Monday, December 20, 2021

স্রোতস্বিনী - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১০]

স্রোতস্বিনী

- কুহেলী দাশগুপ্ত 


  সমুদ্রের তীরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলাম।  আজ পূর্ণিমা। পূর্ণ চাঁদের  আলো গায়ে মেখে সিক্ত হব। ফেনিল স্রোতেরা কূলে এসে আছড়ে পড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ে। নোনা বাতাসে আঁচল উড়িয়ে আজ আমি পাল তোলা নৌকো। আমি জাহ্নবী গুপ্ত। 
জীবনের ওঠা পড়া কোন কিছুই  আর আমার  আত্মাকে ছুঁতে পারে না। নিজেরে হালকা করে নিয়ে ভাসতে শিখে গেছি যে! 
        
        একটা সময় ছিল, যখন প্রতি কথায়, প্রতি কাজে শুধু ভুলের মাশুল গুনেছি। তখন মনে হত, একটা অচল পয়সা ছাড়া আমি আর কিছু নই।সময়ের হাত ধরে চলতে ফিরতে গিয়ে কখন যে এতটা পরিণত হলাম, তার  খবর  রাখিনি। আবেগে ভেসে বেড়ানো মনকে প্রেম ছুঁয়ে নাড়া দিয়েছে বারবার। শরতের আকাশ, মেঘলা দিনের মন কেমনের বাতাস  ,নদীর জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ সবের মাঝেই হৃদয় জুড়ে ভালোবাসার জোয়ার বইতো। আনমনা হয়ে কল্পনায় খুঁজে ফিরেছি, কোথায় পাবো তারে? যে জন আছে হৃদ মাঝারে।

   শুভদৃষ্টি আর মালা বদলের মাঝে যাকে পেলাম, সে সোমেশ। আমার শুভাকাঙ্খীদের নির্বাচিত কর্ম ব্যস্ত, উচ্চাকাঙ্খী পুরুষ। জীবন পথে এগিয়ে চলতে  গিয়ে আমার  না পারার পাল্লা ভারী  হয়ে বেসামাল হয়ে পড়ি।   সোম হয়তো আটপৌরে এই আমিকে গড়েপিটে নিতে চেয়েছিল! কিন্তু অতি আধুনিক সোমেশের বন্ধু পরিজনের সমাবেশে আমার গুটিয়ে যাওয়া মন প্রজাপতির পাখনা ছাড়িয়ে শুঁয়োপোকা হয়ে ঘুরে  বেড়াতো। ইংরেজিতে খই ফোটা বুলির ঝড়ে  স্থবির  হয়ে থাকতো আমার জিহ্বা। সোমেশের চলন কেতা, জীবন যাপনে বেমানান আমি জাহ্নবী থেকে জানু হয়ে উঠতে পারিনি। লাটাইয়ে জড়ানো সুতোর বাঁধন ছিঁড়ে দিয়ে মুক্ত করে দিয়ে আমায় কৃতজ্ঞ করেছে ও।
      
     মানিয়ে চলতে না পারা, হেরে যাওয়া নারী যেন দিশাহীন তরী! সোমেশ কিন্তু বলত মিস ম্যাচ। আমি ও তাই বলি। আমার অন্তরে স্রোতস্বিনী বইছে তার  আপন   খাতে। দিশাহীন পথে সে এগুবে না।

   আমার স্কুল আর ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বেশ আছি। কল্পনার ছবি ক্যানভাসে মুক্তি পায় তুলির আঁচড়ে।  কল্পনায় খুঁজে ফেরা সাথী আজ আমায় চিনে নিয়েছে।বিকাশ আর আমি একটা আঁকার স্কুল চালাই। অ্যাকসিডেন্টে ওর একটা পা বাদ গেলেও , বাকি জীবন  ওর হাত ধরে এগিয়ে নিতে পারব।

 দুজনে পুরী এসেছি। বালিয়াড়িতে বসে দেখি উত্তাল  সমুদ্রের বালির বুকে আছড়ে পড়া। চাঁদের আলো আমাদের বাসর সাজিয়েছে ফেনিল সৈকতে।হৃদয়ে কান পেতে শুনি, জোয়ার বইছে।

No comments:

Post a Comment