Read Online Bangla Novel | খুঁজে ফিরি বিশল্যকরণী (২১ – ২০)

Sharing Is Caring:

খুঁজে ফিরি বিশল্যকরনী (পর্ব ২১) – জয়নাল আবেদিন

কাশি বাবুর কথা মতোই খোঁজখবর চলছে কটা দিন। বাবলু ভাই, সজল, আমিন তিনজন এক উকিল সাহেবের অফিসে আইনি পরামর্শ করেছে। দীর্ঘদিন স্বামী- স্ত্রীর যোগাযোগ না থাকার কারণে, তেমন কোন সমস্যা হওয়ার কোন কারণ নেই। তবে, মুসলিম এ্যাক্ট অনুযায়ী মহিলাকে ধর্মান্তরিত হতে হবে। সে ক্ষেত্রে মহিলা বেশ কিছুটা সুবিধাজনক ব্যবস্থার মধ্যে জীবন ধারণ করার রাস্তা বহাল থাকবে।

কাজী সাহেবের কাছে যেতেই হল শরীয়তে বিধান মেনে বিয়েটা দেওয়ার জন্য। আবার বিয়ের কাবিন করারও প্রয়োজন বর্তমান সময়কে মান্যতা দিয়ে। কাজী সাহেব সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবেন। দিনক্ষণ ঠিক করার ক্ষেত্রে কাশীনাথ বাবু কে ফোন করলে বাবলু ভাই।
— আরে তোরা একটা দিন ঠিক করে আমাকে জানাস। আমি ঠিক সময় করে চলে যাবো। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে কাশীনাথ বাবু বললে।
— ঠিক আছে দাদা। চেষ্টা করছি সামনের শুক্রবার, না হলে যদি অন্য দিন হয় রাতে জানাবো। বাবলুর পরামর্শ।

কাজী সাহেব আগামী শুক্রবার সন্ধ্যায় বিয়ের আসর লিখে নিলেন। রাতেই জানিয়ে দেয়া হলো আরশাদকে। মহিলাকেও বলা হলো, ধর্মান্তরিত হতে হবে। মহিলা মাথা নিচু করে প্রতিবাদ না করে বসে। আরশাদ কিছুটা বিস্মিত। কিছুটা অসহায়। রিজিয়ার মুখের পানে হতবাক তাকিয়ে। রিজিয়াকে কর্তব্যবিমূঢ়। প্রতিবাদ দূরে থাক। কথা বলার কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
— আরশাদ বললে, – রিজিয়া আমি কি করব- কিছু একটা বলো ?

রিজিয়া বললে, যদি বিপদ থেকে বেঁচে থাকতে পারি, আমার কোন কথা নেই। আমার জীবনে যেন আর কোন মুসিবৎ না আসে।
আরশাদ বললে, বাবলু ভাই, তোমরা বলছো বিয়ে করতে। তাতে যদি নতুন কোন বিপদ এসে জোটে? পাশে তোমরা থাকবে তো? ধর্ম ত্যাগ করে বিয়ে হবে, জাত-পাতের সমস্যা হবে না
তো?
বাবলু বললে, সে ব্যাপারে তোমার ভয়ের কোন কারণ নেই। আইন মেনেই সবকিছু হবে। কোন ঝামেলার সমস্যা হবার নয়।
আরশাদ বললে, একটা লেখাপড়ার মধ্যে হলে ভালো হয়। তাহলে সমস্যা হলে কাগজ কথা বলবে।
— সেটাই হবে। আমরা কি ছেলে খেলা করছি তাহলে ? বাবলুভাই আশ্বস্ত করলে।
সজল বললে, আরশাদ ভাই শুক্রবার সন্ধ্যেয়
সকলে আসবে। তোমরা ঘরে লোকজন বসার জায়গা করে রাখবে। নিজেরাও তৈরি থাকবে। আমরা আছি চিন্তা করার কিছু নেই। চলো বাবলুদা, আর দেরি করো না।
ওরা সকলে বেরিয়ে গেল।

বাতাসে ভেসেছে তাজা খবরের গন্ধ। সন্ধ্যা মুখর বস্তির দোকানপাট- গুমটির চায়ের আসর ক্রমশ স্বরগরম। রাজ্য থেকে রাষ্ট্র। মন্ত্রী থেকে সেপাই। আলোচনা থেকে সমালোচনা। কখনো সখনো তপ্ত থেকে উত্তপ্ত ।চিৎকার- চেঁচামেচিতে মাঝেমধ্যেই দুই পক্ষ তৈরি হয়। ভাষার কোন চাতুর্য নেই। না বুঝলে বোঝায়… খিস্তি খেউড়ে বস্তির চরিত্র ফুটে ওঠে। নিয়নবাতির তলায় বিচিত্র মানুষ গুলো এভাবেই সময় কাটায়।
মাতাল রিয়াজ এসেই খবর ছড়ালে। – কালু চাচা নতুন খবর শুনেছো কিছু ?
— কি খবর রে ? কিছুটা বিস্মিত কালু চাচা।
— শুক্কুরবার আরশাদের বিয়ে হবে। রিয়াজ বললে।
ছোটনদা বললে, – তুই এমন খবর কোথা থেকে পেলি ? সাধে কি তোকে মাতাল রিয়াজ বলে লোকে।
— আরে, আমি জাতে মাতাল হলে কি হবে – তালে ঠিক থাকি, বলেছিলাম না! বাবা, দইয়ের হাঁড়ি ঘেটেছো তুমি। তোমাকেই খেতে হবে। রিয়াজের ক্ষোভ।

একটু চাঞ্চল্য তৈরি হলো, কথার পিঠে কথায়। নতুন হাতে গরম খবরে গুমটি থেকে রাস্তা হয়ে- অনেকটাই পৌঁছে গেছে মুখে মুখে। এমন খবর তো চাপা থাকে না। চেপে রাখে না কেউ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি। বস্তিবাসীর কানে- কানে বিয়ের সানাই। কেউ মজা পায়, কেউ আফসোস করে। কেউ বলেছে, পাপ লুকায় না সাগর শুকায় না। কেউ বলেছে, উপকারের সাজা পেলো। আরশাদের চারিত্রিক দোষের কথায়, দুটো পক্ষ হয়ে গিয়েছিল গুমটির সামনে।
কেউ বললে, আরশাদের মতো সৎ ভালো মানুষ এই বস্তিতে কম জনই আছে। কোনদিনও নেশা খেতে দেখেছিস কেউ ?
কেউ বলেছে, মেয়ের নেশা তো ছিলো?

— বাজে কথা বলবি না। তোদের মতো মাতাল চরিত্রহীন ছেলে আরশাদ নয়। চেঁচিয়ে উঠলো কাশেমে মীর।
মাতাল রিয়াজ বললে, তাহলে এতগুলো মাস কি ধুয়ে জল খেয়েছে মিয়া ?
হাত উঁচিয়ে কাশেম মীর, রিয়াজের গালে চড় কষিয়ে দিলে একটা।

— যা মুখে আসবে তাই বলবি? তোর মতো মাতাল সে?
শুরু হলো দুই পক্ষের চিৎকার- চেঁচামেচি। ঠেলাঠেলি- ধাক্কাধাক্কি । জড়ো হতে থাকলো আরো লোকজন। সকলেই বলে চলেছে- যে যার কথা ।অথচ কোন শব্দই শ্রবণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য নয়। বোঝারও মতো কথার কচকচানিতে, হট্টগোল ছাড়া কিছু নেই। সময় ক্রমশ রাত্রির পথে হেটে চলে। বস্তির চরিত্রে মধ্যরাত্রি বলে কিছু হয় না। তবে এখন মধ্যরাতির দিকে সময় এগিয়ে চলেছে। আস্তে আস্তে ভিড় এমনিতেই কমতে থাকে। আবেগ আর উৎকণ্ঠায় বস্তির চারিদিকে বেশ গরম আবহাওয়া। সকাল থেকে সন্ধ্যা পেরিয়ে মধ্যরাত্রি । আলোচনার বিষয়বস্তু একই। অপেক্ষায় শুক্রবারের সন্ধ্যার।

আরশাদ রিকশা নিয়ে বের হয় সকালে। থমথমে মুখ । দুশ্চিন্তায় ভবিষ্যৎ দিনের কথা ভেবে। এমন একটা সরল- সাদাসিধে মানুষের জীবনে, অক্টোপাসের মতো সমস্যাগুলো কেমন আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। সকাল-সকাল স্ট্যান্ডে পৌঁছে লাইনে গাড়ি লাগায়। পরপর দুটো দিন ছুটি হয়েছে। ভাগ্যের উপর মনে- মনে দোষারোপ করে আরশাদ। সেদিনের স্টেশন মাস্টারের কথায় পড়ে পরোপকারিতায় কেন যে এমন সাজা পেতে হলো তাকে । কোন অন্যায়, কোন পাপ- তার মনে তো ছিলো না।

— কিগো, আরশাদ ভাই কি খবর ? জিজ্ঞেস করলে এক রিকশাওয়ালা বন্ধু।
— খবর ভালো ভাই। ছোট্ট উত্তর আরশাদের।
— কিরকম একটা খবর পাচ্ছিলাম কাল রাতে? একটু খোঁচা দিলে লোকটা।
— শুনে থাকলে ঠিকই শুনেছ। কি আর বলবো। উদাশ আরশাদ।
— তুমি শুধু শুধু এতদিন পুশছিলে কেন ? ভাগিয়ে দিলেই পারতে ।
— তাহলে তো সাজা পেতাম না। কপালে এটা লেখা ছিলো বলেই হয়তো তাড়াতে পারিনি। উপকারের একটা চরম মূল্য পেলাম দাদা। কিছুটা আক্ষেপ আরশাদের।
— ঠিক তাই ! ভালো কাজের সাজা এটা। সমব্যথী লোকটা।

দিনভরও রিকশা টেনে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরে আরশাদ। দৈনন্দিন রুটিন মতো জীবনের রোজনামচায় তেমন কোন হেরফের নেই। চান করে। চা- টিফিন খায়। দিদিমণি ছেলে-মেয়েকে পড়ায়, কানে আওয়াজ আসে। রিজিয়া হতাশ নয়, তবে কেমন মনমরা। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে অপরিচিত বেশ কিছু শব্দ তার কানে আসে। তেমন আমল না দিলেও কথাগুলো সহজে হজম হবার নয়। তবুও কোন কথারই জবাব দেয় না রিজিয়া।
কথায় বলে, – ‘হাতি যখন পাকে পড়ে- চামচিকেতে লাথি মারে” এদের এখন অবস্থাও তাই। তবুও রিজিয়া জানে, তার স্বামী অসৎ নয়। চরিত্রহীন নয়। দিদিমনির উপকার করতে গিয়ে তারা আজ পরিস্থিতির শিকার। তাদের মতোই- ওই মানুষটাও অন্যায়ের বলি হতে যাচ্ছিলো। নিজের সুখের জীবন ছেড়ে। সংসার- সন্তানদের ছেড়ে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এসে । অতীতকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হলো। সামান্য খাওয়া- পরায় বেঁচে থাকতে চাওয়া মানুষটাকে কি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যায়!
এই মুহূর্তে স্বাতী নিজের জীবনকে তিরস্কার করে মনে মনে। ভাগ্য-তাকে টেনে- টেনে কোথায় নিয়ে এলো। এভাবে বাঁচার স্বপ্ন কেউ কি কোনদিন দেখে। মানুষ হিসেবে তার কি মূল্য রইলো পৃথিবীতে। সব কিছু থাকতেও সে আজ কতো অসহায়। শুধু জীবনটা বাঁচিয়ে রাখতে নিজের সমস্ত সত্তাকে বিসর্জন দিতে হবে। দিতে হচ্ছে আর কোন উপায়ান্তর নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকে নিজের খোলস টা পাল্টে দিতে হবে। বিসর্জন দিতে হবে। নতুন জন্ম হবে নতুন নাম- ধাম পরিচয়ে।
কেমন ভাবে কেটে গেল কটা দিন। শুক্রবার সকাল থেকেই ঘরে বন্দী আরশাদ। বাইরে প্রয়োজন ছাড়া বেরোচ্ছে না। বস্তির লোকজনের চোখমুখে কেমন যেন ঘৃণা রয়েছে। ঘাটে- মাঠে, দোকান-পাটে, ফিসফিসানি। এ যেন অলিখিত চরম অপরাধের নিদারুন এক শাস্তি।

সন্ধ্যার পর একে একে আসতে থাকে লোকজন। আমিন ভাই, সজল, বাবলু ভাই। মৌলবী সাহেব এসেছেন একজন সঙ্গি নিয়ে। কাশীনাথ বাবুসহ আরো দুজন লোক। ভিতরে চৌকিপাতা ঘরে বসলে সকলে। সারা বস্তি আজ চমকিত। এমনতর বিয়ে এবস্তির কেউ দেখেনি। ফিসফিসানি ক্রমশ শব্দে উচ্চারিত হচ্ছে। কেউ বা শ্লেষাত্মক কথাবার্তায় মশগুল। আবার কেউবা রসাত্মক কাহিনী গড়ার চেষ্টায় মজা পায়।
মৌলবীর ডাকে আরশাদ, স্বাতী, রিজিয়া সকলে ঘরে আসে, চ্যাটাই পাতা মেঝেতে বসে সকলে।
মৌলবী সাহেব বললে, সবের আগে মহিলাকে কলেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। নতুন নামকরণ করতে হবে। তারপর নিকাহ সম্পন্ন করা যাবে। আপনার কোন অসুবিধা নেই তো?
বাবলু ভাই বললে, মৌলবী সাহেব সমস্ত কথা আগে হয়ে আছে। এখন কাজটা শুরু হোক।
স্বাতীকে মৌলভী সাহেব কলেমা পড়ালো। নতুন নাম দেওয়া হলো। আসমা বেগম। বেশ চাঞ্চল্যকর মুহূর্ত একটা। বস্তির এই ছোট্ট ঘরে।

আরশাদ- আসমা দুজনকে পাশাপাশি বসিয়ে নিয়মমাফিক জিজ্ঞাসাবাদে উভয়ের সম্মতি নেওয়া হলো। রেজিস্ট্রি খাতায় দুজন সই করলে। বাকি তিনজন সাক্ষী হিসেবে খাতায় দস্তখত দিলে। একপ্রকার আইন মোতাবেক বিয়ে সিদ্ধ হলো। এবার দোয়ার মজলিস করলে মৌলবী সাহেব।
বিয়ে বাড়ির চরিত্রগত উচ্ছ্বাস না থাকলেও আরশাদের ঝুপড়ির বাইরে বেশ একটা কোলাহল। ঘরের মধ্যে আগত অতিথিদের চা-পানে আপ্যায়িত করলে রিজিয়া। একে- একে সকলে চলে গেলো। শুধু আজকের রাত্রিটায় জেগে রইলো বস্তির নতুন একটা ইতিহাস।

খুঁজে ফিরি বিশল্যকরণী (পর্ব ২০) – জয়নাল আবেদিন

হাওড়া থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সকালে বাড়ি ফিরেছে শঙ্খ। ছেলে- মেয়ে স্বভাবতই খুশি। অনেকদিন পর বাবাকে পেয়েছে। সকলে বসে একসঙ্গে চা জল খাবার খাওয়া শেষ হয়েছে।

শঙ্খ বললে – বাবা- আমি একটু বেলেঘাটার বাড়িতে যাবো। মেজদার সঙ্গে দেখা করে তাড়াতাড়ি চলে আসবো।
সত্যেন বাবু বললে – হ্যাঁ, কদিন আগে তোমার মেজদা এখানে এসেছিলো। আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে। তুমি ফিরলে একদিন নিজেই আসবে বলেছিলো। দেখো, তোমার গিয়ে কথা বলার দরকার আছে।
শঙ্খ কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লে, মেজদার আসার কথা শুনে। স্বাতীর ব্যাপারে কি জানি, কি সব কথা হয়েছে। মাকড়সার জালে মাছি পড়ার মতো কেমন অসহায় অবস্থা তার। যতো বেশি সময় যাচ্ছে। নড়াচড়ায় ক্রমশ জালে জড়িয়ে পড়ছে না তো।
— ঠিক আছে সে আসবে একদিন। আমি আজ একবার ঘুরে আসি। শঙ্খ বেরিয়ে গেলো।

সকালের রোদ্দুর আজ একটু ঝাঁঝালো বেশ। সত্যেন বাবু বাজারের ব্যাগ হাতে বেরোলেন। শঙ্খ একটা মিষ্টির প্যাকেট হাতে, নিজেদের শৈশব কাটানো পৈত্রিক বাড়িতে ঢুকলো। মেজ বৌদি ওকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। বললে, – কি ব্যাপার গো ঠাকুরপো ! পথ ভুলে চলে এসেছ বুঝি ? আর কাউকে দেখছি না যে ?
শঙ্খ বললে – না গো, মেজদার সঙ্গে একটু দেখা করতে একাই চলে এসেছি। আজ সকালেই ফিরলাম। মেজদা কোথায় ?
— ঘরেই আছে। যাও না।

শটান ঘরে ঢুকলে শঙ্খ। মেজদা মেয়েকে বিছানায় বসে পড়াচ্ছিলো। ওকে দেখে বললে, আয় বস। কবে ফিরেছিস ?
— আজ সকালেই। কাল থাকবো, পরশু শুভ্র- অভ্র কে স্কুলে দিতে যাবো। এডমিশন, বই নেওয়া, টাকা পয়সা জমা । অনেকটা কাজ রয়েছে। পাঁচ- ছ’ দিনের ছুটি পেয়েছি। তাই ভাবলাম সকালেই একবার চলে যাই।
মেজদা বললে – সব তো একহাতেই করছিস। চলছেও ঠিকঠাক। কিন্তু বৌমার কি খবর ? সে ব্যাপারে মনে হচ্ছে, তোর তেমন কোনো হেলদোল নেই। বাড়ির বউ কয়েক মাস যাবত বাড়ির বাইরে। কোথায় আছে ।আদৌ আছে কিনা কোন খবর নেই। আর মনে হয় খবর নিচ্ছিস ও না। যদি মনে করিস আপদ গেছে, ভালই হয়েছে। শ্বশুর-শাশুড়িকে ঠিকঠাক জানিয়ে দে। ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে কি ভেবেছিস পরিষ্কার করে বল তাদের।

শঙ্খ একটু ভ্যাকাচেকা খেলো। এতগুলো নেতিবাচক প্রশ্নে, কেমন অস্থির হয়ে বললে, না- না, মেজদা । তা হবে কেন। আমি তো থানায় মিসিং ডায়েরি করেছি, যোগাযোগও রাখছি।
মেজদা একটু তির্যক স্বরে বললে, – ব্যাস, দায়িত্ব খালাস। আর কোন দায় নেই তোর ? কোন বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে কোন খোঁজ নিয়েছিস ?
শঙ্খ বললে – অল্পবিস্তর খোঁজখবর নিচ্ছি তো প্রায়শই। আমি তো বেশি ছুটি পাচ্ছি না। যে কদিনের জন্য আসি, ছেলেদের পেছনে সময় দিতেই কেটে যায়।
— এভাবে চলবে তাহলে, তুই ছেলে দুটোর জন্য সময় কাটিয়ে আবার চাকরি করতে চলে যা। তোর শ্বশুর শাশুড়ি নিজেদের ভিটে ফেলে, তোর মেয়েকে নিয়ে তোর বাড়ি পাহারা দিক। নিজের মেয়েকে গচ্ছিত রেখেছিস ওদের কাছে, অথচ ওদের মেয়েটা কোথায় গচ্ছিত আছে- ভগবান ছাড়া কেউ জানে না। দারুন চিন্তাভাবনা তোর।

মেজদা বেশ বিরক্ত। শঙ্খ একটু নরম। মাথায় কুলাচ্ছে না, কি বলবে- কিভাবে বলবে? একটা সত্যকে গোপন করতে গিয়ে, শত মিথ্যার জান বুনে চলেছে। থানা পুলিশে বেশি জড়াজড়ি তে নিজে ফেঁসে যেতেই পারে। তাই ও পথে নামমাত্র হাঁটা। মেজ বৌদি চা দিয়ে গেল। মেয়ে পড়া ছেড়ে বই পত্র গুছিয়ে মায়ের সঙ্গে ঘরের বাইরে চলে গেল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে, মনে মনে কিছু কথা তৈরি করে নিলে শঙ্খ।
শঙ্খ বললে – দেখো মেজদা, আমারও ভালো লাগছে না ব্যাপারটায়। কিন্তু আমি অসহায়। আমি ভেবেছিলাম রাগ হয়েছে- কোথাও থাকবে, দু চার দিন। ছেলে- মেয়ে রয়েছে। আবার রাগ কমলে চলে আসবে। আর পাঁচজনের যেমন হয়। এবার বল, আমি কি চাকরি ছেড়ে ওকে খুঁজে বেড়াবো।
মেজদা বললে, – ঘরের মানুষটাকে মানুষের মতো দেখেছিস কোনদিন। তাকে তো যন্ত্রের মতো ব্যবহার করেছিস। জন্তুর মতো শাসন- শোষণ করেছিস। মানুষের মতো তার স্বাধীনতা থাকলে সংসার ছেড়ে কেউ একা চলে যায়। তাও বাপ বাড়িতে নয়। কথায় বলে, যেদিক দুচোখ যায় চলে যাবো। তাই হয়তো হয়েছে। তোর ক্রমান্বয়ে আচরণ তাকে তিলে-তিলে শেষ করে দিয়েছে। দূরে কোথাও গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিলেও বিস্মিত হবো না। তবে এর ফল কিন্তু তোকে ভুগতে হবে।

কেমন যেন নড়ে উঠলো শঙ্খ। মেজদা কি কোন কিছু জানতে পেরেছে । সত্যিই যদি আত্মহত্যা করে ফেলে স্বাতী। তাহলে তাকে নিয়ে পুলিশি ঝামেলা হতে পারে।
শঙ্খ বললে – ঠিক আছে মেজদা। কাল একবার থানায় যোগাযোগ করবো। আজ আমি উঠছি।
মেজদা বললে – যেটাই করো, শ্বশুর- শাশুড়িকে এভাবে নিজের বাড়ি পাহারা দিতে আটকে রেখো না। নিজের সমস্যা নিজে মেটাও।

শঙ্খ বাড়ি ফিরল দুপুর নাগাদ। চান- খাওয়া সেরে বিছানায় পিঠ পাতলে একটু। সকালের ঝড় খানিকটা সামাল দিয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ আর একটা ঝড় উঠতে পারে। মানে আকাশ তো সাজানো আছে। সন্ধ্যার চা খাওয়ার শেষে সত্যেন বাবু কথাটা পাড়লে শঙ্খের কাছে।
— এদেরকে কবে স্কুলে দিয়ে আসবে ?
— পরশু নিয়ে যাবো। এ্যাডমিশন করে- হোস্টেলে পৌঁছে দেবো। নরম মিহি গলায় শঙ্খের উত্তর।
সত্যেন বাবু বললে – আমরা ১৬ তারিখে চলে যাবো। চাষের কি হচ্ছে জানিনা। এভাবে এখানে আর থাকলে হবে না।
শঙ্খ বললে – ঠিক আছে আপনারা যাবেন। অসুবিধে নেই। আমি পরশু ওদেরকে শিলিগুড়ি দিয়ে ওখান থেকেই চলে যাব। কলকাতায় আর ফিরবো না।
— তুমি তাহলে বেশ নিশ্চিন্তে আছো। চাকরি করবে, মাঝেমধ্যে ছেলে দুটোকে বাড়ি আনবে। আবার দিয়ে আসবে। বাড়ির মানুষটা বাঁচলো কি মরলো, তার কোন খবর নেওয়ার আর দরকার নেই। তুমি তো একটা মূর্খ মানুষের থেকে খারাপ অবস্থায় আছো। সত্যেন বাবু বেশ খেদিয়ে উঠে বললে – আমি যদি থানায় তোমার নামে কমপ্লেন করি। তুমি আমার মেয়েকে লোক দিয়ে মেরে দিয়েছো। পরিণাম কি হবে বুঝতে পারছো ?
— ছি ছি! এমন কথা বলছো কেন ? বালাই ষাট ! রে- রে করে উঠলো স্বাতীর মা।

শঙ্খ এখন বেশ অসহায়। লজ্জায়- ভয়ে গলার স্বর আরো তলানিতে নামলো। বললে , – একি বলছেন বাবা! ছেলে- মেয়ের দিব্যি কেটে বলছি। এমন কাজ করতে পারি স্বপ্নেও ভাববেন না। আমি সত্যিই বাবা বড় অসহায় এই মুহূর্তে ।আমার জীবনে এত বড় অভিশাপ আসবে, কোনদিন ভাবতে পারিনি।
আবারো ঝাঁঝিয়ে উঠলে সত্যেন বাবু – তুমি এই বিষয়টা নিয়ে শুধুই ছেলে মানুষই করে যাচ্ছো। ডাইরি করে দিয়েছো থানায়, তোমার কাজ শেষ। কি তদারকি করেছ, নিজের স্ত্রীকে খুঁজে পাবার জন্য ? কোথায়- কোথায় গিয়ে নিজে খুঁজেছো ? বন্ধু- আত্মীয় কাউকে জানিয়েছো কোনোদিন ? কয়েক মাস হতে চললো। কটা দিন এর পেছনে সময় ব্যয় করেছো ? তুমি ভাবছো ও না এলেও তোমার দিন চলে যাবে। কিন্তু ওই মেয়েটা আমার একমাত্র মেয়ে। আমার ওকে চাই বলে দিলাম তোমাকে। পনেরো দিন সময় দিলাম। আমার মেয়েকে ফিরে পেতে চাই। কথা শেষ করে সত্যেন বাবু একটু হাঁপাতে লাগলো। মাথা নিচু করে বসে শঙ্খ। জলের গ্লাস এগিয়ে দিলে সত্যেন বাবুকে স্বাতীর মা। ছেলে- মেয়ে অন্য ঘরে বসে। গুমোট আবহাওয়া এ ঘরে।

শঙ্খ বললে – বাবা, সকলেই আমাকে নিশ্চেষ্ট ভাবছেন। কিন্তু কেন ? আপনার মেয়ে হলেও স্বাতী আমার স্ত্রী। তার প্রতি আমার দায়িত্ব কম, কেন ভাবলেন আপনারা । চাকরি ছেড়ে ছেলে-মেয়েকে ঘরবন্দী রেখে আমি নিজের স্ত্রীকে খুঁজতে বের হবো ? তার কি কোন দায় নেই ?ছেলে- মেয়ের প্রতি, স্বামী সংসারের প্রতি ।কিভাবে এতগুলো দিন বাইরে পড়ে আছে ? কোন খবর দেওয়ার কি সুযোগ তার নেই ?
শঙ্খকে থামিয়ে দিয়ে সত্যেন বাবু বললে – স্বামীর প্রতি কর্তব্যের কথা বলছো ? কিন্তু বলতো, একজন মেয়ে তার সংসার ছেড়ে, ছেলে- মেয়ে ছেড়ে কখন চলে যায় ? সে কি সুখের জন্য চলে গেছে ? নাকি স্বামীর দুর্ব্যবহারে সংসার ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে? সংসারের প্রতি – স্বামীর প্রতি – ঘৃণার পাহাড় জমতে-জমতে নিজে জমা স্তুপে চাপা পড়ে যাচ্ছিলো। পালিয়ে বেঁচেছে হয়তো।
— আমি বুঝতে পারছি না বাবা! আপনি এভাবে আমাকেই দোষারোপ করছেন কেন ? সংসার করতে গিয়ে কোন – কোন সময় ঝগড়া-বিবাদ হতেই পারে। তা বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে ? ঠিক আছে, সে তো আপনার ওখানে যেতেই পারতো । রাগ কমলে চলে আসতো।
স্বাতীর মা দীর্ঘ সময় কথাগুলো শুনেই যাচ্ছিলো। কোন কথা বলেনি। যেহেতু স্বাতীর বাবা বলছিলো । এবার নিস্তব্ধতা ভেঙে বললে – বাবাজীবন, এতো বছর সংসার করেছ। তিনটে ছেলে -মেয়ের বাবা-মা তোমরা। অথচ নিজের পরিবারকে চিনতে পারলে না বা চিনতে চাইলে না ? মেয়েটা কতো সৎ, কতো আত্মসম্মানী ছিলো। তুমি তাকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনেক ভাবে ব্যবহার করেছো। ভেবে দেখো, তার মান- অভিমান তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখনি। দেখলে বুঝতে পারতে। কোনদিন মুখে- মুখে কথা বলেনি। সব কষ্ট চোখ বুজে সহ্য করতো।

শঙ্খ বললে – দেখুন মা , সংসারে দুজনকেই সেক্রিফাইস করতে হয়। কম বেশি হতেই পারে, আমাদের তো খাওয়া – পরার অভাব নেই। ছিলো না কখনো।
সত্যেন বাবু বললে – তবে স্বভাবের অভাব ছিলো। যার ফল আমাকে ভুগতে হয়েছে। দু- দুবার অর্থের জন্য আমাকে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। শুধু আমার মেয়ের শান্তির জন্য।
কিছুটা চমকে উঠেছিলো শঙ্খ। এতো কেঁচো খুঁড়তে-খুঁড়তে কেউটে বের হতে চলেছে ।চুপচাপ এবার মাথা নিচু করে বসে থাকলো ।নতুন করে কোন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলো না। স্বাতীর মা ঘর ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে বেরিয়ে গেল। শঙ্খ ঘর ছেড়ে রাস্তার মোড়ের দিকে বের হলো। সন্দেহের পাহাড় সম মাথায় বোঝা চাপা ছিলো এতক্ষন । দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, একমুখ ধোয়া ছেড়ে কিছুটা স্বস্তি আনতে চেষ্টা করলো।

জয়নাল আবেদিন | Joynal Abedin

Speed of Mind Psychology | মনের বিচিত্র গতি | Best 2023

Patriotism of Rabindranath Tagore | রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচিন্তা | Best 2023

Songs of Ramakrishna Mission | রামকৃষ্ণ মিশনের গানগুলো | Best 2023

Famous Places in Murshidabad | Best Travel Story 2023

Read Online Bangla Novel | Bangla Upanyas Online | Bangla Upanyas Online 2023 | New Read Online Bangla Novel | Bangla Upanyas Online Read | Read Bangla Upanyas Online | Bangla Upanyas Online pdf | Download Bangla Upanyas Online | Bangla Upanyas Online Series | Shabdodweep | Sabuj Basinda | High Challenger | Shabdodweep – Bangla Upanyas Online | Bangla Upanyas Online – Joynal Abedin | Bangla Upanyas Online Show | Shabdodweep Writer | Shabdodweep Novel Writer | New Bengali Novel | Read Online Bangla Novel in PDF | Free Novel Download | Top Bengali Novel | Famous Bengali Writer | Best Selling Bengali Story | Pratilipi Story | StoryMirror Story | Bangla Upanyas Online Book | Sabuj Basinda Website | Top Bengali Writer | High Challenger Motivational Blog | Full Story in Bengali | Bengali Story Reader | New Bengali Story 2023 | Bangla Galpo | Natun Bangla Galpo | Natun Bangla Galpo 2023 | Story Writing Competition | Read Online Bangla Novel 2024| Writing Competiton 2023 | Shabdodweep Read Online Bangla Novel | Full Web Stories | Bangla Galper Series | Read Online Bangla Novel in Netflix Bangla | Download Read Online Bangla Novel | Bengali Story in USA | Read Online Bangla Novel in Bangladesh | Indian Bengali Story | Google Read Online Bangla Novel | Search Read Online Bangla Novel | Sera Bangla Galpo | 18+ Online Bangla Novel Reading | Adult English Story | Adult Bengali Story | Adult Bangla Galpo | Bangla Upanyas 2023 | Natun Bangla Upanyas | Shabdodweep Upanyas | Shabdodweep New Novel | Attractive Read Online Bangla Novel | Attractive Bengali Story | Read Online Bangla Novel Collection | Bengali Story Collection | Story in Bangla | Bangla Galper Episode | Read Online Bangla Novel Episode | Shabdodweep Forum | Shabdodweep Story Collection | Bengali Web Novel APK | Bengali Web Novel Website | Bengali Literature | Read Online Bangla Novel in Audio Platform | Read Online Bangla Novel Audio Book | Read Online Bangla Novel Series

Leave a Comment