Saturday, December 18, 2021

কল্পনার ডানা - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৮]

কল্পনার ডানা

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   'দাদান বইয়ের ব্যাগটা একটু নেবে।' বয়সে প্রবীণ নিমাইবাবু নাতির কাছ থেকে ভারী বইয়ের ব্যাগটা নেয়। মা বাবা দুজনেই সকাল নটাতে অফিস চলে গেলে , ঠাকুরদার জিম্মায় কিশোর নাতিটি । এখন তো সেই আগেকার মত বই নয়,একটা ব্যাগে সব বিষয়ের বই নিয়ে  দুই মাইল দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে। ঠাকুরদা আজ সহুরে নাতির পাল্লায় পড়ে এই বয়সেও স্কুলে যায় ! নিমাইবাবু মনে মনে ভাবে, এখনকার বই গুলো খুব ভারী ভারী আর বিশাল আকৃতির। দেখলেই ভয় হয়। এত বই ও পড়ার চাপ কী করে যে নেয় বাচ্চারা ! এর ওপর আছে নানান কমিকস আর হ্যারিপটার। একদিনও খুলে দেখে নি, ইংরেজির যা জ্ঞান তার।

     এ যুগে ঠাকুরদা নাতিকে গল্প শোনাবে কী ,নাতি তাকে এত শোনায় , মাথা ধরে যায়। কী যে কাল্পনিক কাহিনীর জাদুকর , তাকেই নিয়েই সব  পাগল ! তবে একটা জিনিস ভালো, এই মোবাইল, ইন্টারনেট এর যুগে বাচ্চাদের কল্পনার ডানা হারিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পড়ুক না হ্যারি আর তার জাদুকরী কাহিনী। নাতি সুপ্রিয় বাবার কাছে শুনেছে, দাদান নাকি ভালো গল্প বলতে পারে।  স্কুলে বন্ধুদের কাছে সে বলেছে এ কথা। রবিবারের ছুটিতে কাছের বন্ধুরা চলে এলো ওদের বাড়ি।

     কথা শুনে নিমাই বাবু হেসে কুটি কুটি। আরে ভাই, তোমরা এ যুগের ছেলেপুলে হ্যারির পাল্লায় পড়েছ, আমার গেঁয়ো গল্প ভালো লাগবে কী করে।   - ' সুপ্রিয়র বাবা তখন হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে গ্রামে। বিভিন্ন মরশুমে নানান খেলা দেখাতে আসতো মানুষ। পিঠে একটা বড় ঝোলা নিয়ে আসতো ম্যাজিশিয়ান , কেউ বানর, কেউ সাপ, ভালুক নিয়ে আসতো। গ্রামের লোক তখন এত ব্যস্ত ছিল না। এই সব খেলা দেখতে খুব ভালোবাসত। সে বার বৈশাখে , এলো ' মানুষ বাঘের খেলা ' দেখাতে।  ' মানুষ বাঘ ! ' - বলে সবাই আঁতকে ওঠে।  ' সে আবার কী ধরনের খেলা । ' - মজা তো ওখানেই '  - নিমাইবাবু বলে ওঠে। ' দুজন লোক কাঁধে ঝোলা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় হাঁকছে,  ' মানুষ বাঘের খেলা ', 'মানুষ বাঘের খেলা ।' শুনে তো লোক জড়ো হল অনেক, তাদের হাঁক আর ডুগডুগি বাজনার শব্দে। বসানো হল মন্ডলদের চন্ডীমণ্ডপে । আগে ছিল চণ্ডীমণ্ডপ , এখন নেই। প্রায় প্রত্যেক পাড়ায় এই বিশেষ সর্বজনীন ঘর ছিল। সেখানে বসে ঠিক হল রাতে ওই খেলা হবে। ওদের দুজনের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হল, রাতে খেলা হবে এই চন্ডীমণ্ডপে । সন্ধ্যে হতেই খেলা দেখার লোক আসতে শুরু করেছে। একটা হ্যাজাক আলো জ্বালানো হল । তখন রাত প্রায় ৯ টা বাজে, ভরে গেল চণ্ডীমণ্ডপ । 

    একটা মাদুর পেতে বসেছে মূল নায়ক, যে দেখাবে খেলা। কাছাকাছি তার সাগরেদ , রোগা পাতলা লোকটা। শক্তপোক্ত খেলোয়াড়ের হাত পায়ে বাঁধা হল শক্ত দড়ি । সে দড়ি ধরে আছে গ্রামের চার  তরতাজা যুবক। উৎসাহী জনতা মাঝে মাঝে হল্লা করে। সাগরেদ হাতে নিয়েছে এক ঘটি জল , তাতে সে নিমগ্ন মনে মন্ত্র পাঠ করে চলেছে। আনা হয়েছে একটা জ্যান্ত বড় হাঁস। এইবার মূল খেলোয়াড় কয়েকবার  লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াতে শুরু করে । ' চোখ বড় বড় করে সুপ্রিয় আর বন্ধুরা গল্প শুনছে। আবার শুরু করে নিমাই বাবু, _ ' তারপর তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেল, হাত পায়ে এলো প্রচন্ড শক্তি, বাঁধা দড়ি ছিঁড়ে ফেলে আর কি !  এবার সে দাঁত কড়মড় করতে করতে বলছে , ভুখ ভুখ ..। এইবার ওর সাগরেদ লোকটা হাঁসটা নিয়ে তার হাতে ধরায়। মুহূর্তে সে  হাঁসের মুন্ডু পাকিয়ে ধরে ,ডানা ছিঁড়ে নখ দিয়ে পেট কেটে ফেলে। রক্তারক্তি কান্ড বেধে গেছে। সবাই আঁতকে উঠলো। দেখা গেল দিব্যি সে ওই কাঁচা মাংস খাচ্ছে তারিয়ে তারিয়ে। শেষে  আবার হাতপা ছুঁড়ে পালাবার চেষ্টা করে প্রাণপণে । চার যুবক তো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে দড়ি ধরে রাখতে।  এমন সময় সাগরেদ মন্ত্রপূত জল ঘটি থেকে ছিটিয়ে দিল ' মানুষ বাঘ ' এর গায়ে। আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ে এই বাঘ। সব
দর্শক বাড়ি ফিরতে লাগে। '

    সুপ্রিয় আর ওর বন্ধুরা গল্প শুনে থ হয়ে গেল। তারা বললো, যদি দড়ি ছিঁড়ে যেত তাহলে কি হত ।  - ' পালিয়ে যেত যেখানে ইচ্ছে। যতক্ষণ না ওই মন্ত্রপূত জল গায়ে পড়বে ততক্ষণ সে মানুষ বাঘ।  ' এরকম হয়েছিল কী ! ' ওরা প্রশ্ন করে ।
 ' কোন এক গ্রামে একজন ওই বাঘ হওয়ার মন্ত্র শিখে বাড়িতে প্র্যাক্টিস করছিল। সে তার স্ত্রী কে মন্ত্রপূত জলের ঘটি দিয়ে বলে , ' আমি যখন বাঘ হয়ে যাব , তখন খবরদার খবরদার জল ছিটিয়ে দিও। ' কিন্তু যখন ওই লোকটা নিজে মন্ত্র  পড়ে  ব্যাঘ্র স্বভাব পেল , দেখে  তো স্ত্রীর চোখ ছানাবড়া ! ভয়ে আঁতকে উঠে সে ঘটি হাতে থেকে মাটিতে ফেলে দিল। দেখলো তার স্বামী বাঘের মত গর্জন করতে করতে এক ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ' - সুপ্রিয় আর তার বন্ধুরা প্রচন্ড ভয় পেল। ভয়ে ভয়ে বললো, ' তো কোথায় গেল  !'  ' কেউ জানে না কোথায় গেল সেই মানুষ বাঘ।  হয়তো বনেই চলে গেল !'

      গল্প শেষ হলে নিমাই বাবু জিজ্ঞেস করে,  ' 'কী দাদুর দল পছন্দ হোল আমার গেঁয়ো গল্প!'
 ' হ্যাঁ দাদু এমন ভয়ংকর গল্প হ্যারির ছিল না !'
       নিমাইবাবু ভাবতে লাগে, ছেলেগুলোর কল্পনার ডানা গুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে। সে ডানায় কল্পনার জল  ছিটিয়ে সতেজ করার প্রয়োজন এখনই । না হলে যে ওরা যন্ত্র মানব হয়ে যাবে !

No comments:

Post a Comment