Monday, March 14, 2022

নোনা জল (পর্ব - ১) - জয়নাল আবেদিন [গল্প | Galpo | Story] 2022

নোনা জল

- জয়নাল আবেদিন


নৈনান খেয়া ঘাটে তখনও নৌকাটা বাঁধা আছে, যাত্রীরা অপেক্ষায় পাড়ে বসে। দেখলে বোঝা যায় না এটা খেয়াঘাট। একটু পাশেই মাছধরা ট্রলার খানা জাল গোছানো থেকে অন্যান্য গোছগাছ চালাচ্ছে। এখন নদীতে জোয়ার শেষ হয়েছে ভাঁটার অপেক্ষায় জহর মালোর দলবল।
চোদ্দো জনের দল নিয়ে রওনা হচ্ছে সমুদ্রে মাছ ধরতে। পাড়ে বসে মেয়ে বউ-বাচ্চা ক'জনা। ঠায় নৌকায় নজর তাদের, যেকোনো মুহূর্তে ছেড়ে যাবে মাঝ দরিয়ার দিকে। কবে ফিরবে কেউ জানে না।
শেষ শীতের এই সময়টা সমুদ্র খুব একটা উত্তাল হয় না। ঝড়ঝঞ্ঝা থাকে না প্রায়ই। কিন্তু এবছর মৌসুম বড় বেগতিক। মাঝেমধ্যেই ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। সরকারি সর্তকতা মানতে সমুদ্র থেকে ট্রলার নিয়ে চলে আসতে হচ্ছে। কখনো বা যাওয়া স্থগিত করে দিতে হচ্ছে।
কিছুদিন আগেই আম্ফান ঝড়ে বেসামাল তামাম এলাকা। ক্ষয়ক্ষতি সেরে উঠতে এখনো মাথা তোলেনি কত ঘরবাড়ি।

ঘাটের পাশে ছোট্টো দোকান ঘরে চা- পানের দোকান মহিলার, বাড়ির লোকটা সমুদ্রে পাড়ি দেবে- চোখটা পাতা আছে তাই মাছ ধরার নৌকায়।
- আমাদের জীবন তো পদ্মপাতায় জলের মতোই বাবু। ঝড় বদলায় নদী পাগল হয়। পার উপচে জল , সব পাড়ের বাড়িঘর তছনছ করে দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে মহিলার।
- ভয় করে না , এখানে বাস করতে ?
- ভয় কে জয় করেই তো বেঁচে আছি গো। এইতো পুরুষ মানুষটা চলে যাচ্ছে। ফিরবে কিনা ঠাকুর জানে। মাসের পর মাস কেটে যায় তারপরে ফেরে। কখনো মাছ বোঝাই তো কখনো অর্ধেক খালি। পেটের তাগিদে জীবন নিয়ে খেলা।
ভাঁটা শুরু হয়েছে সবে। হালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে বিমল, অভিজ্ঞ হাত। কোন পথে কেমন ঢেউ কাটিয়ে যেতে হয়, নখদর্পণে গভীর জলের হাল-হকিকত। ইঞ্জিন মোটর চালু করার জন্য দাঁড়িয়ে হারুনের বড় ছেলে বাদল।
ট্রলারে একটু গুঞ্জন, যেটা যাত্রা শুরুর আগে হয়। কেমন একটা তৎপরতা সকলের মধ্যেই।

চেঁচিয়ে উঠলো জহর মালো - দরিয়ার পাঁচ পীর,
বদর বদর কোরাসে সকলে বলে উঠলো।
ইঞ্জিন চলার শব্দ শোনা গেল, সচকিত পাড়ে বসা আপন চোখগুলো। ট্রলার পাড় ছেড়ে এগিয়ে চলল দক্ষিণে। ছলাৎ - ছলাৎ শব্দ ট্রলারের গায়ে আছড়ে পড়তে দেখা- চোখগুলো টলটলে জলে ভরে যায় । কারো চোখের বাঁধ উপচে ফোঁটা হয়ে ঝড়ে পড়ে।
মানুষগুলোর জীবনের বেশি সময়টাই নোনা জলের ঘ্রাণে ধাতস্থ। জলের মাঝেই দিন-রাত।

জলের মাঝেই প্রাণপাত। জাল ফেলা। সময় বুঝে জাল তোলা। মাছ বেছে আলাদা করা। বরফ প্যাকিং করা। ক্রমানুসারে চলতে থাকে কাজ। প্রথম প্রথম যাওয়া মানুষগুলো নোনা জল, নোনা বাতাস সহ্য করতে পারত না। ধাতস্থ হতে গিয়ে বমি পায়খানা শরীরকে নিংড়ে নিতো।
কতজনকে আবার ফিরতি কোন ট্রলারে বাড়ি ফিরে আসতেও হতো। যারা কষ্ট সহ্য করতে করতে ধাতস্থ হয়, তারা ভয় কে জয় করে নেয়।
ধু ধু জলরাশি কোন কূল কিনারা নেই। দিনের আলোয় দুর কে দেখা যায়। আরো কতো কতো ট্রলার ভাসছে। জাহাজ যাচ্ছে দূর দিয়ে। রাতের অন্ধকার। নিকষ কালো। চড়াই - উতরাই ঢেউ কাটায় ট্রলার খানা। জালখানা ফেলতে ফেলতে এগিয়ে যাওয়া। ট্রলারে বেঁধে রাখা জালের রশি।
প্রতি ঘন্টায় রশিতে হাত ছুঁয়ে পরখ করা। এ কাজটা জহর মালো বেশি বুঝতো, তাই তাকেই বেশি নজর রাখতে হতো। মাঝরাতের পর পর যাচাই করে ভোররাতে জাল গোটানো হতো। দিন দুই পরপর কপাল খারাপ গেলো। তেমন মাছ উঠলো না। জাল গুছিয়ে ট্রলার আরো একটু গভীরে গেলো। দুপুরের পর আবার জাল ফেলা হলো। খাওয়া-দাওয়া সেরে পাটায় বসে জলের দিকে নজর রাখছিলো জহর মালো।

- কি বুঝছো গো কাকা ? মজবুত হাতে হাল ধরা বিমল চেঁচালো।
- আজ একটু ভালো যাবে- মনে হচ্ছে। হাওয়ার দাপটে কথা গুলো ভেসে গেল। বিমলের কানে কোন শব্দ পৌঁছালো কিনা কে জানে। তবে মুখ নাড়া ভঙ্গিতে বুঝে গেছে কাকার বলা কথা।
- ঠাকুর যেন মুখ তুলে তাকায় গো কাকা। নোনা বাতাসে ভেসে গেল একটা দীর্ঘশ্বাস বিমলের।
- সবইতো তারই ইচ্ছে রে বাপ । আজ কিছু রুপো পাবো মনে হচ্ছে। মনে মনে বিড়বিড় করে জহর মালো।



নোনা জল | শব্দদ্বীপের লেখক | শব্দদ্বীপ | সেরা বাংলা গল্প | গল্প ও গল্পকার | সেরা সাহিত্যিক | সেরা গল্পকার ২০২২ | বাংলা বিশ্ব গল্প


Bengali Poetry | Bangla kobita | Kabitaguccha 2022 | Poetry Collection | Book Fair 2022 | Bengali Poem | Shabdodweep Writer | Shabdodweep | Poet | Story | Galpoguccha | Galpo | Bangla Galpo | Bengali Story | Bengali Article | Bangla Prabandha | Probondho | Definite Article | Article Writer | Short Article | Long Article | Article 2022


জয়নাল আবেদিন | Joynal Abedin







No comments:

Post a Comment