Thursday, January 27, 2022

অপেক্ষমান অবস্থায় আমার নিথর দেহ - রূপশঙ্কর আচার্য্য

অপেক্ষমান অবস্থায় আমার নিথর দেহ

- রূপশঙ্কর আচার্য্য


তোমরা একদিন বিনা নিমন্ত্রণে আমার বাড়ী অবশ্যই আসবে। সেই দিন কোনো পূজা বা বিবাহের বা উপনয়ন বা অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান নয়। তখন মনের মধ্যে একবারও প্রশ্ন হবে না তাই তো তিনি তো একবারের জন্যও বলেন নি যে তাঁদের বাড়িতে যেতে হবে। আমি আমন্ত্রণ করি বা নাই করি, তোমরা অবশ্যই সেই দিনই আমার উঠানে এসে হাজির হবে।

অনেক সময় অপরের বাড়ী বা আমার বাড়ী যাতে না আসতে হয় তার জন্য কিছু বাহানা তোমরা করে থাকতে। তোমরা বলতে, 'না না আবার এই অসময়ে আর গিয়ে অসুবিধায় ফেলবো না, আবার কোনো কাজ আছে বা শরীরটা ভালো নেই এই অজুহাতে আমার বাড়ীর দোরগোড়ায় আসতে না। হঠাৎ করে কোনো আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণ পত্র ছাড়াই একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমার বাড়ির উঠানে উপস্থিত থাকবে। শুধু তাই নয়, তোমরা মনের মধ্যে অনেক জর্জরিত হয়ে যাওয়া কষ্টকে চেপে রেখে কেউ কেউ সেই কষ্ট যন্ত্রণাকে চেপে না রেখে অশ্রু ঝরিয়ে কান্নার মধ্য দিয়ে এই উপস্থিতির হার বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি ঘটাবে। কোনো নিমন্ত্রণ ব্যতীতই সেই সুনির্দিষ্ট দিন আমার বাড়ি আসবে। সেদিন অন্তিম শয়নে আমি বিছানাতে নিস্তব্ধতা রেখে পড়ে থাকব। দুই চোখে তুলসী পাতা, কপালে চন্দন, নাকে তুলো থাকবে কিনা আমি বলতে পারবো না। সেই তোমাদের যতই কাজ থাক,যতই আসুক বাধা  সবাই নাই হোক কিছুজন তো অবশ্যই এই বাধা অতিক্রম করেই হাজির হবে।

কিছুক্ষণ বাদে সেই শরীরের মধ্যে পচন লাগতে পারে যদি না তার দাহক্রিয়া করা হয়।আমি থাকব না, থাকবে সেই দেহ, যেই দেহের মধ্যে চেতন শক্তি আমার প্রাণ অর্থাৎ চৈতন্য বিশিষ্ট অবস্থায় থাকা যে আমার দেহ সেই চৈতন্য ব্যতীত প্রাণ ব্যতীত দেহটিই পড়ে থাকবে। চৈতন্যবিশিষ্ট দেহকেই এতদিন স্নেহ করেছ,শ্রদ্ধা করেছ, ভালোবেসেছ। এই মুহূর্তে  পড়ে থাকা দেহই ছিল তোমাদের পরিচিত তাই না? আবার কেউ কেউ শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার লাভ করেছ ঘৃণা, অবজ্ঞা, অবমাননা করার জন্য। যাই হোক আমি ঠিক অদৃশ্যভাবে অপেক্ষা করব সেই বিনা নিমন্ত্রণে উপস্থিত থাকা তোমাদের কে প্রত্যক্ষ করার জন্য। মনে হবে এই বোধ হয় আমি চার্বাক বা বৌদ্ধ দর্শন বোঝাচ্ছি তোমাদের। তোমাদের সেই উপস্থিত থাকাকে লক্ষ্য করার জন্য অপেক্ষা করব কিন্তু কাউকে দেহাত্মবাদ বা নৈরাত্মবাদ বা ক্ষণিকত্ব বাদ, অদ্বৈতবাদ ব্রহ্ম কি? এই সবের কোনো প্রশ্ন করতে পারবো না।

হয়তো আমার পূর্বের কবিতা টা তোমাদের কেউ কেউ আমার চরিত্র বিশ্লেষণ করার জন্য মনে মনে উচ্চারণ করবে।---------

"আমি জানি না,
তোমরা আমায় কী মনে করো,
আমি জানি না..
তোমরা আমার চরিত্র সম্পর্কে কী কল্পনা করো।
সত্যিই জানি না, জানি না...
আমি জানি না,
আমার সম্বন্ধে তোমাদের কী প্রশ্ন?
আমি জানি না, 
তোমরা আমায় বিশ্বাস করো কিনা...!
সত্যি বলছি জানি না,
তোমরা আমার উপর নির্ভরশীল কিনা ?
আমাকে তোমাদের কাজে লাগবে কিনা...!
তাও জানি না,
জানি না,
সত্যিই আমি জানি না,
আমার লক্ষ্য কী?
আমি জানি না,
আমার কোথায় অন্ত?
শুধু এইটুকু জানি,
পৃথিবীতে আমাদের পাওয়ার মতো স্বাধীনতা নেই,
পরাধীনতাই আমাদের কাছে স্বাধীনতা।
পরাধীনতার আলোই হল স্বাধীনতার সূর্য....।
নেই কোনো সুবিধা,
স্নেহ, মায়া-মমতা।
কিন্তু অফুরন্ত আছে..........
কেবলই ঘৃণা, তিরস্কার, ধিৎকার,অপমান, দুর্নাম,বদনাম।
আমি জানি না,
সত্যিই জানি না হব কিনা,
আমি জানি না,
সত্যিই জানি না হব কিনা...
তোমাদের মতো।
শুধু দৈহিক গঠনে দেখতে, একটি সামান্য মানুষ।
আমি হব কিনা জানি না,
আমি হব কিনা জানি না,
জানি না আমি হব কিনা.......
তোমাদের মতো মানুষ।।"

অবশ্যই আসবে আমি নিমন্ত্রণ করি বা নাই করি সেই দিনটিতে আসতেই হবে। এতদিন অনেকবার বলেছি এসো আমার কথা উপলব্ধি করো। আমার কথাকে উপলব্ধি না করতে পারো মননশীল রূপে গ্রহণ করো। দুঃখের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ করো,নিজেকে উপলব্ধি করো, অপরকে উপলব্ধি করো। আজ সেই দিনের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। যখন তোমাদের ভালো করে তৈরি করার সংকল্প নিয়েও আমাকে তাচ্ছিল্য করা হতো পাগল মনে করা হতো। আমি বলতাম--

"তোমরা ভালোবাসো, আমায় নাই বা ভালোবাসো।
আমায় পাগল বলে একটু হাসো।
তোমরা ভালোবাসো আমায় নাই বা ভালোবাসো।
পাগল বলে একটু হাসো।
মানুষের মনে এই হাসি,
চলে গেছে গরীব দুঃখীদের মতো গয়া কাশী। 
আমি ফিরে ফিরে তোমাদের কাছে তাই আসি।
লেগে রয়েছে হিংসা, মারামারি পাশাপাশি ,
তাই জীবন থেকে উঠে গেল হাসাহাসি। 
আমায় ভালোবাসো নাই বা বাসো।
পাগল বলে একটু হাসো।তোমরা আমায় পাগল বলে একটু হাসো।"

যেদিন আমি কোনোভাবেই তোমাদের আমন্ত্রণ করবো না। আমন্ত্রণ পত্র বা নিমন্ত্রণ না পেলেও তোমরা সত্য সত্যই আমার উঠানে উপস্থিত থাকবে। তাই এক সর্বশ্রেষ্ঠ অপেক্ষায় থাকা অপেক্ষমান নিথর দেহ হিসাবে অপেক্ষা করতে থাকবো।।

2 comments:

  1. আমি কিছুই বলতে পারলাম না আর। খালি চোখ দিয়ে চোখ পড়েই চলেছে।

    ReplyDelete
  2. কি বলবো বুঝতে পারছিনা। চোখে জল চলে এসেছিলো পড়ার সময়।আপনার ভাবনা সবার থেকে আলাদা

    ReplyDelete