Tuesday, December 21, 2021

পাঠের গর্ভগৃহ - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১১]

পাঠের গর্ভগৃহ

- কুহেলী দাশগুপ্ত


  অভ্রকে নিয়ে অন্তরা নাকাল হতে হতে একশেষ। ছেলেটা রোজই  স্কুলে কিছু না কিছু একটা গন্ডগোল করে আসছে। কোনদিন ডায়েরিতে লেখা রিপোর্ট আসছে পেরেন্ট টিচার মিটিং কল হয়েছে, কখনো  স্কুল বাসের  হেল্পার কাকু বলছে, বাড়ির দেয়া টিফিন কেক কুকুরকে খাইয়ে একটা কুকুরছানা নিয়ে বাসে উঠে পড়েছে।কাকু বকাঝকা করে কুকুরছানা নামিয়ে দিয়েছে। একদিন পৃথার মা তো ফোন করে অনেক কথা শোনালেন," আপনার ছেলেকে ম্যানারস শেখান। আমার মেয়েকে কালী কেল্টি বলে ও কোন সাহসে! 
বন্ধুরা দুষ্টুমি করতে পারে। তাই বলে রূপ নিয়ে কথা বলবে!"পৃথার মায়ের কাছে ছেলের হয়ে ক্ষমা চেয়ে, খুব রাগ হয়েছিল  সেদিন অন্তরার। অভ্রকে খুব মেরেছিল সে। 
---"ও ধাক্কা দিয়ে আমার  টিফিন  ফেলে দিয়েছে কেন? তাই বলেছি"। কান্না জড়ানো স্বরে বলে অভ্র।
---"যা--ই হোক, তমি ম্যাম কে বলতে পারতে। তাই বলে বাজে কথা বলবে! আর যেন কোনদিন  এমন না শুনি"।
    মনে মনে অন্তরা ভারী বিরক্ত হয়। রজত ছেলের ব্যাপারে এতটা উদাসীন থাকে,যেন সব দায় মায়ের! কিছু বলতে গেলেই  বলে,"বাচ্চারা অমন অনেক  কিছু করে,। নিজে সামলে নাও"। সারাক্ষণ  নিজের অফিস  আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত সে। ঘরকন্না আর ছেলেকে নিয়ে নাজেহাল অবস্থা অন্তরার। কখনো আবার  কত্তা গিন্নীতে খিটিমিটি বেধে যায়। উপলক্ষ অভ্র। বাড়িতে নিরামিষ  রান্না হলে, ছেলের খাবার নিয়ে বায়না। অন্তরা আলাদা করে মাছ ভাজা বা ডিম করে দিলে  রজত খুব আপত্তি জানায়। "এক বাড়িতে কেন আলাদা 
ট্রিট হবে? সবাই  যা খাচ্ছে, ওকে ও তাই  খেতে দাও। এভাবে বড় হলে কখনো মানিয়ে চলতে শিখবে না"।
     গোল বাধলো একবার  স্কুল পাল্টানোর কথা হয়ে। অন্তরার বাবা একমাত্র নাতিকে কলকাতার  নামকরা স্কুলে পড়ানোর আবদার করেন।  উনি খোঁজ খবর  করে মেয়েকে জানাতে, অন্তরাও রজতের পেছনে লেগে পড়ে। রজত ছেলের  স্কুল বদল করতে একদমই  রাজি নয়। সে নিজেও পাড়ার স্কুলে পড়াশোনা করে বরাবর ভালো রেজাল্ট করেছে।
---"তুমি ব্যাপারটা কেন সিরিয়াসলি নিচ্ছ না? পাড়ার গজিয়ে ওঠা এসব স্কুলে পড়ে  অভ্র  কোন ম্যানারস শিখবে না। বাপি তাই  জন্য  বলছিল।  তাছাড়া তুমিও  তো সময় দিতে পার না। আমি একা কত করব!"
---"শোন অন্তরা, এসব  আমায় বলতে এসো না। তোমরা যা ভালো বোঝ কর। তবে, অভ্র আমার ও ছেলে। আমার কিছু বলার আছে। স্কুল আমার  কাছে মুখ্য  নয়। চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। তোমরা আত্মীয় পরিজন, প্রতিবেশীদের দেখে প্রতিযোগিতার দৌড়ে ছুটতে পারো। কার সন্তান কত ভালো স্কুলে পড়ছে , একটা গাল ভরা নাম বলতে গর্ব হয়। তবে একটা কথা ভাবো, মানবিকতার পাঠ কোন স্কুল দেবে!
একজন যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠা দরকার সবার প্রথমে। শুধু পাঠ্য বইয়ের অনুশীলন নয়, সহবত শিক্ষার জন্য  পরিবারকে পাশে থাকা দরকার। আমরা বাড়িতে স্বার্থপরতার পাঠ দেবো। ছেলেকে আয়েশ আহ্লাদে ভরিয়ে বোঝাব  ,তুমি সবার  চেয়ে আলাদা- এমন শিক্ষা কি ঠিক? তোমার  কি মনে হয় অন্তরা  ,আমার  ছেলেকে আমি কিছু কম ভালোবাসি?যে কোন ভাষায় দক্ষ হওয়ার জন্য  একটা স্কুল ম্যাটার করে শুধু তা নয়। অন্ততঃ আমি মানতে পারি না। নিজের  চেষ্টা , অনুশীলন, উদ্যোগ ই হোল আসল। আমার বক্তব্য আমি জানালাম। বাকিটা তোমরা বোঝ"।
মন খারাপ  হয়ে যায় অন্তরার।  অভ্রের  দাদুকে ব্যাপারটা জানাতে উনি বলেন,"দ্যাখ মামনি, রজত নিজের  সন্তানের  ব্যাপারে যা সিদ্ধান্ত  নেবে, জেনে বুঝেই নেবে। আমরা কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না"। কয়েক বছর কেটে যায় এমনি করে। এখন রজত অফিস  থেকে ফিরে ছেলেকে সময় দেয়। বাবার  কাছে পড়ে অভ্র ভালো উন্নতি করছে। পারিবারিক  শিক্ষাই এগিয়ে চলার  প্রথম  সোপান । ভালো মন্দ সবের মাঝে থেকেই  ভালোকে কাছে টানতে হয়, এমন শিক্ষা ছেলেকে দিয়ে পরিপূর্ণ করতে চায় রজত।

No comments:

Post a Comment