Wednesday, December 15, 2021

বোবা বন্ধু - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৫]

বোবা বন্ধু

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


গ্রামের প্রাইমারি স্কুল। বিকেলে ছুটি হলে সব ছেলেমেয়েরা মিলে, ছু - -- টি  বলে এক অদ্ভুত চিৎকার করে। সেই কোরাস শব্দে গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে, আজকের মত ছুটি। কুন্তলের এখন ক্লাস থ্রি । পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে বই খাতার ব্যাগ নিয়ে ফিরছে। তবে সে কেন আজ গাছের দিকে তাকাচ্ছে, তা সেই জানে। বিকেলে তার কাকা, বাড়ির পাশের বাগানে গাছপালা পরিচর্যা করে।  কাকা জিজ্ঞেস করে, ' কী রে কুন্তল, গাছের দিকে কী দেখিস! ' সে বলে,' কচি পাতা দেখছি। ' কাকা, ' সে তো দেখিস রোজ, আজকে কী হল ! '  ' মাস্টার মশাই আজ ক্লাসের পড়াতে বলেছেন , কিশলয় মানে কচি পাতা। '  ' ও! তাই বুঝি সব গাছের কচি পাতা দেখে দেখে আসছিস।  ' আচ্ছা কাকা কচি পাতা কিভাবে জন্মায় ! ' 

     সন্ধেবেলা ভাইপো ভাইঝিদের পড়ায় ওদের কাকা। সব বই পড়ার শেষে কুন্তলের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে কাকা। সবাই শোনে সেই গাছ কথা মন দিয়ে। ....আমরা এই মানুষ ,আমাদের জন্ম মা থেকে। আর গাছেদের মা হল মাটি। উর্বর মাটিতে  বীজ পড়লে , মেঘের বৃষ্টি, সূর্যের আলো
আর বাতাসের সাহায্যে অঙ্কুরোদগম অর্থাৎ জন্ম হয় গাছের। এখন থেকে তার দরকার হয় ওই জল হাওয়া আলো আর খাদ্য। তবে তো বড়ো হবে গাছেরা। মানুষেরও তাই লাগে। মনে কর, তোরা কেউ আম সে খেয়ে আঁটিটি ঘরের পাশের এক জায়গায় ফেলে দিয়েছিস । কিছুদিন পরে তোরা নিশ্চয় দেখে থাকবি, সেই বীজ বা আঁটি থেকে কী সুন্দর কাঁচা সবুজ রঙের একটা নরম ছোট্ট গাছ, আঁটি ফুঁড়ে বের হয়েছে। তার মাথায় কচি দুটো পাতা। ওই তো কিশলয় । তারপর সে বেড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। ডালে পাতায় যায় ভরে। কুন্তলের জ্যাঠার ছেলে ভুতো পড়ে বড় ক্লাসে। সে বলে, ' হ্যাঁ কাকা,আমি ক বছর আগে, আম  খেয়ে তার আঁটি বাগানে ফেলে দিই , সেই গাছ বড় হয়ে গত বছর মুকুল ধরেছিল, তবে সব ঝরে গেছে। কিন্তু মুকুল ঝরে গেলে কি হবে , আমার যে কি আনন্দ হয়েছিল তা বলে বোঝাতে পারবো না। সবাই অবাক হয়ে শোনে গাছেদের কথা।

    তোরা সবাই জানিস, আমাদের মানুষের বেঁচে থাকতে লাগে খাদ্য ছাড়া অক্সিজেন । যা পাই ওই বাতাস থেকে। আবার বাতাস পায় গাছেদের কাছ থেকে । আসলে গাছ বাঁচার জন্য আমাদের দম ফেলার খারাপ গ্যাস কার্বন রাত্রে খায়।আমরা বুঝতে পারি না। এবার কুন্তল বাবু , তুমি বল,  - গাছ না থাকলে আমদের বাঁচা যাবে! সে উত্তর দেয়, ' না মোটেই না।' আমরা চলা ফেরা করতে পারি, গাছেরা পারে না। মানুষের খাদ্য জোগাড় করতে যেমন অনেক কিছু বাধা আছে, গাছেদেরও আছে। গাছের খাদ্য সংগ্রহ করতে মাটির নিচে শিকড় চালিয়ে দিতে হয়। আর মাটির নিচে থাকে , নুড়ি,পাথর, ইট ইত্যাদি। মাটির গভীরে জল পেতে ওইগুলো শিকড়ে বাধা দেয়। তবুও ওরা খুব কৌশলে  পথ পাল্টে জলের খোঁজে শিকড় নিয়ে যায়। তবে গাছ কমে গেলে কি হবে?  - কুন্তল বললো। মানুষের বাঁচার জন্য খুব অসুবিধা হবে, পরিমাণ মত অক্সিজেন পাবে না। এখনই বেশি বেশি গাছ প্রয়োজন এই পৃথিবীতে।  ' শহরে তো গাছ পালা কম, সেখানে নাকি মানুষ খুব সুখে থাকে ? ' প্রশ্ন করে বাবলু।  ' সুখে নেই বাবু, তবে গ্রাম গঞ্জের গাছ আর বনের গাছের থেকে অক্সিজেন বাতাসে ভেসে ভেসে সহরে যাচ্ছে তাই । 

    সলিল বলে , ' কাকু, গাছেদের ডাল কাটলে, পাতা ছিঁড়লে আঘাত লাগে না ,! ' - আঘাত লাগে বৈকি! ওরা তো আমাদের বোবা বন্ধু। সহ্য করে আঘাত, তবে কিছুই বলতে পারে না। তবে আমাদের বোঝা দরকর, যে ওদেরও লাগে খুব আঘাত লাগে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, গাছেদের আঘাত লাগে, ওরা নড়া চড়া করে, কিন্তু আমরা খালি চোখে দেখতে পাইনা। তোরা তো দেখেছিস , লজ্জাবতীর পাতায় হাত দিলে বা ফু দিলে তার পাতা মুড়ে যায়, বোঁটা নিচের দিকে নুয়ে পড়ে। একটু পরে আবার কেমন সে স্বাভাবিক হয়ে যায় ! লক্ষ্য করে দেখিস, রাতে তেঁতুল, শিরীষ, বাবলা, আমলকী ইত্যাদি গাছ পাতা বুজিয়ে দেয়। দিনের আলোতে আবার সব ঝলমলিয়ে ওঠে। পদ্ম ফুল দিনে পাপড়ি মেলে, রাতে গুটিয়ে নেয়। হয়তো তোরা শুনেছিস, আমাজন বৃষ্টি অরণ্যের কথা। ব্রাজিল ও তার সংলগ্ন কয়েকটি দেশের ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এই অরণ্য, বিশ্বে মানুষের ২০ শতাংশ অক্সিজেন যোগায়। কিছু দিন আগে এই অরণ্যের বিশাল অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অপূরণীয় ক্ষতি হল মানুষের । দিন দিন বিভিন্ন দেশে মানুষের হাতেও বন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনে বিপদের সংকেত। তাহলে বোঝ বাবুরা, গাছ আমাদের কী উপকার করে। আমাদের পাড়ার ওই যে বিশাল বটগাছ, যার নিচে তোমরা খেলতে যাস। ওই গাছে ফল ধরতে দেখেছ , পাকলে লাল হয়, ওর মধ্যে দানা বা বিচি ঠিক যেন  পোস্ত দানা। মানুষ কিন্তু ওই বিচি থেকে গাছ করতে পারে না প্রবীণরা বলেন । পাখি ওই ফল খায়, তাদের বিষ্ঠা বা পায়খানা থেকে ওই বিচি মাটিতে বা দেওয়ালে পড়ে আপনি গাছ জন্মে। সেই গাছ মানুষ বড় করার জন্য পুঁতে দেয় বিভিন্ন জায়গায়। এই ভাবে খুব উপকারী ওই বিশাল বৃক্ষ জন্ম।

  বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, একজন মানুষের বাঁচার জন্য দৈনিক প্রয়োজন প্রায় হাফ লিটার অক্সিজেন , আর সেই পরিমাণ জোগাতে প্রায় তিনটি গাছের দরকার। সবাই চোখ বড় বড় করে শুনছিল। কাকা বলে ,কুন্তল তুমি গা ঘেঁষে বসছ কেন, সকলের মত ছেড়ে ছেড়ে বস। জানত এখন অতিমারী কাটেনি ! আজ এই পর্যন্ত থাক। আসলে গাছ নিয়ে অনেক বলার আছে। খুব অল্প শুনলে। বড় হয়ে অনেক কিছু জানবে , পড়বে এবং দেখবে । গাছ যে মানুষ এবং পৃথিবীর কত বড় সম্পদ তা বলে বোঝানো যাবে না। এই পৃথিবীর আদি প্রাণ হল উদ্ভিদ বা গাছ। তুমি যদি একটা গাছ প্রতি বছর  ভালো মাটিতে বসাতে পারো আর তার নিয়মিত যত্ন করো জল মাটি সার দিয়ে, দেখবে সে গাছে যখন ফুলে ফলে ভরে যাবে, তখন তোমার আনন্দ ! 
      গাছ কথা শেষ হলে রান্নাঘর থেকে ডাক পড়ে ,  ' খেতে আয় সবাই। '.........

No comments:

Post a Comment