Monday, November 21, 2022

গভীর ক্ষতচিহ্ন - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা | গল্প ২০২২ | Krishna Kishore Middya | Bangla Galpa | Story 2022

গভীর ক্ষতচিহ্ন

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


বাজার থেকে কেন যে দেরি করে আসে,আর বকা খায় । প্রায় রোজ। বকা খেলে কিন্তু কোন রাগ নয়, নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যখন চাকরি ছিল, কী যে ব্যস্ত মানুষ !  রান্না যতটুকু হল, ওই পর্যন্ত খাওয়া। সময়ের ট্রেন, সময়ে অফিস। কলকাতায় কিছুদিন ছিল,অফিসার বলতেন, - আপনি কী খুব কাছাকাছি থাকেন, কিন্তু যখন শুনতেন ভাড়া বাড়ির ঠিকানা, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন সেই নিরীহ দর্শন মানুষটার দিকে। বাবা হাজিরা খাতায় সই করতে যেত ধীরে ধীরে। সারা অফিস টাইম মুখ বুজে কাজ, যে মানুষটি সমস্যা নিয়ে এলো, তার ডেকে কথা বলা, কী করলে তার কাজ উদ্ধার হবে, বুঝিয়ে বলা। গ্রাউন্ড ফ্লোরে বসে থাকা নিরাপত্তা রক্ষী, সে যে কি করে জানল ওই মানুষটার কাছে গেলে নির্ভয়ে কথা বলা যায়। সে তাই অফিসে আসা মানুষদের প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে, সেই মানুষটির কাছে যেতে বলে। অফিসের শুভ দীপ কাকু, বাবার জুনিয়র সহকর্মী, বলত বাবা নাকি প্রচারের আড়ালে কত কাজের চাপ নিত, কেউ কিন্তু বুঝতে পারতো না। বাবা কিন্তু কোনদিন অফিসের কাজ, সমস্যা, টেনশন কিছুই বাড়িতে বলতো না। চাকরি জীবনের বেশির ভাগ বাইরে বাইরে।

     আমি তখন মাধ্যমিক দেব, বাবার পোস্টিং পূর্ব মেদিনীপুর। সেখানে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে, নিজে রান্না করে খায়। কী খায়, কী রান্না করে, আমরা কিছুই জানিনা। মা তো কোনদিন জানতে চাইতো না, বাবার রান্নার কথা। তবে মাঝে মাঝে চাল  দিয়ে দিত ব্যাগে করে। রোজ রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার মোবাইল মারফত কথা বলতো। আর আমি স্কুল এবং টিউশন থেকে ফিরেছি কী না খবর নিয়ে তবেই স্বস্তি পেত। এক রাতে আমি মায়ের সঙ্গে রাগ করে ভাত খাচ্ছিলাম না, বাবাকে ফোন করে। আমার সঙ্গে কথা বলে, - দেখ তুই রাগ করছি কেন, খেয়ে নে শরীর খারাপ করবে। আর আমি কিন্তু কিছুই খাব না, তুই না খেলে। মা মাঝে মাঝে বকা দিলেও বাবা কোনদিন বকে নি। বুঝিয়ে বলতো যতক্ষণ না আমার রাগ পড়ে। অবসর নিয়ে বাড়িতে ফিরে খুব মন মরা হয়ে থাকতো, তা কিন্তু না। খুব স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিল অবসর জীবন। রসিকতা করে বলতো, এখন আমি বাতিল গাড়ি,গ্যারাজে পড়ে আছি। আবার মাঝে মাঝে বলতো, - চাষের বলদ বুড়ো হলে যা হয় আর কি, খোঁটায় বেঁধে জল আর খড় দিলেই হল। বন্ধুদের সঙ্গে, ফোনে কথা বলার সময় ঠাট্টা করে এইসব বলতো, শুনেছি। 

     তা তোমার বাজারে এত দেরি কেন হয় বল? কী আর বলবো, - আমি দাঁড়িয়ে আছি দোকানির সামনে, পিছন থেকে খরিদ্দার এসে বললো, ওই টা দাও, সেইটা দাও। দোকানী আমাকে সামনে দেখেও তাদের দিচ্ছে। যে পরে এলো তার কোন বোধ নেই যে,আমি লোকটা সামনে দাঁড়িয়ে। আসলে আমি যেখানে যাচ্ছি, কেউ কি আমার দেখা পায় না !  ট্রেনে বাসে ভিড়ে,কেউ আমার দেখা পায় না বোধ হয়। না হলে একটু দাঁড়াবার জায়গাও দেয় না! ব্যাংকে, বা অন্য কোন জায়গায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও বিপদ। সামনে বেশ ফাঁকা, কাউন্টারের কাছাকাছি গেলেই চারজন এসে বলে, আমরা আগে ছিলাম। পিছনে তিনজন বলে গেল, দাদা আমার লাইন রইলো আপনার পিছনে। এই আমি, বোকার  মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছি লাইনে। আমাকে প্রায় কোন কাজ করতে দিত না। বলতো তুই পারবি না, আমি করছি। মা রাগ করে বলতো, তুমিই ওর কোন কাজ শিখতে দিচ্ছ না। সব সময় কী যে ভাবত, বুঝতাম না। বলতো,ওই ভাবনার মধ্যে থাকলে, তোদের কথা সব শুনতে পাই না।

     তার সেই ভাবনাটা যে কাল হবে, ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারিনি আমরা। অতিমারি একটু কমেছে। কিন্তু মেজ মাসীর ভাসুর মারা গেল সেই করোনাতে। পারলৌকিক কাজে বাবা গেল। প্রথমে ট্রেন, তারপর অটো, প্রায় দু'ঘন্টা লাগে  মাসিদের বাড়ি যেতে। ফেরার পথে নাকি বাবা পথ বদল করে। ওদের বাড়ি থেকে হাঁটা পথে আগের স্টেশনে আসা যায়।তবে সচরাচর কেউই হেঁটে আসে  না। তখন ছিল ফাল্গুন মাস। প্রকৃতি কী সাজে সেজেছে। বাবা নাকি বলে এলো, - আজকে পথ, মাঠ, খাল আর গাছপালা দেখতে দেখতে হাঁটবো। সকলে শুনে অবাক হয়ে বলেছিল অনেকটা হাঁটতে হবে। কারুর কথা শোনেনি।  রাত যখন বাড়ছে, মাসির বাড়ি ফোন করে মা জানল, তার ওই পথ বদলের কথা। আশঙ্কা শুরু হয়ে গেল, বাড়িতে আর আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে। জলজ্যান্ত মানুষটা কোথায় গেল ! মোবাইলে যোগাযোগ করা যাচ্ছেনা, রিং হয়েই যাচ্ছে। একসময় রিংয়ের নিস্তব্ধতা। আমাদের ঘরে নিস্তব্ধতার সঙ্গে নেমে আসছে হিম শীতল আতংক, এই বসন্তের দিনে। রাত যত বাড়ে, ভাবনার স্রোত শিরায় শিরায় স্নায়ুতে স্নায়ুতে খেলে বেড়ায়। হাজার ঘটনার সম্ভাবনা মাথার মধ্যে জট পাকাচ্ছে। জ্যাঠামশাই ও কাকারা সব দিকে খবর পাঠিয়ে, নিকটবর্তী থানায় খবর জানিয়েছে ইতিমধ্যে। আমি আর মা, বিনিদ্র রজনী নির্বাক বসে। মার কান্না আস্তে আস্তে তরঙ্গায়িত হচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোনের শব্দ আসে নিকট জনের কাছে থেকে, বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে,ভাবি হয়তো বাবার ফোন। কিন্তু সত্যি হয় না !

    দুঃস্বপ্নের বিশাল রাত শেষ হলে, আমরা বেরিয়ে গেলাম। গতকাল যে পথে মানুষটা ফিরে ছিল সেই পথে বেশি খোঁজাখুঁজি, অন্য দল থানায় থানায়। সবাই একটা ধন্দে পড়ে গেল, যে পথ ধরে বাবা ফিরছিল সেই পথ নিয়ে। ঘটনা হল, পুরো পায়ে চলা পথটি এখন আর নেই। শেষ অনেকটা অংশ পাকা রাস্তা, বিভিন্ন গাড়ি চলে, তাতেই স্টেশন পৌঁছান যায়। অবশেষে বোঝা গেল গত সন্ধ্যায় এক অটো দুর্ঘটনা হয়েছিল সন্ধ্যার অন্ধকারে। আর মানুষটার বেরোনোর সাথে সময়টা গেল মিলে। শেষ আশাটুকু লীন হোল। কারা কোথায় কোন মানুষকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করেছে সহজে বোঝা যাচ্ছে না।

     আজ দুদিন আমরা এক টলমলে পৃথিবীতে আছি। নিরীহ এক খবর নেওয়া মানুষটা,খবর হীন হল কী করে ! শেষে, তৃতীয় দিন থানার পুলিশের তৎপরতায় জানা গেল একটা গুরুতর আহত মানুষকে কলকাতার এক হাসপাতালে ওই দিন গভীর রাতে ভর্তি হওয়ার কথা। হয়তো একটু আলোর ঝিলিক, নয়তো নিভে যাওয়ার গল্প।  নির্দিষ্ট হাসপাতাল জানা যায় নি। তবু একদল মানুষ তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছে শুধু হাসপাতাল নয়, সর্বত্র। রোগীর বেড খুঁজতে খুঁজতে এখন মর্গে খোঁজা শুরু হল। একজন বাবা নির্ভর জোয়ান ছেলে, কোথায় না দৌড়ে বেড়াচ্ছে কাকা মামাদের সঙ্গে ! তার স্বপ্নের পৃথিবীতে কদিন হোল কোন আলো নেই যেন। মা, বাবার দাদা, ভাইদের অবস্থাও চোখে দেখার মত নয়। কী নিবিড় বন্ধন তাদের ! মর্গের দেহগুলোতে পচন ধরেছে। তবুও খোঁজার শেষ নেই, পালা করে। মুখ চিনতে না পারা নিষ্প্রাণ বিকৃত দেহগুলোর জন্ম দাগ অথবা অন্য কোন কাটা ছেঁড়ার দাগ এখন ভরসা। সেই চেষ্টা ও মার খাচ্ছে, বাবার দেহে সেভাবে কোন গভীর জন্ম চিহ্ন ছিল না। হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল ছোট বেলায় বাবার একটা গল্পের কথা। গল্প বলতে পারতো ভালো, তবে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলার রাজা। তবুও মনে হল ওই গল্প টা তো সত্যি, কারণ বাবার বর্ণনার সঙ্গে দেখিয়ে ছিল সেই দাগটা। 

   ছোটবেলার গ্রাম জীবনের গল্প বেশি বলতো মানুষটা। শহর তার কোনদিন পছন্দ ছিল না। সেদিনের গল্পটা মনে আছে। বর্ষাকালের দিন, স্কুলে ছুটি থাকলে বাবারা সব ভাই মিলে চাষের কাজে যেত। সেদিন মাঠে ধান চারা রোপণের কাজ চলছিল। বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে ঘন মেঘের ঘনঘটা। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি, তখনও কিছু চারা রোপণ বাকি। কিন্তু বৃষ্টির প্রাবল্যে কাজ ফেলে, দৌড়ে বাড়ি ফেরার জন্য সবাই ব্যস্ত। এক হাঁটু জল ভেঙে দৌড়ে ডাঙায় ওঠার আগে, বাবার পায়ের তলা জ্যান্ত শামুকের ধারালো মুখে পড়লো। আর তাতেই গভীর ক্ষত। ওদিকে প্রবল বৃষ্টি। দাদারা ভায়ের পায়ে বেঁধে দিল গামছা। তারপর সেই তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে, সবাই মিলে ধরাধরি করে নিয়ে আসা হল তাকে। ঠাকুরমা তখন তাড়াতাড়ি করে চুন আর বাটা হলুদ মিশিয়ে ক্ষত স্থানে দেওয়ার পর রক্ত বেরোনো বন্ধ হল।বাবার পায়ের পাতার তলায় সেই গভীর ক্ষত চিহ্নের কথা, কাকাদের বললাম। ওদেরও গল্পের সেই ঘটনা মনের আয়নায় স্পষ্ট হল তৎক্ষণাৎ।

     মৃত্যুপুরীর আলো আঁধারি ঘরে এক বীভৎস দৃশ্য। এক সারি বিকৃত মৃতদেহ, কাঠের ছোট ছোট পাটাতনে সাজানো। যতই ঠান্ডা ঘর হোক না কেন পচনশীল মৃতদেহের অসহ্য এক অচেনা গন্ধ। বিকৃত তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।সংশ্লিষ্ট ডোমেরা সাহায্য করে।   ভাই আর দাদারা,আমার বাবার মৃত দেহ শনাক্ত করছে, বাইরে আমি বসে আছি গভীর শঙ্কা নিয়ে। হাজার ঘটনা, হাজার দৃশ্য বাবার সঙ্গে আমার। সবগুলো একসঙ্গে মাথার মধ্যে কী নিষ্ঠুর ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে !  এক বিচিত্র ঘোরের মধ্যে মায়ের মুখটা, বাবার মুখটা মনে পড়ছে। 
আমি যেন ডুবে যাচ্ছি এক গভীর অন্ধকারে! অনেকক্ষণ পরে ওরা ফিরে এলো। সবার পাংশু মুখ, যেন কয়েকটা মৃতদেহ হেঁটে হেঁটে আমার চারধারে হাজির। ঘোরের মধ্যে থাকা আমি, আমার সম্বিত ফিরতে ছোট কাকা আমাকে জড়িয়ে ধরে  হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে।খবরটা  শুনে আমি নাকি জ্ঞান হারাই, পরে জেনেছি। প্রিয় ভাইকে হারানো দাদা ও ছোট ভাইদের সান্ত্বনা দেওয়ার মত কেউ সেখানে নেই। এমন সময় হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার এসে বলে, - আপনারা গাড়ি ডাকুন, ডেড বডি নিয়ে যাবেন। কলকাতার তীব্র আলোর মধ্যেও যেন নেমে আসে মৃত্যুর মত অন্ধকার।


কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা | Krishna Kishore Middya







গভীর ক্ষতচিহ্ন | গভীর রাতে সোনারপুরে শুটআউট | গলায় গভীর ক্ষত চিহ্ন | শ্রীদেবীর মাথায় গভীর ক্ষতচিহ্ন | ক্ষতচিহ্ন সমার্থক শব্দ | গভীর ক্ষত | ভারতে ক্ষতচিহ্ন অপসারণ | এ কী অবস্থা পরিণীতির | শব্দদ্বীপের লেখক | শব্দদ্বীপ | সেরা বাংলা গল্প | গল্প ও গল্পকার | সেরা সাহিত্যিক | সেরা গল্পকার ২০২২ | বাংলা বিশ্ব গল্প | বাংলা গল্প ২০২২ | বাংলা ম্যাগাজিন | ম্যাগাজিন পত্রিকা | শব্দদ্বীপ ম্যাগাজিন


bengali poetry | bengali poetry books | bengali poetry books pdf | bengali poetry on love | bangla kobita | poetry collection books | poetry collections for beginners | poetry collection online | poetry collection in urdu | poetry collection submissions | poetry collection clothing | new poetry | new poetry 2022 | new poetry in hindi | new poetry in english | new poetry books | new poetry sad | new poems | new poems in english | new poems in hindi | new poems rilke | new poems in urdu | bangla poets | indian poetry | indian poetry in english | indian poetry in urdu | indian poems | indian poems about life | indian poems about love | indian poems about death | bengali story | bengali story books for child pdf | bengali story books for adults | bengali story books | bengali story books for child | bengali story books pdf | bengali story for kids | bengali story reading | short story | short story analysis | short story characteristics | short story competition | short story definition | short story english | short story for kids | short story generator | short story ideas | short story length | long story short | long story short meaning | long story | long story instagram | story writing competition | story writing competition topics | story writing competition for students | story writing competition malayalam | story writing competition india | story competition | poetry competition | poetry competitions australia 2022 | poetry competitions uk | poetry competitions for students | poetry competitions ireland | poetry competition crossword | writing competition | writing competition malaysia | writing competition london | writing competition hong kong | writing competition game | writing competition essay | writing competition australia | writing competition prizes | writing competition for students | writing competition 2022 | writing competitions nz | writing competitions ireland | writing competitions in africa 2022 | writing competitions for high school students | writing competitions for teens | writing competitions australia 2022 | writing competitions 2022 | writing competitions uk | bengali article writing | bangla news article | bangla article rewriter | article writing | article writing ai | article writing app | article writing book | article writing bot | article writing description | article writing example | article writing examples for students | article writing for class 8 | article writing for class 9 | article writing format | article writing gcse | article writing generator | article writing global warming | article writing igcse | article writing in english | article writing jobs | article writing jobs for students | article writing jobs work from home | article writing lesson plan | article writing on child labour | article writing on global warming | article writing pdf | article writing practice | article writing topics | trending topics for article writing 2022 | what is article writing | content writing trends 2022 | content writing topics 2022 | Bangla Prabandha | Probondho | Definite Article | Article Writer | Short Article | Long Article | Bangla kobita | Kabitaguccha 2022 | Galpoguccha | Galpo | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Shabdodweep Writer | Shabdodweep

No comments:

Post a Comment