Friday, December 24, 2021

পাহাড়ি আতঙ্ক - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১৪]

পাহাড়ি আতঙ্ক

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   গতানুগতিক জীবন থেকে বেরিয়ে সাময়িক মুক্তি , রমেশ বাবুর প্রত্যেক বছরের বাঁধা রুটিন। তার এই ভ্রমণ নেশা স্ত্রী রেখা আর দুই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বাসা বাঁধে। তাই সারা বছর এই দিনগুলোর জন্য হা পিত্যেশ। গত বছর পুরীর সমুদ্র , এবছর পাহাড় , সিকিম।  শীতের আগে হেমন্তের দিনে পাহাড় ভ্রমণ ,উপযুক্ত সময় বলে রমেশ বাবুর ব্যক্তিগত ধারণা। এই নিয়ে তিনবার হবে পাহাড়ি সিকিম। পাহাড়ের নিসর্গ, নীরবতা এক অদ্ভুত আকর্ষণ ! কোন সময় মেঘের ছোঁয়া, কখনও বৃষ্টি ,কখনও ছায়া। আর তুষার , সে তো এক স্বর্গীয় আনন্দ। শুধু তুষার দেখতেও মানুষ ছুটে যায় ওই পাহাড়ি ভুবনে।

     প্রথম দিন কাছের কতকগুলো পয়েন্ট ও গুমফাগুলোতে ওদের ভ্রমণ। কিশোর কিশোরী ছেলে মেয়ের উচ্ছলতা , চঞ্চলতায় মন ভরে যায় বাবা মার। আরো অনেক ভ্রমণ পিপাসুর সঙ্গের ছোটরা মিলে যেন ঝর্নার কলকল ধ্বনি , পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। সব বিচিত্র পোশাকে এক পাহাড়ি ফুলের মেলা। সন্ধ্যের আগে রমেশ বাবুরা হোটেলের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ফেরে। বাচ্চা দুটো তোলা ছবি দেখে, আর আনন্দে হয় আত্মহারা । পরের দিনের দ্রষ্টব্য স্থান বাবা মন্দির , পথে ছাঙ্গু লেক। 
    
    আজ ছাঙ্গু লেকে যেন মেলা বসেছে। ওরাও নামলো গাড়ি থেকে। তখন বেলা বারোটা। এখন মনোরম আবহাওয়া। বাচ্চা দুজন বায়না ধরে ওরা চমোরি গাই চড়বে। এক এক করে ভাই বোন গরুর পিঠে উঠে ছবি তুললো। লেকের শান্ত জলে অল্প বরফের আস্তরণ। আশপাশের পাহাড়ে কিছু বরফের কোলাজ।  পাহাড়ের মতি গতি বোঝা দায় । কখন যে কী হবে তার আগাম  হিসেব নিকেষ করা বাতুলতা।

     বাবা মন্দিরের পথে যেতে ওরা দুপাশের দৃশ্য দু চোখ দিয়ে গিলছে । সামনে পিছনে  গাড়ি গুলো কত ছোট ছোট দেখায় আঁকা বাঁকা পাহাড়ি দুর্গম পথে। বেশ কিছুক্ষণ পর অনেক উঁচু পাহাড়ে দেখা গেল বাবা মন্দির। তখন  বেলা পড়ে গেছে। আকাশে যেন মেঘের আভাস। ড্রাইভার তাড়া দেয়।  এমন সময় শুরু গুঁড়ি গুঁড়ি তুষারপাত । এক অপূর্ব নয়নলোভন দৃশ্য। দূর আকাশ থেকে যেন সাদা ফুলের পাপড়ি কুচি কুচি করে ছড়িয়ে দিচ্ছে কারা ! সে যেন এক স্বর্গীয় ঘটনা । বাতাসের বুক চিরে নামে বরফ বৃষ্টি , পথ প্রান্তর সব শুভ্রতায় ভরে গেল। হালকা তুষার বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সব ভ্রমনার্থির মত ওরাও গাড়িতে ওঠে দ্রুত। গাড়ির চালক দ্রুত ছেড়ে দেয় গাড়ি। সারি সারি গাড়ি পাহাড়ি পথ দিয়ে ফেরে। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে বরফের টুকরো । গাড়িতে আছড়ে পড়ে, শব্দতে বোঝা যাচ্ছে। গাড়ি দ্রুত চালানোর তো কোন উপায় নেই এই পথে । একের পিছনে অন্য গাড়ির চলন। 

    তখন সন্ধ্যার আঁধার নামে পাহাড়ি পথে, বাড়ে তুষার বর্ষণ। যাত্রীরা সব উদ্বিগ্ন। রমেশ বাবুর স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কোন সান্ত্বনা বাণী আর কাজ করে না। একি মহা বিপদ। সব গাড়িতে একই দৃশ্য। আধ ঘন্টার তুষারপাতে বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির গতি।  সমবেত যাত্রীদের চিৎকার পাহাড়ে ধাক্কা খায়।  গাড়ির গ্লাসের ভিতর থেকে বোঝা যাচ্ছে সাদা পাহাড়ে ঢাকা সমস্ত অঞ্চল। ড্রাইভার সেই দুর্যোগেও গাড়ি থেকে নামলো। একটু এগিয়ে সামনের গাড়ির খবর নিয়ে ফেরে। রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে বরফের জন্য। আজ অজানা আতংকে ওরা বিচলিত। তাপমাত্রা বোধ হয় শূন্য ছুঁয়েছে। মোবাইলের চার্জ শেষ । সবাই আজ মহা বিপদের সামনে।

রমেশ বাবু ভীত সন্ত্রস্ত ছেলে মেয়ের জন্য। কী ঘোর বিপদ এল। এখন তুষারপাত বন্ধ হয়েছে । কিন্তু পথ বন্ধ। জল নেই, কোন খাবারও নেই। রমেশ বাবুর মনে পড়ে , কাশ্মীরের সেই ভয়াবহ তুষারপাতের ঘটনার কথা। অনেক গুলো গাড়ি পুরো বরফের মধ্যে চলে গেলে কত জনের এক মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সে তো স্ত্রী আর বাচ্চাদের শান্ত করার কোন পথ পায়না, নিজেও বড় আতংকের মধ্যে। রাত বাড়ে , ইতিমধ্যে ড্রাইভার জানায়, সেনা বাহিনী রাস্তার বরফ পরিষ্কার করতে নেমেছে। সকলের বুকে ভরসা  যোগাল এই খবর। মধ্য রাতে একদল সেনা সব গাড়িতে খাবার আর জল পৌঁছে দেয়। সকলের ধড়ে প্রাণ আসে যেন । সেনাবাহিনীর এই মানবিক প্রয়াস অতুলনীয় , রমেশ স্ত্রীকে বলে। নীরব বাচ্চা দুটির মুখে কথা ফোটে। অবশেষে রাত তিনটার সময় সিগনাল পায় গাড়ি ছাড়ার।

মৃত্যু আতংকে উদ্বিগ্ন যাত্রীরা ঈশ্বরের কাছে ও সেনাবাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কপালে বোধ হয় হাত ঠেকায় !  সামনের গাড়ির গতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এগোচ্ছে সব গাড়ি। ভিতরের যাত্রীরা ক্লান্ত অবসন্ন । তবে দায়িত্ব শীল চালকেরা সাবধানে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত সব যাত্রীদের , যে যার হোটেলে। হোটেল মালিক সব ইতিমধ্যে খবর পেয়ে গেছে।

    ভোরের আলো ফোটার আগে রমেশ বাবুরা হোটেলের রুমে ঢোকে। ক্লান্ত অবসন্ন দেহগুলো নেতিয়ে পড়ে বিছানায়। এক মৃত্যুপুরী থেকে ওরা যেন ফিরে এলো। 

No comments:

Post a Comment