Friday, December 17, 2021

বিবর্ণ ডায়েরির উজ্জ্বলতা - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৭]

বিবর্ণ ডায়েরির উজ্জ্বলতা

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


    ইংরেজি বছর শেষ হলে নয়নের বাবা নতুন বছরের ডায়েরি পেত বেশ কয়েকটা। তাকেও একটা দিত অন্যদের সঙ্গে। কিন্তু যত্ন করে রেখে দেওয়া ছাড়া সে কিছুই লিখতো না। কলেজ, পড়া, কম্পিউটার নিয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যে থাকে, লেখার সময় কোথায় ! মাঝে মাঝে তার মনে হয়, কী সব লেখে ওই ডায়েরির পাতায় ! তারও তো সময় নেই, সকালে অফিসে যায় ফেরে সেই রাত আটটায়। কখন যে লেখে কেউ জানে না। নেই তার কোন লেখার টেবিল, বইয়ের তাক বা ভালো কলম। কিন্তু পুরনো ডায়েরিগুলো সুন্দর করে সাজান, বিছানার এক পাশে। শুধু কি ওই ডায়েরি, কত পুরনো খাতা কাগজ ইত্যাদি। মা খুব বকাবকি করে, বাবা নাকি ওইগুলো রেখে, ঘর জঞ্জালের স্তূপ বানিয়েছে।

    সেই মানুষটা যখন বাথরুমে পড়ে পায়ের হাড় ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি, আমরা পড়লাম অথৈ জলে। সকলের সহযোগিতা সত্ত্বেও বাবার অভাব আগে এমন করে অনুভব করেনি সে। আর কদিন পরে ছুটি, মা বলে ওনার বিছানাটা একটু পরিষ্কার করে দিতে। ডায়েরির স্তূপে হাত দিতে হল। কী যেন কৌতূহল হল নয়নের একটা ডায়েরির পাতা উল্টে দেখতে। কতদিনের সব পুরনো, বিবর্ণ পাতা। কিন্তু সেই পাতা জুড়ে লেখার সারি। দেখে, লেখার শুরুতে, ইংরেজি তারিখের সঙ্গে বাংলা তারিখও লেখা। মাঝের ভাঁজ খুলে একটা পাতার লেখায় তার মন টানলো।  -- ' আজ ইংরেজি ২৭/ ৪/ ২০০৮ বাংলা ১৪/ ১/ ১৪১৫ , রবিবার। দিনহাটা। এখন দক্ষিণ বঙ্গে দারুণ দহন জ্বালা। উত্তর বঙ্গে এখন বসন্ত - বৈশাখ। বউ কথা কও পাখি ডাকে কোন সে গাছের আড়ালে বসে। এত চেষ্টা করে সেই পাখি দেখা পেলাম কই ! এখানে এখন এই মন খারাপ বিকেল। বসন্ত বৌরির ডাক, সবুজ পানিয়াল গাছের পাতা, আমলকী গাছের পাতার কাঁপন দেখে সময় কাটছে । আমাদের বাসার সামনে বিশাল মাঠ, চার পাশ ঘুরে রাস্তা। সব রকম গাড়ি চলে। পানিয়াল গাছ আগে দেখিনি। ছোট ছোট পাতা, কিছুটা বেলগাছের মত। আর আমলকী গাছ প্রথম দেখা। ..... রোজ কিশোর কালের স্মৃতি ভাসে। সেই সকালে স্কুল। মেঠো পথ, জাম, জামরুল, খেজুর গাছ। বড় পুকুরে স্নান, সে এক অন্য পৃথিবী । .......গতকাল নয়ন ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠলো। ওর মার সঙ্গে স্কুলে গিয়ে রেজাল্ট নিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে উত্তর পূর্ব দিক থেকে গরম বাতাস বইছে। ' ....নয়নের
বুকের ভিতর কেমন হচ্ছে। বাবা তার কৈশোর সময়কে, বৈশাখের বিকেল কেমন সুন্দর ধরে রেখেছে তার ডায়েরিতে ! কৌতূহল বশত আরো একটু সামনের পাতায় এলো।

     ' ১১/০৭/২০০৭, বুধবার। বামনহাট । আজ এক বিয়ে বাড়ির নিমন্ত্রণ। অফিসের কর্মী শচীন মজুমদারের বাড়ি। গ্রাম লাউ চাপড়া, ঠিক বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত ঘেঁষা। এখানে স্বাধীনতা পূর্বের রেলস্টেশন বামনহাট দেখলাম। বামনহাট থেকে প্রায় দু কিলোমিটার সাইকেল ভ্যানে যখন শচীনবাবুর বাড়ি পৌঁছলাম আমরা কয়েকজন তখন সন্ধ্যে ছটা । রাত্রি একটায় লগ্ন। পাত্রের বাড়ি বানেশ্বর। এখানকার আঞ্চলিক রীতিতে পর্দা, সামিয়ানা সব সাজানো। কলা গাছ দিয়ে কী সুন্দর বিয়ের জায়গা নিকোন উঠোনে। বাজন্দার বৃন্দ মাঝে মাঝে ভাওয়াইয়া ও দরিয়া গানের সুর বাজায়। বিয়ের কনে শুধু নয়, সবার মন কেমন উদাস হয়ে যায়। ..... শচীনবাবুর পাঁচ মেয়ে ও সাত ছেলের সংসার। শচীনবাবু নিপাট ভদ্রলোক। দীর্ঘদেহী, গায়ের রং কালো। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ের বিয়ের পর প্রথম মেয়ে পাত্রস্থ হচ্ছে। এখনও সাত ছেলে ও দুই মেয়ের বিয়ে বাকি। সংসারের দুর্ভোগের কথা বলে আমাকে। খুব ভালোবাসে আমার। বিয়ের জল গরম না হলে কী হবে , ফেরার তাগিদ আছে বলে আমাদের কজনের ভোজনের ব্যবস্থা হল সেই গোধূলি বেলায়। ..... শচীন কর্তার ভক্তি এবং শ্রদ্ধা যেন খাদ্য উপকরণে এসে পড়েছে। এত তৃপ্তিদায়ক খাওয়ার জোগাড় যে এই অজ গাঁয়ে করা যায় তা ভদ্রলোক দেখালেন ! ..... সন্ধ্যার আঁধারে আমরা হাঁটতে হাঁটতে বামনহাট ফিরছি ।  সঙ্গী ভুবন বাবুর বাড়ি কাছাকাছি এক গ্রামে। ওর কাছে আমার অনেক জিজ্ঞাসা। কথায় কথায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলো। ও বলে আমরা যে পথে হাঁটছি সে পথ তো সে সময় যুদ্ধক্ষেত্র। সীমান্তের এই গ্রাম তখন সেই যুদ্ধে নাকি সামিল হয়। নিজে ভুবন সেই যুদ্ধে ছিল। ওরা নাকি মাটির ট্রেঞ্চ খুঁড়ে পাক বাহিনীর মোকাবিলা করেছে। আসলে মুক্তি যোদ্ধারা এই সব সীমান্তবর্তী গ্রামে ঘাঁটি গড়ে। আর এপারের যুবকরা সাহায্যের হাত বাড়ায়, যে যার মত করে 
। তারপর বত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণের বিনিময়ে সেই ১৬ ডিসেম্বর ,১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের  উত্থান।  পৃথিবীর ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা। আর ভারতবর্ষ সেই যুদ্ধে আবেগ তাড়িত অংশ গ্রহণ করে, যে অবদান বাংলাদেশী ও পৃথিবীর মানুষ স্বীকার করে। .... আমি তখন ক্লাস এইট এর ছাত্র। সেই বয়সেও কী এক উত্তেজনা অনুভব করতাম, বেতার এর সেই জ্বালাময়ী গান, খবর আর প্রতিবেদনে। কলকাতা ও কলকাতার  মানুষ তখন তো ওই নতুন দেশের সহায় । সেই সব আগুন ঝরা দিন যেন এই সীমান্ত গ্রামের পথে, সন্ধ্যার আঁধারেও দেখা পাচ্ছি বুকের ভিতর । ' ......

     বাবার ডায়েরির বিবর্ণ পাতা কী উজ্জ্বল হয়ে উঠলো নয়নের চোখে আজ ! সে অবাক হয়ে যায় । বাবার সঙ্গে সে ও তার মা সীমান্তের গ্রামে গেছিল। কিন্তু তার বাবা যে এত সুন্দর করে ডায়েরিতে সে সব দিনের কথা, স্মৃতিকথা ধরে রেখেছে তা সে জানত না। আজ কেন যে তার বাবার জন্য মনটা বেশি বেশি উতলা হচ্ছে সে বুঝে উঠতে পারে না। বাবার এখনও বাড়িতে না ফেরা এবং ওই তার ডায়েরির লেখার পংক্তি গুলো অজান্তে তার চোখে জল এনে দেয় !  মার ডাকে সে যেন সাড়া দিতে পারে না। ....

No comments:

Post a Comment