Wednesday, December 22, 2021

অচলা - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১২]

অচলা

- কুহেলী দাশগুপ্ত


  সাম্যকে হরিধ্বনি দিতে দিতে নিয়ে যাওয়ার আগে পলার শাখা ভেঙে সিঁদুর  মুছিয়ে দেয়া হোল। এক নিমেষে জীবনের সব  রঙ উবে গিয়ে যেন সাদা কাগজের সারি। তাতে নতুন গল্প লেখার শুরু। দশটি বছর ভালো মন্দের সবটাতেই জড়িয়ে থাকা। তাদের  ফুটফুটে কন্যা নীলার বয়স সবে ছয়। অবুঝ এই বালিকার  হাত ধরে পলাকে অনেকটা পথ এগিয়ে নিতে হবে।সাম্যর বৃদ্ধ পিতা ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছেন, চোখে জল টলটল করছে। অনেককাল আগে থেকেই তিনি বিছানা সর্বস্ব মানুষ।  সন্ধ্যাদি সযত্নে আগলে রাখে তাই, উনি টিঁকে আছেন এতকাল।  শাশুড়িমা গত হওয়ার পর থেকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে উনি ধীরে ধীরে বিছানা নিয়েছেন। পলা শাশুড়িমা কে সচক্ষে দ্যাখেনি। সবার কাছে শুনেছে,উনি লক্ষ্মীমন্ত ছিলেন। পলাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। নীলার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে বাবার ভূমিকা ও নিতে হবে।

    শ্মশানের কাজ মেটানোর পর পলার দাদা প্রবাল আর বাবা পিযূষ বাবু আসেন মেয়ের কাছে। সাম্যর  দিদি রাই এর প্রভাব কিছুটা রয়েছে এই সংসারে। এ বাড়ির কাছাকাছি রাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। তাই  অবাধ আসা যাওয়া আর বক্তব্য ভাষণ চলে। পলা বুদ্ধিমতী, তাই বরাবর বুঝে চলে দিদিভাইকে।
--"সাম্যর শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে গেলে, তোকে ওবাড়ি নিয়ে যাব বোন। এখানে এভাবে থাকবি কি করে"? প্রবাল  বলে।

---"হ্যাঁ রে মা। তুই আমাদের  কাছে গিয়ে থাকবি। নীলা দিদিভাই বড় হচ্ছে। আমরা সবাই মিলে ওকে আগলাতে পারব"। পিযূষবাবু বলেন।
সাম্যর দিদি রাই পাশের ঘরে ছিল। কোনভাবে শুনতে পেয়ে, চলে আসে এঘরে।
"পলাকে তো এখন যেতে দেয়া যাবে না মেসোমশাই। ভাই চলে গেল বলে, ওর দায়িত্ব ফুরিয়ে যায়নি। আমার  বাবার  কি হবে? যতই  সন্ধ্যাদি দেখাশোনা করুক,  একা হয়ে পড়লে বাবাকে আর  বাঁচানো যাবে না"।

এসব শুনে প্রবাল একরকম বিরক্তি প্রকাশ করেই বলে,"দিদিভাই  কিছু মনে করবেন না, মেসোমশাই আজ আছেন,তো কাল নেই। আপনারা কাছাকাছি থাকেন, সন্ধ্যাদি আছেন । দেখাশোনার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এইটুকুন বাচ্চা নিয়ে বোন এই বাড়িতে অসুস্থ মানুষ কে কতটা আগলাতে পারবে!"
পলা কাছেই ছিল।  এগিয়ে এসে বলে,"না রে দাদা, এবাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। সমস্যা হলে দিদিভাই আছে, বাবা আছে,তুই আছিস।  সাম্য, সব কিছুর দায়িত্বভার আমার হাতে ছেড়ে গেছে। বাবা , তোমরা অযথা চিন্তা কোর না"। রাই আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পায় না। একে একে সবাই  চলে গেলে, পলা অসহায় বোধ করে। ওঘরে সন্ধ্যাদি রয়েছে শ্বশুরমশাইয়ের পাশে। তবুও পুরো বাড়িটা যেন ওকে গ্রাস করতে চায়।নীলা মা কে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়," বাবা কি আর ফিরবে না মা"?ছলছলে চোখে পলা বলে,"বাবা তো স্টার হয়ে গেছে, তাই  রোজ সন্ধ্যেবেলায় তুমি আকাশে দেখতে পাবে।"

 নীলাকে বোঝাতে গিয়ে পলা হারিয়ে যায় দশ বছর আগের স্মৃতিতে। আলতা রাঙা পায়ে ডান পা বাড়িয়েছিল বধূবরণের দিন। বাপের বাড়িতে কেউ কিছু শিখিয়ে দেয়নি।দিদিভাই অলক্ষ্মী বলেছিল।কথাটা পলার বুকে বিঁধেছিল। দশ বছরে সব কিছু একে একে নিজের করে পাওয়া। দিদিভাই বাদ সাধলেও পলার স্কুলের চাকরী নিয়ে সাম্যর কোন আপত্তি ছিল না।

কখনো মজা করে বলত সাম্য,"তুমি আমার গৃহলক্ষ্মী। অচলা হয়ে থেকো"। পলা হেসে বলত,"মা লক্ষ্মী চির চঞ্চলা"। মনে মনে ফেলে আসা দিন ছুঁয়ে যায় পলা। বাইক অ্যাকসিডেন্টে সাম্যর অকালে চলে যাওয়া, দিদিভাইয়ের অলক্ষ্মী সম্ভাষণ মনে করাচ্ছে। এই বাড়ির সবখানেই সাম্যর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। সাম্যর বৃদ্ধ অসুস্থ বাবাকে ফেলে চলে যাওয়ার কথা পলা ভাবতেও পারেনা। এতকাল সাম্যর ভালোবাসার শৃঙ্খলে জড়িয়ে থেকে সে আজ সত্যিই অচলা।

1 comment:

  1. অনিন্দ্য ঘোষDecember 25, 2021 at 2:00 PM

    অসাধারণ! খুব তো লাগলো! অনেক শুভেচ্ছা ||

    ReplyDelete