Bengali Story 2023 | ভবতোষ মাস্টার | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

ভবতোষ মাস্টার [Bengali Story]

ভবতোষ মাস্টারকে দেখলে গ্ৰামের ছেলে মেয়েরা আশেপাশে গা ঢাকা দেয়। পারতপক্ষে কেউ সামনা-সামনি হতে চায় না। কোন ভাবে কেউ সামনে পড়ে গেলে সে আর সহজে রেহাই পাবে না। শুরু হয়ে যাবে ভবতোষ মাস্টারের মাস্টারি।

_ তোর নাম কি রে! বাবার নাম? কোন ক্লাসে পড়িস? অমুকটা বানান কর, তমুকটার মানে বল। বাংলা কে পড়ায়? ইংরেজি মাস্টারের বাড়ি কোথায়?

এভাবে অধীত বিদ্যা এবং বুদ্ধি পরখ করার হাজারো প্রশ্নে জেরবার হয়ে বেচারি তখন উদ্ভূত পরিস্থিতির হাত থেকে নিস্তার পেতে এদিক ওদিক করলেও সহজে মুক্তি মেলে না ভবতোষ মাস্টারের কবল থেকে।
গ্ৰাম থেকে বহুদূরে দু-দুটো থানা পেরিয়ে নদী – নালা বেষ্টিত পাথর প্রতিমা ব্লকের এক উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে ভবতোষ। বছর পাঁচেক হলো এসএসসি দিয়ে চাকরিটা মিলেছে। সেখানে স্কুল-হোষ্টৈলে শিক্ষকদের আবাসে তার মতো আরো জনা কয়েক দূরের মাস্টার মশাই মিলে একসাথে থাকে। প্রতি শনিবার বাড়িতে ফিরে আবার সোমবার ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে।

ছাত্র হিসেবে ভবতোষ খারাপ ছিল না। প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করে, আর নিজের সম্পর্কে একটা উচ্চ অহমিকা বোধ তার বরাবরই ছিল। তার উপর ফ্যামিলিতে সে-ই প্রথম উচ্চ ডিগ্ৰীধারী। বাড়ির কাছাকাছি কয়েকটি স্কুল ছিল,কর্মস্থলটা সেখানে না হয়ে দূরে হ‌ওয়াতে একটা আফশোস থেকেই গেছিল। তার ধারণা গ্ৰামের ছেলে-পুলেরা তাদের স্কুলে যাদের কাছে পড়ে তারা ঠিক যেন উপযুক্ত নয়। অথচ তার মতো একজন বিদগ্ধ শিক্ষককে নিজেদের ছেলে মেয়ে ফেলে রেখে দূরে বাইরের ছেলে মেয়েদেরকে শিক্ষাদান করতে কি মেহনতটাই না করতে হয়! এজন্য ভবতোষ মাস্টার নিজেকে যেন ক্ষমা করতে পারে না।

গ্ৰামে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, তাছাড়া আছে দুটো কে জি স্কুল।গ্ৰামের বেশ কয়েক জন শিক্ষিত বেকার যুবক মিলে স্কুল দুটি চালায়। তারা যে সঠিক পদ্ধতিতে যত্ন সহকারে পড়াচ্ছে না, উপরন্তু পয়সা পিটছে আর গ্ৰামের এবং আশেপাশের ভাবী প্রজন্মের শিক্ষার ভিতটা নড়বড়ে করে দিচ্ছে,তা নিয়ে ভবতোষ মাস্টার একান্ত ঘনিষ্ঠ মহলে মৃদু অনুযোগ হামেশাই করে থাকে।

একবার এক শীতের মরশুমে পাড়ার ছেলেরা মিলে মিনি-ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। বড়দিনের ছুটি উপলক্ষে ভবতোষ মাস্টার বাড়িতে ছিল। সমবয়সী বন্ধুরা বিশিষ্ট জন হিসেবে আয়োজক মঞ্চে উপস্থিত থাকার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানায়।প্রথম দিনে প্রথমার্ধের সভামঞ্চে উপস্থিত থাকল বটে, তবে দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বাকি আর দুদিন ক্রীড়াস্থলের ত্রিসীমানায় পা রাখল না।সবাই খুব হতাশ হলো! পরে জানা গেল যে, কে বা কারা যেন মাইকে তাকে নাম ধরে ধরে আহ্বান করেছে।’বাবু’বা ‘মাস্টার মশাই” জাতীয় সম্মান সূচক শব্দবন্ধ না প্রয়োগ করায় খুবই অপমানিত হয়েছেন। কারণ ক্রীড়া প্রাঙ্গণে বহু জনগণের উপস্থিতিতে বিষয়টি তার আত্মমর্যাদায় প্রচন্ড আঘাত দিয়েছে।

সহজ বিষয়টিকে সহজভাবে গ্ৰহণ করার মানসিকতা যথেষ্ট কম ভবতোষ মাস্টারের। সবকিছুকে একটু পেঁচিয়ে ধাতস্থ করার ঝোঁক তার। স্বভাবটি পিতৃসূত্রে পাওয়া। ভবতোষের বাবা জলধর সামন্ত ছিলেন অনেকটা জটিল মনের মানুষ। জলধর বাবুর বাস্তু সংলগ্ন একটি মুদি দোকান ছিল। দোকানটি চালাতে গিয়ে বেশ কিছু দেনা হয়ে যায় বলে খবর। তার উপর দোকানের সত্ত্ব পাওয়ার লোভ এবং দাবি জলধর বাবুর আর ও তিন ভাইয়ের ছিল।

সে এক গ্ৰীষ্মের শেষ রাত। জলধর বাবুর আর্ত চিৎকারে পাশাপাশির মানুষ জন ঘুম জড়ানো চোখে ছুটে এল। জলধর বাবু সবার সামনে প্রায় কেঁদে ফেলে বলতে লাগলেন,
__ চোরেরা আমার দোকানের মালপত্র লুটপাট করে নিয়ে গেছে, কী করে আমি সংসার চালাবো!

উপস্থিত সবাই দেখল, দোকানের ভিতরের জিনিস পত্র অগোছালোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে এবং বাসনপত্র সহ কিছু জিনিস বিক্ষিপ্তভাবে বাইরে পড়ে। অর্থাৎ চোরেরা সাধ্যের মধ্যে যা পেরেছে নিয়ে গেছে আর বাদবাকি যাওয়ার পথে ফেলে ফেলে রেখে গেছে।সবাই দেখল এবং অনেকে ভাবল যে,চোর বেটারা যতগুলো নিয়ে গেছে, ফেলে গেছে তার অধিক।এ কেমন চোর আর কেমন চুরি রে বাবা!ভোর হয়ে গেল। লোকজন সব ঘরে ফিরছে, অনেকেই বলাবলি করতে লাগল, পাওনাদার আর ভাইদের ফাঁকি দেবে বলে পরিকল্পিতভাবে জলধর বাবু এই ঘটনাটি সাজিয়েছেন।অচিরে সেটাই সত্য বলে লোকে জানতে পারল।যদি ও ঘটনাটি লোক সমক্ষে সত্য প্রমাণ করতে এবং চোর ধরতে জলধর বাবু দূরের গ্ৰাম থেকে ‘বাঁশ চালাচালির ‘ দল এনে দু-তিন দিন ধরে অনেক কান্ড করেছিলেন।

রবিবারটা পুরো দিন বাড়িতে থাকে ভবতোষ মাস্টার। সকালের দিকে হাট-বাজার সেরে বিকেলে পরিচিত বন্ধু বান্ধবদের সাথে বেশ কিছু ক্ষণ আড্ডা জমায়। প্রসঙ্গক্রমে গল্প করে যে, পরে পরে কলেজ সার্ভিসে ঢোকার ইচ্ছা আছে এবং সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাবা মারা গিয়েছেন অনেক বছর হলো। তখন ভবতোষ চাকরি পায়নি। একক প্রচেষ্টায় এ পর্যন্ত আসতে পেরে ভবতোষ নিজে মনে মনে খুবই গর্বিত।তাই তার প্রফেসর হ‌ওয়ার গল্পটা সবাই নিঃসংশয়ে মান্যতা দেয়।

সংসারে তার বিধবা মা, স্ত্রী ও এক ছেলে। তাদের সঙ্গে তেমন ভাবে সময় দিতে না পারার কারণে ভবতোষ অনেক সময় অনেকটা অস্বস্তিবোধ করে।

প্রথম থেকেই স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তেমন বনিবনা চলছিল না। তার জেরে এক সময় মামলায় জড়িয়ে পড়ল ভবতোষ। সে একা নয়, তার সঙ্গে আরও দুজন সহকর্মী ও জড়িয়ে গেল।জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ ঘটিয়ে আখেরে যে লাভ হবে না সে বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিল ভবতোষ। অবসরের ফাঁকে ফাঁকে প্রস্তুতি নিয়ে আবার নতুন করে এসএসসি পরীক্ষায় বসল সে। রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল তার র‌্যাঙ্ক‌ বেশ উপরে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতির থেকে পরিত্রাণের একটা দিশা দেখতে পেল ভবতোষ মাস্টার।

এবার পোষ্টিং পেল কলকাতার এক স্কুলে। চিরদিনের মতো গুডবাই জানাল পাথর প্রতিমাকে। প্রথম প্রথম বাড়ি থেকে কলকাতায় যাতায়াত শুরু করল ভবতোষ। এভাবেই বছর তিনেক কাটল। ইতিমধ্যে কলকাতার উপকণ্ঠে নতুন গৃহ নির্মাণ করে সপরিবারে সেখানকার বাসিন্দা হয়ে গেল।গ্ৰামের ভিটেয় পড়ে র‌ইলো নবনির্মিত পরিত্যক্ত বাড়িঘর। অনেক দিন পর্যন্ত বিধবা মা সামলাচ্ছিলেন সে সব।কালে-ভদ্রে ছুটির দিনে ছেলে এসে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে,রাত নাগাদ ফিরে যেত শহরে।পাড়া-পড়শিরা ব্যাপারটাকে ভালো নজরে দেখছে না,তা নিয়ে অনেক কথা অনেক আগে থেকে তার কানে উঠছিল। শেষটায় মায়ের শরীরের অবস্থা দেখে এবং গ্ৰাম্য সমালোচনার হাত থেকে নিজের মান রক্ষার্থে মাকে নিয়ে কলকাতার বাসায় তুলল। সেই অবধি মা ছেলে -বৌয়ের সঙ্গে কলকাতা প্রবাসী।

রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা [Bengali Story]

হঠাৎ কি জানি কোন ভাগ্যের ফেরে।
স্বপনে লভিনু তাঁরে আপন অন্তরে।
দিনটা ছিল ২৫শে বৈশাখ। দিনটা সম্পর্কে নতুন করে পরিচয় ‌ প্রদানের প্রয়োজন নেই আশাকরি। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের পুণ্য জন্ম দিনটি সাধ্যমতো সাড়ম্বরে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি সবাই মিলে।এমন সময় হঠাৎ সভাস্থলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব।আমরা তো রীতিমতো বিস্মিত হতচকিত।

‘বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে।’
সবাই আমরা অভাবিতভাবে অপ্রস্তুত।
‘তোমার আসন পাতব কোথায় হে অতিথি।’

জন্ম দিনটিতে যাঁর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজা করে এসেছি, যাঁর পূজার ছলে যাঁকে ভুলে থেকেছি, সেই অসীম বিস্ময় ক্ষণজন্মা মহামানবটিকে কাছে পেয়ে আনন্দে,অবাক বিস্ময়ে, দিশেহারা আমরা, তাই-

‘দেবতা জেনে দূরে র‌ই দাঁড়ায়ে,
আপন জেনে আদর করি নে।
পিতা বলে প্রণাম করি পায়
বন্ধু বলে দু’হাত ধরি নে।’

যাঁর তরে আজ এই আয়োজন,সেই পরম পুরুষ হৃদয়ের ধন, তাঁকে হঠাৎ পেয়ে চমকে ওঠা মন চায় সাদরে বরণ করে নিতে–
‘ওহে সুন্দর মম গৃহে আজি পরমোৎসব রাতি।
রেখেছি কনক মন্দিরে কমলাসন পাতি।’

নিত্যদিনের সর্বক্ষণের মানস সঙ্গী গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের হৃদয় জুড়ে রয়েছেন,আজ তাঁকে ‌কাছে পেয়ে‌ অন্তরাত্মা গুনগুনিয়ে উঠল,
‘দাঁড়াও আমর আঁখির আগে।
‌ তোমার দৃষ্টি হৃদয়ে লাগে।’

আসনে উপবিষ্ট রবীন্দ্রনাথ নীরবে তাঁর প্রশান্ত দৃষ্টির স্নিগ্ধ মাধুরী ছড়িয়ে অবলোকন করছেন চারিদিক।গুরুদেবের আগমন বার্তা বাতাসের মতো ছড়িয়ে গিয়েছে দিকে দি‌গন্তরে।এক পলক চোখের দেখা দেখার আশায় অগণিত জনতার নিরন্তর আসা-যাওয়ায় আমাদের নির্ধারিত সূচি গেল ভেস্তে। সবকিছু বাতিল করে নতুন করে কোন সূচি আর তৈরি করা গেল না।যেভাবে জনতার ভিড় বাড়ছে সেই গণ হৃদয়ের উত্তাল আবেগ থেকে গুরুদেবকে ‌নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে, তাঁর আহার‌ এবং বিশ্রামের সুব্যবস্থা করার চিন্তাটাই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়াল।অথচ বন্যার স্রোতের মতো ধেয়ে আসা আপামর জনতাকে গুরুদেব-দর্শনের‌ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

পথ নিরাপত্তার কারণে স্থানীয় থানায় খবর দেওয়া হলো।বিরাট পুলিশ বাহিনী এসে অনুষ্ঠানস্থল এবং বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পথের মোড়ে মোড়ে অবাঞ্ছিত ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে তার সম্পূৰ্ণ দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন।আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল প্রাচীন জমিদার পরিবারের ছেলে। তাদের পড়ে থাকা দুর্গা-দালানে অস্থায়ী মঞ্চের ব্যবস্থা করে সেখানে গুরুদেবকে সিংহাসনে উপবিষ্ট করে স্থাপন করা হলো। সামনে তাৎক্ষণিক‌ ব্যারিকেড তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দেব মূর্তি দর্শনের মতো রবীন্দ্র-দর্শনের ব্যবস্থা করাতে আগত জনগণ সারিবদ্ধভাবে হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের প্রাণের ঠাকুরকে ক্ষণিক দেখার আনন্দ লাভ করে ঘরে ফিরতে লাগলেন।অনেকের হাতে ছিল মালা,জনতার মধ্য থেকে কারা যেন প্রার্থনার সুরে গাইতে শুরু করলেন,

‘….প্রসাদ লাগি কত লোকে আসে ধেয়ে,
আমি কিছুই চাইব না তো র‌ইব চেয়ে–
সবার শেষে যা বাকি রয় তাহাই লব।
তোমার চরণ ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।’

মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল।চেয়ে দেখলাম,কিন্তু বেশ খানিকটা সময় ধরে বুঝতে‌ পারলাম না কোথায় আছি,এখন দিন না রাত। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সম্বিৎ ফিরতে মনটা গভীর বিষাদে ভরে গেল।হে আমার জীবন-দেবতা, জীবনের ধ্রুবতারা-

‘যখন এসেছিলে অন্ধকারে
চাঁদ ওঠেনি‌ সিন্ধুপারে।
হে অজানা তোমায় তবে জেনেছিলেম অনুভবে-‘
ঘুমের মাঝারে ধরা দিলেন, কিন্তু তাঁকে স্বপন -পাশে বাঁধতে গেলাম ভুলে, অথচ ‘স্বপ্নে আমার মনে হল,’
‘ পাশে এসে বসেছিল তবু জাগিনি।
স্বপন মাঝে বাজিয়ে গেল গভীর রাগিণী।’
আমাদের পাড়ার ক্লাবে তখন মাইকে বাজছে,
‘হে নূতন,
দেখা দিক আর বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’

মৃত্যু মিছিল [Bengali Story]

দীর্ঘ কয়েক বছর কলকাতায় কাটিয়ে হাতে কিছু পয়সা জমিয়ে সপরিবারে গ্ৰামের ভিটেয় ফিরে এল ভৈরব বাবুরা। মরে-হেজে গিয়ে বেঁচে আছে একটাই ছেলে। পোড়া মাটি যেমন কাঁচা মাটির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারে না তেমনি কলকাতার জল হাওয়ায় বড়ো হয়ে ওঠা ভৈরব বাবুর ছেলে বাদল ওরফে ভূতো প্রথম প্রথম পাড়ার কোন ছেলে মেয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হলো। তার কথা বলার ভঙ্গি, চুলের ছাঁট, গোঁফের ছাঁট, পোশাক পরিচ্ছদের বাহারি দেখনদারি, সব মিলিয়ে তার ভাবগতিক দেখে মনে হয় সে যেন এ আবহাওয়ার প্রজাতি নয়। এমনি করে কেটে গেল আরো কয়েকটা বছর। ইতিমধ্যে ভৈরব দম্পতির মৃত্যু ঘটেছে। সংসারের কর্তা এখন বাদল।আগের মতো সেই গা-বাঁচিয়ে চলা ভাবটা অনেকটা কেটে গেছে,যদি ও কিছু কিছু নমুনা থেকেই গিয়েছে যা বোধকরি আর যাওয়ার নয়।বাদলের ছেলে মেয়ে তিনজন। বড়ো এক মেয়ে, ছোট দুই ছেলে। বড়ো ছেলে বিমল বাপকা বেটা, তবে বুদ্ধি ভালো।

মেয়ে পৌলমীর বিয়ে হলো কিন্তু সংসার সুখের হলো না। ছোট-খাঁট বিষয় নিয়ে অশান্তি লেগেই থাকল। মেয়ে পেয়েছে ওর বাপের স্বভাব। মানিয়ে চলার ধৈর্য কম। জামাই ছেলেটা পৌলমীকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল অনেক। কিন্তু সে তার শাশুড়িকে কোন ভাবেই বরদাস্ত করতে পারল না। শাশুড়ি ছিল একটু দজ্জাল গোছের।অগত্যা পৌলমী একদিন এক কাপড়ে বাপের ঘরে এসে উঠল।বাপ-মা বোঝায়, মাঝে মাঝে জামাই এসে বুঝিয়ে নিয়ে যেতে চায়, কিছুতেই কিছু ফল হলো না। সেদিন জামাই উপস্থিত ছিল, পৌলমীর মা তাকে বোঝাবার অনেক চেষ্টা করল, শেষে রুষ্ট হয়ে যথেষ্ট কড়া ভাষায় বকাঝকা করল। পরের দিন সকালে পাশের দাবায় যেখানে গরু ছাগল থাকত এক সময়, সেখানে বাঁশের আড়া থেকে গলায় দড়ি দেওয়া অবস্থায় ঝুলতে দেখা গেল পৌলমীকে।

এরপর অনেক দিন পর্যন্ত জামাই বাবাজি এ-বাড়ির সঙ্গে যাতায়াত বজায় রেখেছিল। এমনকি আবার বিয়ে করে নতুন বৌকে নিয়ে ঝি-জামাইয়ের মতো সম্পর্কটা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। তারপর ধীরে ধীরে তা একদিন বন্ধ হয়ে যায়। এতোবড়ো একটা ঘটনার পরে ও বাদলের স্বভাবের তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। ছেলে মেয়ের উপরে আগে যেমন খড়্গহস্ত ছিল এখনও তেমনি র‌ইলো, মাঝে কিছু দিন একটু যেন অবদমিত ছিল। ছেলেদের প্রতি, বিশেষ করে বড়ো ছেলেটার উপর কারণে অকারণে শাসনের রোলার চলত নির্মমভাবে। এই সমস্ত কারণে পাড়ার কারো সঙ্গে বাদলের তেমন কোন হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি। সবাই এই পরিবারটিকে ব্যতিক্রমী পরিবারের মধ্যে গণ্য করত।প্রতি পদক্ষেপে অহেতুক বাধা পেয়ে পেয়ে মনে মনে বোধকরি বিদ্রোহী হয়ে উঠে সমস্ত বাধা অতিক্রমের প্রচ্ছন্ন একটা চেষ্টা বিমলের মধ্যে সব সময়ের জন্য কাজ করতে থাকল। মাধ্যমিক পরীক্ষা মিটে গেছে। মাধ্যমিক দিয়েছে বিমল। পরীক্ষা ভালোই হয়েছে। হাতে এখন অঢেল সময়।একটু বেশি সময় খেলা ধুলো করার সে-সময় সে পায় না, বাপ তাকে কোন না কোন কাজে ব্যস্ত রেখে দেয়।

চৈত্র মাসের প্রকৃতি। হু-হু করে এলোমেলো দখিনা বাতাস ব‌ইছে। মাঠের গরু বাছুরের দল ফিরতে শুরু করেছে।সন্ধ্যা উৎরে গেছে, বিমল এখনও বাড়ি ফেরেনি। বিকেলে একটু সময় খেলতে যায়, সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফেরে। ওর মা পাড়ায় খুঁজতে বার হলো। ডেকে ডেকে সারা, কোন সাড়া পাচ্ছে না।বিষয়টা পাড়ার লোককে ও ভাবিয়ে তুলল। এমন সময় কে একজন ছুটে এসে ওর মাকে খবর দিল বিমলকে পাওয়া গিয়েছে। মা ছুটোছুটি করে বাড়িতে গিয়ে দেখে ছেলের মৃত দেহটা দাবাতে শোয়ানো আছে, পাশে বাদল বসে কপাল চাপড়ে চলেছে। বিমলের ছোট ভাই কমল বসে বসে অঝোর নয়নে কাঁদছে। মা ছেলের মরা দেহটার উপর আছড়ে পড়ল। বিমল বিকেলে আজ মাঠে যায়নি। ঘর থেকে মায়ের একটা শাড়ি নিয়ে গোপনে কখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল কেউ জানে না। ওদের বাড়ির কাছাকাছি ছিল প্রকান্ড একটা বটগাছ। তার নিচে ছিল বিভিন্ন রকম ঠাকুরের একটা বড়ো থান। লোকজন সেখানে সচরাচর চলাফেরা করত না। সেই থানের আড়াতে উঠে মায়ের শাড়ির ফাঁস গলায় লাগিয়ে ঝুলে পড়েছিল বিমল। খুঁজে খুঁজে সন্ধ্যার আবছা আঁধারে ওর বাবা কী মনে ভেবে সেখানে যায় এবং বিমলকে ওই অবস্থায় দেখতে পায়। পাড়ার সবাই হায় হায় করতে লাগল।

মাধ্যমিকের রেজাল্ট বের হলো। দেখা গেল ভালো নম্বর নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছে বিমল। কয়েক মাস পরে ওর বাবা গিয়ে মার্কশীটটা নিয়ে এসেছিল। কেটে গেছে দুটো বছর।বাদলরা নিজেদেরকে বাইরের সমাজ থেকে আরো গুটিয়ে নিল। পাড়ায় আছে অথচ তাদের সাড়া কেউ তেমন পায় না। সকালে সাইকেল ভ্যানটি নিয়ে বেরিয়ে যায় বাদল,ফেরে দুপুর গড়িয়ে, বিকেলে আর বের হয় না। হারাধনের সম্বলের মতো শেষ এবং একমাত্র সম্বল এখন কমল। দাদার মৃত্যুর পর সেও যেন কেমন মনমরা হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সময় একা একা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে। স্কুলে সব দিন যায় না।তা নিয়ে বাবা-মা জেদাজেদি করে না।

গতদিন ছিল হাটের বার। পরের হাট পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে এনেছে বাদল।আজ সকালে গোপা অর্থাৎ বিমলের মা জরুরি একটা প্রয়োজনে যাচ্ছে বাপের বাড়ি। বাপের ঘর পাশের গ্ৰামে। বিকেলেই ফিরে আসবে।মা চলে যাওয়ার পর কমল মাংস খাবে বলে বায়না ধরল। বাপ না করল না, মাংস কিনতে তৎক্ষণাৎ বাজারে বেরিয়ে গেল। বাজার সেই দেড় কিলোমিটার দূরে যেখানে হাট হয়। স্ত্রী গোপা বাড়িতে নেই। বাজার থেকে ফিরে বাদল কমলকে ডাকতে লাগল।সাড়া পেল না।ভাবল বাইরে কোথাও গেছে। মাংসের ব্যাগটি রান্না ঘরে রেখে ঘরে ঢুকল। দরজা জানালার ভিতর দিয়ে ঢোকা আবছা আলোতে আঁতকে উঠল বাদল। ঘরের আড়া থেকে দড়ির ফাঁসে ঝুলছে কমল। লোকজন বাড়িঘর ভরে গেল। একজন গোপাকে খবর দিতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাদল হতভম্বের মতো নির্বাক অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে।সে চাহনির মধ্যে অতল গভীর অব্যক্ত একটা বেদনা কোথায় যেন লুকিয়ে আছে। বিকেলে পুলিশ এসে চটে জড়িয়ে মৃতদেহ গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। বাড়িতে সেদিন আর আলো জ্বলল না। ভূতুড়ে বাড়ির মতো জনশূন্য পড়ে র‌ইলো।

দীর্ঘ কয়েক মাস বাদল গোপাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে কাটালো। সময়ের ব্যবধানে শোক তাপ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলে দু’জনে নিজেদের ভিটেয় ফিরে এসে বাড়িঘরের চেহারা আমূল বদলে নিল। এখন তাদের ঘর দুয়ার দেখলে আশ্রম আশ্রম মনে হবে। তুলসীর মালা নিয়েছে বাদল। নিত্যদিন সকাল সন্ধ্যা চন্দনের ফোঁটা কপালে ধারণ করে দুজনে। এমনি করে জীবনের বরাদ্দ বাকি দিনগুলি শান্তি ও সান্ত্বনার দিশা খুঁজতে খুঁজতে পার করে দিতে চায় তারা।

প্রবোধ কুমার মৃধা | Probodh Kumar Mridha

Bengali Story 2023 | ইচ্ছাপূরণ | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Bengali Story 2023 | লুনি বা টুনী | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

Bengali Story 2023 | ওরাই আমাদের কর্ণধার (শিশুকিশোর) | গল্পগুচ্ছ ২০২৩

ট্যাটুর ইতিহাস ও আমরা | History of Tattoo | Reasons for using tattoos | 2023

bengali story new | indian poems about death | bengali story | bengali story books for child pdf | bengali story books for adults | bengali story books | bengali story books for child | bengali story books pdf | bengali story for kids | bengali story reading | short story | short story analysis | short story characteristics | short story competition | short bengali story definition | short story english | short story for kids | short bengali story generator | bengali story 2023 | short story ideas | short story length | long story short | long story short meaning | long bengali story | long story | long story instagram | story writing competition | story writing competition topics | story writing competition for students | story writing competition malayalam | story writing competition india | story competition | poetry competition | poetry competitions australia 2022 | poetry competitions uk | poetry competitions for students | poetry competitions ireland | poetry competition crossword | writing competition | writing competition malaysia | writing competition london | bengali story writing | bengali story dictation | writing competitions nz | writing competitions ireland | writing competitions in africa 2022 | writing competitions for high school students | writing competitions for teens | writing competitions australia 2022 | writing competitions 2022 | writing competitions uk | bengali article writing | bangla news article | bengali story news| article writing on global warming | article writing pdf | article writing practice | article writing topics | trending topics for article writing 2022 | what is article writing | content writing trends 2022 | content writing topics 2022 | Bangla Prabandha | Probondho | Definite Article | Article Writer | Short Article | Long Article | Bangla kobita | Kabitaguccha 2022 | Galpoguccha | Galpo | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Shabdodweep Writer | Shabdodweep | Shabdodweep Founder

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *