Sunday, December 19, 2021

ফেরা - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৯]

ফেরা

- কুহেলী দাশগুপ্ত

 
 অসুস্থ মাকে ছোট ভাই ডিম্পুর বাড়িতে রেখে যাওয়ার  সময় বলেছিল দীপু," তুমি ক'টা দিন ভাইয়ের কাছে থাকো মা, আমি কেরালা থেকে ফিরে তোমায় আমার কাছে নিয়ে যাব"।মাথায় হাত রেখে বড় ছেলেকে বলেছিলেন  মীনা দেবী,"সাবধানে যাস  বাবা। 
তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। অপেক্ষায় থাকব। বাড়ি গিয়ে লক্ষ্মী পুজো করতে হবে তো! "
 
   অশীতিপর বৃদ্ধা মীনা বসুর বড় ছেলে দীপক পুজোর ছুটিতে স্ত্রী আর মেয়ে রিয়াকে নিয়ে কেরালা ঘুরতে যাচ্ছিল।  মায়ের  বুকে একটা ইনফেকশন হওয়ায় কিছুদিন  নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন। মা অন্ত প্রাণ দীপক এর এবার অন্তত  ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলনা। পুজোর ছুটিতে প্রতিবারই কোথাও না কোথাও  ঘুরতে যাওয়া হয়। তার জন্য  অনেক  আগে থেকেই  প্রস্তুতি নেয়া থাকে। তবে চার বছর ধরে কোথাও যাওয়া হচ্ছিল  না বলে রিয়ার মন খারাপ  ছিল। দীপকের কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছিল  চার বছর  আগে।  স্ত্রী ইন্দিরার সেবা যত্নে দীপক আজ অনেকটা সুস্থ। ইন্দিরা নিজেও ক্যান্সার পেশেন্ট।ব্রেস্ট অপারেশনের বিয়োগ যন্ত্রণার উপশম হওয়ার আগেই কর্কট ঘাতক ফুসফুসে ঘাঁটি গেড়েছে। ভেতরে বাইরে দুদিকেই লড়াই জারি রেখে ইন্দিরা বসু স্বামী দীপকের সেবা করেন আবার  মুম্বই  গিয়ে নিজের চিকিৎসা করান। এই ক'বছরের মানসিক,শারীরিক দুর্যোগের চাপ থেকে কিছুটা শ্রান্তি পাওয়ার নিরিখেই এই বেড়ানোর আয়োজন।

   ---   "দীপুরা লক্ষ্মীপূজার আগের দিন  ফিরবে। সেদিন সকালে আমায় বাড়ি দিয়ে আসবি ডিম্পু।
---"তুমি চিন্তা করছ কেন মা ?দাদা বাড়ি ফেরার আগেই তুমি পৌঁছে যাবে।
---"আয়োজন সব করে রাখতে হবে তো ।দীপুটা আমার ঘটা করে লক্ষ্মীপূজা করতে ভালোবাসে"।

    লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন ইন্দিরার ফোন এলো।"তোর দাদার শরীর একদম ভালো নয় রে ডিম্পু।আমরা এয়ারপোর্টে এসেছি । ওকে স্ট্রেচারে শোয়ানো আছে। জ্বর আছে গায়ে, টেমপারেচার একদম কমছে না। আমরা ডঃ নন্দীর সাথে যোগাযোগ করেছি।এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বেলভিউতে চলে যাব। তুই  সময় করে চলে আসিস"।
মীনাদেবী ধীর পায়ে এসে ছেলের কাছে দাঁড়ান।

--"কি হয়েছে রে ডিম্পু? ইন্দিরা ফোন করেছে কেন?ওরা কখন পৌঁছবে?"
---"কিছু হয়নি মা। বৌদি বলছিল, দাদার একটু জ্বর এসেছে। এই সময় একটু ঠান্ডা পড়ছে তো!"
 
বেলভিউতে নেয়ার পর ডঃ নন্দী সমস্ত এক্সামিন করে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হলেন।কিডনি ফেলিওর। ওনার আর কিছুই করার ছিলনা।
ভোর রাতে ডিম্পুর ফোন এলো স্ত্রীর কাছে।
---"পলি, তুমি মাকে নিয়ে  চলে এসো। দাদা একটু আগে এক্সপায়ার করে গেছে।"
পলি মাকে তৈরি হয়ে নিতে বলে।"ডিম্পু এখনও ফেরেনি? দীপুরা এসে গেছে?"
-'--"তুমি চলতো! আমরা দাদার  কাছেই যাচ্ছি।" মন শক্ত করে বলতে হয় পলিকে।
সেদিন ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন চলছে। মীনা দেবী যখন বাড়ি পৌঁছলেন, দীপক তখন বসার ঘরের মেঝেতে মাদুরে চিরনিদ্রায় শায়িত।ছেলেকে দু'হাতে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা মা। এভাবে ছেলে ফিরবে তিনি ভাবতে পারেননি। একদিকে ইন্দিরার মনোবল যেন অনেকখানি পর্যদুস্ত হয়েছে।
দীপু যখন মায়ের আলিঙ্গন ছাড়িয়ে অনন্তের পথে এগিয়ে শ্মশান  অভিমুখী, আশেপাশের বাড়িতে তখন লক্ষ্মীপুজোর শাঁখ বাজছে।
 সন্ধ্যে নামার আগে, মীনা দেবী অন্তবাসী ছেলের জন্য তার পছন্দের খাবার গুছিয়ে নিয়ে "সাজপানি" সাজিয়ে দেন তুলসী মণ্ডপের কাছে। তখন আকাশে লাল আবীর  ছড়িয়ে সূর্য পশ্চিম কোনে ঢলে পড়ছে।পাখিদের ঘরে ফেরার তাড়া। সেদিক পানে চেয়ে মায়ের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। গোধূলির এই সময়টা বড় কষ্টের। চিরতরে হারানোকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে। সব পাখি ঘরে ফিরে চলে। শূন্য আঁচল পেতে এক মা অনন্তের অপেক্ষায় থাকে, যে ঠিকানায় পৌঁছে হয়তো হারানোকে ফিরে পাওয়া 

No comments:

Post a Comment