Wednesday, December 15, 2021

স্নানধারা - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৫]

স্নানধারা

- কুহেলী দাশগুপ্ত 


মাটির নিচের অন্ধকার গর্ভগৃহ ছেড়ে সে খোলসের আবরণ ভেদ করে মাথা তুলে ধরে খোলা আকাশের দিক চেয়ে। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়। তার কচি, কোমল সবুজ গায়ে সকালের নরম  রোদ এসে আদর মাখিয়ে দেয়। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর মতো আদর পেয়ে সে হাত  পা ছড়িয়ে আমোদিত হতে চায়।অবাক  চোখে পৃথিবীর চারপাশটা দ্যাখে!নড়বড়ে শরীরে বসুমাতাকে আঁকড়ে ধরে শেকড় ছড়িয়ে। সে জানে না তার আসল পরিচয়। কোন বৃক্ষ ফলের  জঠরে সে বীজ রূপে পালিত হয়েছিল,  কিভাবেই বা মা বসুধার গর্ভে সে স্থান পেয়েছিল-এসব জানার জ্ঞান তার  ছিলনা। মাটির কোলে শেকড়ের টানে খাদ্য রস পেয়ে একটু একটু করে বাড়তে থাকে সে। রবিকিরণ তার পাতার শিরায় আহার উপকরণের যোগান দেয়। ধীরে ধীরে পল্লবিত হয় কচি কিশলয়। সকাল, দুপুর, বিকেল উর্ধ্বপানে সে মেঘেদের ভেসে চলা দেখে। আকাশের সীমাহীন ব্যাপ্তি তাকে উর্ধ্ব মুখী করে। গোমরামুখো ধূসর মেঘেরা কখনো তাকে স্নানধারায় ভাসিয়ে দেয় ভারী বর্ষণে। জলধারার স্পর্শে পত্রপল্লবে টুপ্ টাপ্ ছন্দ বাজে। নীল সাদা মেঘেদের আলিঙ্গন দেখে সে লজ্জায় গুটোতে চায়। দুপুরের তপ্ত রবিকিরণ রৌদ্র স্নানের উষ্ণতা দিয়ে তাকে আমোদিত  করে। গোধূলি বেলায় অবাক বিস্ময়ে দেখে আকাশের বুকে অস্ত রবির লালিমা ছড়ানো রূপ মাধুর্য!দখিন হাওয়া ঝিরিঝিরি বয়ে, দোলা দিয়ে তার  কানে কানে বলে,"এই তো শুরু,উর্ধ্বপানে এগিয়ে চলার!ওই যে নীলাম্বরী পরিধানে শোভিতা নভঃ নীলিমা, ওর পানে যতই ধাবিত হও, শেকড়ের টানে চিরকাল থেকো মাটির কাছাকাছি"।

উত্তুরে হাওয়ার স্পর্শে সে শিহরিত হয়। শীতের রাতে শিশির ভেজা জলে সে কম্পিত হয়। আবার সকাল রোদে নেয়ে উঠে নিজেকে সাজিয়ে তোলে। পৃথিবীর বুকে পালাবদলের ঋতুরা আসে একে একে। ঝড়ঝঞ্ঝায় নুইয়ে পড়ে ও আবার মাথা তুলে ধরে আকাশ পানে। চারদিকে চেয়ে দেখে ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া দানকারী মহীরুহদের। কত পাখিদের আশ্রয় দিয়ে, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করেও তারা অবিচল থাকে! প্রকৃতির পরিবর্তনের রীতি ধারায় স্নাত হয়ে সে স্বপ্ন দেখে, এমনইভাবে কারো আশ্রয় হয়ে বেঁচে থাকার।

No comments:

Post a Comment