...

Best Modern Bangla Galpo Reading | Shabdodweep Story

Sharing Is Caring:

অপরাধীর আবার ধর্ম? – সুভাষ কর

২০০১-এর জুলাই। ত্রিপুরার আসাম-সীমান্তের ধর্মনগরের বাসিন্দা শালিনী সবে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করেছে। শিলচরের খ্যাতনামা জিসি কলেজে ইকনমিক্স অনার্স কোর্সে ভর্তি হবে বলে সেদিন বাসে চড়ে তার বাবার সাথে বেরিয়েছে। বিকেলে বদরপুর রেল-জংশনে নেমে ‘জার্নি সিকনেস’ এড়াতে ট্রেনের ধকলহীন জার্নির আশায় দু’জনে বরাকভ্যালি এক্সপ্রেসে চাপল। রাতটা শিলচরে মাসীর বাড়ীতে কাটিয়ে পরদিন কলেজ খুললেই সেখানে গিয়ে সব কাগজপত্র জমা করবে। ভর্তি হয়ে যাবার পর শালিনীর বাবার তাকে জিসি কলেজেরই গার্লস হোস্টেলে রেখে আসবার কথা।

বরাকভ্যালি এক্সপ্রেস সুদূর পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া থেকে আসে। তৎকালীন সময়টায় ট্রেনটা প্রথম দিকে বিজি লাইন হয়ে এলেও পরে আসামের লামডিংয়ে এসে এমজি হয়ে যেত। গোটা ট্রেনটাই পাল্টে যেত- শুধু নামটা ছাড়া। পাহাড় লাইন বলে ট্রেনের গতি হয়ে যেত বেশ মন্থর। এছাড়াও বদরপুরে এসে ট্রেনের মুখ ঘোরানোর জন্যে ইঞ্জিন পাল্টানো হ’ত। তাতে অনেকটাই সময় লেগে যেত, আর কামরাগুলোর অবস্থানও পাল্টে যেত। সামনের দিকের সংরক্ষিত কামরাগুলো একেবারে পেছনে চলে আসত। যাই হোক, বদরপুর থেকে শিলচর অব্দি সর্ট জার্নিতে ঐ কামরাগুলোতে উঠতে কেউই নতুন করে রিজার্ভেশন করত না। শালিনীরাও সীট খালি পেয়ে জেনারেল টিকিটেই সর্বশেষ রিজার্ভড কামরাটায় উঠে গেল। ওরা জানত না যে ওদের এই সিদ্ধান্ত সামনে ওদের জন্যে কোন্ অজানা বিপদ নিয়ে আসছে।

ট্রেন ছাড়তে ছাড়তে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ভেতরে আলোর ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। চারপাশটাও অন্ধকার। দুধারেই ভুতুড়ে নির্জনতা। বদরপুরের পরটায় শালচাপড়ার ঠিক আগে কাটাখাল নামের একটা জায়গা ক্রশ করার সময় হঠাৎ-ই ছ’সাতজনের এক মুখোশধারী ডাকাত-দল কোত্থেকে এসে শালিনীদের কামরায় ঢুকে পড়ল। বোধহয় আগের স্টেশনেই উল্টোদিকের দরজার বাইরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। সবার হাতেই লম্বা লম্বা ধারালো রাম-দা। ব্যাপারটা ভাল করে বোঝার আগেই তারা লুটপাট শুরু করে দিল। একজন এসে দা দেখিয়ে শালিনীদের দুটো এটাচিসহ হাতের ব্যাগটাও কেড়ে নিল। তারপর সবাই মিলে একে একে অন্য যাত্রীদের সব মালপত্রও ছিনিয়ে নিয়ে ট্রেনের এদিককার দরজার পাশটায় জড়ো করল।

শালিনীর বাবা বারবার ডাকাত-দলের লোকগুলোকে একটা বিশেষ এটাচি ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। কাতরভাবে বলেছিলেন, “এতে শুধু আমার মেয়ের বোর্ড-এক্সামের মার্কসীট, আর ভর্তির জরুরী কাগজপত্রই আছে- অন্য দামী কিছুই নেই”। প্রত্যুত্তরে বাবার জুটেছিল নাকেমুখে ঘুষি ও পেটের নীচটায় ‘কুচ’ জাতীয় ধারালো অস্ত্রের খোঁচা। শালিনীই বাবাকে নিবৃত্ত করে কোনভাবে ঐ দুর্বৃত্তদের দ্বারা আরো মারাত্মক নিগ্রহ থেকে তাঁকে রক্ষা করে। পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছবার আগে খুবই মন্থরগতি কামরা থেকে সব মাল একে একে দরজা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ডাকাতদলের লোকগুলো নিজেরাও পরপর ঝাঁপ দিয়ে নেমে গেল ! শালিনীর, তার বাবার, এবং কামরার অনেকেরই কাছে তখন পরনের পোষাকটুকু ছাড়া আর কোন সম্বল নেই।

ট্রেনটি পরের ‘অরুণাচল’ নামের ছোট স্টেশনে থামতেই আক্রান্ত যাত্রীরা সেখানকার স্টেশনমাস্টারকে রিপোর্ট করল। স্টেশনমাস্টার জানালেন- এসবের প্রতিকার করার মতো কোন ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ এই স্টেশনে নেই। তিনি ফোনে শিলচর জিআরপিতে কথা বললেন। পরে সবাইকে শিলচরে নেমে এফআইআর করতে বললেন। যাত্রীদের উদ্বেগ দূর করতে ভরসা জুগিয়ে বললেন, “সেখানকার করিমসাহেব ডাকসাইটৈ অফিসার, একটা সুরাহা করবেনই”।

করিমসাহেব শিলচর জিআরপি থানার বড়বাবু। ধর্মীয় মিশ্র-বসতিপূর্ণ এই এলাকাটিতে কথায় কথায় সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক সংঘর্ষ এবং রেল-সংশ্লিষ্ট নানাবিধ অপরাধের ঘটনা হ্যান্ডেল করার বিশাল অভিজ্ঞতা তাঁর। শালিনী এবং আরো কয়েকজনের অভিযোগ শুনে তিনি শুদ্ধ কাছাড়ী বাংলায় ফোনে কারো সাথে কথা বলছিলেন। একটা স্তরে তাঁকে বলতে শোনা গেল, “অয় অয়, হক কথা। আমার-অ মনটায় কয়বা, অটা নিয়ামত আলির দলেরঔ কারবার। দেখি-আর্, এইবার যদি কালপ্রিটটাইনরে জেলের ঘানি টানাইতাম পারি ! “কিন্তু একখান সমস্যা থাকিয়াই যায় ! নিয়ামিত তো বরাবর কুনু মামা-চাচার জুরেই হক্কলতা করের”। বড়বাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ।

একটু পরেই একদল সাংবাদিক রেলডাকাতির ঘটনায় আক্রান্তদের ইন্টারভিউ নিতে তাদেরকে ঘিরে ধরল। এর মধ্যে সদ্য তৈরী কিছু লোক্যাল টিভি চ্যানেলও ছিল। নাকে-মুখে রক্তের দাগ লাগানো শালিনীর বাবাকে দেখে তারা ওসি সাহেবের উপর চাপ সৃষ্টি করল- এক্ষুনি উনার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ওসি সাহেব প্রায় বাধ্য হয়ে শালিনীদেরকে রেলস্টেশনের ডিসপেনসারিতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে চিকিৎসক জনৈক ডাঃ চক্রবর্তী প্রাথমিক চিকিৎসার পর আহতের নাকের নীচ থেকে ঠোট অব্দি ড্রেস করে দিয়ে তাঁকে শিলচর সিভিল হাসপাতালে রেফার করে দিলেন। বললেন তাড়াহুড়োর কিছু নেই, থানার বাকী কাজ শেষ করে পরদিন সেখানে একবার দেখিয়ে নিলেই হবে। উনি শালিনীকে নিশ্চিন্ত করে বললেন- “ভয়ের কিছু নাই, মামণি; একটুর লাগিয়া চোখা অস্ত্রটা তুমার বাবার কিডনি অব্দি পৌঁছাইছে না। নইলে মহা বিপদ হইত পারত বা”। কথায় কথায় উনি শালিনীকে এও জিজ্ঞেস করলেন, “কালপ্রিটগুলা নিশ্চয় ‘হতা’ আছিল্, না নি?” শালিনী কিছু বুঝতে না পেরে বাবার দিকে তাকালো। বাবা ডাক্তারবাবুকে বিনয়ের সাথে বললেন, “প্লীজ ডাক্তারবাবু, অটা উচ্চারণ করিয়া আর ঝামেলা বাড়াইওন না য্যান্”। ডাক্তারবাবু যা বোঝার বুঝে গেলেও আঁধারে থাকা শালিনী থানায় ফেরার পথে বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “হতা মানে কি, বাবা?” বাবা শালিনীর কানের কাছে মুখ এনে খুব আস্তে আস্তে বললেন, “বাউন ডাক্তার জানতে চাইছিলেন ডাকাইতগুলা মুসলমান আছিল্ না কিতা”

থানায় ফিরে আসতেই সাংবাদিকরা শালিনীকে ঘিরে ধরল। কারো কারো হাতে টিভি ক্যামেরা। নানা প্রশ্ন করে করে ঠিক কি ঘটেছিল তা তারা শালিনীর কাছ থেকে বিস্তৃত জেনে নিল। সঙ্গে ফাঁকে ফাঁকে বহুবার জানতে চাইল, ডাকাতদলের সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল কিনা, নাকি দু’একজন হিন্দুও ছিল। শালিনী কিন্তু সচেতনভাবে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। বলল, “ওরা ডাকাত, ওরা পরের ধন লুঠেরা- এটা জানাই আপনাদের কাছে যথেষ্ট নয় কি?” তারপর একটা লম্বা সময় ধরে লিখিত অভিযোগ দাখিলের এবং এফ আই আর লজ করার কাজ চলল। শালিনীর বাবা ক্যাশ টাকা ইত্যাদির থেকেও বেশী গুরুত্ব দিয়ে বিশদভাবে শালিনীর যাবতীয় সার্টিফিকেট খোয়া যাওয়ার কথা লিখলেন। ওসি সাহেবকে বিশেষ অনুরোধ জানালেন অন্য জিনিসপত্র পাওয়া যাক বা না যাক, অন্ততঃ মেয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো যেন খুঁজে ফেরৎ দেয়া হয়। ওসি সাহেব আশ্বস্ত করলেন তিনি চেষ্টার কোন কমতি রাখবেন না।

পরদিন ভোরে আবার জি আর পি থানায় শালিনীরা দেয়াল-ঘেঁষা বেঞ্চটায় অসহায়ভাবে বসা। জানা গেল এখনো কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। শুধু শেষরাতে শালচাপড়ার ঝিল-পার থেকে সন্দেহজনক অবস্থায় পাওয়া একটা ছেলেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পাড়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের একটা বিরাট গোষ্ঠী নাকি থানায় ধর্না দিয়ে, প্রশাসনের উপরতলায় দরবার করে কিছুক্ষণ আগে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। “তানরা হক্কলে মিলিয়া জানাইছুন পুলাটাইন বুলে খুব-অই ভালা, আর ‘আলা-ভুলা’; এই অবস্থায় আমরা পুলিশরার আর কি করনের থাকে, কইন?” শালিনীর বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলা ওসি সাহেবের কন্ঠস্বরে তাৎপর্যপূর্ণ খেদোক্তি। শালিনীর চোখে জল। ওসি সাহেব সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “কান্দিয়োনা মামণি। ডাকাইতগুলারে একবার বাগে পাই বা। বিশেষ করিয়া তুমার কাগজপত্র খুঁজার চেষ্টাত কুনু খামতি রাখতাম নায়। আর এইবার হিন্দু-মুছলমান বিচার করিয়া বাইরের যত চাপঔ আউক, কুনু হারামিরে ছাড়াছাড়িত নাই”।

খোদ ওসি-স্যারের মুখেও ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রসঙ্গটা শালিনীর কানে কেমন বেমানান ঠেকল। শালিনীদের পরিবার বরাবরই ধর্মীয়-বিভাজন বা যেকোনও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিরোধী। চট করে চোখের জল মুছে দৃঢ়তার সাথে সে বলল, “কিছু মনে করবেন না স্যার, ঘটনার পর থেকে এখানে বহু যাত্রী, ডাক্তার এবং কিছু সাংবাদিকও আমাদের চেপে ধরে বারবার জানতে চাইছিল- যারা দুষ্কর্মটা করল তারা সবাই-ই মুসলিম, নাকি সঙ্গে দুয়েকজন হিন্দুও ছিল, ইত্যাদি। আর এখন দেখছি আপনিও ওই অপরাধীদের ধর্ম নিয়েই কথা বলছেন। আমি তো বলব- ওরা কেউই এতটুকুও ধার্মিক নয়; প্রত্যেকে শুধুই অধার্মিক; গুণ্ডামি করে পরের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার অধর্মেরই ওরা বাহক। কোন অপরাধীর আবার ধর্ম থাকতে পারে নাকি স্যার?”

ওসি করিমসাহেব মনেমনে বিড়বিড় করলেন- “কুনুসময় আমরার লাহান ওপরতলার চাপ খাইছনা ত মামণি, গতিকে আইজ-অ খাঁটি কথাখান এত্ত সহজ করিয়া কইতা পাররায়। এই খাঁকি ড্রেস পরিয়া আমরার হাত-পাও ত পুরা বান্ধা ! তবু-অ, তুমরার এই সাচ্চা দর্শনটাইনরে দূর থিক্যা নতমস্তকে কুর্নিশ জানাই, মামণি !”

কত অজানারে – সুভাষ কর

“ক্রীং, ক্রীং”

রোববার ভোর আটটা নাগাদ কলিং বেলের শব্দ শুনেই মৌসুমী বিরক্তির ভঙ্গীতে সুশান্তকে লক্ষ্য করে বলে উঠে- “ঐ যে ভাই, দরজাটা খোল্ গিয়ে। বাবুরা এসে গেছেন, নতুন করে তোকে দেয়া কথাটা রেখে আমাদের সবাইকে উদ্ধার করতে।”

সুশান্ত হাতে ধরা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে নীচে সদর দরজার গ্রিল খুলতে সিঁড়ির মুখটায় এগিয়ে যায়। মৌসুমীর বাক্যবাণ ছুটতেই থাকে-

— ইস্, আর সহ্য হচ্ছে না ! কবে যে এই বাথরুম সারানোর কাজটা শেষ হবে! পাঁচ-ছ দিনেই শেষ করে দেবে বলে তিন দিন ভাঙাভাঙি করে ফেলে রাখল। পরে যা-ও টাইলস্ হঠিয়ে নতুন মার্বেল পাতার কাজ শেষ করে গেল- তারপর আজ নেই নেই করেও বারোটা দিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কমোড বসানোর কোন গল্পই নেই।

— আঃ, এত অধৈর্য হচ্ছিস কেন দিদিভাই? বলেছে তো আর দু’দিনের মধ্যেই শেষ করে দেবে। প্লাম্বার কাকুটা হঠাৎ যদি এভাবে অসুস্থ হয়ে না পড়ত- তবে তো …

— তবে কি? তুই কি বলতে চাইছিস? সময় মতোই শেষ করে দিত? কক্ষনো না। আরে ওদের তুই চিনিস না। অসুখটা তো একটা বাহানা। দ্যাখ গিয়ে এই পুজোর বাজারে তোর প্রিয় কনট্রাক্টর বন্ধুটা ওর প্লাম্বারকে ঠিক অন্য কোন একটা কাজে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আসলে ওরা একসাথে বহু কাজ হাতে রেখে দেয়, আর সবখানেই একটু একটু করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়।

— হ্যাঁ, তুই যখন তেমনটাই বুঝে গেছিস, তখন এক্ষেত্রে সেরকম না হলেও তোর কাছে সেটাই সত্যি থাকবে। তোকে কি আমি আজ নতুন চিনেছি? তাই এ নিয়ে তোর সাথে আর কোন কথা বলতে চাইনা। কিছু বললেই বলে বসবি- আরে ভাই, আমি ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী, এসব বিষয়ে তুই আমাকে কি বোঝাবি রে?

কথাটা বলেই বছর আটাশের উদ্যমী তরুণ সুশান্ত আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত পায়ে নীচে নেমে যায়। আসলে বছর ছয়েক আগে ওদের বাবা যখন নিজের রিটায়ারমেন্ট-বেনিফিটস এবং আইটি সেক্টরে নতুন চাকরীতে ঢোকা ছেলের নেয়া ব্যাঙ্ক লোন মিলিয়ে এই ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বাড়িটা কেনেন, তখন পুরোপুরি ছেলেমেয়েদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রমোটারকে বলে নীচতলার কমন বাথরুমটায় কমোড না বসিয়ে তিনি ইণ্ডিয়ান প্যান বসিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল- দেশের বাড়ী থেকে বয়স্ক আত্মীয়স্বজনদের কেউ এসে এবাড়িতে উঠলে ল্যাট্রিন ব্যবহারটা ওদের কাছে যেন একটু ‘কমফোর্টৈবল’ বোধ হয়। ছেলেমেয়েদের মা-ও পরোক্ষে এতে সায় দেয়ায় তখন হাজার বিরোধিতা সত্ত্বেও ইণ্ডিয়ান টয়লেটের বাস্তবায়ন ঠেকানো যায়নি। তবে এরপর মেয়ের বিয়ে দিয়ে, এবং বছরখানেক আগে ছেলেকে বিয়ে করিয়ে এখন বাবার মনে হচ্ছে- যেহেতু দেশের বাড়ী থেকে বেশী সংখ্যায় লোক আসার সম্ভাবনা আর ততটা নেই, তাই ছেলেমেয়েদের ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে বাথরুমটাকে এখন ইউরোপীয়- তে কনভার্ট করে নেয়াই ভাল। তাছাড়া বয়স সত্তর পেরিয়ে যাওয়ায় ইদানীং ওটা ব্যবহার করতে উনার নিজেরও বেশ কষ্ট হচ্ছিল।

দায়িত্বশীল ছেলের উপর কাজটার সম্পূর্ণ ভার সঁপে দিয়ে বাবা বলেছেন, “তুই চেনাজানা কাউকে দিয়ে কাজটা তাড়াতাড়ি করিয়ে নে বাপু- টাকাপয়সা যা লাগে সবটা আমিই দেব”। আজকাল এই বৃদ্ধ লোকটির পেনশনের টাকায় খুব কমই হাত পড়ে- শুধু মাছ-সব্জীর বাজার করা ছাড়া, যা তিনি নিজের হাতে করতেই পছন্দ করেন। ওদিকে সারা মাসের প্রয়োজনীয় গ্রোসারির লম্বা তালিকাসহ সংসারের যাবতীয় বড় খরচগুলো ছেলে আর বৌমা মিলেই চালিয়ে নেয়। এখন অবশ্যি বৌমা তার অফিসের ছোট একটা প্রজেক্টের কাজে দেশের বাইরে কাজ করছে। আসছে পুজোয় তার বাড়ীতে আসা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মেয়ে ও নাতিকে দিল্লী থেকে ক’দিনের জন্যে বাপের বাড়ী বেড়াতে নিয়ে আসা হয়েছে। জামাই অনেক চেষ্টা করলেও ছুটি ম্যানেজ হয়নি বলে আসতে পারেনি। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল- দিদি এসে পৌঁছবার আগেই ভাই বাথরুমের এই ঝামেলার কাজটা শেষ করিয়ে দিক। কিন্তু ভাই যথেষ্ট চেষ্টা করেও তা পেরে উঠেনি। পরিস্থিতির কারণে বন্ধু-স্থানীয় কনট্রাক্টর যুবকটি বাধ্য হয়ে কিছু সময় চেয়ে নিয়েছে। অবশ্যি ফ্ল্যাটে অন্য আরো দুটো বাথরুম থাকায় তেমন খুব একটা অসুবিধেও যে হচ্ছে, তা নয়।

দরজা খুলে সুশান্ত দেখল বুড়ো মতো সেই প্লাম্বারকাকু আরেকটা কমবয়সী ছেলে সহ কমোডের সব সরঞ্জাম নিয়ে হাজির। লোকটাকে সে প্রথম দিকে একদিনই দেখেছিল- যখন তাকে কাজটা বুঝিয়ে দেবার জন্যে আনা হয়েছিল। পরনে একটা ঢিলেঢালা প্যান্ট, আর হাফ হাতা সার্ট। লোকটাকে প্রথম দিনই খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। কিন্তু এই ক’দিনে তার চেহারা যেন আরো অনেকটাই খারাপ হয়ে গেছে। লোকটি খুব বিনয়ের সাথে নীচু গলায় সুশান্তকে বলল- আপনাদের খুব কষ্ট হ’ল বাবু: আসলে আমার ঐ অপারেশনটা না লাগলে আমি ঠিক সময় মতোই আসতাম”।

— অপারেশন? বলছ কি তুমি? কি অপারেশন হ’ল তোমার, কাকু?

— আজ্ঞে, হাসপাতাল থেকে বলল হার্নিয়া। খুব নাকি ঘালিয়ে গেছল।

— তা হাসপাতালে ক’দিন ছিলে?

— মোট চারদিন। আগের দিন ভর্তি, পরদিন অপারেশন, আর পরের দিনটা রেখে তার পরের দিন ছেড়ে দিল।

— এখন কোন সমস্যা নেই তো?

— না, ডাক্তার বলল দু’দিন বিশ্রাম নিয়ে হালকা কাজ করতে কোন অসুবিধা নেই। তাই তো এসে গেলাম। চেষ্টা করব আজই সবটা শেষ করে দিতে।

তারপর সেই সদ্য সুস্থ হওয়া অপারেশনের রোগী গায়ের প্যান্ট-সার্ট পাল্টে, শরীরের নীচ অংশে একটা গামছা মতো জড়িয়ে আর উপরে হাত কাটা ঘাম-ময়লা একটা গেঞ্জি পরে সারাটা দুপুর খেটেখুটে কমোড, সিষ্টার্ন, স্যানিটেশন শাওয়ার ইত্যাদির ফিটিংসের কাজ সারল। মাঝখানে শুধু আধঘন্টার জন্যে টিফিন খেতে বাইরে গেছল। তারপর আগে থেকেই বলে রাখা পুরনো বাথরুমগুলির টুকটাক আরো কিছু সারাইয়ের কাজকর্ম সেরে বিকেল চারটে নাগাদ প্লাম্বার লোকটি আবার সার্ট-প্যান্টটা পরে নিয়ে সুশান্তকে ডেকে বলল, “আমার কাজ শেষ বাবু, আমি আসছি”। সুশান্ত জিজ্ঞেস করল, “শরীর ঠিক আছে তো?” লোকটি জানালো তার কোন অসুবিধে নেই।

বাড়ী ছেড়ে বুড়ো মানুষটা যখন চলে যেতে উদ্যত, দিদি মৌসুমী তখনই প্রায় দৌড়ে ভেতর-ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সুশান্তকে উপদেশের সুরে বলল, “কিরে ভাই, সব কাজ ঠিকঠাক হয়েছে কিনা দেখে নিয়েছিস তো? ভাল করে সব চেক করে নে, নইলে পরে পস্তাতে হবে। পরে এনাদের টিকিটি খুঁজে পাওয়াও মুশকিল হবে বলে দিলাম”। লোকটি সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলল, কোন অসুবিধা হলে কনট্রাক্টর স্যারকে ফোন করবেন ম্যাডাম; বাকিটা আমাদের দায়িত্ব”।

সুশান্ত বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি সাবধানে বাড়ী যেও কাকু”।

— আমি তো এখন বাড়ী যাব না। এয়ারপোর্ট হয়ে যেতে হবে; ছেলের সাথে দেখা করে যাব।

— এয়ারপোর্ট হয়ে মানে? সেখানে তোমার ছেলে কিছু করে নাকি?

— মানে ও আজ সিঙ্গাপুর যাচ্ছে। চেন্নাই থেকে ফ্লাইটে কলকাতায় নেমে আবার দু’ঘন্টা পরেই সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট। এত কম সময়ে বাড়ীতে যাওয়া সম্ভব হবে না তো, তাই মা-বাবাকে এয়ারপোর্টে যেতে বলেছে। ওর মা বাড়ী থেকে সেখানে চলে যাবে। আর আমি সরাসরি সাইট থেকেই … যাক, আসছি বাবু, ওদিকে আবার দেরী হয়ে যাবে।

— কিন্তু তোমার ছেলে কি করে বললে না তো কাকু !

— বছর পাঁচেক আগে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আপনাদের আশীর্বাদে সিঙ্গাপুরের একটা কোম্পানির চেন্নাই ব্রাঞ্চে জয়েন করেছে। ওকে প্রায়ই সিঙ্গাপুরে যেতে হয়। তখন এভাবেই একটুর জন্যে মা-বাবাকে দেখে যায়।

— বাহ্ ! আর এমনিতে ছেলে ক’দিন পরপর বাড়ী আসতে পারে?

— সুযোগ পেলেই আসে, কিন্তু বছরে একবারের বেশী নয়। তবে সমানে টাকা পাঠিয়ে যায়, রোজ ফোন করে খোঁজখবর নেয়। আমাকে তো সেই কবে থেকেই এই প্লাম্বিংয়ের কাজটা করতে একেবারেই নিষেধ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমি ঠিক করেছি, যদ্দিন শরীরটায় দেবে, তদ্দিন এই কাজটা চালিয়েই যাব। ওর পাঠানো সব টাকা ওর মায়ের নামে ব্যাঙ্কে রেখে দিচ্ছি। পরে ওরা মা-ছেলে মিলে যা করবার করবে। আমার একটাই মেয়ে, তাকে তো বহু আগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ঠাকুরের কৃপায় শ্বশুরবাড়িতে সেও সুখেই আছে। তাই আমার আর এখন বেশী টাকাপয়সা দিয়ে কি দরকার, বলুন বাবু? এখন শুধু ছেলের জন্যে একটা লক্ষ্মীমন্ত বৌমা আনতে পারলেই আমার দায়িত্ব শেষ।

সুশান্ত অবাক হয়ে প্লাম্বারকাকুর কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হ’ল মানুষের দ্বারা সামনাসামনি দেখা বহু সাদামাটা দৃশ্যের, কিংবা উপরে উপরে ভেবে নেয়া তার অসংখ্য স্থবির ভাবনাদের আড়ালে এমন অদেখা কত মনোরম দৃশ্য আর অচিন্তনীয় কত প্রাণবন্ত উপলব্ধিরা লুকিয়ে থাকে ! সে নিজের আবেগকে কোনভাবে সংবরণ করে শান্তভাবে শুধু বলল, “না কাকু, তুমি আর দেরী করো না, ফ্লাইট এসে পড়লে কিন্তু মুশকিল হয়ে যাবে”।

প্লাম্বারকাকু চলে গেলে দিদি আর ভাইয়ের মধ্যে অনেকক্ষণ কথাবার্তা হ’ল। বুড়োর জীবনযুদ্ধের শেষে সন্তানের দিক থেকে অভাবনীয় এই সাফল্যের খবর যে দিদির ছকবাধা জীবনদর্শনকে অনেকটাই ব্যাকফুটে ঠেলে দিল তা সহজেই অনুমেয়। একসময় দিদিকে শোনা গেল আফশোস করে বলতে, “সত্যিই ভাই, আমাদের ম্যানেজমেন্টের সূক্ষ্ম হিসেবেও মাঝে মাঝে কেমন বিরাট ভুল ধরা পড়ে যায় !”

সুভাষ কর | Subhash Kar

Why 15th August chosen as Independence Day? | Probodh Kumar Mridha

New Style of Durga Puja 2023 | Tanmoy Kabiraj

Why do newborn baby cry after birth? | Probodh Kumar Mridha

Goddess Dakshina Chandi 2023 | Barid Baran Gupta | Best Article

Modern Bangla Galpo Reading | Top Bangla Golpo Online Reading | New Modern Bangla Galpo Reading | Top Best Story Blogs | Best Story Blogs in pdf | Sabuj Basinda | High Challenger | Famous Bangla Golpo Online Reading | Shabdodweep Read Online Bengali Story | Shabdodweep Writer | Bangla Golpo Online Reading pdf | Famous Story – Read Online Bangla Galpo | Pdf Modern Bangla Galpo Reading | Modern Bangla Galpo Reading App | Full Modern Bangla Galpo Reading | Bangla Golpo Online Reading Blogs | Best Story Blogs in Bengali | Modern Bangla Galpo Reading in English | Modern Bangla Galpo Reading Ebook | Full Bangla Galpo online | Read Online Bangla Galpo 2023 | New Bengali Web Story – Episode | Golpo Dot Com Series | Modern Bangla Galpo Reading Video | Story – Read Online Bangla Galpo | Modern Bangla Galpo Reading Audio | New Bengali Web Story Video | Read Online Bangla Galpo Netflix | Audio Story – Modern Bangla Galpo Reading | Video Story – Modern Bangla Galpo Reading | Shabdodweep Competition | Story Writing Competition | Bengali Writer | Bengali Writer 2023 | Trending Modern Bangla Galpo Reading | Recent story Read Online Bangla Galpo | Top Modern Bangla Galpo Reading | Popular Modern Bangla Galpo Reading | Best Read Online Bengali Story | Read Online Bengali Story 2023 | Shabdodweep Modern Bangla Galpo Reading | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Read Online Bangla Galpo Download | Bangla Golpo Online Reading mp3 | Horror Adult Story | Read Online Bengali Story Collection | Read Online Bangla Galpo mp4 | Read Online Bangla Galpo Library | New Bengali Web Story Download | Full Live Bengali Story | Bengali Famous Story 2023 | Shabdodweep Bengali Famous Story | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Live Bengali Story – audio | Bengali Famous Story – video | Bengali Famous Story mp3 | Full Bengali Famous Story | Bengali Literature | Shabdodweep Magazine | Shabdodweep Web Magazine | Live Bengali Story Writer | Shabdodweep Writer | Story Collection – Read Online Bangla Galpo | Modern bangla golpo reading pdf free download | Modern bangla golpo reading pdf download | Modern bangla golpo reading pdf | Modern bangla golpo reading in english pdf | Modern bangla golpo reading in english | Modern bangla golpo reading book pdf | choto golpo bangla

Leave a Comment

Seraphinite AcceleratorOptimized by Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.