Tuesday, December 14, 2021

রক্তগোলাপ কাঁটা - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৪]

রক্তগোলাপ কাঁটা

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   বার্ধক্যে এসে কমলিনী পিছনের দিনের কথাগুলো ভোলে না, স্মৃতি যতই আবছা হয়ে যাক। জীবনটা মনে হয় সেদিন শুরু হল। ছোটবেলার বাপের বাড়ির স্মৃতি রোমন্থন করে নি, এমন দিন বোধহয় আসেনি । বাপের ছিল এই প্রকৃতির প্রতি, গাছপালার প্রতি এবং ফুলের বিশেষ ভালোবাসা। তার প্রিয় ফুলবাগানে আর যাই থাক বা না থাক, গোলাপ থাকবেই। দাদা ভাই বোনদের মধ্যে সেই ছিল গোলাপের ভক্ত, বাবার মত। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়, বইয়ের পাতার ভাঁজে ভাঁজে রাখতো সে লাল গোলাপের পাপড়ি খুব সুন্দর করে। বিভিন্ন রঙের মধ্যে পছন্দ ছিল লাল গোলাপ। বাবা তার কী পরিশ্রম করে যে ওই গোলাপ চারা করতো ! স্কুলের বন্ধুরা তার সেই গোলাপ গন্ধি বই নিয়ে টানাটানি করতে দেখে একদিন প্রফুল্ল বাবুর ছড়ি খেয়েছিল।  তারপর থেকে ওরা লুকিয়ে কমলিনীর গোলাপী বই দেখতো। বন্ধুদের বায়না মেটাতে কত দিন সে লুকিয়ে বাড়ি থেকে ফুল আনতো ।

     প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে হাই স্কুল। অন্য এক জগতের দোরগোড়ায়। নতুন বন্ধু, ছেলে সহপাঠী নতুন পরিবেশ। ছেলে সহপাঠীরা অনেকে যেন অন্য চোখে তাকায়। ওই তাকানো সব সময় যে খারাপ লাগতো ত নয়। দু একজনকে ভালই মনে ধরতো। টিফিনের সময় কত যে গল্পের ঝুলি খুলে যেত তার শেষ নেই। .... দেখতে দেখতে অষ্টম শ্রেণি । ওর প্রিয় বন্ধু যুথিকা একদিন মনমরা হয়ে ক্লাসে বসে। অনেক জেদাজেদি করে কমলিনী গল্প শুনে অবাক! ক্লাসের সেকেন্ড বয় সুরজিৎ নাকি যুথিকাকে লুকিয়ে লাল গোলাপ দিয়েছে। এই নাকি ভালোবাসার প্রথম পদধ্বনি! দিনে দিনে গোপন কথাটি রইলো না গোপন। 

      কলেজে ভর্তি হয়ে কমলিনী যেন খেই হারিয়ে ফেলে। সে যেন এক বিচিত্র বর্ণের জগৎ, তার কাছে। কান পেতে শোনে কত কথা, দেখে আরো বিচিত্র ছবি। সারা ক্লাসে সে যে অন্য রকম এবং মনোযোগী ছাত্রী ,সবাই জানে। কিন্তু এক দিনের ঘটনা তার জীবন ওলট পালট করে দিয়ে যায়। অন্যদের মত তারও একটা ভাল লাগার মন স্বাভাবিক ভাবে তৈরি হয়েছে। ক্লাসের সেই নিরীহ মিষ্টি ছেলেটা , যার কাছ থেকে নোট নেয়, সে যে এমন কাণ্ড করে বসবে কমলিনী ভাবেনি। .... একদিন বসন্তের বিকেলে ক্লাস শেষে দুজনে একটু আলাদা হয়ে যায়। চলতি পথে সুতনু ওর খোঁপায় একটা লাল গোলাপ গুঁজে দিয়েছিল।  অন্য এক জগতের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তখন, কমলিনীর। আর সেই ভেসে যাওয়ার দুরন্ত স্রোতে বাড়িতে এসেও মনে পড়লো না যে, তার খোঁপায় আছে প্রিয় ফুল। মা দেখলো, বাবা এবং দাদারাও। কিন্তু কেউ কিছুই বললো না। ....

    আজ এই বাষট্টি বছরের দীর্ঘ জীবনে কী পেল সে! সংসার ও স্বামী পেল বাবা মার পছন্দ অনুসারে। কিন্তু সন্তানহীনতার ' মহাপাপ ' এ ভেসে গেল সে সুখের সংসার ! ভাসতে ভাসতে শেষে শহরবাসী দাদার সংসারে সে এখন এক 'বিপদ' । কী সমারোহ করে বিবাহ অনুষ্ঠান। তার প্রিয় গোলাপের ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল বড় মোহময়ী করে। গোলাপের মালা ছিল তার মাথার চুলের খোঁপায়। সবটাই তার গোলাপ প্রীতির কারণে। সেদিন সুতনুর নিরীহ স্নিগ্ধ মুখ মনে করে সে কেঁদেছিল আড়ালে। দীর্ঘ জীবনের সমস্ত ঘটনা যেন তার মুখস্থ কবিতার হৃদয়ভাঙা পংক্তি দিয়ে সাজানো ! 

     ..... বিকেলে শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে ভাসা বারান্দায় বসে কমলিনী যখন স্মৃতি সমুদ্রের ঢেউ গুনছে, দাদার ছোট নাতি এসে ,পিছন থেকে গলা জড়িয়ে বলে, - ' দিদা বাপি ডাকে তোমার ।' চোখের জল মুছতে মুছতে কমলিনী বলে, - ' চলো দাদু ভাই !' খোঁপায় গুঁজে দেওয়া সুতনুর লাল গোলাপের কাঁটা আজ তার জীর্ণ হৃদয়ে, ফুটে ফুটে রক্ত ঝরায় ! 

No comments:

Post a Comment