Monday, December 13, 2021

আলো মেঘের গল্প - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ৩]

আলো মেঘের গল্প

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


ঠাকুরদা ছিল গ্রামের এক নিরক্ষর চাষী। কী সুন্দর ছিল তার লাঙল চষা। যেন নরম মাটির খেতে শিরেলে শিরেলে কবিতার পংক্তি! তারপর ধানের চারা রোপণ , ..... সবুজের ঢেউ,.....গভীর রাতের মায়াবতী মেঘের ধারা বর্ষণ......গর্ভবতী ধানগাছের বিস্তীর্ণ প্রান্তর .....। এত কথা হয়তো বুঝত, নয় তো বুঝত না । অনিমেষ মাঝে মাঝে  ভাবে, তার পূর্বপুরুষদের প্রকৃতি পালিত জীবন কথা, গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে। 

     শহরতলির মেসে, যে বেকার জীবন সে বয়ে চলেছে তার থেকে উদ্ধার হবে কী না ! কিন্তু দর - মার বেড়া দেওয়া মেস ঘরের  বাইরে এসে যখন সে আকাশ পানে চায়, মনটা কেমন উদাস হয়ে যায় ! শরতের ছেঁড়া ছেঁড়া তুলোর মত, কোথাও স্তূপাকার সাদা মেঘ , দূরে শূন্যের নীলিমা। ওই সূর্যের সাত রঙ মহাজাগতিক কিরণ। ক্ষণিকের জন্য হলেও সে যেন পার্থিব জগৎকে ভুলে যায়। এই ভুলে যাওয়ার অভ্যাসটা পেয়েছিল বংশগতভাবে। ... ঠাকুরদার সঙ্গে যখন সে মাঠে যেত ,তার বয়স ছিল কৈশোরের। কৈশোরে যখন বাড়ির গরুগুলো মাঠে চরাতে যেত তখন জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস। ভিজত প্রাক বর্ষার বৃষ্টিতে, বর্ষার ঘনঘোর মেঘের ছায়াতে । মাঠে বন্ধু রাখালদের সঙ্গে খেলতে খেলতে আকাশের অদ্ভুত সব মেঘ দেখতো। আর কখন আনমনে চলে যেত , সেই মেঘের দেশে। সেথায় কখন বিশাল হাতি, নয়তো কুমির, কোনদিকে পাহাড়,পাহাড়ি পথ সবগুলোই মেঘের এবং কল্পনায়। কখনো বা দিগন্তের রামধনু। খুব দ্রুত তাদের রূপ বদল। আবার প্রাক সন্ধ্যার বর্ষালি মেঘ, পশ্চিম দিগন্তে কী এক মায়াবী জগৎ সৃষ্টি করে, তা আজও তার উত্তর তিরিশ জীবনে মনে আছে স্বপ্নের মত।

   শরতের ছেঁড়া মেঘ আরো তাকে পিছনে টেনে নিয়ে যায়। বৈশাখের তপ্ত আকাশে থাকে না মেঘের কোন চিহ্ন । সূর্যের তাপ যেন ঝলসে ঝলসে মাটিতে নামে।  অথচ বিকেলে এক চিলতে মেঘ থেকে কী দ্রুততায় আকাশ ঢেকে ধেয়ে আসে কালবৈশাখীর ঝড়। শূন্য আকাশে জলভরা মেঘের পুকুর! শীতল বাতাসের অদ্ভুত অনুভূতি। ধূলিঝড়, মেঘ গর্জন, বিদ্যুতের ঝলকানি। আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে গ্রীষ্মের সকল মালিন্য মোচন । .... মহাশূন্য সূর্যকে দায়িত্ব দেয় পৃথিবীর । সূর্য তাই আপন মনের ইচ্ছে দিয়ে ,মেঘমালার বহিরাবরণ সাজায় সারাবছর, ছয় টি ঋতুতে।  ..  গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর পর আসে বর্ষালি মেঘের সামিয়ানা পৃথিবীর আকাশে। বৃষ্টি নামে ঝরঝর সাদা ফুলের পাপড়ির মত মাটির বুকে । জীবন্ত হয় মৃতপ্রায় দূর্বাদল, ঘাস, গাছগাছালি, সমস্ত প্রকৃতি। সুখ দুঃখের গল্প লেখা থাকে মেঘের  গুরু গুরু গর্জনে। ধরণীর বুকে শস্যের ভান্ডার, খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্ন যেন সফলতায় ভরে দেয়। বিচিত্র মেঘের দল, হাসায়, কাঁদায়, ভাসায় ।

    সূর্য বোঝে বর্ষা মেঘের স্থায়িত্ব। সে বলে, যাও মেঘ ,ছুটি এখন তোমার । পরিচ্ছন্ন করে দাও আমার আকাশ উঠোন। এইবার নিমন্ত্রণ জানাব শরতের মেঘ কন্যাদের। আমার রুপোলী আলো দিয়ে ধানখেত করে দেব আলো। সার্থক হবে ওই কৃষকের শ্রম। আকাশের উঠোন হয় নিকোন । সাদা মেঘের থোকা থোকা ফুলের স্তবক আকাশ গঙ্গায় ! মন উদাসী দূর নীলিমার শূন্যতা । ধানগাছের সদ্য ফোটা শিষের প্রতিটি দানায় মাটির রস ভরে দেয় দুধ।  .. কৃষাণীর রান্নাঘরের ফুটন্ত হাঁড়ি থেকে ভেসে আসবে ভাতের সুবাস।
     .. ..  ভাবনার ডিঙ্গিতে ভাসতে ভাসতে কখন যে অনিমেষ, সাজানো দোতলা বাড়ির সামনে  এসে বাজাল কলিং বেল ! দরজা খুলে টিউশন ছাত্রের মা বলে, এসো। .....

No comments:

Post a Comment