Tuesday, December 14, 2021

ক্ষত - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৪]

ক্ষত

- কুহেলী দাশগুপ্ত 


টুলির হাতে পায়ে ওষুধ লাগাতে গিয়ে গোবির চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে। দাদাবাবু কি মারটাই না মারলেন ওকে! বেতের আঘাতে লাল চাকা দাগ হয়ে গেছে। বাচ্চা মেয়ে না বুঝে গাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়েছে বলে দাদাবাবু এতটা রেগে যাবে, গোবি ভাবতে পারেনি। মা মরা মেয়েটাকে সে নিজে কখনো মারধর তো দূরের কথা, উঁচু স্বরে ও বকে না। টুলির মা শালু মরে যাওয়ার পর তাদের সোনামূড়া গ্রামে গোবির মন আর টেঁকেনি। জমি জিরেত ছোট ভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে টুলিকে নিয়ে শহরমুখী হয়েছিল। এধারে ওধারে কাজ খুঁজে শেষে রায় বাড়ির বাগান পরিচর্যার কাজ পায়। রায় বাড়ির সামনের অংশে অনেকটা জায়গা জুড়ে গোলাপ বাগান। কত্তা অতীন রায়ের শখের গোলাপ বাগান। দাদাবাবু নিজে সময় পান না হাজার কাজের ভিড়ে। কিন্তু ভোর কি সন্ধে দিনের একটা সময় এসে বাগানের চারপাশটা ঘুরে দেখেন। বাড়ির বাইরে ও বাগানের পাঁচিলে বড় হরফে লেখা রয়েছে-"গাছে হাত দেয়া বারণ"। নানা রঙের, নানা জাতের গোলাপের চাষ হয় এই বাগানে। বাড়ির পেছনে একটি ঘরে বাপ বেটীর ঠাঁই হয়েছে। গোবি ভোর থেকেই বাগানের পরিচর্যায় লেগে পড়ে। দাদাবাবু গম্ভীর, মেজাজি প্রকৃতির হলেও বউ দিদি খুব আন্তরিক। রোজ দু'তিন পদ রান্না পাঠিয়ে দেন বাপ বেটীর জন্য। গোবি কাজের অবসরে ভাতটুকু ফুটিয়ে নেয়। স্কুলের দিদিমনি বউ দিদি দুপুরের পরে বাড়ি ফেরেন। সাথে থাকে গুঞ্জা মা। তাদের ছয় বছরের মেয়ে। প্রায় সমবয়সী গুঞ্জা আর টুলি বিকেলে বাগানে খেলা করে। ব্যাপারটা দাদাবাবুর হয়তো পছন্দ নয়। দেখতে পেলে কড়া স্বরে গুঞ্জাকে ডেকে নেন তিনি। আজ খেলার সময় কখন টুলি একটা গোলাপ ছিঁড়েছে গোবি লক্ষ্য করেনি। দাদাবাবু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেয়ে এমন ধমকে উঠেছিলেন, গোবি নিজেই চমকে উঠেছিল। বাগানে এসে একখানা বেতের কঞ্চি দিয়ে টুলির হাতে পায়ে বেদম প্রহার।  মেয়েটা কঁকিয়ে কেঁদে উঠেছিল। "আমার গাছে হাত দেয়া বারণ তোরা জানিস না? "গুঞ্জা কেঁদে বলেছিল,"বাপি, ও কিছু করেনি। আমি বলেছিলাম তাই"। গুঞ্জার মা শোরগোল শুনে ছুটে এসে টুলিকে নিজের কাছে টেনে নেন।" একটা শিশুকে অমন করে মারতে হয়! তোমার এমন মেজাজ কমাও। মেয়েটাও বড় হচ্ছে। এরপর তোমার কাছে ঘেঁষতে ভয় পাবে"। গোবি ছলছলে চোখে বলেছিল,"এমনটি আর হবেনা দাদাবাবু। আমি ওরে সামলি রাখবো"। অতীন কটমটে চোখে তাকিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। বউ দিদি বরফ জল, ব্যথা কমার ওষুধ এনে টুলির হাতে পায়ে লাগিয়ে দেন। গোবির বুকের ভেতরটা আনচান করে ওঠে। এই বাগানের পরিচর্যায় সে দিন রাত খাটে। মাটি তৈরি, গোবর সার ,হাড়ের গুঁড়ো এনে মেশানো, চা পাতা পঁচিয়ে সার তৈরি, জল দেয়া, ডাল ছাঁটাই, বাগান পরিষ্কার একা হাতেই সব সামলায়। দাদাবাবুর চেয়ে সে কিছু কম ভালোবাসে না এই বাগানকে। কেউ যাতে গাছে হাত না দেয়, সে খেয়াল ও রাখে। তবুও একদিনের ভুলে এমন শাস্তি হতে পারে ভাবতে ও পারেনি গোবি। টুলি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অসহায় পিতার বুকে একটা গোলাপ কাঁটা যেন বিঁধে খচখচ করছে। নাহ্! অন্নদাতার কোন ক্ষতি সে কামনা করবে না। মনে ভাবে,"মেয়েটারে আরো বেশি করি আগলাতি হবে"।

No comments:

Post a Comment