Thursday, December 16, 2021

অক্লান্ত অবসর - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৬]

অক্লান্ত অবসর

- কুহেলী দাশগুপ্ত 


  ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে জানালার সামনে দাঁড়াই। শীতের সকালের কুয়াশা ঢেকে দিয়েছে জানালার স্বচ্ছ কাঁচ। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে আলসে ধরা শরীরকে চনমনে করে নিই। তবে নিজের হাতের বানানো চায়ে সেই আন্তরিকতা, ভালোবাসার ছোঁয়া পাই না। লহরীকে খুব মনে পড়ে। আমার প্রেম, আমার বন্ধুত্ব, ভালোবাসা সব তাকে ঘিরে আবর্তিত। আমার অর্ধাঙ্গিনী সে। ত্রিশ বছরের ঘরকন্নার প্রতিটা মুহূর্ত তার যত্ন, ছোঁয়া পেয়ে আমি পরিপূর্ণ ছিলাম। তবে, সে কি ততটাই পূর্ণতা পেয়েছিল এই সংসারে? বোধহয় না। নাহ্, কোন অভিযোগ সে কখনো করেনি। তার নীরবতার ভাষাকে কখনো বোঝার চেষ্টা করিনি। ভেবে নিয়েছিলাম, এমনটাই তো হয়! কাজ পাগল, ছন্নছাড়া আমি সারাদিন কলেজে বক্তব্য, ভাষণ দিয়ে বাড়ি ফিরে বইয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। একার হাতে দুই ছেলেকে সামলেছে। বিয়ের পর নিজের স্কুলের চাকরি ছেড়েছিল, আমার ছন্নছাড়া সংসারকে সাজিয়ে তুলতে। অসুস্থ শাশুড়ি মায়ের খিটখিটে মেজাজ, পিঠোপিঠি দুই ছেলের দায়িত্ব সামলে স্কুলের চাকরিটা বজায় রাখা ওর পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। কখনো মন খারাপ করে কিছু বলেনি তো! আমার উদাসীনতাকে অবহেলার তকমা দিয়ে কেঁদে ভাসাইনি কোনদিন। বাইরেটা কোমল হলেও, ভেতরটা হয়তো ওর ইস্পাত কঠিন ছিল। আমার মা গত হয়ে লহরীকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল। ওর তত্বাবধানে দুই ছেলে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন ইউরোপে সপরিবারে। আর একজন দিল্লী থাকে। কলেজে পড়ায়। বৌমাটি ডাক্তার। আজ আমার কানায় কানায় পরিপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে একা করে দিয়ে লহরী যে শোধ নিয়ে গেল! ছেলেদের পরিপূর্ণ করে দিয়ে, আমায় একা করে অকালে চলে গেল সে। ব্লাড ক্যান্সার। জ্বর জারিতে ভুগতো খুব। খেয়াল রাখিনি তার। চাপা, অভিমানী সে বুঝতে দেয়নি কিছু।শেষ মুহূর্তে নার্সিংহোম, ছুটোছুটি, ভালো চিকিৎসা পরিষেবাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে পালিয়ে গেল। আমি অরিন্দম মিত্র।  একাকীত্বের অবসরে আমার  চিরসাথী বইয়ের সাহচর্য আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে। শীতের দিনে গায়ে জড়িয়ে নিই সেই কাশ্মীরি শাল খানা যেটা লহরী পৌষমেলা থেকে আমার জন্য পছন্দ করে কিনেছিল। ওর স্পর্শ অনুভব করি, শাল খানা জড়িয়ে। মনে হয় যেন শুনতে পাই, শালখানা গায়ে জড়িয়ে দিয়ে লহরী আমায় বলছে,"নাও, গরম চা য়ে চুমুক দিয়ে বইয়ের সমুদ্রে ডুব দাও"।অনেক  রাত  যে ওকে অপেক্ষায় রেখে বই থেকে চোখ তুলে ভোরের সূর্য ওঠা দেখেছি।

No comments:

Post a Comment