Bengali Story 2023 | ওরাই আমাদের কর্ণধার (শিশুকিশোর) | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Sharing Is Caring:

ওরাই আমাদের কর্ণধার (শিশুকিশোর) [Bengali Story]

খোকন খুব ভালো রেজাল্ট করে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেছে। বাবা শাহেদ ও মা যূথীর একমাত্র আদরের সন্তান খোকন। দিনকালের যা অবস্থা! খোকনকে কোথাও একা ছাড়তে চায় না বাবা মা। তাঁদের সাধ্যানুযায়ী ছেলের চাওয়াগুলো পূরণ করতে চেষ্টা করে। তবে খোকন খুব লক্ষ্মী ছেলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন চাওয়া নেই ওর, তেমন কোন বায়না বা আবদার ও নেই । শান্ত প্রকৃতির বলে স্কুলের শিক্ষকসহ সবাই খোকনকে খুব স্নেহ করে ও ভালোবাসে। কয়েকদিন ধরেই যূথীর শরীরটা বেশ খারাপ। প্রতিদিন ছেলেকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া তাঁর পক্ষে বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আবার স্কুলও কামাই করা যাচ্ছে না কারণ বেশ কড়াকড়ি খোকনের স্কুলের নিয়মকানুন। কৈফিয়ত দেওয়া, দরখাস্ত করা, এসব অনেক ঝামেলার ব্যাপার। তাই শাহেদ ও যূথী দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, এই কয়েকটা দিন তাঁদের বুয়া জরিনার ছেলে রাজিবকে দিয়েই খোকনকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করাবে। বিনিময়ে ওকে কিছু টাকা দিয়ে দিবে।

রাজিব বয়সে খোকনের থেকে দুই তিন বছরের বড়ো হবে। বেশ বুদ্ধিমান আর চটপটেও। মাঝে মাঝেই যূথী রাজিবকে দিয়ে টুকটাক বাজারহাট, ঘরের কিছু কাজকর্মও করায় আর বিশ্বাসীও বলে মনে হয়। দেখে বেশ ভদ্রই লাগে ছেলেটাকে। এদিকে রাজিব মায়ের মুখে খোকনকে স্কুলে নিয়ে যাবার কথা শুনে খুশিতে আটখানা!

— মা, এই ট্যাহা দিয়া মুই একটা জ্যাকেট কিনুম। মোর বড় শখ্ খোকন ভাইয়ার লাহান ঐরহম একখান জ্যাকেট পিন্দনের!

জরিনা নিশ্চুপ।

— ও মা, কতা কওনা ক্যা ? ট্যাহাডা মোরে দিবা না?

— ওরে বোহা ছেমড়া, এই ট্যাহায় কি তোর ঐ জ্যাকেটের দাম অইবে!

রাজিবের মনটা খারাপ হয়ে যায়,

—কতো ট্যাহা দিব মা?

— মোরে তো হেইডা কয় নাইরে বাজান? কতো আর দিব, দুই তিনশো ট্যাহাই!

পরদিন সকালবেলা যথাসময়ই রাজিব খোকনদের বাসায় এসে হাজির হয়, কলিং বেল টিপে। যূথী দরজাটা খুলে দিয়ে,

— ও, তুই এসেছিস? বলে খোকনকে ডাকতে যায়।

খোকন এসে দেখে রাজিবের গায়ে একটা পাতলা ফুলহাতা গেঞ্জি আর পাতলা ফিনফিনে একটা লুঙ্গি পড়া। বুকের উপর হাত দু’টো জড়সড় করে শীতে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে আছে । খোকনকে দেখেই বলে উঠে– চলেন ভাইয়া।

পিছন থেকে যূথী এসে খোকনের স্কুল ব্যাগটা রাজিবের হাতে ধরিয়ে দেয়,

— খোকনকে সাবধানে নিয়ে যাস্ কিন্তু আর ছুটি না হওয়া পর্যন্ত তুই স্কুল গেটের সামনে বসে থাকবি কেমন?

রাজিব ব্যাগটা নিজ কাঁধে ঝুলিয়ে ; দায়িত্বের সাথে মাথা নাড়ায় ,

— আইচ্ছা আন্টি।

খোকনের স্কুল অবশ্য বেশী দূরে নয়। গলিটা পার হয়ে দু’ একটা বাড়ির পরেই। রাতে ঘুমানোর সময় খোকন মাকে প্রশ্ন করে,

— আচ্ছা আম্মু, রাজিবের গায়ে গরম কাপড় নেই কেন?

খুব স্বাভাবিকভাবেই যূথী উত্তর দেয়,

— শীত লাগেনি তাই পড়েনি। এমনিও গরীবদের শীতটা একটু কমই থাকে বাবা!

খোকন একটু জোর দিয়েই বলে উঠে,

— না, না থাকে, তুমি দেখলে না, ও কেমন শীতে কাঁপছিল?

যূথী একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— তুমি এখন ঘুমাও তো খোকন, মাথায় শুধু উদ্ভট উদ্ভট প্রশ্ন! রাস্তার বাচ্চাদের দেখলে, ওদের বাড়ি নেই কেন? ঈদে ওদের জামা নেই কেন? ওরা স্কুলে পড়ে না কেন? যত্তসব!

তারপর আরও একটু উচ্চস্বরে,-

— এগুলো ফালতু বিষয় নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, তুমি তোমার লেখাপড়া নিয়ে ভাবো, বড় হলে সব বুঝবে।

খোকন আর কোন কথা বলে না ; আম্মুটা যে কী! কোন কথা বল্লে সবসময় রেগে যায়, থাক্ আর কিছু বলবে না সে; আব্বুর কাছ থেকেই না হয় সব জেনে নিবে।বালিশে মাথা রেখে ঘুমাতে চেষ্টা করে খোকন।

কয়েকদিনের মধ্যেই যূথী সুস্থ হয়ে উঠে। এখন থেকে সে নিজেই আবার ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়া করে। একদিন ছেলেকে স্কুল ড্রেস পড়াতে যেয়ে ওর জ্যাকেটটা আর খুঁজে পাচ্ছে না। খোকনকে জিগ্যেস করায়, খোকন কোন উত্তর না দিয়ে, ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মা অবাক হয়ে,

— কী হলো, উত্তর দিচ্ছ না যে?

আমতাআমতা করে খোকন বলল,

— আম্মু… মানে…ওটা চুরি হয়ে গেছে! –

— এ্যামা! এতো দামী জ্যাকেটটা হারিয়ে ফেল্লে, কেমন করে?

— জ্যাকেটটা খুলে আমি স্কুল মাঠে খেলছিলাম, এসে দেখি ওটা আর নেই।

এ কথাটা শুনার সাথে সাথেই যূথী খুব রেগে যায়,

— কী, স্কুলের ভিতর চুরি করা! দাঁড়াও আজই প্রিন্সিপালের কাছে অভিযোগ করবো।

— থাক্ না আম্মু, আমার তো আরও অনেক জ্যাকেট আছে। ওখান থেকে না হয় একটা পড়িয়ে দাও।

— তাতো দিবই, কিন্তু চুরির ব্যাপারটাতো স্কুলে জানাতেই হবে। এটাও যদি আবার চুরি করে, চোরকে তো ধরতে হবে তাই না?

স্কুলে যেয়ে যূথী, প্রিন্সিপালের রুমে এ নিয়ে কথা বলে আর কে চুরিটা করেছে তা খুঁটিয়েও দেখতে বলে। প্রিন্সিপাল কিছুটা লজ্জিত হয়ে, এ বিষয়টা তিনি নিজেই দেখবেন বলে যূথীকে আশ্বাস দেন; এটা তাঁর স্কুলের জন্য একটা দুর্নামও বটে!

আজ ছুটির দিন। এই দিনে একটু বেলা করেই উঠে যূথী। শাহেদ এসে ঘুমন্ত যূথীকে ডেকে তুলে,

— এই যূথী? দেখ, ন’টা বাজে বুয়া তো এখনো এলো না।

যূথী চোখ মেলে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়, প্রায় ন’টা বাজে, মেজাজটা খারাপ করে,

—- ধ্যাত, আমি এখন রান্না করতে যাবো!

শাহেদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

— নাস্তাটা কিনে আন প্লিজ!

বুয়া না এলে, শাহেদকে প্রায়ই বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়, এটা নতুন কিছু না। বেশি দূরে অবশ্য যেতে হয় না। গলিটা পেরুলেই বড় রাস্তার উপর লাইন করা কয়েকটাই ভালো খাবার হোটেল আছে। শাহেদ খোকনকে সাথে নিয়ে ওখান থেকে নাস্তা কিনে আনে। যূথী টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে চুলোয় চায়ের পানি দিতে যাবে, এমন সময় কলিং বেলের শব্দ; ঐ বুঝি বুয়া এলো! এক দৌড়ে দরজাটা খুলে দেয়। খুলেই যূথীর চোখ দু’টো ছানাবড়া,

— একি! তোর এত্ত বড় সাহস, বলেই ঠাসঠাস করে কষে গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়। তারপর কান ধরে টানতে টানতে ঘরের ভিতর নিয়ে আসে।

যূথীর চেঁচামেচি শুনে শাহেদ আর খোকন তাড়াতাড়ি ছুটে আসে, কার সাথে রাগারাগি করছে যূথী?

এসে দেখে রাজিব। শাহেদকে দেখে যূথী আরও অগ্নিমূর্তি হয়ে,

— দেখ, দেখ ওকে আমাদের বিশ্বাস করার ফল! এই কয়েকটা দিন মাত্র, খোকনকে স্কুলে আনা নেওয়া করেই খোকনের দামী জ্যাকেটটা কেমন গায়েব করে ফেল্ল! রাগান্বিত দৃষ্টিতে রাজিবকে – এতো বড় চোর তুই?

রাজিব আকুতি করে কিছু বলতে যায়.. কিন্তু যূথী সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই, আবার রাজিবকে মারার জন্য হাত উঠায়, অমনি শাহেদ যূথীকে থামায়,

— দাঁড়াও যূথী, ও কী বলতে চায়, আগে শোনো?

— কী আর বলবে, মিথ্যে বানিয়ে সাজিয়ে কিছু বলবে?

রাজিবের গাল গড়িয়ে তখনও টপ্ টপ্ করে চোখের জল ঝরেই যাচ্ছে। শাহেদের কথা শুনে, একটু সাহস সঞ্চার করে রাজিব কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

— আন্টি মুই চোর না! ভাইয়া এই জ্যাকেটখান নিজ হাতেই মোরে দেসে, মুই নেতে চাই নাই কিন্তু ভাইয়া কতা হুনে নাই, জোর কইরাই মোরে দেসে।

সব শুনে শাহেদ যূথীর দিকে তাকায়,

— হুম, রাজিব ঠিক কথাই বলছে। চুরি করলে নিশ্চয়ই এই জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে, ও এখানে আসতো না?

চোখ মুছতে মুছতে রাজিব আবারও বলে,

— শুধু মোরে না, রাস্তার ঐ ছেমড়া দুইডা, পল্টু আর বিল্লাল হেগোরেও ভাইয়া নিজের দুইডা শাট দেসে।

যূথী এবার খোকনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বলল,

— এতো বড়ো মিথ্যে কথা কেন বল্লে আমায় তুমি? আমি দু’দিন অসুখে পড়েছিলাম আর তুমি এতো কাণ্ড ঘটিয়েছ?

শাহেদ এবার খোকনকে জিগ্যেস করে,

— বাবা, রাজিব যেগুলো বলেছে সেগুলো কি সত্যি?

ভীতিগ্রস্ত হয়ে খোকন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। খোকনের করুণ চেহারা আর যূথীর রাগান্বিত চেহারা দেখে শাহেদ পরিস্থিতি সামলিয়ে বলল,

— ঠিক আছে যূথী, একটু শান্ত হও, রাতের বেলায় না হয় ধীরেসুস্থে, খোকনের কাছ থেকে সব জেনে নিব, কেন এমন মিথ্যে কথাগুলো বলল।

এমন সময় যূথীর মুঠোফোনটা বেজে উঠে। রিসিভ করতেই ওপার থেকে,

— হ্যালো, আপনি কি খোকনের আম্মু বলছেন? আমি খোকনের ক্লাস টিচার বলছিলাম।

— জ্বি, আমিই খোকনের আম্মু বলছি।

— আজ আমাদের স্কুল মাঠে কিছু গরীব, অসহায় শীতার্তদের শীতবস্ত্র দেওয়া হবে তাই দুপুর তিনটার মধ্যেই খোকনকে নিয়ে, আপনাদের উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করছি।

— আচ্ছা অবশ্যই আপা, আমরা ঠিক সময়মতই যাবো।

— আর একটা কথা, এই কয়েকটা দিন রাজিব নামের যে ছেলেটা খোকনকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেছে, ওকেও সংগে করে আনবেন।

একটু অবাক হয়ে যূথী বলল,

— রাজিবকে কেন আপা?

দরাজগলায়,

— রাজিবই তো আজ আমাদের লিটল হিরো! এলেই বুঝতে পারবেন। ফোনটা কেটে দেয়।

যূথী সাতপাঁচ ভেবেও কিছু আন্দাজ করে উঠতে পারেনি; ‘রাজিবকে কেন নিয়ে যেতে হবে? নাকি অন্য ছাত্রদের কিছু চুরি করেছে?

যথাসময় সবাই উপস্থিত হয় স্কুল মাঠে। শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবকদের সমাগমে ভরপুর স্কুল মাঠটি । প্রায় পঞ্চাশজনের মতো ছোটবড় গরীব অসহায় ছেলেমেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়ে। সামনে টেবিলের উপর সব শীতবস্ত্র সাজানো । সবার উপস্থিতিতে প্রিন্সিপাল একে একে ওদের হাতে কাপড়গুলো তুলে দেন। সবশেষে তিনি সবার উদ্দেশ্যে তাঁর কিছু বক্তব্য তুলে ধরেন,

— আজ আমরা আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াসে কয়েকজন শীতার্তদের হাতে, এই শীতবস্ত্রগুলো তুলে দিতে পেরে খুবই আনন্দবোধ করছি। যদিও যৎসামান্য! তবু আমরা বলবো এর পরিমাপ বৃহৎ! কারণ আজ এ আয়োজনটি আরও সম্ভব হয়েছে আমাদের স্কুলের সব ছোট ছোট ফুলের মতো ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতার হাত বাড়ানোর জন্য। ওরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে, ওদের স্কুল টিফিনের টাকা, কেউ তাঁদের পুরাতন কাপড়, নতুন কাপড় দিয়ে সাহায্য করেছে। এই বাচ্চাদের উৎসাহ দেখে সত্যি আমি মুগ্ধ, অভিভূত! এই সন্তানদের জন্য আমি গর্বিত! তোমাদের সকলের প্রতি রইলো আমার অনেক অনেক দোয়া তোমরা যেন সবাই এমন সুন্দর মনের মানুষ হয়ে বেড়ে উঠো।

তারপর যূথী, খোকন ও রাজিবকে প্রিন্সিপালের সামনে ডাকা হয়। প্রিন্সিপাল যূথীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

— সেদিন আপনার ছেলের জ্যাকেট চুরি হওয়ার অভিযোগটা শোনার পর, আমি খোকনের সাথে আলাদা করে কথা বলেছি, তখন জানতে পারলাম যে; ওর জ্যাকেটটা চুরি হয়নি, খোকন নিজেই রাজিবকে ঐ জ্যাকেটটা দিয়েছে।

যূথী নিচু গলায় উত্তর দেয়,

— জ্বি, আপা আমি আজই জানলাম!

— সেই কথাটা আপনার কাছে, খোকন কেন গোপন করেছিল; সেটা জানেন?

— না, আপা এখনো শুনিনি…

— কারণ, খোকনের ভাষ্য থেকে যতটুকু বুঝলাম, খোকনের ধারণা আপনি গরীবদের পছন্দ করেন না, ওদের কষ্টটা বুঝতে চান না। তাই লুকিয়ে সে রাজিবকে ওর জ্যাকেটটা দিয়েছে, ওর একটাও গরম কাপড় নেই বলে। আপনি জানলে খোকনকে বকাবকি করবেন, মারধর করবেন সেই ভয়েই আপনাকে বলতে চায়নি তাই এই মিথ্যেটা সে বলেছিল।

যূথী নীরব, নিশ্চুপ। কোন উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। তারপর প্রিন্সিপাল রাজিবকে আরেকটু নিজের কাছে টেনে আনেন, মাথায় হাত বুলিয়ে, ওর উদ্দেশ্যে সবাইকে বললেন,

— এই যে দেখছেন এই ছেলেটাকে, ওর নাম রাজিব। ও খোকনদের বুয়ার ছেলে। ওর খুব সখ ছিল খোকনের মতো একটা জ্যাকেট পড়ার। কিন্তু ওরা গরীব, টাকার অভাবে তা আর কেনা সম্ভব হয়নি। কয়েকদিন খোকনকে স্কুলে আনা-নেওয়া করায় সে কিছু টাকা পায়, সেই টাকায় একটা জ্যাকেট কিনবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা কি জানেন? যখন খোকন রাজিবকে জ্যাকেটটা উপহার দিল, তখন রাজিব তাঁর পরিশ্রমের সেই টাকাটা এই শীতার্তদের দান করার জন্য আমাদের হাতে তুলে দেয়। টাকাটা দেওয়ায় আমি খুব অবাক হয়ে রাজিবকে বললাম, তুমিতো এই স্কুলে পড় না? তুমি টাকা দিবে কেন? তোমার দিতে হবে না, বাবা!

—উত্তরে রাজিব কি বলল জানেন?

সবাই উদগ্রীব শোনার জন্য। এবার প্রিন্সিপাল রাজিবকে বলল, তুমিই নিজের মুখে বলতো রাজিব, কেন টাকাটা তুমি দিয়েছ?

রাজিব সাবলীলভাবে উত্তর দেয়,

— মোরে তো খোকন ভাইয়া একটা জ্যাকেট দেসেই। আমার ইচ্ছাডাও পূরণ অইলে! এই ট্যাহা দিয়া, মোর লাহান আরেকজনের সখটা পূরণ অইবে, খুশিও অইবে; হেইলিগ্যাই ট্যাহাটা মুই দেসি।

এইটুকুনি একটি গরীব ছেলের মুখে এই অসাধারণ মানবতার কথাগুলো শুনে, প্রিন্সিপালসহ সবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। নির্বাক সবাই। প্রিন্সিপাল নিজেকে সামলিয়ে, অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আবারও বলেন-

— আজ বেশীরভাগ বাবা মায়েদের দেখি, তাঁদের সন্তানদের ভালো রেজাল্ট, A+, গোল্ডেন পাওয়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেই যাচ্ছেন, কোমর বেঁধে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, যেন নিজের সন্তানটিই নাম্বার ওয়ান হয়। শুধু লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু আপনার সন্তানটি পাহাড় সমান শিক্ষা লাভ করেও যদি তারমধ্যে কোন মনুষ্যত্ব না থাকে, মানবতাবোধ না থাকে তবে তাঁর এ সার্টিফিকেটের কি কোন দাম আছে? যে কোন মোকাবেলায় মানুষ যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায় তবে তা হবে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ! একজন সত্যিকারের সৎ ও ভালো মানুষই একমাত্র পারে সুন্দর, পবিত্র,পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করতে। আর এজন্য সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অবশ্যই সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরী এবং তা শিশুবয়স থেকেই দিতে হবে।

তারপর স্কুলের সব বাচ্চাদের দেখিয়ে আবারও বললেন,

— তাই আমি সব বাবা, মায়েদের প্রতি অনুরোধ করে বলছি, এই কোমলমতি শিশুদের ছোট ছোট অনুভূতি, মায়ামমতা, দরদ, ভালোবাসাগুলো গুড়িয়ে দিবেন না। ওদের চিন্তা,ভাবনাগুলোকে মূল্য দিন, ভালো চিন্তাগুলোকে উৎসাহিত করুন, মুক্ত স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিন। ওরাই যে আমাদের আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। ওরাই যে আমাদের কর্ণধার! ওদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত হতে দিন। হত্যা করে দিবেন না প্লিজ! শিশুদের মধ্যে যে একটি সুন্দর ও বড় মন আছে, আজ রাজিবের এই ত্যাগ ও মহানুভবতাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেলে আজ এই রাজিব ও ভবিষ্যৎ এ হতে পারে একজন আলোকিত মানুষ।

তাই আমরা ঠিক করেছি রাজিব কাল থেকে এই স্কুলে পড়বে এবং তাঁর লেখাপড়ার সমস্ত ব্যায়ভার বহন করবে স্কুল। সবাই খুশী হয়ে সায় দেয়। সবার হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে বিদ্যাঙ্গনের চারপাশ।

স্বদেশপ্রেম [Bengali Story]

গোমতী নদীর তীরে ছোট্ট একটা গ্রাম, নাম মায়াবতী। লোকমুখে শোনা যায়, একবার ঐ গ্রামে মহামারী রোগ দেখা দিয়েছিল। এই রোগের ভয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে শুরু করলো। গ্রামটি প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। তারপর গ্রামের এই করুণ অবস্থা দেখে কয়েকজন দরদী মা, এর হাল ধরলেন। যে ঘরেই এই রোগের আবির্ভাব হয়, তাঁরা সেই রোগীদের সেবাশুশ্রূষা করে ভালো করে তুলতে লাগলেন। ‘কোন রোগ-ই ভয়ের কিছু না! সৃষ্টিকর্তা যেমন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তেমন রোগ- বালাই, বিপদ-আপদ, দুর্যোগও দিয়েছেন। আবার এই রোগের চিকিৎসাও দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, যে কোন বিপদকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকেই দিয়েছেন। তাই ইচ্ছা করলে আল্লাহর রহমতে সব কিছুর মোকাবেলা মানুষই করতে পারে। আমাদের মনোবলকে শক্ত করতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং সবাই সবার বিপদে এগিয়ে এসে সাহায্য সহযোগিতা করলে, আমরা সব রকমের পরিস্থিতি থেকে উঠে আসতে পারবো ইনশাআল্লাহ্। ‘সেবার পাশাপাশি এই কথাগুলো সেই মায়েরা সবাইকে বোঝাতে থাকে। তাঁদের কাজে ও কথায় সবাই মুগ্ধ ! কিছুদিনের মধ্যে সবাই সুস্থ হয়ে উঠে এবং শীঘ্রই রোগমুক্ত হয় গ্রামটি। গ্রামের বাসিন্দারাও ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে তাঁদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে। আবার আগের মত প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় গ্রামটি। সেই কয়জন স্নেহময়ী মায়েদের ত্যাগ, মায়ামমতা আর ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করে পরবর্তীতে এই ছোট্ট গ্রামটিকে সবাই “মায়াবতী” গ্রাম নামেই ডাকে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামের নামের পিছনেই এমন ছোট-বড় অনেক গল্প আছে। এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করেই বেশীরভাগ গ্রামগুলোর নামকরণ করা হয়। সেই গ্রামে ছোট থেকে বেড়ে উঠা একজন স্নেহময়ী মা, নাম তাঁর রূপসা। তিনি ঐ গ্রামেরই নামানুসারে মায়াবতী নামে একটি প্রাইমারী স্কুল “মায়াবতী প্রাইমারী স্কুল” এর প্রধান শিক্ষিকা। তাঁর দু’টি সন্তান মেয়ে শাপলা আর ছেলে দোয়েল। ওরা মায়ের স্কুলেরই ছাত্র-ছাত্রী। রোজ মায়ের সাথেই ওরা দুই ভাইবোন স্কুলে যায়। সেদিন একটু আগেভাগেই রূপসাকে স্কুলে যেতে হয় কারণ স্কুল পরিদর্শনের জন্য ঢাকা থেকে ইন্সপেক্টর সাহেবরা আসবেন। স্কুলে যাওয়ার আগে রূপসা তাঁর ছেলে-মেয়ে শাপলা ও দোয়েলকে বলল,

— — “তোমরা যথারীতি সময়ে কিন্তু স্কুলে চলে যেও আর স্কুল ড্রেস, চুল সুন্দর পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, বইখাতাগুলোও ঠিকঠাক-মত নিবে।”

উত্তরে ভাইবোন বলল,

— মা, তুমি কোন চিন্তা করনা আমরা তোমার কথামতোই পরিপাটী হয়ে যাব। আমাদের স্কুলের এবং তোমার কোন অসম্মান যেন না হয় অবশ্যই সে খেয়াল রাখবো।

এইটুকুন বাচ্চাদের মুখ থেকে বড়োদের মত এমন পাকা পাকা কথা শুনে মা একগাল হেসে ওদের জড়িয়ে ধরে , আদর করে কপালে চুমু খায়। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায় স্কুলের উদ্দেশ্যে। যথাসময়ে দোয়েল আর শাপলা স্কুলে যেয়ে তাঁদের শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী সবাইকে সুন্দর পরিপাটী দেখে ওদের খুব ভালো লাগে। তবে প্রতিদিন ওরা দুই ভাইবোন এমন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হয়েই স্কুলে আসে। এটা তাঁদের মায়ের আদেশ । স্কুলের আঙ্গিনা, বাগান, ক্লাসরুমগুলো সব ঝকঝক, তকতক করছে। কোথাও কোন কাগজের টুকরো, বাদামের ছোকলা, বিস্কিটের প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই।

‘ইস! প্রতিদিনই যদি এমন পরিচ্ছন্ন থাকতো আমাদের স্কুলটা?’ শাপলা ওর বন্ধুবান্ধব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল।

শুনে দোয়েল বলল, — হ্যাঁ, ইচ্ছে করলেই কিন্তু আমরা পারি, তাইনা আপু?

সবাই একসাথে বলে উঠল, অবশ্যই পারবো আমরা।

শাপলা তখন বলল,— বেশ, তাহলে এরপর থেকে আমরা আর কেউ স্কুল নোংরা করবো না? মা বলেছে শুধু নিজের বাড়িঘর নয়, স্কুলকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদের দায়িত্ব। আর আমাদের স্কুলের পরিবেশ যদি নোংরা থাকে তবে আমাদের রোগবালাইও বেশি হবে। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। তাই সবকিছু ঐ ডাস্টবিনে ফেলবো। চলো আজ থেকে সবাই প্রতিজ্ঞা করি?

সবাই প্রতিজ্ঞা করলো, ‘ কেউ তাঁদের স্কুল আর নোংরা করবে না’।

ইন্সপেক্টরেরা যথাসময়ে স্কুল পরিদর্শন করতে চলে এলেন । ছাত্রছাত্রীরা ফুল দিয়ে তাঁদের বরণ করে নেয়। প্রথমে স্কুল মাঠের শহীদমিনারের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। তারপর পুরো স্কুলটা ঘুরে দেখে।

স্কুলের পিছনে বিভিন্ন রকমের গাছগাছালি, ফল-ফুলের সুশোভিত সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি বাগান দেখে মুগ্ধ হন তাঁরা। আরও মুগ্ধ হলেন, যখন শুনলেন এই বাগানটি স্কুলের শিক্ষক -ছাত্রছাত্রীদের সমন্বয়ে নিজের হাতে গড়া এবং ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত এর পরিচর্যা করে। আর বাগানের উৎপন্ন সবজি,ফল সব বিক্রি করে যা টাকা হয় ; সব টাকা স্কুল ফান্ডে জমা রাখা হয়। কোন ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনে বা তাঁদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে এই ফান্ড থেকে সাহায্য করা হয়।

সবশেষে ইন্সপেক্টরেরা প্রতিটি ক্লাসরুমে ঢুকে বাচ্চাদের বিভিন্নরকমের প্রশ্ন করে,— বলতো আমাদের জাতীয় ফুল কী? একবাক্যে সবাই বলল, —শাপলা।

— জাতীয় পাখি?

— দোয়েল।

— জাতীয় কবি

— কবি নজরুল ইসলাম

— আমাদের পতাকার রং কী?

— সবুজ আর লাল।

— ভাষা দিবস কবে?

— ২১ শে ফেব্রুয়ারি, বাংলা মাসের ৮ই ফাল্গুন।

— বিজয় দিবস?

— ১৬ই ডিসেম্বর ।

বাঙালিদের জাতিরপিতা কে?

— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সবশেষে বলল, — আচ্ছা তোমরা কী বলতে পারবে, লেখাপড়া শিখলে আমাদের কী কী উপকার হয়?

সবাই নীরব! এই নীরবতা ভেঙে শাপলা সাহসের সাথে উঠে দাঁড়ায়,— লেখাপড়া শিখলে আমাদের জ্ঞান অর্জন হয়, এতে আমরা কোনটা ভালো কোনটা খারাপ তা জানতে পারি। শিক্ষা ছাড়া মানুষ উন্নতি করতে পারে না। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আমরা যত শিক্ষিত হব, দেশ তত এগিয়ে যাবে। তাই লেখাপড়া শিখলে সবার উপকার হয়।

— বাহ্‌, তুমি সঠিক উত্তর দিয়েছ শাপলা।

সব প্রশ্ন করা শেষ হলে, শিক্ষার ব্যাপারেও স্কুলের খুব প্রশংসা করে ইন্সপেক্টরেরা। স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষা সবদিক থেকে বিচার করে, এই জেলার সব প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে শাপলাদের স্কুল অর্থাৎ ‘মায়াবতী প্রাইমারি স্কুল’ সেরা স্কুল বলে ইন্সপেক্টরেরা ঘোষণা করে যান। কিছুদিনের মধ্যেই সরকারীভাবে ঘোষণা করা হবে এবং প্রধান শিক্ষিকাকে অর্থাৎ রূপসাকে পুরস্কৃত করা হবে বলে জানিয়ে যায়।

শাপলা আর দোয়েল খুশিতে আটখানা! তাঁদের মা সেরা শিক্ষিকা নির্বাচিত হয়েছেন। স্কুল ছুটির পর শাপলা আর দোয়েল বড়ো বড়ো পা ফেলে বাড়ির পথে রওয়ানা হয়। কখন তাঁরা এই খুশির খবরগুলো বাড়ির সবাইকে বলে শুনাবে। দাদু, দাদুমণি, পলাশভাইয়া ও শিমুল আপুকে। শাপলাদের যৌথ পরিবার। পলাশ ও শিমুল ওদের চাচাতো ভাইবোন। পলাশ পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে আর শিমুল সপ্তম শ্রেণিতে। ওরা দুই ভাইবোনও এই মায়াবতী প্রাইমারি স্কুল থেকেই পাশ করে এখন হাইস্কুলে লেখাপড়া করছে। সবাইকে আরও একটা খুশির খবর শুনাবে ওরা, ‘ইন্সপেক্টরদের প্রশ্নের উত্তর বেশীরভাগই সে আর দোয়েল দিতে পেরেছে, তাই সবাই ওদের দুই ভাইবোনকে গুড-গার্ল আর গুড-বয় বলেছে।’

স্কুলের সবাইকে পেন্সিল ও এক প্যাকেট রং পেন্সিল উপহার দিয়েছে। শাপলা ও দোয়েল ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসে। ছুটির দিন ওরা ঘরের বাইরে একদম প্রকৃতির কাছে বসে ছবি আঁকে। গাছ, পাখি, দিঘীতে ফোটা পদ্মফুল, শাপলাফুল, নৌকা আরও কত কী! বইয়ের ছবি দেখে আঁকার চেয়ে, সামনে থেকে দেখে আঁকলে ছবির রং, আলো, ছায়া সব নিখুঁত হয় আর সেই ছবিটা বেশি প্রাণবন্ত ও সতেজ হয়। এই কথাগুলো শিখিয়েছে সবুজমামা মানে ওদের ছোটমামা। ছোটমামা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়াশুনা করে। প্রায়ই ছুটির দিনে ওদের বাসায় বেড়াতে আসে। ছোটমামা এলে ওদের খুব মজা হয়। গ্রামের অনেক জায়গায় সবাইকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করে, নদীর ধারে, নৌকায় করে ওপারে কাশবনে। পলাশ ভাইয়া, শিমুলআপুও যায় তাঁদের সাথে। আবার কখনো দাদুও সঙ্গ নেয়। তখন ভারি আনন্দ করে সবাই। শাপলা আর দোয়েল উঠোনে পা ফেলতেই দেখে, ছোটমামা দাদুর সাথে বসে গল্প করছে। খুশিতে একদৌড়ে ওরা মামাকে জড়িয়ে ধরে,

— তুমি কখন এলে ছোটমামা? আমরা তোমার কথাই বলতে বলতে আসছিলাম।

মামা ওদের আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

— কেন, কোন খুশির খবর আছে নিশ্চয়ই, তবে চটজলদি বলে ফেলতো দেখি।

শাপলা আর দোয়েল বলল, — হ্যাঁ ছোটমামা, মস্ত বড় খুশির খবর আছে! দু’ভাইবোনের আনন্দ দেখে বাড়ির সবাই এসে জড়ো হয়ে দাঁড়ায়, ওদের মস্ত বড় খুশির খবরটি শোনার জন্য।

রাতে খাবারের পর ছোটমামা ওদেরকে নিয়ে একটা প্ল্যান প্রোগ্রাম করে,’এবার তাঁরা কোথায় বেড়াতে যাবে, আর সারাদিন আনন্দ করে কোথায় ঘুরে বেড়াবে?’ দোয়েল বলল, কিন্তু ছোটমামা আমরা কোথায় যাব, সেটাই তো বলছ না?

— ওয়েট, ওয়েট! একটু ধৈর্য ধর, সব বলছি।

সবাই উদগ্রীব হয়ে ছোটমামার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। আরেকটু আয়েশ করে বসে, তারপর ছোটমামা বলল,

— শোন্, গোমতী নদীর ওপারে চন্দনপুর গ্রাম নামে একটা ছোট্ট সুন্দর সুগন্ধি গ্রাম আছে। সেই গ্রামে বিরাট জমিদার বাড়ি, তার পাশ ঘিরে বয়ে গেছে বিশাল একটা দিঘী। দিঘীটার শেষ সীমানা নদীর সাথে মিশে গেছে। শোনা যায় বর্ষাকালে এখনও ঐ দিঘীতে কুমির আসে। আর প্রতি বছর ঐ দিঘীতে উৎসবের মত করে নৌকা বাইচ হতো এবং এখনো হয়। শনিবারে সেই নৌকা বাইচ হবে আর সেজন্যই তোদের নিয়ে যাওয়া আর তার সাথে জমিদারবাড়িটাও ঘুরে দেখা।’

সবাই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো, ‘ইউ আর গ্রেট ছোটমামা! আমরা কখনোই নৌকা বাইচ দেখিনি । সবাই খুব খুশি।

পলাশ বলল, — আচ্ছা ছোটমামা সুগন্ধি গ্রাম কেন? আর আমাদের ‘মায়াবতী’ গ্রামের নামের মতো কি চন্দনপুর নামেরও কোন কারণ আছে?

— হুম, কারণতো অবশ্যই একটা আছে। শুনেছি সেই জমিদারের খুব প্রিয় ছিল চন্দন কাঠ, সেজন্য পুরো গ্রামটা নাকি চন্দন গাছ দিয়ে ঘেরা আর জমিদারবাড়ির সব দরজা জানালাগুলো চন্দন কাঠের তৈরি তাই বাড়ির চারিদিক সবসময় থাকে চন্দনের সুবাসে ভরপুর। তাই গ্রামটির নামকরণ করা হয় ‘চন্দনপুর’ গ্রাম।

পলাশ বলল, — ছোটমামা, আমার বন্ধু কয়েকজনকেও আমাদের সঙ্গী করে নেই? না নিয়ে গেলে ওরা খুব মন খারাপ করবে যে! শুনে শিমুলও লাফিয়ে উঠে বলল, — তাহলে আমার বান্ধবীদেরকেও বলবো?

ছোটমামা বলল, —- বাহ্, বেশ তো! সবাইকে নিয়ে চল । তাহলে তো একটা টীম হয়ে গেল আমাদের জার্নিতে । খুব ভালো হবে।

সবার কথা শুনে দাদু বলল, — হুম, চন্দনপুর গ্রামটা সত্যিই খুব সুন্দর! ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা মুক্তিযোদ্ধারা চন্দনপুর হয়ে অনেক জায়গায় যেতাম। ঐ গ্রামের অনেক স্মৃতি আছে আমাদের।

দোয়েল আর শাপলা বলল,— তাহলে দাদু তুমিও চলো না আমাদের সাথে?

— ঠিক আছে, অবশ্যই আমিও যাব তোমাদের সাথে।

সবাই তো মহা খুশি!

শনিবার খুব ভোরবেলায় সবাই চন্দনপুর যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। প্রথমে ওদের কিছুদূর হেটে যেতে হবে নদী পর্যন্ত তারপর নৌকা করে নদীর ওপারে গেলেই চন্দনপুর গ্রাম। যাওয়ার পথে মায়াবতী গ্রামের শহীদমিনারের মাঠটা সামনে পড়ে। দাদু সবাইকে বলল, — চলো, আগে কিছুক্ষণ শহীদমিনারে দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ছোটমামা সবাইকে নিয়ে মাঠের একপাশে ফুটে থাকা কিছু বনফুল আর ঘাসফুল তুলে এনে শহীদমিনারের সামনে রাখলো।

দোয়েল ছোটমামাকে বলল, — আজ তো ২১ শে ফেব্রুয়ারি না, তবে কেন আমরা শহীদমিনারে ফুল দিব মামা?

শুনে দাদু বলল, — শোনো দাদুভাই, এই শহীদদের ত্যাগের বিনিময়ে, রক্তের বিনিময়ে আজ তুমি, আমি, আমরা সবাই বাংলাভাষায় কথা বলি, বাংলায় গানগাই, লেখাপড়া করি। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। সেই মাতৃভাষা রক্ষা করতে যারা অকাতরে জীবন দিয়ে গেছে, সেই শহীদদের প্রতি শুধু একদিন কেন, তাঁদের প্রতি আমরা সবসময় শ্রদ্ধা ও স্মরণ করবো এবং করা উচিত। তারপর দাদু আবারো বলল, — তোমরা কি সেই শহীদদের নাম বলতে পারবে?

শাপলা সাথে সাথেই বলে উঠলো, — পারবো দাদু, সালাম, বরকত, জব্বার রফিক, শিশু শফিউর আরও নাম না জানা অনেকেই।

— আচ্ছা তোমরা কি জানো, কারা ওদের গুলি করেছিল এবং কেন?

শিমুল বলল,—— আমি জানি দাদু, আগে আমাদের দেশের নাম ছিল পূর্বপাকিস্তান আর শাসন করতো পশ্চিম পাকিস্তানিরা। তারপর পাকিস্তানিরা একদিন জারি করলো, আমাদের লেখাপড়া সব কিছূ বাংলায় নয়, উর্দু ভাষায় করতে হবে। কিন্তু বাঙালিরা তা মেনে নিল না। আন্দোলন শুরু হলো, রাষ্ট্র ভাষা বংলা চাই। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি পুলিশেরা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি করে তখন ওরা শহীদ হয়। তাই ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা দিবস।

এবার দাদু বলল, — তোমরা সবাই জানলে তো, এ বাংলা ভাষা আমাদের রক্ত দিয়ে কেনা? এ ভাষা বাঙালিদের জীবন দিয়ে কেনা। তাই মায়ের ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সবসময় তোমরা সচেতন থাকবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে এটা তোমাদের অবশ্যই কর্তব্য।

সবাই একসাথে বলল, ‘আমরা সবসময় শহীদদের স্মরণ করবো আর আমাদের মায়ের ভাষাকে মর্যাদা দিব ইনশাআল্লাহ্!’ তারপর ছোটমামা গলা ছেড়ে গান গাইতে থাকে, ‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারোর দানে পাওয়া নয়, আমি দাম দিয়েছি প্রাণ লক্ষ কোটি জানা আছে জগতময়… সবাই তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে নদীর দিকে এগুতে থাকে। আর বেশি দূরে নয়, সামনেই দেখা যাচ্ছে নদীটা। নদীর তীরে কয়েকটা নৌকা বাঁধা, আবার দূর থেকেও এক এক করে নৌকাগুলো তীরে এসে ভীর করছে। ছোটমামা একটা বড় নৌকা ঠিক করে সবাইকে সাবধানে উঠতে বলল। সবাই ফুর্তি করে নৌকার পাটাতনে উঠে বসে। চন্দনপুর গ্রামে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় ঘণ্টাখানিক সময় লাগবে। নৌকায় চড়ে ঘুরতে ওদের সবারই খুব ভালো লাগে। ছোট ছোট ঢেউয়ের উপর দিয়ে নৌকা তরতর গতিতে বয়ে চলছে। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে, নদীর দুই ধারে কাশবন ; কাশফুলগুলো গায়ে গায়ে হেলেদুলে দোল খাচ্ছে।

দাদু নৌকার মাঝিদের বলল, — ও মাঝি ভাইয়েরা এমন সুন্দর পরিবেশে ভাটিয়ালি না গাইলে কি হয়, তোমরা জোরেশোরে একটা গান ধর তো দেখি?

দাদুর কথা শুনে পলাশের বন্ধু শ্যামল বলল, — দাদু ভাটিয়ালি গান কাকে বলে? দাদু তিলের নাড়ুটা মুখে পুরে দিয়ে বলল,

— খুব ভালো প্রশ্ন করেছ দাদুভাই। আমরা বাঙালি, বাংলার ঐতিহ্য সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, বাংলার ইতিহাস সবাইকে যে জানতে হবে, অন্তরে ধারণ করতে হবে, তবেই না আমরা খাঁটি বাঙালি! ভাটিয়ালি গান হল এক ধারার লোকগীতি। মাঝিমাল্লাদের গান থেকেই ভাটিয়ালি সুরের সৃষ্টি। নদীর ভাটির স্রোতে নৌকা বাইতে মাঝিদের তেমন বেগ পেতে হতো না, সেই অবসরে মাঝিরা গলা ছেড়ে লম্বা টানে গান গাইত। ধীরে ধীরে এই গানই একদিন ভাটিয়ালি গান নামে পরিচিত হয়ে যায়। ভাটিয়ালি গানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, সুরের দীর্ঘ টান ও, লয়।

মাঝিরা ততক্ষণে প্রাণ খুলে ভাটিয়ালির সুর ধরে,

— ও আমার দরদী আগে জানলে তোর ভাঙা নায়ে চরতাম না… মাঝিদের একের পর এক ভাটিয়ালি সুরের টান, ছন্দ আর তালে তালে বৈঠার ছলাৎছলাৎ শব্দ একাকার হয়ে, এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়!

মাঝে মাঝে ছোট মামাও মাঝিদের সুরে, সুর মেলায়।

যথাসময়ে নৌকা চন্দনপুরের তীরে এসে পৌঁছায়। নৌকা থেকে নেমে সবাই ঠিক করে, তাঁরা ভেনে চেপে জমিদারবাড়ি যাবে। শরতের আকাশ, পেঁজা পেঁজা তুলোর মত মেঘগুলো ছুটোছুটি করছে ; এই মেঘলা এই রোদ। খোলা আকাশের নিচে আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে ভ্যান চলছে। রাস্তার দু’পাশে নাম না জানা কত বনফুল থোকায়থোকায় ফুটে আছে , ফুলে ফুলে প্রজাপতির সমারোহ। যেদিকেই তাকায় সবুজ আর সবুজ। ধানগাছগুলো হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে দুলছে।

‘কী অদ্ভুত সুন্দর চন্দনপুর গ্রামটা’! ছোটমামা সবাইকে তাঁর সাথে গাইতে বলে, — আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা রে ভাই লুকোচুরির খেলা- – – -সবাই গাইতে গাইতে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছে যায় জমিদারবাড়ি। সত্যি- ই তো চারদিক চন্দনের গন্ধে ভরপুর ! নৌকা বাইচ শুরু হবে দুপুরের পর। এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে।

ছোটমামা বলল, — চলো এরমধ্যে আমরা জমিদারবাড়িটা আগে ঘুরে দেখি।

বিশাল বাড়ি, সামনে পিছনে ফুল ফলের বাগান। সেখানে চন্দন গাছের সংখ্যাই বেশী। জমিদারের বংশধরেরা এখনো কেউ কেউ বেঁচে আছে , তাঁরাই এগুলো দেখাশোনা করে। সামনেই বিশাল দিঘী তার শান বাঁধানো ঘাট। রাজবাড়ীটা ঘুরে এসে সবাই ঘাটের পাড়ে গিয়ে বসে। ঘাটের চারপাশ ঘেরা সবুজ গাছগাছালির মেলা। বিভিন্নরকম পাখিদের গুঞ্জনে চারপাশ মুখরিত! জমিদারবাড়ি থেকে বেশ দূরে ছোট ছোট অনেক কুটির। কুটিরগুলো কোনটার দরজা জানালা নেই, কোনটার কিছু ভাঙা অংশ লেগে আছে।

শিমুলের বান্ধবী জু্ঁই দাদুকে বলল, — দাদু, ঐ কুটিরগুলোতে কারা থাকতো?

দাদু বলল, — জমিদারের কর্মচারীরা থাকতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অনেকসময় এখানে এসে আশ্রয় নিতাম। একবার রাজাকারেরা টের পেয়ে যায়। এ খবর শুনে আমরা একদিন সারারাত এই দিঘীর পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে লুকিয়েছিলাম।

শুনে দোয়েল বলল, — মুক্তিযোদ্ধা মানে কী দাদু?

তখন পলাশ বলে উঠলো, —, ৭১ সালে এদেশকে পরাধীন থেকে, মুক্ত করার জন্য পাকিস্তানিদের সাথে বাঙালিদের যুদ্ধ হয়, আর যে সকল বাঙালিরা যুদ্ধ করেছিল তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা বলে।

— আর রাজাকার?

— সেই যুদ্ধের সময় যারা পাকবাহিনীদের সাথে হাত মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে তাঁরাই রাজাকার । তাইনা দাদু?

দাদু বলল, — একদম সঠিক বলেছ দাদুভাই।

শাপলা চোখ বড় বড় করে বলল, — তারপর কি পাকিস্তানিরা ওদের মেরে ফেলতো দাদু? একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দাদু বলল,

— শুধু কী মেরে ফেলতো দাদু ভাই! কী যে অত্যাচার করতো ওদের উপর। বুলেটের খোঁচায় খোঁচায় সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত করা, চোখ উপড়ে ফেলা, বিভিন্ন অঙ্গ কেটে নুন মরিচ মেখে দেওয়া, গরম পানি ঢেলে দেওয়া। আরও কতরকমভাবে মারতো । শুধু তাই নয়, ওদের বাবা মা ভাই বোন সবাইকে খুঁজে মেরে ফেলেছে আবার বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আর ওদের মদদ দিত সেই রাজাকারেরা।

চোখ ছলছল করে দোয়েল বলল— কেন মারতো দাদু?

— কোথায় কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা ও তাঁদের ক্যাম্প আছে সেগুলো জানার জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে বের না হতো, এমন অত্যাচার করেই যেতো।

— ওরা কি নামগুলো বলে দিতো?

— কখনোই না, দেশ রক্ষার্থেই যে যুদ্ধে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধারা।

ওরা যে দেশপ্রেমিক! জীবন দিয়েছে দেশের জন্য, তবুও মুখ খুলেনি।

শিমুল বলল, —- দাদু, তারপর আপনারা এই দিঘী থেকে উঠে কিভাবে পালালেন?

— সারারাত রাজাকারেরা এদিক সেদিক টর্চ মেরে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে, আরেকটু হলেই ধরা পড়ে যাই! আমরা তখন সবাই কচুরিপানার মধ্যে মুখ গুজে রাখি আর কেউ আল্লাহকে কেউ ভগবানকে ডাকতে থাকি। ভোরের দিকে ওদের আর দেখতে পাইনি। তারপর আমাদের লোক যারা বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর এনে দিতো, ওরা এসে জানালো রাজাকারেরা চলে গেছে ; এখন তোমরা নিরাপদ। সারারাত আমরা না খেয়ে, না ঘুমিয়ে সবাই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম! তখন ওরা আমাদের একটা গোপন জায়গায় নিয়ে গেল। সবার ভেজা শরীর কেমন যেন ফুলে ফেঁপে গিয়েছিল। ওরা আমাদের কাপড় এনে দিল, খাবারের ব্যবস্থা করলো। আমাদের সাথের একজন নাম ছিল লাবলু ওর ভীষণ জ্বর চলে এলো গায়ে। সবার চোখকে আড়াল করে লুকিয়ে রাতের বেলা ডাক্তার ডাকা হলো। এখানে আমাদের থাকাটা খুবই বিপদজনক হয়ে উঠে। কিন্তু এত অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাওয়া, কিছুতেই সম্ভব ছিল না। বাধ্য হয়ে কিছুদিন সেখানে লুকিয়ে থাকতে হলো। বাইরে থেকে দরজায় তালা দেওয়া হতো আর রাতে আলো নিভানো থাকতো যেন লোকে মনে করে এ বাড়িতে কেউ নেই। আর তোমাদের মত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দিয়ে খাবার পাঠাতো কেউ যেন সন্দেহ না করে। লাবলুর জ্বর একটু কমলেই আর এক মুহূর্ত থাকলাম না, অন্যত্র চলে গেলাম। পরে শুনেছি পাক বাহিনীরা এ জমিদার বাড়িতে ঘাঁটি করেছিল আর ঐ কুটিরগুলোতে মুক্তিযোদ্ধা ও সন্দেহদের এনে রাজাকারেরাসহ খুব নির্যাতন করতো।

দাদুর কথাগুলো সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে আবার কখনো কখনো ওদের চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে । সেই ছলছল চোখে কান্না দাবিয়ে শিমুল বলল,—আচ্ছা দাদু, পাকিস্তানিদের সাথে বাঙালিদের কেন যুদ্ধ করতে হয়েছিল? শিমুলের কথা শুনে শাপলাও বলল, — যুদ্ধ না করলেই তো হতো দাদু, তাহলে এতগুলো মানুষ মারা যেত না?

— হা হা হা… ওদের কথা শুনে ছোটমামা প্রাণখোলা একটা হাসি হাসে, তারপর বলল, — তাহলে যে বাঙালিদের আজ জিন্দা লাশের মত বেঁচে থাকতে হতো রে…? পরাধীন থাকার চেয়ে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য বীরের মত যুদ্ধ করে মরে যাওয়াও অনেক ভালো।

দাদু বলল, — তাইতো সেদিন বাঙালিরা, পাকিস্তানিদের শিকল ভেঙে গুড়িয়ে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হতে, শপথ করে নেমেছিলাম ; আমরা মুক্তিযোদ্ধারা।

তারপর দাদু সবার দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে বীরত্বের সাথে বলল, — তাহলে শোনো তোমরা সেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প।কেন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল?

মুক্তিযুদ্ধ মূলত বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ স্বাধীনতা লাভের জন্য লড়াই। তোমরা তো জানো বাংলাদেশের পূর্ব নাম ছিল পূর্বপাকিস্তান বা পূর্ববাংলা। তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা দেশ শাসন করতো। আর পাকিস্তানিরা প্রতিনিয়তই অন্যায়, অমানবিক আচরণ করতো পূর্ববাংলার মানুষের উপর। দুই যুগের অর্থনৈতিক শোষণ, অবিচার, প্রতিটি ক্ষেত্রে অসাম্য, বাঙালিদের মুক্তচিন্তা চর্চায় পথরোধ করা, প্রাপ্য মানবিক-নাগরিক সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা এবং রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করার পরিকল্পনা করে। তারপর ১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন। বাঙালি জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক চক্র এক ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের উদ্দেশ্য, কোনভাবেই এই ক্ষমতা বাঙালিদের হাতে সঁপে দিবে না। তখন এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে উঠলো বঙ্গবন্ধু। বিক্ষোভে ফেটে পড়ি বাংলার সব জনগণ। বাঙালিজাতির ইতিহাসে এই প্রথমবারের জন্য আমরা বাঙালীরা স্বাধীনতার স্লোগান দিলাম, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।”

এরপর থেকে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। কারফিউ, হরতাল, মিছিল আর মিছিল। তারপর ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনতার উত্তাল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে, এক ভাষণ দেন। তিনি পরাধীন জাতিকে পাকিস্তান শাসনের বিরুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে দিক নির্দেশনা দেন মুক্তিযুদ্ধের। ভাষণ শেষে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন,

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ডাকই ছিল মূলত ৭১- এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। তারপর ৭১ সালের মার্চ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানিদের সাথে বাঙালিদের কোন্দল। পাকিস্তানিরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের আক্রমণ করতে থাকে। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীরা অগণিত ঘুমন্ত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিক ও দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সশস্ত্র আক্রমণ ও গণহত্যা শুরু করে সারাদেশে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবর খুঁড়ে সেখানে শত শত লাশ মাটি চাপা দিয়ে তার উপর বুলডোজার চালায়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে সারারাত ধরে হাজার হাজার লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয়। আবার পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতেও শত শত লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাই ২৫ মার্চের রাতকে কাল রাত্রি বলা হয়। তারপর সেই রাত্রিতে আমরা বাংলার জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করি এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৬শে মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস। সেদিন থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সার্বিকযুদ্ধে। তারপর নয় মাসের একটানা যুদ্ধে, ৩০ লাখ শহীদের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জন করি আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা! জন্ম হয় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

এরপর ছোটমামা বলল,— সব শুনলি তো তোরা, তোদের মুক্তিযোদ্ধা দাদুর মুখ থেকে? মনে রাখবি মুক্তিযুদ্ধ হলো বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা। এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই আমরা লাভ করেছি একটি স্বাধীন দেশ, নিজস্ব পতাকা। বিশ্বের মানচিত্রে খোদিত হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

উদগ্রীব হয়ে সবাই মুক্তিযুদ্ধের কারণগুলো শুনে বলল,— তোমরা এত ত্যাগ আর এত রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছ দাদু?

— হ্যাঁ দাদু ভায়েরা, আমরা বাঙালিরা দেশ ও দেশের মানুষকে এত ভালোবাসি বলেই জীবন উৎসর্গ করে দিতে এতটুকু পিছ পা হয়নি। এর অন্যতম কারণই হলো দেশপ্রেম। তাই সর্বপ্রথম আমাদের দেশপ্রেমিক হতে হবে। দেশপ্রেমিকরা কখনো দেশ ও দেশের মানুষের সাথে বেঈমানি করে না, যেমনটি করেছিল রাজাকারেরা। কারণ ওদের মধ্যে দেশপ্রেম বলতে কিছুই ছিল না, তাইতো দেশের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছিল।

শাপলা বলল, — কিন্তু দাদু, এখন তো দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, যুদ্ধ শেষ তাহলে আমরা দেশপ্রেমিক হবো কেমন করে? শাপলার কথায় সবাই সায় দিয়ে বলল, — হুম, তাই তো! আমরা কেমন করে দেশপ্রেমিক হবো দাদু?

ছোট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে, দাদু বলল, — দেশপ্রেমিক হতে যেমন সাহস আর যোদ্ধার প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন সৎ, নিষ্ঠা আর মায়ামমতা। এই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য , সৎভাবে দেশের প্রতিটি কাজের দায়িত্ব পালন করাও দেশপ্রেম। তারপর দাদু যেন শক্ত করে বলল,— স্বাধীনতার চেয়ে দেশ রক্ষ করা যে আরও কঠিন কাজ দাদু ভায়েরা?

ছোটমামা আবারো বলল, — এদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ। স্বদেশ প্রেম থাকতে হবে আমাদের অন্তরে, দেহে, প্রতিটি রক্তকণায়। আমরা বিশিষ্ট কিছু দিবসকে পালন করি কিন্তু দেশপ্রেমিক হওয়ার জন্য কোন একটি মাস বা যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না। সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে যার যার সাধ্যানুযায়ী আমাদের চারপাশের অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই, প্রয়োজনীয় কিছুটা হলেও মিটাই তবে এটাও হবে দেশকে সেবা করা, স্বদেশপ্রেম। একজন দুঃখীনীকে সান্ত্বনা দেওয়া, বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, আশ্বাস দেওয়া, হাসিমুখে কারো সাথে কথা বলা,তাঁর কথা শুনে উপদেশ নির্দেশ দেওয়া,ভদ্র আচরণ এগুলোও দেশ সেবার আওতায় পড়ে। ভালোবেসে দেশের মাটিতে যদি আমরা একটি গাছও লাগাই, একজন পিপাসার্তকে এক গ্লাস পানিও পান করাই, এটাও হবে একজন দেশপ্রেমিকের কাজ। দেশের জন্য ভাল কিছু চিন্তা করা, দেশের যে কোন পরিস্থিতিতে ভালমন্দে সম্মতি দেওয়া এটাও দেশেরই সেবা করা। এভাবে আমরা যদি দেশের মানুষের সেবা করে দেশপ্রেমিক হয়ে উঠি, তবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্থক।

ছোটমামার কথা শুনে দাদু মুগ্ধতার সাথে বললেন,— বাহ্, চমৎকার! চমৎকার বলেছ সবুজ? আজ মনে হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে, তোমাদের মত যুবকদের হাতে দেশকে তুলে দিয়ে আমরা ভুল করিনি, আমাদেরও মুক্তিযুদ্ধ করা সার্থক।

পলাশ আগ্রহের সাথে বলল, — দাদু, যুদ্ধের সময় যারা মুক্তিযোদ্ধাদের নানান রকমভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছে ওরাও তো তাহলে স্বদেশী আর দেশপ্রেমিক ছিল?

দৃঢ়ভাবে দাদু বলল,— শতভাগ দেশপ্রেমিক ছিল ওরা সবাই। শুধু কী তাই? তখন সঙ্গীত শিল্পীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লুকিয়ে রেডিওতে দেশের গান, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী গান প্রচার করতো। আমরা যখন মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম কিংবা স্বজনদের জন্য মনটা বিষণ্ণ হয়ে থাকতো। তখন সেই গানগুলো, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি… , মাগো ভাবনা কেন আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি, তোমার ভয় নেই মা’ … এমন আরও বিভিন্ন ধরণের রণসঙ্গীতগুলো আমাদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিত, আমাদের দারুণ শক্তি, সাহস আর উদ্দীপনা বেড়ে যেত। তখন যুদ্ধ করার স্পৃহা আমাদের বহু গুণ বাড়িয়ে দিত, আমরা আবার সাহসী যোদ্ধা হয়ে বীরের মত মেশিনগান, স্টেনগান কাঁধে তুলে নিতাম। অনেকসময় যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের কারোর গায়ে গুলি লাগলে, ঐ অবস্থায় তাঁকে কিছুতেই ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। তখন আশেপাশে কারো বাসায় লুকিয়ে আশ্রয় নিতে হতো। সেই বাড়ির মা বোনেরা মুক্তিযোদ্ধাদের আগলে রেখে সেবাশুশ্রূষা করে ভালো করে তুলতো। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ করেছি ঠিকই কিন্তু নারী, পুরুষ, কিশোর সবাই যে যার অবস্থান থেকে, জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ;দেশের স্বার্থে প্রতিনিয়তই আমাদের সাহায্য সহযোগিতা ও উপকার করে গেছে। তাই একবাক্যে ওরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। দাদুর কথাগুলো সবাই অন্তর দিয়ে শুনছিল।

দাদু আবারো বলল, — একটা ঘটনা বলছি শোনো, একবার আমরা খবর পেলাম পশ্চিম গ্রামে পাকসেনারা ঘাঁটি করেছে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে, সব যুবক ছেলেদের ধরে ধরে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। মানুষের বাড়িঘর সব ভাঙচুর করছে। সেই গ্রামে অপারেশন করতে যেয়ে আমাদের গ্রুপের একজন নাম সিরাজ, ওর পায়ে গুলি লাগে। হাটতে পারছিল না। আমি সকলের অগোচরে কাঁধে তুলে নিয়ে সেই গ্রামবাসীর অচেনা একজনের বাড়িতে রেখে, চলে এলাম যুদ্ধে। তাঁরা সানন্দে সিরাজকে আশ্রয় দিয়ে, সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিল। সুস্থ হয়ে সিরাজ চলে গেল ঠিকই কিন্তু পরে শুনলাম, রাজাকারেরা কোনভাবে এটা জানতে পেরে পাকসেনাদের কানে পৌঁছে দিল। মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে সেই রাতেই পাকবাহিনীরা ঐ বাড়িতে হামলা করে বাড়ির সব লোকদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে, ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে আর রাজাকারেরা বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই আগুনে লাশগুলো পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে যায়।

সবাই নিশ্চুপ!

দাদু সবার দিকে একবার দৃষ্টি রেখে বলল, — দাদু ভায়েরা তোমাদের চোখে জল, তোমরা কাঁদছ? যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের হাতে বাঙালিদের এমন হাজারো করুণ, নৃশংস, ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে, যা মনে হলে আজও আমার রক্ত গরম হয়ে যায়, গা শিউরে উঠে।

ছোটমামা বলল, — সেই বীর শহীদদের আত্মত্যাগের কথা আমরা কোনদিনও ভুলবো না।

ছোটমামার সাথে সবাই একসাথে বলে উঠলো, — হ্যাঁ, আমরা কোনদিনও তোমাদের ভুলবো না, ভুলবো না। আমাদের জীবন দিয়েও তোমাদের মূল্য দিব, মাতৃভূমিকে রক্ষা করবো আর দেশের শত্রু রাজাকার বেঈমানদের অবশ্যই হটাবো।

হঠাৎ ঢাকঢোলের শব্দে সবার দৃষ্টিটা অন্য দিকে মোড় নিল। দীঘির ওপার থেকে নানান রংবেরঙের পোষাকে এক এক করে নৌকাগুলো এগিয়ে আসছে। লোকেরও ভীর বাড়ছে। নিমিষেই লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল দীঘির চারপাশ। আর একটু পরই শুরু হবে নৌকা বাইচ। দোয়েল, শাপলা, শিমুল, দাদুসহ সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে, শানবাঁধানো ঘাটে আরও আঁটসাঁট করে বসলো ; এই বুঝি শুরু হবে নৌকা বাইচ!

পুনম মায়মুনী | Punom Mymoni

Bengali Story 2023 | লুনি বা টুনী | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Bengali Article 2023 | চিরায়ত ধর্মমঙ্গলের স্বাতন্ত্র্য | প্রবন্ধ ২০২৩

Bengali Article 2023 | আশা নিরাশার দোলাচলে বাঁকুড়া জেলার কাঁসা শিল্প

Bengali Novel 2023 | ফিরি বিশল্যকরণী (পর্ব ৭) | উপন্যাস

স্বদেশপ্রেম | বাঙালির স্বদেশপ্রেম | স্বদেশ প্রেম কি | স্বদেশ প্রেমের গুরুত্ব | স্বদেশ প্রেম রচনা | স্বদেশপ্রেমের কবিতা | স্বদেশ প্রেম রচনা উক্তি | স্বদেশ প্রেম রচনা ক্লাস ৭ | দেশপ্রেম রচনা | স্বদেশপ্রেম ও নেতিবাচক প্রভাব | স্বদেশপ্রেমের চেতনা ও দেশাত্মবোধ | রচনা স্বদেশপ্রেম খুবই সহজ | অনুচ্ছেদ স্বদেশপ্রেম | স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা | स्वदेश प्रेम | स्वदेश प्रेम पर निबंध हिंदी में | स्वदेश प्रेम | स्वदेश प्रेम का अर्थ | স্বদেশপ্রেম (২০ পয়েন্ট) | শব্দদ্বীপের লেখক | শব্দদ্বীপ | সেরা বাংলা গল্প | গল্প ও গল্পকার | সেরা সাহিত্যিক | সেরা গল্পকার ২০২২ | বাংলা বিশ্ব গল্প | বাংলা গল্প ২০২২ | বাংলা ম্যাগাজিন | ম্যাগাজিন পত্রিকা | শব্দদ্বীপ ম্যাগাজিন

2 Best Swadesh Prem Essay | Essay On Swadesh Prem | bengali story | bengali story books for child pdf | bengali story books for adults | bengali story books | bengali story books for child | bengali story books pdf | bengali story for kids | bengali story reading | short bengali story pdf | short bengali story analysis | short bengali story characteristics | short bengali story competition | short bengali story definition | short bengali story english | short bengali story for kids | short bengali story generator | short bengali story ideas | short bengali story length | long bengali story short | long bengali story short meaning | long bengali story | long bengali story instagram | bengali story writing competition | bengali story writing competition topics | bengali story writing competition for students | story writing competition malayalam | bengali story writing competition india | bengali story competition | poetry competition | bengali story australia 2022 | bengali story competitions uk | bengali story competitions for students | bengali story competitions ireland | bengali story crossword | writing competition bengali story | writing competition malaysia | writing competition london | writing competition hong kong | writing competition game | writing competition essay | bengali story competition australia | writing competition prizes | writing competition for students | writing competition 2022 | writing competitions nz | writing competitions ireland | writing competitions in africa 2022 | writing competitions for high school students | bengali story for teens | writing competitions australia 2022 | bengali story competitions 2023 | writing competitions uk | bengali article writing | bangla news article | bangla article rewriter | article writing | bengali story writing ai | bengali story writing app | bengali story writing book | bengali story writing bot | bengali story writing description | bengali story writing example | article writing examples for students | bengali story writing for class 8 | bengali story for class 9 | bengali story writing format | bengali story writing gcse | bengali story writing generator | article writing global warming | bengali story writing igcse | article writing in english | article writing jobs | article writing jobs for students | article writing jobs work from home | bengali story writing lesson plan | bengali story writing on child labour | bengali story writing on global warming | bengali story writing pdf | bengali story writing practice | bengali story writing topics | trending topics for article writing 2022 | what is bengali story writing | bengali story trends 2022 | content writing topics 2022 | Bangla Prabandha | Probondho | Definite Article | Article Writer | Shabdodweep bengali story | Long Article | Bangla kobita | Kabitaguccha 2022 | Galpoguccha | Galpo | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Shabdodweep Writer | Shabdodweep | Shabdodweep Founder

Leave a Comment