Thursday, December 23, 2021

ঘটকালি - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১৩]

ঘটকালি

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   শীতকালে ভুটভুটি - লঞ্চের ভিতরে খুব ঠাণ্ডা। উপরের ছাদে রোদ্দুর থাকলে কি হবে , সারেং খুব কড়া কাউকে বসতে দিচ্ছে না। তবে জন তিনেক লোক বসে আছে । ভাটার উল্টো টানে জলযান চলে মন্থর । গন্তব্য সোনাখালী, আসছে গোসাবা থেকে। ওই তিনজনের একজন ঘটক, অন্য দুই ছেলের বাপ, দুই বন্ধু। ঘটক মশায়ের পোষাক, শরীরী ভাষা আর বাক চাতুরী সত্যি  বলতে অনবদ্য। পাকা অভিনেতা। ছাদের কাঠের উপর সে তাসের মত গোটা পঁচিশ পাস পোর্ট সাইজের ছবি , পাত্র ও পাত্রীদের বিছিয়ে দেখাচ্ছে দুই বন্ধুকে। খুবই উৎসাহ নিয়ে দুই বন্ধু ছবি গুলো দেখে।  ' ছবি দেখে কী আর ফর্সা কালো বোঝা যায় ! '  - শশধর বাবু বলে ঘটক মশাইকে । সে বলে, প্রাথমিক পছন্দ হলে বড় ফটো দেওয়া যাবে, তারপর বাড়িতে গিয়ে আসল মানুষ কে দেখবেন।  যত ছবি দেখে  তত puzzle হয় শশধর । ছেলে এবার প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি পেয়েছে, দশ বছর আদালতে লড়ে। বড় ছেলে তো সংসারী , ইটবালি ব্যবসা। ছোট ছেলে চাকরি চাকরি করে বয়স বাড়ালো। ভাল পাত্রী যে কোথায় মিলবে ! তবুও গোটা পাঁচেক পাত্রীর ছবি নেয় । ছবির পিছনে ঠিকানা, ফোন নম্বর আর একটা সিরিয়াল নম্বর লেখা। পাশে বসে বন্ধু মনোজ দোটানায় পড়ে। বিয়ের বয়স হলেও ঘাড় দিচ্ছেনা তার ছেলে। সে এখনও বুঝতে পারেনি ,ছেলের প্রেম ভালোবাসা আছে কি না। ছেলের মা বলেছে , পছন্দের পাত্রী দেখতে। কিন্তু আজকের দিনের ছেলে মেয়েদের কী যে হালচাল ! পাঠান খালির ঘাটে ওরা দুই বন্ধু নেমে গেল। ঘটক বলে দিল, পছন্দ হলে যেন ফোন করে। ঘটকের গন্তব্য সোনাখালি । 

    সেদিন ছিল বৃষ্টিভেজা শীতের দিন । শশধর বাবু আগের রাতে ভায়ের বাড়ি বারুইপুর এলো ,পরের দিন সকালেই পাত্রী দেখা ঠিক করেছে ঘটক। সে নিজে না আসতে পারলেও নিজের দিদিকে দিয়ে সব ব্যবস্থা করেছে । কারণ দিদির বাড়ি পাত্রীর বাড়ির কাছে। পরদিন সকালে নিম্ন চাপের বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ছোট ভাই আর বড় ভগ্নিপতি কে সঙ্গী করে সকালের ট্রেন ধরে। আধ ঘণ্টা ট্রেন, আধ ঘন্টা অটো, তারপর মিনিট পাঁচেক হেঁটে যখন পাত্রীর বাড়ির সামনে গেল তখনও দরজা বন্ধ। বাড়ির চারপাশ  দেখে ওরা , বিদ্যুৎ রাস্তা ঘাট ভালো । লেদার কমপ্লেক্স হওয়ার দৌলতে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে যায়। স্বাভাবিক সৌজন্য শেষে  বসলো সবাই। সাধারণত কনে দেখা হয় বিকেলে। সেই প্রচলিত প্রথা । তবে আজকাল মানুষের ব্যস্ততা সব কিছু পরিবর্তন করে দিয়েছে।

    চা ও মিষ্টি পরিবেশনের পর, পাত্রী এসে সবার সামনে বসল , শাড়ি নয় আটপৌরে চুড়িদার পরে, ওড়না ছিল না। শশধর বাবু অবাক হয়ে দেখল কিছুক্ষণ। সৌজন্য বজায় রেখে অল্প কিছু জিজ্ঞাসা। সকলে মিলে কথা,  পাত্র পাত্রীর পরিচয় ইত্যাদি আধ ঘণ্টা ধরে চললো। শেষে কথা হল , পছন্দ অপছন্দ বিষয় ফোন মারফত জানানো হলে পরবর্তী পদক্ষেপ।

    বাইরে এসে শশধর মুখ কেমন গোমড়া করে রইলো। ঘটকের দিদি চলে গেলে বলে, - ' জীবনে প্রথম দেখলাম পাত্রী শাড়ি ছেড়ে অন্য পরিধানে ! ' আমরা বলি, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তো হবে। আগের দিনের কথা আর কেউ শুনবে না।  অবশেষে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে ফেরা। 
     শশধর পাত্রীপক্ষের আসার অপেক্ষায় থাকে। মনে মনে ভাবে , ছেলেটা যদি ভাব ভালোবাসা করতো তো হ্যাপা থাকতো না। এখন সে অন্য জেলায় কর্মরত। দিনে দিনে কী হোল। প্রাইমারি স্কুলের জন্য বাইরের জেলা ! সবাই জানে এখন কার দিনে নেতার হাত মাথায় না থাকলে দূরে পোস্টিং তো হবে। সেখানে আবার রূপচাঁদের ব্যাপার আছে। কোনটাই যখন নেই চিন্তা করেও লাভ নেই।  রাত্রে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। ঘুম ঘুম চোখে  শশধর দেখে ,তার পুরনো সহকর্মী নিতাই বাবুর ফোন। প্রাথমিক সৌজন্যের পর   নিতাই বাবু  বলে,  - ' কাল সন্ধ্যায় আমার মেয়ের এনগেজমেন্ট , তোমার নিমন্ত্রণ, আসা চাই । ' শশধর কোন কথা বলার আগে ফোন কেটে গেল।

     নিতাই বাবুর বাড়ি। দোতলার ছাদে বিশাল ব্যবস্থা। সানাই, পুরোহিত আর বরের আসন ছাড়া সব আয়োজন হয়েছে। শশধর ভাবে  , এটা বিয়ে বাড়ি না  অন্য কিছু। সহকর্মী বন্ধু নিতাই কে জিজ্ঞেস করে । হাসতে হাসতে নিতাই বাবু বলে,  - ' মেয়ের দেখা শোনা কমপ্লিট। আজ হবে এনগেজমেন্ট, তাই একটু অনুষ্ঠান করছি। আজকাল এটাই চল হয়েছে।' ছেলের বাড়ি থেকে ছেলে, মা , বাবা ও কিছু আত্মীয় স্বজন, নিতাই বাবুর কিছু আত্মীয় ও প্রতিবেশী হাজির আজ। এসে গেছেন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার । 
    শুভ লগ্নের সময় দেখে নিতাই বাবু সর্বসমক্ষে ঘোষণা করলেন মেয়ের পাত্রের নাম ধাম কর্ম ও বিবাহের তারিখ। পাত্র, পাত্রীর আঙুলে পরিয়ে দিল সোনার দামি আংটি। শঙ্খ ধ্বনি ও পুষ্প বৃষ্টির মাধ্যমে সূচিত হল আগামী বিয়ের প্রস্তুতি ।

অবশেষে বিয়ে নথিভুক্ত করলেন উপস্থিত বিবাহ নথিকরণের জন্য  আগত ব্যক্তি। পরিপাটি ভোজনের মাধ্যমে শেষ হল অনুষ্ঠান। 
     ফেরার পথে শশধর চিন্তা করে, এই তাহলে এনগেজমেন্ট । বিয়ে ঠিক হলে আগের দিনে কেন এখনও উভয় পক্ষের বাড়িতে হয়  'পাকাদেখা ' ।  পুরনো দিনের রীতি গুলো কি উঠে যাচ্ছে !  এতদিন ধরে চলে আসা সব কিছু হয়তো হারিয়ে যাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।  শশধর বাবু ভাবে , ছেলের বিয়েতে সে কি করবে! 

   পাত্রী দেখে দেখে নাজেহাল তিনি মনে মনে ছেলেকে দোষারোপ করে। যদি পুত্রটি প্রেম ভালোবাসা করতে পারতো ,তাহলে তাকে এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হত না  ! ঘটকের ঘটকালি কী উদ্ধার করবে !

No comments:

Post a Comment