কা সাজের সুন্দর তাহিয়া বেশ শৃঙ্গারে রত্নসিংহাসনের প্রধান দেবতাদের পরিধান করানো হয়। সুদর্শন চক্র, ভূদেবী, শ্রীদেবী ও নীলমাধব বিগ্রহে এই বৈচিত্র্য সেভাবে দেখা যায় না।

জগন্নাথদেব যখন মাথায় তাহিয়া মুকুট পরে তাহিয়া বেশ শৃঙ্গারে সজ্জিত হয়ে শ্রীমন্দিরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে ভক্তদের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ান তখন জগন্নাথের ভক্তদের হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে সমগ্র শ্রীক্ষেত্রে আনন্দের জোয়ার আসে। তাহিয়া বেশে সুসজ্জিত হয়ে প্রথমে দেখা দেন অনন্তাবতার বলভদ্রদেব, তাঁর ঠিক পরেই আসেন যোগমায়া দেবী সুভদ্রা। তাঁদের দুজনের এই সজ্জায় প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের জগন্নাথ দর্শনজনিত উন্মাদনা সপ্তমে চড়ে যায়। অবশেষে অজস্র ভক্তহৃদয়ের অধিপতি জগন্নাথ তাহিয়ায় সজ্জিত হয়ে দেখা দেন। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের তাহিয়া বেশে একস্থান থেকে অন্য স্থানে গমন ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে অন্যতম চিত্তাকর্ষক ঘটনা। এই বেশে জগন্নাথ ভক্তদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। জগন্নাথ তাঁর প্রায় অন্য সব বেশেই রত্নসিংহাসনে বসে ভক্তদের সঙ্গে দেখা করেন। সেক্ষেত্রে ভক্তরা শ্রীমন্দিরে গিয়ে জগন্নাথকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন। কিন্তু তাহিয়া বেশটি বিপরীত ঘটনা ঘটায়। তাহিয়ার সাজে সজ্জিত জগন্নাথ তাঁর ভাই-বোনের সঙ্গে শ্রীমন্দির থেকে বাইরে এসে ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হন। তাহিয়া বেশে সুসজ্জিত জগন্নাথের অভিযাত্রার একটি অতি ছোট বর্ণনা চৈতন্যজীবনীকার কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এর মধ্যলীলায় পাওয়া যায় :

বলিষ্ঠ দয়িতাগণ যেন মত্ত হাতী।
জগন্নাথ বিজয় করায় করি হাতাহাতি।
কতক দয়িতা করে স্কন্ধ আলম্বন।
কতক দয়িতা ধরে শ্রীপদ্মচরণ।।
কটিতটে বদ্ধ দৃঢ় স্থূল পট্টডোরী।
দুই দিকে দয়িতাগণ উঠায় তাহা ধরি।।
উচ্চ দৃঢ় তুলী সব পাতি স্থানে স্থানে।
এক তুলী হৈতে ত্বরায় আর তুলীতে আনে।।
প্রভু-পদাঘাতে তুলী হয় খণ্ড খণ্ড।
তুলা সব উড়ি যায় শব্দ হয় প্রচণ্ড।।
বিশ্বম্ভর জগন্নাথে কে চালাইতে পারে।
আপন ইচ্ছায় চলে করিতে বিহারে।।

এই অংশটি জগন্নাথের শ্রীমন্দির থেকে বাইরে এসে রথে ওঠার দৃশ্য। জগন্নাথের এই গমন অনেকখানি দুলে দুলে। জগন্নাথের মুকুটের অংশে তাহিয়াটি এই দুলকিচালে যাত্রাকালে খুব ঝাঁকুনি পায়। জগন্নাথের দুলে দুলে চলার তালে তালে তাঁর তাহিয়াটি একবার সামনে একবার পিছনে করে অতি দ্রুত দোলা খেতে থাকে। তাহিয়ায় এভাবে বহুবার ঝাঁকুনি লাগতে থাকায় তাহিয়ার বিভিন্ন অংশ আলগা হয়ে খসে পড়তে থাকে। জগন্নাথের ভক্তরা জগন্নাথের ব্যবহৃত তাহিয়ার পড়ে যাওয়া টুকরোগুলি নিজেদের বাড়ির কোনো পবিত্র স্থানে, গৃহদেবতার ঘরে, ঘরের নির্দিষ্ট পূজাস্থানে দারুব্রহ্ম ভগবানের স্পর্শধন্য স্মারকটি সংরক্ষিত করে রাখে। আবার অনেকে গৃহনির্মাণ বা মন্দির নির্মাণ করার সময় ভিত্তিতে জগন্নাথের তাহিয়ার টুকরো পরম শ্রদ্ধায় গেঁথেদেয়। সাধারণত মঙ্গলদ্রব্য ও ঈশ্বরের আশীর্বাদ রূপে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এই রীতির মান্যতা রয়েছে।

তাহিয়া নামে পরিচিত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এই বিশেষ গড়নের মুকুটটি মূলত বেত, বাঁশের লাঠি, রঙিন কাগজ, সোলার ফুল, টাটকা প্রাকৃতিক ফুল এবং রঙ (ন্যূনতম পক্ষে লাল রঙ এবং দস্তার রঙের ব্যবহার করা হয়) দিয়ে তৈরি। তাহিয়া মুকুটটি শ্রীবিগ্রহত্রয়ের মাথায় সুসজ্জিত হয় শ্রীমন্দিরের ভেতরেই, যখন তাঁকে শ্রীমন্দির থেকে তিনটি পৃথক রথে একে একে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রথযাত্রার যাত্রাপথের শেষ অবধি এটি শ্রীবিগ্রহত্রয়ের সঙ্গেই থাকে। চাহিয়া মুকুট ওজনে অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় বাতাসের চাপে ও জগন্নাথের গমনের ছন্দে মুকুটটি সামনে-পেছনে করে নির্দিষ্ট ছন্দে দোলা খায়। শ্রীমন্দিরের পক্ষ থেকে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত দক্ষ শিল্পী কারিগরদের ওপরেই তাহিয়া বেলের উপকরণগুলি প্রস্তুত করার ভার অর্পণ করা হয়। তাহিয়া মুকুটটি অনেকখানি সুপারি গাছের পাতার মতো আকারে দেখতে। জগন্নাথ ও বলরামের তাহিয়া মুকুটটি উচ্চতায় প্রায় ছয় ফুট এবং পরিধিতে প্রায়ে সাড়ে আট ফুট। ভগবতী সুভদ্রার তাহিয়ার মাপ একটু ছোট। তাহিয়াকে নির্দিষ্ট শিল্পসম্মত আকৃতি দেওয়ার জন্য একসঙ্গে তিনটি করে কাঁচা বাঁশের কাঠি সুতির সুতো দিয়ে একসঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অজস্র ছোট ও বড় কাঁচা বাঁশের লাঠি এই বেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাঁশের কাঠির পাশাপাশি একটু শক্ত ধরনের বেত কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবহার করা হয়। এর ফলে তাহিয়াটি আরও মজবুত হয় এবং রথযাত্রার ভূয়সি হুল্লোড়েও তাহিয়া মুকুটটি ভেঙে যাওয়ার ভয় কমে যায়। টাটকা তাজা জুঁইফুল ছাড়াও সোলা দিয়ে তৈরি ফুলও ব্যবহার করা হয়। তবে সোলা দিয়ে তৈরি তাহিয়ার ঠিক শীর্ষ অংশে কদম্ব ফুলের সারি প্রতিটি তাহিয়া মুকুটের শোভা ও সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে তোলে। পুরীর জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ ছয় ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার। প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার জগন্নাথ বিগ্রহের মাথায় এত বড় ও উচ্চতা বিশিষ্ট মুকুটটি আরও মনোরঞ্জক দেখায়। জগন্নাথদেব রথে ওঠার সময় তাহিয়া ছাড়া আর কোনও মূল্যবান অলংকার পরেন না। অর্থাৎ একটা স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি এই সময় শৃঙ্গার করেন। এই বেশে জগন্নাথ সহজ-সুন্দর, তিনি সাধারণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে জনসাধারণের প্রিয়ধন হয়ে ওঠেন।

জগন্নাথের তাহিয়া বেশের প্রবর্তনের সঙ্গে তাঁর ভক্তপ্রবর রঘুর কাহিনী অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত রয়েছে। জগন্নাথের প্রেমধনে মত্ত ভক্ত রঘু পুরীর শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারের কাছে আকাশের জ্বলন্ত সূর্যের নীচে শ্রীমৎ মহাপ্রভু জগন্নাথের ধ্যান করছিলেন। পুরীর তৎকালীন গজপতি মহারাজা রাজা ছাতার আচ্ছাদনের (ওড়িশার বিশেষ ধরনের ছাতা তাতি) মাধ্যমে জগন্নাথের ভগবৎচিন্তায় মগ্ন ভক্তদের সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য সেবাস্বরূপ ছায়া সরবরাহ করতেন। গজপতি মহারাজা একই ভাবে জগন্নাথের ভক্ত রঘুর জন্যও একটি ছাতা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় তপস্বী সাধকদের বিশ্বাস রয়েছে, পক্ষী ও সন্ত কিছুই সঞ্চয় করেন না। সন্ত রঘুও গজপতি মহারাজা প্রদত্ত সুন্দর কারুকার্যময় ছাতার কোনও ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব না করে সেটিকে অবহেলায় ফেলে দিলেন। গজপতি মহারাজা পরদিন সকালে আবার ভক্ত রঘুকে আগের অবস্থায় ধ্যানস্থ দেখে আবার তাঁর জন্য একই রকমের সুন্দর ছাতার ছায়া তৈরি করে দিলেন। কিন্তু এবার ঘটল অন্য ঘটনা। যখন ভক্ত রঘু আচ্ছাদনটা টেনে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, তখন শ্রীনাথ জগন্নাথ ভক্ত রঘুর সামনে উপস্থিত হলেন। রঘু আনন্দে বিস্ময়ে চিৎকার করে বললেন, “হে মহাপ্রভু জগন্নাথ, হে প্রভু, আপনি আমার মাথায় আচ্ছাদন দিয়েছিলেন, এবার আমি আপনার মাথায় তাহিয়া দিয়ে আবৃত রাখব।” সেই ঘটনার পর থেকে ভক্ত রঘু রত্নসিংহাসনের দেবদেবীদের বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ বিশেষ যাত্রার জন্য তাহিয়ার নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ করতেন। অবশ্য এই কিংবদন্তির আরেকটি রূপে পাওয়া যায়, জগন্নাথ মহাপ্রভু তাঁর অন্যতম প্রিয় সাধকের ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং ভক্ত রঘুর সামনে বালগোপাল রূপে উপস্থিত হন। সেখানে বালগোপাল রূপী জগন্নাথ তাঁর ভক্ত রঘুর পিছনে ছাতা ধরে অলক্ষ্য পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন। জগন্নাথের বালগোপাল সম বিগ্রহ এখনও ওড়িশার কিছু ঘরে দেখা যায়। এই ঘটনার পর থেকে ভক্ত রঘু আষাঢ়ের দিব্যরথযাত্রার সময় জগন্নাথের সজ্জা সংক্রান্ত তাহিয়া সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়ধন জগন্নাথকে।

32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu

রাজরাজেশ্বর সোনা বেশ (Rajarajeswar Suna besha)

রাজরাজেশ্বর জগতের নাথ জগন্নাথ মহাপ্রভুর সমস্ত বিশেষ বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে বহু সোনার অলংকারে সজ্জিত পোশাক বা সোনা বেশ (ওড়িশা উচ্চারণে সুনা বেশ) সবচেয়ে আকর্ষণীয়। জগন্নাথ মহাপ্রভুকে সমগ্র বিশ্বের রাজা বলা হয়। যিনি সমগ্র বিশ্বের রাজা সমস্ত বিশ্বের সবকিছুই তাঁর সম্পদ। এমন কিছুই নেই যা তাঁর নেই। শুধুমাত্র একটি পৃথিবী নয় অজস্র সৌরমণ্ডলের সবকিছুই তাঁর। ভাগবতের ব্রহ্মসংহিতায় তিনিই কৃষ্ণরূপে এই তত্ত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। জগন্নাথ মহাপ্রভুর সোনা বেশ শৃঙ্গারে তাঁর সম্পদের কণামাত্র প্রতিফলিত হয়। সমগ্র বিশ্বই যাঁর সম্পদ সামান্য কয়েকটা সোনার অলংকার যে তাঁর কাছে অতি নগন্য সম্পদ। কিন্তু পার্থিব বস্তুজীবনের দৃষ্টিতে জগন্নাথের সোনা বেশ বাস্তবিকই শ্রীমন্দিরে দেবতার বিত্ত, বৈভব ও ধনের প্রমাণ রাখে।

জগন্নাথের সোনা বেশ তাঁর রাজা বেশ, রাজরাজেশ্বর বেশ ও রাজাধিরাজ বেশ নামেও পরিচিত। সোনার বহুবিধ অলংকারে সজ্জিত জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার সোনা বেশ বছরে পাঁচবার পাঁচটি বিশেষ তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই পবিত্র তিথিগুলি হলো আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশী, আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের দশমী বা দশহরা (দশেরা বা বিজয়া দশমী), কার্তিক পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমা, পৌষ পূর্ণিমা ও মাঘ পূর্ণিমা। রথযাত্রা উৎসব পরবর্তী আষাঢ়ের শুক্লা একাদশী তিথিতেই একমাত্র জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার সোনা বেশ শ্রীমন্দিরের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিথিতে তাঁরা শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারের বাইরে নিজ নিজ রথে বিরাজমান অবস্থায় সোনা বেশ গ্রহণ করেন। গুণ্ডিচা প্রত্যাগত অভ্রভেদী রথে বিরাজমান জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে প্রবেশের আগে এই সমারোহপূর্ণ সোনা বেশ তাঁর প্রতিপত্তির বার্তা দেয়। জগন্নাথ উৎকলের ভূমির ও উৎকলবাসীর হৃদয়ের রাজা। বাকি চারটি তিথির সোনা বেশ অনুষ্ঠিত হয় শ্রীমন্দিরের ভেতরে। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রত্নসিংহাসনে বিরাজমান অবস্থায় সোনা বেশ গ্রহণ করেন।

উৎকলের প্রাচীন রাজা অনঙ্গভীম দেবের শাসন তথা রাজত্বকালে তিনি মহাপ্রভু জগন্নাথকে উৎকল সম্রাট বা সমগ্র জাতির প্রভু হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন হয়েছিল। মহারাজা অনঙ্গভীম দেব পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের নির্মাণের কাজ শুরু করিয়েছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষ প্রান্তে পুরীর বর্তমান শ্রীমন্দিরের কাজ সমাপ্ত হয়।ততদিনে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। জগন্নাথের শ্রীমন্দিরের ইতিহাস অনুসারে, জগন্নাথের সোনা বেশের প্রাচীন পরিচয় পাওয়া যায়, গজপতি মহারাজা কপিলেন্দ্রদেবের যুগে জগন্নাথের প্রথম সোনা বেশ আয়োজন করা হয়েছিল। রাজা কপিলেন্দ্রদেব দাক্ষিণাত্য বিজয়ের পর গৃহভূমে ফেরার সময় মোট ষোলটি হাতি বোঝাই করে তাঁর আরাধ্য দেবতা জগন্নাথের জন্য বিবিধ ভেট এনেছিলেন। মাদলা পাঁজিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যে ১৪৬০ সালে গজপতি কপিলেন্দ্র দেবা মহাপ্রভু জগন্নাথ ও ভগবতী জয়দুর্গার আশীর্বাদে দক্ষিণ ভারতের রাজার ওপর বিজয় লাভ করে লব্ধ সম্পদের সিংহভাগ ওড়িশায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। অর্জিত সমস্ত সম্পদ তিনি নিজে ভোগ করতে চাননি। তিনি সমস্ত সম্পদ আরাধ্য জগন্নাথকে দান করেছিলেন। তিনি যে সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন সেগুলিতে হীরা, জহরত, সোনা ও রূপার ভাগ ছিল অনেকখানি। তিনি মন্দিরের সেবায়েত বা পুরোহিতদের রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে দেব-দেবীদের শোভিত করার জন্য যে সোনা ও হীরা দিয়েছিলেন তা দিয়েই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ অলংকারে সজ্জিত করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই থেকে রত্নসিংহাসনের দেবতারা অর্থাৎ জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা প্রতি বছর বহুড়া যাত্রার পরে এই প্রাচীন গহনা দিয়ে সজ্জিত হয়ে আসছেন।

জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার যাবতীয় গহনা সারা বছর শ্রীমন্দিরের প্রশাসন, কার্যকর্তাদের মাধ্যমে শ্রীমন্দিরের গোপন ‘ভিতর ভাণ্ডারঘরে’ রক্ষা করা হয়। জগন্নাথের রত্নভাণ্ডারে দেবোত্তর দেড় শতাধিক সোনার গয়না রয়েছে। সোনা বেশের সময় জগন্নাথ ও বলভদ্র সোনার তৈরি হাত-পা ধারণ করেন। সুভদ্রা বিগ্রহে হাত-পায়ের সংযোজন হয় না। তিনটি বিগ্রহকে মাথায় অপূর্ব মুকুট, বাহুতে তাগাদি, কণ্ঠে রত্নহার দিয়ে সাজানো হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র কপালে ধাতুর তৈরি তিলক সেবা করেন। সোনা বেশের সময় জগন্নাথ শঙ্খ ও চক্র এবং বলভদ্র হল ও মষুল ধারণ করেন। সোনার তৈরি চন্দ্রসূর্য, সূর্যমুখী ফুল, পদ্ম ফুল দিয়েও বিগ্রহ সজ্জা করানো হয়। জগন্নাথের এই বেশ ভক্তদের স্মরণ করিয়ে দেয় তিনিই জগতের রাজা। একজন প্রকৃত রাজার কাছে যেমন প্রতিটি প্রজাই তাঁর নিজের সন্তান সমান, তেমনই জগন্নাথের রাজ্যে প্রতিটি ভক্তই তাঁর সন্তান, অমৃতের পুত্র। তিনি জগতের পালনকর্তা।

পুনশ্চ : আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে আয়োজিত জগন্নাথের সোনা বেশ (Ratha Suna besha) শৃঙ্গারেই ভিন্ন নামে আশ্বিনের শুক্লপক্ষের দশমী বা বিজয়া দশমীতে রাজ বেশ (Raja besha or Dashera Suna besha), কার্তিকের পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমায় রাজরাজেশ্বর বেশ (Rajarajeswar besha or Rasa Purnima Suna besha), পৌষের পূর্ণিমায় রাজাধিরাজ বেশ (Rajadhiraja besha or Pusyaviseka suna besha), ফাল্গুনের পূর্ণিমা বা দোলযাত্রায় রাজা বেশ (Raja besha or Dol Purnima Suna besha) নামে পরিচিত। সরলভাবে বলা যেতে পারে, উল্লিখিত প্রতিটি বেশই জগন্নাথের সোনা বেশ। নাম ও আচার অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য থাকলেও এই বেশগুলির মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই।

প্রলম্বাসুর বধ বেশ (Pralambasura badha besha)

ত্রেতাযুগে জগতের নাথ নারায়ণ রামচন্দ্র রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর লীলাবর্ধনে জন্ম নিয়েছিলেন অনন্তনাগ লক্ষ্মণ রূপে। অনন্তনাগ নারায়ণের নিত্যসেবক। ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র তাঁর জীবনে অনেক এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে শেষাবধি রামচন্দ্র কষ্টে দুঃখে দীর্ণ হয়েছিলেন। রামচন্দ্রের জীবনের সর্বাবস্থায় লক্ষ্মণ তাঁর সহযোগী হয়েছিলেন। রামচন্দ্রের কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত ঠিক মনের মতো না হলেও লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের কোনো কাজের বিরোধিতা করেননি। ভাতৃ-আজ্ঞাকে তিনি চিরকাল মাথায় বহন করেছেন। ত্রেতাযুগে লীলাবসানের পর অনন্তাবতার লক্ষ্মণ বৈকুণ্ঠে এসে নারায়ণের কাছে অভিযোগ করেন, ত্রেতাযুগে অনন্তনাগ রামচন্দ্রের অনুজ লক্ষ্মণ রূপে জন্মগ্রহণ করে চিরকাল রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ ছিলেন। অনুজ হওয়ার জন্য রামচন্দ্রের কোনো কাজ রামচন্দ্রেরই ক্ষতিসাধক হচ্ছে বুঝেও লক্ষ্মণকে চুপ থাকতে হয়েছে। তাই অনন্তনাগ বৈকুণ্ঠে নারায়ণকে সশক্তিক দেখে অনুরোধ করেন, আগামী অবতারে তিনি নারায়ণের অনুজ হয়ে নয়, বরং অগ্রজ হয়ে জন্ম নিতে চান। যাতে প্রয়োজনে লোকাচার মেনে নিজের শাসনে তিনি নারায়ণকে সঙ্কট থেকে আগলে রাখতে পারেন। অনন্তনাগের মনের ভাব বুঝতে পেরে নারায়ণ তাতে সম্মতি দেন। দ্বাপর যুগে জগন্নাথ নারায়ণ কংসের অত্যাচার থেকে ভূদেবীকে রক্ষা করতে ধরাধামে কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত হন। কৃষ্ণের জন্মের কিছুকাল আগে তাঁর অগ্রজ বলরাম রূপে আবির্ভূত হন অনন্তনাগ। বলরাম জন্মগ্রহণ করেন বৃন্দাবনের নন্দরাজগৃহে মাতা রোহিনী দেবীর গর্ভে ও কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন মধুরা নগরীতে রাজা কংসের কারাগারে মাতা দেবকীর গর্ভে। অষ্টমীর গভীর রাত্রে কৃষ্ণের জন্মের পর দৈবের সহায়তায় যাদবরাজ বসুদেব নিজের সন্তানকে তাঁর বিশ্বাসভাজন মিত্র নন্দরাজের গৃহে সুরক্ষিত রাখার বন্দোবস্ত করে মথুরায় ফিরে আসেন। কৃষ্ণ-বলরামের লীলাবিলাসে বৃন্দাবনধাম হয়ে ওঠে দ্বাপরের বৈকুণ্ঠপুর। দ্বাপর যুগে জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের বাল্যলীলায় সমগ্র বৃন্দাবনের ভূমি মাতিয়ে তুলেছিলেন। জগন্নাথ-কৃষ্ণ ও অনন্ত-বলরামের বৃন্দাবনলীলায় বৈষ্ণবীয় পঞ্চরসের প্রতিটি পর্বেরই নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে।

মথুরার রাজা কংস দৈববাণী শুনেছিলেন তার ভগিনী দেবকীর গর্ভজাত অষ্টম সন্তান তার বিনাশ করবে। দেবকীর গর্ভজাত অষ্টম সন্তান কংসের বিনাশ করবে জেনেও অত্যাচারী কংস দেবকীর পরপর ছয়টি সন্তানকে জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করে। দেবকীর সপ্তম সন্তান তাঁর গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে দেবকীর গর্ভে স্বয়ং ভগবান জন্ম গ্রহণ করেন। বসুদেব তাঁদের অষ্টম সন্তানকে রক্ষা করতে সমর্থ হলেও দেবকী দীর্ঘদিন সেই সংবাদ জানতে পারেননি। অবশেষে দেবকীর অষ্টম সন্তান কৃষ্ণের মহিমার কথা বৃন্দাবন ছাপিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে মথুরায় কংস ভীত হয়ে ওঠেন। প্রাণভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত কংস দৈববাণীর কথা ভুলে যেতে পারেননি। তিনি শিশু কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য তার অনুগামী অসুর ও রাক্ষসদের একে একে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ও বলরামকে হত্যার জন্য পাঠাতে থাকেন। কিন্তু যিনি পূর্ণব্রহ্ম জগন্নাথের বিনাশ তিনি না চাইলে আর কে ঘটাবে! বাল্যাবস্থা থেকেই কৃষ্ণ ও বলরাম কংসের প্রেরিত সমস্ত দুষ্টজনকে অবলীলায় সংহারে সমর্থ হন।

মথুরারাজ কংসের আজ্ঞাবহ হয়ে প্রতাপশালী বহুরূপধর অসুর প্রলম্ব কংসের কালরূপ কৃষ্ণের সন্ধানে যমুনার তীরবর্তী বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন। প্রলম্বাসুর কৃষ্ণকে চিনত না, আগে সে কোনোদিন কৃষ্ণকে দেখেওনি। বৃন্দাবনে গিয়ে প্রলম্বাসুর নিজের বিকট রূপ মায়ায় আবৃত করে একজন শিশুর রূপ ধারণ করে। প্রলম্বাসুরের ইচ্ছা ছিল বন্ধুর বেশে কৃষ্ণের সঙ্গে মিশে কৃষ্ণের বিনাশ সাধন করে তার প্রভু কংসের সাহায্য করা। মায়ায় শিশুর ছদ্মবেশে প্রলম্বাসুর অনায়াসে গোপবালক দলের মধ্যে মিশে যেতে সমর্থ হন। শিশুরা সরলমতি তারা কেউই বুঝতে পারেনি এই নব্যাগত শিশুটি তাদের মধ্যে কারও একজনের ক্ষতিসাধন করতে এসেছে।

বৃন্দাবনের মূলধন গাভীদের তৃণভূমিতে চড়তে দিয়ে গোপবালকগণ ও কৃষ্ণ-বলরাম নিজেদের নিত্যনতুন খেলায় মেতে উঠলেন। শিশুর ছদ্মবেশে আসা প্রলম্ব অসুর এক নতুন খেলার পরামর্শ দেয়। বালকেরা দুদিকে দুই দলে ভাগ হয়ে খেলবে। খেলার শেষে যে দল হারবে সেই দল অন্য দলকে কাঁধে করে এক প্রান্ত অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বহন করবে। এই খেলার পরামর্শে সকলেই রাজি হয়। কিন্তু দুইটি দলের মধ্যে যে দলপতি দরকার। কৃষ্ণ ও বলরাম দুই জনে যে দলে থাকবে সেই দলকে হারায় কার সাধ্যি! অতএব কৃষ্ণ ও বলরাম দুই দলের দলপতি হলেন। খেলা হলো সমানে সমানে। এই খেলায় কৃষ্ণের দলকে হারিয়ে জয়ী হলো বলরামের দল। বলরামের দলে হৈ হৈ করে আনন্দ হলো। শর্ত মতো কৃষ্ণের দলের শিশুরা বলরামের দলের শিশুদের কাঁধে তুলে অন্য প্রান্তের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল‌। এই সুযোগে শিশুর ছদ্মবেশী প্রলম্বাসুর বলরামকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করে দিল। প্রলম্বাসুর বলরামকে কৃষ্ণ ভেবে ভুল করেছিল। প্রলম্বাসুর বলরামকে কাঁধে নিয়ে যত এগায় ততই শিশু বলরামের ভার বৃদ্ধি পেতে থাকে। যে বলরাম স্বয়ং বিশ্বম্ভর ভগবানের অংশ তাঁর ভার বহন করা সামান্য কথা নাকি! যথারীতি শিশুর ছদ্মবেশে থাকা প্রলম্বাসুর দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। একপ্রকার বাধ্য হয়ে শেষে প্রলম্বাসুর নিজের আসল বিকট মূর্তি ধারণ করল। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেল সমস্ত গোপবালক। ভয়ে তারা অন্যত্র গমন করল। এই সুযোগে কৃষ্ণ ও বলরাম নিজের আত্মশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে প্রলম্বাসুরকে সংযত করলেন। বলরাম ভীষণ আঘাতে আঘাতে প্রলম্বাসুরকে মুক্তি দানে ধন্য করলেন। প্রলম্বাসুর বলরামের হাতে মৃত্যুলাভ করে বিষ্ণুলোকে গমন করল।

শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা প্রতি বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে প্রলম্বাসুর বধ বেশে সুসজ্জিত হন। এই বেশে মূলত বলভদ্রদেবের পোশাকেই বৈচিত্র্য বেশি থাকে। জগন্নাথ ও সুভদ্রা আষাঢ়ের রথযাত্রা পরবর্তী স্বর্ণ বেশ বা সোনা বেশের (সুনা বেশ বা Suna besh) অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথদেব অজস্র সোনার অলংকারে সজ্জিত হন। জগন্নাথ বিগ্রহে দুটি হাত সংযুক্ত করা হয়। জগন্নাথের দুই হাতের মধ্যে দক্ষিণ হাতে সুদর্শন চক্র ও বাম হাতে পাঞ্চজন্য শঙ্খ শোভা পায়। এই বেশে জগন্নাথের দুই পা দেখা যায়। দেখে মনে হয় জগন্নাথ রত্নবেদীতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এই বেশের সময়ে জগন্নাথকে মূলত পীতাম্বরে সাজানো হয়। জগন্নাথের দুই পাশে ভূদেবী ও শ্রীদেবী থাকেন। সুভদ্রা দেবীর পোশাকে বৈচিত্র্য দেখা যায় না। সোনা বেশের মতো অজস্র অলংকারেই মূলত এই বেশে সুভদ্রা দেবীর শৃঙ্গার হয়। সুভদ্রা দেবী রক্তাম্বরে সাজেন। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারে সবচেয়ে বৈচিত্র্য দেখা যায় বলরাম বিগ্রহে। বলভদ্রদেবের ঠিক সামনে দুই হাত দুপাশে প্রসারিত সশস্ত্র প্রলম্বাসুরকে দেখা যায়। প্রায় চার ফুট উচ্চতার কাঠের তৈরি সবুজ রঙের ভীষণ দর্শন প্রলম্বাসুরের কাঁধ বেষ্টিত অবস্থায় বলরামের দুই পা দেখা যায়। বলরাম বিগ্রহেও সংযোজন করা হয় দুটি হাত। বলরাম তাঁর দুই হাতের মধ্যে দক্ষিণ হাতে মুষল ও বাম হাতে হল শোভিত হয়। প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারের সময়ে বলরামকে নীলাম্বরে সজ্জিত করা হয়। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গার অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথের মধ্যাহ্ন ধূপা (মধ্যাহ্নকালীন ভোগরাগ) অনুষ্ঠানের পর। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহগুলি শোলা, রঙিন কাগজ, চকচকে জরি ও অজস্র ফুলের সাজে সাজানো হয়। সমগ্র সজ্জা সাজাতে প্রায় চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে।

জগন্নাথ ও বলভদ্র ভগবানের প্রলম্বাসুর বধ বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে দিয়ে বার্তা পাওয়া যায়, ভগবানকে আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই পাই। প্রলম্বাসুর জগন্নাথ-বলরামের সঙ্গে যতক্ষণ সখ্যভাবে আনন্দ করেছিল, ততক্ষণ ভগবানও তার সঙ্গে সখ্যভাব বজায় রেখেছেন। কিন্তু যখনই প্রলম্বাসুর বৈরীভাবে প্রভুর কৃপাদৃষ্টি থেকে সরে যেতে ইচ্ছুক হলো তখন বলভদ্রদেবের রোষানলে তার মৃত্যু নেমে এলো। জগন্নাথ কল্পতরু। তাঁর কাছে যে যে-ভাব নিয়ে আসে সে সে-ভাবেই প্রভুকে পায়। জগন্নাথকে প্রাণে মনে ভালবাসলে জগন্নাথ তাঁর ভক্তের জন্য ভালোবাসার দুইহাত বাড়িয়ে দেন। ভক্তবিলাসী জগন্নাথ জগতের নাথ হয়েও বিশুদ্ধ ভক্তের নিষ্কাম বিশুদ্ধ ভালবাসার কাঙাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

কৃষ্ণ-বলরাম বেশ (Krishna Balarama besha)

শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট বেশগুলির মধ্যে কৃষ্ণভাবময় যে বেশগুলির শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও কৃষ্ণের অদ্বৈত ভাব প্রকাশিত হয় তার মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রের কৃষ্ণ-বলরাম বেশ। জগন্নাথের শৃঙ্গারে ব্যবহৃত অজস্র বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে কৃষ্ণ-বলরাম বেশটি রত্নসিংহাসনস্থ ত্রি-দেবদেবীর বাস্তবিকই আকর্ষণীয় পোশাক। হিন্দু বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের ত্রয়োদশীতে জগন্নাথ মহাপ্রভুর মধ্যাহ্ন ধুপের পর অনন্তাবতার বলভদ্রকে দ্বাপর যুগের বলরাম, পূর্ণব্রহ্ম জগন্নাথকে দ্বাপর যুগের কৃষ্ণ এবং ভগবতী সুভদ্রা মহারানীকে দ্বাপরের যোগমায়া দেবীর সাজসজ্জা পরিধান করানো হয়।

বৃন্দাবনের কৃষ্ণলীলায় ভগবানের শৈশবকালে পোষ্য গবাদি পশুদের সঙ্গে নিয়ে শিশু কৃষ্ণ ও শিশু বলরামের আনন্দময় সুখের সময়গুলি জগন্নাথ ও বলভদ্রের এই বেশভূষায় স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। কৃষ্ণ-বলরাম বেশ শৃঙ্গারে ব্যবহৃত বেশিরভাগ উপকরণ ও সাজসজ্জা শোলা, রঙিন জরি, নরম ও শক্ত বেত, বিভিন্ন রঙের কাপড় এবং ভেসজ আঠা ইত্যাদি ব্যবহার করে অতি যত্নে প্রস্তুত করা হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার পোশাক পুরীরই এই শ্রেণির বিশেষজ্ঞ কারিগরগণ দক্ষতার সঙ্গে পরম্পরায় প্রস্তুত করেন। প্রতিটি উপকরণের নির্দিষ্ট মাপ রয়েছে। কৃষ্ণ-বলরাম বেশ শৃঙ্গারে মহাপ্রভু জগন্নাথ এবং প্রভু বলভদ্রের শ্রীঅঙ্গে দুটি করে হাত সংযোজন করা হয় এবং মা সুভদ্রা দেবীর জন্য তৈরি করা হয় চার হাত। ত্রিবিগ্রহের জন্য নির্মিত এই আট হাতের প্রতিটির নির্দিষ্ট ভঙ্গী রয়েছে। কৃষ্ণ-বলরাম বেশে ভগবতী সুভদ্রা দেবী শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে রাখা কাঠের অপূর্ব শিল্পময় সিংহাসনে পদ্মাসনের পদ্ধতিতে বসেন। আছেন যা সজ্জায় আবৃত। উজ্জ্বল লাল রঙের বস্ত্রে আবৃত থাকেন সুভদ্রা দেবী। দেবীর এই শৃঙ্গারে পদ্মাসনরত দুখানি অতসীবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। দেবীর পায়ের পাতা ওপরের দিকে দেখা যায়। এই বেশে শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ মণিময় সুন্দর মুকুট দিয়ে সজ্জিত হন। জগন্নাথ ত্রিভঙ্গ ছন্দে পদবিন্যাস করে দাঁড়িয়ে থাকেন। জগন্নাথের বিগ্রহে দুইটি কৃষ্ণবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। জগন্নাথের এই বেশে তিনি দক্ষিণ হাতে বাঁশি এবং বাম হাতে একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুল ধারণ করেন। জগন্নাথের অনুরূপভাবে বলভদ্রও ত্রিভঙ্গ ছন্দে দাঁড়িয়ে তাঁর দক্ষিণ হাতে শিঙা এবং বাম হাতে একটি পদ্মফুল ধারণ করেন। এই বেশে বলভদ্রদেবের বিগ্রহে দুটি শ্বেতবর্ণের পা সংযোজন করা হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিগ্রহ মুকুট, ফুলের নোলক, চন্দন, বিবিধ মালা, সোনার চন্দ্রসূর্য, বিবিধ অলংকার, কাপড়, উত্তরীয়-চাদর প্রভৃতি উপকরণে সেজে ওঠে। এই বেশে দেবী সুভদ্রার চার হাতে যথাক্রমে অভয়া মুদ্রা, বর মুদ্রা, পাশ ও অঙ্কুশ শোভা পায়। কৃষ্ণ-বলরাম বেশে শ্রীবিগ্রহের সঙ্গে দেখা যায় নন্দ রাজা, উপানন্দ, বাসুদেব, কৃষ্ণ ও বলরামের অজস্র সখা অর্থাৎ গোপ বালকবৃন্দ, গোপীগণ, প্রজাপতি ব্রহ্মা, দেবরাজ ইন্দ্র, দেবর্ষি নারদা, মাতা রোহিনী, মাতা যশোদা ইত্যাদির বিগ্রহ। এই বিগ্রহগুলি জগন্নাথ ও বলভদ্র উভয়েই পার্শ্বদেশে শোভা পায়। এছাড়াও কৃষ্ণ-বলরাম বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের দুই পাশে দুইটি করে মোট চারটি গাভী দেখা যায়। শ্রীমন্দিরের ত্রিদেবদেবী কৃষ্ণ-বলরাম বেশে থাকাকালীন সন্ধ্যা ধুপ পূজা উদ্‌যাপন শুরু হয়। হাজার হাজার ভক্ত জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশভূষা দেখার অপেক্ষা করেন। গভীর রাত পর্যন্ত জগন্নাথ এই বিশেষ বেশে থাকেন। জগন্নাথের শয়নের পূর্বে এই পোশাক বদল করে সাধারণ পোশাক পরানো হয়। অনেক বছর আগে জগন্নাথের এই বেশের পরিবর্তে ‘গিরিগোবর্দ্ধন’ বেশে দেবতার শৃঙ্গার হতো। কিছু সমস্যার জন্য জগন্নাথের গিরিগোবর্দ্ধন বেশে বন্ধ হয়ে যায় ও সেই বেশের অনুসঙ্গ বহনকারী কৃষ্ণ-বলরাম বেশ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। ওড়িশার কটক শহরের এক জমিদার পরিবার থেকে জগন্নাথের এই বেশ শৃঙ্গারের ব্যয়ভার বহনের সুযোগ নেওয়া হয়ে আসছে দীর্ঘদিন।

জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশের মাধ্যমে জগন্নাথ ও কৃষ্ণের অভিন্নতার তত্ত্ব অনেক মজবুত হয়েছে। এই বেশ কত বছরের প্রাচীন তার হিসেব পাওয়া যায় না। ‘জগন্নাথাষ্টকম্’-এ বর্ণিত জগন্নাথের কৃষ্ণভাবের সঙ্গে এই বেশের সংযোগ রয়েছে। এছাড়াও জগন্নাথের কৃষ্ণ-বলরাম বেশের মাধ্যমে ভক্তের কাছে বার্তা আসে, ভগবান যুগে যুগে সৎজীবন যাপনকারী মানুষের কল্যাণে তাদের মাঝেই অবতীর্ণ হন। নরশরীর পরিগ্রহ করে লীলাময় ভগবান লীলাবিলাসে আসেন। চারিদিকে যখন অধর্ম বয় তখন তিনি ধর্মের ধ্বজা নিজে বহন করতে আসেন। মন্থনের সময় মাটিতে জলে সব এক হয়ে থাকে, সময়ে স্থির হয়ে মাটি নীচে স্থির হয় ও জল ওপরে স্থির হয়। জগন্নাথ পূর্ণব্রহ্ম। সাক্ষাৎ দারুব্রহ্ম তিনি। তিনি পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা হয়েও বিবিধ লীলাবিলাসের জন্য আমাদের মতো সাধারণ জীবাত্মার সঙ্গে থাকেন। তিনি পূর্ণ, তিনি আমাদের অপূর্ণতাগুলিকে নিজগুণ পূর্ণ করে তোলেন। কিন্তু এর জন্য তাঁর প্রতি আমাদের নিষ্কাম মনোবৃত্তি ও সাধনার প্রয়োজন।

বনভোজী বেশ (Banabhoji besha

ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতির অজস্র লোককাহিনী ও বাংলার কবি বিশ্বম্ভর দাসের জগন্নাথমঙ্গলে কৃষ্ণের বাল্যলীলাকে জগন্নাথেরই বাল্যলীলার সঙ্গে একাত্ম করে তোলার প্রচেষ্টা হয়েছে। জগন্নাথের পৃথকভাবে কোনো বাল্যলীলার বর্ণনা সংস্কৃত স্কন্দপুরাণে পাওয়া যায় না। জগন্নাথভাগবতেও এর উল্লেখ নেই। কৃষ্ণের বৃন্দাবনী বাল্যলীলা বৈচিত্র্য ভরপুর। সহজ সরল সাধ্য ও সাধনার লীলামাধুর্যে কৃষ্ণের বাল্যলীলা ভক্তের আহ্লাদের বিষয় হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ ও বলরামের বাল্যলীলার বিশেষত গোষ্ঠীলীলার ঘটনার সঙ্গে জগন্নাথের বনভোজী বেশ শৃঙ্গারের মিল রয়েছে। জগন্নাথের বনভোজী বেশ অনুষ্ঠিত হয় ভদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের দশমী তিথিতে। শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম এই দিনে এমনভাবে সজ্জিত হন যে, দেখে মনে হয় যেন তাঁরা কোনও এক বনভোজনে (চড়ুইভাতি বা পিকনিক) অংশ নিতে চলেছেন। পুরীতে জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরে শ্রীকৃষ্ণ-জন্মাষ্টমী তিথির পরে ভগবান কৃষ্ণের প্রায় সমস্ত উল্লেখযোগ্য বাল্যলীলা বা ক্রিয়াকলাপ জগন্নাথের মধ্যে দিয়েই পরিচালিত হয়। যদিও কৃষ্ণ ও জগন্নাথের জন্মতিথি ভিন্ন ভিন্ন। কৃষ্ণের জন্মতিথি ভাদ্র কৃষ্ণাষ্টমীতে ও জগন্নাথের জন্মতিথি জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা বা স্নানযাত্রার পূর্ণিমার তিথিতে। শ্রীক্ষেত্রে কৃষ্ণের জন্মতিথি থেকে কয়েকদিন কৃষ্ণের লীলা বিষয়ে একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে গোপবালকদের সঙ্গে বনভোজন, কলিবিকা, বকাসুর বধ, অঘাসুর বধ, কালিয়দমন, প্রলম্বাসুর বধ পালা অনুষ্ঠিত হয়। কৃষ্ণলীলার এই আখ্যানগুলির সবকটি জগন্নাথের বেশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।


জগন্নাথ মহাপ্রভুর বনভোজী বেশ একাধারে দারুতনুধর জগন্নাথের অন্যতম বিশেষ অনুগ্রহ ও কৃষ্ণের লীলার মনোরম-প্রেমময় অভিমুখটির পরিচয় বহন করে। জগন্নাথ ও তাঁর বড় দাউ (দাদা) বলভদ্র তাঁদের সহচর দেবগণ ও গোপাল বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বৃন্দাবনের বনে বনভোজনে মান। কৃষ্ণ-বলরামের বন্ধুগণও গোপাল নামেই পরিচিত। এই সূত্র থেকে চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দের আশীর্বাদধন্য বাংলার শ্রীপাটগুলিতে দ্বাদশ গোপালের ধারণা এসেছে। বনভোজনে বনের ফল সহজলভ্য হলেও জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের ঘর থেকেই সুস্বাদু খাদ্য সঙ্গে বহন করে নিয়ে যান। বনভোজী বেশে দেবতারা বহন করেন ক্ষীর, সর, ননী প্রভৃতি সুস্বাদু ভোজন। এই ভোজ্যদ্রব্যের অধিকাংশই গোপজীবনে সহজলভ্য। ভাগবতেও কৃষ্ণ ও বলরামের বনভোজনের দৃশ্য রয়েছে। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের সখাদের সঙ্গে আত্ম-পরের হিসাব, উচ্চ-নীচের হিসাব ভুলে গিয়ে একাত্ম হয়ে একত্র বিহার, ক্রীড়া ও ভোজনে মেতেছিলেন। বৃন্দাবনের বনে বনে সখ্যরসের ফল্গুধারা বয়ে গিয়েছিল। সখ্যরসে ঈশ্বর ও ভক্ত সমান সমান। দু’জনের মধ্যে অপূর্ব বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ভাগবতের এই ঘটনার ঠিক অনুরূপ দৃশ্যটি মহাপ্রভু জগন্নাথের বনভোজী বেশে ধরা রয়েছে। জগন্নাথের বনভোজী বেশে শৃঙ্গার সন্ধ্যা আরতির পরে শুরু হয় এবং সন্ধ্যাধুপের সমাপ্তি পর্যন্ত এই বেশ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার শ্রীঅঙ্গে থাকে। প্রাকৃতিক শোলা, নরম বেত ও বিবিধ কাপড়ের তৈরি ফুলের পাপড়ি বলভদ্র ও জগন্নাথের মাথার চুড়ার সঙ্গে সুচারুভাবে সংযুক্ত থাকে। জগন্নাথের হাতে একটি বনচারীর লাঠি এবং এক হাতে জগন্নাথ দই ও অন্যান্য খাদ্যে ভরপুর একটি রূপোর বাটি ঝুলিয়ে ধারণ করেন। জগন্নাথের মতো ঠিক একইভাবে সাজেন বলভদ্রদেব। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাত ও পা সংযোজন করা হয়। দেবী সুভদ্রার সাজে বৈচিত্র্য থাকে না। সুভদ্রা দেবীকে সোনা বেশ বা স্বর্ণ বেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হতে দেখা যায়। এছাড়াও, জগন্নাথ ও বলভদ্রের সামনে গোচারণ লীলার স্মারক রূপে কাঠের তৈরি সাদা রঙের একটি গরু এবং একটি বাছুর উপস্থিত থাকে। ভাদ্র মাসে কদমফুল সহজেই পাওয়া যায়। তাই জগন্নাথের বনভোজী বেশে কদমফুলের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়াও ওড়িশার সাবেকি সাজের সোনার অলংকারে অলংকৃত করা হয় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে।

জগন্নাথের বনভোজী বেশ তাঁর সখারূপের পরিচয় বহন করে। তিনি শুধু ভক্তের আরাধ্য দেবতা নন, বরং তিনি ভক্তের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার মতো অভিন্নহৃদয় বন্ধু। ব্রজের গোপবালকরা জগন্নাথ-কৃষ্ণকে আপনজন ভেবেছিলেন। তাঁরা খেলতে খেলতে কখনও কৃষ্ণ-বলরামের কাঁধে চেপেছেন, আবার কখনও তাঁদেরই কাঁধে তুলে আনন্দ করেছেন। কখনও তাঁরা কৃষ্ণ-বলরামের সঙ্গে একপাত্রে আহার করেছেন, কখনও একত্র শয়ন করেছেন। বন্ধুত্ব কোনো লোকাচার মানে না। সাধারণ সমাজবিধির বাইরে গিয়ে তাই জগন্নাথ মহাপ্রভু বনভোজী লীলায় মাতেন। তিনি নিজেই আমাদের বৈধী পূজার বাইরে গিয়ে আপনভাবে ভাবিত হয়ে তাঁকে ধরার নির্দেশ দেন। তাঁকে অনুভব করার জন্য বিধিবদ্ধ নানা নিয়মে তাঁর পূজা করা, একবার তাঁকে অনুভব করতে শিখলে সমাজবিধি, পূজাবিধি সব তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন জগন্নাথ ভক্তের কাছে তদ্ভাবরঞ্জিত হয়েই ধরা দেন।

কালীয়দলন বেশ (Kaliyadalana besha)

জগন্নাথকে বৈদ্যনাথও বলা হয়। তিনি জীবনের ঐহিক ও পারৈহিক উভয় প্রকারের বিষই হরণ করে জীবকে নির্বিষ ও সুস্থ করে তোলেন। তিনি উত্তম বৈদ্যদের একজন। তিনি ভক্তের কলুষ হরণ করেন। তিনি শ্রীক্ষেত্রে আগত সকল ভক্তের কলিকলুষ নাশ করেন। বৈচিত্র্যময় জগন্নাথের চরিত্রের এই ভাবটি গাথা রয়েছে তাঁর কালীয়দলন বেশের মধ্যে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথকে কালীয়দলন বেশে শৃঙ্গার করানো হয়। মধ্যাহ্ন ধুপের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার কিছু পরে, শ্রীমৎ মহাপ্রভু জগন্নাথের কালীয়দলন বেশভূষার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়।

কালীয়দলনের ইতিবৃত্ত পাওয়া যায় কৃষ্ণকাহিনিতে কৃষ্ণের বাল্যলীলার আখ্যানে। কৃষ্ণের গোষ্ঠজীবনের সময়পর্বে কালীয় নাগ সপরিবারে যমুনা নদীতে এসে বসবাস করতে থাকে। কালীয় নাগের প্রবৃত্তি ছিল বড় হিংসাত্মক। যমুনায় কেউ স্নান ও জল পান করতে আসুক সেই বিষয়ে কালীয় নাগের ভীষণ বিদ্বেষ ছিল। বৃন্দাবনের যে যে যমুনার জল ব্যবহার করতে গিয়েছিল, কালীয় নাগের প্রকোপে তাদের সকলেরই প্রাণ সংশয় হয়েছিল। বৃন্দাবনের অনেকেই এই বিপদে পড়েছেন জানতে পেরে কৃষ্ণ বৃন্দাবনের এই গণসমস্যা নিবারণ করতে অগ্রসর হন। তিনি যমুনার জলে নেমে কালীয় নাগকে প্রতিহত করতে চান। কৃষ্ণ যমুনার জলে নামার সঙ্গে সঙ্গে কালীয় নাগ সচেতন হয়ে ওঠে ও তার বিদ্বেষী মনে হিংস্র ভাব জেগে ওঠে। যমুনার জলে কৃষ্ণ ও কালীয় নাগের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে। যমুনার বিষাক্ত জল প্রবলভাবে দোলা খেতে থাকে। অনেকক্ষণ ধরে যমুনার জলে কৃষ্ণ ও কালীয় নাগের মধ্যে ভীষণ লড়াই চলতে থাকে। কৃষ্ণের রণমূর্তির আঘাতে কালীয় নাগের অঙ্গ থেকে রক্ত বের হতে শুরু করে। সেই বিষতুল্য লাল রক্তে যমুনার জলও লাল হতে শুরু করে। যমুনা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বলরাম, কৃষ্ণ ও বলরামের অজস্র সখা, অজস্র গোপ ও গোপী, মা যশোদা, নন্দরাজ, শ্রীমতী রাধা ও তাঁর সখীগণ সকলেই কৃষ্ণের জন্য দুশ্চিন্তা করতে থাকেন। এমন সময় যমুনার জলে লাল রক্তের আভাস পাওয়া মাত্র বৃন্দাবনে কৃষ্ণের জন্য সকলে হাহাকার করে ওঠে। এঁদের অনেকেই জানতেন কৃষ্ণ সাধারণ মানুষ নন, তিনি স্বয়ং নারায়ণ। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই কৃষ্ণকে নিজের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসেন বলেই তাঁর জন্য দুশ্চিন্তা করেন। বহুভাবময় কৃষ্ণ-জগন্নাথ, তাঁর বহুভাবময় ভক্ত। অবশেষে বৃন্দাবনের সকলের সমস্ত দুশ্চিন্তা নস্যাৎ করে দিয়ে কৃষ্ণ কালীয় নাগের সঙ্গে যমুনার জলে ভেসে ওঠেন। যমুনার জলেই কালীয় নাগের ভীষণ ফণাগুলির ওপর কৃষ্ণ নৃত্য শুরু করেন। নটবর কৃষ্ণের নৃত্যের ছন্দে তালে পদাঘাতে ধীরে ধীরে কালীয় নাগ দুর্বল হতে শুরু করে। কালীয় নাগের একটি ফণা থেকে আরেকটি ফণায় কৃষ্ণের পায়ের আঘাত পড়তে পড়তেই কালীয় নাগের প্রাণ যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। ক্রমশ কালীয় নাগ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে শুরু করে। কিন্তু কৃষ্ণের ক্রোধ তখনও শান্ত হয়নি। কৃষ্ণ আরও প্রবলতর গতিতে কালীয় নাগের ফণা থেকে ফণায় দ্রুততর পদবিন্যাসে নৃত্য করতে শুরু করেন। কালীয় নাগের মুখ থেকে রক্তপাত হতে শুরু করে। কালীয় নাগের এই অবস্থা দেখে তার স্ত্রীগণ কৃষ্ণের কাছে কালীয় নাগের হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করতে থাকে। কালীয় নাগের স্ত্রীগণের স্তব, স্তুতি ও প্রার্থনায় কৃষ্ণের ক্রোধ নিয়ন্ত্রনে আসে। কৃষ্ণ আগের থেকে শান্ত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ এক হাতে কালীয় নাগের লেজ ধরে তাকে সম্পূর্ণরূপে সংযত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কালীয় নাগের মাথায় কৃষ্ণের পদচিহ্ন তৈরি হয়। কৃষ্ণ কালীয় নাগকে আশীর্বাদ করেন তাঁর এই পদচিহ্ন দেখে পক্ষীরাজ গরুড় মহারাজ আর কোনোদিনই সপরিবারে কালীয়কে কোনো ক্ষতি করবে না। কৃষ্ণের নির্দেশনা অনুযায়ী কালীয় নাগ সপরিবারে যমুনা নদী ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করে। যমুনার দূষিত জল এক নিমেষে দূষণমুক্ত হয় কৃষ্ণের কৃপায়। যমুনা নদীর ওপর নির্ভরশীল সমগ্র জনজীবনে জলবাহিত বিষের ভয় নষ্ট হয়ে যায়। দ্বাপর যুগের এই মহিমাময় বৃত্তান্তটি স্মরণে রেখে আজও শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের কালীয় দলন বেশে শৃঙ্গার করানো হয়। কৃষ্ণের জীবনের কালীয় দলনের আখ্যানটিকে আধুনিক পরিবেশবাদী দৃষ্টিতে জলদূষণ রোধের আখ্যান।

কালীয়দলন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র বিগ্রহে কাঠের তৈরি পা ও হাত সংযোজন করা হয়। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র উভয়ের বিগ্রহই দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। কালীয়দলন বেশে শৃঙ্গারে জগন্নাথের দক্ষিণ হাতে পদ্ম ফুল শোভা পায়। বাম হাতে তিনি কালীয় নাগের লেজের শেষভাগ ধরে তাকে দমন করেন। জগন্নাথের দুই পা কালীয় নাগের ফণার ওপর স্থিত দেখা যায়। জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ এমন ভঙ্গিমায় সাজানো হয় যে, তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি কালীয় নাগের মাথায় দাঁড়িয়ে তার লেজের শেষভাগ ধরে তাকে দমন করছেন। জগন্নাথের কালীদলন বেশ শৃঙ্গারের সময় তাঁর দক্ষিণ হাতে পদ্ম ফুলের পরিবর্তে ভোজ্য দ্রব্য ( অমৃতের লাড্ডু) ও বাঁশি দেওয়ার রীতিও রয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট রীতি পাওয়া যায় না। জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় ভগবতী সুভদ্রা দেবী সোনা বেশের অনুরূপ সজ্জায় সজ্জিত হন। জগন্নাথ ছাড়া আর বলভদ্রদেবের বিগ্রহেই যা একটু বৈচিত্র্য দেখা যায়। বলরামের দক্ষিণ হাতে ভোজ্য দ্রব্য (অমৃতের লাড্ডু) ও বাম হাতে পদ্ম ফুল দেখা যায়। এই বেশে বলরামের হাতেও কখনও মুষল, হল ও শিঙা দেখা যায়।

জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারে ব্যবহৃত কালীয় নাগের দৈর্ঘ্য প্রায় ত্রিশ ফুট। এই নাগের শরীরটি শ্রীমন্দিরের নির্দিষ্ট দর্জি শ্রেণির কারিগররা রেশম, জরি, বেত এবং কাপড় ব্যবহার করে তৈরি করেন। কালীয় নাগ তৈরিতে কালো, নীল, গাঢ় সবুজ রঙের ব্যবহার দেখা যায়। কালীয় নাগের সম্পূর্ণ শরীর মূলত কালো রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। কালীয় নাগের শরীরটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, নাগটিকে সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ভঙ্গীতে প্রয়োজন অনুসারে বাঁকানো যায়। জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় কালীয় নাগকে জগন্নাথের রত্নসিংহাসনের ওপরের অংশে এনে এমনভাবে সাজানো হয় তাতে নাগের মাথাটি জগন্নাথের বিগ্রহে সংযোজিত কৃষ্ণবর্ণের কাঠের পায়ের ঠিক নীচে থাকে এবং নাগের লেজটি দেবতার হাতে থাকে। বলভদ্র বিগ্রহের সামনে দু’পাশে দুটি বৃন্দাবনী গাভী দেখা যায়। ওড়িশায় লোকবিশ্বাস রয়েছে, কালীয়দলন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাতে ধরা অমৃতের লাড্ডুর প্রসাদে শরীরে বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের স্পর্শধন্য এই অমৃতের লাড্ডু ভক্ষণ করলে সর্পদংশনের ভয় নাশ হয়। খুব সম্ভবত এই লোকবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে, প্রাচীনকালের ওড়িশা অঞ্চলের সাপের উৎদ্রবের ভয় থেকে। বঙ্গদেশে সর্পভীতি ও সর্পদংশন জনিত অপঘাতের ভয় থেকে যেমন মনসা দেবীর পূজার প্রসার ঘটেছিল, তেমন একই সমাজ মানস থেকে ওড়িশায় জগন্নাথের কালীয়দমন বেশের প্রতি সাধারণ জনতার আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ওড়িশাবাসী ও জগন্নাথ-সংস্কৃতি সচেতন অজস্র মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন জগন্নাথ মহাপ্রভুর কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের দর্শনমাত্রে শরীরে পার্থিব ও অপার্থিব সমস্ত বিষ নাশ হয়, কঠিন বিষময় দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করেন স্বয়ং জগন্নাথ। এই বিশ্বাসেই অজস্র জগন্নাথের ভক্ত জীবনে অন্তত একবার জগন্নাথের কালীয়দলন বেশ শৃঙ্গারের সময় তাঁকে দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। উৎকলের জনতা মনের আনন্দে কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’-এর অংশবিশেষ গেয়ে ওঠে, “কালিয়বিষধরগঞ্জন জনরঞ্জন।/ যদুকুলনলিনদিনেশ জয় জয় দেব হরে।।”

Jagannath

রাধা-দামোদর বেশ (Radha-Damodara besha)

ওড়িআ বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথি থেকে শুরু করে কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথি পর্যন্ত শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে বিরাজমান জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাচীন রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারে শোভিত হয়ে ওঠেন। শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনের দেবদেবীগণ তাঁদের প্রাত্যহিক অবকাশ পর্বের আচার, অনুষ্ঠান, পূজা ও ভোগরাগ শেষ হওয়ার পর প্রায় এক মাস ব্যাপী প্রতিদিন এই বিশেষ ধরনের বেশভূষায় সুসজ্জিত হয়ে ভক্তগণের হৃদয়মন্থন করে শুদ্ধভক্তির অভিষেক ঘটান। ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় কার্তিক মাসে মহাবিষ্ণু জগন্নাথকে দামোদর রূপে পূজায় দৈবী মায়া ও মায়াবদ্ধ সংসার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। মোক্ষনগরী পুরীতে জগন্নাথ সর্বদাই মোক্ষদাতা পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা হয়েই বিরাজমান থাকেন। তার সত্ত্বেও জগন্নাথ আকাঙ্ক্ষী অজস্র মানুষ রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথকে দেখে অনাবিল আনন্দ অনুভব করেন।

কৃষ্ণ বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনী ও লোককথা অনুসারে, কংসের রাজধানী মথুরা নগরে যাওয়ার পথে কংসের বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী অক্রুর পবিত্র যমুনা নদীতে স্নান করার সময় কৃষ্ণের রাধা-দামোদর বেশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দী থেকে জগন্নাথের রাধা-দামোদর বেশের প্রবর্তন করা হয়েছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাধা চরিত্রটি ওড়িআ ও বাঙালি জাতির আধ্যাত্মিক মননের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে শুরু করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে সর্বভারতীয় মানসে রাধা চরিত্রের সঙ্গে কৃষ্ণের নাম একাত্ম হয়ে ওঠার পিছনে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের কবি জয়দেব গোস্বামীর ‘গীতগোবিন্দম্’-এর অনেকখানি প্রভাব রয়েছে। ওড়িআ ও বঙ্গে রাধা-কৃষ্ণ ভাবধারার পরিপুষ্ট স্রোত নির্মাণের পিছনে শুধু বিদ্যাপতির সাহিত্যই নয়, মিথিলার কবি বিদ্যাপতি ঠাকুর ও বঙ্গের কবি চণ্ডীদাসের অবদানও ছিল যথেষ্ট। সর্বভারতীয় বৈষ্ণব মানসে কৃষ্ণের সঙ্গে দেবী রুক্মিনীর পূজা প্রাচীন সময় থেকে প্রচলিত ছিল। বিশেষত পশ্চিম-ভারতে ও দক্ষিণ-ভারতে কৃষ্ণ ও রুক্মিনী দেবীর একত্র পূজার আয়োজন এখনও রয়েছে। পশ্চিম-ভারতের ক্ষেত্রপতি দ্বারকাধীশ কৃষ্ণেরও শক্তিরূপে রুক্মিনী দেবীর পূজা করা হয়। চারধামের অন্যতম দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ মন্দিরের অনতিদূরে রুক্মিনী দেবীর মন্দিরও রয়েছে। কৃষ্ণ-রাধার আয়োজন মূলত পূর্ব-ভারতীয় সংস্কৃতি। তাছাড়া জগন্নাথ-সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত বৈষ্ণব সমাজেও রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের বিষয়কে সুনজরে দেখা হয় না। এঁরা কৃষ্ণের স্বকীয়া প্রেমে বিশ্বাসী। রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথকে সাজানো হলেও রাধার আয়োজন শ্রীমন্দিরে সেভাবে নেই। শ্রীমন্দিরের দেবতা জগন্নাথের স্বকীয়া শক্তি ভগবতী শ্রীদেবী (লক্ষ্মী)। তাঁর শক্তি দেবী প্রসারিত হয়েছেন ভূদেবী ও বিমলা দেবী পর্যন্তই, এর বেশি নয়। রাধা দেবী রূপে ওড়িশার সমাজে আরাধিত হয়েছেন তিনজন ভিন্ন ভিন্ন সময়কালের বৈষ্ণব সাধকের প্রভাবে – বিষ্ণুস্বামী, নিম্বার্ক আচার্য ও চৈতন্যদেব। এঁদের মধ্যে একমাত্র চৈতন্যদেবই বঙ্গসন্তান ও সাধনজীবনের সিংহভাগ সময় শ্রীক্ষেত্রে বসবাস করেছিলেন। বিষ্ণুস্বামী ও নিম্বার্ক আচার্যের ভাবধারা দাক্ষিণাত্যে ও উত্তর-ভারতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলেও পূর্ব-ভারতে তাঁদের স্বকীয় বৈষ্ণবীয় ভাবধারা সেভাবে প্রসারিত হতে পারেনি। চৈতন্যদেবের প্রভাব শ্রীক্ষেত্রে ও উৎকলের রাজপরিবারে পড়েছিল। উৎকলের গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব সহ তাঁর পরবর্তী অনেক গজপতিই চৈতন্যদেবের ভাবধারার গৌড়ীয় বৈষ্ণব আচার্যগণের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। গজপতি মহারাজা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে আস্থাশীল হলেও শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরের গৌড়ীয় মত ও আদর্শ সেভাবে প্রবেশাধিকার পায়নি।

ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমদিকে সন্ন্যাস গ্রহণের পর চৈতন্যদেব শ্রীক্ষেত্রে বসবাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। চৈতন্যদেব যে সময় সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন সেই সময়ে ওড়িশা আগ্রাসনের জন্য বাংলার রাজা হোসেন শাহ মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ওড়িশায় হিন্দু সংস্কৃতি ও জগন্নাথের গৌরবময় ইতিহাস রক্ষা তাগিদে রাজা প্রতাপরুদ্র জগন্নাথের কৃপায় হোসেন শাহকে প্রতিবার পরাস্ত করতে সক্ষম হন। কালক্রমে সন্ন্যাসী চৈতন্যদেব ও রাজা প্রতাপরুদ্রের মহামিলনে বঙ্গ ও ওড়িশার সাধারণ জনতার মধ্যে মৈত্রী ঘটে। ধীরে ধীরে ওড়িআ জাতি ও বাঙালি জাতির মধ্যকার যুদ্ধজনিত পারস্পরিক বিদ্বেষ কমে আসে। যেহেতু চৈতন্যদেব ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীক্ষেত্রে এসেছিলেন ও ওড়িশার জনজীবনে তাঁর আগমনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ঘটেছিল, তাই অনেকেই মনে করেন জগন্নাথের রাধা-দামোদর বেশের সূচনাকাল ষোড়শ শতাব্দীতে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের চোখে চৈতন্যদেব ছিলেন অন্তরঙ্গে রাধা ও বহিরঙ্গে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-রাধার মিলিত বিগ্রহ। তাছাড়া চৈতন্যদেবের প্রভাবে বাংলার কৃষ্ণ ও ওড়িশার জগন্নাথ একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন। শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথকে কৃষ্ণরূপে উপাসনার তথাকথিত প্রসার ঘটেছিল চৈতন্যদেবের সাধনজীবনের প্রভাবে। যদিও শ্রীক্ষেত্রে শ্রীমন্দিরকে দ্বারকা নগর ও গুণ্ডিচা বাড়িকে বৃন্দাবন রূপে দেখার প্রচেষ্টা চৈতন্যদেবের অনেক আগে থেকেই ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে রয়েছে। জগন্নাথকে দ্বারকানাথ কৃষ্ণ ও বৃন্দাবনধন কৃষ্ণ রূপে অর্চনার সূচনা আনুমানিক অষ্টম শতাব্দী থেকে। বস্তুত এই সময়কালের মধ্যেই স্কন্দপুরাণ রচিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে জগন্নাথের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাও দেখেছিল প্রাচীন ভারতভূমি। জগন্নাথের রাধা-দামোদর বেশের সূচনা রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের সমকালে, এমন একটি মতও ওড়িশায় প্রচলিত রয়েছে। সেদিক থেকে দেখা হলে, প্রতাপরুদ্রের মাধ্যমে চৈতন্যদেবের পরোক্ষ প্রভাব জগন্নাথের রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারে রয়েছে। তবে এই মতের সপক্ষে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর। জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশ প্রচলিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনায়। অর্থাৎ, চৈতন্যদেবের জন্ম প্রায় দুই শতাধিক বছর আগে থেকেই জগন্নাথ কৃষ্ণের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনার স্মরণে শৃঙ্গার করতে শুরু করেছিলেন। অবশ্য এই প্রথার পিছনে নিম্বার্ক আচার্যের প্রভাব শ্রীক্ষেত্রে রয়েছে।

আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথি থেকে শুরু করে কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথি পর্যন্ত রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও বলভদ্র ওড়িশার ‘ত্রিকাছা’ শৈলীতে পোশাক পরেন। জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের হাতে ধারণ করেন সোনালি নালিভূজ। জগন্নাথ ও বলভদ্রের বিগ্রহ সজ্জায় মোট চারটি নালিভূজের ব্যবহার করা হয়। নাতিদীর্ঘ বাঁশের তৈরি লাঠি ও বিভিন্ন রঙের রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি ‘ত্রিমুণ্ডী’ (উচ্চারণভেদে ত্রিমুন্দী) ও সোনার ‘চন্দ্রিকা’ গহনা (সোনার ময়ূর-পালক) জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় চূড়ার অংশে শোভিত হয়। রাধা-দামোদর বেশে সোনার চন্দ্র-সূর্য ও তার নীচের অংশে সোনার তৈরি তিলকে সজ্জিত হন জগন্নাথ ও বলভদ্র। এই স্বর্ণতিলক তাঁদের সোনা বেশ শৃঙ্গারেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথার দু’পাশে কানের অংশে সোনার বড় বড় দুটি কুণ্ডল পরানো হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের কোমরে রঙিন উত্তরীয় দিয়ে সাজানো হয়। ‘বড়লাগী’ কাপড়ে শ্রীবিগ্রহগুলি সেজে ওঠে। দেবী সুভদ্রার সাজে বৈচিত্র্য সেভাবে দেখা না গেলেও তাঁকে রাধা-দামোদর বেশে সোনার কণ্ঠহার ও‌ তাগায় সাজানো হয়। এছাড়াও ত্রিদেবদেবীকে রাধা-দামোদর বেশ শৃঙ্গারে আরও কিছু সোনা ও রূপোর অলংকার এবং অজস্র ধরনের ফুলের সজ্জায় সজ্জিত করা হয়। কখনও কখনও জগন্নাথকে মোটা মোটা তুলসীর মালায় ও পদ্মের মালায় সাজতেও দেখা যায়। হাজার হাজার ভক্ত রাধা-দামোদর দুর্দান্ত পোশাকে সজ্জিত রত্নসিংহাসনের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকে এক ঝলক দেখতে ভিড় করে। বিশেষ করে এই সজ্জায় জগন্নাথকে দেখার জন্য বাংলার বৈষ্ণব সমাজে বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়। বলাবাহুল্য জগন্নাথের রাধা-দামোদর বেশের জগন্নাথই পূর্ণবিগ্রহে শ্রীমতী রাধার ‘দামোদর’ ভগবান রূপে অর্চিত হন। বহু জগন্নাথ ভক্ত মনে করেন জগন্নাথই দামোদর ও তাঁর সমস্ত ভক্তই রাধা। রাধা ভক্তচূড়ামণি, রাধার মতো রাগানুগা ভক্তিতে ভগবান জগন্নাথকে নিজের মতো করে পাওয়া যায়। রাধার কৃষ্ণ ও ভক্তের জগন্নাথ – এই দুটি কথার অর্থ যেন ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে মিলে মিশে এক হয়ে গিয়েছে কোনো এক প্রাচীন সময় থেকেই।

বাঁকাচূড়া বেশ (Bankachuda besha)

জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশটি একাধারে বাৎসরিক বিশেষ বেশ ও পঞ্চুকার (কোনো বছর কার্তিক মাসের তিথি মার্গশীর্ষ অগ্রহায়ণ মাসে সম্প্রসারিত হলে সেই তিথিগুলিকে কেন্দ্র করে উৎসব) পাঁচ দিনের অন্তর্গত অন্যতম একটি বিশেষ বেশ। কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বাদশী তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথ ও বলভদ্রকে বাঁকাচূড়া বেশে শৃঙ্গার করানো হয়। দ্বাপরযুগের কৃষ্ণের ব্রজলীলার শেষ পর্বের আখ্যানের সঙ্গে জগন্নাথ ও বলভদ্রের বাঁকাচূড়া বেশটি সম্পর্কযুক্ত।

মথুরারাজ কংস তার মৃত্যু সংক্রান্ত দৈববাণীকে মিথ্যা করে দেওয়ার লালসায় নিজের ভগিনী দেবকীর গর্ভজাত সন্তানদের একের পর এক হত্যা করেও নিজের বধ সংক্রান্ত পূর্বনির্ধারিত ভবিতব্যকে খণ্ডন করতে পারেননি। কংস চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখতে চাননি। ভগবতী যোগমায়াকে হত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে কংস জেনেছিলেন তাকে যিনি বিনাশ করবেন তিনি গোকুলে বড় হচ্ছেন। তারপরেও কংস একের পর এক ভীষণ অসুরকে ব্রজে পাঠিয়েছেন নিজে বাঁচার জন্য। কিন্তু রাখে হরি মারে কে, আর মারে হরি তো রাখে কে! কৃষ্ণ ও বলরাম কংসের সব উল্লেখযোগ্য অসুরকে বিনাশ করে আরও প্রবলভাবে কংসের জীবনের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন। কৃষ্ণ ও বলরামের প্রকৃত পরিচয় বৃন্দাবন, মথুরা, হস্তিনাপুর সহ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে কংসরাজ মিত্রের ছদ্মবেশে কৃষ্ণ ও বলরামকে মথুরায় আমন্ত্রণ করে এনে হত্যা করার ষড়যন্ত্র বাঁধেন। কংসের পক্ষ থেকে বৃন্দাবনে গিয়ে কৃষ্ণ ও বলরামকে আমন্ত্রণের দায়িত্ব আরোপিত হয় অক্রুরের ওপর। এই অক্রুর ছিলেন একাধারে কংসের রাজকর্মচারী ও কৃষ্ণের একান্ত ভক্ত। কংসের আজ্ঞাধীন অক্রুর কৃষ্ণ ও বলরামকে মথুরায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বৃন্দাবনে এসে কৃষ্ণ ও বলরামকে যে সজ্জায় সজ্জিত দেখেছিলেন, সেই সজ্জায় সজ্জিত করা হয় জগন্নাথ ও বলভদ্রকে। সেই নির্দিষ্ট বেশই রত্নসিংহাসনের দেবগণের বাঁকাচূড়া বেশ নামে পরিচিত। কৃষ্ণ ও বলরামের সেই বিশেষ বেশকে স্মরণ করার জন্য বহু শতাব্দী ধরে বছরের পর বছর নির্দিষ্ট সময়ে বাঁকাচূড়া বেশের আয়োজন করা হয়। ভাগবতের পৌরাণিক ঘটনার স্মৃতিচারণমূলক বেশ হিসেবেও জগন্নাথ ও বলভদ্রের বাঁকাচূড়া বেশটি প্রসিদ্ধ। আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশ শৃঙ্গারের সূচনা হয়।

বাঁকাচূড়া বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথার দক্ষিণভাগে চন্দ্রিকাচুলা (চুল বাঁধার এক বিশেষ শৈলী) শোভা পায়। দেববিগ্রহে সংযোজিত এই চন্দ্রিকাচুলার শেষ অংশে কিয়া নামক ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী সোনার দেবগহনা সজ্জিত থাকে। জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় মহামূল্যবান রত্নশোভিত একটি ছোট মাপের সোনার মুকুটের ব্যবহার করা হয়। দেখে মনে হয় জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের মাথায় খানিকটা বেনুনীর খোঁপার মতো করে চুল বেঁধে তাতে কিয়া, ফুল ও একটি সোনার মুকুট বেঁধেছেন প্রাচীন গোপশ্রেণির মানুষের গোষ্ঠীস্বামীদের মতো। এছাড়াও জগন্নাথের লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ শৃঙ্গারে ব্যবহৃত অধিকাংশ সোনার অলংকারই বাঁকাচূড়া বেশে শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ ও বলভদ্রকে পরানো হয়। বাঁকাচূড়া বেশেও জগন্নাথ ও বলভদ্রের দুই হাত ও দুই পা শ্রীবিগ্রহদ্বয়ে সংযোজন করা হয়। এই বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথের দক্ষিণ হাতে সুদর্শন চক্র ও বাম হাতে শঙ্খ দেখা যায়। বলরামের দক্ষিণ হাতে মুষল ও বাম হাতে হল ধরা থাকে। সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহে বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় না। কিন্তু দেবী সুভদ্রাও মাথায় কিয়া নামক সোনার তৈরি দেবগহনা ধারণ করেন। জগন্নাথের স্বর্ণ বেশ, বামন বেশ ও লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশের সঙ্গে জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশের অনেকখানি মিল রয়েছে। তবে জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় চন্দ্রিকাচুলার ব্যবহার এই বেশে রত্নসিংহাসনের দেবগণের পরিচিত সাজসজ্জাকেও নতুন করে তোলে। তবে জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশ কত প্রাচীন সেই বিষয়ে স্পষ্টভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনুমিত হয় দ্বাদশ শতাব্দী বা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সংস্কৃত সাহিত্যের কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’ শ্রীমন্দিরে বরণীয় হয়ে ওঠার পর জগন্নাথের কৃষ্ণত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এরই পরবর্তীকালে কোনো এক সময়ে জগন্নাথের বাঁকাচূড়া বেশের প্রবর্তন হয় শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরে।

জগন্নাথ ও বলভদ্রের বাঁকাচূড়া বেশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ঈশ্বরকে বৈরীভাবে সাধন করলেও তিনি ভক্তের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে কৃপা করেন। আর যে ভক্ত তাঁকে কায়মনোবাক্যে নিরন্তর প্রাণপ্রিয় রূপে জেনে সাধনা করেন তাঁকে তো তিনি সাড়া দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন। ভাবগ্রাহী জগন্নাথ। তাঁকে যে যেভাবে নিয়ে ডাকবে, তার কাছে তিনি সেভাবে নিয়েই প্রকাশিত হবেন। তিনি কারও ভাব ভাঙতে দেন না। সমস্ত ভক্তের সমস্ত ভাব রক্ষা করেন।

হরিহর বেশ (Harihara besha)

ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে বলা হয়, “যো হরিঃ স হরঃ সাক্ষাত যো হরঃ স হরিঃ সদা। (यो हरिः स हरः साक्षात यो हरः स हरिः सदा।)” অর্থাৎ, সাক্ষাৎ যিনি হরি (মহাবিষ্ণু) তিনিই হর (মহাদেব) ও যিনি হর তিনি হরি। তাঁরা স্বরূপত এক, অভিন্ন, একাঙ্গ, অদ্বৈত। শুধু তাঁদের প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন। হরি ও হরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শিব ও বিষ্ণু এক। শিবই বিষ্ণু, বিষ্ণুই শিব। পুরীর জগন্নাথ ও বলভদ্র দুজনেই সাক্ষাৎ নারায়ণ ও শিবশঙ্কর রূপে পূজা গ্রহণ করেন। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় যুগাচার্য কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্ ।/ মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ ॥” অর্থাৎ‚ যিনি যে প্রকারে আমার উপাসনা করেন‚ আমি তাঁকে সেই ফলদান করে অনুগ্রহ করি। হে পার্থ‚ বর্ণাশ্রমাদি ধর্মনিষ্ঠ মানুষেরা সকল প্রকারেই আমার পথই অনুসরণ করেন। পরম ঈশ্বরকে যে যেভাবে ভজনা করেন, যে পথে তাঁকে দর্শন কামনা করেন, ঈশ্বর ভক্তের আকাঙ্ক্ষা বা মার্গ অনুযায়ী সেভাবেই তাঁর প্রকাশ ঘটান। আধুনিক যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ এই আদর্শের সরলীকরণ করে বলেছিলেন, সাকারও সত্য, নিরাকারও সত্য।

প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যার তিথি থেকে কার্তিকের শুক্লা একাদশী তিথির আগে পর্যন্ত প্রতি সোমবার পুরীর শ্রীমন্দিরে বলভদ্রদেব অবকাশ বেশ পরিবর্তন করার পর হরিহর বেশ ধারণ করেন। সমগ্র কার্তিক মাসে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা রাধাদামোদর বেশে শৃঙ্গার করেন। কার্তিক মাসের অনুষ্ঠিত হরিহর বেশটি রাধাদামোদর বেশেরই একটা ভাগ বা সামান্য পরিবর্তিত রূপ। বলভদ্রের পরিধানে হরিহর বেশের সাজ দেখা গেলেও জগন্নাথ ও সুভদ্রার সজ্জায় রাধাদামোদর বেশই দেখা যায়। হরিহর বেশের অলংকার ও সজ্জা-শৃঙ্গার প্রকরণ রাধাদামোদর বেশের সঙ্গে অভিন্ন হলেও বৈচিত্র্য দেখা যায় বলভদ্রদেবের সজ্জায়। বলভদ্র যে বস্ত্র পরিধান করেন তার অর্ধেকটা কৃষ্ণবর্ণ ও অর্ধেকটা শ্বেতবর্ণের। বিগ্রহের মাথার চূড়া থেকে পাদদেশ পর্যন্ত এমনভাবে সজ্জিত করা হয় যে, কালো ও সাদা কাপড় উলম্বভাবে বলভদ্রের শরীরের দুদিকে শোভা পায়। এই বেশে বলরামকে শুধুমাত্র কার্তিক অমাবস্যা থেকে কার্তিক শুক্লা একাদশীর আগে পর্যন্ত অর্থাৎ দশমী পর্যন্ত সময়পর্বের মধ্যে শুধুমাত্র সোমবার দেখা যায়। এই দশ-এগারো দিনের মধ্যে বলরাম কমপক্ষে একদিন ও সর্বোচ্চ দুদিন হরিহর বেশে সজ্জিত হন। হরিহর বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও বলভদ্র ওড়িশার ‘ত্রিকাছা’ শৈলীতে পোশাক পরেন। জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁদের হাতে ধারণ করেন সোনালি নালিভূজ। হরিহর বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের বিগ্রহ সজ্জায় মোট চারটি নালিভূজের ব্যবহার করা হয়। নাতিদীর্ঘ সরু বাঁশের তৈরি লাঠি ও বিভিন্ন রঙের রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি ‘ত্রিমুণ্ডী’ (উচ্চারণভেদে ত্রিমুন্দী) ও সোনার ‘চন্দ্রিকা’ গহনা (সোনার ময়ূর-পালক) জগন্নাথের মাথায় চূড়ার অংশে শোভিত হয়। রাধা-দামোদর বেশের অনুকল্পে হরিহর বেশেও সোনার চন্দ্র-সূর্য ও তার নীচের অংশে সোনার তৈরি দীর্ঘ তিলকে সজ্জিত হন জগন্নাথ ও বলভদ্র। এই স্বর্ণতিলক তাঁদের সোনা বেশ সহ আর কয়েকটি বিশেষ শৃঙ্গারেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথার দু’পাশে কানের অংশে সোনার তৈরি বড় বড় দুটি কুণ্ডল পরানো হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের কোমরে রঙিন উত্তরীয় দিয়ে সাজানো হয়। এঁদের মধ্যে বলরামের জন্য নির্দিষ্ট থাকে সাদা ও কালো রঙের ব্যবহার। এর মধ্যে সাদা শিবের ও কালো বিষ্ণুর প্রতীক বহন করে। খুব সম্ভবত শিব ও বিষ্ণুর গাত্রবর্ণের সূত্র ধরে এই দুটি রঙের ব্যবহার এসেছে। ওড়িশার তাঁতে তৈরি ‘বড়লাগী’ কাপড়ে শ্রীবিগ্রহগুলি সেজে ওঠে। দেবী সুভদ্রার সাজে বৈচিত্র্য সেভাবে দেখা না গেলেও তাঁকে হরিহর বেশে সোনার কণ্ঠহার ও‌ তাগায় সাজানো হয়। এছাড়াও ত্রিদেবদেবীকে হরিহর বেশ শৃঙ্গারে আরও কিছু সোনা ও রূপোর অলংকার এবং অজস্র ধরনের ফুলের সজ্জায় সজ্জিত করা হয়। কখনও কখনও জগন্নাথকে মোটা মোটা তুলসীর মালায় ও পদ্মের মালায় সাজতেও দেখা যায়। উৎকলের ব্রাহ্মণেরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের ওপর জগন্নাথের নির্দেশ রয়েছে, “মহাদেবং বিনা যো মাং ভজতে শ্রদ্ধয়া সহ।/ নাস্তি তস্য বিনিমোক্ষঃ সংসারাজ্জন্মকোটিভিঃ।। (महादेवं बिना यो मां भजते श्रद्धया सह |/ नास्ति तस्य विनिमोक्षः संसाराज्जन्मकोटिभिः ||)” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আমাকে (মহাবিষ্ণু-জগন্নাথকে) অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উপাসনা বা ভজনা করে, কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেবকে শ্রদ্ধা, পূজা, ভজনা বা উপাসনা করে না, সেই ব্যক্তি শত শত জন্মের পরেও মোক্ষ লাভ করতে পারে না। এর কারণ হলো, “শিবস্য হৃদয়ং বিষ্ণুঃ বিষ্ণুশ্চ হৃদয়ং শিবঃ। (शिवस्य हृदयं विष्णुः विष्णुोश्च हृदयं शिवः।)” অর্থাৎ, বিষ্ণুর হৃদয়ে শিব সদা বিরাজমান, শিবের হৃদয়ে সদা বিরাজমান বিষ্ণু। শিব বিষ্ণুভজনায় প্রীত হন, বিষ্ণু শিবভজনায় প্রীত হন। আরেকটি শাস্ত্রীয় নির্দেশ পাওয়া যায়, শিবের গুরু বিষ্ণু ও বিষ্ণুর গুরু শিব। কোনো শিবভক্ত যদি বিষ্ণুনিন্দা করেন তবে তিনি শিবের গুরুনিন্দাই করেন; অনুরূপভাবে, কোনো বিষ্ণুভক্ত যদি শিবনিন্দা করেন তবে তিনিও বিষ্ণুর গুরুনিন্দাই করেন। গুরুনিন্দাকারীকে সনাতন ধর্মে সুনজরে দেখা হয় না। শিব উপাসক যদি বিষ্ণুনিন্দা করেন তবে তার শিবপদ লাভ হয় না এবং বিষ্ণু উপাসক যদি শিবনিন্দা করেন তবে তার বিষ্ণুপদ লাভ হয় না। শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথকে ভগবতী বিমলা মায়ের ভৈরব (বা শিব) রূপে দেখা হলেও বলভদ্রকেই শিবস্বরূপ অনুধ্যান করা হয়। এক্ষেত্রে বলভদ্র-মহাশিব, সুভদ্রা-আদ্যাশক্তি, জগন্নাথ-মহাবিষ্ণু রূপে পূজিত হন। নিত্যপূজা উপাসনার সময় বলভদ্রদেবের পূজার বিধিবিধানের সঙ্গে হরিহর বেশে সজ্জিত বলদেবের পূজায় সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটে। হরিহর বেশে তিনি একদেহে শিবরূপে ও বিষ্ণুরূপে ভক্তের পূজা গ্রহণ করেন। হরিহর বেশে সজ্জিত বলদেবের পূজাপদ্ধতিতেও শিবপূজা ও বিষ্ণুপূজার মিশ্রণ দেখা যায়। পূজার উপাচারেও কিছু বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এই অপূর্ব বেশ ভক্তের মনের ও আধ্যাত্মিক পথের ভেদবুদ্ধি নাশ করে। শৈব-শাক্ত-বৈষ্ণব ধর্মমতের মধ্যকার সম্প্রদায়গত পারস্পরিক বিদ্বেষ ও বিরোধের অবসান ঘটাতেই শ্রীভগবান হরিহর বেশে সজ্জিত হয়ে ভক্তের মনের যাবতীয় সংশয় সমূলে উৎপাটন করেন। হরি আর হরে কিছু তফাৎ নেই। তাঁরা একই পরমাত্মার দুই প্রকাশ। পৌরাণিক হরিহর মূর্তিতেও দেখা যায় মহাশিব ও মহাবিষ্ণু একই শরীরের অবস্থান করেন। সেই অদ্বৈত বিগ্রহের অর্ধাঙ্গে ভস্ম, অর্ধাঙ্গে চন্দন; অর্ধাঙ্গে জটাজাল, অর্ধাঙ্গে রত্নমুকুট; অর্ধাঙ্গে ব্যাঘ্রচর্মাম্বর, অর্ধাঙ্গে পীতাম্বর; অর্ধাঙ্গে রুদ্রাক্ষমালা, অর্ধাঙ্গে রত্নহার; একপদে বিল্বপত্র, একপদে তুলসীপত্র। শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনের দেবতার হরিহর বেশের সঙ্গে পৌরাণিক ইতিবৃত্ত এভাবে প্রচ্ছন্নভাবে জড়িত রয়েছে।

পদ্ম বেশ (Padma besha)

জগন্নাথের ভক্ত মনোহর দাস ছিলেন হিন্দিভাষী। তিনি আজ থেকে আনুমানিক তিন শতাব্দী আগে জগন্নাথের লীলাপ্রচারের অঙ্গ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভক্তিমান পুরুষ। জগন্নাথের প্রতি তাঁর একান্ত ভক্তি ও অচল বিশ্বাস ছিল। একবার মনোহর দাস জগন্নাথকে চোখ ভরে দেখার জন্য মনে মনে খুব ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মনের ভাব তিনি কাউকে বলতে পারছিলেন না। জগন্নাথের প্রতি তাঁর ব্যাকুলতা ক্রমে বাইরেও প্রকাশ পেতে থাকে। অবশেষে জগন্নাথের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠা মনোহর দাস সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি নীলাচলে জগন্নাথ দর্শনে যাবেন। পার্থিব সমগ্র প্রতিবন্ধকতা তিনি পার করে যাবেন শুধুমাত্র জগন্নাথের মহানাম সম্বল করে। মনোহর দাসের যেমন সিদ্ধান্ত তেমনই কাজ।

একদিন ব্রহ্মমুহূর্তে জগন্নাথের নামস্মরণ করে ভক্তরত্ন মনোহর দাস রওনা হয়েছিলেন নীলাচলের দিকে। জগন্নাথের নাম গান করতে করতে তিনি পাহাড়-জঙ্গল, নদ-নদী, জনপদ পেরিয়ে পথ চলতে লাগলেন মনের আনন্দে। তিনি সারাদিন পথ চলতেন ও রাতে বিশ্রামের জন্য একটি আশ্রয়ের সন্ধান করতেন। যেদিন তাও মিলত না সেদিন তিনি পথেই জগন্নাথের নাম স্মরণ করে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন আবার চলতে শুরু করতেন নীলাচলের পথে।

নীলাচলের পথে পথ চলতে চলতে এভাবেই মনোহর দাসের দিন কেটে যাচ্ছিল। একটি করে দিন কাটে আর মনোহর দাস মনে মনে আনন্দ বোধ করেন এই ভেবে যে, তিনি নীলাচলের পথে আরও অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছেন। যত দিন যাচ্ছে ততই তিনি জগন্নাথের দর্শনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এমনই একদিন সকালবেলা তিনি তাঁর যাত্রা শুরু করে দুপুরবেলা পথে তিনি তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠলেন। সেই সময় তিনি কাছাকাছি কোনো গ্রাম বা মন্দির বা কোনো আশ্রয় দেখতে পেলেন না। এমনকি কাছাকাছি কোনো পানীয় জলের জলাশয় খুঁজে পেলেন না যেখানে একটু জল পান করে তৃষ্ণা শান্ত করা যায়। তবু তিনি পথে পথচলা থামালেন না। মনে মনে জগন্নাথের নাম সংকীর্তন করতে করতে তিনি এগিয়ে যেতে লাগলেন। অনেক দূর আসার পর তিনি দেখতে পেলেন একটি সুন্দর পুকুর। তিনি সেই সুন্দর পুকুরে প্রথমে কিছুটা জল পান করে তারপর পুকুরে স্নানাদি সেরে নিলেন। পুকুরের মিষ্টি জলে তার তৃষ্ণা সম্পূর্ণ নিবারণ হয়ে গিয়েছিল। তৃপ্ত মনে তিনি পুকুরের দিকে চেয়ে দেখলেন অজস্র সুন্দর পদ্ম ফুল ফুটে রয়েছে। কিন্তু শীতের মরসুমে এমন দৃশ্য দেখে তিনি অবাকই হলেন। শীতে পদ্মফুল ফুটলেও তার শোভা কমে আসে। প্রাকৃতিক উপায়ে শীতে পদ্মফুল খুব কম ফোটে। সূর্যের তেজ পদ্ম ফুটতে সাহায্য করে। শীতকালে একসঙ্গে এত পদ্ম ফুল ফুটে থাকার এমন বিরল দৃশ্য দেখে মনোহর দাস খুবই আশ্চর্য হলেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন জগন্নাথের সৃষ্ট পৃথিবীতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। জগন্নাথ সমস্ত নিয়ম তৈরি করেন আবার তিনিই নিয়ম ভাঙতে দাঁড়িয়ে থাকেন। জগন্নাথ মূককে সুবক্তা করান, পঙ্গুকে পাহাড় লঙ্ঘন করান। তাঁর সামান্যতম কৃপা কটাক্ষে অসাধ্য সাধন হয়। শীতে পদ্মফুল ফোটা আর কি এমন বড় ব্যাপার। তিনি পুকুরে নেমে সমস্ত পদ্মফুল তুলে নিলেন আর নিজের ছোট্ট কাপড়ে সমস্ত ফুল আঁটি করে নিজের কাঁধের কাপড়ে বেঁধে নিলেন। তিনি কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সেই পুকুরটিকে মিলিয়ে যেতে দেখলেন। এসব জগন্নাথেরই অশেষ কৃপায় ছবি বুঝতে পারলেন তিনি। মনোহর দাস মনে মনে হাসলেন।

এভাবে পথে চলতে চলতে মনোহর দাস অবশেষে মাঘ মাসের অমাবস্যার রাতে জগতের রাজা জগন্নাথের রাজধানী পুরীতে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁর বাঞ্ছিতধামে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আনন্দে অধীর হয়ে উঠলেন। তিনি আর দেরি করলেন না সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করলেন জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে। তিনি রত্ন সিংহাসনে বিরাজমান জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শনকে দেখে বিমোহিত হয়ে গেলেন। আনন্দে মনের ভেতর থেকে তাঁর ‘জগন্নাথ’ ‘জগন্নাথ’ জয়ধ্বনি হতে লাগল। মনোহর দাসের দুই চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু বইতে লাগল। মহাবাহু জগন্নাথকে দেখে তাঁর ভেতরে একাধিক সাত্ত্বিক মহাভাবের প্রকাশ হলো। এ যে বড় আনন্দের দেখা ভগবানের সঙ্গে ভক্তের। ঠিকই এরপর মনোহর দাস বাহ্য চেতনা ফিরে পেতেই কয়েকদিন আগে সংগ্রহ করা সেই পদ্মফুলগুলি জগন্নাথকে নিবেদন করতে চাইলেন। জগন্নাথের প্রতি একান্ত অনুরাগে মনোহর দাস ভুলে গিয়েছিলেন যেদিন তিনি পুকুর থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মফুলগুলি সংগ্রহ করেছিলেন, সেদিনের পর অনেকগুলি দিন কেটে গেছে। ভাবের ঘোরে থাকা মনোহর দাসের মনেও ছিল না তাঁর সংগ্রহ করা পদ্মফুলগুলি এতদিনে অনেকটা শুকিয়ে গেছে। তবু তাঁর ভক্তহৃদয় এতসব তুচ্ছ বিষয়ে ভাবতে চাইল না। তিনি যে এসব জগন্নাথের জন্যই এতদূর থেকে মাথায় বয়ে এনেছেন। মাঝে যদি এতগুলো দিন কেটে গিয়ে থাকে, তবে সেটাও তো জগন্নাথেরই ইচ্ছে। মনোহর দাস গ্রামে থাকতে এক কথকতার আসরে শুনেছিলেন, জগন্নাথের ইচ্ছা ছাড়া একটা ফুলের রেণুও খসে না, একটা গাছের পাতা নড়ে না।

পুরীর শ্রীমন্দিরে দাঁড়িয়ে মনোহর দাস তাঁর সংগ্রহ করে আনা শুকনো পদ্মফুলগুলি জগন্নাথের ভাবে ভাবিত হয়ে থাকা অবস্থায় নিবেদন করতে চাইলে পুরীর পাণ্ডারা তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ হন। জগন্নাথের সেবক ও পাণ্ডারা মনোহর দাসকে বোঝান, জগন্নাথকে শুধুমাত্র টাটকা ফুলই নিবেদন করা উচিত। শুকনো ফুল দেবতাকে নিবেদন করা যায় না। মনোহর দাসের মনে খুব কষ্ট হলো। তিনি তাঁর আরাধ্য দেবতার জন্য এতদিন ধরে মাথায় করে এত শত পদ্মফুল বহন করে আনলেন অথচ সেই ফুলই কিনা তাঁকে দিতে পারলেন না। মনোহর দাস মানসিক কষ্টে ‘জগন্নাথ’ ‘জগন্নাথ’ বলে কাঁদতে লাগলেন। তিনি মনে মনে খুব আহত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর সংগ্রহ করে আনা ফুলগুলি সঙ্গে নিয়ে জগন্নাথের শ্রীমন্দিরকে আশাহীন ভাব নিয়ে ছেড়ে বাইরে চলে এলেন। তখনও তিনি মনে মনে বিশ্বাস করে চলেছেন, জগন্নাথ স্বয়ং ভাবগ্রাহী জনার্দন। জগন্নাথ কি তাঁর ভক্তের এই কষ্ট বুঝবেন না? জগন্নাথই যদি এই পদ্মফুলগুলি না চান, তবে আর কীভাবে মনোহর দাস তা জগন্নাথকে দিতে পারে! শ্রীমন্দিরের থেকে একটু দূরে মনোহর দাস রাতের বিশ্রামের জন্য রইলেন। এদিকে শ্রীমন্দিরে জগন্নাথদেব তাঁর ভক্তের আনা ফুলের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। পাণ্ডাদের কৃতকর্মের জন্য জগন্নাথ অভিমানী হয়ে উঠলেন। তিনি সন্ধ্যাকালীন বড় শৃঙ্গার বেশে আর সাজতে চাইলেন না। যতবার জগন্নাথকে সাজানো হয় ততবারই সাজ খুলে পড়ে যায়। এমন ঘটনা বিরল। জগন্নাথের সেবকগণ ভয় পেয়ে গেলেন। প্রধান পুরোহিত ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন, নিশ্চয়ই কোনো দিব্য মহাত্মার প্রতি অন্যায় হয়েছে শ্রীমন্দিরে। জগন্নাথ তাই রুষ্ট হয়েছেন সকলের ওপর। সেই অন্যায়ের যদি সংশোধন না করা হয় তবে জগন্নাথের সাজ কোনোভাবেই করা যাবে না।

ভাবগ্রাহী জনার্দন জগন্নাথ তাঁর ভক্ত মনোহর দাসের সেবা গ্রহণ করতে চান। তিনি যে ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু। তিনি কারও বাসনা অপূর্ণ রাখেন না, রাখতে পারেন না। মনোহর দাস আশা করে সেই শুকনো হয়ে আসা পদ্মফুলগুলি আগলে বসে থাকলেন। ক্রমে তিনি জগন্নাথের চিন্তা করতে করতে মহাভাবে মূর্ছিত হয়ে গেলেন। এদিকে জগন্নাথ মহাপ্রভু পুরীর গজপতি মহারাজের কাছে প্রত্যাদেশ দিলেন, “হে রাজা, আজ আমার এক প্রিয় ভক্ত শ্রীমন্দিরে আমার সেবার নিমিত্তে তোমার নিয়োজিত পাণ্ডা ও সেবকদের কাছে বিনা কারণে অপমানিত হয়ে ফিরে গেছে। আমার জন্য আমার ভক্ত অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর পদ্ম সংগ্রহ করে এনেছিল। সেগুলি তোমার নিয়োজিত পাণ্ডা ও সেবকদের কারণে সে আমাকে উপহার দিতে পারেনি। এখন সেই ভক্তই আমার চিন্তা করতে করতে মূর্ছিত হয়ে মন্দিরের বাইরে সিংহদ্বারের কাছে শুয়ে রয়েছে। সে মনের দুঃখে ব্যথিত হয়ে রয়েছে। আমি তোমাকে আদেশ করছি অনতিবিলম্বে আমার সেই ভক্তের কাছে যাও এবং তাঁর অতিকষ্টে সংগ্রহ করে আনা সেই পদ্মফুলগুলি যেখানে যে অবস্থায় পড়ে আছে সেই অবস্থায় দ্রুত নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। আজকের বড় শৃঙ্গার বেশে আমি মনোহর দাসের পদ্ম দিয়েই সাজতে চাই। আর এর সঙ্গে পদ্মচালের সুমিষ্ট ক্ষীর তৈরি করে আমাকে নিবেদন করে আমার ভক্তকে তা মহাপ্রসাদ রূপে উপহার দাও। আমার ভক্ত মনের দুঃখে অভুক্ত উদর নিয়ে রয়েছে। যাও রাজা, তাঁকে এখনই ফিরিয়ে আনো। আমি আমার ভক্তের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছি।” একই সময়ে জগন্নাথের একই প্রত্যাদেশ পেলেন পুরীর শ্রীমন্দিরের প্রধান পূজারী। তিনি বুঝতে পারলেন আজ কত বড় ভুল হয়েছে শ্রীমন্দিরে। নিজেদের ক্রিয়াকাণ্ড ও অহংকারের জন্য প্রধান পুরোহিত লজ্জিত হলেন। জগন্নাথের শৃঙ্গার সাময়িকভাবে থামিয়ে মনোহর দাসের কথা চারিদিকে আলোচিত হতে লাগল। সকলেই উপলব্ধি করলেন বিধিপূজা কতটা বাহ্য বিষয়। ভক্ত যদি সভক্তি সামান্যতম কিছু প্রভুকে অর্পণ করেন তবে তা নিমেষে নিখাদ সোনার মতো বিশুদ্ধ হয়ে যায়। পরশপাথরের স্পর্শ পেলে লোহা কি আর লোহা থাকে? জগন্নাথের এই তো ধারা।

জগন্নাথের এমন অদ্ভুত প্রত্যাদেশ পেয়ে গজপতি মহারাজ আর একটুও দেরি করলেন না। ততক্ষণে শ্রীমন্দির থেকে রাজার কাছে খবর এসেছে জগন্নাথের বড় শৃঙ্গারে আজ বারবার অন্যথা হচ্ছে। জগন্নাথের শরীরে বড় শৃঙ্গারের কোনো উপকরণই ক্ষণমাত্র থাকছে না, শুধুই খসে যাচ্ছে। রাজা বুঝতে পারলেন যে, আসলে শ্রীমন্দিরে কি ঘটেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সিংহদ্বারের কাছে পৌঁছে গেলেন। ভক্ত মনোহর দাস তখনও বাহ্য চেতনা হারিয়ে সিংহদ্বারের কাছে পড়েছিলেন। তখনো তাঁর হাতের কাছে পদ্মফুলগুলি আঁটি করে বেঁধে রাখা ছিল। রাজা স্বয়ং মনোহর দাসের কাছ থেকে পরম শ্রদ্ধায় শুকনো পদ্মফুলগুলি সংগ্রহ করলেন। মনোহর দাসের কানে জগন্নাথের নাম শোনাতে শোনাতে তাঁর বাহ্য চেতনা ফিরে এলো। রাজা মহাপ্রভু জগন্নাথের সেবক ও পাণ্ডাদের নির্দেশ দিলেন আজ মনোহর দাসের আনা এই পদ্মফুলেই হবে জগন্নাথের বড় শৃঙ্গার বেশ। রাজার কথা শুনে সেবক ও পাণ্ডারা আশ্চর্য হলেন। প্রধান পুরোহিত বুঝলেন জগন্নাথ নিশ্চয়ই রাজাকেও প্রত্যাদেশ করেছেন। সবাই বুঝতে পারলেন, এটাই জগন্নাথের ইচ্ছা। মনোহর দাসের সংগ্রহ করে আনা সেই শুকনো পদ্মগুলি সুগন্ধি চন্দনে স্পর্শ করে জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহে স্পর্শ করানো সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি সদ্য ফোটার পদ্মের মতো ফুটে উঠতে লাগল। একসঙ্গে এতগুলি পদ্মফুলের সৌরভে সমগ্র মন্দির দিব্যসুগন্ধে ভরে গেল। গজপতি মহারাজ ও শ্রীমন্দিরের সমস্ত জনতা এমন অদ্ভুত অপার্থিব দৃশ্য দেখে আনন্দে বিভোর হয়ে উঠলেন। সকলেই জগন্নাথ ও তাঁর মহান ভক্ত মনোহর দাসের নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগলেন।

পুরীর শ্রীমন্দিরে এই ঘটনাটি ঘটেছিল আনুমানিক তিন শতাব্দী আগে কোনো এক মাঘ মাসে। জগন্নাথের ভক্ত মনোহর দাসের এই কিংবদন্তি অনুযায়ী এখনও মাঘ মাসের অমাবস্যার পর থেকে শুক্লপক্ষের শ্রীপঞ্চমী তিথির (সরস্বতী পূজার তিথি) মধ্যবর্তী যে শনিবার বা বুধবার পড়ে সেই দিন জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শন পদ্মের সজ্জায় সজ্জিত হয়ে ওঠেন। শুধুমাত্র পুরীতে শ্রীমন্দিরেই নয় ওড়িশায় জগন্নাথ-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অজস্র মন্দিরে প্রধান দেবতাকে এখন পদ্মবেশে সজ্জিত করা হয়। প্রতি বছর শীতের মরসুমে পদ্মফুলের অভাব ঘটে। কিন্তু ঠিক কোনো না কোনো ভক্ত এই সময়ে জগন্নাথের জন্য অজস্র সুন্দর পদ্ম সংগ্রহ করে আনেন। এছাড়াও সাদা কাগজ ও সাদা শোলা দিয়ে পদ্ম তৈরি করা হয় জগন্নাথকে সাজানোর জন্য। পদ্ম বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ ও বলভদ্রের পায়ের কাছে‌ কাগজ ও শোলার তৈরি রাজহংস দেখা যায়।

জগন্নাথের এই পদ্মবেশ সারারাত জগন্নাথের গায়ে থাকে। জগন্নাথের অন্য কোনো বিশেষ বেশেই জগন্নাথের শয়ন হয় না। পদ্মবেশ এক্ষেত্রে খুব ব্যতিক্রম। পরেরদিন ভোরে জগন্নাথের মঙ্গলারতির পরও কিছুক্ষণ জগন্নাথ পদ্মবেশে থাকেন। এমনকি সিংহদ্বারের পতিতপাবন বিগ্রহও একইভাবে সেজে থাকেন। মঙ্গলারতির পর এই বেশও খুলে নতুন সাজে জগন্নাথকে সাজানো হয়। জগন্নাথের পদ্মবেশ মনোহর দাসের ভক্তি ও বিশ্বাসের স্মারক। ভক্তের জন্য জগন্নাথ সবকিছু করতে পারেন। ভক্ত যদি জগন্নাথের জন্য সমস্ত নিয়ম ভেঙে জগন্নাথের প্রতি অনুরক্ত হন, তবে জগন্নাথও সমস্ত নিয়ম ভেঙে ভারতের কাছে ধরা দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে পদ্ম একাধারে ভক্তের জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি, অভীষ্ট, প্রেম, আনন্দ, লক্ষ্য, উৎসর্গ, সমর্পণ, প্রণিপাত, শুদ্ধতা, আবেগ, বৈরাগ্য, হৃদয়পদ্ম ও নিষ্কাম মনোবৃত্তির প্রতীক। পদ্মবেশে জগন্নাথ স্মরণ করিয়ে দেন, যে ভক্ত একবারও জগন্নাথের হওয়ার কল্পনাও করেছেন, জগন্নাথ সঙ্গে সঙ্গে সেই ভক্তের হয়ে বসে রয়েছেন। ভক্তের হৃদয়পদ্মই জগন্নাথের প্রকৃত আসন। এখানেই জগন্নাথের সর্বাধিক সেবা সম্ভব। এই হৃদয়পদ্মই জগন্নাথকে উৎসর্গ করতে হয়। তবেই ভক্তের সাধনার সার্থকতা।

গজ-উদ্ধারণ বেশ (Gaja-Uddharana besha)

শ্রীপুরুষোত্তমধামের মহাবাহু জগন্নাথের পরিত্রাতা রূপটি সর্বজনবিদিত। যে ব্যক্তি জীবনের চরম অসময়ে মাত্র একবারও কায়মনোবাক্যে জগন্নাথের নামস্মরণ করেন, তাতেই তাঁর সংকটের কালো মেঘ কেটে যায়। জগন্নাথের সর্ব আর্তি হরণকারী রূপ তাঁর অনন্য গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারে ধরা পড়ে। ওড়িশায় জনে জনে বিশ্বাস রয়েছে, জগন্নাথ মহাপ্রভুর গজ-উদ্ধারণ বেশ দর্শন করলে ও গজেন্দ্র মোক্ষ লীলা শ্রবণ করলে ভক্তের ঐহিক ও পারৈহিক বিপদ সম্পূর্ণ কেটে যায়। জগন্নাথের গজ উদ্ধারণ বেশের সূচনার পিছনের কাহিনিটি শ্রীমদ্ভাগবতে রয়েছে। জগন্নাথের এই অনন্য বেশে জগন্নাথ শ্রীহরি নারায়ণ রূপে প্রকাশিত হন।

ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতির মৌখিক কথা ও কাহিনী অনুযায়ী গজেন্দ্র মোক্ষ কাহিনিতে রয়েছে, এক সময় অযুত যোজন সমান উচ্চতার ত্রিকূট পর্বত ও তার সন্নিহিত অঞ্চল অতিশয় মনোমুগ্ধকর স্থান। এই সুউচ্চ ত্রিকূট পর্বতের একটি গভীর অরণ্যে একদল বিশাল আকারের হাতি শান্তিতে বসবাস করত। ত্রিকূট পর্বতের বনে বনান্তরে খাদ্যের অভাব ছিল না। বনের হিংস্র পশুর সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক অনেক কম। ত্রিকূট পর্বতের অরণ্যে বসবাসকারী হাতি বা গজের দলের দলপতি বা রাজা ছিল গজেন্দ্র। তাকে তার বিশাল হস্তিবাহিনীর প্রত্যেকেই প্রধান হাতির সম্মান দিত। সেই হাতিই ক্রমে হয়ে উঠেছিল সমগ্র গজসমাজের গজের রাজা। এই গজেন্দ্র ছিল পূর্বজন্মের অভিশপ্ত। মুনির অভিশাপে গজেন্দ্র পূর্বজন্মের সমস্ত স্মৃতি ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু পূর্বজন্মের রাজাসম সংস্কার ও ভগবানের প্রতি ভক্তি তার এই গজজন্মেও বর্তমান ছিল। পূর্বজন্মের ভালো ও মন্দ উভয় প্রকারের সংস্কারই ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া বিনা তপস্যায় সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয় না।

গজদলপতি গজেন্দ্র পূর্বজন্মে ছিল দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় অঞ্চলের একজন উচ্চ বংশীয় প্রজাপালক মহারাজা। পূর্বজন্মে গজেন্দ্রর নাম ছিল ইন্দ্রদ্যুম্ন। একবার দ্রাবিড়ের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নিজের মাতৃভূমি তথা রাজ্য ত্যাগ করে এসে কিছুকালের জন্য মলয় পর্বতে বাস করছিলেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন ভগবান শ্রীমৎ নারায়ণের উত্তম ভক্ত ও মর্তলোকে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাসক। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিত্তে যশস্বী পুরুষ ছিলেন। তিনি পার্থিব, অপার্থিব অতুল ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী হয়েও তাঁর আরাধ্য দেবতার প্রতিদিন স্মরণ, মনন, পূজা, যজ্ঞ, জপ, ধ্যান করতেন।
রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দ্রাবিড় দেশ থেকে মলয় পর্বতে এসে বসবাসকালে তিনি বনবাসী তপস্বীগণের মতোই কষায় রঙের বসন ও শিরে জটা ধারণ করেছিলেন। এই সময়ে তাঁকে ঠিক বনচারী সাধু-ব্রহ্মচারী তপস্বীর মতোই দেখতে লাগত। তাঁর বনবাসী জীবন শান্তিতে ঈশ্বরের নিরন্তর চিন্তায় অতিবাহিত হচ্ছিল। এমনই একদিন যখন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রভাতী স্নান করে সেদিনের মতো নিশ্ছিদ্র মৌনব্রত ধারণ করে গভীর তপস্যার সংকল্প নিয়ে একাগ্রচিত্তে শ্রীবিষ্ণু ভগবানের নিত্যপূজা করতে বসেছিলেন ঠিক তখনই সেখানে দৈবের দোষে ভারতের মধ্যভাগে বিরাজমান মহাযশস্বী তপস্বীসম্রাট অগস্ত্য মহামুনির তাঁর শিষ্যপরিকর সমেত আগমন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মধ্যভারতের সবচেয়ে প্রতাপশালী মুনি। মহামুনি অগস্ত্য রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর সামনে এসে তাঁকে সম্ভাষণ করলেও মৌনব্রতে ব্রতী রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সম্পূর্ণ চুপ করে রইলেন।
মৌনতা অবলম্বন করে বিরাজমান রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের এই ধরনের আচরণ মহামুনি অগস্ত্যকে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর প্রতি ক্রোধান্বিত করে তুলতে থাকল। মহামুনি অগস্ত্য মলয় পর্বতে সশিষ্য এসেছিলেন। শিষ্যদের সামনে তাঁর এই নিরুত্তর অনাদর তিনি মেনে নিতে পারলেন না। মহামুনি অগস্ত্যর ক্রোধ রিপু চরমে উঠতে থাকায় তিনি রাজার সামনে থেকে গমনকালে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন অভিশাপ দিলেন। মহামুনি রাজাকে অভিশাপ দিলেন, সামাজিক রীতিনীতির, শিষ্টাচার ও যথার্থ সুশিক্ষার অভাবে অহংকারী রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ক্ষত্রিয় বর্ণের রাজা হিসেবে মুনিঋষিগণের প্রতি নিজের কর্তব্য ভুলে গিয়ে অজস্র তপস্বীগণের সামনে তপস্বী ব্রাহ্মণ অগ্যস্তকে অপমান করেছে। রাজার এই আচরণ তাঁর মূর্খ হস্তীসম জড়বুদ্ধির পরিচয় বহন করে। তাই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন মনুষ্য জীবন ত্যাগ করে সেই ঘোর অন্ধকারময় হস্তীযোনিতেই গমন করুক ও আগামী জীবন হস্তির জীবন কাটাক। বিনা অপরাধে দ্রাবিড়ের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের অভিশপ্ত হস্তীজন্ম প্রাপ্ত হয়েছিল কিন্তু আগের মনুষ্যজন্মে শ্রীবিষ্ণু ভগবানের নিত্যদিন পূজা-যজ্ঞ-আরাধনার প্রভাবে অভিশপ্ত জড়বুদ্ধিমান গজজীবনেও রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর চিন্তা চেতনায় শ্রীবিষ্ণু ভগবানের পূজার্চনার পূর্বের শুভস্মৃতি অক্ষয় হয়ে বজায় ছিল।

ত্রিকূট পর্বতে বসন্ত সমাপ্ত হয়ে গ্রীষ্ম এলো। পর্বতের অরণ্যে বসবাসকারী হস্তিরাও রোদের প্রচণ্ড তাপে বিহ্বল হয়ে উঠতে থাকলো। অরণ্যে বসবাসকালে একদিন গজেন্দ্র তাঁর অনুগামী হস্তীবাহিনী নিয়ে অরণ্যের সর্ববৃহৎ সরোবরে যাচ্ছিল সুস্বাদু জল পান ও ঠাণ্ডা জলে স্নানের আকাঙ্ক্ষায়। গ্রীষ্মের দাবদাহে তৃষ্ণার্ত হস্তীবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে গজেন্দ্র যখন বনপথে চলেছিল তখন শেষ বসন্তের ও গ্রীষ্মের প্রারম্ভের ফুলগুলি সুগন্ধি বাতাসে বনের পথ ভরিয়ে তুলেছিল। প্রকৃতির সুরভিত বাতাসে প্রায় মদবিহ্বল নয়নে হস্তিবাহিনীর দলপতি গজেন্দ্র অনেক দূর থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মরেণুর সুগন্ধবাহী বাতাসের আঘ্রাণ লাভ করে সেই বিরাট সরোবরের তীরে দ্রুতগতিতে সদলবলে উপস্থিত হলো।

স্বর্ণকমল, শ্বেতকমল, পীতকমল, নীলকমল ও রক্তকমলের সুবাসে সুরভিত মধুর নির্মল জলের বিরাট সরোবরে গজেন্দ্র প্রথমে অবতরণ করল আর নিজের শুড় দিয়ে সেই সরোবরের সুস্বাদু মিষ্টি জল পান করতে লাগল। অবশেষে গজেন্দ্র সরোবরের জলে নেমে স্নানও করল। এতে গজেন্দ্র খুবই আমোদ পেল। এই জলবিহার বিনোদনে গজেন্দ্র তার অন্য হস্তীবাহিনী সদস্যদেরও সরোবরের ঠাণ্ডা জলে স্নান করিয়ে দিল ও ঠাণ্ডা মিষ্টি জল পান করিয়ে তৃপ্ত করতে সক্ষম হলো। এই বৃহৎ সরোবরটি ছিল দিকপাল বরুণদেবের। সুরভিত বাতাস ও গ্রীষ্মের দিনে এমন ঠাণ্ডা জলে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে রইল গজেন্দ্র। ক্রমে এতে মোহিত হয়ে গজেন্দ্র সরোবরের মাঝেই উন্মত্তের মতো আচার আচরণ করতে শুরু করল। যেখানে জীব প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে বিলাসে ডুবে যায়, সেখানেই বিপদ তাকে আক্রমণ করে। গজেন্দ্রও আমোদে বুঁদ হয়ে ভুলেই গিয়েছিল যে তারা সকলে তৃষ্ণনিবারণের জন্য সরোবরে এসেছে, জলবিলাসের জন্য নয়। কিন্তু ভোগের ভ্রমে অন্ধ হয়ে থাকা গজেন্দ্র বুঝতেও পারছিল না এক বড় বিপদ তার এত সন্নিকটে আসছে। ফলে আসন্ন বিপদের বিষয়ে গজেন্দ্র প্রস্তুতও ছিল না।
গজেন্দ্র যখন অরণ্যের সরোবরে উন্মত্তের মতো আচরণ করছিল তখন দৈবপ্রেরিত হয়ে এক বলবান কুমীর নিজের করার দাঁতে দৃঢ়ভাবে গজেন্দ্রর একটি পা কামড়ে ধরল। এই কুমীর পূর্বজন্মে ‘হূহূ’ নামে এক শ্রেষ্ঠ গর্ন্ধব ছিল। মহান ঋষি দেবলের অভিশাপে সেই গন্ধর্বরাজ কুমীরের দেহ ধারণ করে এই সরোবরেই বহুদিন ধরে বসবাস করছিল। গজেন্দ্রর প্রমত্তের মতো আচার আচরণে তার শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছিল। তাই কুমীররূপী যক্ষ গজেন্দ্রর পায়ে ভীষণ আঘাত করে। কুমীর করার দাঁতে গজেন্দ্রর পায়ে কামড় বসানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গজেন্দ্র সচেতন হয়ে ওঠে। অতি বলবান গজেন্দ্র নিজের সমস্ত দৈহিক শক্তি একত্রিত করে নিজেকে কুমীরের ভীষণ কামড় থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করতে শুরু করল। কিন্তু কুমীরের দাঁতের ভীষণ আঘাত থেকে সে নিজেকে মুক্ত করতে পারল না। বরং সে যত ছটফট করতে লাগল ততই কুমীরের দাঁতারও দৃঢ় হয়ে তার পায়ে বসে যেতে লাগল। গজেন্দ্র এই অবস্থার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিল না। ফলে গজেন্দ্র সরোবরে দিশেহারা হয়ে পড়ল। জলে কুমীর বলবান, স্থলে গজের দল। গজেন্দ্র অনায়াসে বুঝতে পারল জলে কুমীরের সঙ্গে লড়াই করা যথেষ্ট কঠিন। অথচ কুমীরও এত শক্তিশালী যে গজেন্দ্র তাকে স্থলে টেনে তুলতে অক্ষম। গজেন্দ্র ও কুমীরের মধ্যে ভীষণ জীবন-মরণ যুদ্ধ শুরু হলো। গজেন্দ্রর সঙ্গে আসা তার বিরাট হস্তীবাহিনীও নিজেদের সমস্ত বল প্রয়োগ করেও নিজেদের প্রিয় দলপতি গজেন্দ্রকে কুমীরের ভীষণ কামড় থেকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হল না। এই ভীষণ যুদ্ধে গজেন্দ্র ও কুমীর উভয়েই নিজ নিজ পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রয়োগ করেছিল। তাছাড়া গজেন্দ্র ও কুমীর উভয় পক্ষই সমান শক্তিশালী হওয়ায় সরোবরের জলে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন টানাটানি চলতেই থাকল। গজেন্দ্রর নিজের বাহুবলের ওপর গর্বও ছিল।

এভাবে অনেক দিন, অনেক মাস, অনেক বছর অতিক্রান্ত যেতে থাকল। এই যুদ্ধ দেবতাদেরও আশ্চর্য করল । অবশেষে দেখা গেল যে প্রবল পরাক্রমশালী গজেন্দ্র শারীরিক ও মানসিক শক্তি হারিয়ে অবসন্ন হয়ে পড়তে শুরু করল। গজেন্দ্র যতই অবসন্ন হয়ে পড়তে লাগল ততই বলবান হয়ে ওঠতে লাগল কুমীর। ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসা গজেন্দ্রকে দেখে তার সঙ্গীসাথীরা তাকে ফেলে রেখে স্বস্থানে গমনে উদ্যত হলো। গজেন্দ্র দেখল এই বিপদের সময়ে একমাত্র সে-ই কুমীরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত, তার সঙ্গীগণ যাদের সে এতদিন আপন ভাবত তারা কেউই তার পাশে নেই। তাকে মরণাপন্ন দেখে একে একে সবাই তাকে ত্যাগ করে চলেছে। এমনকি তার সঙ্গে প্রণয়বদ্ধ তার প্রধান স্ত্রী হস্তিনীও তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে গজেন্দ্র সম্পূর্ণ একা লড়াই করে চলেছে। গজেন্দ্রর মনে বৈরাগ্য এলো। গজেন্দ্র বুঝতে পারল জগতে কেউ কারও নয়। সংসার অসার। ঈশ্বরের প্রতি প্রেমই একমাত্র নিঃস্বার্থ। আর সমস্ত সম্পর্কে স্বার্থ রয়েছে। এখন গজেন্দ্রর সঙ্গে সবার সব স্বার্থ ফুরিয়েছে। এখন গজেন্দ্রকে ত্যাগ করতেও এরা পিছুটান অনুভব করেনি। অথচ গজেন্দ্র এই পরিস্থিতিতে পড়ার আগে এদের নিয়েই মত্ত হয়ে ছিল। গজেন্দ্রর নিজের ওপর ধিক্কার এলো। এই কঠিন পরিস্থিতিতে গজেন্দ্র ক্রমে বুঝতে পারল সরোবরে কুমীররূপে স্বয়ং কালই তাকে গ্রাস করতে বসেছে। আর এই পরিস্থিতিতে তাকে মহাকালের হৃদয়নাথ শ্রীবিষ্ণু নারায়ণই তাকে রক্ষা করতে পারেন। ঈশ্বর ভিন্ন জীবের আপনজন আর কে আছে। যতক্ষণ আনন্দ আছে ততক্ষণ সবাই আছে। যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে তখন যার যার তার তার।

গজেন্দ্রর অন্তরে আত্মজ্ঞান জাগ্রত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজ বুদ্ধিতেই নিজের মনকে জাগতিক চিত্তভূমিতে সম্পূর্ণ স্থির ও শান্ত করে ঈশ্বরের ধ্যানে ডুবে গেলেন। এদিকে সরোবরের জলে কুমীর হয়ে উঠলো আরও হিংস্র। গজেন্দ্রর বাঁচার প্রচেষ্টা বন্ধ হয়েছে দেখে সেও প্রবল প্রতাপে গজেন্দ্রকে জলের মধ্যে টানার চেষ্টা করতে লাগল। গজেন্দ্র পূর্ব জন্মের সংস্কার তার মনের মধ্যে থেকে উত্থিত করতে লাগল একের পর এক বিষ্ণুস্তুতি। গজেন্দ্র বাঁচার ইচ্ছা ত্যাগ করেছে বুঝতে পেরে এবার কুমীরও খানিক আশ্চর্য হলো। কিন্তু গজেন্দ্রকে তখনও কুমীর জলে টানাটানি থেকে বিরত রইল না।

এদিকে বৈকুণ্ঠে বসে সশক্তিক শ্রীবিষ্ণু নারায়ণ তাঁর ভক্ত গজেন্দ্রর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তখন ভক্তপ্রবর গজেন্দ্রকে এই ভীষণ যুদ্ধকালীন বিপদ থেকে রক্ষার জন্য বিষ্ণু প্রস্তুত হলেন। বৈকুণ্ঠে নারায়ণের সঙ্গে অবসর যাপনের লীলাখেলায় মেতে ছিলেন লক্ষ্মী দেবী। গজেন্দ্রর অন্তর থেকে উচ্চারিত প্রতিটি ধ্বনি বৈকুণ্ঠে দশগুণ হয়ে পৌঁছাতে লাগল।ভক্ত একভাগ ঈশ্বরভজনা করলে ভগবান নিজের গুণে ভক্তের সেই ভজনাকে দশগুণ বৃদ্ধি করে আহ্লাদন করেন। ভক্তবিলাসী ভগবান ভক্তকে নিজের আপনজন ভাবেন। গজেন্দ্রর স্তুতি বৈকুণ্ঠে পৌঁছালে ভগবতী লক্ষ্মী দেবী খেলা ছেড়ে গজেন্দ্রকে রক্ষার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। শ্রীবিষ্ণু নারায়ণ গরুড়কে বাহন করে ও ভগবতী লক্ষ্মী দেবীকে নিজের বামভাগে বসিয়ে সেই সরোবরের স্থানে উপস্থিত হলেন। স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু নারায়ণ ভগবতী লক্ষ্মী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে গজেন্দ্রর সামনে স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন দেখেই গজেন্দ্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। জগদীশ্বর জগন্নাথ শ্রীহরি বিষ্ণু তাঁর ভক্ত গজেন্দ্রকে অতি কাতর অবস্থায় সরোবরে জীবনসংগ্রামের লিপ্ত দেখে এবং এই কঠোর পরিস্থিতিতও গজেন্দ্রর উচ্চারিত প্রতিটি স্তুব-স্তোত্র-স্তুতি শ্রবণ করে কষ্ট অনুভব করতে লাগলেন। এদিকে গজেন্দ্র নিজের জীবনসংশয়ের কথা ভুলে গেলেন গরুড়ে আরোহণ করে আসা তাঁর প্রভু চক্রপাণি শ্রীবিষ্ণুকে সশক্তিক আসতে দেখে গজেন্দ্র আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। আজ তার বহুজন্মের তপস্যা সার্থক হয়েছে। আজ সে নিজের আরাধ্য ঈশ্বরের সশক্তিক দর্শন পেয়েছে। অথচ নিজের আরাধ্যকে দেওয়ার মতো তার কাছে কিছুই নেই। গজেন্দ্র দুঃখে কাঁদতে লাগলো। তার আরাধ্য দেবতা তার কল্যাণে তার সামনে এসেছেন অথচ পূজা-সেবা-আরতির সুযোগ পর্যন্ত নেই। হয়তো আয়ুও ফুরিয়ে এসেছে তার।

গজেন্দ্র চারিদিকে চেয়ে দেখলেন সরোবরে অজস্র স্বর্ণকমল, শ্বেতকমল, পীতকমল, নীলকমল ও রক্তকমলের ফুটে রয়েছে। গজেন্দ্র চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের ধ্যান করে নিজের শুঁড় দিয়ে সরোবর থেকে একটি পদ্মফুলে তুলে সকাতর স্বরে নারায়ণের উদ্দেশ্যে বলল , “হে ভগবান বিষ্ণু, হে জগতের নাথ জগন্নাথ, হে ভাবগ্রাহী নারায়ণ, প্রভু আমার, প্রাণ আমার, আজ এতকাল পরে আমি আপনার দর্শন পেয়েছি। আপনি আমার আভূমি প্রণাম গ্রহণ করুন। আমি আপনার দর্শন পেয়েই ধন্য হয়ে গেছি। আমি এখন মরি বা বাঁচি কোনোকিছুতেই আমার আপত্তি নেই। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য আজ আপনার দর্শন মাত্রেই আমার পূরিত হয়েছে। ঈশ্বরলাভের পর আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই, পাওয়ার নেই। আমি আপনার দর্শন পেয়েই পূর্ণ হয়ে গেছি। প্রভু, আমাকে গ্রহণ করুন।”

গজেন্দ্রর এমন আর্তি ভরা কথা শুনে শ্রীপতি নারায়ণ আর স্থির থাকতে পারলেন না। ভগবতী লক্ষ্মী দেবীর চোখেও জল দেখা দিল। নারায়ণ তাঁর বাহন গরুড়রাজ থেকে অতি দ্রুত নেমে এসে পরম করুণায় স্বয়ং সেই সরোবরের জলে নেমে গজরাজ গজেন্দ্রর সঙ্গে কুমীরকেও অনায়াসে টানতে টানতে সেই সরোবরের তীরে নিয়ে এসে তুললেন। নারায়ণকে সশক্তিক পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতে দেখে ইতোমধ্যেই সেই সরোবরেই তীরে স্বর্গলোকের দেবতাগণও এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের সকলের সম্মুখেই ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর চক্রকে আজ্ঞা দিলেন, “হে চক্ররাজ সুদর্শন, যাও আমার ভক্ত গজেন্দ্রকে মুক্ত করো।” জগতের নাথের আজ্ঞা পাওয়া মাত্র সুদর্শন চক্র কুমীরের মুখ টুকরো টুকরো করে গজেন্দ্রকে মুক্ত করলেন। ভগবতী লক্ষ্মী দেবীর কৃপায় গজেন্দ্রর পায়ের ক্ষত নিমেষে নিরাময় হয়ে গেল। শ্রীবিষ্ণু ও লক্ষ্মী দেবীর পরিত্রাতা রূপ দেখে আকাশ মার্গে দেবতাগণ অপূর্ব পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন। সকলে সমস্বরে গজেন্দ্রমোক্ষ স্তোত্র পাঠ করতে লাগলেন। জগতের নাথের চক্রের আঘাত লাভ করে অভিশপ্ত কুমীর জীবন সমাপ্ত করে যক্ষের দিব্য দেহ ধারণ করল। নারায়ণে কৃপায় গজেন্দ্রও তার অভিশপ্ত হস্তীজন্ম শেষ করে দিব্যদেহ ধারণ করল।

জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারে শোলা ও কাঠের নিপুণ কাজে জগন্নাথাদি ত্রিবিগ্রহ সাজানো হয়। এই অপূর্ব বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র উভয়েই চতুর্ভুজ ধারণ করেন। এই শৃঙ্গারে জগন্নাথ কাঠের তৈরি পক্ষীরাজ গরুড় মহারাজের ওপরে বসেন। গরুড়ের কাঁধের দুই পাশে জগন্নাথের দুই পা ঝুলে থাকে। জগন্নাথের চার বাহুর ওপরের দক্ষিণ ও বাম বাহুতে যথাক্রমে সুদর্শন চক্র ও শঙ্খ থাকে এবং তাঁর নিচের দক্ষিণ ও বাম বাহুতে যথাক্রমে গদা ও পদ্মফুল শোভিত হয়। জগন্নাথের বাম কোলে বসেন সোনার শ্রীদেবী (লক্ষ্মী দেবী)। গরুড় মহারাজের ডানা দুটি দু’পাশে প্রসারিত অবস্থায় থাকে। গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারে বলভদ্রদেবও চতুর্বাহু ধারণ করে চারটি অস্ত্র ধারণ করেন। বলরামের চার বাহুর ওপরের দক্ষিণ ও বাম বাহুতে যথাক্রমে সুদর্শন চক্র ও শঙ্খ থাকে এবং তাঁর নিচের দক্ষিণ ও বাম বাহুতে যথাক্রমে মুষল ও হল (লাঙ্গল) শোভিত হয়। এই বেশে বলভদ্রদেবের দুই পদ দেখা যায়। গজ-উদ্ধারণ বেশের সময় বলভদ্রদেবের বামভাগে পূর্ণ মূর্তিতে থাকেন মহামতি সুভদ্রা দেবী। এই বেশ শৃঙ্গারে সুভদ্রা দেবীকে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সুভদ্রা দেবীর দুই হাতে দেখা যায় পদ্মফুল। সন্ধ্যাকালে জগন্নাথের রত্নবেদীর নিচে একটি হাতি ও একটি কুমীরের মূর্তি রাখা হয়। এই দুটি মূর্তি পৌরাণিক কাহিনীর গজেন্দ্র ও কুমীরের ভাব বহন করে। আরেকটি হাতি দেখা যায় বলভদ্রদেবের দক্ষিণভাগে। এই হাতির শুঁড়ে একটি ফোটা পদ্মফুল থাকে। এই হাতিটি গজেন্দ্রর জগন্নাথের প্রতি শরণাগতির দ্যোতক। শ্রীমন্দিরে জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট সেবকগণই জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারের এই উপকরণগুলি তৈরি করেন। জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশ তাঁর নারায়ণ রূপের ভাব বহন করে।
প্রতি বছর পবিত্র মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথ শ্রীক্ষেত্রে এই পৌরাণিক গজ উদ্ধারণ বেশে সজ্জিত হন। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের অষ্টম স্কন্দের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত গজরাজের আখ্যানের সঙ্গে শ্রীমৎ জগন্নাথ মহাপ্রভুর গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারের মিল পাওয়া যায়। রাজ্ঞী বকুল মহাদেবী জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশের পোশাকাদি প্রথম তৈরি করিয়েছিলেন। এরপর মাঝের কিছু বছর জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গার হয়নি। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে গজপতি রামচন্দ্র দেব পুনরায় জগন্নাথের গজ-উদ্ধারণ বেশের শৃঙ্গারের বিধিব্যবস্থা করিয়েছিলেন। পরে এই বেশের ব্যয়ভার বহন করতে থাকে বাসুদেব মঠের অধ্যক্ষ বা মহন্ত মহারাজ। এখন জগন্নাথের এই বেশ শৃঙ্গারের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পায় তাঁর ইচ্ছায় তাঁর ভক্তরা। ওড়িশার জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথকে গজ-উদ্ধারণ বেশ শৃঙ্গারে দেখলে ও তাঁকে স্মরণ করে শুকদেব কথিত গজেন্দ্রমোক্ষঃ স্তোত্র পাঠ করলে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সমস্ত সংকট জগন্নাথ নিজে এসে মোচন করে দিয়ে যান। ওড়িশার সাধারণ জনগণ যদি মাঘী পূর্ণিমার তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তমক্ষেত্রে এসে জগন্নাথদর্শনে সমর্থ না হন তবে তিনি যেখানে রয়েছেন সেখানেই জগন্নাথের নাম স্মরণ করে গজ-উদ্ধারণ বেশের ধ্যানে তৃপ্ত হন। ক্ষণমাহাত্ম্য অনুযায়ী বিশ্বাস করা হয় মাঘী পূর্ণিমার তিথিতে সূর্যাস্তের পর গজেন্দ্রমোক্ষঃ স্তোত্র পাঠ করার প্রশস্ত কাল। এই পবিত্র তিথিতে ওড়িশার জনতার কেউ যদি গজেন্দ্রমোক্ষঃ পাঠের সুযোগ না পান, তবে শুধুমাত্র জগন্নাথের মহানাম স্মরণ করেই জগন্নাথের কৃপার সমান ভাগীদার হয়ে ওঠেন।
শ্রীমদ্ভাবত পুরাণের অষ্টম স্কন্দের তৃতীয় অধ্যায় অনুযায়ী গজেন্দ্রমোক্ষঃ স্তোত্রটি নিম্নরূপ :

শ্রীশুক উবাচ

এবং ব্যবসিতো বুদ্ধ্যা সমাধায় মনো হৃদি ।
জজাপ পরমং জাপ্যং প্রাগ্‌জন্মন্যনুশিক্ষিতম্ ॥ ১॥

গজেন্দ্র উবাচ

নমো ভগবতে তস্মৈ যত এতচ্চিদাত্মকম্।
পুরুষায়াদিবীজায় পরেশায়াভিধীমহি ॥ ২॥

যস্মিন্নিদং যতশ্চেদং যেনেদং য ইদং স্বয়ম্ ।
যোঽস্মাৎপরস্মাচ্চ পরস্তং প্রপদ্যে স্বয়ম্ভুবম্ ॥ ৩॥

যঃ স্বাত্মনীদং নিজমায়য়ার্পিতং
ক্বচিদ্বিভাতং ক্ব চ তত্তিরোহিতম্ ।
অবিদ্ধদৃক্ সাক্ষ্যুভয়ং তদীক্ষতে
স আত্মমূলোঽবতু মাং পরাৎপরঃ ॥ ৪॥

কালেন পঞ্চৎবমিতেষু কৃৎস্নশো
লোকেষু পালেষু চ সর্বহেতুষু ।
তমস্তদাঽঽসীদ্গহনং গভীরং
যস্তস্য পারেঽভিবিরাজতে বিভুঃ ॥ ৫॥

ন যস্যদেবা ঋষয়ঃপদং বিদু-
র্জন্তুঃ পুনঃ কোঽর্হতি গন্তুমীরিতুম্ ।
যথা নটস্যাকৃতিভির্বিচেষ্টতো
দুরত্যযানুক্রমণঃ স মাবতু ॥ ৬॥

দিদৃক্ষবো যস্য পদং সুমঙ্গলং
বিমুক্ত সঙ্গা মুনয়ঃ সুসাধবঃ ।
চরন্ত্যলোকব্রতমব্রণং বনে
ভূতাত্মভূতাঃ সুহৃদঃ স মে গতিঃ ॥ ৭॥

ন বিদ্যতে যস্য চ জন্ম কর্ম বা
ন নামরূপে গুণদোষ এব বা ।
তথাপি লোকাপ্যযসম্ভবায় যঃ
স্বমায়যা তান্যনুকালমৃচ্ছতি ॥ ৮॥

তস্মৈ নমঃ পরেশায় ব্রহ্মণেঽনন্তশক্তয়ে ।
অরূপায়োরুরূপায় নম আশ্চর্যকর্মণে ॥ ৯॥

নম আত্মপ্রদীপায় সাক্ষিণে পরমাত্মনে ।
নমো গিরাং বিদূরায় মনসশ্চেতসামপি ॥ ১০॥

সত্ত্বেন প্রতিলভ্যায় নৈষ্কর্ম্যেণ বিপশ্চিতা ।
নমঃ কৈবল্যনাথায় নির্বাণসুখসংবিদে ॥ ১১॥

নমঃ শান্তায় ঘোরায় মূঢায় গুণধর্মিণে ।
নির্বিশেষায় সাম্যায় নমো জ্ঞানঘনায় চ ॥ ১২॥

ক্ষেত্রজ্ঞায় নমস্তুভ্যং সর্বাধ্যক্ষায় সাক্ষিণে ।
পুরুষায়াত্মমূলায় মূলপ্রকৃতয়ে নমঃ ॥ ১৩॥

সর্বেন্দ্রিয়গুণদৃষ্টে সর্ব প্রত্যয হেতবে ।
অসতাচ্ছায়যোক্তায় সদাভাসায় তে নমঃ ॥ ১৪॥

নমো নমস্তেঽখিলকারণায়
নিষ্কারণায়াদ্ভুতকারণায় ।
সর্বাগমাম্নায়মহার্ণবায়
নমোঽপবর্গায় পরায়ণায় ॥ ১৫॥

গুণারণিচ্ছন্নচিদূষ্মপায়
তৎক্ষোভবিস্ফূর্জিতমানসায় ।
নৈষ্কর্ম্যভাবেন বিবর্জিতাগম-
স্বয়ংপ্রকাশায় নমস্করোমি ॥ ১৬॥

মাদৃক্প্রপন্নপশুপাশবিমোক্ষণায়
মুক্তায় ভূরিকরুণায় নমোঽলয়ায় ॥
স্বাংশেন সর্বতনুভৃন্মনসি প্রতীত-
প্রত্যগ্দৃশে ভগবতে বৃহতে নমস্তে ॥ ১৭॥

আত্মাঽঽত্মজাপ্তগৃহবিত্তজনেষু সক্তৈ-
র্দুষ্প্রাপণায় গুণসঙ্গবিবর্জিতায় ।
মুক্তাত্মভিঃ স্বহৃদয়ে পরিভাবিতায়
জ্ঞানাত্মনে ভগবতে নম ঈশ্বরায় ॥ ১৮॥

যং ধর্মকামার্থবিমুক্তিকামা
ভজন্ত ইষ্টাং গতিমাপ্নুবন্তি ।
কিং ৎবাশিষো রাত্যপি দেহমব্যযং
করোতু মেঽদভ্রদয়ো বিমোক্ষণম্ ॥ ১৯॥

একান্তিনো যস্য ন কঞ্চনার্থং
বাঞ্ছন্তি যে বৈ ভগবৎপ্রপন্নাঃ ।
অত্যদ্ভুতং তচ্চরিতং সুমঙ্গলং
গায়ন্ত আনন্দসমুদ্রমগ্নাঃ ॥ ২০॥

তমক্ষরম্ব্রহ্ম পরং পরেশ-
মব্যক্তমাধ্যাত্মিকয়োগগম্যম্ ।
অতীন্দ্রিয়ং সূক্ষ্মমিবাতিদূর-
মনন্তমাদ্যং পরিপূর্ণমীডে ॥ ২১॥

যস্য ব্রহ্মাদয়ো দেবা বেদা লোকাশ্চরাচরাঃ ।
নামরূপবিভেদেন ফল্গ্ব্যা চ কলয়া কৃতাঃ ॥ ২২॥

যথার্চিষোঽগ্নেঃ সবিতুর্গভস্তয়ো
নির্যান্তি সংয়ান্ত্যসকৃৎস্বরোচিষঃ ।
তথা যতোঽয়ং গুণসম্প্রবাহো
বুদ্ধির্মনঃ খানি শরীরসর্গাঃ ॥ ২৩॥

স বৈ ন দেবাসুরমর্ত্যতির্যঙ্
ন স্ত্রী ন ষণ্ডো ন পুমান্ন জন্তুঃ ।
নায়ং গুণঃ কর্ম ন সন্ন চাসন্
নিষেধশেষো জয়তাদশেষঃ ॥ ২৪॥

জিজীবিষে নাহমিহামুয়া কি-
মন্তর্বহিশ্চাবৃতয়েভয়োন্যা ।
ইচ্ছামি কালেন ন যস্য বিপ্লব-
স্তস্যাত্মলোকাবরণস্য মোক্ষম্ ॥ ২৫॥

সোঽহং বিশ্বসৃজং বিশ্বমবিশ্বং বিশ্ববেদসম্ ।
বিশ্বাত্মানমজং ব্রহ্ম প্রণতোঽস্মি পরং পদম্ ॥ ২৬॥

যোগরন্ধিতকর্মাণো হৃদি যোগবিভাবিতে ।
যোগিনো যং প্রপশ্যন্তি যোগেশং তং নতোঽস্ম্যহম্ ॥ ২৭॥

নমো নমস্তুভ্যমসহ্য বেগ-
শক্তিত্রয়ায়াখিলধীগুণায় ।
প্রপন্নপালায় দুরন্তশক্তয়ে
কদিন্দ্রিয়াণামনবাপ্যবর্ত্মনে ॥ ২৮॥

নায়ং বেদ স্বমাত্মানং যচ্ছক্ত্যাহন্ধিয়া হতম্ ।
তং দুরত্যযমাহাত্ম্যং ভগবন্তমিতোঽস্ম্যহম্ ॥ ২৯॥

রঘুনাথ বেশ (Raghunath or Rama besha)

জগন্নাথ মহাপ্রভুর দুর্লভ বেশগুলির মধ্যে অন্যতম তাঁর রঘুনাথ বেশ বা রাম বেশ। বস্তুত জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ এখন এতটা দুর্লভ হয়ে গেছে যে, সাধারণ ভক্তরা ও জগন্নাথের শ্রীমন্দিরের বিভিন্ন শ্রেণির সেবকরা পোশাকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা আলোচনা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন। নাগার্জুন বেশের চেয়েও রাম রঘুনাথ বেশ বেশি দুর্লভ। এই বেশ সম্পর্কে আলোচিত বা প্রামাণিক সাক্ষ্য দিতে না পারায় বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ লোকই সচেতন হয়ে গেছেন। প্রাচীন জগন্নাথ ভক্তদের মধ্যে যে সব সৌভাগ্যবান এখনও জীবিত রয়েছেন তাঁরাও তাঁদের জীবনে মাত্র একবারই জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ দেখার সুযোগ পেয়েছেন। বহু বছর ধরে বিভিন্ন কারণে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ মহাপ্রভুর রঘুনাথ বেশের আয়োজন করা হয়নি। রঘুনাথ বেশ সম্পর্কে যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তার অধিকাংশই মৌখিক। কিছু লিখিত তথ্যও রয়েছে। পুরীধামের শ্রীমন্দির কর্তৃপক্ষ, উৎকল দীপিকা, প্রাচীন উৎকল ও অন্যান্য উৎস থেকে জানা যায় বিগত পাঁচশো বছরে শুধুমাত্র নয় বার জগন্নাথের রঘুনাথ বেশে শৃঙ্গারের আয়োজন হয়েছে। এর মধ্যে শেষবার জগন্নাথের রঘুনাথ বেশের আয়োজন হয়েছিল ১৯০৫ সালে। রেকর্ড অনুযায়ী ১৫৭৭ সালে প্রথমবার জগন্নাথের রঘুনাথ বেশের আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় রঘুনাথ বেশের আয়োজন করা হয় ১৭৩৯ সালে। তারপর ১৮০৯, ১৮৩৩, ১৮৪২, ১৮৫০, ১৮৯৩, ১৮৯৬ ও ১৯০৫ সালে সর্বমোট নয় বার জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ হয়েছে। এই বেসগুলি সাধারণত রাজা, জমিদার এবং গজপতি দ্বারা স্পনসর করা হত। ১৯৬৯সালের ১৭ই নভেম্বর জগতানন্দ দাস জগন্নাথের রঘুনাথ বেশের আয়োজন, নির্মাণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু জগন্নাথ মহাপ্রভুর রঘুনাথ বেশের আয়োজন উপলক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ এবং প্রাচীন অলঙ্কারগুলি ব্যবহার করতে বাবা জগতানন্দ দাস অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে শেষ পর্যন্ত জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। আবার, ১৯৮৩ সালে জনৈক জেলা কালেক্টর রঘুনাথ বেশ পরিচালনার জন্য শ্রীমন্দির প্রশাসক, মহারাজ, বিভিন্ন পর্যবেক্ষক এবং জগন্নাথ সংস্কৃতির অন্যান্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সভার আয়োজন করেন‌। এই জাতীয় চার বা পাঁচটি বৈঠকের পরেও জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে আজও কার্যকর করা যায়নি। প্রতি বছর চৈত্র মাস আসে, রামচন্দ্রের জন্মতিথিতে শ্রীক্ষেত্র ও সমগ্র উৎকলের বিভিন্ন ছোট ছোট জগন্নাথ মন্দিরে রঘুনাথ বেশের আয়োজন করা হলেও শ্রীমন্দিরে সম্ভব হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভক্তরা এখন সবকিছু জগন্নাথ মহাপ্রভুর উপর ছেড়ে দিয়ে প্রার্থনা ও অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন যেদিন তাঁর ইচ্ছা হবে সেদিন আবার তিনি রাম রঘুনাথ বেশ ধারণ করে রত্নসিংহাসনে আলোময় হয়ে বসবেন। বাস্তবে আর্থিক এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাগুলির জন্য জগন্নাথের রামসুন্দর রঘুনাথ বেশ খুব কমই অনুষ্ঠিত হয়।

জগন্নাথের এই বেশ সম্পর্কে যেটুকু প্রাচীন বিবরণ পাওয়া যায় তা হলো, রঘুনাথ বেশে রামায়ণের কাব্যনায়ক রামচন্দ্রের অযোধ্যার রাজদরবার কক্ষের মতো রত্নসিংহাসনকে সাজানো হয়। রঘুনাথ বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথের অন্যান্য বেশের মতোই জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার দারুবিগ্রহের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি প্রতিমার সহাবস্থান দেখা যায়। রঘুনাথ বেশের সময় জগন্নাথ হন রামচন্দ্র ও বলভদ্র হন ছত্রধর লক্ষ্মণ। রামচন্দ্ররূপ জগন্নাথ স্বর্ণময় সিংহাসনে বসেন। তাঁর এক পদ নিচে এক পদ ওপরে থাকে। তাঁর পদসেবনের জন্য উপস্থিত থাকেন রামগতপ্রাণ বীর হনুমান। জগন্নাথের সঙ্গে থাকে ধনুক ও বান। পীঠে থাকে তূর্ণ। লক্ষ্মণরূপ বলভদ্র একইভাবে সাজেন। তবে তিনি সিংহাসনে বসেন না, জেষ্ঠ্যের সেবায় ছত্র ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। জগন্নাথের লক্ষ্মী দেবী সীতা দেবীর সজ্জায় সজ্জিত হয়ে জগন্নাথের বাম কোলে শোভা পান। তাঁদের ঘিরে থাকেন ভরত, শত্রুঘ্ন, হনুমান, নারদ মুনি, জাম্বমান, বিভীষণ, সুগ্রীব, অঙ্গদ, সুষেণ, দধিমুখ, নীল, নল, দধিগান, বায়ুমুখ, ব্রহ্মা, ইন্দ্র, কুবের, পবনদেব, নৈঋত, বশিষ্ট, বামদেব, যবালি, কাশ্যপ, কাত্যায়ন, গৌতম, বিজয়, গবয়, ঋষভ, দ্বিবিধ, সুমন্ত সহ সর্বমোট বত্রিশটি মূর্তি। এই সমস্ত মূর্তি একটি দীর্ঘ চওড়া সিংহাসনের মতো কাঠের সুসজ্জিত প্ল্যাটফর্মে পর্যায়ক্রমে বসেছিলেন। শুধুমাত্র জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ অনুষ্ঠানের জন্য অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছিল এই প্ল্যাটফর্মটি। যার বিস্তৃতি ছিল জগন্নাথের রত্নসিংহাসন থেকে প্রায় কালাহাটা দ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রঘুনাথ বেশের সময় মূল তিন বিগ্রহ ছাড়াও অন্য দেবদেবীদের সাজানোর জন্য অনেক মূল্যবান গহনা ব্যবহার করা হয়েছিল। শুধুমাত্র অর্থের দিক থেকে নয় শিল্পনৈপুণ্যেও এই আয়োজনেও বিরাট।

সারা বছরের মধ্যে রঘুনাথ বেশ শুধুমাত্র রামচন্দ্রের রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানের তিথিতে আয়োজিত হয়। যদিও শ্রীমন্দিরের রেকর্ড অনুযায়ী চৈত্রের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে রঘুনাথ বেশের নির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে রঘুনাথ বেশ কবে ও কীভাবে প্রথমবার পালন করা হয়েছিল সে সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। প্রথম মত অনুযায়ী, আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতীয় আচার্য রামানুজ জগন্নাথকে রামচন্দ্রের রূপে অনুভব করেছিলেন। কিংবদন্তি রয়েছে তিনি শ্রীমন্দিরে জগন্নাথদেবের দর্শন করতে এসে প্রবলভাবে অনুভব করেছিলেন শ্রীমন্দিরের ভগবান জগন্নাথ এবং তাঁর আরাধ্য দেবতা রঘুনাথ রামচন্দ্র দুইজনে এক ও অভিন্ন। তাদের দুইরূপে স্বরূপের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। যিনিই পুরুষোত্তম জগন্নাথ তিনিই পুরুষোত্তম রামচন্দ্র। কথিত রামানুজ মানস চক্ষে দেখেছিলেন শ্রীমন্দিরের দেব-দেবীদের অভিষেকের পরে পৌষ পূর্ণিমায় রত্নসিংহাসনে ভগবান জগন্নাথ, বালভদ্র ও সুভদ্রা যথাক্রমে রাম, লক্ষ্মণ এবং সীতার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য রামরাজ্যের রাজদরবারের পোশাকে সজ্জিত হয়েছিলেন। আরেকটি মত অনুযায়ী, উৎকলের প্রাচীন রাজা গজপতি রামচন্দ্র দেব জগন্নাথের রঘুনাথ বেশের আয়োজন করেন ষোড়শ শতাব্দীতে ১৫৭৭ সালে। তিথিটি ছিল বৈশাখের কৃষ্ণপক্ষের দশমী। তিনি জগন্নাথের সেবার জন্য ও রঘুনাথ বেশ সজ্জার জন্য প্রচুর গহনা তৈরি করেছিলেন। সেই গহনা জগন্নাথের রঘুনাথ বেশ উপলক্ষে ব্যবহার করা হয়েছিল। গজপতি রামচন্দ্র দেব শ্রাবণ শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে নিজেকে (নব্য) ইন্দ্রদ্যুম্ন হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়া তিনি রামাভিষেক মোহর নামে একটি সোনার তৈরি সীল তৈরি করিয়েছিলেন। বলা হয় জগন্নাথের রঘুনাথ বেশকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি বীর রামচন্দ্রপুর গ্রামে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া আরও কয়েকটি কিংবদন্তি রয়েছে, বীর হনুমানকে জগন্নাথ রামচন্দ্রের রূপে দর্শন দিয়েছিলেন। পৌরাণিক অমরদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রামভক্ত লঙ্কেশ বিভীষণ শ্রীমন্দিরে জগন্নাথদর্শনে এলে জগন্নাথ তাঁকেও রামচন্দ্রের রূপে দর্শন দেন। অবধী ভাষায় ‘রামচরিত্রমানস’-এর কবি তুলসীদাস গোস্বামীও পুরীতে এসে জগন্নাথকে রামচন্দ্রের রূপে দর্শন করেছিলেন। আজ অজস্র রাম অনুরাগী জগন্নাথের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে রামরূপে ভজন করে স্বগত বলেন, “শ্রীরাম রাম রামেতি রমে রামে মনোরমে।/ সহস্রনাম তদতুল্যম রামনাম বরাননে।।”

বামন বেশ (Bamana or Bali Bamana besha)

ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে শ্রীপুরুষোত্তম জগন্নাথ বামন রূপে প্রকাশিত হন। এই তিথিতে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ মহাপ্রভুর বামন বেশ বা বলি-বামন বেশ অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথকে বামন রূপে দেখার শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, রথযাত্রার সময়ে রথে বিরাজমান বামন স্বরূপ জগন্নাথকে দর্শন করলে জন্মজন্মান্তরের বন্ধন নাশ হয়, জীবের মুক্তি ঘটে। এই বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথকে ভগবান বিষ্ণুর পঞ্চম অবতারের সাজসজ্জায় সাজানো হয়।

বামনদেবের একটি পূর্ব ইতিহাস রয়েছে। সত্যযুগে বিষ্ণু নৃসিংহদেব রূপে অবতার গ্রহণ করে তাঁর দৈত্য কুলোদ্ভব ভক্তশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন এবং দৈত্যরাজ হিরণ্যকশপুকে বধ করেছিলেন। এরপর দৈত্যরাজ হন প্রহ্লাদ। প্রহ্লাদের বংশধরগণ দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন। প্রহ্লাদের বংশধরগণ ধীরে ধীরে প্রতিপত্তি বিস্তার করতে থাকেন। তাদের ক্ষমতা ও বাহুবলে তারা তিনলোকে অজেয় হয়ে উঠতে থাকেন। এই বংশেই জন্মগ্রহণ করেন বলি। বলি দৈত্যরাজ হয়ে ওঠার পর তিন লোকে দৈত্য, রাক্ষস, অসুরদের প্রতিপত্তি আরও বেড়ে যায়। রাজা বলিও প্রায় অজেয় হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার মোহ ও লোভে অন্ধ হয়ে স্বর্গের দেবতাদের আবার আক্রমণ করে তারা। দেবতারা ভীষণ চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হন। অবশেষে স্বর্গবাসী দেবগণ পরাজিত হয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন। দেবতারা আশ্রয়হীন হলে দেবজননী ভগবতী অদিতি দেবী খুবই বিচলিত হয়ে ওঠেন। অন্য কোনো উপায়ান্তর না দেখে, ভগবতী অদিতি দেবী নতুন শক্তিশালী বীর পুত্রের জন্য সংসারের পালনহার ভগবান বিষ্ণুর পূজাপূর্বক কঠোর তপস্যা করেন। দেবজননী ভগবতী অদিতির কঠোর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁকে আশীর্বাদ করেন, খুব শীঘ্রই বিষ্ণু মহর্ষি কশ্যপের প্রসাদে দেবজননী অদিতির গর্ভে জন্মগ্রহণ করে ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। এ তাঁর অঙ্গীকার। এই ঘটনার পর যথাসময়ে ভগবতী অদিতির গর্ভে বিষ্ণু নবরূপে পঞ্চম অবতারে বামন বেশে আবির্ভাব গ্রহণ করেন। অহংকারী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৈত্যরাজ বলিকে দমন করাই ছিল বামন অবতারের প্রধান উদ্দেশ্য। বামনদেব ত্রেতাযুগে প্রকাশিত বিষ্ণুর প্রথম অবতার। তাঁর আবির্ভাবের পর থেকেই দৈত্যরা ক্রমে নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে। কিন্তু যতদিন যায় ততই সবাই অবাক হয়ে যায়, জন্ম নেওয়া বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার একজন বামন। দৈ বা দধি তাঁর বড় প্রিয় খাদ্য, তাই সবাই তাঁকে আদর করে দধিবামন বলেও ডাকেন।

এক সময়ের দৈত্য জনগোষ্ঠীর অধিপতি বলি এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞে ঋত্বিকদের সঙ্গে ছিলেন দৈত্যগুরু আচার্য শুক্রদেব। যজ্ঞে আগত সকলকে দৈত্যরাজ বলি কিছু না কিছু দান করেছিলেন। যে ব্রাহ্মণ তাঁর কাছে যা চাইছিলেন তিনি তাই-ই দান করেছিলেন। কাউকে তিনি ফেরাচ্ছেন না। সংস্কৃত ভাষায় প্রবাদসম একটি শ্লোক রয়েছে, অতি দর্পে হতা লঙ্কা, অতি মানেশ্চ কৌরবাঃ। অতি দানে বলি বদ্ধা অতি সর্বত্র গর্হিতম।। বামন অবতার বিষ্ণুদেব বলির যজ্ঞভূমিতে উপস্থিত হয়ে দান চাইলেন। দৈত্যরাজ বলিও দানে সমর্থ জানালেন। বলিরাজ বামনদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁর কী চাই? বলি মনে মনে ভেবেছিলেন তিনি ত্রিলোকের অধিপতি এক বামন ব্রাহ্মণ আর কতটুকুই বা চাইবেন। তাছাড়া তার মতো ক্ষমতাবান পুরুষের অদেয় কী থাকতে পারে? বামনদেব বলিরাজকে বলেন তাঁর প্রার্থীত দান বা ভিক্ষা অতি সামান্যই- মাত্র ত্রিপাদ ভূমি। তিন পা ফেলার মতো ভূমি তিনি দানে চান। এই কথা শুনে রাজা বলি অনেকটা তাচ্ছিল্য করে হাসতে হাসতে হাত বাড়ালেন গঙ্গাজলে পূর্ণ কমণ্ডলুর দিকে। কমণ্ডলুর মুখ থেকে নির্গত পবিত্র জল হাতে নিয়ে, সেই জল সংকল্প সহ ভূমিতে নিক্ষেপ করে অন্যকে দান করাই সেই সময় শাস্ত্রসম্মত প্রথা ছিল। দৈত্য রাজ বলির অদ্ভুত আচরণেই তাঁর গুরু শুক্রদেব বুঝতে পেরেছিলেন কোনো একটা বড় বিপদ আসন্ন। বিপদ অনুভব করে দৈত্যগুরু শুক্রদেব রাজা বলির দান-সংকল্পের আগে তাকে এই কাজ থেকে বিরত করতে চাইলেন। শুক্রদেব দৈত্যদের গুরু হলেও তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ ও সিদ্ধপুরুষ। স্বয়ং মহাদেব শিব তাঁকে বহুবার কৃপা করেছিলেন। দৈবজ্ঞ শুক্রদেব জানতেন, যজ্ঞস্থলে নব্যাগত বামন ব্রাহ্মণ স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর অবতার। তিনি আকারে যতই বামন হোন না কেন, তিনি প্রকারে বৃহৎ ক্ষমতাধর। তিনি অনুমান করেছিলেন, বিষ্ণুর অবতার দধিবামনের এই দান চাওয়ার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে আরও একটি বড় ছল। ব্রাহ্মণকে দানের অহংকারে মদমত্ত রাজা বলি তখন অন্ধ। গুরুদেবের সতর্ক নির্দেশ তিনি শুনেও কানে তুলতে চাইলেন না। অহংকারী বলি গুরুর আজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করতেও দ্বিধা করলেন না। শিষ্যের অপধার ক্ষমা করে আদর্শ গুরুর মতো গুরু শুক্রদেব শেষ চেষ্টা করলেন। আচার্য শুক্রদেব গোপনে সূক্ষ্ম শরীর ধারণ করে প্রবেশ করলেন বলি রাজার সংকল্পের কমণ্ডলুতে এবং বন্ধ করে দিলেন ভেতরে জল বাইরে আসার সরু পথটি। সংকল্প করার জন্য কমণ্ডলু কাত করেও রাজা বলি যখন দেখলেন জলপূর্ণ কমণ্ডলু থেকে জল পড়ছে না তখন তিনি বিরক্ত হয়ে যজ্ঞস্থলে পড়ে থাকা একটি কুশঘাস দিয়ে কমণ্ডলুর নলটি পরিষ্কার করতে চেষ্টা করলেন। কুশের আঘাতে আহত হয়ে দৈত্যগুরু শুক্রদেব বাইরে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজা বলি কমণ্ডলু থেকে জল নিয়ে ভূমিতে তা নিক্ষেপ করলেন। রাজা বলি বামনদেবকে বললেন, এবার তিন পদ ভূমি তিনি যেন মেপে নেন।

রাজার নির্দেশ পাওয়া মাত্র দধিবামন ক্ষুদ্রকায় বামন শরীরকে বিরাট রূপে প্রকাশ করলেন। বামনদেবের ত্রিবিক্রম রূপ সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। বামনদেবের একটি পায়ে অর্জিত হলো স্বর্গলোক ও অন্য পায়ে অর্জিত হলো মর্ত্যলোক। তখনও এক পায়ের সমান ভূমির প্রয়োজন। বলিরাজের কাছে বামনদেব জানতে চাইলেন, স্বর্গ ও মর্ত্যের সমগ্র ভূমিই তো অর্জন হয়ে গেছে, এখন তৃতীয় পদটি তিনি কোথায় স্থাপন করবেন। নিরুপায় রাজা বলি নিজের মাথা এগিয়ে দিলেন। তাঁর মাথাতেই বিষ্ণুপদ স্থাপনের জন্য অনুরোধ করলেন। বলি রাজার অহংকার চূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরাজ প্রহ্লাদ এসে তাঁর পৌত্র বলির পার্থিব বন্ধন মুক্তির জন্য আরাধ্য দেবতা বিষ্ণুর জয়গান করলেন। রাজা বলির অহংকার চূর্ণ হলে বামনদেব তাঁকে কৃপা করে পাতাললোকের রসাতল ভূভাগ ছেড়ে দেন। বলি তাঁর বাকিজীবন রসাতললোকেই বসবাস করেন। বামনদেবের কৃপায় দেবতারা তাঁদের স্বর্গরাজ্য ফিরে পান।

ভাদ্রের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে জগন্নাথ তাঁর ভক্তদের সমস্ত অহংকার ভেঙে দিতে বামনবেশ ধারণ করেন। এই তিথিতে জগন্নাথ স্বর্ণ হস্ত-পদ ধারণ করেন। জগন্নাথের ডান হাতে রূপোর তৈরি কমণ্ডলু ও বাম হাতে ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী ছত্র দেখা যায়। জগন্নাথের এই বেশে ব্রাহ্মণকুমারের মতো তাঁর মাথায় কালো রঙের শিখা দেখা যায়। তিনি কপালে সমান্তরাল তিন দাগ বিশিষ্ট ছোট ভস্ম তিলক ধারণ করেন বলরামও স্বর্ণ হস্ত-পদ ধারণ করেন। তাঁর ডান হাতে মুষল ও বাম হাতে হল দেখা যায়। উভয়েই স্বর্ণ তিলক, চন্দ্র-সূর্য, তাগা, কুণ্ডল ও মুকুট ধারণ করেন। তবে এই বেশে বলভদ্রের চূড়ার উচ্চতা তুলনামূলক একটু উঁচু। সুভদ্রা দেবী সোনা বেশের মতোই সজ্জিত হন। জগন্নাথের এই বেশ শৃঙ্গার হয় মধ্যাহ্নধূপের পর এবং বড় শৃঙ্গার বেশের আগে পর্যন্ত জগন্নাথ এই বেশে থাকেন। লোকবিশ্বাস রয়েছে জগন্নাথের বামন বেশ দর্শন করলে ভক্তদের অহংকার নাশ হয়, মানুষ অহংকার মুক্ত হয়ে সৎ জীবনযাপনে ব্রতী হন।

নাগার্জুন বেশ (Nagarjura or Parashurama besha)

জগন্নাথ সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয় মহাপ্রভু জগন্নাথ সমগ্র মহাবিশ্বের পালক ও শাসক। জগন্নাথ স্বয়ং পরমব্রহ্ম বা পরমাত্মাতত্ত্ব। জগন্নাথ যেমন বৈচিত্র্যময় পুরুষ তেমনই তাঁর বৈচিত্র্যময় সাজসজ্জা। তিনি যখন যেভাবে প্রকাশিত হন তখন সেভাবেই তাঁর শৃঙ্গার করানো হয়। জগন্নাথ মহাপ্রভু যেমন ভক্তের কাছে আকর্ষণীয় ঠিক তেমনই তিনি বিভিন্ন বিশেষ তিথিতে যে যে পোশাকে সজ্জিত হন সেগুলিও সমান দর্শনীয় তথা আকর্ষণীয়। জগন্নাথের সমস্ত বিশেষ বেশ শৃঙ্গারের মধ্যে তাঁর নাগার্জুন বেশ ভক্তদের কাছে সবচেয়ে দর্শনীয় এবং জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ অন্যতম দুর্লভ বেশ। পুরীর শ্রীমন্দিরে প্রতিবছর নাগার্জুন বেশ অনুষ্ঠিত হয় না। জগন্নাথের নাগার্জুন বেশকে কেন্দ্র করে অজস্র রহস্যময় ঘটনাও রয়েছে। সাধারণত, ওড়িআ বর্ষপঞ্জি বা পাঁজি অনুযায়ী পবিত্র কার্তিক মাসের শেষ পাঁচ দিন (তিথি) পাঁচুকা বা পাঁচুচা বা পঞ্চুকা নামে পরিচিত। এই পাঁচুকা হলো কার্তিক শুক্লার বর্ধিত তিথি দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী ও চতুর্দশী। এই তালিকায় থাকা অতিরিক্ত একটি দিনে শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে বিরাজমান দেবদেবীরা দুর্লভ নাগার্জুন বেশে শৃঙ্গার করেন। পাঁচুকার সময় জগন্নাথ প্রতিদিন বিশেষ বিশেষ শৃঙ্গারে সজ্জিত হন। যে বছর কার্তিক মাসের শেষে জগন্নাথের নাগার্জুন বেশের তিথি আসে সে বছর পাঁচুকা ছয়দিনের জন্য পালন করা হয়। এই সময়ের পাঁচুকাকে তাৎপর্যপূর্ণ, বিশাল ও সমৃদ্ধময় করে তোলে মহাপ্রভু জগন্নাথের নাগার্জুন বেশে সাজসজ্জা। তবে, এই আয়োজনের সুযোগ ঘটে খুব কমই। ২০২০তে জগন্নাথের নাগার্জুন বেশের আয়োজন হয়েছে একটানা ছাব্বিশ বছর পর। এর আগে শেষবার জগন্নাথের নাগার্জুন বেশের আয়োজন হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। অনেক বছর বাদে পাঁচুকায় একটি অতিরিক্ত দিন যুক্ত হওয়ায় ২০২০তে পাঁচুকা ছয় দিনের জন্য পালন করা হয়। কিন্তু দুর্লভ নাগার্জুন বেশের আয়োজন করা হলেও সাধারণ ভক্তরা জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন দেশে অতিমারীর প্রকোপ থাকার জন্য। এছাড়াও ১৯৬৬, ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৯৩তে পরপর তিন বছর পঞ্চুকার অতিরিক্ত তিথি বা মল তিথি থাকায় নাগার্জুন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের শৃঙ্গার হয়েছিল। প্রাচীন নথিপত্রে প্রতিটি তারিখ পেয়েছি, ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী সেগুলি হলো যথাক্রমে, ২৬-১১-১৯৬৬, ১৬-১১-১৯৬৭, ০৩-১১-১৯৬৭, ২৬-১১-১৯৯৩, ১৬-১১-১৯৯৪ ও ২৮-১১-২০২০ বলভদ্র ও জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ সম্পর্কে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক দুটি পৃথক কাহিনী সূত্র রয়েছে।

পৌরাণিক মতানুসারে ব্যাসদেব প্রণীত মহাভারতের মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন নাগসম্রাট বাসুকি নাগের কন্যা উলুপী সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুজনের দাম্পত্যের ফলস্বরূপ একটি সুপুত্র জন্ম নিয়েছিল। সেই পুত্রের নাম নাগার্জুন। নাগার্জুনের মধ্যে সমগ্র নাগ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পরাক্রম ও পিতা অর্জুনের মতো যশস্বী যোদ্ধার শক্তি প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু নাগার্জুনকে অর্জুন বিশেষভাবে কাছে পাননি। এমনকি তিনি দীর্ঘদিন জানতেও পারেননি অর্জুন তাঁর পিতা। পরবর্তীতে অর্জুন ও নাগার্জুনের মধ্যে বিবাদকালেও তাঁরা পরস্পরকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নাগার্জুনও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। নাগার্জুনের মাতা উলুপীর সঙ্গে বিবাহের কাছাকাছি সময়ে অর্জুন মণিপুররাজের কন্যা চিত্রাঙ্গদার সঙ্গেও পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। চিত্রাঙ্গদা ও অর্জুনের সম্পর্ক আলগা হওয়ার ক্ষেত্রেও উলুপীর অনেকখানি কূটনৈতিক ভূমিকা ছিল।

মহাদেব শিব নাগপৌত্র নাগার্জুনকে পরবর্তী সময়ে পর্বতরাজ হিমালয়ের একটি সুন্দর মনোরম পার্বত্য উদ্যানের দায়িত্বে অভিষিক্ত করেন। উদ্যান রক্ষার ভারপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নাগার্জুনই ছিলেন সেই পার্বত্য উদ্যানের প্রধান রক্ষক l উদ্যানের সুরক্ষায় নাগার্জুন সবসময় সচেতন থাকতেন। সামান্যতম বিচ্যুতিও তাঁর কাছে অজানা থাকত না।

এমনই একদিন অর্জুন একটি বিশেষ প্রয়োজনে বন্য একশৃঙ্গ গণ্ডারের অনুসন্ধানে বহু পার্বত্যভূমি ও অরণ্যলোকে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কোথাও একটিও একশৃঙ্গ গণ্ডার না পেয়ে অবশেষে নাগার্জুন রক্ষিত হিমালয়ের প্রাগুক্ত উদ্যানে প্রবেশ করেন। এই অরণ্যসম উদ্যানে ভ্রমণ করতে না করতেই অর্জুন একটি একশৃঙ্গ গণ্ডারের দেখাও পান। উদ্যানে ধনুকের শরসন্ধান করে অর্জুন খড়্গধারী গণ্ডার শিকার করতে উদ্যত হতে না হতেই সেই উদ্যানের রক্ষক নাগার্জুন অর্জুনকে সাবধান করেন। কিন্তু অর্জুন দৃঢ়সংকল্প থাকায় নাগার্জুনের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাঁধে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নাগার্জুন ও অর্জুনের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ শুরু হয় l আদতে পিতা-পুত্রের যুদ্ধ হলেও তাঁরা দুজনেই পরস্পরের প্রকৃত পরিচয় ও সম্পর্ক জানতেন না। নাগার্জুন অর্জুনের মতোই যুদ্ধে দক্ষ। তিনি যুদ্ধকৌশলে অবলীলায় অর্জুনকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। নাগার্জুনের কাছে আহত হয়ে মৃতসম মূর্ছা যান অর্জুন l নাগার্জুন বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়লে সেখানে উপস্থিত হন উলুপী। উদ্যানে মূর্ছিত অর্জুনকে দেখতে পেয়েই উলুপী আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। নাগার্জুনও জানতে পারেন তিনি যাঁর সঙ্গে এতক্ষণ যুদ্ধ করেছেন তিনিই তাঁর পিতা! নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে উলুপী বীরেন্দ্র নাগার্জুনকে অজ্ঞাতসারে পিতৃহন্তার গর্হিত অপরাধ থেকে রক্ষা করতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। স্বামীকে বাঁচাতে সূর্যদেবের কাছে অর্জুনের জীবন দান করার অনুরোধ করেন l অনাদি কাল থেকে প্রচলিত জগতের নিয়মানুসারে অতিরিক্ত দিবসে প্রাণদানের প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু নিয়ত গমনশীল সূর্যের একদিন পিছিয়ে আসা বা থেমে থাকা সম্ভব না। এমন অনর্থ হলে জগৎ অচল হয়ে যাবে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে সমস্ত নাগ একজোট হয়ে ভগবান কৃষ্ণ ও বলরামকে সেখানে আহ্বান করতে থাকেন l বলরাম ও কৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত হন। কৃষ্ণ তাঁর গুহ্য দৈবীশক্তিতে তখন পঞ্চুকা তিথির আহ্বান করেন। আকাশে সাতাশ নক্ষত্রের অবস্থান অদ্ভুত রূপলাভ করে। একটি অতিরিক্ত তিথি তথা দিন তৈরি হলে তার মধ্যেই অর্জুনের প্রাণসঞ্চারে সচেষ্ট হন কৃষ্ণ। নাগদের নাগমণিকে এই সময় ব্যবহার করেছিলেন অর্জুন। চেতনা ফিরে পেয়ে অর্জুন খুবই দুঃখ অনুভব করেন। অর্জুনের বিমর্ষ ভাব দেখে কৃষ্ণ তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। অর্জুন তাঁকে বলেন, অর্জুনের ইচ্ছে ছিল শুধুমাত্র কৃষ্ণই যেন তাঁকে পরাজিত করতে পারেন। আর এখানে এক সামান্য তরুণ নাগার্জুন তাঁকে পরাস্ত করেছেন। তখন অর্জুনকে কৃষ্ণ প্রবোধ দিয়ে বলেন, তিনিই নাগার্জুন স্বরূপে রয়েছেন। নাগার্জুন রূপে তিনিই জন্ম নিয়েছেন। সখার এমন বাক্যে অর্জুন আংশিক শান্ত হলেও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে সংশয় প্রকাশ করেন। আর এতেই ক্রোধান্বিত হয়ে বলরাম কৃষ্ণের বিরাট নাগার্জুন মূর্তির আহ্বান করেন। সঙ্গে সঙ্গে ষোড়শ প্রাণঘাতী অস্ত্রসজ্জিত কৃষ্ণ-বলদেবের রুদ্ররূপ প্রকাশিত হয়। ভয়ে ত্রস্ত হয়ে অর্জুন কৃষ্ণ-বলরামকে এই ভীষণ রূপ সংহার করতে বলেন।

জগন্নাথের নাগার্জুন বেশকে অনেকেই পরশুরাম বেশও বলেন। ব্রাহ্মণরুদ্র পরশুরাম বিভিন্ন অস্ত্রচালনায় দক্ষ ছিলেন। জগন্নাথের নাগার্জুন বেশেও মোট ষোলোটি অস্ত্র তিনি ধারণ করেন। কোমড়ে তাঁর বাঘছাল দেখা যায়। এমনকি জগন্নাথের মুখে পাকানো দাড়িও দেখা যায়। জগন্নাথের এই বেশ যুদ্ধসাজকে চিহ্নিত করে। তবে পুরীর জগন্নাথদেবের নাগার্জুন বেশ কবে থেকে শুরু হয় এই বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কোনো লিপিবদ্ধ তথ্যও নেই। তবে ওড়িশার অজস্র জগন্নাথ গবেষক মনে করেন প্রাচীন উৎকলের গজপতি মহারাজা অনঙ্গভীম দেব জগন্নাথ-সংস্কৃতিতে প্রথম নাগার্জুন বেশের আয়োজন করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, গজপতি মহারাজা অনঙ্গভীম দেব তাঁর রাজত্বকালে একবার যুদ্ধে পরাস্ত হন। ফিরে এসে তিনি জগন্নাথ মহাপ্রভুর শরণে গিয়ে নিজের দুঃখের কথা বলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জগতের যা কিছু ঘটে সবই ঈশ্বরের ইচ্ছায় ঘটে। জগন্নাথের ইচ্ছে ছাড়া একটি পাতার নড়ে ওঠার সাধ্য নেই। সমস্ত জীবের মধ্যে তিনি ব্যক্তচেতন রূপে বিরাজমান, সমস্ত জড়ের মধ্যে তিনি সুপ্তচেতন রূপে প্রকাশিত। জগন্নাথের কাছে অনুযোগ করে আসার পর অনঙ্গভীম দেবের রাজগুরু তাঁকে গুহ্য দৈবীশক্তি সমৃদ্ধ নাগার্জুন মন্ত্রে সাধনার নির্দেশ দেন। এই নাগার্জুন মন্ত্র মানুষকে অজেয় করে তোলে। তন্ত্রপদ্ধতিতে নাগার্জুন মন্ত্রের বিশুদ্ধ সাধনা করতে হয়। নাগার্জুন মন্ত্র সাধনা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। কিন্তু এই মন্ত্রে একবার সিদ্ধি অর্জন করলে সাধক জলে-স্থলে-আকাশে অজেয় হয়ে ওঠেন। রাজা অনঙ্গভীম দেব গুপ্ত সাধনায় নাগার্জুন মন্ত্র সাধন করতে শুরু করেন। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি নাগার্জুন মন্ত্রের সাধনা সম্পূর্ণ করেন। স্বয়ং দেবতা তাঁকে কৃপা করেন। সিদ্ধ অনঙ্গভীম দেব অজেয় হয়ে ওঠেন। এরপর গজপতি অনঙ্গভীম দেব আর যুদ্ধে হারেননি। কথিত স্বয়ং জগন্নাথ যুদ্ধকালে তাঁর পক্ষে লড়েছিলেন। নাগার্জুন মন্ত্র সাধনা পর প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে যেদিন অনঙ্গভীম দেব উৎকলে ফিরে এসেছিলেন সেদিনও ছিল পাঁচুকা বা পঞ্চুকার অতিরিক্ত তিথি। আপাত দৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও ঘটনাটি বাস্তবে ঘটেছিল। রাজা অনঙ্গভীম দেব পঞ্চুকা তিথিতেই জগন্নাথকে বিশেষ নাগার্জুন বেশে সাজানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেন। অচিরেই সমস্ত আয়োজন শুরু হয়। কালিয়াঠাকুর জগন্নাথ ও বড়ঠাকুর বলদেব সেজে ওঠেন নাগার্জুন বেশে। জগন্নাথকে অনঙ্গভীম দেব উৎকলের প্রকৃত রাজার মর্যাদা দিয়েছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন জগন্নাথের প্রতিনিধি স্বরূপ তিনি উৎকল রাজ্য শাসন করেন। কালক্রমে জগন্নাথ-বলরামের নাগার্জুন বেশ ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ-সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্য আজও পুরীর শ্রীমন্দির সহ জগন্নাথের অন্য সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্দির বহন করে চলেছে। এমনকি ওড়িশার বহু পুরুষ দেবতার মন্দিরে নাগার্জুন বেশে দেববিগ্রহ সাজানো হয়ে আসছে।

শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরে শুধুমাত্র জগন্নাথ ও বলদাউ নাগার্জুন বেশে সাজেন। জগন্নাথ ও বলভদ্রের নাগার্জুন রূপের সঙ্গে উপজাতি নাগ সম্প্রদায়ের বেশভূষার আংশিক মিল রয়েছে। অনেকে মনে করেন জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ উপজাতি বা অন্ত্যজ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্মারক। জগন্নাথ যেমন আর্যের তেমনই অনার্যের। জগন্নাথ ও বলভদ্র নাগার্জুন বেশে মূলত যুদ্ধযাত্রী যোদ্ধাদের মতো সজ্জিত হন। দেববিগ্রহের মাথায় শিরস্ত্রাণের অনুকরণে মুকুট দেখা যায়। সাধারণ বস্ত্রের ওপর লেখা বাঘের ছাল। জগন্নাথ ও বলভদ্র নাগার্জুন বেশ শৃঙ্গার করলেও দেবী সুভদ্রা সোনা বেশ শৃঙ্গারের অনুরূপ সাজসজ্জা করেন। প্রাচীনকালে সাধারণত নারীগণ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতেন না। কিন্তু প্রাচীন ভারতে বীরাঙ্গনা নারী ছিলেন না, এমন নয়। আদি সাহিত্য রামায়ণেই রয়েছেন কৈকেয়ী দেবী, যিনি রাজা দশরথের সঙ্গে যুদ্ধের প্রান্তরে অংশ নিয়েছিলেন।

অবকাশ বেশ ত্যাগ করে অনতিবিলম্বে নাগার্জুন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র আপাদমস্তক যুদ্ধসাজে সজ্জিত হন। জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় কালো রঙের হাণ্ডিয়া মুকুট শোভা পায়। এই বিশেষ মুকুটের প্রধান রঙ কালো, তার ওপর সোনালী ও রূপোলী জরির কাজ করা থাকে। এই মুকুট তৈরিতে কাগজ, কাপড়, রঙ, পাতলা বেত ও বাঁশের চটার ব্যবহার করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা প্রাচীনকালে যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলমেট বা শিরস্ত্রাণের মতো। অনেকাংশে টুপির মতো করে এই মুকুটটি পরানো হয়। এই মুকুটের একেবারে চূড়ার অংশে বসানো হয় একটি নাগফুল। এছাড়াও মুকুটের সঙ্গে গাঁথা থাকে ঐতিহ্যবাহী চন্দ্র-সূর্য, আদকানি অলংকার। দুই দেবতারই কপালে সোনার তিলক সাজানো হয়। জগন্নাথ ও বলরাম নাগার্জুন বেশে দাড়ি পরেন। কালো রঙের পাকানো দাড়ি বিগ্রহের গালের ধার বরাবর অর্ধচন্দ্রাকৃতিতে সাজানো হয়। বলাবাহুল্য নাগার্জুন বেশ ছাড়া আর কোনো বেশেই জগন্নাথ ও বলভদ্রের মুখে দাড়ি লাগানোর আয়োজন করা হয় না। রত্নসিংহাসনের দেবতারা সকলেই কানে কুণ্ডল পরেন। জগন্নাথ ও বলভদ্রের গলায় রকেটের মতো করে ঝুলে থাকে বাঘনখী অলংকার। তাঁদের কোমড়ে সোনার কোমড়বন্ধন দেওয়া হয়। এর ঠিক নিচে তাঁরা বাঘছাল ধারণ করেন। শোনা যায়, পূর্বে আসল বাঘছালের আয়োজন করা হতো। কিন্তু এখন বাঘছাল প্রিন্টের কাপড়ের ব্যবহার করা হয়। শাহী যাত্রায় নাগ সম্প্রদায় বা নাগারা যেমন কাঁধে পালকের গুচ্ছ পরেন ঠিক যেন তার অনুসরণে জগন্নাথ ও বলভদ্রের কাঁধে কলমি ফুলের সজ্জা থাকে। জগন্নাথ ও বলভদ্র কোমড়ে ধারণ করেন বাঁকা ছুরি, কাটারি, ঢাল, শিঙা, খড়্গ, রঞ্জকদান ইত্যাদি। নাগার্জুন বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্র হাত-পা ধারণ করেন। জগন্নাথের ডান হাতে চক্র ও বাঁ হাতে শঙ্খ থাকে এবং বলদাউ-এর ডান হাতে মুষল ও বাঁ হাতে হল থাকে। জগন্নাথ ও বলভদ্রের পীঠের দিকে ধনুকের মতো করে সাজানো হয় নাগাতাতি বা ধেনু। এর মধ্যে রক্ষিত থাকে অনেকগুলি অস্ত্র। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ত্রিশূল, বর্শা, শর, ত্রিকোণ পতাকা ইত্যাদি। অস্ত্র সহ নাগার্জুন বেশের প্রতিটি সাজই উৎকলের শিল্পীরা হাতে তৈরি করেন। বিভিন্ন কাগজ, কাপড়, বেত, বাঁশ, রঙ ও আঠার ব্যবহার করা হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্রের নাগার্জুন বেশ বীর ভাবের উদ্রেক করে। তিনি ভক্তকে আশ্বস্ত করেন ভক্তের সঙ্কটে, বিপদে সর্বক্ষণ তিনি তার সঙ্গে রয়েছেন। লোকবিশ্বাস রয়েছে জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ দর্শন করলে ঐহিক ও পারৈহিক শত্রুহানি হয় এবং পার্থিব ও অপার্থিব সমস্ত সঙ্কট নাশ হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র নাগার্জুন বেশে ভক্তের কাছে বার্তা দেন ভক্তকে রক্ষা করতে তিনি সবসময় প্রস্তুত রয়েছেন এবং ভক্তের যাবতীয় সংগ্রামে তিনি সহযোদ্ধা হয়ে সহযোগিতা করেন। জগন্নাথের নাগার্জুন বেশ বার্তা দেয় তিনি অনাথের নাথ, অধনের ধন, অবলের বল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, আমাদের শুধু নির্ভর করার মতো মানসিক স্থিরতা প্রয়োজন।

নবাঙ্ক বেশ (Nabanka besha)

শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরের উত্তরায়ণ উৎসবের অন্তর্গত একটি বিশেষ বেশ জগন্নাথ-বলভদ্রের নবাঙ্ক বেশ। নবাঙ্ক বেশ বিশেষ বৈচিত্র্যপূর্ণ না হলেও দেবতার সাধারণ শৃঙ্গারের চেয়ে আলাদা। নবাঙ্ক বেশ শৃঙ্গারের চেয়ে সেই দিনের আচার-আচরণ ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রার গুরুত্ব অনেক। জগন্নাথের প্রতিনিধি দেবতা মদনমোহনই জগন্নাথের হয়ে সেদিনের যাবতীয় আচার-আচরণ সামাল দেন। আর রত্নসিংহাসনের দেবতারা শুধুমাত্র নবাঙ্ক বেশ সজ্জায় সজ্জিত হন।

নবাঙ্ক বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রের বাহুতে যথাক্রমে শঙ্খ-চক্র ও মুষল-হল শোভা পায়। দুই দেববিগ্রহে মোট চারটি অস্ত্র সংযোজন করা হলেও পৃথকভাবে স্বর্ণ হস্ত-পদ যুক্ত করা হয় না। বলাবাহুল্য এই শঙ্খ-চক্র ও মুষল-হল তৈরি করা হয় এক ধরনের বিশেষ প্রকারের শোলা দিয়ে। শোনা যায় থার্মোকলের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই চারটি অস্ত্র ছাড়াও কুণ্ডল ও তাগাদি তৈরি করে রত্নসিংহাসনের দেবতাদের সাজানো হয়। নবাঙ্ক বেশে সোনা-রূপার অলংকারের চেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সাধারণ প্রাকৃতিক ফুল। বিশেষ করে শীতকালীন ফুলের মধ্যে বিভিন্ন রঙের গাঁদা ফুলের ব্যবহার দেখা যায়। অনেকটা বাংলার টোপরের মতো দেখতে এক ধরনের ফুলের টোপর বা মুকুটে সাজানো হয় জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলদেবকে। সাদা, গেরুয়া, হলুদ, লাল, কমলা, গোলাপী রঙের বিভিন্ন ফুলের মালা দিয়ে টোপরটি তৈরি করা হয়। তুলসীর মালায় সবুজ রঙের বৃত্তে টোপরের শোভা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। দীর্ঘ রঙিন কাপড়ে আচ্ছাদিত থাকেন দেবগণ। জগন্নাথ ও বলভদ্রের বাহুমূল থেকে বুক, পদপ্রান্ত পর্যন্ত পদ্মমালা সহ আরও কয়েকটি মালা শোভা পায়। বিগ্রহের মাথায়, কানে, কপালে ও নাসায় ঐতিহ্যবাহী ফুলের অলংকার পরানো হয়।

লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ (Laxmi-Narayana or Thiakia besha)

শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ-বলভদ্র-সুভদ্রার লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে। কিংবদন্তি রয়েছে, দক্ষিণ ভারতীয় বৈষ্ণব আচার্য রামানুজের বড় পছন্দের বেশ ছিল জগন্নাথের লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ। কথিত নিম্বার্ক আচার্যও জগন্নাথকে এই বেশে দর্শন করে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ অনুষ্ঠিত হয় মহাপ্রভু জগন্নাথের অবকাশ বেশের অনতিবিলম্বে। গোপালবল্লভ ও সকালধুপ অনুষ্ঠান হয় এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশে জগন্নাথ রাজার মতো নরম রেশমের কাপড় পরেন। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র হস্ত-পদ ধারণ করে সজ্জিত হয়। জগন্নাথ নারায়ণস্বরূপে ডান হাতে চক্র ও বাঁ হাতে শঙ্খ ধারণ করেন। বলভদ্র রাজার মতো দুই হাতে যথাক্রমে ধনুক আর শর ধরেন। তাঁদের দুজনের কপালে তিলক সাজানো হয়। কখনও কখনও চন্দ্র-সূর্যেরও ব্যবহার করা হয়। সুভদ্রা দেবী জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাঝে মহারাজ্ঞীসম বিরাজমান থাকেন। জগন্নাথের লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশে জগন্নাথই নারায়ণ ও শ্রীদেবী স্বয়ং লক্ষ্মী। কিন্তু গজ উদ্ধারণ বেশের মতো কোনো গরুড় বিগ্রহ উপস্থিত থাকেন না। রত্নসিংহাসনের দেবতাদের বিভিন্ন সোনার গয়না দিয়ে সাজানো হয়। তুসলীপত্র ও পদ্ম ফুলের মালা দিয়ে জগন্নাথের শৃঙ্গার করা হয়। জগন্নাথের মাথায় সোনার চূড়া, হাতে সোনার চক্র ও রূপার শঙ্খ দেখা যায়। জগন্নাথের লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ সারা ভারতের বিশিষ্ট-অদ্বৈতবাদী অর্থাৎ রামানুজ অনুসারী সাধক পরম্পরায় খুব জনপ্রিয়। প্রতি বছর জগন্নাথের লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ দর্শনের জন্য শ্রীক্ষেত্রে ভিড় হয়। এই বেশের আরেক নাম ঠাইকিআ বেশ।

ত্রিবিক্রম বেশ (Tribakrama or Adakia besha)

জগন্নাথ সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, জগন্নাথ ত্রিলোকস্বামী। তিনি সাক্ষাৎ নারায়ণের ত্রিবিক্রম মূর্তি। স্বর্গলোক, মর্ত্যলোক ও পাতাললোকের পালনকর্তা স্বয়ং জগন্নাথ। প্রতিটি জীব ও জড় তাঁর আপন। তিনিই চেতন রূপে জীব, অচেতন রূপে জড়। জগৎ তাঁর চৈতন্যে চেতনা অর্জন করে। এই ধারণা থেকেই এসেছে জগন্নাথের ত্রিবিক্রম বেশ। জগন্নাথের ত্রিবিক্রম বেশ অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে। এই তিথিতে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শিরে সোনার মুকুট পরানো হয়। তাঁদের কানে সোনার কুণ্ডল, মাথায় সোনার চন্দ্রসূর্য, গলায় সোনার কদম্ব অলংকারে সজ্জিত করা হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র সোনার তিলক ধারণ করেন। জগন্নাথ ও বলভদ্র ত্রিবিক্রম বেশ শৃঙ্গারের সময় সোনার হস্ত-পদ ব্যবহার করেন। বলভদ্র ও জগন্নাথ দুই হাতে যথাক্রমে মুষল-হল ও শঙ্খ-চক্র ধারণ করেন। কথিত জগন্নাথের বিশিষ্ট ভক্ত রামজয়ন্তী দাস জগন্নাথের ত্রিবিক্রম বেশ প্রবর্তন করেছিলেন। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের মাথার মুকুটের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অলংকারে শোলা, বেত ও কচি বাঁশের সাহায্যে নক্‌শা সাজানো হয়। এছাড়াও পাটের কাপড় ও ফুলের সজ্জায় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম ত্রিবিক্রম বেশে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন। জগন্নাথের ত্রিবিক্রম বেশ বীর ভাবের উদ্রেক করে। তাঁর এই বেশ ভক্তদের অহংকার নাশ করে। সাধারণ মানুষ বুঝতে শেখে, অনন্ত জ্যোতিঃসমুদ্রে বিরাজমান বিরাট পরমপুরুষের তুলনায় সে বড়ই নগন্য। আর সেই বিরাটের সামনে অহংকার করার মতো কিছুই নেই।

লক্ষ্মী-নৃসিংহ বেশ (Laxmi-Nursinha or Dalkia besha)

জগন্নাথদেব সাক্ষাৎ নৃসিংহ। সত্যযুগে বিষ্ণুর চতুর্থ ও শেষ অবতার নৃসিংহদেব। প্রহ্লাদের আহ্লাদের জন্য ও হিরণ্যকশপুর মুক্তির জন্য নারায়ণ নৃসিংহ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথের বিগ্রহ ও মন্দির নির্মাণের আগে নৃসিংহদেবের দর্শন পেয়েছিলেন। স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে নৃসিংহমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নৃসিংহ দেবতার কৃপায় সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের পর মহাসমুদ্রে ভেসে আসা শঙ্খ-চক্র চিহ্নিত নিমদারু পেয়েছিলেন। এর পরেই সেই নিমদারু দিয়ে তিনি নিরাকার বিষ্ণুর সাকার বিগ্রহ তৈরি করান। নৃসিংহ উগ্ৰরূপ শুধু নন, তিনি ভক্তবৎসল। কায়মনোচিত্তবাক্যে যে ভক্ত তাঁর শরণাগত হন, নৃসিংহদেব সেই ভক্তের সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন। ভক্তের ভালোবাসা ছাড়া তিনি আর কিছু চান না। নৃসিংহদেবের কৃপায় ভক্তের জগন্নাথলাভ হয়। অর্থাৎ মোক্ষলাভ হয়। জগন্নাথ সংস্কৃতিতে জগন্নাথকে সাক্ষাৎ নৃসিংহরূপে ভজনার রীতিও রয়েছে। ওড়িশায় জগন্নাথ-নৃসিংহ মিলিত বিগ্রহও রয়েছে। জগন্নাথকে বলা হয় পুরুষসিংহ। মনরূপ মত্ত হস্তিকে পুরুষসিংহ জগন্নাথ সংযত করতে সাহায্য করেন।

কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে জগন্নাথ লক্ষ্মী-নৃসিংহ রূপে শৃঙ্গার করেন। জগন্নাথের লক্ষ্মী-নৃসিংহ বেশটি ডালিকিয়া বেশ নামেও পরিচিত। লক্ষ্মী-নৃসিংহ বেশ অলঙ্করণ খুবই ইঙ্গিত দেয় যে, জগন্নাথের সমৃদ্ধশালী, ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে জগন্নাথ মন্দিরে প্রাচীন সময় থেকেই যথাযথ স্বীকৃতি ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্মী-নৃসিংহ বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় যে চূড়া পরানো হয় তার গড়ন দেখতে অনেকাংশে শিল্পশৈলীগত সিংহের কেশরের মতো। এই বেশে জগন্নাথ ও বলভদ্রকে চূড়াফণী ও অজস্র স্বর্ণালংকার পরানো হয়। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মাথায় সোনার চন্দ্র-সূর্য, কানে কুণ্ডল, তাদাদি পরানো হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র এই দিনে সোনার হস্ত-পদ ধারণ করেন। জগন্নাথের ডান হাতে চক্র ও বাম হাতে শঙ্খ থাকে। বলভদ্রের ডান হাতে মুষল ও বাম হাতে হল দেখা যায়। ফুলের মুকুট, পদ্ম সহ বিভিন্ন ফুলের মালা, তুলসীর মালা, সোনার কদম্ব ও কমলে শ্রীবিগ্রহ সেজে ওঠে। কথিত জগন্নাথের লক্ষ্মী-নৃসিংহ বেশ দর্শন করলে ভক্তদের সমস্ত পার্থিব ভয় বিনষ্ট হয়ে যায়।

শ্রাদ্ধ বেশ (Shraddha besha)

জগন্নাথ সমগ্র বিশ্বের পিতা। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ক্রন্দনধ্বনি তাঁকে কাঁদায়, প্রতিটি মানুষের হাসিমুখ তাঁকে আরও আনন্দময় করে তোলে। তিনি তাঁর সমস্ত সন্তানের তদ্ভাবরঞ্জিত হতে ভালোবাসেন। তিনি আদর্শ পিতার মতো শাসন করেন, আবার স্নেহে ভরিয়ে দেন। তিনি যেমন আদর্শ পিতা, তেমনই তিনি আদর্শ পুত্রও। সৃষ্টির কল্যাণে তিনি মানবশরীর ধারণ করেছিলেন ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে। তিনি রামচন্দ্র, তিনিই কৃষ্ণচন্দ্র। জগন্নাথই পুত্ররূপে পিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন অযোধ্যারাজ দশরথকে, ব্রজরাজ নন্দকে ও যদুপতি বসুদেবকে। পিতৃঋণ জনমে শেষ করা যায় না। জগন্নাথ দশরথ, নন্দ ও বসুদেবের কাছে চিরঋণী রয়েছেন। জগন্নাথ এখনও প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথিতে পিতৃঋণ শোধ করে চলেছেন। তিনজন পিতার জন্য তিনদিনে পিতৃঋণ শোধের সময় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা শ্রাদ্ধ বেশ পরিধান করেন।

জগন্নাথ ত্রেতা যুগে অযোধ্যার সূর্যবংশীয় মহারাজ দশরথের প্রথম পুত্র সন্তান রামচন্দ্র রূপে মাতা কৌশল্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দশরথ রামচন্দ্রকে স্নেহে ভরিয়ে তুলেছিলেন। মহারাজ দশরথ রামচন্দ্রকেই অযোধ্যার যোগ্যতম উত্তরপুরুষ নির্বাচন করেছিলেন। রামচন্দ্রও ছিলেন পিতার যথার্থ অনুগামী। পিতার আজ্ঞা তাঁর কাছে ছিল অলঙ্ঘনীয়, বেদবাক্যের সমান। পিতৃসত্য পালনের জন্য রামচন্দ্র রূপে রাজকীয় সমস্ত সুখ, সমৃদ্ধি, বৈভব, বিলাসবহুল জীবন বর্জন করে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো বনবাসী জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর সহযাত্রী হয়েছিলেন অনন্তাবতার বলরামের পূর্বরূপ রামানুজ লক্ষ্মণ ও জগন্নাথের শক্তি সীতা দেবী। জগন্নাথ তাঁর পূর্বপিতার স্মরণে প্রথমদিন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জগন্নাথ দ্বাপর যুগে মথুরার রাজা কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম পুত্র কৃষ্ণ রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দেবকী দেবীর সপ্তম গর্ভের সন্তান গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। কথিত দৈব পরিকল্পনা অনুযায়ী দেবকীর সেই সন্তান বিষ্ণুর নির্দেশে দেবী যোগমায়ার মাধ্যমে উপ্ত হয়েছিল বসুদেবের অপর স্ত্রী দেবী রোহিণীর গর্ভে। সেই পুত্রই বলভদ্র। এছাড়া দেবী যোগমায়াও জন্মগ্রহণ করেন নন্দরাজের গৃহে। কৃষ্ণের জন্মের আগে বাসুদেব ও নন্দ শলা পরামর্শ করেছিলেন, বসুদেবের অষ্টম পুত্র হবেন কংসের হত্যাকারী, তাই যে কোনো প্রকারে এই পুত্রকে রক্ষা করতে হবে। নন্দরাজ বসুদেবকে আশ্বস্ত করেছিলেন তাঁর ঘরে যে সন্তানই জন্মাবে তার সঙ্গে বসুদেবের সন্তান বদলে নেবেন তিনি। দৈবনির্দিষ্ট সময়ে দেবকীর কোল আলো করে কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। এরপরেই নবমী তিথিতে দেবী যোগমায়াও মাতা যশোমতীর কোল আলো করে কন্যারূপে আবির্ভূত হন। সত্যবদ্ধ নন্দরাজ নিজের সদ্যজাত কন্যাকে স্ত্রীর অজ্ঞাতেই বসুদেবের হাতে তুলে দেন এবং বসুদেবের অষ্টম পুত্রকে রক্ষার দায় গ্রহণ করেন। এরপর থেকে কৃষ্ণ ও বলরামকে নন্দরাজ নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম বড় হয়ে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় জানতে পারেন। পরবর্তীতে কৃষ্ণ ও বলরাম নন্দরাজ-যশোমতী ও বসুদেব-দেবকী অর্থাৎ তাঁদের পালক পিতা-মাতা ও জন্মদাতা পিতা-মাতার প্রতি সমস্ত কর্তব্য পালন করেছিলেন। জগন্নাথ তাঁর পূর্বপিতাদ্বয়ের জন্য যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। বলরামও জগন্নাথকে অনুসরণ করে একইভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁদের পিতৃপুরুষের প্রতি।

মার্গশীর্ষ (অগ্রহায়ণ) মাসে শ্রীমন্দিরে দেবদীপাবলী পালিত হয়। অজস্র আলোময় প্রদীপে শ্রীমন্দিরে চারধার সেজে ওঠে। মার্গশীষের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী, অমাবস্যা ও শুক্লপক্ষের প্রতিপদ এই তিনদিনে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা শ্রাদ্ধ বেশ পরেন। সাদা রঙের আঠারো হাত লম্বা চার হাত চওড়া কাপড় পরেন জগন্নাথ। পিতৃপুরুষের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশই শ্রাদ্ধ। শ্রাদ্ধ বাহ্যিক উপকরণের চেয়ে অন্তরের উপকরণে সমৃদ্ধ হয়। শ্রাদ্ধে বৈভবের কোনো গুরুত্ব নেই। তাই শ্রাদ্ধ বেশে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের সজ্জায় সেভাবে কোনো অতিরিক্ত জৌলুস থাকে না। অলংকারের বাহুল্যও দেখা যায় না। জগন্নাথ ও বলভদ্র ধুতি ও চাদরে সাজেন। সুভদ্রা দেবী সাজেন সাজা শাড়িতে। রত্নসিংহাসনের দেবতাদের সাদা কাপড়ের পারের অংশের জন্য কয়েকটি রঙ নির্ধারিত রয়েছে, তার মধ্যে কালো, নীল, সবুজ, লাল উল্লেখযোগ্য। শ্রাদ্ধ বেশ শৃঙ্গারে জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় কোনো মুকুট থাকে না। তাঁদের মাথা ও কান সাদা কাপড়ে ঢাকা থাকে। বড় ওড়িআ মঠ থেকে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের জন্য যাবতীয় সামগ্রী পাঠানো হয়। এটি এখানের পরম্পরা। শ্রাদ্ধ বেশে দেবতারা শুধুমাত্র ফুলের মালা প্রভৃতির শৃঙ্গার করেন।

সেনাপটা বেশ (Senapata besha)

জগন্নাথ ও বলদেব সেনাপটা (সোনপটা বা সেনপটাও বলে অনেকে) বেশ বহুল আলোচিত নয়। সেনাপটা প্রকৃতপক্ষে পৃথক দারু নির্মিত উপকরণ। জগন্নাথ ও বলভদ্রের মাথায় অনেকটা ঝুঁটি বা শিখার মতো দেখতে। সেনাপটা অনেকটা অর্ধবৃত্তকারে বিগ্রহের মাথা ও কোমড়ে যুক্ত থাকে। দেববিগ্রহের অঙ্গে সারাবছর থাকে না। সেনাপটার কিছুটা অংশ দেখা যায় জগন্নাথের স্নানযাত্রা ও রথযাত্রার সময়ে। তবে উভয় সময়েই সেনাপটা নরম সুতির বা পাটের কাপড়ে ঢাকা থাকে। দীর্ঘদিন শ্রীবিগ্রহের অঙ্গে সেনাপটা যুক্ত থাকায় এর গুরুত্ব অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার আগেরদিন জগন্নাথের শ্রীঅঙ্গে সেনাপটা লাগানো হয়। শ্রীমন্দিরের অভ্যন্তরে গুপ্ত রীতিতে সেদিনের যাবতীয় আচার-আচরণ সামাল দেন সেবকগণ। সাধারণ ভক্তেরা এই দৃশ্য দেখতে পান না। এর ছবি আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। বলরাম ও জগন্নাথের সেনাপটা বেশে বেশি বৈচিত্র্য নেই।

জগন্নাথের সেনাপটার পিছনে একটি কিংবদন্তি রয়েছে। জগন্নাথের বিখ্যাত ভক্ত মাধব দাসের সঙ্গে জগন্নাথ ও বলভদ্র সখ্যভাবে মেলামেশা করতেন। চপল বন্ধুসুলভ অত্যাচারে মাধব দাসকে মাঝে মাঝে বিরক্তও করতেন জগন্নাথ। মাধব দাস হয়ে উঠেছিলেন জগন্নাথের নিত্যলীলা সহচর। মাধব দাসের সঙ্গে জগন্নাথ ও বলভদ্র দুভাই বিচিত্র বিচিত্র লীলায় মাততেন। এমনই একদিন তাঁরা দুভাই মিলে মাধব দাসকে স্থানীয় একটি বাগানে নিয়ে আসেন। তখন বর্ষাকাল বাগানের কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল পেঁকে বাগান মাতিয়ে রেখেছে। হঠাৎ জগন্নাথ মাধব দাসের কাছে কাঁঠাল খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু জগন্নাথ জানান, তাঁর ও বলভদ্রের শরীর স্থূল। এই বপুতে গাছে ওঠা দুঃসাধ্য। অতএব মাধব দাসকেই গাছে উঠে কাঁঠাল নামাতে হবে। মাধব দাস আর কি করে। তিনি জানেন জগন্নাথ ও বলভদ্র যা বলেছেন তা না পাওয়া পর্যন্ত থামবেন না। মাধব দাস কাঁঠাল গাছে উঠে কাঁঠাল নামাতে রাজি হলেন। জগন্নাথ ও বলভদ্র একের পর এক গাছে মাধব দাসকে উঠতে বলেন, মাধব দাস গাছে ওঠার পর তাঁরা বলেন এই গাছ নয় অন্য গাছের কাঁঠাল খাবেন। এভাবে মাধব দাস একটি একটি করে অনেকগুলি গাছে উঠলেন আর নামলেন। মাধব দাস তাঁর হৃদয়বন্ধু জগন্নাথের এমন আচরণে অস্থির হয়ে উঠলেও জগন্নাথের অনুরোধে শেষবারের মতো তিনি আর একটি কাঁঠাল গাছে ওঠেন। কিন্তু কাঁঠাল নামানোর সময় জগন্নাথ ও বলভদ্র কাঁঠাল ধরতে রাজি হলেও কাঁঠাল ধরার আগে অদৃশ্য হয়ে যান। গাছের থেকে বড় মাপের কাঁঠাল টি মাটিতে পড়তেই ধুপ করে শব্দ হয়। শব্দ পেয়ে বাগানের রক্ষক ছুটে এসে দেখেন মাধব দাস কাঁঠাল পারছেন। সেই সময় মাধব দাসকে পুরীবাসী সকলেই চিনতেন। সবাই জানতেন মাধব দাস জগন্নাথের সঙ্গে বিচরণ করেন। স্বাভাবিকভাবেই মাধব দাসকে দেখে বাগানের রক্ষক চুপ করে যান। উল্টে অনুরোধ করেন, এরপর কাঁঠাল লাগলে মাধব দাস যেন তাকে নির্দেশ দেন। মাধব দাস বলেন, তিনি নিজের জন্য কাঁঠাল নামাতে আসেননি, জগন্নাথ ও বলভদ্র তাঁকে এমন কাজ করিয়েছেন। বাগান রক্ষক আর কি বলবেন! এমনভাবে আর একদিন আবার মাধব দাসকে জগন্নাথ ও বলভদ্র কাঁঠাল গাছে উঠিয়েছেন। সেদিনও এই গাছ সেই গাছ করে তাঁকে দুই ভাই মিলে অস্থির করে তুলেছেন। গাছে উঠতে নামতে অনেক গাছেই পাতা ইত্যাদি খসে গাছ বেয়ে কষ বা আঠা নেমেছে। কিন্তু জগন্নাথের লীলায় বাগানের রক্ষক কিছুই টের পাননি। বাগানের রক্ষক দুপুরবেলা একটি গাছে হেলান দিয়ে বসে ঘুমোচ্ছিলেন। আগের দিনের মতো হঠাৎ কাঁঠাল পড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায় এবং দৌড়ে গিয়ে চোর ধরার সময় তিনি দেখেন তার সাজের শিখা কাঁঠাল গাছের আঠায় লেগে গাছের সঙ্গে আটকে গেছে। এই আকস্মিক ঘটনায় তার শিখায় খুব জোরে টান লাগে, তার ব্যথা হয়। রাগে গজগজ করে তার মুখ দিয়ে অভিশাপ বেরিয়ে আসে, যার কারণে এভাবে তার চুলের শিখায় আঠা লাগায় তার এত ব্যথা লাগলো, যেন সেই ব্যক্তিরও এভাবে শিখায় টান দেওয়া হয়। জগন্নাথ ও বলভদ্র সেই অভিশাপ গ্রহণ করেন।

শ্রীমন্দিরে পরবর্তী সময়ে তুলোর গদির ওপর দিয়ে জগন্নাথের চলাচলের পাহণ্ডি রীতি বন্ধ হয়ে যায় এবং চালু হয় সেনাপটা রীতি (নীতি)। এখনও জগন্নাথ যখন শ্রীমন্দির থেকে বাইরে এসে স্নানমঞ্চে বা রথে ওঠেন তখন সেবকরা জগন্নাথের মাথার সেনাপটা ধরে তাঁকে দুলে দুলে এগিয়ে নিয়ে চলেন। জগন্নাথের সেনাপটা বেশ ভক্ত-ভগবানের বৈচিত্র্যময় লীলাসমূহের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

চাচেরি বেশ (Chancheri besha)

ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথি থেকে চতুর্দশী তিথি পর্যন্ত মোট পাঁচদিন শ্রীমন্দিরের আরাধ্য জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা মধ্যাহ্নকালীন ভোগরাগের সমাপ্তির পরে লাল রঙের চাচেরি বেশ শৃঙ্গারে সাজেন। রূপোর পাত্রে শীতল চন্দন শ্রীবিগ্রহের অঙ্গে লেপন করা হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম ও সুদর্শন বিগ্রহ চাচেরি বেশভূষায় সজ্জিত করার উপকরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কড়া লাল (অনেকাংশে বেনারসীর পাকা লাল) রঙের রেশমী ধুতি, লাল রঙের শ্রীমুখ বালা, লাল উত্তরীয়, আডাকানী ও নালিভূজা প্রভৃতি। চাচেরি বেশে জগন্নাথ সহ চতুর্ধা বিগ্রহ সজ্জিত হলে জগন্নাথের শক্তিদেবী শ্রীদেবী ও ভূদেবীকে মহাজন সেবকরা সুসজ্জিত খাটে (এক ধরনের আসনই) নিয়ে বসান। জগন্নাথের দোলপূর্ণিমার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দেবতা দোলগোবিন্দের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। সকলেই চাচেরি বেশ পরে তৈরি থাকেন। এরপর তাঁদের দিব্য ভোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভোগরাগের শেষে তাঁদের আবার রত্নসিংহাসনের বসানো হয়। এরপর শুরু হয় ফাগুলাগীর অনুষ্ঠান। এমন চলে প্রায় দোলযাত্রা পর্যন্ত‌। এছাড়াও কিছু গুহ্যাতিগুহ্য পদ্ধতিতে জগন্নাথের পূজা চলতে থাকে।

জগন্নাথের চাচেরি বেশের সময় তাঁদের প্রত্যেকের ব্যবহৃত সাজসজ্জার প্রধান রঙ লাল। লাল বসন্তের অন্যতম প্রধান রঙ। প্রকৃতি বসন্তবন্দনা করেন লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের মেলায়। জগন্নাথ সময় অনুসারে সাজেন, তাই রঙ যখন প্রকৃতিকে রাঙায় তখন জগন্নাথও রাঙা রঙে রঙিন হতে ভালোবাসেন। চাচেরি বেশে নতুন কাপড়ের সঙ্গে প্রায় ত্রিশ রকমের অলংকারে জগন্নাথ আরও দিব্যতনুধর হয়ে ওঠেন।

চন্দনলাগী বেশ (Chandanalagi besha)

জগন্নাথ ঋতু অনুযায়ী যে কয়েকটি বেশে শৃঙ্গার করেন তার মধ্যে প্রথম চন্দনলাগী বেশ। মৃদু সুগন্ধযুক্ত চন্দন কাঠ জলে ভিজিয়ে পাথরের পাটায় ঘষতে ঘষতে মিহি চন্দনের কাঁদ তৈরি হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ঘরেই প্রায় অনুরূপে চন্দন তৈরি করার রীতি রয়েছে। শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের জন্য তৈরি করা চন্দন রূপোর সুন্দর বাটিতে তুলে রাখা হয়। জলের সঙ্গে চন্দনের কাঠের মিহি মিশ্রণটি সুশীতল। চন্দন তৈরির সময় খেয়াল রাখা হয় তা যেন অতিরিক্ত পাতলা না হয়। সঠিকভাবে ঘর্ষণ না হলে চন্দন কাঠের সূক্ষ্ম দানা থেকে যায়, দেবতার জন্য তৈরি করা চন্দনের যেন দানা না থাকে সেই দিকে খেয়াল রাখা হয়।

শ্রীমন্দিরে চন্দনযাত্রা দুই ধরনের। প্রথমটি শ্রীমন্দিরের বাইরে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। জগন্নাথের প্রতিনিধি দেবতা মদনমোহন শ্রীদেবী ও ভূদেবীর সঙ্গে চন্দনযাত্রা করেন। তাঁদের সঙ্গে যান অষ্টধাতুর রাম ও কৃষ্ণ। দ্বিতীয়টির আয়োজন হয় শ্রীমন্দিরের ভেতরে। তখন জগন্নাথ স্বয়ং এই চন্দনলাগী উৎসবের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। এই দুই প্রকার চন্দনযাত্রা বা চন্দনলাগী অনুষ্ঠানই একুশ দিন করে অনুষ্ঠিত হয়। মোট বিয়াল্লিশ দিন জগন্নাথ এভাবে চন্দনসেবা গ্রহণ করেন। বৈশাখের পবিত্র অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমা পর্যন্ত চন্দনযাত্রা বা চন্দনলাগী অনুষ্ঠান হয়। শ্রীমন্দিরে চন্দনলাগী বেশ অনুষ্ঠিত হয় জ্যৈষ্ঠের কৃষ্ণপক্ষের নবমী থেকে জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমা পর্যন্ত।

চন্দনলাগী বেশ অনুষ্ঠানের সময় জগন্নাথাদি দেবতার শরীরে মিহি সুগন্ধযুক্ত চন্দনের প্রলেপ দেওয়া হয়। জগন্নাথের মাথা ও হাতে চন্দনের পুরু প্রলেপ দেওয়া হয়। এছাড়াও পেটের ওপরের অংশে চন্দনের ঘন প্রলেপ দেওয়া হয়। শোনা যায়, জগন্নাথের চন্দনবেশের সময় বিগ্রহের শীতলতা ভক্তরা অনুভব করতে পারেন। গরমের সময় দেবতাদের শরীর ঠাণ্ডা রাখার জন্য পরানো হয় গরমের উপযোগী কাপড়। চন্দনলাগী অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়, এই সময় দেবতাগণ প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রঙের কাপড় পরেন। জগন্নাথের ভোগেও এমন কিছু বিশেষ উপাদানের আয়োজন থাকে, যা ভক্ষণে বাস্তবিকই গরমের হাত থেকে খানিকটা নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, জগন্নাথ পরমপুরুষ পরমাত্মা, তাঁর আবার গরম কী, ঠাণ্ডা কী? তবু ভক্তরা নিজস্ব ভাবে তাঁদের প্রভুকে দেখেন। যখন প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের দাবদাহ চলছে তখন নিশ্চয়ই প্রভুরও গরমে কষ্ট হচ্ছে, এই একটি ভাবনা এর পিছনে কাজ করে। চন্দনলাগী অনুষ্ঠানের সময় জগন্নাথকে লাল ও সাদা রঙের পদ্মের মালায় সাজতে দেখা যায়। সাদা, হলুদ সহ বিভিন্ন স্নিগ্ধ বর্ণের ফুলে জগন্নাথ এই সময়ে সাজেন। বাস্তবিকই শ্রীমন্দিরে অভ্যন্তরে চন্দনলাগী অনুষ্ঠানের সময় প্রকৃতির তাপ কম অনুভূত হয়। জগন্নাথের চন্দনলাগী অনুষ্ঠানের প্রসাদী চন্দন তাঁর ভক্তেরা অনেকেই পেয়েছেন। জগন্নাথের স্পর্শধন্য চন্দনের মাহাত্ম্য ভক্তদের কাছে অনেক। শুনেছি চন্দনলাগী বেশের প্রসাদী চন্দন অনেকে কবচের মতো ধারণ করেন, অনেকে শুভ কাজে যাওয়ার আগে পরম শ্রদ্ধায় নিজের মাথায় প্রসাদী চন্দনের বিন্দু এঁকে নেন। অনেক মানুষই জগন্নাথের চন্দনবেশের প্রসাদী চন্দন ঘরে এনে পবিত্র স্থানে সংরক্ষণ করে প্রতিদিন জগন্নাথের আশীর্বাদ অনুভব করেন। আরও একটি তথ্য এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে, জগন্নাথের চন্দনলাগী অনুষ্ঠানের সময় কবি জয়দেব গোস্বামীর পদ প্রায় প্রতিদিনই শ্রীমন্দিরে গীত হয় :

চন্দনচর্চিত নীলকলেবর পীতবসন বনমালিন্৷
কেলিচলন্মণি কুণ্ডলমণ্ডিত গণ্ডযুগ স্মিতশালিন্৷৷
চন্দ্রকচারু ময়ূরশিখণ্ডক মণ্ডল বলয়িত কেশম্৷
প্রচুর পুরন্দর ধনুরনুরঞ্জিত মেদুরমুদির সুবেশম্৷৷
সঞ্চরদধর সুধা মধুর ধ্বনি মুখরিত মোহন বংশম৷
বলিত দৃগঞ্চল চঞ্চল মৌলি কপোল বিলোল বতংসম্৷৷
হারমমলতর তারমুরসি দধতং পরিরভ্য বিদূরম্৷
স্ফুটতর ফেন কদম্ব করম্বিতমিব যমুনা জল পূরম্৷৷
শ্যামল মৃদুল কলেবর মণ্ডলমধিগত গৌর দুকূলম্৷
নীল নলিনমিবপীত পরাগ পটল ভর বলয়িত মূলম্৷৷
বদনকমল পরিশীলন মিলিত মিহির সম কণ্ডল শোভম্৷
বন্ধুজীব মধুরাধর পল্লব মুল্লসিত স্মিত শোভম্৷৷
বিশদকদম্বতলে মিলিতং কলিকলুষ ভয়ং শময়ন্তম্৷
করচরণোরসি মণিগণভূষণ কিরণ বিভিন্ন তমিস্রম্৷৷
শশি কিরণোচ্ছুরিতোধর জলধর সুন্দর সকুসুম কেশম্৷
তিমিরোদিত বিধুমণ্ডল নির্মল মলয়জ তিলক নিবেশম্৷৷

ঘোড়লাগী বেশ (Ghodalagi besha)

জগন্নাথ গ্রীষ্মকালে যেমন চন্দনলাগী বেশে শৃঙ্গার করেন, তেমনই তিনি শীতকালে ওড়নষষ্ঠী তিথি থেকে ঘোড়লাগী অনুষ্ঠানেও মাতেন। সোজা ভাষায় বললে, এই ঘোড়লাগী প্রকৃতপক্ষে জগন্নাথের শীতকালীন সাজসজ্জা। প্রকৃতিতে শীত এলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন জগন্নাথেরও শৈত্যপ্রবাহে শীত অনুভূত হচ্ছে। সেই বিশ্বাস থেকেই জগন্নাথের ঘোড়লাগী বেশের আয়োজন করা হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে শীত ঋতুর শৈত্য থেকে রক্ষা করতে ঘোড়লাগী বেশে তাঁদের সাজানো হয়। ঘোড়লাগী বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শ্রীবিগ্রহের মুখ বাদে প্রায় সর্বাঙ্গ মোটা শীতবস্ত্র দিয়ে সম্পূর্ণ আবৃত করে রাখা হয়।

মার্গশীর্ষ (অগ্রহায়ণ) মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ পৌষ মাস ও মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি (সরস্বতী পূজা) পর্যন্ত জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের ঘোড়লাগী বেশে সুসজ্জিত থাকেন। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রীপঞ্চমী তিথিতেই জগন্নাথের রথযাত্রার প্রাথমিক উপকরণ অর্থাৎ কাঠগুলি শ্রীমন্দির চত্বরে এসে পৌঁছায়। শ্রীপঞ্চমী শীতশেষে কর্মতৎপরতার প্রারম্ভিক দিন। ঘোড়লাগী বেশ শৃঙ্গারের জন্য নির্দিষ্ট বারের জন্য নির্দিষ্ট রঙের বিধিবিধান রয়েছে। ঘোড়লাগী শৃঙ্গারের সময় রবিবারে টুকটুকে লাল রঙের শীতবস্ত্র, সোমবারে সাদার ওপরে কালো বিন্দু দেওয়া শীতবস্ত্র, মঙ্গলবারে মিশ্র বহুবর্ণ যুক্ত শীতবস্ত্র, বুধবারে হাল্কা নীলচে বা অনেকটা আকাশী রঙের শীতবস্ত্র, গুরুবার বা বৃহস্পতিবারে হলুদ রঙের শীতবস্ত্র, শুক্রবারে সম্পূর্ণ সাদা রঙের শীতবস্ত্র ও শনিবারে কালচে নীল বা বেগুনী রঙের শীতবস্ত্রে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের আপাদমস্তক আবৃত করা হয়। এই শীতবস্ত্রগুলির চারিধারে উজ্জ্বল জরির কাজ করার হয়। অনেকসময় সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত প্রাগুক্ত রঙের শীতবস্ত্রও জগন্নাথের শৃঙ্গারে ব্যবহার করা হয়। এই কাপড়গুলি ওজনে বেশ ভারমুক্ত কিন্তু যথেষ্ট গরম হয়। এই সময় জগন্নাথের শ্রীমন্দিরের পতিতপাবন বিগ্রহ ও সিংহদ্বারে বিরাজমান ভগবতী লক্ষ্মীদেবীকেও ঘোড়লাগী বেশ শৃঙ্গার করানো হয়। ঘোড়লাগী বেশের সময় জগন্নাথ ও বলভদ্র কোনো অস্ত্র ধারণ করেন না। বিগ্রহের সঙ্গে সোনার হস্ত-পদ বা পৃথক কোনো স্বর্ণ মুকুট পরানো হয় না। ঘোড়লাগী শৃঙ্গারের সময় অজস্র ফুলের মালায় জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা সজ্জিত হন। বলরাম ও জগন্নাথের গলায় তুলসীর মালাও পরানো হয়। এই সময়ে গাঁদা ফুল সুলভ হয়। গাঁদা ফুলের দীর্ঘ মালায় জগন্নাথাদি দেবতাদের সাজানো হয়। শীতকালীন বিভিন্ন সাদা ও রঙিন ফুলে জগন্নাথ ও বলভদ্রের হাত থেকে বুক পর্যন্ত মালার সম্ভার দেখা যায়। টোপরের আকৃতিতে বিভিন্ন ফুল ও তুলসীর মালা দিয়ে তৈরি মুকুটে সাজানো হয় রত্নসিংহাসনে বিরাজমান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে। ফুলের নোলকের ব্যবহারও দেখা যায়। সোনার অলংকার ঘোড়লাগী বেশে বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী বেশের মধ্যে মাত্র কয়েকদিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মাথায় সোনার চন্দ্র-সূর্য সাজানো হয়। ঘোড়লাগী বেশ শৃঙ্গারের শ্রীমন্দিরের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী অনুষ্ঠান। ঘোড়লাগী বেশ শৃঙ্গারের সময় জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শরীরের বেশিরভাগ অংশই শীতবস্ত্রের আড়ালে থাকায় এই বেশ ভক্তদের কাছে খুব বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি।

জামালাগী বেশ (Jamalagi besha)

ভারতে মাঘ মাসের মাঝামাঝি সময়ে (ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি) শীতের বাতাবরণ ম্লান হয়ে আসে। এরপর থেকেই ঋতু পরিবর্তন শুরু হয়। মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমীতে বসন্ত ঋতুর আগমনের সূচনা হয়, এমন একটি ধারণা ভারতবর্ষে অনেককাল আগে থেকেই প্রচলিত রয়েছে। শ্রীপঞ্চমীর (সরস্বতী পূজা) থেকে দোলপূর্ণিমা (ফাল্গুনী পূর্ণিমা) পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরে বসন্তের বন্দনা শুরু হয়। মধ্যবর্তী তিথিগুলিতে বিভিন্ন দেবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন তিথিতে ফাগ উৎসব বা ফাগু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন কৃষ্ণ মন্দিরগুলি ছাড়াও অজস্র শিব মন্দির, শক্তি মন্দিরে ফাগ উৎসবের রীতি রয়েছে। প্রাচীন ভারতের ঋষিদের কাছে শীত কাম্য ঋতু ছিল না। শীত জড়তা আনে, আর জড়তা মৃত্যুর সমতুল। শীতে প্রকৃতির প্রাচূর্য কমে আসে। শীতকে প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যের বৃদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ফাল্গুনী নাটকেও এই ধারণা রয়েছে। তাই ভারতীয় সভ্যতায় শীতের বিদায় লগ্ন থেকেই বসন্ত বরণের এতো আয়োজন। বসন্ত প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের দূত, নতুন প্রাণের সঞ্চারক ঋতু।

বৈচিত্র্যময় জগন্নাথও শীতের বিদায় মুহূর্তে প্রকৃতিমাতার বুকে আসন্ন বসন্তের জয়গানের সময় নববেশে সজ্জিত হন। জগন্নাথের এই সময়ের বেশ শৃঙ্গার মূলত জামালাগী বেশ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মাঘের মাঝামাঝি সময় থেকে সমগ্র পূর্ব-ভারতে শীত বিদায় নিতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই পুরীর শ্রীমন্দিরেও শীতের প্রোকোপ কমে আসে। শীত কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে জগন্নাথকে প্রাকৃতিক তাপমাত্রার ও ঋতু পরিবর্তনের সময়ের সঠিক উপযোগী পোশাক পরানো শুরু হয়। এমনিতেও লোকসংস্কার রয়েছে ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরের প্রতি যত্নবান না হলে রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে এই সময়ে আরও সাবধানে থাকতে হয়। শীত বিদায় নেওয়ার সময় বেশ কিছুদিন ধরেই তাপমাত্রা ওঠানামা করে। জগন্নাথকে আত্মভাবে সেবার সুযোগ রয়েছে বলেই জগন্নাথের ক্ষেত্রেও এই সমস্ত সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। জগন্নাথের জামালাগী বেশ শৃঙ্গারে যে রকমের পোশাক ব্যবহার করা হয় তা জগন্নাথের শীতকালীন পোশাকের চেয়ে বেশ অনেকটাই পাতলা আবার গ্রীষ্মকালীন পোশাকের চেয়ে অনেকটা মোটা। অর্থাৎ মাঝারি নরম কাপড়কে জগন্নাথের জামালাগী বেশের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়। বসন্তের তারুণ্য পুরীতে ছেড়ে যায় জগন্নাথের জামালাগী বেশের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে। ফাল্গুনের পূর্ণিমা পর্যন্ত জামালাগী বিধির সঙ্গে জগন্নাথের পূজা, সেবা ও ভোগ সংক্রান্ত কয়েকটি গুহ্য পরিবর্তনও নাকি ঘটে।

জামালাগী বেশ শৃঙ্গারের সময় রবিবারে লাল, সোমবারে সাদার ওপরে কালো বিন্দু, মঙ্গলবারে মিশ্র বহুবর্ণ, বুধবারে হাল্কা নীল বা আকাশী, বৃহস্পতিবারে হলুদ, শুক্রবারে সাদা ও শনিবারে কালচে নীল বা বেগুনী রঙের নরম পোশাকে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র সেজে ওঠেন। জামালাগী বেশেও জগন্নাথ ও বলভদ্র কোনো অস্ত্র ধারণ করেন না। বসন্ত ঋতুর বিভিন্ন ফুলে জগন্নাথ সেজে উঠতে থাকেন। গরম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পদ্ম ফুলও সুলভ হয়। পদ্মের মালায় সাজতে শুরু করেন জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শন। মাঘের শুক্লপক্ষের শ্রীপঞ্চমী থেকে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত রত্নসিংহাসনের দেবতাগণ প্রতিদিন জামালাগী বেশ শৃঙ্গারে ভক্তমন মোহিত করেন। জগন্নাথের জামালাগী বেশকে অনেকেই ঘোড়লাগী বেশের অঙ্গীভূত মনে করেন। কারণ উভয়ের রীতিপদ্ধতির মধ্যে অনেক মিল রয়েছে।

মকর চৌরাশী বেশ (Makara Chaurashi or Makarachula besha)

পৌষ মাসের শেষ দিন সারা ভারতময় মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। সাধারণত ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখেই মকর সংক্রান্তি পড়ে। অধিকাংশ হিন্দু উৎসবই সৌর বর্ষপঞ্জির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। মকর সংক্রান্তির একটি আদিম মাহাত্ম্য রয়েছে। এই সময়ে ঋতু পরিবর্তনের লগ্নে প্রাকৃতিক অনেকগুলি পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। পরিবেশ ও কৃষিভূমিকে কেন্দ্র করে মকর সংক্রান্তিতে ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, গুজরাট প্রভৃতি রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এই সময় থেকেই ভারতে ধীরে ধীরে দিন বাড়তে থাকে ও রাত কমে আসে। শীতের জড়তাও ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করে। ভারতে আবার উত্তাপ বাড়তে থাকে। মকর সংক্রান্তিতে পুরীর শ্রীমন্দিরে আয়োজিত হয় জগন্নাথের উত্তরায়ণ যাত্রা। পৌরাণিক কাহিনীতে রয়েছে, সাক্ষাৎ জগৎ সংসারের সঞ্চালক ভগবান সূর্যদেব মকর সংক্রান্তিতে তাঁর পুত্র শনিদেবের ঘরে আসেন। শনিদেব মকর রাশির অধিপতি দেবতা।

মকর সংক্রান্তিতে পুরীর শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্র মকরচৌরাশী বেশ শৃঙ্গার করেন। তাঁরা এই বেশে মাথায় বিশেষ ধরনের মকরচূড়া ধারণ করেন। এই সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার জন্য নতুন মিঠে চালের বিভিন্ন পিঠা, পরমান্ন প্রভৃতি নিবেদন করা হয়। বিভিন্ন স্বাদু ফল, শুকনো ফল (ড্রাই ফ্রুট), ছানা, খোয়াক্ষীর, গুড়, দুধ, নারকেল কোরানো প্রভৃতি পদে জগন্নাথ সেবা গ্রহণ করেন।

মকরচৌরাশী বেশের সময় জগন্নাথ সাধারণ বস্ত্রই পরেন। এই সময় শ্রীমন্দিরে একই সঙ্গে ঘোড়লাগী শৃঙ্গারও চলে। তাই মকরচৌরাশী বেশে তেমন বৈচিত্র্য দেখা যায় না। মকরচৌরাশীতে বিভিন্ন ফুলের সাজে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, সুদর্শন, শ্রীদেবী, ভূদেবী, নীলমাধবের সাজানো হয়। মালা দিয়ে গোল করে এক ধরনের বিশেষ মুকুটের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও জগন্নাথাদি দেবতাদের মাথায়, নাসায়, বাহুমূলে, বুকে কয়েকটি ফুলের তৈরি অলংকার দেখা যায়। মকরচৌরাশী বেশেও জগন্নাথ ও বলভদ্র বিশেষ কোনো অস্ত্র ধারণ করেন না।

পুষ্যাভিষেক বেশ (Pusyaviseka Besha)

স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে পুষ্যাভিষেকের নির্দেশ রয়েছে। বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পৌষ মাসের পুষ্যা নক্ষত্র বিহিত পূর্ণিমা তিথিতে (অনেকসময় পৌষের তিথি মাঘ মাসে প্রসারিত হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে মাঘ মাসের অনুষ্ঠিত হয়) জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের বিশেষ ভাবে রঙিন ফুল ও সুগন্ধি দ্রব্যে বিশেষ অভিষেক করা হয়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন অনেক দেবমন্দিরে পুষ্যাভিষেক পৌষের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতেও অনুষ্ঠিত হয়। ‘পুষ্যা’ শব্দের সঙ্গে পুষ্টির যোগাযোগ রয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তমণ্ডলী বিশ্বাস করেন নববিধা ভক্তির সঠিক পুষ্টিসাধনের জন্য পৌষের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে ভগবানের অভিষেক করলে তিনি তৃপ্ত হন। আগে শীতকালের রঙিন ফুলের প্রাচূর্য দেখা দিত পৌষের শেষ দিকে। এখন বিভিন্ন রকমের জৈব ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে শীতকালীন ফুলও গ্রীষ্মকালে তৈরি করা হয়। প্রাচীন সময়ে কৃষির এই সাফল্য ছিল না। শীতকালে ভারতে ফুলের সংকট দেখা দিত। বিশেষত পদ্ম, শালুক, টগর, শিউলি, নাগলিঙ্গম্, নাগকেশর, জবার মতো সহজলভ্য পূর্ব ভারতীয় ফুলগুলি শীতকালে প্রাকৃতিক উপায়ে এখনও কম ফোটে। প্রাচীন সময়ে এই কারণেই সম্ভবত মাঘ মাসে অনুষ্ঠিত জগন্নাথের পদ্মবেশে শোলা ও রঙিন কাগজের তৈরি পদ্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। বঙ্গেও রাসপূর্ণিমার সময় কৃষ্ণের আসন সাজানোর জন্য শোলার তৈরি কদমের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া উৎকল ও বঙ্গের অধিকাংশ শুভ অনুষ্ঠানে সুতো বা দড়ি দিয়ে বাঁধা পরিণত আমপাতার তৈরি বনমালার দুটি আমপাতার মাঝখানে শোলার তৈরি কদম ঝোলানোর রেওয়াজ রয়েছে। কদম মূলত বর্ষার ফুল। তাই এর প্রাকৃতিক অভাবের সময় শোলার তৈরি কদমের ব্যবহার শুরু হয়েছে।

ওড়িশায় লোকবিশ্বাস রয়েছে, জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন আদিবিগ্রহ পুষ্যাভিষেকের দিনই প্রথম স্থাপিত হয়েছিল। বলাবাহুল্য এর প্রামাণিক নথিপ্রমাণের অভাব রয়েছে। এর বিশেষ স্মরণোৎসবকে স্মরণীয় করে রাখতে শ্রীমন্দিরে জগন্নাথ-বলভদ্র-সুভদ্রার পুষ্যাভিষেক আয়োজন করা হয়। সকালে দেবতাদের অভিষেকের পর জগন্নাথাদি দেবতাদের রাজকীয় আভিজাত্যময় পোষাক পরানো হয়। এই সময় স্বর্ণ ভাণ্ডার থেকে নিয়ে আসা বিভিন্ন ভারী ভারী সোনার গহনা দিয়ে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামের শৃঙ্গার হয়। কুণ্ডল, কবচ, তাগা, নোলক, কোমরবন্ধ, মুকুট প্রভৃতিতে সেজে ওঠেন তাঁরা। পুষ্যাভিষেকের বস্ত্রের নির্দিষ্ট রঙ নেই, বারভিত্তিক রঙের যে প্রকরণ রয়েছে সেই অনুযায়ী তিনি বস্ত্রের রঙ বেছে নেষ। এই সময় বিভিন্ন সুগন্ধি দ্রব্য জগন্নাথকে নিবেদন করা হয়। বিভিন্ন রঙিন ফুলের মালায় বিগ্রহ সাজানো হয়। ষোড়শ ব্যঞ্জনে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার ভোগ হয়, তারপর আরতি করা হয়। অতিযত্নে বিগ্রহের মাথায় ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের তৈরি রাজছত্র ধরা হয়। এই সময় বিগ্রহের নিত্য পদসেবার রীতিও রয়েছে।

অনবসরকালীন বেশ (Anabasarakalina besha)

জগন্নাথের জন্মতিথি অর্থাৎ, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় স্নানযাত্রার পর বলভদ্র ও জগন্নাথের গজানন বেশ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন অনবসর সেবা গ্রহণের জন্য শ্রীমন্দিরে প্রবেশ করেন। এরপর পনেরো দিনের জন্য জগন্নাথের জ্বরলীলা শুরু হয়। জগন্নাথের সেবায় নিযুক্ত হন রাজবৈদ্য। লোকচক্ষুর অন্তরালে এই পনেরো দিন ধরে জগন্নাথের পরিচর্যা চলে। এই সময় জগন্নাথ অবসরহীন সেবা গ্রহণ করেন, তাই এই কালপর্বকে জগন্নাথের অনবসরকাল বলা হয়ে আসছে। অনবসর শব্দটি ভাঙলে দাঁড়ায় অন্-অবসর। অর্থাৎ অবসরহীন। এই সময় জগন্নাথ শুধুমাত্র ‘নিজগণ’-এর কাছেই প্রকাশিত হন।

শ্রীমন্দিরের আনন্দবাজারের নিকটস্থ স্নানমঞ্চে একসঙ্গে একশো আটটি কলসের জলে স্নান করে সুদর্শন, বলভদ্র, সুভদ্রা ও জগন্নাথের দারুবিগ্রহ সিক্ত হয়ে যায়। এই সময় মহাদারু ভিজে যাওয়ায় পুনরায় দারু শুষ্ক করার প্রয়োজন হয়। জল দারু বা কাঠের পক্ষে ক্ষতিসাধক। বিগ্রহের ক্ষয় ক্ষতি যাতে না হয় তাই এমন গুপ্ত পরিচর্যা চলে। মহাস্নানের ফলে জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলভদ্রের অঙ্গের রঙও সামান্য ক্ষয় হয়। শুধু পুরীর জগন্নাথের ক্ষেত্রেই নয়, দেশের অধিকাংশ প্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরেই দেখা যায় প্রাকৃতিক রঙে রঞ্জিত বিগ্রহের রঙ বিগ্রহের স্নানের ফলে বেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পূর্ববৎ বিগ্রহের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চলতে থাকে প্রায় পনেরো দিন ধরে। এই সময় দেবতার শ্রীবিগ্ৰহ রত্নসিংহাসনে থাকেন না। কিন্তু বিগ্রহ না থাকলে রত্নসিংহাসন জগন্নাথশূন্য থাকে না। জগন্নাথের অনবসরকালে শ্রীমন্দিরের রত্নসিংহাসনে দারুব্রহ্ম জগন্নাথের পরিবর্তে বিরাজিত হন পট্টব্রহ্ম বা পটব্রহ্ম জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা। দেবতার অনবসর বেশ দেববিগ্রহে নয় ব্রহ্মপটেই অনুষ্ঠিত হয়। অনেকে অনবসর বেশকে জগন্নাথের বেশ রূপে স্বীকৃতি দিতে চান না। কারণ এই সময় জগন্নাথ বিগ্রহ অনবসর পরিচর্যার জন্য গুপ্তভাবে রক্ষিত হয় এবং শুধুমাত্র দেববিগ্রহের অনুপস্থিতিতে পটের ব্যবহার করে দেবতার অনুসঙ্গ রক্ষা করা হয়। এমনকি অনবসর কালে সিংহদ্বারের পতিতপাবন বিগ্রহও দেখা যায় না। অনবসরকাল পর্বে পতিতপাবন বিগ্রহের জানালা বন্ধ থাকে এবং সেই জানালার ওপরে একটি পূর্ণবিগ্রহ জগন্নাথের পটব্রহ্ম স্থাপন করা হয়। চৈতন্যজীবনী গ্রন্থগুলি থেকে জানা যায় জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় জগন্নাথের স্নানযাত্রার পরের দিনগুলিতে পুরীনিবাসী সন্ন্যাসীপ্রবর মহাপ্রভু চৈতন্যদেব জগন্নাথের বিরহে অস্থির হয়ে অদূরবর্তী ব্রহ্মগিরি নিবাসী আলালনাথের দর্শনে যেতেন। এখনও জগন্নাথদেবের অনবসরকালে জগন্নাথের ভক্তরা আলালনাথ দর্শনে যান ও আলালনাথের বিখ্যাত ক্ষীর (ক্ষীরী) প্রসাদ লাভ করেন।

জগন্নাথের অনবসর পটগুলি প্রতি বছর জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত সেবকরা তৈরি করেন। এই ব্রহ্মপট তৈরি করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কাপড়, কাঠ, ফুল, রঞ্জক, আঠা প্রভৃতি উপকরণ ব্যবহৃত হয় ব্রহ্মপট তৈরি করার ক্ষেত্রে। সবার প্রথমে পটটি মসৃণ করে তৈরি করা হয়। রত্নসিংহাসনে যে পটগুলি বসানো হয় সেগুলি উচ্চতায় আনুমানিক চার থেকে পাঁচ ফুট ও প্রস্থে প্রায় কমবেশি চার ফুট মতো। পতিতপাবন বিগ্রহের জানালার বাইরে স্থাপিত ব্রহ্মপট প্রায় দেড় ফুট লম্বা ও এক ফুট চওড়া। মাদুর বা চাঁটাই জাতীয় পর্দার ওপর ব্রহ্মপটগুলি লাগানো থাকে। ব্রহ্মপটে মূলত কৃষ্ণ, শ্বেত, পীত, রক্ত ও শ্যামল রঙের ব্যবহার করা হয়। কথিত এই পাঁচ বর্ণ পঞ্চভূত অথবা প্রকৃতির পাঁচ তত্ত্ব। বাকি অন্যান্য রঙ এই রঙগুলি থেকেই তৈরি করা হয়। মসৃণ পট তৈরির পর প্রায় সাদা রঙের ক্যানভাস তৈরি করে নেওয়া হয়। তার ওপরে পেনসিল বা চারকোল দিয়ে এঁকে নেওয়া হয় দেবতার পূর্ণবিগ্রহের স্কেচ। সম্পূর্ণ স্কেচ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর রঙের প্রলেপ দেওয়া শুরু হয়। পটগুলি নিখুঁত করে তোলার জন্য কালো রঙের বিভাজনরেখা আঁকা হয়। ফলে ব্রহ্মপটে ব্যবহৃত প্রতিটি রঙ আরও নিখুঁত ভাবে চোখে পড়ে। সাদা ও হলুদ রঙ পটের দিয়ে বিশেষ বিশেষ জায়গায় অলংকরণ করা হয়। জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলদাউ-এর পট প্রায় সমান উচ্চতার হলেও পটের ভেতরে তিনজন দেবতার চিত্র এমনভাবে আঁকা হয়, যা দেখে মনে হয় জগন্নাথের অবয়ব বড়, তার থেকে সামান্য ছোট বলভদ্র ও বলভদ্রের থেকে আকারে আরও একটু ছোট সুভদ্রা দেবী। তবে চক্ররাজ সুদর্শন বিগ্রহের বিকল্পে কোনো পটের আয়োজন দেখা যায় না। পটগুলি দীর্ঘ হয় বলে পটচিত্রগুলি আঁকার জন্য অনেক সময় শিল্পী পটের ওপরে বসেও পট আঁকেন। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার ঠিক পনেরো দিন আগে ফলহারিণী কালীপূজার অমাবস্যার তিথিতে পটব্রহ্মের সমস্ত উপকরণ শিল্পীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অতি দ্রুত মাত্র পনেরো দিনের মধ্যে রত্নসিংহাসনের তিনটি পট তৈরি করে নেওয়া হয়। পটশিল্পী সেবকদের তত্ত্বাবধানে পনেরো দিনের মধ্যে পটগুলি স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। জগন্নাথের অনবসর শুরু হলে স্নানযাত্রার পরবর্তী প্রতিপদ তিথিতেই পটব্রহ্মের বিজয় করানো হয়।

জগন্নাথের ব্রহ্মপটে দেখা যায় জগন্নাথ পদ্মাসনে বসে রয়েছেন। তাঁর চার হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা আর পদ্ম। জগন্নাথের গায়ের রঙ ঘন নীল বা কৃষ্ণবর্ণ। জগন্নাথের পরনে পীতাম্বর, মাথায় মুকুট, মুকুটে চন্দ্র-সূর্যও থাকে, বুকে কৌস্তুভ মণি, কানে মকর আকৃতির কুণ্ডল, গলায় পদ্মসহ বনমালা, কাঁধে উপবীত, কপালে চন্দন তিলক, নাকে একটি তিলক ফোঁটা, কোমরে কোমরবন্ধনী ও সর্বাঙ্গে অজস্র অলংকার। জগন্নাথের বুকে ভৃগুপদের চিহ্ন দেখা যায়। জগন্নাথের মুখে গোঁফ ও দাড়ি দেখা যায়। অনবসর পট ছাড়া জগন্নাথের দাড়ি দেখা যায় শুধুমাত্র নাগার্জুন বেশ শৃঙ্গারের। জগন্নাথের পটরূপ যেন তাঁর রাজবেশেরই স্মরণ করিয়ে দেয়। জগন্নাথের দারুব্রহ্ম রূপের মতোই তাঁর পটব্রহ্ম রূপটি বিষ্ণুত্বে পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। রত্নসিংহাসনের জগন্নাথের পটের মতো একইভাবে তৈরি করা হয় পতিতপাবন বিগ্রহের জানালার বাইরের পটব্রহ্ম। জগন্নাথের পটব্রহ্ম নির্মাণ করেন শ্রীমন্দিরের আঠারো ঘর সেবক।

দেবী সুভদ্রার ব্রহ্মপটে দেখা যায় সুভদ্রা দেবী রত্নসিংহাসনে পদ্মাসনে বিরাজিত। পটে দেখা যায় সুভদ্রা দেবীর চারহাতের মধ্যে ওপরের দুই হাতে পদ্মফুল এবং নীচের দুই হাতে অভয় ও বরাভয় মুদ্রা প্রকাশিত। ব্রহ্মপটের সুভদ্রা দেবীর গাত্রবর্ণ অতসী ফুলের মতো উজ্জ্বল পীত বা হলুদ। তিনি পদ্মাসনে রক্তাম্বর ধারণ করেন। দেবীর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, কপালে কুমকুমের টিপ, নাসায় দুটি নাকফল বা নোলক, কানে কুণ্ডল, হাতে কঙ্কণ-বালা-তাগাদি সোনার অলংকার, গলায় পদ্মসহ দীর্ঘ পুষ্পমালা ও রত্নমালা, কোমরে কোমরবন্ধনী। দেবীর সর্বাঙ্গে বহু রত্নময় অলংকার শোভা পায়। দেবী সুভদ্রার এই রূপকে ভুবনেশ্বরী মহামায়া রূপ বলা হয়। তন্ত্রোক্ত দেবী ভুবনেশ্বরী মহাবিদ্যার রূপের সঙ্গে অনেকখানি মিল রয়েছে সুভদ্রার পটব্রহ্মের। তবে ‌সুভদ্রা দেবীর হাতে ভুবনেশ্বরী দেবীর সঙ্গে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করার মতো কোনো অস্ত্র ধরা নেই। একটি মত প্রচলিত রয়েছে, পূর্বে জগন্নাথের অনবসরকালে সুভদ্রা দেবীর পটব্রহ্মেও দেবীর হাতে অস্ত্র দেখা যেত। শ্রীমন্দিরে বৈষ্ণব প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভুবনেশ্বরী স্বরূপা সুভদ্রা দেবীর ওপরে লক্ষ্মীর রূপ ছায়াপাত করেছে। সুভদ্রা দেবীর পটব্রহ্ম আঁকেন শ্রীমন্দিরের চোদ্দো ঘর সেবক।

বলভদ্রের ব্রহ্মপটে দেখা যায় বলরাম পদ্মাসনে বসে রয়েছেন। তাঁর চার হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, হল আর মুষল। বলভদ্রের গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ। জগন্নাথের বড়দাদা বলভদ্রের পরনে নীলাম্বর। জগন্নাথের মতো তাঁর মাথাতেও মুকুট দেখা যায়। বলরামের মুকুটের ঠিক ওপরে থাকে সপ্তফণাবিশিষ্ট মহানাগ। এই নাগের বর্ণও শ্বেত। বলভদ্রের গলায় স্বর্ণ চাঁপা ও পদ্মসহ বনমালা, কাঁধে উপবীত, কপালে চন্দন তিলক, বাহুতে বালা, কোমরে কোমরবন্ধনী ও সর্বাঙ্গে রাজাসুলভ অজস্র অলংকার শোভা পায়। বলভদ্রের পটব্রহ্মেও মুখে গোঁফ ও দাড়ি দেখা যায়। পঞ্চুকার অতিরিক্ত তিথিতে পালিত নাগার্জুন বেশ শৃঙ্গার ছাড়া বলভদ্রের আর কোনো বেশে দাড়ি দেখা যায় না। বলরামদেবের পটব্রহ্মরূপ তাঁর রাজবেশের স্মারক। ব্রহ্মপটে বলভদ্র স্বয়ং অনন্ত নাগ বা অনন্তদেব। অনন্তনাগ বিষ্ণুর অন্যতম নিত্যসঙ্গী ও প্রিয় সেবক। বলভদ্রের ব্রহ্মপটকে ঘিরে একটি প্রচলিত মত রয়েছে যে, পূর্বে বলরামের হাতে শিবস্মারক থাকত। বলরাম স্বয়ং শিব, শ্রীমন্দিরে হরিহর বেশ শৃঙ্গারের সময়ও বলভদ্রের অর্ধভাগ শিবরূপে সজ্জিত হয়। শ্রীমন্দিরে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রভাব বৃদ্ধি পর থেকে শিব স্বরূপ বলভদ্রকে অনন্তনাগের অনুসঙ্গে পরিপূর্ণ করে নেওয়া হয়েছে। বলভদ্রের পটব্রহ্ম আঁকেন শ্রীমন্দিরের ছয় ঘর সেবক।

জগন্নাথের অনবসরকালে পটব্রহ্মের সঙ্গে একত্রবাস করেন মদনমোহন, দোলগোবিন্দ, শ্রীদেবী, ভূদেবী, রামচন্দ্র, কৃষ্ণচন্দ্র। অনবসর সমাপ্ত হলে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রের পটব্রহ্ম সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু পুরীর জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরেই নয়, এই রীতি প্রচলিত রয়েছে উৎকলের প্রায় সমস্ত প্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরে। জগন্নাথের অনবসরকালে ওড়িশার জগন্নাথবিরহী জনতার মুখে মুখে ফেরে একটি বহুল প্রচলিত ওড়িআ গীত। ওড়িআ ভাষারীতিতে গানটি নিম্নরূপ :

চতুর্ভুজ জগন্নাথ
কণ্ঠশোভিত কৌস্তুভঃ
পদ্মনাভ বেদগর্বহস্য
চন্দ্র সূর্যা বিলোচনঃ
জগন্নাথ লোকনাথ
নিলাদ্রিহ সো পারী হরি
দীনবন্ধু দয়াসিন্ধু
কৃপালুং চ রক্ষকঃ
কম্বু পানি চক্র পানি
পদ্মনাভো নরোত্তমঃ
জগ্দম্পারথো ব্যাপী
সর্বব্যাপী সুরেশ্বরাহা
লোকা রাজো দেবরাজঃ
চক্র ভূপহ স্কভূপতিহি
নিলাদ্রিহ বদ্রীনাথশঃ
অনন্তা পুরুষোত্তমঃ
তাকারসৌধাযোহ কল্পতরু
বিমলা প্রীতি বরদন্‌হা
বলভদ্রোহ বাসুদেব
মাধব মধুসূদনা
দৈত্যারিঃ কুণ্ডরী
কাক্ষোঃ বনমালী
বড়াপ্রিয়াহ ব্রহ্মাবিষ্ণু তুষমী
বংগশ্যো মুরারিহ কৃষ্ণ কেশবঃ
শ্রী রাম সচ্চিদানন্দোহ
গোবিন্দ পরমেশ্বরঃ
বিষ্ণুর বিষ্ণুর মহাবিষ্ণুপুর
প্রবর বিষ্ণু মহেশরবাহা
লোকাকর্তা জগন্নাথো
মহীহ করতহ মহজতহহ
মহর্ষি কপিলাচার ব্যোহ
লোকাচারিহ সুরো হরিহ
বাতমা চা জীবা পালসাচা
সুরহ সংগসারহ পালকহ
একো মীকো মম প্রিয়ো
ব্রহ্ম বাদি মহেশ্বরবরহা
দুই ভুজশ্চ চতুর্বাহু
শত বাহু সহস্রক
পদ্মপিতর বিশালক্ষয
পদ্মগর্ভা পরোহরি
পদ্ম হস্তেহু দেব পালো
দৈত্যারি দৈত্যনাশনঃ
চতুর্মূর্তি চতুর্বাহু
শহতুর ন ন সেবিতোহ
পদ্মহস্তো চক্রপাণি
শঙ্খহস্তো গদাধরহ
মহাবৈকুণ্ঠবাসী চো
লক্ষ্মীপ্রীতি করহু সদা।।

হারিয়ে যাওয়া জগন্নাথের গিরিগোবর্ধন বেশ (Girigobardhana besha)

জগন্নাথের যেসব বেশ শৃঙ্গার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে তার মধ্যে অন্যতম গিরিগোবর্ধন বেশ বা গিরিধারী বেশ। মহাপ্রভু জগন্নাথ আগে গিরিগোবর্ধন বেশ বা গিরিধারী বেশে শোভিত হতেন যা মূলত পরিচালনা করতেন পুরীধামের বড় ওড়িআ মঠ (বড় ওড়িয়া মঠ)। এই বিশেষ বেশ তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে অসুবিধা তৈরি হয়েছিল, তাই এটি আপাতত বন্ধ করা হয়েছে। জগন্নাথ মহাপ্রভু এই বিশেষ বেশে তাঁর বাম হাতে গিরিগোবর্ধন পাহাড় আর ডান হাতে সোনার বাঁশি ধরে রাখতেন। জগতের নাথ তথা জগতের পালনকর্তা জগন্নাথের হাতে ধরা বড় গিরিগোবর্ধন পাহাড়কে এভাবে একটানা ধরে থাকতে দেখে ব্রজের ছেলেদের মনে সখ্যপ্রেম জেগে উঠেছিল। গিরিগোবর্ধন বেশে গোপবালক ছাড়াও নন্দ, যশোদা, গরুবাছুরও দেখা যেত। গিরিগোবর্ধন বেশের সময় বলভদ্র একটি হাতে শিঙা ধরে এবং একটি হাতে সুন্দর ফুল ধরে থাকতেন। আর ভগবতী সুভদ্রা দেবী সোনা বেশে অলঙ্কৃত হতেন। ১৯৪৩ সালে জগন্নাথ মহাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করে কটকের জনৈক ভক্ত শীঘ্রই একটি পুত্র সন্তান লাভ করেছিলেন। তাদের পরিবার বড় ওড়িআ মঠের মহন্ত মহারাজের কাছে যান এবং জগন্নাথ মহাপ্রভুর প্রয়োজনীয় অলংকারিক সামগ্রী কেনার জন্য দান করেন। বড় ওড়িআ মঠের তৎকালীন মহন্ত মহারাজ গিরিগোবর্ধন বেশ তৈরির কিছু সমস্যার কারণে মানা করেন। এর বদলে তিনি জগন্নাথ মহাপ্রভুর বিশেষ কৃষ্ণ বলরাম বেশের সম্পর্কে সুপরামর্শ দিয়েছিলেন, এবং সেই সুপরামর্শ সবার সম্মতি পেয়েছিল। এখনও শ্রীমন্দিরে বিরল এই বেশ বন্ধই রাখা হয়েছে।

সমাপ্তিকথন [32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu]

জগন্নাথ। তিনি সুন্দর। তিনি শৃঙ্গার করুন, না করুন, তিনি সুন্দর। তাঁর সৌন্দর্য তাঁর স্বরূপে। পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ব্ল্যাক বিউটির ধারণা রয়েছে। আমাদের দেশেও রয়েছে। ওদের ব্ল্যাক বিউটির ধারণা দেহবাদী। আমাদের দেশের ব্ল্যাক বিউটির ধারণা আধ্যাত্মিকতা ও দেহোত্তরবাদী। আমাদের কৃষ্ণ কালো, জগন্নাথ কালো, কালীও কালো। কিন্তু এমন কাজলের চেয়েও যিনি কালো, তাঁর আলোর শেষ নেই। সমুদ্রের জলের মতো দূর থেকে রঙ আছে, কাছে গিয়ে সেই জল হাতে তুলে নিলে দেখা যাবে কোনো রঙই নেই। এই বিশ্লেষণ শ্রীরামকৃষ্ণের।

জগন্নাথ স্বরূপত সুন্দর। জগন্নাথ সুন্দরের সমার্থক। জগন্নাথের প্রসারিত হাসিমুখ, বিরাট বিরাট দুই চোখ, চোখের ধারে প্রেমময় রক্তিম আভা, দুই প্রসারিত বাহু কার না হৃদয় টানে। ওমন আলিঙ্গনমুখী দুই হাত দেখে কোন ভক্তহৃদয় তাঁকে আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। তাঁকে মধুরে আলিঙ্গনেই সুখ। তাঁকে বাৎসল্যে শৃঙ্গার করিয়ে আর খাইয়ে তৃপ্তি। তাঁকে সখ্যে বাঁধতে পারলে আনন্দ। তাঁকে দাস্যে সেবা, পূজায় প্রশান্তি। তাঁকে শান্তে পরম অনুভবেই যে হৃদয় বিরাট হয়ে যায়। জগন্নাথ বহুরূপময়, জগন্নাথ বহুভাবময়। তাঁর সঙ্গে যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ। তাঁকে ভক্ত যেভাবে দেখতে চান, যেভাবে সেবা করতে চান, যেভাবে ভজনা করতে চান, তিনি সেভাবেই নিজেকে প্রকাশিত করেন। জগন্নাথের এত বৈচিত্র্য, এত বহুমুখী প্রকাশ রয়েছে বলেই তিনি ওড়িশার রাষ্ট্রদেবতা হয়েও সর্বভারতের, তিনি আন্তর্জাতিক। জগন্নাথের শ্রীমন্দিরে যার প্রবেশাধিকার নেই, তার ঘরেও জগন্নাথ পৌঁছে যান নিজে। এত বিচিত্র, এত মুক্তমনা দেবতা আর কোথায়। এই জন্যই জগন্নাথ সংস্কৃতি উৎকলের ভৌগলিক সীমারেখা পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পেরেছে।

জগন্নাথ নিত্যনতুন। তিনিই চিরপুরাতন। কিন্তু তিনি একঘেয়ে নন। বৈচিত্র্যময় শৃঙ্গারে জগন্নাথ নব নব রূপে আসেন প্রাণে। এত বৈচিত্র্যময় শৃঙ্গারে জগন্নাথের সেজে ওঠা সাধারণ বিষয় নয়। জগন্নাথ এক জায়গায় থেমে থাকেন না। তিনি বহুভাবের সংশ্লেষ করেন বলেই তিনি সকলের হৃদয়ের এত কাছে। তিনি শুধু বৈষ্ণবের নন, তিনি শাক্তের আরাধ্য, তিনি শৈবের আরাধ্য, গাণপত্যের আরাধ্য, সৌরের আরাধ্য, এমন তিনি আরাধ্য বৈদান্তিকের। তিনি আরাধ্য বৌদ্ধের, জৈনের, শিখের। তিনি আর্যের, তিনি অনার্যের আরাধ্য। ইদানীং তিনি অভারতীয় সম্প্রদায়ের কাছেও বরণীয় হয়ে উঠেছেন। প্রত্যেক মতের পথিকই জগন্নাথকে নিজের বলে দাবি করেছেন। জগন্নাথ এক মুক্ত প্রবাহ, সবাই যে যার ঘাটে বসে ভাবছেন, এ জল আমাদের, এ নদী আমাদের। আর জগন্নাথও নিজেকে বহুরূপে প্রকাশিত করে সবাইকে আপন করে নিয়ে চলেছেন। আরও অনেক শতাব্দী কেটে যাবে। জগন্নাথ আরও নতুন নতুন শৃঙ্গার করে আমাদের সামনে আসবেন, আবার কত বেশ শৃঙ্গার থেমেও যাবে। কিন্তু যতদিন ওড়িশা প্রদেশ থাকবে, যতদিন ওড়িশাবাসীর হৃদয়ে তাদের প্রাণভ্রমর জগন্নাথের প্রতি প্রেম থাকবে, যতদিন সমৃদ্ধশালী ধ্রুপদী ওড়িআ ভাষা থাকবে, ততদিন মহিমাময় জগন্নাথও থাকবেন, তাঁর বৈচিত্র্যময় শৃঙ্গারও থাকবে। সবশেষে জগন্নাথের প্রতি আস্থা রেখে ‘পঞ্চাক্ষরীজগন্নাথস্তোত্রম্’-এর মধ্য দিয়ে চিরপ্রাচীন চিরনবীন জগন্নাথকে অনুভব করি :

পরমব্রহ্মায় পরমাত্মায় বেদান্তবেদ্যায় জ্ঞানাতীতায়।
আদিপুরুষায় বিশ্বরূপায় তস্মৈ জ-কারায় জগন্নাথায়।।
পুরুষোত্তমায় ভক্তিপ্রদায় গরুড়ধ্বজায় লক্ষ্মীনাথায়।
দশাবতারায় জগদ্ধিতায় তস্মৈ গ-কারায় জগন্নাথায়।।
রাজীবনেত্রায় শঙ্খধরায় লোকপালকায় চক্রধরায়।
দুঃখদহনায় মোক্ষপ্রদায় তস্মৈ ন্না-কারায় জগন্নাথায়।।
চন্দনরাগায় মেঘবর্ণায় ভক্তবল্লভায় পীতাম্বরায়
রিপুদলনায় রথারূঢ়ায় তস্মৈ থা-কারায় জগন্নাথায়।।
ত্রিগুণাতীতায় গুণপ্রদায় প্রপঞ্চহরায় কালান্তকায়।
নিত্যবন্দনায় স্তুতিত্তীর্ণায় তস্মৈ য়-কারায় জগন্নাথায়।।

অভিজিৎ পাল | Avijit Pal

Traditional Seth Family Durga Puja | চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী হরিহর শেঠ পরিবারের দুর্গাপূজা

Tebhaga Movement | বাংলায় “তেভাগা আন্দোলন” এবং সলিল চৌধুরীর গণসঙ্গী

History of Bengali Poetry | কবিতা কি ও কেন এবং তার ইতিহাস

Teachers day in honor of teachers | শিক্ষকদের সম্মানে শিক্ষক দিবস

Shabdodweep Founder | Shabdodweep Web Magazine | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu pdf | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu video | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu pdf book | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – article | Best seller – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – pdf download | Top video – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Top article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | New article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – Web story | Story – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | New pdf – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | News print – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | viral video – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | video trend – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | video download – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Full video – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Full pdf – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | History – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | pdf topic – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | full article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | web article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Shabdodweep – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Shabdodweep article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Shabdodweep pdf – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Shabdodweep book – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Shabdodweep article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | Bengali article – 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu article in pdf | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – article trend | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu video trend | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu pdf journal | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – web article | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – Shabdodweep article | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – history | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – pdf book | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – article pdf | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu 2023 video | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 article | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 pdf | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 journal | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 film | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu 2023 | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 magazine | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – 2023 published | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – video trend 2023 | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – long key | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – longtail keyword | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – short article | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu – long article | 32 Beshas of Jagannath Mahaprabhu

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *