Monday, December 20, 2021

পলাতকা ঢেউ - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১০]

পলাতকা ঢেউ

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   কল্পনায় নয় বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে দেখতে চায় মিনতি। রোজ চেনাজানা প্রকৃতিও কম আকর্ষণের নয়, চোখ থাকলে। তবে সে অসীমের সামনে দৃষ্টিসীমার ওপারে ঝাপসা পৃথিবীর খবর রাখবে নিজের জীবনের আলো ছায়ার বেড়া ডিঙিয়ে। একঘেয়ে ক্লান্ত তার জীবনের অবসন্নতা গ্রাস করে যখন, সাধ্যের সীমা পার করে অজানার অসীম পুরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়।

     মিনতির বাবা বলতো, সমুদ্রের কাছে বসে থাকলে কিভাবে যে সময় পার  হয়ে যায় ! শুধু জল আর ঢেউ ভিন্ন কিছু নেই , অথচ উভয়ের এক চুম্বকের মত আকর্ষণ টেনে রাখে। তার বাবা মা শেষ বয়সে যায় সমুদ্র দর্শনে আটপৌরে জীবনের ঘেরাটোপ পেরিয়ে। দাদার ব্যবস্থাপনায় সুযোগটা এসে গেল। ছেলে সুমাল্য, মেয়ে সুলতার কী আনন্দ। পড়াশুনো আর স্কুল স্কুল করে কিশোর বয়সে ওরা থাকে ব্যস্ত। ওদের বাবাও ছুটি নিল অগত্যা।

     দীঘার সৈকতে পৌঁছে গেল। দীর্ঘ বেলাভূমির নির্জনতা ভেঙে হাজার হাজার মানুষ। মিনতি ভাবে তারা মানুষ দেখবে,না সমুদ্র ,উভয়েই তো কোলাহলে মেতে। বাচ্চা দুজন এভাবে মুক্ত জীবনের স্বাদ পায়নি অনেকদিন ! ওদের হাসি, আনন্দ ,উচ্ছলতা সমুদ্র দেখার চেয়ে বেশি যেন খুশি করে। বাবার হাত ধরে অন্যদের সঙ্গে ওরা দৌড়ে নেমে পড়ে, যায় জলের কাছাকাছি। এক প্রাণ ভরা রোদ্দুরের দেশে ওরা খেলায় মেতে ওঠে । কত মানুষ ছেলে মেয়েদের নিয়ে বর্ণময় পোশাকে , কেউ জলে,  সৈকতে আনন্দের যজ্ঞে মেতেছে। সকলের উন্মাদনা দেখে সমুদ্রও তার
ঢেউ আর গর্জন প্রকাশ করে।  সে বার বার করে সাবধান।

     সমুদ্রের গর্জন নিরন্তর। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে দেখে মানুষ ওই সমুদ্রের  অসীমতাকে। দূর থেকে বিশাল আকৃতির ঢেউ ছন্দের তালে তালে এগিয়ে আসে বেলাভূমির দিকে  ভয়ঙ্কর সুন্দর মূর্তি নিয়ে।  গভীর থেকে যত  অগভীরতায় সে ঢেউ আসে , মৃদু লয়ে আছড়ে পড়ে সৈকতে । এ এক আত্ম সমর্পণ। আঁকিবুঁকি জলছবির সেই ফেনিল জলতরঙ্গ ভিজিয়ে দেয় পা , মানুষ সব  শিহরিত হয় অসীম সমুদ্রের ছোঁয়া পেয়ে। 

   প্রথম দিন ছিল দীঘা। পরের দিন তালসারি থেকে শুরু । সেই সমুদ্র । জলে ডাঙায় অদ্ভুত বিনোদন।  তারই মাঝে কিছু খেটে খাওয়া মহিলার ছাঁকনি জাল দিয়ে ছোট মাছ আর ঝিনুক সংগ্রহ, এক বৈপরীত্যের ছবি। মিনতি দেখে তারই মেয়ের বয়সী কিশোরীরা মায়েদের সঙ্গী। ঢেউয়ের তালে তালে ওরা জাল বেয়ে আনে ডাঙায় । বাচ্চা গুলো আবর্জনা ঘেঁটে কুড়িয়ে নেয় ঝিনুক ইত্যাদি। জীবিকার উপকরণ  গরীবের ঘরে। কৌতূহলী হয়ে মিনতি যায় এক কিশোরীর কাছে। লাজুক দৃষ্টিতে সে দেখে মিনতিকে। নাম বলে, বলে তার বাবা ছিল নুলিয়া। এক বছর আগে কোন এক বাবুকে বাঁচাতে গিয়ে জলে ডুবে মারা যায়। কাছাকাছি ঝুপড়িতে ওদের বাড়ি। মা, দুই দাদা আর ও , এক গরীবের সংসার। '  সমুদ্র তোদের ভালো লাগে ? ' ' সমুদ্র আমাদের ঘরবাড়ি , সারা রাত দিন ও আমাদের ডাকে। কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর খুব ভয় করে সমুদ্রকে দেখে। ভয়ে ভয়ে আসি , খাবো কী ! ' 

     এমন সময় ছেলে মেয়ে দুজনে দৌড়ে মায়ের কাছে আসে।  ' মা চলো  সবাই খেতে ডাকছে।  '   ' চলো ' বলে মিনতি এগিয়ে চলে শীতার্ত রোদ্দুরের ওম নিয়ে। চলতে চলতে সে দেখে  , কে যেন কিসের আঁচড়ে সৈকতে লিখেছে  , -  শ্রাবণী , আমি তোমাকে ভালোবাসি '  - কমল ।
হঠাৎ একটা দমকা ঢেউ এসে মুছে দিয়ে যায় সে লিখন । মিনতি গোড়ালি ডোবা পলাতকা ঢেউ মাড়িয়ে এগিয়ে যায় । ওরা সবাই ডাকে।

No comments:

Post a Comment