Sunday, March 20, 2022

মিথ্যের রূপকার - প্রবোধ কুমার মৃধা [গল্প | Galpo | Story] 2022

Probodh 3rd Top

[সেরা বাংলা গল্প ২০২২]
[৩য় সেরা]
[মার্চ শেষ সংখ্যা] [পঠন / দর্শন সংখ্যার ভিত্তিতে বিচার]

মিথ্যের রূপকার

- প্রবোধ কুমার মৃধা


মিথ্যে কথাকে কতটা শৈল্পিক সুষমায় উন্নীত করা সম্ভব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জয়ন্তবাবু।সত্যের ভাঁজে ভাঁজে মিথ্যার ভেজাল ব্যবহার করাই তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বৈশিষ্ট্য।
বাজার থেকে আলু-পেঁয়াজ-তেল-মশলা একসাথে কিনে বাড়ির কাছাকাছি এসে পেঁয়াজের পলিথিনটা পৃথক হাতে নিয়ে ব্যাগে ছড়িয়ে পড়া পেঁয়াজগুলো তাতে ভরে সমস্ত বাজারটাই গৃহিণীর হাতে ধরিয়ে দিলেন। অসম্ভব ধর্মপ্রাণা ,সূচিবায়ুগ্ৰস্থ ধর্মপত্নী মায়াদেবী স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন,'পেঁয়াজগুলো অন্য বাজারের সঙ্গে মেশাওনি তো?'

'মাথা খারাপ, নেড়া ক'বার বেল তলায় যায় ? এখনি তো আলু শুঁকে পেঁয়াজের গন্ধ পেলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ।:'
'কথার ছিরি শোন না ।'‌ বলে গৃহিণী রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন ।
'বাঁচা গেল! ' কার মুখ দেখে যে আজ উঠেছিলেন ‌জয়ন্তবাবু, মনে মনে ইষ্ট দেবতার উদ্দেশ্যে মাথা নোয়ালেন।

জয়ন্তবাবুরা দুই ভাই। বড়জন অনন্ত, ছোট জয়ন্ত। দাদা অনন্তবাবু উচ্চ শিক্ষিত। অধ্যাপক হিসেবে সুনামের সাথে কর্মজীবন শেষ করে অবসর জীবন যাপন করছেন। ছোট ভাই জয়ন্ত পোষ্টালে কর্মরত। মিশুকে প্রকৃতির ,লম্বা শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারা।বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ব্যবহারে যথেষ্ট আন্তরিক, মুখমিষ্ট স্বভাবের। মিছে কথা তাঁর মুখস্থ; এমন সাবলীল অনায়াস ভঙ্গীতে তা পরিবেশন করতে পারেন নতুন সঙ্গীর পক্ষে সন্দেহ বা অবিশ্বাস করা ভীষণ কঠিন।কিছু দিন জয়ন্ত বাবুর সঙ্গে মেলা মেশা না করলে তাঁর সত্য-মিথ্যার কারিকুরি‌ বিষয়ে নিঃসংশয় হ‌ওয়া মুশকিল। 
বাড়ির গৃহিণী তাঁকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখেন ; তবে ধর্মপত্নী রূপে কেবল মাত্র পরকালে পাতকের হাত থেকে  রেহাই পেতে স্বামীকে বিশ্বাস তাঁকে করতেই হয়।ভীষণ ধর্মভীরু, ঠাকুর দেবতায় নিবেদিত প্রাণ, দেব-দ্বিজে অগাধ ভক্তি । কী জানি পূর্বজন্মে কোন পাপের পরিণতিতে এজন্মে কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত স্বামী তাঁর কপালে জুটেছে। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এজন্মে সতী সাবিত্রীর মতো পতিসেবার পরাকাষ্ঠা দেখাতে এবং পূর্ব জন্মের পাপ স্খলনের আশায় স্বামীকে‌ ভক্তি শ্রদ্ধা করা তাঁর নারী জন্মের ব্রত রূপে মেনে নিয়ে নিষ্ঠাভরে তা অনুশীলন করে চলেছেন।

         কিশোর বয়সে জয়ন্ত বাবু কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হন।বহু জায়গায় বহুদিন ধরে চিকিৎসা করিয়ে ও একেবারে রোগমুক্ত হতে পারেননি।মূলত সে সময়ে কুষ্ঠরোগের তেমন চিকিৎসা ছিল না; দ্বিতীয়তঃ সামাজিক লজ্জার ভয়ে ব্যাপারটি বহুদিন যাবৎ সাধ্যমতো গোপন রাখার চেষ্টা করে বিলম্ব করে ফেলেছেন।তার উপর ফুটবল খেলার নেশা এবং দলগত রাজনীতির আকর্ষণে সদ্য আক্রান্ত ব্যাধিটির ভবিতব্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপেক্ষা দেখিয়েছেন। বর্তমানে রোগটি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে না গেলে ও ডান পায়ের তিনটি আঙুল বেঁকে বসে গিয়েছে এবং একটির গোঁড়ায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে রক্তরস ঝরে।

মিথ্যের কারিগর জয়ন্ত বাবুর পত্নীভাগ্য ঈর্যণীয়।একেবারে সেকালের পতিব্রতা রমণীর সমস্ত গুণ‌ই  মায়াদেবীর চরিত্রে বর্তমান; উপরন্তু স্বামীর এই মহাব্যাধিটির কারণে স্বামীর প্রতি সেবা যত্নের মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছে।বর্তমান সমাজকে যেন ব্যঙ্গ করে তাঁর  পতি পরায়ণতার নজিরকে এক উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন। অশিক্ষিতা সরলা রমণীর সেই দুর্বলতা টুকুর সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিথ্যার জাল বুনে মনে মনে ‌খুশি অনুভব করেন জয়ন্ত বাবু ;
তবে স্ত্রীর নজরদারি বৈশিষ্ট্যটিকে ভয় করেন যথেষ্ট।বেচাল দেখলে মুখের নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ পরখ করে দেখতে ছাড়েন না মায়াদেবী। অত‌এব বাইরে এদিক ওদিক করলে ও ঘরে জয়ন্ত বাবু স্ত্রীকে ভীষণ সমীহ করেন।ধর্ম পরায়ণা স্ত্রীর সরলতার গল্প বন্ধু বান্ধবদের কাছে গল্পের ছলে উল্লেখ করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন।দিদিদের মুখ থেকে পত্নীর প্রশংসা শুনে অন্তরে অন্তরে গর্ববোধ করেন বড়ো।

         জয়ন্ত বাবুর বংশ মর্যাদার গরিমাবোধ টনটনে। মেকি সম্মান বোধের ফোবিয়াবশতঃ জীবন যাত্রার অনেক অপরিহার্য কর্ম থেকে বিরত থাকেন, যার সুফলগুলি অন্যেরা ভোগ করেন।গাছের ফল, বাগানের বাড়তি সবজি বাইরে বিক্রি করাটাকে বংশের সম্মান হানির কারণ হিসেবে গণ্য করেন।অথচ স্ত্রী মায়াদেবী এসবের বিরোধী। একমাত্র পুত্র ও মাকে সমর্থন যোগায়।স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগে বিষয়গুলির সদ্ব্যবহার করে থাকেন, পরে অবশ্য স্বামীর গোচরে প্রসঙ্গ গুলি উত্থাপন করে মৌন-সম্মতির ছাড়পত্র পেয়ে যান।
বাজার থেকে মাছ-চিংড়ি বা অন্য দ্রব্য সামগ্ৰী কম মাত্রায় ক্রয় করতে জয়ন্ত বাবুর লজ্জায় মাথা কাটা যায় ; ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামগ্ৰী ক্রয় করে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর বিরাগ ভাজন হবে জেনে ঝামেলা এড়াতে সাময়িক পাড়ার দিকে বেরিয়ে যান।
জয়ন্ত বাবু যথেষ্ট বুদ্ধি রাখেন। সাংসারিক কলা কৌশল এবং সামাজিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আদব কায়দা অনেকটা রপ্ত তাঁর।দাম্পত্যজীবনে তিনি সুখী মানুষ, উভয়ের মধ্যে বোঝাপড়া মন্দ নয়; যেটুকু  ফাঁক-ফোঁকর,মন -গড়া মিথ্যে দিয়ে সুন্দরভাবে ম্যানেজ করে থাকেন। লোকের মুখের কথা দিয়ে লোককে রহস্যের ছলে বিঁধতে অসম্ভব পটু।

পরিচয়ের ঘনিষ্ঠতা বুঝে পরিচিতের নিকট থেকে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে বিনয়ের অবতার তিনি।এক্ষেত্রে তাঁর রাজনীতি করার পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়।তাঁর নাছোড়বান্দা আবেদন নিবেদনের হাত এড়ানো খুব সহজ সাধ্য নয়।তবে সর্বোপরি মিথ্যের বেসাতি করা মানুষটির মধ্যে একটা মননশীল দরদি মনের পরিচয় মেলে, যার কারণে অতি সহজে তিনি মানুষকে কাছে টানতে পারেন এবং অনেক সময় নিজের সংসারের প্রয়োজন উপেক্ষা করে অন্যের  আপদে বিপদে সঙ্গী হতে পারেন। লজ্জাশূন্য আকর্ষণীয় মিষ্ট ব্যবহারের জন্য ইচ্ছা থাকলে ও তাঁর সাহচর্য এড়িয়ে থাকা শক্ত।


মিথ্যের রূপকার | কীভাবে মানুষ মিথ্যা বলা শেখে | বাংলার রূপকার | শব্দদ্বীপের লেখক | শব্দদ্বীপ | সেরা বাংলা গল্প | গল্প ও গল্পকার | সেরা সাহিত্যিক | সেরা গল্পকার ২০২২ | বাংলা বিশ্ব গল্প Story | Episode | Writer | Short Story | Bangla Galpo | Golpo | Bengali Story | Bengali Writer | Bangla Galpo | Natun Bangla Galpo | Galpa | Tale Story Bangla | Bangla Galpa 2022


প্রবোধ কুমার মৃধা | Probodh Kumar Mridha







No comments:

Post a Comment