Sunday, December 19, 2021

দিগন্তের রাঙা টিপ - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৯]

দিগন্তের রাঙা টিপ

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   অহীন আজও ভাবে। তার বাবা কেন যে শেষ বিকেলের আলো ভালোবাসে ! সে আলোয় নাকি একটা বিষণ্ণতা থাকে। আবার বিষণ্ণতার মাঝে ঘরে ফেরার এক ইঙ্গিত সে থাকে। বিকেলে এখানে আলো বলতে ইলেকট্রিকের। দিনেও প্রায় অন্ধকার , এমন এক শহরতলির গলিতে তাদের ভাড়ার বাসা। মানুষটা সারাজীবন খুঁজে গেছে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা, যেখানে আলো বাতাস আসবে প্রকৃতি থেকে। কিন্তু তার সে আশা পূর্ণতা পায়নি ।

    দুই মেয়ের একজনের বাড়ি শহরতলি ছেড়ে পাশের গ্রামে। মাঝে মাঝে নৃপেন বাবু যায় সেখানে । মোটামুটি সচ্ছলতা আছে । আজ যেমন এলো। সকালে হাঁটা তার কোনকালে ছিল না। বিকেলের নরম রোদে পথে হাঁটা, গ্রামের পথে ,তার পছন্দ সেই ছোটবেলা থেকে। এই গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে একটা খাল উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত। তখনও সূর্যের তেজ কিছুটা হলেও বর্তমান। বসন্তের বিকেলে দখিনের মৃদু বাতাস যেন মায়ের মরমী ছোঁয়ার মত মনে হয়।  এখানে এলে তার অনেক স্মৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। দু বছর আগে স্ত্রী মধুমতিকে নিয়ে এখানে আসে এক শীতের বিকেলে। সেই মধুমতি গত বছর যে নদী হয়ে ভেসে যাবে তা স্বপ্নেও  ভাবে নি সে । মধুমতির চলে যাওয়া তার জীবনে এনেছে এক অনন্ত শূন্যতা। আর সেই থেকে জীবন চেতনায় এক বিষাদী সুর বাজে অহরহ। তবু তো জীবন থেমে থাকে না। ভাবনা এখন নিজের জন্য হয় না, দুই ছেলে আর তাদের সংসার তাকে ভাবায় । মেয়ে দুজনের তবু এক স্থিতিশীলতা দিতে পেরেছে। ছেলেদের মানসিক অশান্তি নৃপেনবাবুর মনের আকাশে কালো মেঘ বয়ে আনে।  

   খালপাড়ের নিম গাছের তলায় মাটিতে বসে । নোংরা জল দখিন মুখী স্রোতে বয়ে যায়। তখন সূর্য দিনের শেষ আলো ছড়াচ্ছে  সারা চরাচরে। নিম গাছের শাখায় শাখায় , জানা অজানা পাখির ডাকাডাকি মুখরিত করে প্রাক গোধূলির পরিবেশ। কানে তার কুজন ,চোখে  অস্তগামী সূর্যের মায়াবী আলোর আভা। তার মনে হয় সূর্য নয়, পশ্চিম দিগন্তের কপালে এক রাঙা গোল টিপ। সে টিপ আস্তে আস্তে অপসৃয়মাণ। অপলক চেয়ে চেয়ে সূর্য ডোবা দেখে। কোন এক ভাবনার জগতে তার অস্তিত্ব এখন।  ভাবে, সূর্য ডুবে গেল, আলোর বিচিত্র রঙে দিগন্ত রাঙিয়ে।
ডুবন্ত কালের সে শোভা দেখার জন্য এই মানব জীবন, হয়তো বা সারা জীবন বাঁচার সংগ্রাম ! এবং অস্তরাগের আলোতে স্বপ্নকে ছোঁয়া ! মনে হয় তার, সূর্য চলে গেলে থাকে তার আগামী ভোরের প্রস্তুতি। সূর্য ডোবে আবার উঠবো বলে, মানুষ ডোবে , ওঠে না আর কোনদিন............।

     সন্ধ্যার আলো আঁধারি পথে হাঁটতে হাঁটতে যখন মেয়ের বাড়ির  সদর দরজার চৌকাঠে পা রাখলো, সন্ধ্যা আরতির শঙ্খ বাজে তুলসী তলায় ।  অধিক রাতে নৃপেনবাবুর ধুম জ্বর এলো। মেয়ে বাবার গায়ে হাত দিয়ে ভয় পেয়ে যায়, স্বামীকে জানায় । খবর গেল দাদাদের কাছে। ঘণ্টা খানেকের পথ। অহীন ভাইকে নিয়ে চলে আসে । সারারাত ভাইবোনেরা বাবার বিছানায় বসে। নৃপেনবাবু জ্বরের  ঘোরে ভুল বকে। জ্বরের ওষুধে  জ্বর কমলেও তার কথা আর শেষ হয় না। সবাই এক অজানা আশঙ্কায় বিনিদ্র রজনী প্রভাতের অপেক্ষায়। ভোর হয় হয়, রোগী ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন হয়। 

      ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে অহীন বোনকে বলে,  - ' বাবাকে নিয়ে কী করি বলতো ! রোজ বিকেলে সূর্য ডোবার সময়  এখানে আসতে চায় , আর বলে , তোদের জন্য আমি সূর্য হতে চেয়ে ছিলাম । পারিনি ! '  নির্বাক হয় তিনজন। তখন ভোরের মোরগ ডাকে পাশের বাড়ির হাঁস মুরগির খুপরি থেকে।

No comments:

Post a Comment