Friday, January 21, 2022

বিধি রে - কুহেলী দাশগুপ্ত [সেরা বাংলা গল্প ২০২২]

Top Story 2nd

[গল্পে দ্বিতীয় সেরা]

[জানুয়ারি ২য় সংখ্যা] [পঠন / দর্শন সংখ্যার ভিত্তিতে বিচার]


বিধি রে --

- কুহেলী দাশগুপ্ত


১.

তিন দিনের প্রবল জ্বরে হীরা হঠাৎ মারা গেল। দুটি ছোট্ট বাচ্চা জীবন আর পরাণ কে নিয়ে তার বউ সনকা পড়ল অথৈ জলে। একমাত্র ভরসার মানুষ রয়েছে দেওর ধীরা।শ্মশান থেকে ফিরে ধীরা পাথর হয়ে বসে থাকা সনকা কে বলে,"বউ মণি গো, কি করাম, দাদা গ্যাছে আমাগো ফ্যালাইয়া, তুমি ভাইঙ্গা পড়লে ছাওয়াল গো ক্যাডা দ্যাখবো।"সনকা আর চাপতে পারে না, ছেলেদের জড়িয়ে ধরে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ে।  কয়দিন আগে ও দু'ভাই জমির কাজ করে   ফিরলে সনকা যত্ন করে বসে খাওয়াতো, আজ একজন নেই। সোমত্ত বয়সে স্বামীহারা হয়ে  বাচ্চা দুটিকে   কিভাবে আগলাবে-দিশাহীন দৃষ্টি কূল পায় না। ধীরা সাহস জোগায় । মনমরা হয়ে সনকার দিন কাটে। কাজে মন নেই। কখনো উনুনে ভাত চড়িয়ে আপন খেয়ালে ডুবে থাকে। ভাতের হাঁড়ি উতরে ফ্যান পড়ে আগুন নিভে ধোঁয়া হয়, তখন সম্বিৎ ফিরে পায়। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে হাঁড়ি নামিয়ে উনুন ঠিক করতে যায়। বছর তিন আর পাঁচ এর বাচ্চা দুটি উঠোনে আপন মনে খেলে। বড়টি জীবন এসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, "বাবা কই গ্যাছে গো মা?আয়ে না ক্যান?"কি বলবে ভেবে পায়না সনকা, শুধু চোখ ভেজে তার।ধীরা ক্ষেতের কাজ থেকে ফিরে, কাছে টানে বাচ্চা দুটিকে, বোঝায়,"বাবা ম্যালা দূর কামে গ্যাছে। আইবো যখন, তগো লাইগ্যা বহুত কিছিমের খ্যালনা আইনব।" ভুলে থাকে ছেলে দুটি।এমনি করে দিন যায়। ধীরা আর সনকা কে নিয়ে পাড়ায় কানাঘুষো চলতে থাকে।একদিন পুকুর ঘাটে গোবির মা বলে সনকাকে, "তরা এক লগে আছস যহন , পোলা পানের কথা ভাইব্যা বিয়া বইয়া যা। মাইনষে নানান কথা কয়।"সনকা ক্ষেপে যায়। বলে, " আমাগো লাইগ্যা তোমাগো অ্যাত্তো চিন্তা ক্যান। ধীরা রে মুই ভাইয়ের লাহান দ্যাখি। "মুখ বেঁকিয়ে যাওয়ার সময় গোবির মা বলে,"ভাই না আর কিছু, তুই কত সতী আমাগো জানা আছে। মর গ্যা।" এমন নানা কথা চলতে থাকে পাড়া গাঁ য়ের মুখে মুখে। এসব ধীরার কানে ও যায়। বরাবরই ঠান্ডা স্বভাবের ছেলে সে। দাদা -বৌদি অন্ত প্রাণ তার। সনকাকে ভরসা দেয়, "তুমি মন বিষাইয়ো না বৌমণি, মাইনষের কথা তাগো কইতে দ্যাও। " শেষ রক্ষা পায় না। গ্রামের প্রভাবশালীদের নিয়ে প্রতিবেশীরা সালিশী সভা ডাকে। ধীরা র ডাক পড়ে সেখানে। সবাই একমত হয়ে সনকা আর ধীরা র বিয়ের কথা বলে। বউদিদির সম্মানে যতই ধীরা তাদের বোঝাতে চায় , তারা এককাট্টা হয়ে কিছুই মানতে চায় না। শেষে ভেবে ধীরা দুদিন সময় চেয়ে নেয়।

        বাড়ি ফিরে বৌমণি জানতে চাইলেও কিছু বলে না সে। বলে, "ছাড়ান দ্যাও। আমি আছি তো।"সনকার মনে ও দ্বন্দ্ব চলে। ভাইয়ের মতো স্নেহ যে তার ধীরার জন্য। পরদিন ক্ষেতের কাজ শেষে কোথায় যেন যায় ধীরা।অনেক রাতে ফেরে। বলে," আমাগো ইহানের পাট চুকলো গো। গুছাইয়া লও। শহরে যামু গা। কাইল বিহান্যা ভোরে বাইর হমু।"অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে সনকা,"কডি যাবা নে?জমি জিরেত, ভিডার কি হইব?"ধীরা অভয় দেয়,"চিন্তা নাই ক্যা। ব্যাবাক বাঁধা দিছি বাবুল মহাজনের দ্বারে। পরে ছাড়াইয়া লমু নে। শহর যামু কাইল। চিন্তা নাই, একখান কাম ঠিক জুটাইয়া লমু। ইহানে আমাগো শান্তি দিবো না হগ্গলে। তোমারে দিদি ছাড়া কিছু ভাবি নাই কুনোদিন। আইজ হালায় রঙ ছড়াতি চায়! ভাই বুইনে ঠিক পারুম পোলা দুইডারে বড় করতি।"সনকা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ধীরার মুখ খানা যেন মায়ায় ভরা। ছলছল চোখে সারা রাত সব গুছিয়ে নেয়।  কাক ডাকা ভোরে শহরের উদ্দেশ্যে অজানা পথে এগিয়ে যায় তারা। যেখানে প্রশ্নের তীর এসে হয়তো তাদের বিদ্ধ করবে না প্রতিনিয়ত। 
    এদিকে গ্রামে রটে যায়, হীরার সোমত্ত বেধবা বউটা আর বাচ্চাদের নিয়ে ধীরা পালিয়েছে। এই কান্ড যদি করে তো পালানোর দরকার কি? নানা কথা মুখোরোচক হয়ে ফেরে।  বিধি হাসেন, নিরব সত্যের আড়ালে।

২.

মুসাফিরখানার  গলিতে কয়েক ঘর বসত । সবাই ভাড়া বাবদ মালিক কালু সরকার কে হাজার টাকা করে দেয়। ধীরা সনকা আর ভাইপো দুটিকে নিয়ে এইখানে এক ঘর ভাড়া নেয়। জমি আর বাড়ি বন্দকীর টাকায় কিছুদিন চালিয়ে এক মুদি দোকানে কর্মচারীর কাজ নেয়। প্রথমে প্রতিবেশীরা নানা প্রশ্ন করলে ও পরে উৎসাহে ভাটা পড়ে। সনকা ধীরা কে ভাই বলে ডাকত আর ধীরার বউমণি ডাক  -শুনে কৌতূহলীদের  প্রশ্নে সনকা বলেছিল, "দেওর হইলে ও অরে ভাই জাইন্যা আসছি। "জীবন আর পরাণ কে একটা অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এভাবেই চলছিল  কোন রকমে। এরই মাঝে সনকা কাজের ডাক পায়। তার প্রতিবেশী একটি বউ কয়েক বাড়ি ঠিকে কাজ করে। সে ই বলে বড় লোক বাড়িতে কেনা রুটির চাহিদা রয়েছে। সনকা রুটি বানিয়ে দিলে সে পৌঁছে দেবে বাড়ি বাড়ি। কিছু বাড়তি আয় হলে ধীরার যদি কিছু ভার লাঘব হয়।  রুটি বিক্রীর টাকার কিছু কমিশন যেত প্রতিবেশিনী বউটির কাছে , বাকিটা সনকার। অল্প, অল্প করে জমছিল ভালো।

 তাদের বাড়িওয়ালা কালু সরকারের এক মেয়ে ছিল। গায়ের রঙটা একটু বেশী চাপা। তবে ছিপছিপে তন্বী। মাথার চুল গোছা ভরা, দীঘল কালো। আড়ালে লুকিয়ে দেখত সে ধীরাকে। যখন কল তলায় স্নানে যেত ধীরা, ফর্সা মেদবিহীন  শরীর অবাক হয়ে দেখত  । নাম তার বিন্তি।  মাজা গায়ের রঙ বলে মেয়েকে পাত্রস্থ করতে বেগ পেতে হচ্ছিল কালুর। মেয়ের গতি বিধি দেখে কালুর বউ স্বামীকে সবটা জানায়। তখন থেকে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে ছক কষে নেয় কালু। ধীরার স্বভাব গুণে ভাল পাত্র হলে ও একমাত্র মেয়েকে হাড়-হাভাতে ঘরে পাঠাবে না সে। কিছুদিন পর কালুর বউ প্রস্তাব নিয়ে যায় সনকার কাছে। "মাইয়া আমাদের খুব লক্ষ্মীমন্ত গো। মুখে রা টি কাড়ে না। তোমাগো মত হইলে বিন্তির বাপে কথা কইব। "সনকা ধীরার মত জেনে নেবে আশ্বাস দেয়। 

        রাতে বাড়ি ফিরে , সব জেনে ধীরা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। পরে বলে," বিয়া বইলে তোমাগো দ্যাখবো ক্যাডা?সবটি ভাবন লাগে বউমণি। আমার  অহন হেইসব চিন্তায় মন নাই। তুমি মানা করি দ্যাও"। 
সনকা অনেক বুঝিয়ে রাজি করায় ধীরাকে। বিয়ে হলেও  তারা ভেন্ন হবে না ,কথা দেয় সনকা।

    শুভ দিনে চারি চক্ষের মিলনে গাঁটছড়া বাঁধে বিন্তি ও ধীরা। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই  কালু তার  ব্যবসার  দায়িত্ব ভার নেয়ার জন্য ধীরাকে চাপ দিতে থাকে। ধীরা কিছুতেই মানতে চায় না। বিন্তিরে দুই-চাইর কতা শোনায়। তাইরপর বউমণিরে কয়, " ভালা আছিলাম,  তোমাগো সইলোনি। ন্যাও, অহন দুই ভেলার মাঝে মুই খাবি খাই"!
 সনকা বোঝায় ধীরারে,"অ ভাই, চটো ক্যান? আমাগো লাইগ্যা ভাইবো না। বিয়া করছ। সোমসার গোছাও। ভার নিছ, সামলান লাগবো"।
--"ক্যাডা নিতি চাইছিল?তুমি জোর সাধলা। আমার  কুনো কতার মান দিছ?আমি পারুম না। অন্যের কামের ভার নেওনের দায় নাই"।

পরদিন  কালু, বিন্তির মা এসে বলে, ধীরাকে তাদের  সাথেই  থাকতে হবে বিন্তিরে নিয়ে। অ্যাত্ত  ছোট ঘরে তাদের  মেয়ের  কষ্ট  হচ্ছে। অন্যথা হলে, কালু সনকাদের এই ভাড়ার  ঘরে ও থাকতে দেবে না। ধীরার জেদ চেপে যায়। রেগে কিছু বলতে যাবে, তখন সনকা বাধা দিয়ে বলে," আপনেরা  চিন্তা কইরেন না। ভাই যাবে আপনেগো ঘরে। আমাগো কুনো  চিন্তা নাই।"। বিন্তির  বাবা মা মেয়েরে নিয়ে বাড়ি যায়।

সারারাত ধীরা  ঘুমোয় না। অভিযোগের অন্ত নাই  তার।  সনকার  চোখে জল।বলে, "ভাই, তুমি আর কিছু কবা না। আমাগো লাগি গোটা জেবন তুমি বরবাদ দিবা, এইডা মুই সইতে পারি ,কও?তুমি উপায় কইরা জমি ,বাড়ি ছাড়াই দিও। পোলা গো লইয়া দ্যাশে যামু"। 

--"উহানে তুমি থাকতি পারবা বউমণি! ব্যাবাক তুমারে জ্বালাইবো। তুমি যাবা না"।ধীরা কয়।
----"কিচ্ছু হইবো না। তুমার বিয়া হইছে। আর কওনের কিছুই নাই"।
সেদিনকার পর  থেকে ধীরার  শ্বশুর ঘরে জীবন যাপন।  মাঝে বৌমণি আর ভাইপো দের খোঁজ  নিয়ে যায়। সনকার  রুটি বানানোর  কাজে আরও  চাহিদা বাড়ে। দু'এক বছর বাদে কালু অ্যাকসিডেন্টে পা ভেঙে বিছানা নেয়। ধীরা শ্বশুরের তেজারতি কারবারে ভালো রকম জড়িয়ে যায়। বউমণিদের খোঁজ খবর করা কমতে থাকে। কখনো বিন্তি আসে। এটা ,সেটা নিয়ে। খবর দেয়  তাদের উত্তরসূরী আসতে চলেছে। সনকার  খুব আনন্দ  হয়। মন চায় শ্বশুর ভিটে ফিরে যেতে। সেকথা ধীরার  কাছে জানায়। কে জানে সনকার কেন যে মনে হোল, ধীরা আগের মতো আর নেই। বৈষয়িক দের মতো বল,
"ইহানে মন্দটা কি আছ?জমি বাড়ি ছাড়াতি ম্যালা ট্যাহা লাগবো। অহন পারুম না। দ্যাহি , ক্যামনে ছাড়ান যায়। সবুর কর"।

সনকা কথা বাড়ায় না।  সনকার দিন  কাটে  গুমোট এক ঘর কষ্ট  নিয়ে। ছেলেরা পাস দিয়ে বড় কেলাসে  যায় ।কে জানে তারা কবে আবার গাঁয়ের পথে ফিরতে পারবে!ফেলে আসা উঠোন, তুলসী তলা -সব কেমন কাছে টানে। পরমুখাপেক্ষী জীবনে নিশ্চয়তা পায় না সে।


বিধি রে | বিধিরে ও বিধিরে | বাংলার গল্প | জীবনের গল্প | গল্পকার |  রহস্য গল্প | কল্পনার গল্প | প্রেমের গল্প | সুখের গল্প | বিরহের গল্প | বাস্তব গল্প | হাসির গল্প | বাংলা গল্প | সেরা গল্প ২০২২ | গল্পকার | Bangla Galpo | Bengali Story | Galpo 2022 | Writer


কুহেলী দাশগুপ্ত Kuheli Dasgupta








No comments:

Post a Comment