Suryamukhi | সূর্যমুখী | শওকত নূর | Best 2023

Sharing Is Caring:
BENGALI STORY

শওকত নূর – সূচিপত্র [Bengali Story]

সূর্যমুখী [Suryamukhi]

মেয়ের দল খুব সম্ভবত আমাকে ভিক্ষুক ঠাউর করেছিল। সম্ভবত বলছি এই কারণে, তামাম প্রেক্ষিতে সেটিই ছিল তাদের সাথে আমার প্রথম এবং শেষ তথা একমাত্র দেখা। পরবর্তীতে যদি তাদের সাথে কোনও সাক্ষাতালাপের সুযোগ ঘটত,তবে এই আলোচ্যে ‘সম্ভবত’ শব্দটির প্রয়োগ আবশ্যিক নাও হয়ে উঠতে পারত। যাক সে কথা। উল্লেখ জরুরি, তারা বয়সে নবীন, আর নিশ্চয়ই উঁচু অভিজাত ঘরের সন্তানাদি ছিল। তাদের চাকচিক্যময় পরিচ্ছদ ও আকর্ষণীয় মুখচ্ছবি, চলার বলার ধরণ তেমন ধারণাকেই প্রকট করে তুলেছিল । সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করার কালে কাগজি নোট বাগিয়ে ছুটে আসে তাদের একজন। আমার পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে কলহাস্যে দলে মেশে। হেলেদুলে উচ্চ-হাস্য অদৃশ্য হতে থাকে তারা দূরের মাটির ঢিবি সদৃশ্য অনুচ্চ বস্তুগুলোর আড়ালে।

যে গাছটির নিচে পা বিছিয়ে হেলানে বসেছিলাম আমি, সেটি ছিল একেবারে পাতাহীন মৃতদর্শন। গায়ের পায়ের পরিধেয়ের প্রতি করুণ দৃষ্টি ছিল আমার। কাদামাটি তথা ভেজা বালি লেগে ওগুলো ছিল একান্ত জীর্ণ দশাগ্রস্থ। বলা বাহুল্য, আয়না কিংবা অনুরূপ কোনও মুখ দর্শন সামগ্রী আমার সাথে ছিল না, তবু অনুমান নেহাৎই সহজসাধ্য ছিল- আমার মুখমণ্ডলটি ওই সময় সন্দেহাতীত হয়ে থাকবে সর্ব নিচুস্তরের ভিক্ষুকের চেয়েও দীনদর্শন।

দৃষ্টি সন্মুখে প্রসারিত ছিল আমার। যতদূর নজর চলে ধূ-ধূ বালুচর। একেবারে দৃষ্টির শেষ সীমায় ধোঁয়াটে সাদা অদৃশ্যে বালু কি’ সমুদ্র, তা ছিল একেবারে বোধানুমানের বাইরে। ডানে বাঁয়ে তাকালেও নিঃসীম বালি আর ওপরে নীলাকাশ। মন থেকে স্বপরিহাস শব্দ বাক্য তথা তাচ্ছিল্য হাসি বেরিয়ে এসে কানকে দীর্ণবিদীর্ণ করছিল: হে পোড়াকপাল গেঁয়ো যুবক আয়েন উদ্দিন আন্দু, ভাগ্যান্বেষণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বের হয়েছিলে নৌপথে। ভেবেছিলে সাগর পাড়ি দিয়ে ওপারে পৌঁছে যেতে পারলেই উঠে যাবে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায়। একেই বলে বিধি বাম। সলিলসমাধি এড়িয়ে প্রাণে বেঁচে এখন ভিক্ষুক-দর্শন এই সীমাহীন বালুচরে না খেয়ে মরার শেষ দৃশ্যে ভিক্ষুক গণ্য হওয়াই বুঝি তোমার অপরিণামদর্শী অভিবাসন যাত্রার যথোপযুক্ত পরিণাম। তোমার অতি অল্প বিদ্যা শিক্ষার এই একমাত্র অর্জন। কথায় আছে, অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। এবারে বিনা পানাহারে ধুঁকেধুঁকে মরো এই নির্জন বেলাভূমে। ধুঁকে ধুঁকে মরো হে, ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু প্রহর গোনো!

আত্মক্ষোভ থেকে সরে ধীরে ধীরে ভাবনাচ্ছন্ন হই। কল্পনায় টেনে আনতে থাকি আমার বিদ্যাশিক্ষা, বিদ্যাবহর, বিদ্যাস্থানের যত কথা। গাঁয়ের পাঠশালায় অষ্টম শ্রেণি নাগাদ পড়েছিলাম আমি। যুগের তুলনায় অতি নগণ্য বিদ্যার্জন কাল পরিধি। কাল পরিধি যাই হোক, বিদ্যার্জন বহর আমার নেহাৎ কম ছিল না। জীবন দর্শন, সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন, জগত দর্শন, জগতের ভৌত কাঠামো-পৃষ্ঠ দৃশ্যাবলী নানা বিদ্যায়ই আমার স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ ছিল।

এই যে বসে আছি, এমন স্থানের বর্ণনা ভূগোলে পড়েছি, ভূমধ্যসাগরের কথা শুধু বই-পুস্তকেই পড়িনি,সেখানকার নানা জলযান দুর্ঘটনার কথাও পত্র পত্রিকাসহ নানা মাধ্যমে পড়েছি, জেনেছি। বইতে পড়েছি গালিভার এর সফর কথা, রবিনসন ক্রুসোর কথা, রহস্য দ্বীপ উপন্যাস কাহিনী – কই আমার এই গল্পের সাথে শুধু সেসবের স্থানিক মিল রয়েছে, বিষয়বস্তুর মিল বলতে কিছুই নেই।

আমি পড়াশোনায় ঢের আগ্রহী ছিলাম। আমার দরিদ্র অথচ সম্পদাকাংখী অধৈর্য পিতার সে আগ্রহে ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তিনি আমাকে প্রবাসে দিয়ে রাতারাতি ধনী বনতে চাইলেন। প্রেরণ সহায়ক দালালের আশ্রয় নিলেন যাচাই-বাছাইহীন। তারই নির্মম ফলশ্রুতি ট্রলার ডুবির পর আমার নিজেকে এই অজানা অচেনা নির্জন ধূ-ধূ চরে আবিষ্কার। আমি বস্তুত কিছুই জানি না আমার সম্মুখে পেছনে কতদূর কী আছে, কী নেই। আমার আত্মসস্মানবোধ প্রবল – বিপরীত লিঙ্গের যারা বিনা বিবেচনায় আমাকে ভিক্ষুক ঠাউরালেন, আমি নিজেকে কোনও ঠিকানায় উপনীত করার প্রশ্নে তাদের পশ্চাৎধাবনে নিজেকে ঠেলে দিতে সমর্থ হইনি।

আবার এও ভাবছি, আদৌ কি কোন মেয়ের দল সত্যিকারে আমাকে অতিক্রম করে গেছে, নাকি তা ছিল নেহাৎই আমার অতি ক্লান্ত হতাশাগ্রস্থ দুর্বল মনের কল্পলৌকিক ফসল, ইংরেজি পরিভাষায় যাকে বলে হ্যালুসিনেশন? আমি জানি না, শুধু জানি, যা দেখেছি তা সত্যি। সে সত্যির ওপর ভরসা করেই ভাবছি, একটু শক্তি ফিরে পেলে আমি ঠিক সেদিকটিই বেছে নেব, যেদিকে মেয়েগুলো কলহাস্যে গেছে। নির্ঘাত ওদিকে বেচে থাকার সহায়ক লোকাকয় আছে। কিন্তু শক্তি কি আদৌ ফিরবে আমার? পেটে দানাপানি নেই, ঘুম পাচ্ছে, বড় ক্লান্তি আচ্ছন্ন করছে আপাদমস্তক। আমি সোজা বসে থাকতে পারছি না। না সম্ভব হচ্ছে বৃক্ষ হেলানে থাকতে। এইতো এক দিকে কাৎ হয়ে যাচ্ছে শরীর ; ক্রম অবশ আচ্ছন্ন হচ্ছে তামাম অস্তিত্ব।

ঘুমিয়েছিলাম নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম জানি না। যখন সম্বিত এলো, দেখলাম আলো বলতে কিছু নেই। সম্মুখে আবছা অন্ধকার। সূর্য মাত্রই অস্ত গেছে বোধ করি। কিছুটা শীত শীত ভাবও এসেছে। এতক্ষণ সূর্য খুঁজতে দৃষ্টি ওপর দিকে ছিল। তা নিচে নামিয়ে পা বরাবর তাকাতেই সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। কেউ একজন বসে আছে আমার পায়ের কাছে। আবছায়ায় স্পষ্ট ধরা পড়ল সে মানুষ এবং আমারই মতো জীর্ণ দশার, জীর্ণ বেশভূষার কেউ। পার্থক্য শুধু তার লম্বা সাদা চুল দাড়ি ভ্রু আর খুদে চাউনিতে। বললাম, কে আপনি?

আগে বলো তুমি ক্যাঠায়। চেঁচালেন তিনি।

মানুষ, বিপদগ্রস্থ মানুষ। আপনি?

আমি এই রাজ্যের এক অভাগা মানুষ, ভিক্ষুক।

ভিক্ষুক!

হ্যালা করতেছ বোধ করি? তোমারে তো দেখতে ভিক্ষুকের চাইয়াও দীন দরিদ্র মনে হইতেছে। নইলে তো আর তোমার পায়ের কাছে আইসা বসতাম না। জাতভাই বলতে একটা কথা আছে না?

হুম, তা আছে।

তা তুমি এইখানে পইড়া আছ যে, কী কারণ?

আমি অনেকের সাথে সমুদ্র পথে যাচ্ছিলাম ভিন দেশে। ট্রলার ডুবিতে মরার দশা হয়। সাঁতরিয়ে এসে কোনমতে প্রাণ নিয়ে তীরে উঠি। অনেকক্ষণ মনে হয় অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে লোকালয়ের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকি। শরীর মন ভয়ানক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই গাছটা দেখে মনে আশা জাগে। এর নিচে বসে পড়ি। ভাবি, গাছ যেহেতু আছে, নিশ্চয়ই লোকালয় ধারেকাছে থাকতেও পারে।

বুঝছি, তুমি ভিনদেশি। পলাইয়া অন্যায়ভাবে ভিনদেশে যাইতাছিলা। তা নিজের দেশে বিক্কাই কইরা খাইতা। নাকি বিক্কার নিয়ম নাই তোমার দ্যাশে?

আছে, কিন্তু সবার পক্ষে তা করা সম্ভব হয় না।

অহন কী করবা? এইহানে বইয়া থাইকা পইচা মরবা? নাকি যাইতে চাও আমার লগে? বিক্কুক হইলেও তোমারে মরার মুখে ফালাইয়া তো যাবার পারি না। আমিও মানুষ, তুমিও মানুষ। মানুষ হিসাবে মানুষের প্রতি একটা কর্তব্য থাকে। কী কও তুমি যাওয়ার ব্যাপারে?

কই যাব আপনার সাথে?

ও– আবারো বোধ করি হ্যালা করতেছ। কই আর যাবা? যাবা আমার ডেরায়। ভিক্ষুকগো আর থাকপার জাগা কই এই দ্যাশে?

কোনদিকে আপনার ডেরা?

উই যে দেখতাছো মাটির ঢিবাগুলান, ওইধারেই আমার ডেরা।

মেয়েগুলোকে আমি ওইদিকেই যেতে দেখেছি। অন্যমনস্ক বলে উঠলাম আমি।

কী বললা? মাইয়া মানুষ দেখছ? সুন্দুরী মাইয়ার জাঙ্গাল? খবরদার, মাইয়াপ্রাণীর কথা আর মুখে আনবা না। ভিক্ষুকের মুখে ওইসব কথা মানায় না। মনে রাখবা, তুমি নিজের দ্যাশে যাই হইয়া থাক না ক্যান, এইহানে তুমি ভিক্ষুক, এই দ্যাশেরই ভিক্ষুক। আমার লগে আমার ডেরে থাকবা, আমার লগে লগে ভিক্ষা মাগবা – বাঁচতে পারবা। অন্য পরিচয় দিলেই ধরা খাইয়া মারা পড়বা। কী কও তালি, রাজি আছো নাকি?

জি আছি।

তালিপরে আমার লগে চলো আমার ডেরায়।

চলুন।

আমরা দুজন হাঁটতে থাকি। ভিক্ষুক লোকটি আগে ও আমি পেছন পেছন। আবছায়াটা এরই মধ্যে অন্ধকারে রূপ নিয়েছে। অমাবস্যার কাল বোধ করি। দুর্বল শরীরে ভীষণ কষ্ট করে হাঁটছি। থেকে থেকে উবু হয়ে পড়ে যাওয়ার দশা হচ্ছে। ভিক্ষুক লোকটি তা টের পেয়ে বললেন, হাঁটতে কষ্ট হইতেছে মনে হয়। আসমানে চাঁন্দ নাই। পেটে খিদা, আমার কাছে কোন সুখাদ্য নাই। কাঁচা ময়লা আস্তা ভুট্টা আছে কিছু। আমি তো খাদ্যের ভিক্ষুক না। বিক্কায় টেকাপয়সা লই। ঝোলায় মশকে কিছু পানি অবশ্যি আছে, দুর্গন্ধ পানি। পান করবা? পেট চালানির সম্ভাবনা আছে।

আমি পানি পান করব না। বললাম আমি।

কষ্ট কইরা চলো। তোমারে যে ধইরা লইয়া হাঁটমু সেই বয়স আর শক্তি আমার নাই। আমি নিজেই আতুর ন্যুলা মানুষ। তার উফর বুড়া হইছি।

সাহায্য লাগবে না, চলুন।

আইচ্ছা, আসো পিছে পিছে।

আর কতদূর?

এইতো আইসা পড়লাম বইলা। উই যে বিজগোবি আঁন্ধার – ওইগুলান ঝোপজঙ্গল। ওইহানেই আমার ডেরা। মনে সাহস আনো। নিজেরে দুর্বল ভাবলি যাইতে সমর্থ হবা না। মনের জোর হইল বড় জোর। আমারে দেহো, কিভাবে চলি।

জি চলুন।

বেশ কিছুক্ষণ অতি কষ্টে হেঁটে শেষ পর্যন্ত ভিক্ষুক লোকটির ডেরায় পৌঁছি। একটা সুরঙ্গ পথে অগভীর এক ঢালে তিনি নামলেন আমাকে নিয়ে। ঝোলা থেকে দেশলাই নিয়ে কুপি জ্বাললেন। দুর্বল ক্লান্ত শরীর, তবু চারদিকে চেয়ে দেখলাম অতি জরাজীর্ণ কুটির- নির্জন। ডেরার গায়ে হেলানে বসে পড়ি আমি। লোকটি প্রথমে তার মাটির পাত্র থেকে পানি ঢেলে খাওয়ালেন আমাকে। মনে হলো, পানি নয় যেন কোন অলৌকিক জীবন সুধা পান করলাম আমি। খানিক বাদে একটা মাটির বাটিতে করে গুড়া জাতীয় কোন খাবার ঢেলে পানি মিশিয়ে খাওয়ালেন তিনি আমাকে। এরপর রাজ্যের যত ঘুম নেমে আসে চোখে। শীঘ্র তলিয়ে যাই সংজ্ঞাহীন রাজ্যে।

যখন ঘুম ভাঙে তখন ভোর। বাইরের আলো এসে পড়েছে কুটিরে। দূরে কোথাও জীবজন্তু পাখপাখালি শব্দ করছে। ভিক্ষুক লোকটি প্রথমেই জানতে চাইলেন আমি কেমন আছি। তারপর যাবতীয় প্রাতঃক্রিয়া করালেন আমাকে দিয়ে। সকালের নাস্তা খাওয়ালেন ভুট্টার ছাতু জাতীয় খাবার -অমৃতের স্বাদ যেন তাতে পেলাম। একই খাবার দুপুরের জন্যও রেখে বাইরে যাবার কথা পাড়লেন তিনি। জানালেন, আগের দিনের মতো একই সময়ে আজও ফিরবেন। সতর্ক করলেন দিনমান আমি যেন কুটিরের ভেতরেই অবস্থান করি। ভুলেও যেন বাইরে পা বাড়াবার বিষয়টি মাথায় না আনি। আমি মাথা নেড়ে সায় জানাই। তিনি কুটিরে বার শিকল তুলে চলে যান ভিক্ষার উদ্দেশ্যে।

ভিক্ষুক কুটিরে স্থবির কাটলেও ভিক্ষুক লোকটির বদান্যতায় ক’ দিনের মাথায় আমি অনেকটা সুস্থ তথা চাঙা হয়ে উঠি। এক সন্ধ্যায় বার থেকে ফেরার পর লোকটি ঝোলা ঝেড়ে ভিক্ষালব্ধ টাকা পয়সা গোনার ফাঁকে বললেন, আগামী দিন আমার ছুটি, ভিক্ষা-ছুটি। ভাবতেছি কালকে তোমারে নিয়া বাইরে বাইর হবো।

কেন? কৌতূহলে বললাম আমি।

তুমি ভিনদেশি। আমার দ্যাশ দেখাব না তোমারে?কতকিছু দেখার আছে! কী বলো তুমি? রাজি?

জি রাজি।

তবে কথা হইল, তোমার কিন্তু ভিক্ষুক সাইজাই বাইর হওন লাগব। বেশি ভাব লওয়া যাব না, বুঝলা?

কী আর ভাব নেব? ভিক্ষুক বেশেই তো আছি।

তুমি আমারে দাগা দিয়া কথা বলতেছ। ইচ্ছা করলে তোমারে আমি নতুন জামা কাপড় কিনা দিবার পারি। কিন্তু তোমার ভালোর লাইগাই তা দিতাছি না। তুমি সাজগোছ করলে ভিনদেশি হিসাবে ধরা খাইয়া যাবা। হেইডা কি তুমি চাও?

না না, তা চাই না।

তবে ভিক্ষুক বেশেই দুইজনা বাইর হবো।

জি।

পরদিন সাতসকালে বাইরে বেরিয়ে পড়ি দুজন। বেশ কিছুদূর হাঁটি আমরা। আমি ভেবেছিলাম আমাকে হয়তো কোনও শহর বা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু দেখলাম আমাকে একটা সুউচ্চ পাহাড়ের কাছে নিয়ে আসা হয়েছে। সুদৃশ্য পাহাড়, গা থেকে কলকল ঝর্ণা নেমে এসেছে। মিষ্টি বাতাস বইছে, পাখি উড়ছে। পাখি দেখার ছলে ওপরে তাকাতে দেখলাম পাহাড়ের গায়ে বেশ বড় এক সাইনবোর্ড। তাতে এই বড় বড় হরফে লেখা :

পাহাড় মনিকাঞ্চণ

প্রতিষ্ঠাতা: রাজাধিরাজ মহামহিম মেহমুদ জব্বর আলী জবরদস্ত প্রপিতামহ

প্রতিষ্ঠাকাল: — খ্রিস্টাব্দ

বললাম, এ কিসের সাইনবোর্ড?

এই পাহাড় হইল গিয়া আমাগ বর্তমান রাজা সাহেবের দাদার বাপের প্রতিষ্ঠা করা পাহাড়। সেই সাইনবোর্ড।

পাহাড় কি কেউ প্রতিষ্ঠা করতে পারে? তাও আবার এত বড় পাহাড়! এ কেমন কথা?

এই দ্যাশে এমনতরই নিয়ম। খালি এইডা ক্যান, এর চাইতে বড় যত পাহাড় আছে, পর্বত আছে, সব কিছুর মালিক আমগ রাজা সাহেবরা।

আশ্চর্য!

চলো এইখান থেইকা সইরা পড়ি। ভিক্ষুক হইয়া পাহাড় দেহনডা কোন নিরাপদ কাজ না। বেশি সময় দেখলে সমস্যা হইবার পারে।

আচ্ছা চলুন।

আমরা আবারও হাঁটতে থাকি। হেঁটে সুবিশাল এক বনের প্রান্তে এসে থামি। বটগাছ জীবনে কম দেখিনি। কিন্তু এত বড়, এতটা প্রাচীন গাছ, বিশেষত বটের সুবিশাল এমন বন একেবারে কল্পনাতীত। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। একেবারে নাক বরাবর বন্ধ বিস্তৃত সুউচ্চ প্রবেশদ্বারের বর্ণিল সাইনবোর্ড খুব সহজে দৃষ্টি কাড়ল। তাতে লেখা :

বন বটেশ্বর

প্রতিষ্ঠাতা : রাজাধিরাজ মহামহিম মেহমুদ জব্বর আলী জবরদস্ত প্র -প্রপিতামহ।

প্রতিষ্ঠা : —– খ্রিস্টাব্দ

এমন সুপ্রাচীন দিকবিস্তারী বন, বটবন – তারও আবার প্রতিষ্ঠাতা!

হ্যাঁ, এই দ্যাশের যত বন মহাবন আছে, হগলতেরই স্রষ্টা আমাগ রাজাধিরাজ এর বংশধরগন।

বিস্ময়কর!

বিশময় রাইখা এইবার চলো। গাছের ডাইলে গোরিলাগুলান কেমন কটমট কইরা তাকাইতাছে।
একবার চিল্লানি ফালাইলে কানে তালা তো লাগবই, অধিকন্তু ভিক্ষুক হইয়া বটের বন দেখনের জন্য ঘোরতর বিপদ ঘনাব। তার উফর তুমি আবার ছদ্মবেশি ভিনদেশি। চলো আইজের মতো দুরোতো ডেরায় ফিরি।

জি চলুন।

আমরা দ্রুত বেগে হেঁটে ভিক্ষুক ডেরায় ফিরি। সেদিনের মতো দুজন ডেরাতেই অবস্থান করি।
সন্ধ্যায় ভিক্ষুক লোকটি বললেন, শুনো, তোমারে
ডেরায় বসাইয়া খাওয়ান আমার জন্য কোন অসম্ভব ব্যাপার না। কিন্তুক তাতে কইরা তোমারই ক্ষতি হইব। ডেরায় শুইয়া বইসা খাইয়া খাইয়া শরীলে ত্যাল বাইন্ধা গেলে নানান অসুখ বাসা বানব। তাতে কইরা অকালে মারা পড়বা তুমি এই দূর দ্যাশে।

কী করব তবে?

কী আর করবা? পলাতক ছদ্ম জীবনে বিক্কা ছাড়া আর কী কাজ করার আছে? কাইলেত্তান তাই আমার লগে বিক্কায়ই বাইর হবা। দুই জনা একলগে বিক্কা করমু আর আর গান গামু :

আমরা বিক্কা কইরা খাই
দুই জনা বিক্কা কইরা খাই
হানকি দুই হান হাতে লইয়া
বিক্কার গান হুনাই।

কী, পারবা না এই গান গাইতে?

জি পারব।

পরদিন থেকে আমি নিয়মিত লোকটির সাথে ভিক্ষার গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেরাই। ভীষণ না পছন্দের কাজ হলেও বাঁচার তাগিদে একান্ত বাধ্যগত হওয়াতে কিছু করার থাকে না। এ কাজে নির্বিঘ্নেই কাটে বেশ কিছু দিন। একদিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে লোকটির কাছে অনুরোধ করে ভিক্ষা ছুটি নিই। সেদিন সন্ধ্যায় লোকটি ডেরায় ফিরেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, এইবার দুই জনার বিপদ বুঝি ঘনায়া আসলো, কী কই শুনতাছ?

জি। কিন্তু কেন? কী হয়েছে? উদ্বেগে বললাম আমি।

এক মানব পাচার দালাল তোমার আমার গতিবিধি লক্ষ্য কইরা সন্দি কইরা ফালাইছে।

এখন?

অহন আর কী? ডেরায় হানা হইব।

কেমন হানা?

এই ধরো, আমরা যুদি দালালগো কাছে আত্ম-সমর্পণ করি, তালিপর আমগো ধইরা লইয়া বনের মধ্যে আন্ধার ডেরায় আটকাইয়া রাইখা মুক্তিপণ দাবি করব। টেকা যে কয়দিন না পাব হেই কয়দিন শারীলিক ওত্যাচার করব। হাঁসমুরগী পশুর অখাদ্য কুখাদ্য খাইতে দিব। পচা পানি পান করাব। আবার যুদি আত্ম-সমর্পণ না করি সারাক্ষণ তাকে তাকে থাইকা আমাগ আইনের কাছে ধরাইয়া দিয়া জেলে পচাইয়া মারনের ব্যবস্থা করব।

এখন উপায়? আমি কাঁদো কাঁদো বললাম।

উপায় একখান আছে। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হও। অহনই ডেরা থেইকা বাইর হওন লাগব। আইজ রাইতের মধ্যেও তারা হানা দিবার পারে।

জি, হচ্ছি রেডি।

লোকটি আমাকে নিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লেন পথে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে পথ চলতে লাগলাম দুজন। চলতে চলতে একটা স্থাপনার সামনে এসে থামলেন তিনি। আমিও। স্থাপনায় তাকিয়ে বললাম, এটা কী?

এইডা হইল গিয়া ভাঙ্গা সরাইখানা।

এ রকম বিশ্রী ভাঙ্গা কেন?

ভাঙ্গা আর কিয়ের জন্য, ভাঙ্গা হইছে। বর্তমান রাজারা ক্ষেমতায় আইসাই এইডা ভাঙছে।

কেন?

এইডা হইল আগের রাজাগ আত্মীয় পরিজনের সরাইখানা।

তা এখনকার রাজারা ভেঙেছেন কেন?

আহা ভায়া, ওই পশ্চিমের ধারে চিকনা চাঁন্দ যে উঠছে, কী কয় ওইধাররে?

দিগন্ত, পশ্চিম দিগন্ত।

হ হ হ, ওইধারে গেল বছর আছমান থিকা ঠাঠা পইড়া বর্তমান রাজাগ আত্মীয়গ ঘরবাড়ি পুইড়া ছাই হইছিল। বর্তমান রাজারা কইছে হেইডা বলে আগের রাজাগ লোকজনের বিশেষ কারসাজি আছিল। তাগো জ্ঞাতিগুষ্ঠিত আবার পীর ফকির আছে। হ্যাতেরাই বলে বদদোয়া আর বুজুর্গি খাটায়া আসমানেত্থোন ওই ঠাঠাখানা টাইনা আইনা নিচে ফালাইছিল। কাজেকর্মেই বর্তমান রাজারা তাগোর পরাজিৎ কইরা অছ পরথম এই সরাইখানা ভাইঙ্গা পোরতিশোধ লইছে।

হুম, তাহলে বর্তমান রাজাগন এক বছর ধরে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু তারা আসার আগেও কি ওই বন, পাহাড়গুলো তাদেরই ছিল? ওইসব প্রতিষ্ঠাকেন্দ্রিক সাইনবোর্ড?

তোবা তোবা, কী কও এইসব? তারা আওনের আগে বন পাহাড়গুলান তাগোর আগের রাজাগ নামে আছিল। তহন ভিন্নতর সাইনবোর্ড আছিল। তাগর নিজ জ্ঞাতিগুষ্টির নামে।

হুম, বুঝেছি? এখন কী করব?

এত কতা না কইয়া আগে এই ভাঙ্গা সরাইখানার মধ্যে ঢুকো জলদি।

বেশিহন বাইরে দাঁড়ায়া থাকন নিরাপদ না। ডরাইও না। ভিতরে অনেক হিয়াল কুত্তাও থাহে, অন্য নানান পেরাণিও থাকপার পারে।

তাহলে?

তুমি থাকপা একটা ডেরায়। বাইরেথোন আমি ভালামত আটকায়া দিয়া যামু। দিনের বেলা এক ফাঁকে আইসা খাবার দিয়া যামু।

আপনি কোথায় থাকবেন?

আইজের রাইত ডেরার আশেপাশে কুনহানে থাইকা সব লক্ষ্য করমু। আশমকা দেখলে শিগগির দুইজনা দ্যাশ ছাড়মু। ঢুকো জলদি ভিতরে। এই যে এই আন্ধার দরজা দিয়া ঢুকো।

জি ঢুকছি।

একটা টর্চলাইট নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্দশায় সে অন্ধকার পরিত্যক্ত ভাঙা বিধ্বস্ত সরাইখানার প্রকোষ্ঠে দিন যাপন করতে লাগলাম আমি। দিন সাতেকের মাথায় রীতিমত অসহ্যকর হয়ে উঠল জীবন। এক সন্ধ্যায় খাবার দিতে তথা খোঁজ খবর নিতে এলে ভিক্ষুককে আমার অধিকন্তু এভাবে দিনাতিপাতে একান্ত অপারগতার কথা জানালাম। তিনি ফিসফিস করে জানালেন তিনিও প্রায় আমারই মতো পলাতক তথা ফেরারি জীবন যাপন করছেন ও হন্যে হয়ে পরিত্রাণের পন্থা খুঁজছেন।

দিন তিনেক পরের সন্ধ্যায় তিনি জানালেন একটি পথ তিনি এরই মধ্যে বের করেছেন এবং আসন্ন ভোর রাতে এখান থেকে চির মুক্তির উদ্দেশ্যে তিনি আমাকে বের করে নিয়ে যাবেন। আমাকে সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলে তিনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। ওই ভীষণ দুর্দশাগ্রস্থ মনো-দৈহিক প্রকট দুর্বলাবস্থায়ও মুক্তির উত্তেজনায় রাতের প্রহরগুলো আমার নির্ঘুম কাটতে লাগল। ভোর রাতের অপেক্ষায় অধীর হয়ে রইলাম।

ভোররাতে আমরা দুজন নির্জন পথে হাঁটতে থাকি। অন্ধকার তখনও গাঢ়। সেই গাছটি, যেটির নিচে বসা অবস্থায় লোকটির সাথে আমার সাক্ষাৎ, সেটির কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ালাম আমি। লোকটি আমাকে হাঁটার ইঙ্গিত করে সোজা দক্ষিণে ঘুরে হাঁটা ধরলেন। যতদূর চোখ যায় ধূধূ বালুচর। একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। দেখলাম অদূরে বিস্তৃত উঁচুভূমি। তিনি ফিসফিস করে বললেন, এইটা হইল মালভূমি, চিনো? এইহান থেইকা বাইর হওনের এইটাই একমাত্র পথ। তবে এখন থেইকা খুউব সাবধান! এই মালভূমি তিনদিন আগে সাবেক রাজা সাবরা দখলে নিয়া প্রতিষ্ঠাতা বইলা নিজেগ নামে সাইনবোর্ড টাঙ্গাইছে। সুতরং তাগ অনুচর সিপাইরা আশেপাশেই থাকব। এখান থেইকা কিছুদূর আমরা বালুতে হামাগুড়ি দিয়া দিয়া আউগাইয়া যাব। কিন্তুক খুউব হুশিয়ার! মনে রাখবা, ধরা পড়ছ তো মরছ।

জি চলুন। আমি ফিসফিসালাম।

হেঁটে হামাগুড়ি দিয়ে চরম কষ্ট দুর্দশায় একটা সময় আমরা সমুদ্র তীরে এসে উপস্থিত হই। দেখলাম মাঝ সমুদ্রে আকাশ হলুদাভ হয়ে উঠেছে। লোকটা সেদিক দেখিয়ে বললেন, সূর্য উঠতেছে। ওই বরাবরে আমরা যাব, বুঝলা? একেবারে সূয্যু বরাবর।

কিন্তু কিভাবে? চেঁচালাম আমি।

আস্তে কথা কও। ওই যে দেখো ছোট্ট ডিঙি। কোনও জায়গা থেইকা ভাইসা আইসা ওইটা ওই যে দূরের ঝোপ জঙ্গলের লগে আটকাইয়া আছিল। বহুত দিন খোঁজ খবর রাখতে রাখতে আমি ওইটার সন্ধান পইছি। গতরাত্রে পানি সেইচা এইখানে আইনা বাইন্ধা রাইখা গেছি। জলদি উইঠা পড়ো। দেরি করলে পস্তাবা।

ওগুলো কী? হঠাৎ চমকে ওঠার সাথে বললাম আমি।

দুড়া কচ্চপ, হামগর, তিমুর মাছ চিনো না? সমুদ্দরের যত জীব। এইভাবেই এরা থাহে। কতক চরে উঠে, কতক পানিতেই থাহে৷ ডরের কিছু নাই। ডরাইলে যাইতে পারবা না। হয় দালালের অত্যাচারে আন্ধারি জঙ্গলে না খাইয়া মরবা, নইলি পর জেলে পইচা মরবা। উঠো জলদি।

ঝটপট ডিঙায় উঠে বসি দুজন। সামনে নিঃসীম সমুদ্র, ডিঙাটা একেবারে ছোট। অথচ কোনও ভয়ের রেশ এখন টের পাচ্ছি না ভেতরে। কী এক ভালো লাগায় নেচে উঠছে সমস্ত, শরীর মন। সূর্য এরই মধ্যে ওপরে উঠে গেছে। নতুন এক পৃথিবী দেখছি, অবাক বিস্ময়কর পৃথিবী। প্রাণপণে দাড় টানতে থাকি দুজন।

অনেকটা দূর এগিয়েছি আমরা। মাঝপথে চারদিগন্তের স্থানে স্থানে খণ্ডবিখণ্ড মেঘ দেখে মনের ভেতর একবার শুধু উথলে উঠল এক প্রশ্ন : যদি কোনও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় ডুবে মরি এই নিঃসীম মহাসমুদ্রে? পরক্ষণে অবাক ঝলসানো সূর্যের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ভয় কিসের? আমরা তো এখন স্বেচ্ছা মুক্ত, চলনে সূর্যমুখী।

শওকত নূর | Shawkat Noor

Bengali Story 2023 | তিন্নির ফড়িং আর মানুর কারসাজি | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Bengali Novel 2023 | ফিরি বিশল্যকরণী (পর্ব ৭) | উপন্যাস

Bengali Story 2023 | লুনি বা টুনী | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Bengali Story 2023 | স্বপ্নের জোনাকিরা | গল্প ২০২৩

suryamukhi film | suryamukhi in hindi | suryamukhi resort | suryamukhi odia song download | suryamukhi ka phool | suryamukhi flower | suryamukhi oil | surajmukhi in hindi | suryamukhi oil price | suryamukhi ayurved college ranchi | suryamukhi ka vaigyanik naam | suryamukhi ki kheti | arka suryamukhi | keshav suryamukhi college of education | hotel suryamukhi | suryamukhi plant | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Shabdodweep Writer | Shabdodweep | Shabdodweep Founder | suryamukhi business | suryamukhi nursery | suryamukhi film song | suryamukhi bengali story | suryamukhi gift | suryamukhi movie song | bengali story suryamukhi | suryamukhi pdf book | suryamukhi pdf download | story suryamukhi download | suryamukhi video download | suryamukhi images

Leave a Comment