Bengali Story 2023 | সন্ধ্যে নামার আগে | গল্প ২০২৩

সন্ধ্যে নামার আগে [পর্ব – ১] [Bengali Story]

সাঁকোটার কাছে আসতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল । ফেব্রুয়ারির শেষ,শীতের হালকা আমেজ তবুও রয়ে গেছে । কোচিং সেন্টার থেকে বের হয়ে জোরে সাইকেলটা চালিয়েও সন্ধ্যে নামার আগে সাঁকোটা পার হতে পারল না তনুকা । আসার সময় ওদের গ্রাম রামতলা থেকে মিনিট পনেরো সাইকেলটা চালিয়ে বড় খালটার উপর লোহার তৈরি সাঁকোটার কাছে আসতে প্রায় আধঘণ্টা লেগে যায় । সাঁকোর ওধারে স্টেশনের স্ট্যাণ্ডে সাইকেলটা রেখে ট্রেন ধরে স্টেশনের কাছের একটা বাড়িতে ক্লাস এইটের একটা ছেলেকে ইংরাজি পড়ায় । তারপর কোচিং সেন্টারে ব্যাঙ্কিং-এর কোচিং ক্লাস সেরে ফিরতে হয় তনুকাকে রোজ । টিউশুনির দুহাজার টাকায় ওর কোচিং-এর ফিসটা হয়ে যায় । তাই দুটোই চালিয়ে যাচ্ছে । ফেরার সময় আজ একটু দেরি করে ফেলল বান্ধবীর কাছে আগের দিনের অসমাপ্ত নোটটা নিতে গিয়ে । গ্রামের দিক থেকে সাঁকোর ওধারের জায়গাটা সন্ধ্যের পর শুনশান হয়ে যায় । সাঁকোটা যেখানটায় শুরু তার পাশে বড় বেল গাছাটার গায়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে পুরানো আমলের ভাঙা মন্দিরটায় আশেপাশের কিছু বখাটে ছেলের আড্ডা জমেছে কিছুদিন যাবৎ । সন্ধ্যের পর জুয়া-মদ-ছিনতাই-মেয়েদের টানাটানি সব দুষ্কর্মই চলে ওখানে । মাঝে মধ্যে এই জায়গাটার অপকর্মের কথা কানে যে আসে না তা নয়, তবুও সাহসে ভর করেই যাতায়াত করতে হয় । শহরে যাওয়ার অন্য কোন রাস্তাও তো নেই ।আগের মোড় থেকে সঙ্গী দুজনের থেকে আলাদা হতে হয়েছে আজও প্রতিদিনের মত। খালটা বেশ বড়, লম্বা সাঁকোটা পার হতে সময় লাগে । সাঁকোটায় উঠতেই জোরে প্যাডেল চালাতে শুরু করে তনুকা । এমনিতে পাড়ায় ডাকাবুকো মেয়ে বলে জানে সবাই, দেখতে সুশ্রী লম্বা-চওড়া শক্ত-সমর্থও বটে তনুকা, মার্শাল আর্টের প্যাঁচ-পয়জারও জানে কিছু কিছু। তবুও একা এই সময়টায় কেমন যেন বুকটা ঢিপঢিপ করে । আবছা আলোয় সাঁকোর ওধার থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে কে যেন আসছে না । বুকের স্পন্দন দ্বিগুণ হয়, চাঁদের আলোয় পিছনে একটা মানুষের ছায়া সাইকেলের সামনে সামনে পড়ছে, জুতোর খটখট শব্দটাও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে পিছন থেকে । ঘাড় ফিরিয়ে দেখার সময় নয় এখন, আরো জোরে চাপ দেয় প্যাডেলে; হঠাৎ সামনের লোকটা মূর্তিমান যমদূতের ম ত দু-হাত দিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ে । এই কি তাহলে ল্যাঙড়া রতন, মুহূর্তে ভেবে নেয় তনুকা । কর্কশ গলায় বলে ওঠে ছায়ামূর্তি-‘‘একটু আস্তে খুকুমণি, অত তাড়া কিসের, জরুরী কথা আছে ।‘‘ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে । চিড়িক করে বিদ্যুৎ খেলে যায় মাথায় ; কি করতে হবে ভেবে নিয়েছে তনুকা । তড়িৎগতিতে সাইকেলটা রেলিঙয়ে ঠেসিয়ে দেয়, জুতোর ফিতে ঠিক করার ভঙ্গিতে বসে পড়ে দু হাতের উপর ভর দিয়ে চকিতে ডান পা টা দিয়ে সজোরে এক লাথ ল্যাংড়াটার তলপেট লক্ষ্য করে । ভারী স্পোর্টস সু-এর মোক্ষম লাথি । হতভম্ব রতন, এতটা ভাবতেই পারে নি । বাবা গো… মরে গেলাম গো…. দুহাতে অস্থান জায়গাটা চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরে বসে পড়ে ল্যাংড়া রতন । সাগরেদটা ইতিমধ্যে দুহাতে জাপটে ধরে ফেলেছে পিছন থেকে । ‘‘কোথায় যাবি…অ্যাঁ…বড্ড বাড় বেড়েছে আজকাল তোর.. রূপের দেমাগ..না…চল হারামজাদি মজা দেখাচ্ছি ; ঘষটে ঘষটে টেনে নিয়ে চলল ভাঙা মন্দিরটার দিকে। ধস্তাধস্তি চলছে । দমবে না কিছুতেই, দু-পা সমানে ঝটকা মেরে চলেছে তনুকা….সুযোগের অপেক্ষা…..আচমকা বুকের কাছে প্যাঁচানো বদমাইশটার একটা হাতে কামড় বসিয়ে দেয় জোরসে । বাপরে….গেলাম রে– হাতটা ছেড়ে দিতেই কুনু্ই দিয়ে পিছন দিকে সজোরে একটা চার্জ করতেই অন্য হাতের প্যাঁচটাও খুলে যায় লোকটার । বিদ্যুৎগতিতে ছিটকে সরে পুরো একপাক ঘুরে লোকটার বুকের হা্ইটে নিজের ডান পা টা তুলে সজোরে একটা লাথ হাঁকায় তনুকা । নির্ভুল স্ট্রোক … আচমকা ধাক্কায় বেসামাল হয়ে ছিটকে পড়ে লোকটা চার-পাঁচ হাত দূরে । ব্যস….এই সুযোগ.. নিমেষে সাইকেলটা একহাতে তুলে নেয়, হ্যাণ্ডেলটা ঘুরিয়ে একলাফে সিটে উঠেই প্যাডেল চালিয়ে দেয় তনুকা । কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে সব ঘটে যায় । উত্তেজনায় প্যাডেলে দাঁড়িয়েই সাইকেলটা চালাতে থাকে তীব্র বেগে । বুকের মধ্যে যেন দামামা বাজছে তনুকার । ভয় পাবে না সে, কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে—‘ভাগ তনুকা ভাগ’ । পিছনে ভারী বুটের শব্দ..পরাজিত বাঘের হুঙ্কার শুনতে পাচ্ছে, ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে যেন উন্মত্ত পশুটা । ধরা পড়া চলবে না.. নুয়ে পড়ে বনবন করে সামনে ছোটায় পঙ্খীরাজটাকে । দম যেন শেষ হয়ে আসছে । উঃ মা গো আর কতক্ষণ । ক্রমশঃ….ক্রমশঃ যেন দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে ধপাধপ আওয়াজটা । রুদ্ধশ্বাসে একই স্পিডে পাড়ার মোড় ছাড়িয়ে বাড়ির সামনে এসে সাইকেলটায় ব্রেক কষে তনুকা । বুক ভরে শ্বাস নেয়, শীতের রাতেও গোটা শরীরটা ঘামে জবজব করছে । আতঙ্ক আর উত্তেজনায় বুকের দ্রুত উঠানামা অনুভব করল তনুকা । সদর দরজাটা পার হয়ে সাইকেলটা কোনরকমে দাঁড় করিয়েই এক ছুটে মায়ের ঘরে, জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে তনুকা । অবিন্যস্ত প্যান্ট-জামা, চুল এলোমেলো মেয়ের চেহারা দেখেই ভয়ে আঁতকে উঠে মা । কি হয়েছে…কি হয়েছে তনু…এত হাঁপাচ্ছিস কেন । গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মা, কোন উত্তর নেই শুধু ফুঁপিয়ে কান্না ……শুধু কান্না….

গ্রামেরই প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করেন রমেন বাবু । প্রায় কুড়ি বছর হবে স্কুলটাতে পড়াচ্ছেন । এখানেরই মানুষ তিনি । বীরভূম জেলায় একটা গণ্ডগ্রামে প্রাইমারী স্কুলে প্রথম চাকরীতে যোগ দেন । পরে বদলী নিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে আসেন । সৎ পরিশ্রমী মানুষ হিসাবে সুনাম আছে এলাকায় । তার হাতে তৈরি অনেক ছাত্রই এখন বড় চাকুরে বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্য ক্ষেত্রে । কিছু চাষের জমিও আছে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া । নিজেই লাঙল কিনে চাষ করান, দেখাশুনা করেন । দুই ছেলেমেয়ে তনুকা আর তন্ময়, বৃদ্ধা মা ও স্ত্রী অনিমাকে নিয়ে পাঁচ জনের সংসার রমেনবাবুর । গ্রামটা বেশ বর্ধিষ্ণু । বিভিন্ন জাতের লোক বাস করে, অনেকগুলো পাড়া গ্রামটায় । থানা, হাসপাতা‌ল, স্কুল, গ্রামীণ লাইব্রেরী, পোস্টঅফিস, আড়তদার,তেজারতির কারবার, একটা ছোট সিনেমাহল সবই আছে এখানে । এ গ্রামেই এখানকার এম.এল.এ.থাকেন । উনিই এখানকার হত্তাকত্তা । ভাল-খারাপ ছোট-বড় অনেক পোষ্য আছে ওনার । সাঁকোর কাছে আখড়াটার রসদ কে যোগায় তাও জানে সবাই । মুখ খোলে না কেউই ; মোড়ের কাছটায় রথতলায় বাজার বসে প্রতিদিন । রমেনবাবুর্ এই পৈতৃক বাড়ীটা গ্রামের শেষের দিকে, বাজার ছাড়িয়ে মোরাম রাস্তা দিয়ে গোলদিঘির পাড় হয়ে গেলে সাঁকোটা পার হলেই স্টেশন ; হাঁটা পথে মোড় থেকে সোয়া ঘণ্টা, সাইকেলে মিনিট পনেরো লেগে যায় স্টেশন যেতে ।

গ্রাজুয়েশনের পর কম্পিউটারে ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করে ব্যাঙ্কিং-এর কোচিংটা নিতে শহরে যেতে হয় তনুকাকে । তন্ময় ওর চেয়ে বছর তিনেকের ছোট, এবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসবে । দেখতে শুনতে ভালই তনুকা, ডাকাবুকোও বটে । মেয়ের জেদ চাকরী করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে । তাই বিয়ের কথা পারেননি রমেনবাবু মেয়ের কাছে । সেদিন মেয়ের কাছে পুরো ঘটনাটা শুনে একটা অজানা আশঙ্কার মেঘ ছেয়ে ফেলে মায়ের মন । তবুও মেয়েটা লড়াই করে বাঁচতে শিখছে জেনে গর্বে আনন্দে বুকটা ভরে গিয়েছিল অনিমার । ঘটনাটার আকস্মিকতার রেশ তখনো কাটেনি তনুকার । কি করে যে সে পারল এখনও নিজেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না । এত সহজে যে সে পার পাবে না তাও বুঝতে পারছিল । প্রতিহিংসা ওরা নেবেই । রাতে ঘুম আসছিল না দুঃশ্চিন্তায় । মনে পড়ে গতবছর এই সময়টায় ঘোষ পাড়ার শর্বরী সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরছিল টিউশন সেরে, সাঁকোর পরে ঐ ভাঙা মন্দিরটার কাছটায় ছোকরাগুলোর টোন-টিটকিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, প্রতিবাদ করেছিল, থানায় মৌখিক রিপোর্টও করেছিল । কয়েকদিন চুপচাপ কেটে যাবার পর টিউশানি থেকে একদিন বাড়ী ফিরল না শর্বরী ।অনেক রাত অবধি খোঁজাখুঁজি করেছিল ওর দাদা; পরদিন সকালে বাড়ী ফিরেছিল বিধ্বস্ত অবস্থায় ।অপবাদের ভয়ে থানাপুলিশ করেনি ওর বাড়ীর লোক । মাসী বাড়ী যাবার গল্পটা বিশ্বাস করেনি কেউই ।ব্যাপারটা ধামা চাপা দেওয়ার জন্য ওকে সত্যিসত্যিই মাসীর বাড়ীতেই রেখে এসেছিল ওরা । পরে ওখান থেকেই নাকি বিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

সন্ধ্যে নামার আগে [পর্ব – ২] [Bengali Story]

প্রাইভেট সেরে বাড়ী ফিরছিল, পাড়ার মোড়ে জটলা দেখে সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে এগিয়ে যায় তন্ময় । একটা ছেলেকে ঘিরে ভীড়টা । শুনল গতকাল রাত্রে ল্যাঙড়া রতন সাঁকোর কাছে পা ফসকে খালে পাথরের উপর পড়ে যায়, পেটের নিচে গুরুতর আঘাত লেগে জখম , গত রাতেই এখানকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে । চাঁদা তুলতে হবে, তারই ব্যবস্থা করতে আসা । এম.এল.এ.র কাছে যাবে সাহায্যের জন্য । অনেকে মুখ চেপে হাসাহাসি করছে ল্যাঙড়া হলেও রতন একটা শক্তপোক্ত ব্যাটাছেলে, সে পা ফসকে পড়ে গেল খালের মধ্যে ,কি করে বিশ্বাস হয় । তন্ময় হাসি চেপে ওখান থেকে সরে পড়ে । সত্যি জিও দিদি, স্যালুট জানায় তন্ময় আরেকবার তনুকাকে । কেমন জব্দ, একটা মেয়ের হাতে মার খাওয়ার কথা হেঁকে-ফুকারে বলতে পারছে না লজ্জায়, এলাকার স্বঘোষিত দাদা যে, সকলের রক্ষাকর্তা, অন্তত চাঁদা চাইতে গিয়ে তাই বলে থাকে ।

মনে সাহস যুগিয়ে কয়েকদিন পর আবার যাতায়াত শুরু করল তনুকা, ফেরার সময় তন্ময়কে ফোনে ডেকে নিত, সাঁকোর আগে তন্ময় এসে দাঁড়াত তারপর ভাইবোনে গল্প করতে করতে একসঙ্গে বাড়ী ফিরত । চুপচাপ কেটেছে প্রায় একটা মাস । এরপর সাহসী হয়ে আর তন্ময়কে ডাকত না । একাই কয়েকদিন যাতায়াত করছিল তনুকা । সেদিন আকাশে মেঘ ছিল । ট্রেন থেকে নামার পরই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে । অন্ধকারটা আজ একটু বেশীই । সামনে পরীক্ষার কথা ভেবে তন্ময়কে আর ডাকল না, একাই চলে যাবে ভেবে সাঁকোটায় উঠতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি চলে এল । অন্ধকার আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি সঙ্গে মেঘের গর্জন আর শোঁ শোঁ বাতাস শুরু হল । এখন আর দাঁড়াবার সময় নেই । জোরে সাইকেল চালাতে লাগল তনুকা । বৃষ্টির ছাঁট আর উল্টো দিকের বাতাসের ঠেলায়ে জোরে এগোতেও পারছে না, হঠাৎ সাঁকোটার শেষ থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ষণ্ডামার্কা লোক পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল । কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছন থেকে আর একজন জাপটে ধরে ফেলল, বজ্রঘোষিত হুঙ্কার ভেসে এল ‘‘একদম চালাকি করবে না, আজ শেষ দেখে ছাড়ব ।’’ তনুকা হাত পা ছুঁড়তে লাগল, প্যান্ট-জুতো কোনটাই আজ পরে আসেনি, প্রচন্ড বৃষ্টিতে সালোয়ার কামিজ ভিজে সপসপ করছে । আজ নিজেকে রক্ষা করার কোন সুযোগই কি পাবে না । এভাবেই নিঃশব্দে তার চরম সর্বনাশ হয়ে যাবে । সামনের লোকটা সাইকেল আর ব্যাগ দুটোই খালের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল ; যাঃ মোবাইলটা গেল, কি করবে এখন..উপায় না দেখে তনুকা চিৎকার শুরু করল । লোকটা চুলের মুঠিটা ধরে ঠাস ঠাস করে দুগালে কষে চড় লাগাল, তারপর ওর হাঁ-মুখটা বড় একটা রুমাল দিয়ে বেঁধে কাঁধে তুলে নিল । হাত দিয়ে লোকটার পিঠে কিল-ঘুষি মারতে লাগল কিন্তু অসুরটার গায়ে প্রচন্ড ক্ষমতা, ওকে কাঁধে নিয়ে ভাঙ্গা মন্দিরটার দিকে ছুটতে লাগল । এদিকে বৃষ্টি শুরু হতেই মায়ের তাড়ায় তন্ময় ছাতা নিয়ে সাঁকোটার দিকে সাইকেলে রওনা হয়েছিল । বিদ্যুতের ঝলকানিতে দূর থেকে সাঁকোটা নজরে আসতে কয়েকটা ছায়ামূর্তির ধস্তাধস্তি দেখেই ব্যাপারটা বুঝে গেল, সাইকেলটা ফেলে দিয়ে দৌড়ে বেলগাছটার কাছে এসে ওদের ধরে ফেলল । প্রচন্ড আক্রোশে পিছন থেকে লোকটার মাথার চুল ধরে টেনে ধরে চিৎকার করে বলল –‘‘ছেড়ে দে….ছেড়ে দে শয়তান…দিদিকে ছেড়ে দে’ ছেড়ে দে শয়তান…দিদিকে ছেড়ে দে ।‘‘ ভ্রুক্ষেপই করল না লোকটা । অন্য লোকটা তখন ছুটে এসে চিতার মত ক্ষিপ্র গতিতে তন্ময়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, সজোরে মুখে এক ঘুষি মারল..আচমকা ধাক্কায় দূরে ছিটকে পড়ল…….উঠে দাঁড়াবার আগেই দ্বিতীয় ঘুষি বুকে । তারপর এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি-লাথি….সদ্য বয়ঃপ্রাপ্ত কচি ছেলে তন্ময়, এত ভীষণ মার সহ্য করতে পারছে না, মুখের কষ বেয়ে রক্তের নোনা স্বাদ, বুকে পেটে প্রচন্ড ব্যথা, কোনরকম বাধাই দিতে পারছে না সে । লোকটার হাতে চকচক করছে একটা ড্যাগার, ভয়ে আর কোন প্রতিরোধ করতেও পারল না । বাঁহাত দিয়ে ঠেলা মারতে মারতে খালের ধারে নিয়ে এসে প্রচন্ড জোরে একটা লাথ মারল লোকটা । লাগাতার মার খেয়ে মাথা নাক ঝাঁঝাঁ করছে, আর পারল না, কাদায় পিছলে বেহুঁশ তন্ময় খালের নিচে ঝোপের মধ্যে পড়ে গেল । ওদিকে লোকটা নখের আঁচড় আর পায়ের গুঁতো খেতে খেতে বেল গাছটার নিচে একটা ভাঙ্গা ঘরের মধ্যে ঢুকলো, দড়ির খাটে ছুঁড়ে ফেলল দেহটা । তারপর হাতদুটো পিছন দিকে ঘুরিয়ে একটা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলল । ‘শালী আজ দেখাব মজা । লাথ মারা না, তোর হাত পা আজ ভেঙ্গে দেব হারামজাদী ।‘ মার খেয়ে বৃষ্টিতে সপসপে ভিজে নেতিয়ে পড়েছে তনুকা আর যেন পারছে না । বিদ্যুতের আলোয় তখন তন্ময়কে দেখেছে, কোথায় গেল ও, খুব মারছিল ওরা বুঝতে পারছিল পিছন দিক থেকে কিন্তু দেখতে পায়নি পুরোটা, তবে কি ওকে মেরেই ফেলল । ঘরটায় একটা গুমোট গন্ধ, কতকগুলো মদের বোতল, দেওয়ালে সিনেমার পুরানো পোস্টার ঝুলছে, টিমটিমে একটা ল্যাম্প জ্বলছে । মড়ার মত পড়ে রইল তনুকা, পালাবার প্ল্যান খুঁজতে লাগল । মেয়েটা নেতিয়ে আছে দেখে ফুর্তিটা আরও জমবে ভেবে মদের বোতল নিয়ে বসেছে দুটো । উবু হয়ে পড়ে আছে, মাঝে মাঝে ওদের ক্রিয়াকর্ম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিতে নিতে হাতের বাঁধনটা আলগা করতে লাগল তনুকা । শক্ত বাঁধন, অনেক চেষ্টায় পিচকে পিচকে বাঁধাটা খুলে গেছে, তবুও ঐভাবেই পড়ে থাকল কিছুক্ষণ । চোখ ঢুলুঢুল..নেশাটা জাঁকিয়ে বসেছে মনে হচ্ছে । সন্তর্পণে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে কোনের দিকে গাদ করে রাখা চ্যালা কাঠ একটা পেয়ে গেল । ওটা তুলতে গিয়েই খুট করে শব্দ করে ফেলল, ব্যস….দেখে ফেলেছে । ওরা উঠে আসার আগেই এবার রেডি, মরিয়া তনুকা, মেরেই মরবে । একজন এগিয়ে আসছে, আয়ত্তের মধ্যে আসার সাথে সাথে বাঁ পায়ে ভর দিয়ে এক পাক ঘুরে ডান পাটা দিয়ে সজোরে এক লাথ কোমরে । কোৎ করে লোকটা পড়ে গেল উঠে দাঁড়াবার আগেই চ্যালা কাঠটা দিয়ে মাথায় সজোরে এক রদ্দা । মোক্ষম তাক, কুত্তাটা মাথা ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে বসে পড়ল তারপর চিৎপাত । ল্যাংড়া রতন এবার উঠে আসছে । টলমল পায়ে এগিয়ে আসছে, জড়ানো গলায়– ‘‘কোথায় পালাবে খুকুমণি, এবার আর নয়, এই যে গঙ্গাজল, মোক্ষম দাওয়াই, চিরতরে সব সাধ আহ্লাদ মিটিয়ে দেব ।” হাতের স্বচ্ছ বোতলে টলটল করছে ওটা কি.. ..মদ নয়তো… ধোঁয়া উঠছে…তবে কি… না এ হতে পারে না । নার্ভাস হলে চলবে না কি করবে ঠিক করে নেয় নিমেষে …..চোখে চোখ রাখে তনুকা । এগিয়ে আসছে খোঁড়া রতন.. আচমকা বোতলটা থেকে ছুঁড়ে দেয় এক ঝলক তীব্র অ্যাসিড , ডানদিকে একটু হেলে মুখটা সরিয়ে নেয় তড়িৎগতিতে । ধোঁয়া ওঠা গঙ্গাজলের ঝলকটা ছলকে মাটিতে পড়ে যায়, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে দ্বিগুণ রাগে আবার ছোঁড়ার আগেই চকিতে বসে পড়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে ডান পা টা চালায় খোঁড়াটার দুপায়ের মাঝ বরাবর । মদের নেশায় চুর ছিল এমনিতেই, আচমকা লাথির ঘায়ে বেসামাল হয়ে উল্টে পড়ে গেল রতন কোনের ভাঙ্গা ইট-কাঠের গাদায়, কিছু বোঝার আগেই হাতের বোতলের ঝলকটা উছলে পড়ে খোঁড়াটার ঘাড়ে গলায় বুকে….আর্ত চিৎকার করে ওঠে….গেলাম রে……জ্বলে গেলাম রে…মাগী হারামজাদী….আঃ…. পুড়ে গেলাম….জ্বলে যাচ্ছে…শালী কুত্তির বাচ্চা…আমাকেই ঘায়েল করলি আমারই অস্ত্রে ” …রাগে জ্বলনে কুৎসিত ভাষায় যাচ্ছেতাই গালিগালাজ….মেঝেয় পড়ে যন্ত্রণায় ছটপট করতে লাগল পশুটা । সাগরেদ কুত্তাটা তখন রতনের চিৎকারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক দৌড়ে বাইরের অন্ধকারে চলে এল তনুকা । আন্দাজ করে প্রাণপণে ছুটতে লাগল বড় রাস্তার দিকে, তন্ময় কোথায় খুঁজবে কি করে, চিৎকার করে ডাকতেও ভয় পাচ্ছে । আগে বের হই, এদের হাত থেকে ।

বৃষ্টি থেমে গেছে….মিশকালো অন্ধকারটা আর নেই, তবে আলো দেখা যাচ্ছে না কোথাও, ঝিঁঝিঁর ডাক.. জোনাকি আর দু-একটা বাদুড় উড়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক…রাস্তায় উঠেই দৌড়াতে শুরু করল আবার…পিছনে ধপাধপ পায়ের শব্দ শুনতে পেল..তাড়া করে আসছে কি আবার…ভয়ে ভাবনায় আরো জোরে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগল তনুকা । কানের কাছে সেই ফিসফিসানি- ‘ ভাগ তনুকা ভাগ ’ ….. ছুটছে তো ছুটছেই । পিছনের শব্দটা আর শোনা যাচ্ছে না লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে, তাই পিছু ছেড়েছে বোধ হয় লোকটা । রাস্তার আলোয় দোকানদানি দেখা যাচ্ছে…ঐ তো গোলদিঘীটা…ওপারে মোড়টা…এবার রাস্তাটা চিনতে পারল ; থানাটা কোথায়, তন্ময়কে বাঁচাতে হবে । ছুটতে ছুটতে একেবারে থানার বড়বাবুর টেবিলে আছড়ে পড়ল তনুকা ক্লান্ত দেহটা নিয়ে । আঁতকে উঠলেন ও.সি. নির্মল ঘোষাল । কি হল…কি হয়েছে ? জাঁদরেল আবার সহৃদয় মানুষ দারোগা সাহেব । সৎ পুলিশ অফিসার হিসাবে নাম আছে এলাকায় । বিধ্বস্ত চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন বড় কোন বিপদে পড়েছে মেয়েটা । গায়ের সালোয়ারটার একটা হাতা ছিঁড়ে ঝুলছে, অবিন্যস্ত এলোমেলো চুল থেকে জল চুইয়ে পড়ছে, কপালে কালশিটে দাগ কস বেয়ে রক্তের ধারা.. গোটা শরীরটা ভিজে সপসপ করছে, বড় বড় নিঃশ্বাস পড়ছে, চোখ তুলে ভাল করে তাকাতে পারছে না…হাতের ঈশারায় একটু জল চাইল । একটু সামলে গোটা ঘটনাটা সংক্ষেপে বলল তনুকা, ‘‘ভাইটাকে বাঁচান স্যার.. ওর অবস্থা ভাল নয় ।” সব শুনে খুব তাড়াতাড়ি একজন পুলিশ অফিসারকে সশস্ত্র ফোর্স দিয়ে পাঠালেন বড়বাবু সাঁকোটার দিকে । তনুকার পরিচয় পেয়ে চিনতে পারলেন । স্কুলবোর্ডের কোন এক অনুষ্ঠানে আলাপ হয়েছিল তনুকার বাবা রমেনবাবুর সঙ্গে । বদমাশগুলোর নামে এফ.আই.আর.করিয়ে নিয়ে আশ্বস্ত করলেন । থানার গাড়ীতে করে স্থানীয় এক প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে তনুকাকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে নিজেও সাঁকোটার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন বড়বাবু ।

আজ তনুকা একজন প্রতিষ্ঠিত পুলিশ সাব-ইন্সপেকটর । বাড়ী থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বীরভূমের একটা থানার ব্যারাকে সহকর্মীর কাছে বসে এতক্ষণ শোনাচ্ছিল তার জীবনে ঘটে যাওয়া হাড় হিম করা অভিজ্ঞতার কথা, তার লড়াই করে বেঁচে যাওয়ার গল্প । পনের বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাত্রে ঘটে যাওয়া সমস্ত ছবিটাই ভেসে ওঠে মনের পর্দায়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনকার সেই রুদ্ধশ্বাস দৌড়, অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা, তন্ময়কে মারতে মারতে খালে ফেলে দেওয়া, থানায় বড়বাবুর টেবিলে লুটিয়ে পড়া সব….সব মনে পড়ছে তার ।

সেদিন বিধ্বস্ত তনুকাকে নিয়ে বড়বাবু বাড়ীতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, বুকে জড়িয়ে ধরেন মেয়েকে দুজনে, মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বড়বাবুকে কে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তন্ময় আসেনি দেখে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকেন রমেনবাবু—চিৎকার করে প্রশ্ন করেন—‘‘আমার ছেলে কোথায়….তন্ময় কোথায়…ওকে কোথায় রেখে এলেন স্যার, ওকে আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিন…দয়া করুন…” । মায়ের বুকফাটা কান্নায় কড়া ধাতের ও.সি. নির্মল ঘোষালও বিচলিত হয়ে পড়েন ; কোনরকমে আশ্বস্ত করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান গাড়ী নিয়ে । অনেক রাত্রে থানা থেকে গাড়ীতে করে রমেনবাবুকে ব্লকের হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ । বুকে লাথি খেয়ে বৃষ্টির জলে পিছল খালের পাড় থেকে বেহুঁশ তন্ময় গড়িয়ে পড়েছিল নীচে । পাথরে আঘাত লেগে মাথায় প্রচণ্ড চোট পায়,গোটা শরীরটা থেঁতলে যায় ।ব্লকের স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে পরদিন কলকাতার বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় ; মাথায় জরুরী অপারেশন হয়, তিনদিন অজ্ঞান অবস্থায় যমে মানুষে টানাটানির পর জ্ঞান ফেরে তন্ময়ের । হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে দু-সপ্তাহ পর বাড়ী ফেরে তন্ময় । ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজের সমস্ত সঞ্চয় ছাড়াও ধার দেনায় মাথা বিকিয়ে যায় রমেনবাবুর ।পরীক্ষা আর দেওয়া হয় নি সে বছর তন্ময়ের । থানার বড়বাবুর জানান, সেদিন রাতে ওদের আখড়ায় কাউকে না পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে সাগরেদ সহ ল্যাঙড়া রতনকে গ্রেপ্তার করেন ; এমনিতেই ল্যাঙড়া রতন নিজের ছোঁড়া অ্যাসিডে নিজে জ্বলে পুড়ে একশা, তার উপর থানার চার্জ, কথা বলার অবস্থায় নেই ; বাঁ দিকের গোটা ঘাড়টা গাল কপাল চোখের উপরদিকটা অ্যাসিডে পুড়ে দগদগে ঘা নিয়ে যন্ত্রণায় ছটপট করছে তখন ; না পারে কোন অভিযোগ জানাতে না পায় কোন সরকারী সাহায্য ; স্থানীয় গডফাদার সমালোচনার ভয়ে হাত গুটিয়ে নেয় । তার উপর পুলিশ কেস ; নির্মল ঘোষাল বেশ ভাল ভাবেই ঘুটি সাজান, আঁটসাঁট করে চার্জশীট জমা দেন কোর্টে । হাসপাতাল থেকে বীভৎস ভূতের মত চেহারা নিয়ে ফিরে জেলের ঘানি টানে চার বছর, সাগরেদটারও দু বছর সশ্রম কারাদণ্ড সঙ্গে জরিমানা হয় ।

ঘটনাটার পর কিছুদিন চুপচাপ ছিল , ভাই সুস্থ হওয়ার পর জেদ চেপে বসে তনুকার ; দুষ্কৃতির ঐ আড্ডাটা ভাঙতেই হবে ; সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ও.সি. নির্মল ঘোষাল ; আজ আর ভাঙা মন্দির বেলগাছ-আগাছার জঙ্গলের কোন চিহ্ন নেই সাঁকোর গোঁড়ায় ।এখন ওখানে একটা এন.জি.ও.-র অফিস ঘর ।একটা ক্যারাটে সেন্টারও চলে । আশেপাশের অনেকগুলো গ্রাম থেকে ছেলেমেয়ে ওখানে মার্শাল আর্ট শেখে । দিঘীর পাড় থেকে এদিকে আসার রাস্তার ধারে অনেকগুলো বাড়ীও হয়েছে, সাঁকোটা এখন পাকা ব্রিজ হয়েছে, বড় বড় আলোকস্তম্ভে মার্কারি আলোর বন্যা, আশে পাশে কয়েকটা চা-দোকান সেলুন গুমটি মোবাইল রিচার্জের দোকান ছাড়াও কয়েকটা খাবারের দোকানও হয়েছে, দোকানগুলোয় গান বাজে, খোলা থাকে অনেক রাত অবধি । এককথায় সারা দিন রাত বেশ জমজমাট সাঁকোটার এধারওধার ।ও.সি. নির্মল ঘোষালের অনুপ্রেরণায় তনুকাই উদ্যোগ নেয় সবকিছুর ; তনুকা এখন অনেকের অনুপ্রেরণা ; গ্রামের ক্লাবটার কয়েকটা ছেলে দু-একজন সাহসী মেয়ে তনুকার সঙ্গে হাত মেলায় ; সামনে ভোট ; এমন সাহসী মেয়েকে সাহায্য করতে পারলে আখেরে লাভ, তাই এম.এল.এ. সাহেবও এগিয়ে আসেন ; প্রথমে বড়বাবুর সহায়তায় মন্দিরের সংলগ্ন ভাঙা ঘরগুলো সাফ করিয়ে মার্শাল আর্ট-এর আখড়া খোলেন ;কলকাতা থেকে ট্রেনার আনা হয় ; স্থানীয় ক্লাবের ছেলেরাও এগিয়ে আসে, উঠতি ছেলেমেয়েরা ক্যারাটে সেন্টারে ভর্তি হতে থাকে, তন্ময়ও দেখাশোনা করে, পড়ার ফাঁকে সাধ্যমত সাহায্য করে দিদিকে । এলাকার পিছিয়ে পড়া অভাবী ঘরের বৌ-ঝিদের নিয়ে একটা স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তোলে তনুকা । সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করে দেন এম.এল.এ. সাহেব ; তনুকা নিজে দলবল নিয়ে বাড়ী বাড়ী গিয়ে বোঝায় মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখার প্রয়োজনীয়তা, মেয়েদের আত্মনির্ভর হওয়া, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর গুরুত্ব বোঝাতে থাকে ।ও.সি. নির্মল ঘোষাল এর সহযোগিতায় স্থানীয় সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে ছোট ছোট লোন –এর ব্যবস্থা হয় ।গ্রুপের সকলকে আচার তৈরী করা, টেডিবিয়ার তৈরী করা শেখানো হতে থাকে, কয়েকটা সেলাইমেশিন বসিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয় ; এছাড়াও নানা নানান হাতের কাজ শিখিয়ে রোজগারের করার ব্যবস্থা করা হয় ; টাকা রোজগারের নেশায় পেয়ে বসে ক্রমশ: সকলকে । বড়বাবুর পরামর্শে তনুকা নিজেও মার্শাল আর্ট শিখতে থাকে সঙ্গে দৌড়ানো আর শরীর চর্চা চালিয়ে যায় । এখন তনুকাই গোটা ব্যবস্থাটা পরিচালনা করে । গোটা গ্রামের কাছে একটা সাহসী উদ্যোগী লড়াকু মেয়ে হিসাবে সকলের মধ্যমণি হয়ে ওঠে । মাঝে মাঝেই পুলিশ লাইনে চাকরীর পরীক্ষায় বসতে থাকে, দৌড়ের পরীক্ষা দিতে থাকে ; হতাশ না হয়ে নিজেকে তৈরী করতে থাকে প্রচন্ড জেদ নিয়ে ।

আজ এত বছর পর পুলিশ ব্যারাকে বসে সহকর্মী বান্ধবীর সাথে আলাপচারিতায় মনের জমানো কথাগুলো বলতে পেরে অনেক হালকা বোধ করে তনুকা ; পুরানো দিনের সব ঘটনা ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে ফিরে আসে মনের ক্যানভাসে ; বাবা অবসর নিয়েছেন ।তনুকাই এখন সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে ; বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান সে ; ওঁরা তো মেয়ে বলে আলাদা করে দেখেননি কখনো তাকে ; সমান গুরুত্ব দিয়ে মানুষ করেছেন । তার জেদ ছিল সে চাকরী করবে, ছেলেদের মত সংসারের দায়িত্ব নেবে ; লড়াই করেছে ফলও পেয়েছে হাতে হাতে ; তনুকা পুলিশের চাকরী নিয়ে চলে আসার পর তন্ময়ই সামলায় তনুকার ফেলে আসা কাজগুলো । সময় অনেকটাই পার হয়ে গেছে ; একটা একটা করে অনেকগুলো রঙিন বসন্ত পার হয়ে গেছে তনুকার জীবনে ; মায়ের শত অনুরোধেও বিয়ের পিড়িতে বসে নি সে, শুধু নিজের কথা ভাবতে পারেনি তনুকা ; কলেজ জীবনে সৌম্যের কথা মনে পড়ে ; ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল একসময় ; কথা দিয়েছিল পরস্পরকে অপেক্ষা করার ; এখনও কি সম্ভব নতুন করে শুরু করার নতুন একটা অধ্যায় । ব্যারাকের খাটে শুয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে পাড়ি দেয় তনুকা । একটা নির্মল প্রশান্তি ছড়িয়ে রয়েছে ঘুমন্ত তনুকার সারা মুখে, যা মনে তৃপ্তি আনে, অন্যকে বাঁচতে শেখায়…বাঁচাতে শেখায় ।

জয়ন্ত কুমার সরকার | Jayanta Kumar Sarkar

Travel Story 2022 | আমার বেড়ানো | পণ্ডিচেরী | মহাবলীপূরম | তিরুপতিধাম | কন্যাকুমারী

Fathers Day History | পিতৃ দিবসের ইতিহাস ও বাঙালি আবেগ | 2023

Emblem of Ramakrishna Mission | রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতীকের অর্থ | নক্‌শা ও তাৎপর্য | 2023

Is it possible to remove tattoo | ট্যাটু রিমুভ কি সম্ভব? | 2023

সন্ধ্যে নামার আগে কবিতা | ঠিক সন্ধ্যে নামার আগে | সন্ধ্যে নামার আগে মুভি | সন্ধ্যে নামার আগে লিরিক্স | সন্ধ্যে নামার আগে গান | শব্দদ্বীপের লেখক | শব্দদ্বীপ | সেরা বাংলা গল্প | গল্প ও গল্পকার | সেরা সাহিত্যিক | সেরা গল্পকার ২০২২ | বাংলা বিশ্ব গল্প | বাংলা গল্প ২০২২ | সন্ধ্যে নামার আগে গল্প ২০২২

Shondhye Namar Aagey Lyrics | bengali story | bengali story books for child pdf | bengali story books for adults | bengali story books | bengali story books for child | bengali story books pdf | bengali story for kids | bengali story reading | short bengali story pdf | short bengali story analysis | short bengali story characteristics | short bengali story competition | short bengali story definition | short bengali story english | short bengali story for kids | short bengali story generator | short bengali story ideas | short bengali story length | long bengali story short | long bengali story short meaning | long bengali story | long bengali story instagram | bengali story writing competition | bengali story writing competition topics | bengali story writing competition for students | story writing competition malayalam | bengali story writing competition india | bengali story competition | poetry competition | bengali story australia 2022 | bengali story competitions uk | bengali story competitions for students | bengali story competitions ireland | bengali story crossword | writing competition bengali story | writing competition malaysia | writing competition london | writing competition hong kong | writing competition game | writing competition essay | bengali story competition australia | writing competition prizes | writing competition for students | writing competition 2022 | writing competitions nz | writing competitions ireland | writing competitions in africa 2022 | writing competitions for high school students | bengali story for teens | writing competitions australia 2022 | bengali story competitions 2023 | writing competitions uk | bengali article writing | bangla news article | bangla article rewriter | article writing | bengali story writing ai | bengali story writing app | bengali story writing book | bengali story writing bot | bengali story writing description | bengali story writing example | article writing examples for students | bengali story writing for class 8 | bengali story for class 9 | bengali story writing format | bengali story writing gcse | bengali story writing generator | article writing global warming | bengali story writing igcse | article writing in english | article writing jobs | article writing jobs for students | article writing jobs work from home | bengali story writing lesson plan | bengali story writing on child labour | bengali story writing on global warming | bengali story writing pdf | bengali story writing practice | bengali story writing topics | trending topics for article writing 2022 | what is bengali story writing | bengali story trends 2022 | content writing topics 2022 | Bangla Prabandha | Probondho | Definite Article | Article Writer | Shabdodweep bengali story | Long Article | Bangla kobita | Kabitaguccha 2022 | Galpoguccha | Galpo | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Shabdodweep Writer | Shabdodweep | Shabdodweep Founder

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *