Best Bangla Galper Diary | Shabdodweep Bengali Story

Sharing Is Caring:

সেই তারা – ভুবনেশ্বর মন্ডল

প্রিয়ব্রত তখন সবেমাত্র ফিজিক্সে এমএসসি ও বি এড পাস করেছে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। এখন একটা চাকরির সন্ধান করছে। কারণ নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। বাবা একজন প্রান্তিক চাষী। অনেক কষ্ট করে পড়াশুনার খরচ জুগিয়েছেন। ওর ইচ্ছে ছিল পিএইচডি করার। কিন্তু সম্ভব হয়নি অনেক সময় চলে যাবে বলে। পিএইচডি করতে কম করে ৫-৬ বছর সময় লাগতো। এতটা সময় ব্যয় করার মত পরিস্থিতি তার ছিল না। তাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির দিকে না গিয়ে সে স্কুলশিক্ষকের চাকরির দিকে ঝুঁকেছিল। তখন অবশ্য স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হয়নি। ম্যানেজিং কমিটির আন্ডারে স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ হতো। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যে স্বচ্ছ ছিল তা বলা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজিং কমিটি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করতেন। সে অর্থ দেওয়ার মতো ক্ষমতা সকলের থাকতো না। মুষ্টিমেয় দু চারজন তা দিতে পারতেন। এভাবে অর্থের বিনিময়ে তারা অনেকেই চাকরি পেতেন। মেধার চেয়ে অর্থকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো বেশি। অনেক সময় আবার স্কুলের সেক্রেটারি প্রেসিডেন্ট হেডমাস্টার মশাই ইত্যাদি গণ্যমান্যদের কোন একজনের মেয়েকে বিয়ের বিনিময়েও অনেকেই চাকরি লাভ করতেন। টাকা দিয়ে চাকরি কিনে নেওয়ার মতো পুঁজি বা মানসিকতা কোনটাই ছিল না প্রিয়ব্রতর। তাতে জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন সে লড়ে যাবে। প্রয়োজনে টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করবে। এদিকে সুমনাও চাপ দিচ্ছে একটা চাকরি যোগাড় করার জন্য। সুমনা প্রিয়ব্রতর প্রেমিকা। তবে ওর সাবজেক্ট ফিজিক্স নয় হিস্ট্রি। দুজনে একই ইয়ারে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় পড়তো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ফাংশনে ওদের আলাপ। তারপর ক্রমে ঘনিষ্ঠতা। গোলাপবাগের পার্ক, কৃষ্ণসায়র,রেলস্টেশন, আশপাশের আরও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে ওদের প্রেমের স্মৃতি। ওরা বোঝাপড়ায়, মানসিকতায় পরস্পরের পরিপূরক। সুমনার বাবা একজন বড় সরকারি অফিসার। সুমনা তার একমাত্র মেয়ে। বড় সরকারি চাকুরে বা প্রতিষ্ঠিত পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে চান। ইতিমধ্যে একজন কলেজ অধ্যাপক পাত্রের সঙ্গে সুমনার বিয়ের ব্যাপারে এক প্রস্থ আলোচনা চালিয়েছেন। সুমনাকে ওনাদের পছন্দ। বিয়ে দিতেও রাজি। কিন্তু সুমনা না করে দিয়েছে। যেহেতু প্রিয়ব্রত এখনও কোন চাকরি পায়নি তাই ওদের সম্পর্কের ব্যাপারটা বাবা-মাকে জানাতে পারেনি সুমনা। জানালে নানা রকম বাধা-বিপত্তি আসবে। তাই ও এখন এমফিল করে দুটো বছর কাটিয়ে দিতে চায়। এই দু বছরে প্রিয়ব্রত নিশ্চয়ই একটা চাকরি যোগাড় করে নেবে। শুধু প্রিয়ব্রত নয়, সুমনা নিজেও একটা চাকরি যোগাড়ের চেষ্টা করবে। প্রিয়ব্রতর চাকরি হয়ে গেলে তখন ব্যাপারটা বাড়িতে জানাবে। তখন হয়তো ওর বাবা-মা আর না করতে পারবেন না।

প্রিয়ব্রত এখন বর্ধমানে একটা মেসে থাকে। অনার্স, এমএসসির বেশ কয়েকটা স্টুডেন্টকে টিউশনি পড়ায়। তাতে যা রোজগার হয় ওতে ওর মেস খরচ ও অন্যান্য খরচ চলে যায়। উদ্বৃত্ত কিছু অর্থ অবশ্য থাকে সেটা বাড়িতে বাবাকে পাঠায়। বিভিন্ন রকম কম্পিটিটিভ পরীক্ষার জন্য মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন রকম গাইড বই কিনে পড়াশোনা করছে। একটার পর একটা চাকরির পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। এমপ্লয়মেন্ট নিউজ, কর্মক্ষেত্র, কর্মসংস্থান, জীবিকা সন্ধান এরকম বহু পত্রপত্রিকা কেনে। সেখানে যে সমস্ত চাকরির বিজ্ঞাপন বেরোয় সেগুলো দেখে আবেদন করে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সাফল্য এখনও আসেনি। তবে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাত জেগে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে। হঠাৎই একদিন ওর এমপ্লয়মেন্ট নিউজ এর চতুর্থ পাতায় চোখ আটকে গেল। ওখানে একটা বিজ্ঞাপন ছিল। বিহারের পাটনা শহরে একটি প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে একজন ফিজিক্স টিচার নেওয়ার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। যোগ্যতা এমএসসি, বিএড। ওরা যে স্যালারি উল্লেখ করেছেন তা খুব একটা খারাপ নয়। যতদিন না অন্য কোন চাকরি পাওয়া যাচ্ছে ততদিন ওই বেসরকারি স্কুলে কাজ করা যেতেই পারে। পড়ানোর একটা অভিজ্ঞতা হবে, সেই সঙ্গে আর্থিক সুরাহাও হবে। তাই বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করে ফেলল ওই স্কুলের জন্য। রেজিস্টারড ডাকে আবেদনপত্র পাঠিয়েও দিল। দিন দশেক পরে ওই স্কুল থেকে এল ইন্টারভিউ এর চিঠি। যেদিন ইন্টারভিউ তার আগের দিন রাতে ট্রেনে রওনা দিল পাটনার উদ্দেশ্যে। পাটনা পৌঁছালো সকাল আটটা নাগাদ। রেলস্টেশনে নেমে আশপাশের দোকানে স্কুলের খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে স্কুলটা স্টেশন থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যেতে হবে রিকশ্ করে।

হালকা টিফিন করে নিল একটা দোকানে। তারপর বেরিয়ে পড়ল রিকশা চেপে স্কুলের উদ্দেশ্যে। সকাল ন’টা নাগাদ পৌঁছালো স্কুলে। তখনও স্কুল খোলেনি। বাইরের গেটে তালা লাগানো। কিছুক্ষণ পরে দেখা হল স্কুলের নাইট গার্ডের সঙ্গে। সে জানালো স্কুল খুলবে সাড়ে দশটায়। সময়টা ছিল এপ্রিল মাসের শেষ দিক। গরম যথেষ্ট পড়েছিল। পাশেই ছিল একটা বড় বটগাছ। তার ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নিল প্রিয়ব্রত। গাছের ছায়ায় বসে নিজের সাবজেক্ট বিষয়ে একটু পড়াশোনা করতে লাগলো। ইতিমধ্যে আরো কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী উপস্থিত হলেন। তাঁরাও বটগাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন। ওদের সঙ্গে প্রিয়ব্রতর আলাপ হল। ওদের সকলেরই বাড়ি বিহারের বিভিন্ন জায়গায়। পশ্চিমবাংলা থেকে একমাত্র প্রিয়ব্রতই এসেছে ইন্টারভিউ দিতে। সাড়ে দশটা নাগাদ স্কুলের গেট খুলে দিল। চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ১৮ জন। প্রায় সকলেই হাজির। ওরা সকলে গিয়ে স্কুলের একটা হল ঘরে উপস্থিত হলো। ওখানেই সকলকে বসতে দেওয়া হল। এগারোটা নাগাদ ইন্টারভিউ বোর্ডের এক্সপার্ট গণ এলেন। ঠিক বারোটার সময় ডাক পড়ল প্রথম জনের। ইন্টারভিউয়ের জন্য বরাদ্দ সময় কুড়ি মিনিট। দশ মিনিট ভাইভা এবং দশ মিনিট ক্লাস টিচিং। প্রিয়ব্রতর নাম ছিল এক্কেবারে শেষে। ওকে একটা চাপা টেনশন ও উদ্বেগ নিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতে হলো হলঘরে। সবশেষে ডাক পড়ল। ইন্টারভিউ ভালোই হলো। প্রায় সব প্রশ্নেরই সন্তোষজনক উত্তর সে দিতে পেরেছিল। ক্লাস টিচিং ও ভালো হয়েছিল। মনে একটা উৎসাহ, শক্তি ও তৃপ্তি এল। ইন্টারভিউ দিয়ে যখন বেরিয়ে এলো তখন প্রায় সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে। স্কুল থেকে রেলস্টেশন ছয় কিলোমিটার দূরে । কিন্তু রাতের দিকে বাড়ি ফেরার কোন ট্রেন সেদিন ছিল না। বিশেষ কারণ বশতঃ রাত বারোটার দিকে যে ট্রেনটা ছিল সেটা প্রায় ৮ ঘন্টা লেটে চলছিল। অর্থাৎ পরদিন সকাল আটটায় ট্রেনটা পাওয়া যাবে। তাই রাতটা কোন একটা হোটেলেই প্রিয়ব্রতকে কাটাতে হবে। আশেপাশে সেরকম কোন হোটেল পাওয়া গেল না। এক দোকানদার বললেন দু কিলোমিটার পথ গেলে হোটেল পাওয়া যাবে । সন্ধ্যার দিকে এ অঞ্চলে লোকজনের ভিড় থাকে না । তাই রিকশওয়ালাদেরও এ সময় এ দিকে দেখা যায় না। অগত্যা প্রিয়ব্রতকে হেঁটেই যেতে হলো প্রায় দু কিলোমিটার পথ। লো ভোল্টেজের জন্য রাস্তার লাইট গুলো টিমটিম করে জ্বলছিল। ভালোভাবে পথ দেখা যাচ্ছিল না। আলো অন্ধকারে দু’একবার হোঁচট খেয়ে টলতে টলতে এসে পৌঁছলো একটা চৌমাথার মোড়ে। কয়েকটা ছোটখাট দোকানপাট সেখানে রয়েছে। আর রয়েছে দু একটা হোটেল। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লান্ত প্রিয়ব্রত একটা হোটেলের দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পরে একজন লোক এলো। প্রিয়ব্রত বললো -” দাদা আজকে রাতটা থাকার মত একটা রুম হবে?”লোকটা বলল দেখি খাতাটা চেক করে। খাতা চেক করে দেখে বলল হ্যাঁ, দু তলায় একটা সিঙ্গেল রুম খালি আছে। তবে অ্যাটাচ বাথ নেই। কমন বাথরুম ব্যবহার করতে হবে। প্রিয়ব্রত যেন হালে পানি পেল। যে কোন একটা রুম হলেই ওর চলবে। নইলে এই অজানা জায়গায় এই রাত্রিবেলায় সে কোথায় কাটাবে? কোনরকমে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই যথেষ্ট। হোটেলের ভাড়াও খুব একটা বেশি নয় বলা যেতে পারে কমই। মাত্র ১০০ টাকা।

হোটেলের একটা ছেলে ওকে রুমে নিয়ে গেল। একটা চাবি দিল। সারাদিনের ঘামে ভেজা জামাপ্যান্ট চেঞ্জ করল প্রিয়ব্রত। তারপর বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিল। এখন খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু এ হোটেলে খাবার কোন ব্যবস্থা নেই। কেবলমাত্র থাকা যায়। রুমে তালা দিয়ে নিচে এল। একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চা বিস্কুট খেলো। অন্য কোন খাবার পাওয়া গেল না। আবার রুমে ফিরে এলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই দুচোখে নেমে এলো ঘুমের আবেশ। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানেনা। ঘুম যখন ভাঙলো তখন রাত প্রায় এগারোটা। সেই চা বিস্কুট খেয়ে আছে। পেটে খিদের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। একটু ভাত বা রুটি খাওয়া দরকার। তাড়াতাড়ি হোটেল থেকে বেরিয়ে এলো। কিন্তু ততক্ষণে বেশিরভাগ হোটেলই বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই ঝাঁপ নামিয়ে দিয়েছে। আলো-আঁধারি রাস্তায় একাই হেঁটে চলল হোটেলের খোঁজে। যেখানেই যায় হতাশ হতে হয়। সকলেই জানায় হোটেলে কোন খাবার নেই। এত রাতে আর কোন হোটেলই খাবার পাওয়া যাবে না। তখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা বেজে গেছে। শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত প্রিয়ব্রত ভাড়া নেওয়া হোটেলের দিকে পা বাড়ালো।

আলো আঁধারী রাস্তায় হেঁটে চলেছে প্রিয়ব্রত। শরীরে শক্তি নেই বড় ক্লান্তি বোধ হচ্ছে। হঠাৎই সামনে থেকে কালো জন্তুর মতো একটা গাড়ি এগিয়ে আসতে লাগলো ওর দিকে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ধাঁধিয়ে গেল প্রিয়ব্রতর দুচোখ। কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছেনা । গাড়িটা এখন ওর কাছাকাছি এসে গেছে। গাড়ির ড্রাইভার ব্রেক কষে সামনে দাঁড় করালো গাড়িটা। প্রিয়ব্রত হতভম্ব ও ভীতসন্ত্রস্ত। এত রাতে এরকম নির্জন এলাকায় এরকম একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন সে হবে জীবনে ভাবেনি। টর্চ লাইট জ্বেলে গাড়ি থেকে পাঁচজন পুলিশ নেমে এলেন। ওদের টর্চের আলো পড়ল প্রিয়ব্রতর মুখে। পাঁচজন পুলিশের মধ্যে একজন ছিলেন ইন্সপেক্টর। কাঁধের নিচে তারকা চিহ্ন। এরা সকলেই বিহারের পুলিশ। রাতের বেলা রাস্তায় পেট্রোলিঙ করছেন। পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রিয়ব্রতকে হিন্দিতে জেরা শুরু করলেন । তার নাম, ঠিকানা এত রাতে কোথায় গিয়েছিল, এখন কোথায় যাচ্ছে, এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করলেন। প্রিয়ব্রত একটু ভয় পেয়ে কাঁপছিল। তবুও প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যথাযথ দিল। ওর আধার কার্ড ,ভোটার কার্ড, ইন্টারভিউ লেটার সব কাছেই ছিল, দেখালো পুলিশ ইন্সপেক্টরকে। ইন্সপেক্টর ওর পরিচয় পত্র দেখে এবং কথাবার্তা শুনে বুঝলেন লোকটি কোন ক্রিমিন্যাল নয়, কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়েও এখানে আসেনি।ও যে হোটেলে হোটেলে খাবার খুঁজে হয়রান হয়ে অভুক্ত অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে এটা অনুভব করলেন।

ইন্সপেক্টর প্রিয়ব্রতকে সাবধান করে বললেন -তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে যাও। এত রাতে রাস্তায় ঘোরাফেরা করা ঠিক নয়। পথে-ঘাটে নানা বিপদ আছে। যেকোনো সময় কিছু ঘটে যেতে পারে। এত রাতে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে বেরোনো তার উচিত হয়নি। প্রিয়ব্রত আর কোন কথা না বলে ইন্সপেক্টরকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিল। আবছা অন্ধকারে ক্লান্ত শরীরটাকে কোনক্রমে টেনে নিয়ে চলল হোটেলের দিকে। পিঠব্যাগে একটা জলের বোতল ছিল। তা থেকে একটু জল পান করল। আর পিছন ফিরে না তাকিয়ে হোটেলের দিকে হাঁটতে থাকে। প্রায় ৩০ মিটার এগিয়ে যেতেই প্রিয়ব্রত শুনতে পেল একটা ডাক। কেউ হিন্দিতে বলছেন ” আরে ভাই, এদিকে এসো একবার।” প্রিয়ব্রত বুঝতে পেরেছে এ কন্ঠস্বর কার। এ ডাক ওই পুলিশ ইন্সপেক্টরের। সে একটু ভয় পেল। আরে ডাকছে কেন?আবার কি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হবে? না উনি এখনও কি সন্দেহ করছেন। মনে মনে ভগবানকে স্মরণ করছে সে। যেন কোন বিপদে পড়তে না হয়। ভয়ে ভয়ে পিছন ফিরে তাকালো। তারপর অন্ধকার চিরে এগিয়ে চলল পুলিশের গাড়িটার দিকে। কাছাকাছি আসতেই পুলিশ ইন্সপেক্টর তার পুলিশি আভিজাত্য ত্যাগ করে সহৃদয় কন্ঠে বললেন সারাদিন প্রিয়ব্রতর খুব ধকল গেছে। তার ওপর খাবার জোটেনি। এভাবেই অভুক্ত অবস্থায় ও রাত কাটাবে কি করে! খুব কষ্ট হবে! ইন্সপেক্টর ভদ্রলোক বললেন – “একটা হোটেলে খাবার আছে । তুমি যেতে পারবে? আমি খাবারের ব্যবস্থা করে দেব।” প্রিয়ব্রত অবাক।

এখানে যতগুলো হোটেল আছে, সব হোটেলেই সে খোঁজ করেছে। সকলেই জানিয়েছে কোন খাবার নেই। তাহলে খাবার কি করে পাওয়া যাবে? কিন্তু উনি যখন বলছেন তখন নিশ্চয়ই পাওয়া যেতে পারে। ইন্সপেক্টর ভদ্রলোক একজন কনস্টেবলকে বললেন “এই এক টুকরো কাগজ দাও তো।” কনস্টেবল ওর পকেট থেকে একটা সাদা কাগজ বের করে ইন্সপেক্টর হাতে দিলেন। ইন্সপেক্টর ওই কাগজে লিখে দিলেন হোটেলে যে খাবারটা আছে এই ছেলেটিকে দেবেন। ও অভুক্ত। কাগজের নিচে নিজের নাম স্বাক্ষর করে দিলেন। ঘটনাটা প্রিয়ব্রতর কাছে মনে হল যেন দৈব ঘটনা। এমন অপ্রত্যাশিত খাদ্যপ্রাপ্তি সে কল্পনাও করেনি। খিদেয় পেট জ্বলছে। ইন্সপেক্টর যে হোটেলটির ঠিকানা দিয়েছিলেন সেখানে গিয়ে প্রিয়ব্রত উপস্থিত হল। হোটেলে কোন কাস্টমার নেই। ম্যানেজার একটা সোফাতে বসে তন্দ্রায় ঢুলছেন। প্রিয়ব্রতর পায়ের শব্দে তার তন্দ্রা ভেঙে গেল। তিনি বললেন “আরে ভাই আবার এসেছেন! বললাম তো হোটেলে কোন খাবার নেই।”প্রিয়ব্রত কিছু না বলে ইন্সপেক্টর এর লেখা কাগজটা হোটেল ম্যানেজারের হাতে দিল। ম্যানেজার কাগজটা পড়ে তৎপর হয়ে উঠলেন এবং -” বললেন বসুন বসুন। খাবার হয়ে যাবে। এক্ষুনি দিয়ে দিচ্ছি।” প্রিয়ব্রত একটা চেয়ারে বসলো। তিন মিনিটের মধ্যেই খাবার চলে এলো টেবিলে। একেবারে রাজকীয় খাবার। রুটি,ডাল, সবজি, মাটন, আলুভাজা, চাটনি, পাঁপড়। এতটা সে স্বপ্নেও আশা করেনি। খেতে খেতে প্রিয়ব্রত ম্যানেজারকে বললো -“আচ্ছা দাদা, কিছুক্ষণ আগে আপনিই তো বলেছিলেন কোন খাবার নেই। অথচ ফ্রিজ থেকে বের করে আমাকে খাবার দিলেন। এটাতো প্রথমে দিলেই পারতেন। অকারণে আমাকে এতটা কষ্ট দিলেন!” হোটেল ম্যানেজার বললেন -” আরে ভাই, এই খাবারটা কার জানেন? যিনি চিঠি লিখে আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন, এটা ওনারই খাবার।

রাত সাড়ে বারোটার দিকে এসে উনি এই খাবারটা খান। হোটেল বন্ধ হয়ে গেলেও ওনার খাবারটা আমি ফ্রিজে রেখে দিই। তারপর উনি এলে সেটা ওনাকে সার্ভ করে দিই।” প্রিয়ব্রত হতবাক হয়ে বলল – “তাহলে আজকে রাতে উনি কি খাবেন? ওনার খাবার তো আমি খেয়ে ফেললাম।” ম্যানেজার ভদ্রলোক বললেন – “তা বলতে পারবো না। উনি যেহেতু বলেছেন তাই ওনার খাবারটা আপনাকে দিলাম।” কথাটা শুনে আমার চোখে জল এলো। বাংলা থেকে দূরে এই অজানা, অচেনা, স্বজনহীন জায়গায় এমন অপ্রত্যাশিত মানবতার স্পর্শে আমার আমার হৃদয় ভরে উঠলো। উনি তো আমার কেউ নন, একজন নামিদামী পুলিশ ইন্সপেক্টর। পুলিশকে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। ওনাদের থেকে দূরত্ব রাখে।অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা পুলিশেরা নির্মম ও নিষ্ঠুর হন। তাদের জীবনে মানবিকতার প্রকাশ কমই দেখা যায়। কিন্তু প্রিয়ব্রত আজ একি দেখল ও অনুভব করল! ওই পুলিশ ইন্সপেক্টরকে ওর মনে হলো দেবতা। মানুষের কঠিন বর্মের আড়ালে যে কোমল হৃদয় ও মানবিকতার নির্ঝর লুকিয়ে থাকে এই ঘটনা না ঘটলে হয়তো প্রিয়ব্রত অনুভব করতে পারত না। কি দরকার ছিল ওই ভদ্রলোকের এই মহানুভবতা দেখানোর! নিজের মুখের খাবার তুলে দিলেন এক অভুক্তের মুখে। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এলো ওই মানুষটার কাছে। উনি আজ রাতে কী খাবেন এই চিন্তা পীড়িত করছিল প্রিয়ব্রতকে। কোন হোটেলে তো আর খাবার পাবেন না। তাহলে উনি কি অভুক্ত থাকবেন সারারাত। নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হল প্রিয়ব্রতর। কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল হৃদয়। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হোটেলের বিল মিটিয়ে বেরিয়ে পড়ল হোটেলের দিকে। যে পথ ধরে এসেছিল সে পথেই চলেছে এখন। কিন্তু পুলিশের সেই গাড়ি বা পুলিশ ইন্সপেক্টর কাউকেই আর রাস্তায় দেখতে পেল না। ভেবেছিল যদি দেখা হয় ওনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবে, প্রণাম জানাবে। কিন্তু সে সুযোগ পাওয়া গেল না। ওনারা এখন অন্যত্র চলে গেছেন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় হোটেলে এসে পৌঁছল। হোটেলের ম্যানেজার তখনও জেগে ছিলেন। বললেন কি দাদা খাবার পাওয়া গেল? প্রিয়ব্রত মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো। তারপর রুমে এসে শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অবসন্ন ক্লান্ত শরীরটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হল। এক মহাতৃপ্তির ঘুমে যখন সকাল হলো তখন দেখল জানলা দিয়ে সকালের সূর্যের আলো ঘরে ঢুকছে। দু একটা পাখি কিচিরমিচির ডাকছে। সকাল ন’ টায় ফেরার ট্রেন। আটটার সময় হোটেলের বিল মিটিয়ে চেক আউট করে প্রিয়ব্রত বেরিয়ে পড়ল স্টেশনের দিকে। সারাটা রাস্তা মনে পড়তে লাগলো গত রাতের ঘটনাটা। মনে মনে ভাবছিল ওই ইন্সপেক্টরের নাম,ঠিকানা ও ফোন নাম্বার যদি পাওয়া যেত তাহলে খুব ভালো হতো। কিন্তু এত তাড়াতাড়ির মধ্যে ওই রাতে ওনার নামটাও জিজ্ঞাসা করা হয়নি, এখন তাঁকে দেখলে আর হয়তো চিনতেও পারবেনা প্রিয়ব্রত । কারণ অন্ধকারে ওনার মুখটাও ভালোভাবে দেখা হয়নি। অন্ধকার আকাশে এক ঝলক বিদ্যুতের মত দেখা দিয়ে এই বিরাট পৃথিবীতে উনি যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন! তারপর ট্রেন ধরে প্রিয়ব্রত বর্ধমানে তার মেসে ফিরলো। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে ওই পুলিশ ইন্সপেক্টরের স্মৃতিটা। ভেবেছিল যদি ওখানে চাকরিটা পায় তাহলে ওনার সঙ্গে গিয়ে একবার দেখা করবে ভালো করে আলাপ করবে।দেখতে দেখতে সপ্তাহ তিনেক পেরিয়ে গেল। কিন্তু ওই প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে কোন নিয়োগপত্র এল না। পরে জানা গেল বিহারের কোন একজন ক্যান্ডিডেট সেখানে নিযুক্ত হয়েছেন। খবরটা পেয়ে মনে মনে একটু মুষড়ে পড়েছিল প্রিয়ব্রত। পড়াটাই স্বাভাবিক। ওর একটা চাকরি ভীষণ দরকার। ইতিমধ্যে স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু হয়ে গেছে। শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপনও প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়ব্রত আবেদনপত্র ডাকযোগে রিজিওন্যাল অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। মাস খানেকের মধ্যে পরীক্ষায় বসার এডমিট কার্ড এল। তারপর একদিন পরীক্ষাও হয়ে গেল। মাস তিনেকের মধ্যে ফলাফলও প্রকাশিত হলো। প্রিয়ব্রত কোয়ালিফাই করেছিল। এরপর ইন্টারভিউ । তাতে ভালো র‍্যাঙ্কও হলো। একদিন ডাকযোগে মেসের ঠিকানায় এলো রেকমেন্ডেশন লেটার। বর্ধমানের নিকটবর্তী একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে ফিজিক্সের টিচার হিসেবে জয়েন করলো। প্রিয়ব্রতর স্বপ্ন এখন পূরণ হয়েছে। চাকরি পাওয়ার বছর খানেকের মধ্যেই ওর বিয়েও হয়েছে সুমনার সঙ্গে। এখন ওদের সুখী দাম্পত্য জীবন। সুমনাও বছর দুয়েক পরে একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। ওরা ব্যাংকে লোন নিয়ে বর্ধমানে একটা 3 BHK ফ্ল্যাট কিনেছে। প্রিয়ব্রত এখন তার বাবা ও মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছে নিজের কাছে বর্ধমানের ফ্ল্যাটে।

প্রিয়ব্রতর স্কুলের চাকরি প্রায় বছর দশেক হয়ে গেল। কোএড স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ দিয়ে দায়িত্ব সহকারে পড়ায়। ওর জীবনে এখন পার্থিব কোন অভাব নেই। শান্তিপূর্ণ সংসার। তবুও মাঝে মাঝে ওর মনে হয় কোথাও যেন একটা অতৃপ্তি রয়েছে।জীবনে বিশেষ একটা কিছুর অভাব আছে। তবে সেটা যে কি ও বুঝতে পারে না। রাতের বেলা ব্যালকনিতে বসে যখন তারায় ভরা আকাশ দেখে তখন মনে হয় এই মহাকাশের তুলনায় সে কত ছোট! এই যে সংসার জীবন তাও তো একটা ছোট্ট বৃত্ত। খাওয়া, পরা, বংশবিস্তার করা এর বাইরে জীবনে কি আর কিছুই নেই ? অসীম অনন্ত সত্ত্বার সঙ্গে নিজেকে কি যুক্ত করা যায় না ? রবীন্দ্রনাথের গান যখন মন দিয়ে শোনে তখন অসীম এসে ওর বুকে খেলা করে। ইচ্ছে করে খাঁচার পাখি নয়, বনের পাখি হতে। মাঝে মাঝে ওর মনে হয় এ জীবনের উদ্দেশ্য কি? কি জন্য এসেছে এই পৃথিবীতে? জীবন তো একটা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ,শূন্যতার গান। কবর কিংবা চিতার আগুন তার অন্তিম পরিণতি।

এর জন্য এত কিছু, এত আয়োজন! সবই কি তবে অসার? কোথাও কোন সার বস্তু নেই? জীবনের আনন্দগুলো, তৃপ্তিগুলো কেন চিরস্থায়ী হতে পারে না?

মনে মনে এসব ভাবে প্রিয়ব্রত। আর সন্ধান করতে থাকে চিরস্থায়ী কোন সারবস্তুর, যা নশ্বর হয়েও অবিনশ্বর হতে পারে। প্রিয়ব্রত একদিন সন্ধেবেলা বেডরুমে বসে রোমন্থন করছিল ওর অতীত জীবনের নানা স্মৃতি। শৈশব, কৈশোর, স্কুলজীবন, কলেজজীবন, ইউনিভার্সিটিজীবন, সোমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার নানা মুহূর্ত, চাকরির জন্য মরণপণ লড়াই ইত্যাদি প্রসঙ্গ। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মনে পড়ে গেল বিহারের পাটনা শহরে প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ইন্টারভিউ দেওয়ার কথা। আর সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিতে শুকতারার মতো জ্বলজ্বল করে উঠলেন সেই দেবতুল্য পুলিশ ইন্সপেক্টর। তাঁর কথা অনেকদিন প্রিয়ব্রত ভুলেই গিয়েছিল। মাত্র একটা রাতের একটা বিশেষ মুহূর্তের ঘটনা। কিন্তু প্রিয়ব্রতর জীবনে তার আবির্ভাব দেবদূতের মত।ওই মানুষটির কৃতকর্মের ছাপ যে কত গভীর আজ এত বছর পরেও এই সন্ধ্যাবেলায় অনুভব করছে প্রিয়ব্রত।সে এই শহরের স্টেশন ,রাস্তাঘাট চত্বরে যখন ঘুরে বেড়ায় তখন দেখতে পায় কত অভুক্ত মানুষকে। কত লোক অভাবের তাড়নায় ভিক্ষা করছে, খাবার চাইছে, লোকের ফেলে দেওয়া এঁটো পাতা থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে। মানুষ আর পশুর জীবন যেন মিলেমিশে একাকার। এজন্যই হয়তো কবি সুকান্ত লিখেছিলেন -”ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।” অভুক্ত থাকার যন্ত্রণা একমাত্র ভুক্তভোগীই বোঝেন। আচ্ছা এ বিষয়ে প্রিয়ব্রতর কি কিছুই করার নেই? ওই পুলিশ ইন্সপেক্টর যে কাজটি করেছেন সে রকম কাজ সে কি করতে পারে না? দাঁড়াতে পারেনা অভুক্ত মানুষের পাশে? এ কাজ করতে গেলে অবশ্যই অর্থের দরকার। ভগবান কিছুটা অর্থ সামর্থ্য তো প্রিয়ব্রতকে দিয়েছেন। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করে। তাদের পাঁচ বছরের একটিমাত্র পুত্র সন্তান। দুজনে যা রোজগার করবে তাতে একটি সন্তান মানুষ করার পরও অনেক উদ্বৃত্ত থেকে যাবে। তার কিছুটা অংশ দিয়ে কি অভুক্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো যায়না ? নিশ্চয়ই যায়। সবটাই নির্ভর করে মানসিকতার উপর, জীবন দর্শনের উপর। প্রিয়ব্রত কলেজে পড়ার সময় দেখেছিল এক ভদ্রলোককে। অতি সাদামাটা সাধারণ ছাপোষা সরকারি অফিসের করণিক। মফ:স্বল শহরেরে রাস্তায় যে সব কুকুরেরা ঘুরে বেড়াত তাদেরকে তিনি রোজ খাবার দিতেন। সাইকেল চেপে খাবার নিয়ে হাজির হতেন রাস্তার কুকুরদের কাছে। তাদের ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিতেন, ব্যান্ডেজ করে দিতেন, এমনকি শহরের পুরনো পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা বাড়িতে তাদের থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন। ওনাকে দেখলেই রাস্তার কুকুরগুলো আত্মার আত্মীয় ভেবে পাগলের মতো ছুটে আসতো। দু একদিন নয় দীর্ঘদিন এই সেবাকাজ করে গেছেন উনি।ভদ্রলোককে দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো প্রিয়ব্রতর।মনে হতো এমন মানুষও পৃথিবীতে আছে ! পাটনার পুলিশ ইন্সপেক্টরের কথা এখন খুব মনে পড়ছে প্রিয়ব্রতর। একটা প্রদীপ যেমন আর একটা প্রদীপকে জ্বালিয়ে দেয় ঠিক তেমনি করে উনি যেন এই নিভৃত সন্ধ্যায় প্রেরণা দিচ্ছেন প্রিয়ব্রতকে অন্তরের প্রদীপটি জ্বালাতে।

প্রিয়ব্রত এই শহরের অভুক্ত দীনহীন রাস্তার মানুষদের জন্য কিছু একটা করার জন্য মনে মনে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। বড়সড়ো কিছু না হোক তার সাধ্যমত ছোটখাটো একটা প্রতিষ্ঠান সে গড়ে তুলবে। এ ব্যাপারে সুমনাকেও জানিয়েছিল। সুমনা অমত করেনি। তবে বলেছিল ব্যাপারটা অত্যন্ত কঠিন। খুব ধৈর্য চাই, নিষ্ঠা চাই,মনের জোর চাই, অদম্য উৎসাহ চাই, সেই সঙ্গে চাই অর্থ বল। এসব কাজ অনেকেই শুরু করেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত টানতে পারেন না। মাঝপথেই রণে ভঙ্গ দেন। তাই ভেবে চিন্তে কাজ করা উচিত। প্রিয়ব্রত বলেছিল দেখাই যাক না। আগে শুরু তো করি। বেশি নেগেটিভ ভাবলে কাজে এগোনো যাবে না। না মরে ভূত হয়ে কোন লাভ নেই। আমি জানি আর কাউকে না পাই তোমাকে পাশে পাব। সুমনা আর কিছু বলেনি একটু হেসেছিল। আর প্রিয়ব্রতর হাতটা শক্ত করে ধরেছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা ছেলে ও সুমনাকে নিয়ে প্রিয়ব্রত একটা পার্কে বেড়াতে গেল। সুন্দর পার্কটা দেখে ওর মন আনন্দে ভরে উঠলো। ছেলে সৌম্য ছুটে বেড়াচ্ছে। সুমনা ছেলেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে। আকাশে একটার পর একটা তারা ফুটে উঠছে। দেখতে দেখতে লক্ষ লক্ষ তারাতে ভরে উঠল রাতের আকাশ। প্রিয়ব্রতর মনে হল আকাশটা যেন তারার মালা পরেছে। আজকের মত নক্ষত্র খচিত এত সুন্দর আকাশ আগে সে কখনো দেখেনি। সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবতারা সবাই হাজির। ওদের চোখে মুখে কী উজ্জ্বলতা! ওই তারাগুলোর মাঝে হঠাৎই একটা তারায় চোখ আটকে গেল প্রিয়ব্রতর। মনে হল এ তারাটা যেন তার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। বড় কাছের। ও যেন হাতছানি দিয়ে বারবার ডাকছে প্রিয়ব্রতকে। হয়তো কিছু বলতে চায়। ওর বুকে অনেক কথা জমে আছে। সে গুলো শেয়ার করতে চাই প্রিয়ব্রতর সঙ্গে। প্রিয়ব্রত অপলকে তাকিয়ে আছে তারাটার দিকে,অপূর্ব মুগ্ধতা ও মায়া ভরা চোখে। মনে হল তারাটির গায়ে যেন মাটির সোঁদাগন্ধ। হয়তো কোন এক সময় ও এই পৃথিবীতেই ছিল। কিন্তু আজ দূরে অনেক দূরে! প্রিয়ব্রত এখন স্মৃতির আকাশে হারানো পুরনো পৃথিবীর সুগন্ধে স্নান করছে । আর আনমনে বিড়বিড় করে বলছে -”রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।” পাটনা শহরের কবেকার সেই রাতের আকাশের সেই তারাটা আজকের এই সন্ধ্যায় খেলা করছে ওর বুকের মধ্যে। গভীর তৃপ্তি ও প্রসন্নতার আলোয় অনন্ত এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রিয়ব্রতর মন।

দহন – ভুবনেশ্বর মন্ডল

আজ সকাল থেকেই বাড়িতে বিয়ের সানাই বাজছে। একতলা বাড়িটা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। লোকজনের আনাগোনা ও হইচই। সকলেই যে যার মত ব্যস্ত। অতিথি আপ্যায়ন করছে সমরেশ নিজে। তার ছেলে অরণির আজ বিয়ে। অরণি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। একটা নামকরা কোম্পানিতে লোভনীয় প্যাকেজে কাজ করে। যে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে সেও সরকারি চাকুরে। ভালোবাসার বিয়ে। পাত্র-পাত্রী দুপক্ষই খুশি মনে মেনে নিয়েছেন তাদের সম্পর্ক। তারই পরিণতিতে এই আনন্দঘন বিয়ের অনুষ্ঠান। কিন্তু সানাই এর সুরে কোথাও যেন মিশে রয়েছে একটা গভীর বিষাদ। সবই ঠিক আছে কিন্তু অলক্ষ্যে তাল কেটে যাচ্ছে। আলোর ভিতরে একটা অন্ধকার ঘাপটি মেরে বসে আছে। আজকের অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ একজনকে দেখা যাচ্ছে না। সে হলো তমসা। মানে সমরেশের স্ত্রী, অরণির মা। নিজের ছেলের বিয়ে কিন্তু তমসা নেই, সে কি করে সম্ভব! সে কোথায় গেল? তমসা এখন পুরীতে তার কলিগদের সঙ্গে ভ্রমণে গেছে দিন দশকের জন্য। এরকম অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণ কি? লোকসমাজেও তো ছি: ছি: পড়ে যাবে। পাঁচজনে পাঁচ কথা বলবে। আত্মীয়-স্বজন এসে ছেলের মায়ের খোঁজ করবে। তখন সমরেশ কি বলবে? কাছাকাছি যারা থাকেন তারা হয়তো অনেকেই ব্যাপারটা জানেন। কিন্তু দূরের আত্মীয়-স্বজন যারা ব্যাপারটা জানেন না, তাদের মুখে হাত দেবে কে? ব্যাপারটা নিয়ে সমরেশও মনে মনে চিন্তিত। চক্ষু লজ্জা বলেও তো একটা জিনিস আছে। কী উত্তর দেবে সে মানুষজনকে। লোকসমাজে পরিবারের বদনাম হবে। সমরেশের মাথা হেঁট হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু করার নেই। ওদিকে তমসার অবশ্য অত মাথাব্যথার কারণ নেই। তার কলিগরা সমস্ত ব্যাপারটাই জানেন। তাদের কাছে নতুনত্ব কিছু নেই। আর আত্মীয়-স্বজন থেকে তমসা এই মুহূর্তে অনেক দূরে উড়িষ্যার পুরীতে। সুতরাং তাকে কারো মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। কী এমন ঘটেছে যে তমসাকে ছেলের বিয়ে ছেড়ে পালাতে হলো। ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগের।

সমরেশ ও তমসার বিয়ের পর প্রায় দশ বছর’বছর সম্পর্কে মাধুর্য ও রোমান্স ছিল। ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা। সমরেশ এমএসসি পাস করেছিল। কিন্তু এমনই কপাল যে কোন চাকরি জোটেনি। তাই সংসারের ঘানি টানতে চুটিয়ে টিউশনি করছিল। টিউশনির বাজারও ভালো ছিল। বহু ছেলে মেয়ে তার কাছে পড়ে। ওর ওপর নির্ভরও করে। ওর কাছে পড়ে বহু ছেলে মেয়েই এখন জীবনে প্রতিষ্ঠিত। প্রাইভেট শিক্ষক হিসাবে এলাকায় সমরেশ একটা সুনাম অর্জন করেছিল। সে যা আয় করত তাতে সংসার মোটামুটি চলে যেত। সমরেশের বাবা আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে মারা যান সমরেশের যৌবনের প্রারম্ভে। তখন সে সবেমাত্র হায়ার সেকেন্ডারি পাস করেছে। বাবা একটা ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। বাবার মৃত্যুতে পরিবারটা প্রায় ভেসে যেতে বসে। বিধবা মা এবং দুই বোনকে নিয়ে সমরেশ যে কোথায় দাঁড়াবে ভেবে কুল কিনারা পায়না। পেটের খিদে বড় জ্বালা। হাওয়া খেয়ে তো আর বাঁচা যায় না। তাই এই বয়স থেকেই সমরেশকে শুরু করতে হয় টিউশনি। কোন রকমে সংসারের চাকাটা গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। টিউশনি পড়িয়ে সমরেশ অনার্স এবং এমএসসি পাস করে। যদিও বড়দি প্রভার বিয়ে আগেই হয়েছিল। কিন্তু ছোট বোন অঞ্জনার বিয়ে সমরেশই দেয়। সে ইতিহাস বড় মর্মান্তিক এবং বেদনাদায়ক। ভুক্তভোগী ছাড়া সে যন্ত্রণা কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। চাকরির জন্য সমরেশ অনেক চেষ্টা করেছিল, অনেক কম্পিটিটিভ পরীক্ষাও দিয়েছিল কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য চাকরি জোটেনি। তাই টিউশনিটাকেই করতে হয় পেশা ও নেশা। এটাই তার বাঁচার একমাত্র পথ, অন্ধের লাঠি। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের যোগাযোগে গ্রাজুয়েট তমসার সঙ্গে তার সামাজিক বিয়ে হয়। তমসারা দুই বোন ও এক ভাই। বাবা সম্পন্ন চাষী। বোন থাকে কলকাতায় স্বামীর চাকরি-স্থলে। তমসা তার বোনের মত সুন্দরী নয়।গায়ের রং অনেকটা দাবা। তবে মুখশ্রী সুন্দর। মাঝারি স্বাস্থ্য। বড় আকর্ষণীয় ওর চোখ দুটো। মেয়ে দেখতে গিয়ে সমরেশ এক নজরে ওকে পছন্দ করেছিল। সমরেশও সুপুরুষ, ফর্সা উজ্জ্বল, উন্নত নাসিকা। উচ্চতাও মাঝামাঝি। ওকে দেখে তমসাও চোখ ফেরাতে পারেনি। তারপর এক ফাল্গুনের রাতে বসন্তের ছোঁয়ায় দুটি হৃদয় এক হল। বাসর রাতে, ফুলশয্যায় ওরা অনেক স্বপ্ন দেখল। সেদিন ওদের মনে হয়েছিল পৃথিবীতে বোধহয় ওরা দুজন ছাড়া আর কোন প্রাণী নেই। নিবিড় ঘনিষ্ঠতায় চারটে চোখ এক হয়ে গেল। দেহের খিদে, মনের খিদে মিলেমিশে একাকার। পৃথিবীতে তখন নব বসন্তের হাওয়া বয়ে চলেছিল। ওদের মনে হয়েছিল ওরা দুজন মিলে সব সম্ভব করতে পারে। তমসা বলেছিল তুমি কোন চিন্তা করোনা। চাকরি না পেলে কী হবে, আমি ঠিক সংসার চালিয়ে নেব। সময় সুযোগ এলে আমি যদি কোন কাজ পাই তাহলে তোমাকে সাহায্য করবো।দুজন মিলে সংসারের হাল ধরবো। তখন দেখবে তোমার পরিশ্রম অনেক কমে যাবে। তমসার কথা শুনে সমরেশ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ওকে সাহায্য করার জন্য এই বিশাল পৃথিবীতে একজন যে আছে একথা ভেবে সমরেশ মনে জোর পায়। এখন লড়াইটা শুধু তার একার নয়, তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য একজন হাত বাড়িয়েছে। এটা তার কাছে যেন ঈশ্বরের একটা বড় আশীর্বাদ। সমরেশ ও তমসার দাম্পত্য যেন ফুলে ফলে ভরে উঠতে চাইছে। তমসাকে পেয়ে সমরেশ সত্যি সত্যিই খুশি। বারবার মনে হয়েছে ওদের দাম্পত্যে কোথাও যেন ফাঁক নেই। কতবার রাতে জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় তমসার সুন্দর নিষ্পাপ মুখটা দেখে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে সমরেশ। একদিন তমসার গর্ভে জন্ম নেবে দুজনের ভবিষ্যৎ ও ভাবীকাল। একটা ফুলের মত শিশু টলমল পায়ে আধো আধো কথা বলতে বলতে হেঁটে যাবে ঘরের বারান্দায়। ওরা দুজন মিলে জড়িয়ে ধরবে শিশুটিকে। ওদের রক্ত মাংস অস্থি দিয়ে গড়া এক স্বপ্নের শিশু। পৃথিবীর বোধ হয় সবচেয়ে পুরনো মধুর ডাক বাবা ও মা ওদের কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করবে। উত্তরাধিকারের চারাগাছের স্নেহ, ভালোবাসা, সৌন্দর্য, ও ছায়ায় ওদের জীবন স্বর্গ হয়ে উঠবে। ওরা অনায়াসে পেরিয়ে যাবে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তুফান, পাহাড় শুধু ওই মৃতসঞ্জীবনী চারা গাছটিকে বুকে রেখে।

বছরখানেক পরে একদিন রাতের বেলা শোবার সময় তমসা সমরেশকে জড়িয়ে ধরে বলল একটা ভালো খবর আছে। শুনলে তুমি খুব খুশি হবে। সমরেশ আলতো করে তমসার ঘাড়ে হাত রেখে বলল, বলো না কি এমন খবর যা শুনলে আমি খুশি হব। বিশেষ কিছু কি হয়েছে? হ্যাঁ গো বিশেষই তো। তুমি অনেকদিন ধরে যা চাইছিলে সেটা আজ তোমার এক্কেবারে হাতের নাগালে। সমরেশ বলে, অত হেঁয়ালি না করে আসল কথাটা তাড়াতাড়ি বলে ফেলো তো। তমসা বলে আরে বাবা বলছি বলছি। মানে আমি এবার তোমার সন্তানের মা হয়েছি। সমরেশ হঠাৎই আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। আরে বলছ কী? একেবারে হান্ড্রেড পারসেন্ট সত্যি? হ্যাঁ গো হ্যাঁ সত্যি নয় তো মিথ্যে নাকি। কয়েকদিন থেকে আমার কিছু শারীরিক অসুবিধা হচ্ছিল।। গা বমি বমি করছিল। খেতে পারছিলাম না। তাই বড়দি আজ আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাক্তার বাবু দেখে শুনে পরীক্ষা করে জানালেন, আমি প্রেগন্যান্ট। সমরেশ মহানন্দে তমসাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, এত বড় খবরটা তুমি আমার কাছে এতদিন চেপে রেখেছিলে কেন? তমসা বলে, তোমাকে সারপ্রাইজ দেবো বলে। আগে থেকে জেনে গেলে এত আনন্দ পেতে না। সমরেশ বলে, তোমার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। সত্যিই তমসা তুমি আমার হৃদয় ভরিয়ে দিলে। কী যে আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝাতে পারবো না। আমাদের মধ্যে একটা অটুট বন্ধন তৈরি হয়ে গেল। যে বন্ধন দু’জনকে বেঁধে রাখবে চিরকাল। আচ্ছা তমসা আমাদের যদি ছেলে হয় তাহলে কি নাম রাখবে? তমসা বলে, দাঁড়াও একটু ভাবি। তুমিও ভাবো। যারটা ভালো লাগবে সেই নামটাই রাখবো।সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎই সমরেশ বলল, ইউরেকা। পেয়ে গেছি মনের মত একটা নাম। তমসা বলে তাড়াতাড়ি বল, দেখি আমার আবার পছন্দ হয় কিনা। সমরেশ বলে, অরণি। তমসা বলে বাহ বেশ সুন্দর নাম তো, আমার পছন্দ হয়েছে। আচ্ছা যদি মেয়ে হয় তাহলে কী নাম রাখবে? সমরেশ বলে, এবার তুমি একটু ভাবো, একটা সুন্দর মিষ্টি নাম। তমসা মাথা চুলকায় আর বলে – কী নাম রাখি, কী নাম রাখি। হ্যাঁ এসে গেছে আইডিয়া ওর নাম হবে নদী। কি ঠিক আছে তো ? সমরেশ তমসার টোল পড়া গালে আঙুল ছুঁয়ে বলে খুব সুন্দর নাম‌। সেদিন রাতে দুজনে অনন্ত তৃপ্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হল। অরণি আর নদী নামের দুটো ফুলের মত শিশু স্বপ্নে ওদের বুকে খেলা করতে লাগলো।

এভাবেই দিনগুলো গড়িয়ে চলল বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে। সমরেশ প্রায় সব সময় তমসার খেয়াল রাখে। সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখেন সমরেশের নিঃসন্তান বিধবা বড়দি প্রভা। তিনি প্রায় চল্লিশ বছর এ সংসারে আছেন। সংসারটাকে মায়ের মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। পরোক্ষে তিনিই এ সংসারের কর্ত্রী। সমরেশের ছোট বোন অঞ্জনা স্বামীর সঙ্গে থাকে হলদিয়াতে। মাঝেমধ্যে বাপের বাড়ি আসেন। সমরেশের মা গৌরীদেবী মাটির মানুষ। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে জীবনে অনেক ঝড় ঝাপটা, দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন। পরিবারে নতুন অতিথির আগমন সংবাদে আনন্দের ঢেউয়ে তাঁর হৃদয় ছাপিয়ে যাচ্ছে। দশ মাস দশ দিন পর হাসপাতালর লেবার রুমে শোনা গেল শিশুর কান্না। নার্স বেরিয়ে এসে বললেন সমরেশ বাবু আপনার একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু। সবার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক। সমরেশরা ছুটে গেল মা ও শিশুকে দেখতে। তখন অবশ্য তমসার জ্ঞান ফেরেনি। সমরেশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখেই যাচ্ছে তার স্বপ্নের অরণিকে। তবে ওর ভেতরে একটা উদ্বেগ তমসার কখন জ্ঞান ফিরবে। একসময় তমসার জ্ঞান ফিরলো। ও ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখলো ওর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে সমরেশ। সমরেশ তমসার মাথায় হাত রেখে বলল অনেক কষ্ট সহ্য করে তুমি যে উপহার আজ আমাকে দিলে তার জন্য তোমার কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। তমসা ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা এনে বলল – ” তুমি খুশি তো?” সমরেশ কোন কথা না বলে তমসার হাতে হাত রাখলো।

জীবন বহুকোষী। সব সময় সরলরেখায় চলে না। অনেক সময় বক্ররেখারও পথ ধরে। ঝড়, ঝঞ্ঝা, তুফান, সুনামি, ভূমিকম্প এসে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায়। তমসা ও সমরেশের সরলরৈখিক জীবন কখন যে বক্ররেখার জটিল আবর্তে ডুবে গেল তা তারাও খেয়াল করেনি। অরণির বয়স যখন দশ বছর তখন থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। ইতিমধ্যে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন সমরেশের মা গৌরীদেবী। মাকে হারিয়ে সমরেশ খুব ভেঙে পড়েছিল। বড়দির হার্টেও মেজর প্রবলেম দেখা দিয়েছে। হার্টে বড় ধরনের ব্লকেজ আছে। উনি এখন চিকিৎসাধীন। সংসারের শক্ত ভিতটা নড়বড় করতে শুরু করেছে। বড় অসহায়তা বোধ করছে সমরেশ। বড়দির যদি কিছু হয়ে যায় সংসারটার দশা কি হবে ? কে ডানা দিয়ে আগলে রাখবে মায়ের মত ? অরণি তো পিসিমণি ছাড়া জগতে আর কাউকে চেনে না। নিঃসন্তান বড়দি তাঁর সব মাতৃত্বটুকু উজাড় করে দিয়েছেন অরণিকে। অরণিকে জন্ম দেওয়ার পর তমসাকে ছেলের বিষয়ে তেমন ভাবতে হয়নি। অরণির খাওয়া, পরা, যত্ন আত্তি, প্রাথমিক পাঠদান প্রায় সব দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বড়দি প্রভা। বড়দির ক্ষুধার্ত মাতৃত্ব একটা স্নেহের আশ্রয় খুঁজছিল। তা তিনি পেয়েছেন অরণির মধ্যে । ইদানিং সমরেশের টিউশনিতে একটু ভাটা পড়েছে। আগে যে পরিমাণে ছেলে-মেয়ে পড়তো তার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কারণ বেকারের সংখ্যা এত বেড়েছে যে টিউশন টিচারের প্রতিযোগিতাও বেড়ে গেছে বহুগুণ। আর সংসারের খরচ আগের থেকে বেড়েছে অনেক। আয় কিছুটা কমে গেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সমরেশ। বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ অবস্থায় এগিয়ে এলো তমসা। বলল তাহলে আমি চাকরি-বাকরির চেষ্টা করি। যদি কোন কাজ জুটে যায় তাহলে সংসারে সাহায্য করতে পারব। কিন্তু সমরেশ পুরোটা সায় দিতে পারল না। কারণ বড়দি প্রভার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ। আগের মতো আর সংসারের কাজ করতে পারেন না। তার ওপর অরণিকে মানুষ করা, তার দেখভাল করা এ মুহূর্তে তাঁর পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব হয়ে উঠছে। তাই তমসা যদি সংসার ছেড়ে বাইরে কোন কাজে চলে যায় সংসার প্রায় অচল হয়ে যাবে। তার প্রভাব পড়বে অরণির ওপরেও। বড়দিরও বয়স হচ্ছে। আগের মত লোড নেওয়া আর সম্ভব নয়। কিন্তু তমসা বলে অত চিন্তা করো না আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। দেখাই যাক না কী হয়। সংসারটাকে তো বাঁচাতে হবে। টাকা পয়সার পর্যাপ্ত যোগান না থাকলে সংসার চলবে কী করে? সমরেশ আর কিছু বলেনি। চুপ থেকে গেছে। তমসার কথায় যে যুক্তি নেই তা কিন্তু নয়, অবশ্যই আছে। কিন্তু শ্যাম রাখি না কুল রাখি এটাই সমস্যা। যাইহোক একটা প্রাইভেট সেক্টরে তমসা কাজ জোগাড় করল। ডিউটি সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে ছয়টা।

সকালবেলা উঠে অফিস যাবার তাড়া। সকালের কাজকর্ম তেমন আর কিছু করা হয় না। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা সাতটা। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। বাড়িতে কাজ করার মত শারীরিক সামর্থ্য আর থাকে না। বাড়িতে যে কাজের লোক রাখবে সে অর্থ সামর্থ্যও নেই। সংসারের পুরো চাপটা গিয়ে এখন পড়লো বড়দি প্রভার উপর। সমরেশেরও সময় নেই, সারাটা দিনই প্রায় টিউশনি। দুপুরের দিকে দু’ঘণ্টা মাত্র রেস্ট। এমনি করে প্রায় বছর দুয়েক চলল। বড়দির অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ। প্রায়ই শ্বাসকষ্ট হয়। শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। হাঁটা চলার শক্তি কমে যাচ্ছে। তার প্রভাব পড়ছে অরণির উপর। সারাদিন সে মাকে পায় না। রাতের বেলা মা বাড়ি ফিরলেও তাকে যত্ন নেওয়ার মতো শারীরিক সামর্থ্য মায়ের থাকে না। ছেলেটার পড়াশোনায় ক্রমশ ক্ষতি হতে লাগলো। অত্যন্ত মেধাবী ছেলে অরণি। কিন্তু এই দু বছরে রেজাল্ট আগের তুলনায় খারাপ হতে লাগলো। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে সমরেশ তমসাকে বলল – তমসা তুমি কাজটা ছেড়ে দাও। না হলে ছেলেটা মানুষ হবে না। আমি যেটুকু রোজগার করছি ওতেই কোন রকমের সংসার টা চালিয়ে নেব। নুন ভাত খেয়ে থাকবো। আমাদের জীবনের লক্ষ্য শুধু ছেলেটাকে মানুষ করা। তমসা ব্যাপারটা যে বোঝে না তা নয়। কিন্তু এই দু বছর বাইরে কাজের জগতে থেকে একটা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার যে আস্বাদ সে পেয়েছে সেটা তার পক্ষে ত্যাগ করা একটু কঠিন হয়েই দাঁড়ালো। সে মনে মনে ভাবে আমাকে কেন কাজ ছাড়তে হবে? আমিও তো কিছু রোজগার করছি। বরং সমরেশ দু একটা ব্যাচ টিউশনি কমিয়ে দিক। ওই সময়টা ও সংসারে দিক। সংসারের দায়িত্ব নিতে হলে দুজনকেই নিতে হবে। একদিন সমরেশকে কথাটা স্পষ্ট বলেই ফেলল। কথাটা শুনে সমরেশ থ হয়ে গেল। তমসা যে এভাবে বলতে পারে সে কল্পনাও করেনি। আগের তমসা আর আজকের তমসাকে সে মেলাতে পারছে না। কথাটা বড়দির কানেও গেল। তিনিও হতবাক। অনেক রকম করে বোঝালেন তমসাকে। এমনকি একথাও বললেন আমি যদি হঠাৎ মারা যাই তাহলে তোমার সংসার ও ছেলের অবস্থা কি হবে? তখন তো তোমাকে কাজ ছাড়তেই হবে। তমসা বলে যখন যেমন পরিস্থিতি হবে তখন সে রকম ভাববো। এখন তো আপনি আছেন। আমি যে রোজগার করছি তা তো সংসারের জন্যই করছি। এটাকে আপনারা এমন খারাপ ভাবে নিচ্ছেন কেন? বড়দি আর কিচ্ছু বলেন নি কোনদিন। সমরেশও চুপ হয়ে গেছে। দশ বারো বছরের দাম্পত্যে ধীরে ধীরে তৈরি হল ফাটল। দুজনে ক্রমশ চলে যাচ্ছে দুই মেরুতে। এখন আর আগের মতো স্বামী-স্ত্রীতে সহজ কথাবার্তা হয় না। একটা ইগো পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। এমনি করে পেরিয়ে গেল আরও কয়েকটা বছর। বড়দি সমস্ত প্রতিবন্ধকতার আঁচ নিজে সহ্য করে রক্ষা করে চললেন অরণিকে মায়ের মত। অরণির কাছে এখন মা বলতে পিসিমণি প্রভা। জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে তৈরি হয়ে গেল দূরত্ব। এভাবেই সে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক ,উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আজ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। এখন তার বয়স চব্বিশ বছর। পিসিমণি ও বাবা তার জীবন সর্বস্ব। একই ঘরে আছে কিন্তু মা তার কাছে আজ দূর কোন গ্রহ। কোন টান নেই, আকর্ষণ নেই। বন্ধুরা তাদের মায়ের কথা বললে ওর কষ্ট হয়। তখন সে পিসিমণির মুখটা মনে করে। আজ তার বিয়ে। কিন্তু এ বিয়েতে মায়ের কোন ভূমিকা নেই। বিয়ের আচার সংক্রান্ত সব কাজই করছেন পিসিমণি। একটা তীব্র অভিমান থেকে তার বিয়ে সম্পর্কে কোন সংবাদই মা কে সে জানায়নি। বিয়ের কয়েক দিন আগে কেবলমাত্র সামাজিকতা রক্ষার জন্য বিয়েতে থাকার অনুরোধ করেছিল। শুধু এটুকুই মাত্র। ঘটনাগুলো যে তমসার বুকে তিরের মতো বেঁধেনি তা কিন্তু নয়। সেও তো মানুষ, রক্ত মাংসের মানুষ। ওর মনে হয়েছে এ বাড়ির কেউই ওকে ঠিকঠাক বোঝেনি। তাই সেও এক তীব্র অভিমানে ছেলের বিয়ের দুদিন আগেই কলিগদের সঙ্গে চলে এসেছে পুরি। বাড়িতে থাকলে হাজার লজ্জা, অপমান, ঘৃণা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। কিন্তু এখানে এসেও সে কি শান্তিতে আছে? বুকের মধ্যে একটা আগুন হু হু করে জ্বলছে। সাতাশ বছর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীটা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সমরেশের সঙ্গে বাসর ঘরে রাত জাগা, ফুলশয্যা, গর্ভধারণ করে ছেলের নাম ঠিক করা, গর্ভের সন্তানের মুখ কল্পনা করা, প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে হাসপাতালে অরণির জন্ম দেওয়া সেইসব স্মৃতিকাতর মুহূর্তগুলো এখন চোখের সামনে ভাসছে তমসার। দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল। খুব ইচ্ছে করছে হাউ হাউ করে কেঁদে অরণিকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে।

আর এক জন্ম – ভুবনেশ্বর মন্ডল

আজ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সেই মুখটাকে খুঁজছি। কিন্তু কোথাও পাচ্ছিনা। কোথায় হারালো সে মুখ!গায়ের রং শ্যাম বর্ণ। চেহারা অতি সাধারণ। উচ্চতা পাঁচ ফুটের কাছাকাছি। এক চিলতে ছিটেবেড়ার ঘরে এক সন্ধ্যায়, ওকে এক আবেগঘন মুহূর্তে দেখেছিলাম। সেদিন ঘরে কেউ ছিলনা। ওর সংসারে আপন বলতে ছিল একমাত্র বিধবা মা। ও তখন মাধ্যমিকের ছাত্রী। আমি ওকে টিউশন পড়াতাম কয়েকজনের সঙ্গে একটা ব্যাচে। আমিও তখন একেবারে ছাপোষা কাঠ বেকার। একটা পুরনো ভাঙা সাইকেলে চেপে কয়েকটা বাড়িতে পড়িয়ে কলেজের পড়া ও মেসে থাকার খরচা জোগাড় করতাম। মাত্র কয়েকশো টাকার টিউশনি। ও দিত একশো টাকা। একবার মাস শেষ হয়ে গেছে এক সপ্তাহ হল। মেয়েটি কয়েকদিন থেকে পড়তে আসে না। তাই আমিও বেতন পাইনি। টাকার খুব দরকার। খুঁজে খুঁজে একদিন ওর বাড়ি গেলাম মাইনেটা আনতে। আমাকে দেখে ও খুব অপ্রস্তুত। আমি যে এ ভাবে ওর বাড়ি পর্যন্ত চলে আসতে পারি ও স্বপ্নেও ভাবেনি। আমাকে একটা মোড়াতে বসতে দিল। দেখলাম ঘরে কেউ নেই। বলল স্যার পাঁচ মিনিট বসুন আমি সন্ধ্যাটা জ্বেলে নিই। ও সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালল। ধুপের গন্ধে ভরে গেল ছোট্ট ঘরটা। দেখলাম ঘরের সর্বত্র দারিদ্র্যের ছাপ। দেখে একটু কষ্ট হল। ভাবলাম মাইনেটা চাইবো। চাওয়াটা কি উচিত হবে? কিন্তু না চাইলেও যে উপায় নেই। আমার মেসের খরচা পাব কোথায় ? শেষমেশ চোখ বন্ধ করে বললাম গোপা, মাইনেটা আজ দিতে পারবে? পেলে খুব ভালো হতো।টাকাটা খুব দরকার ।কেমন করুণ অসহায় মুখে ও আমার দিকে তাকালো। বুঝতে পারলাম ওর হাতে টাকা নেই। ওর অসহায়তাটুকু বুঝতে পেরে মায়া হল। তবুও নিষ্ঠুরের মতো বলে ফেললাম আজ না হোক কাল পরশুতে দিও। ও মাথা নাড়লো। বললাম তোমার মা কোথায়? বলল মা তো একটা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে, এখনও ফেরেনি। ফিরতে একটু রাত হয়। বললাম তাহলে এখন আসি। আমি বারান্দা থেকে উঠোনে পা দিতেই বলল স্যার একটু চা খেয়ে যান। অবশ্য লিকার চা। আমাদের বাড়িতে তো দুধ থাকে না। আমি বললাম পরে খাবো। এখন আসি। তাহলে পরশু সন্ধ্যাবেলা আসবো। ভাঙা সাইকেল চেপে মনে একটা চাপা বেদনা নিয়ে অন্ধকার অলিগলি পেরিয়ে যখন সদর রাস্তায় উঠলাম, তখন দেখলাম আকাশে চাঁদ উঠেছে। শহরের বড় বড় অট্টালিকা গুলো জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু যে গলি থেকে আমি বেরিয়ে এলাম সেখানে শুধু অন্ধকার। এখানে এসে যেন চোখ ঝলসে গেল। সেদিন রাতে মেসে ফিরে এসে গোপার কথা, ওর হতশ্রী বাড়ির কথা বুকে কেমন যেন মোচড় দিচ্ছিল। তবু মনে মনে একটা যুক্তি খাড়া করলাম। আমিও তো কিছু তালেবড় নই। সামান্য কয়টা টাকার টিউশনি করি। এ মুহূর্তে আমার টাকার দরকারও খুব। কি করে ছেড়ে দিই একশো টাকা ! দিন দুয়েক পরে একটা গোপন অপরাধবোধ নিয়ে আবার গেলাম গোপাদের বাড়ি ।গোপা একশো টাকার একটা নোট অতি সংকোচে আমার হাতে দিয়ে বলল – স্যার একটু দেরি হয়ে গেল দিতে, কিছু মনে করবেন না। সেদিন যখন এসেছিলেন তখন আমার মা মাইনে পায়নি। তাই সময় মত টাকাটা দিতে পারিনি। আসার সময় প্রণাম করে বলল – স্যার আশীর্বাদ করুন যেন মাধ্যমিকটা এক চান্সে পাস করে যায়। আর তো আমার পড়া হবে না ! আমার মা তো লোকের ঘরে কাজ করে। আর পড়াতে পারবে না। কথাটা শুনে চোখে জল এলো। এরকম কত গোপা আমাদের সমাজে রয়েছে তার খবর আমরা কয় জন রাখি! একটা অব্যক্ত বেদনা নিয়ে সেদিন ভাঙা সাইকেল চেপে মেসে ফিরেছিলাম।

এ ঘটনা প্রায় ত্রিশ বছর আগের। এর মধ্যে পৃথিবীতে কত কি ঘটে গেছে। কত কি বদলে গেছে। এখন আমি একটা সরকারি চাকরি করি। অনেক কষ্ট করে কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিয়ে এই চাকরিটা পেয়েছি। মাস গেলে মাইনে পাই। এখন আর আগের সেই অভাব নেই। সংসার করেছি। একমাত্র সন্তানকে একটা ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি। আমার অনেক শখ ,সাধ পূরণ করতে পেরেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে এখনো গোপার সেই অসহায় করুণ মুখটা আমার মনে পড়ে। মনে হয় একটা বড় অপরাধ করেছিলাম সেদিন ওর কাছে মাইনেটা নিয়ে। না নিলেও তো পারতাম! না হয় একটু কষ্ট করেই মাসটা চালিয়ে নিতাম। কিন্তু আমি স্বার্থপরের মতো নিজের দুঃখ কষ্টটাকেই বড় করে দেখেছি, ওই অসহায় পরিবারটার কথা ভাবিনি। তারপর এখন বেশ কয়েকবার এই শহরের ওই কানা গলিতে গেছি গোপা ও তার মায়ের খোঁজে। কিন্তু ওদের কোন সন্ধান পাইনি। আশেপাশের লোক জন বলেছিল বিশ বছর আগে ওরা এখান থেকে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। মনে ইচ্ছে ছিল গোপার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব সেদিনের সেই নিরুপায় অপরাধের জন্য। কিন্তু সে সুযোগ ভগবান আমাকে দিলেন কোথায়! এখনও বহুবার রাতের স্বপ্নে গোপার অসহায় করুণ মুখটা ভেসে ওঠে।দেখি ও তুলসি তলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালছে।আর আমি ওর হাতে আমার মাস মাইনের কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলছি- গোপা আমাকে ক্ষমা করো। এই সামান্য কিছু টাকা হাতে রাখো। আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করার একটা সুযোগ অন্তত দাও!দেখি ,গোপা আমার পায়ে হাত রেখে প্রণাম করছে। ওর চোখে জল ছল ছল করছে। আর অস্ফুট স্বরে বলছে স্যার আপনি মানুষ নন ,দেবতা! হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।দেখি বিছানায় শুয়ে আছি। আমার পাশে ঘুমোচ্ছে নিবেদিতা, আমার স্ত্রী। আর আমার ছেলে অমিতাভর সুন্দর মুখটাতে জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলো পড়েছে। ওকে দেখতে দেবশিশুর মত লাগছে। স্বপ্নে দেখা গোপা এখন হারিয়ে গেছে এক অজানা অন্ধকারে। তবু ওর সেই করুণ অসহায় মুখটা আজও ভুলতে পারিনি। হয়তো এরকমই বহুবার রাতের স্বপ্নে ও আমার চেতনার দরজায় ধাক্কা মারবে। আর আমি যখন জেগে উঠবো তখন মনে পড়বে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতার লাইন “দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া / কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া / অবনী বাড়ি আছো ?” এ পৃথিবীতে আমরা হয়তো কম বেশি অনেকেই অবনী। হৃদয়- দুয়ার এঁটে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছি। আর রাতের অন্ধকারে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তির মতো গোপারা হারিয়ে যাচ্ছে। এ জন্মে ওদের আর রোদ্দুর হওয়া হলো না। হয়তো তার জন্য আর এক জন্ম অপেক্ষা করতে হবে।

বিচার – ভুবনেশ্বর মন্ডল

প্রায় আশি বছর আগের কথা বলছি । গ্রাম বাংলা তখন অন্ধকার কুয়াশায় ঢাকা অনেকটা প্রাগৈতিহাসিক। মেঠো পথ। বর্ষায় এক হাঁটু কাঁদা। রাতে হ্যারিকেন ও লন্ঠনের আলো। যানবাহন নেই, বিদ্যুৎ নেই। রাত আটটা বাজলেই গ্রামে নেমে আসে নিঝুম অন্ধকার। এমনই এক অজ পাড়াগাঁয়ের ভয়ংকর কৃপণ ও ধনী মানুষ রাখহরি পাল। এলাকায় যেমন তার অর্থের জন্য নাম ডাক আছে তেমনি বদনাম আছে কৃপণ হিসেবেও। রাখহরির ভাই জয়কালী। সে দাদার একান্ত ভক্ত, দাদা বলতে অজ্ঞান, দাদা যেন তার কাছে সাক্ষাৎ ভগবান। জয় কালীর হাবাগোবা বউ মেনকা। সে অক্ষর জ্ঞানহীন। রাখহরির বউ পার্বতী ওকে পরিচালনা করে। মেনকা এ বাড়ির দাসী বাঁদী। উঠতে বসতে সর্বক্ষণ তাকে লাঞ্ছিত হতে হয় পার্বতী ও রাখহরির কাছে। এ ব্যাপারে জয়কালীর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং সে জানে মেয়ে মানুষ পুরুষের সেবা দাসী। দাদা বৌদির প্ররোচনায় সেও মেনকার উপর কম অত্যাচার চালায় না। খুব কষ্ট হলে মেনকা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। মার খেয়েও পড়ে থাকে এদের পায়ে। কারণ তার যাবার আর কোন জায়গা নেই। বাবা মা গত হয়েছেন সেই শৈশবে। মানুষ হয়েছে দূর সম্পর্কের এক মামার কাছে। ওই মামাই মাথা থেকে দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য কালো কুৎসিত অমানুষ জয় কালীর হাতে তুলে দেন মেনকাকে। সে মামাও আজ নেই। আছে ওই মামার মেয়ে রেবতী।

হঠাৎই জানা যায় মেনকা গর্ভবতী। তার পেটে সন্তান এসেছে। মেনকার মনে খুশি খুশি ভাব। পেটের সন্তানকে ঘিরে সে অনেক কিছু ভাবে, স্বপ্ন দেখে। কিন্তু জয় কালী সন্তান ধারণের জন্য মেনকাকে কোন আলাদা সমীহ দেখায় না। কিন্তু এ বাড়িতে প্রসবের আগের দিন পর্যন্ত মেনকাকে সব কাজকর্ম করতে হয়েছে। না পারলেও কষ্ট করে করতে হয়েছে। অবশেষে মেনকার কোল আলো করে এলো এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান। তবে ছেলের মুখ দেখে জয়কালীর একটু ভাবান্তর হল। একটা মায়াও জন্মালো ছেলেটার প্রতি। মাঠ থেকে কাজ করে ফিরে এসে ছেলেকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু এ দিকে রাখহরি আর পার্বতী প্রতিহিংসায় জ্বলতে লাগলো। কারণ তাদের একচ্ছত্র সম্পত্তির ভাগীদার এসে গেছে। তাদের ছেলে গোপাল আর সর্বস্ব পাবে না। যেমন করেই হোক এই ছেলেটাকে পৃথিবী থেকে সরাতে হবে। এ কাজ করতে হবে অত্যন্ত সাবধানে এবং গোপনে। তার জন্য একটা কৌশল নিতে হবে।

এখন থেকে রাখহরি ও পার্বতী নানা অছিলায় মেনকাকে প্রতি পদে পদে লাঞ্ছনা দিতে শুরু করলো। ওর প্রতি কাজের খুঁত ধরা ওদের মজ্জাগত স্বভাব হয়ে গেল। এমনকি জয় কালীর মনে ওরা ঢুকিয়ে দিল সন্দেহের বিষ। জয়কালী কে বোঝালো যে মেনকার সন্তান অবৈধ সন্তান। সে সন্তান জয়কালীর নয়। হুঁশ জ্ঞানহীন হাবাগোবা মেয়ে অন্য কারো সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে। ওরা এমন ভাবে জয়কালীর মগজ ধোলাই করল যে জয়কালী বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো। শেষমেশ মেনকাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। অসহায় মেনকা গাঁয়ের দু একজন লোকের সাহায্যে কোনরকমে ঠাঁই পেল দূর সম্পর্কের সেই মামাতো দিদি রেবতীর বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও সেই একই দশা। দাসী বাঁদীর অবস্থা। দুটো খাওয়া পরা ও একটু আশ্রয়ের জন্য তাকে সহ্য করতে হলো অপমান ও লাঞ্ছনা। কিন্তু এ দিকে রাখহরির চক্রান্ত শেষ হলো না। শত্রুকে সে নির্মূল করতে চায়। ওই বেজন্মা ছেলেটা বড় হয়ে কোন দিন এসে সম্পত্তির দাবি করতে পারে। তাই মেনকার অর্থ লোলুপ জামাইবাবু রতিকান্তকে বশ করে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই দুধের শিশুটাকে গলা টিপে মেরে ফেলার সুপারি দিল। হলও তাই। মেনকা একদিন বাচ্চাটিকে ঘুম পাড়িয়ে পদ্ম পুকুরে স্নান করতে গেল। আর সেই সুযোগে রতিকান্ত পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল শিশুটিকে। স্নান করে ফিরে এসে মেনকা দেখল ছেলে জাগছে না। কথা বলছে না। দিদি রেবতী স্বামীর গতিবিধি জানতো। সে ততক্ষণে সব বুঝে গেছে। এ বিষয়ে স্বামীকে বারণও করেছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মেনকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলো। রেবতীর চোখেও জল এলো। সেও তো মানুষ! তাই সেও কাঁদে। মেনকা বলে -“হে ভগবান তুমি একি করলে!আমি এবার কি করে বাঁচবো?”মাস তিনেকের মধ্যেই রতিকান্ত বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল মেনকাকে। সে এখন গায়ে গঞ্জে ভিক্ষে করে দিনপাত করে। যেখানে পায় সেখানে রাত কাটায়।

এদিকে রাখহরির এখন পৌষ মাস। তবে ছেলের মৃত্যুর কথা শুনে মাঝে মাঝে চোখে জল আসে জয় কালীর। মনটা কেমন হু হু করে। কেন এমন হয় সে জানে না। ও তো তার ছেলে নয়। দাদা বৌদি তো তাই বলেছে। কিন্তু তবু মনটা কেন কাঁদে তার? জয়কালী যখন চোখের জল ফেলে তখন রাখহরি তার পিঠে হাত দিয়ে বলে – “কালী কাঁদিসনে‌। কার জন্য কাঁদছিস? ওকি তোর নিজের ছেলে? ওতো একটা বেজন্মা।”

দেখতে দেখতে দুটো বছর পেরিয়ে যায়। এখন মাঠে ধান পেকেছে। চারিদিকে ধান কাটা চলছে। রাখহরি এবং জয়কালী ধানকাটায় ব্যস্ত। রাখহরির ছেলে গোপাল বেলা এগারোটা নাগাদ বাবা ও কাকার জন্য মাঠে জল খাবার নিয়ে এসেছে। খাবারটা আলের মাথায় রেখে দশ বছরের গোপাল জমির এক কোণে খড় দিয়ে তৈরি একটা চালা ঘরে ঢোকে। এই খড়ের চালা ঘরটা তৈরি করেছিল রাখহরি মাঠ পাহারা দেওয়ার জন্য। সেখানে ঢুকে গোপাল একটা দেশলাই দেখতে পাই। এই দেশলাই দিয়ে রাখহরি বিড়ি ধরাতো। আপন খেয়ালে গোপাল হঠাৎই একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে যায় চালা ঘরে । মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন লেলিহান শিখায়। গোপাল আর বেরোবার পথ পায় না। ওদিকে রাখহরি ও জয়কালী ধান কাটায় মগ্ন। এদিকে কি হচ্ছে খেয়াল করেনি। গোপাল আর্তস্বরে হঠাৎই চিৎকার করে ওঠে “বাঁচাও! বাঁচাও! মরে গেলাম! বাবা, কাকা তোমরা ছুটে এসো, আমাকে বাঁচাও!”

গোপালের চিৎকারে ছুটে আসে রাখহরি ও জয়কালী। কিন্তু ততক্ষণে প্রায় সব শেষ হয়ে গেছে। গোপালের সর্বাঙ্গ পুড়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ জ্বলছে। রাখহরি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কিন্তু আগুন ঠেলে ভিতরে যেতে পারছে না। সে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইতিমধ্যে মাঠের অন্যান্য লোকেরা ছুটে এসেছে। পুকুর থেকে জল এনে তারা আগুন নেভালো। কিন্তু গোপালকে বাঁচানো গেল না। ফুটফুটে ফুলের মত গোপাল ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। রাখহরি এখন মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে পাগলের মত হাউ হাউ করে কাঁদছে। আর বলছে -“হে ভগবান! তুমি নিক্তি ধরে বিচার করো। তোমার বিচার অতি সূক্ষ্ম। তোমার চোখকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।”

শিকড় – ভুবনেশ্বর মন্ডল

ফোনটা যখন এল, পরমব্রত তখন অফিসেই। ল্যাবে গবেষণার ফাঁকে কফি খাচ্ছিল। আজই ঘন্টা খানেক আগে সেরিব্রাল স্ট্রোকে মারা গেছেন বাবা। হঠাৎই শক খেয়ে পরমব্রত কিংকর্তব্য বিমূঢ়। এর জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু ঘটনাটা ঘটে গেছে। একটা কান্না বুকের ভেতর থেকে দলা পাকিয়ে গলা পর্যন্ত ঠেলে ঠেলে উঠছে। দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখেছে। আর খেতে পারেনি। সেটা এখন ঠান্ডা হয়ে গেছে। মিনিট পনেরো পর একটু ধাতস্থ হয়ে স্ত্রী স্বপ্নাকে ফোন করে জানালো ব্যাপারটা। সেদিন আর ল্যাবের কাজে মন বসলো না। একটা অস্থিরতা ও হুহু যন্ত্রণা মোচড় দিচ্ছিল বুকে। গাইড ক্রিস্টোফার থমসন সাহেব কে সব জানিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ল্যাব থেকে। গাড়ি চলেছে দ্রুত গতিতে হাউসটনের জনবহুল পথে। পিঁপড়ের সারির মতো গাড়িগুলো নিজ নিজ গন্তব্য অভিমুখী। পরমব্রতর আর বিলম্ব সইছে না। ওর ইচ্ছে করছে স্বপ্নার কাছে গিয়ে প্রাণ খুলে কেঁদে একটু হালকা হতে। ঘন্টা দুয়েক পরে যানজট কাটিয়ে বাড়ি ফিরল। ধীর পায়ে কোনরকমে টলতে টলতে এসে সোফায় বসলো। স্বপ্নাও ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। ওর চোখেও জল। দেবারতি মানে পরমব্রতর দশ বছরের একমাত্র কন্যা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল “বাবা, সত্যিই কি দাদাই মারা গেছে? ইন্ডিয়া গিয়ে আর কোনদিনই কি দাদাইকে দেখতে পাবো না?” পরমব্রত মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে “না মা আর কোনদিনই দাদাইকে দেখতে পাবে না। দাদাই যে এখন আকাশের তারা হয়ে গেছে।” বাড়ির পরিবেশ এখন থমথমে। আশপাশে যে কয়টি প্রবাসী বাঙালি পরিবার ছিলেন তাঁরাও দেখা করতে এলেন পরমব্রতর সঙ্গে। সাধ্য মতো সান্ত্বনা দিলেন। সন্ধ্যাবেলায় পরমব্রত স্বপ্নাকে বলল “বাবাকে শেষ দেখাটা তো দেখতে পেলাম না। এত দূর থেকে দেশে পৌঁছানোর অনেক আগেই ডেড বডি দাহ হয়ে যাবে। আর যাওয়াও সম্ভব নয়।জানো খুব আক্ষেপ হচ্ছে। মনে হচ্ছে এত দূর দেশে না থাকলেই পারতাম। আজ যদি দেশে থাকতাম তাহলে বাবার শেষ যাত্রার সঙ্গী হতে পারতাম। মনের খেদ মিটত।

বাবা আমাদের জন্য আজীবন কত করেছেন! স্কুল টিচারের চাকরি করে যে মাইনে পেতেন তাতে আমাদের পাঁচ ভাই বোনকে নিয়ে সংসার ভালো করে চলতো না। বাবাকে টিউশনি করতে হতো। তবুও আমার পড়াশোনার খরচা সব জুগিয়ে গেছেন বাবা। তিন বোনের বিয়ে দিয়েছেন অনেক খরচ করে। অনেক কষ্ট করে ব্যাংকের লোন শোধ করতে হয়েছে। সে সব এক ইতিহাস। বাবা পড়াতেন এক প্রাইভেট কোম্পানির স্কুলে। সেখানে কোন পেনশন ছিলনা। তাই অবসর গ্রহণের পরও টিউশনি পড়াতেন সংসারের জন্য। তারপর আমি ফেলোশিপ পেয়ে রিসার্চ করলাম। সেখান থেকে কিছু বাঁচিয়ে মাসে মাসে বাবাকে দিতাম। কিন্তু সে আর কতটুকু! পুরো সংসারটাই বাবা টানতেন। দাদাও চাকরি পায়নি সেও বেকার। ছোটখাটো একটা ব্যবসা সে করতো কিন্তু সেটাও ভালো চলত না। তারপর সৌভাগ্যক্রমে চলে এলাম আমেরিকায়, এই হাউসটনে। সায়েন্টিস্ট হিসাবে এখানকার ল্যাবে কাজ করার সুযোগ পেলাম। তারপর তুমি এলে আমার জীবনে। এলো দেবারতি। জন্মসূত্রে দেবারতি এখানকার সিটিজেন। তাই আর দেশে ফেরার ইচ্ছে হলো না। আমরাও এখানকার নাগরিকত্ব নিলাম। থেকে গেলাম এই দূর দেশে। সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগবিলাসে ডুবে গেলাম। কি আশ্চর্য! কয়েক বছরের মধ্যেই শিকড়ের টানটা আলগা হতে থাকলো। প্রথম প্রথম দেশের জন্য মনটা কেমন কাঁদতো। তারপর সব সয়ে গেল।

স্মৃতিগুলোর উপর বিস্মৃতির ধুলো জমতে শুরু করল। ফেলে আসা দেশ সম্পর্কে ক্রমশ নিরাসক্ত হতে থাকলাম। একটা সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আমার জন্মভূমিকে কেমন যেন উপেক্ষার চোখে দেখতে লাগল। আমি ভুলতে বসলাম শৈশব ও যৌবনের দিনগুলোকে। যে দেশের জল হাওয়াতে একদিন আমি পুষ্ট হয়েছি। আমার দেহ মন গড়ে দিয়েছে যে দেশ। যে দেশের খেয়ে পরে আজ আমি এতদূর এসেছি। তার প্রতি আজ যেন কোন দায়বদ্ধতা অনুভব করছি না। তবু মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার পংক্তি “এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা / এইসব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা।” কিন্তু আমি তো এখন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আমার কেরিয়ার, আমার স্বপ্ন, আমার ভোগ বিলাস, আমার স্বাচ্ছন্দ্য, আমার নিউক্লিয়ার সংসার আরও কত কী। জানো স্বপ্না অনেকবার ভেবেছিলাম আমার বৈভব হীন জন্মভূমিতে ফিরে যাব। ওখানেও তো আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অনেক মানুষই আছেন। ঘর সংসার, চাকরি বাকরি, ব্যবসা নিয়ে বেশ সুন্দর কাটিয়ে দিচ্ছেন। ইচ্ছে করলে আমিও তো ওখানে কাজ পেতাম। কিন্তু এখানে এলাম কেন? আসলে আমি একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চেয়েছিলাম।

ও দেশে তো এত সুযোগ, পরিকাঠামো, অর্থ নেই। হয়তো সাদামাটা আটপৌরে জীবনে আমার চেতন অবচেতন মন তৃপ্ত হতে চাইনি। তাই শিকড় সহ গাছটাকে তুলে এনে বসিয়েছি একটা টবে। মনে মনে ভাবি আমি কি তবে বনসাই? এখানে অনেক কিছুই পেয়েছি তবুও একটা শূন্যতার যন্ত্রণা এসে মাঝে মাঝে আমাকে গ্রাস করে। মনে হয় জন্মভূমির প্রতি আমার কি কোন দায় নেই! কেন আমি আমার বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রতিভাকে বন্ধক রাখলাম অন্যের কাছে? আমি কি সত্যিই স্বার্থপর! এখানে যা কিছু দিচ্ছি সেটুকু যদি আমার দেশের জন্য দিতাম! তাহলে তো জন্মভূমির ঋণ শোধ করা হতো। তবু আত্মপক্ষ সমর্থন করে ভাবি এটা তো বিশ্বায়নের যুগ, আমরা এখন গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা। দেশান্তরের সীমারেখা আজ থেকেও যেন আর নেই। তাহলে এখানে থাকলে অনুতাপ হবে কেন? আমার মতো হাজার হাজার মানুষ এ পথের পথিক। তাদের থেকে আমি আলাদা তো নই। স্বপ্না তুমি কি আমার সঙ্গে সহমত?” স্বপ্না বলে – “মানছি তোমার কথা। কিন্তু কী জানো আমিও মাঝে মাঝে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তবু এখানে ঘর সংসার নিয়ে বেশ মানিয়ে নিয়েছি। মেয়েদের জীবনটা তো এরকমই। আমরা এক জায়গায় বড় হই তারপর বিয়ে হলে আর এক জায়গায় জীবন কাটাই। তা এত দিন পর তুমি এ সব নিয়ে এত বিচলিত কেন? বাবাকে শেষ দেখাটা দেখতে পেলে না বলে খুব ভেঙে পড়েছো,তাই না ?”পরমব্রত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে -“জানো এখন মনে হয় জীবনটা যেন একটা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ। এই আছে, এই নেই। এই যে জীবনে এত ভোগ সুখের আয়োজন সত্যিই কি এর এতটা প্রয়োজন আছে! বাঁচতে গেলে কতটুকু লাগে? আমাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার তো শেষ নেই। কোনদিন শেষও হবে না।

এক স্বপ্ন থেকে আর এক স্বপ্নে আমরা ছুটবো অনন্তকাল। এ জীবনে সবকিছুই আপেক্ষিক। যদি ভাবি জীবনের তলানিটুকু পর্যন্ত পান করে নেব, কারণ ঐহিকতার বাইরে আর কিছু নেই। তবুও কোথাও একটা কিন্তু থেকে যায়। এ মুহূর্তে মনে পড়ে যাচ্ছে অনেকদিন আগে পড়া তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের নিতাই কবিয়ালের গাওয়া একটি গান -“ভালোবেসে সাধ মিটিলো না জীবনে / হায় জীবন এত ছোট কেনে?” শুধু দেহে বাঁচা নয়, আমরা যে মনেও বাঁচি। এই মনটাই আজ আমাকে কাঁদাচ্ছে স্বপ্না। একে আমি অস্বীকার করি কী করে! আমার রক্তস্রোতে ধ্বনিত হচ্ছে শিকড়ের গান। ফেলে আসা শৈশব,কৈশোর , যৌবনের দিনগুলো যেন বাবার মুখের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। জানো এখন শত ইচ্ছে করলেও দু মাসের আগে আমি দেশে যেতে পারবো না। আমার ল্যাবে এমন একটা গবেষণার সঙ্গে আমি যুক্ত, যেটা এখন তুঙ্গে, তাছাড়াও দেবারতির স্কুলের পরীক্ষাও আর এক সপ্তাহ পরে। তাই এই মুহূর্তে ছুটি নেবার কোন উপায় নেই।সে সব ঝামেলা মিটতে মিটতে বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি সব পেরিয়ে যাবে। যদি দেশের মধ্যে থাকতাম এক বেলার জন্যও যে কোন মূল্যে যেতে পারতাম। কিন্তু এত দূর থেকে তো সেটা কি করে সম্ভব বলো? তাই কেমন যেন একটা অসহায়তা গ্রাস করছে আমাকে। এখন এই মুহূর্তে একটা গানই মনে পড়ছে সেই বাংলা শ্যামা সংগীত -“দোষ কারো নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।” মনে হচ্ছে নিরুপায় আমি যেন নিজের হাতেই আমার শিকড়টাকে ছিঁড়ে ফেলেছি।

ভুবনেশ্বর মন্ডল | Bhubaneswar Mondal

100 questions and answers about Ramakrishna Mission | রামকৃষ্ণ মিশন সম্পর্কে প্রশ্ন ও উত্তর

Pralambasura badha besha of Jagannath | প্রলম্বাসুর বধ বেশ | অভিজিৎ পাল

Prem Sadhanar Nayika | প্রেম সাধনার নায়িকা : নানা আঙ্গিকে | New Article 2023

Ananta Bikeler Rupkathara | অনন্ত বিকেলের রূপকথারা | New Bengali Story 2023

Bangla Galper Diary | Top Bangla Golpo Online Reading | New Bangla Galper Diary | Top Best Story Blogs | Best Story Blogs in pdf | Sabuj Basinda | High Challenger | Famous Bangla Golpo Online Reading | Shabdodweep Read Online Bengali Story | Shabdodweep Writer | Bangla Golpo Online Reading pdf | Famous Story – Read Online Bangla Galpo | Pdf Bangla Galper Diary | Bangla Galper Diary App | Full Bangla Galper Diary | Bangla Golpo Online Reading Blogs | Best Story Blogs in Bengali | Bangla Galper Diary in English | Bangla Galper Diary Ebook | Full Bangla Galpo online | Read Online Bangla Galpo 2023 | New Bengali Web Story – Episode | Golpo Dot Com Series | Bangla Galper Diary Video | Story – Read Online Bangla Galpo | Bangla Galper Diary Audio | New Bengali Web Story Video | Read Online Bangla Galpo Netflix | Audio Story – Bangla Galper Diary | Video Story – Bangla Galper Diary | Shabdodweep Competition | Story Writing Competition | Bengali Writer | Bengali Writer 2023 | Trending Bangla Galper Diary | Recent story Read Online Bangla Galpo | Top Bangla Galper Diary | Popular Bangla Galper Diary | Best Read Online Bengali Story | Read Online Bengali Story 2023 | Shabdodweep Bangla Galper Diary | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Read Online Bangla Galpo Download | Bangla Golpo Online Reading mp3 | Horror Adult Story | Read Online Bengali Story Collection | Read Online Bangla Galpo mp4 | Read Online Bangla Galpo Library | New Bengali Web Story Download | Full Live Bengali Story | Bengali Famous Story 2023 | Shabdodweep Bengali Famous Story | New Bengali Famous Story | Bengali Famous Story in pdf | Live Bengali Story – audio | Bengali Famous Story – video | Bengali Famous Story mp3 | Full Bengali Famous Story | Bengali Literature | Shabdodweep Magazine | Shabdodweep Web Magazine | Live Bengali Story Writer | Shabdodweep Writer | Story Collection – Read Online Bangla Galpo | Modern bangla golpo reading pdf free download | Modern bangla golpo reading pdf download | Modern bangla golpo reading pdf | Modern bangla golpo reading in english pdf | Modern bangla golpo reading in english | Modern bangla golpo reading book pdf | choto golpo bangla

Leave a Comment