Sunday, December 12, 2021

পোষা পাখির ছানা - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ২]

পোষা পাখির ছানা

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


ছেলেটা খুব ডানপিটে। স্কুলে যাবার পথে, কার গাছে কুল, কার গাছে আম, পেয়ারা সব দেখে। মাঝে মাঝে বই খাতার ব্যাগ ফেলে রেখে গাছে যে ওঠে না, এমন কথা বলা যায় না। হঠাৎ হঠাৎ তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি। গ্রামের স্কুলে পড়াশুনো আছে, খেলাধুলো আছে, আর মজা তো আছেই। 
   দাদাদের সহজ পাঠের সেই তিনটে শালিকের ঝগড়া, মামাদের গ্রামের কথা বলা শালিক। ওর মাথায় মধ্যে কিভাবে যে ঢুকলো! মায়ের কাছে বায়না, সে শালিক পুষবে। তার মায়ের আছে এক পাল হাঁস, মুরগি এবং ছাগল। ' দেখ বাছা, পাখি পোষ । কিন্তু শালিকের ছানা পাড়তে গিয়ে যেন হাত পা ভেঙে না যায়।'

- মা বলে। তিন ভাই এক বোনের ওই ছোট। বলে সবাই ছোট্ট, কিন্তু আসলে সে শ্রীদাম । বাবাকে দেখে একটু ভয় পেলে কী হবে ,দাদা দিদির ভালোবাসা যেমন পায়, চড় থাপ্পড় খায়, আদুরে। পাড়ার লোকের কাছে সে প্রিয়, লেখাপড়ায় মনোযোগী বলে। সবাই বলে বাবার মত অভ্যাস।
বাবা তো ছেলেবেলা গাছপালা কম চড়েনি ! তো

ছেলে গাছে উঠবেই। স্কুলে তার এখন চতুর্থ শ্রেণি । গরমের সময় শালিকের ছানা হয় সে তার বাবার কাছে জেনেছে। তাই স্কুলে যাবার পথে, দেখে কোন গাছে শালিকের বাসা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একদিন সে দেখা পেল, গায়েনদের বট গাছের ডালে শালিকের এক বাসা। সেই থেকে রোজ দেখে ছানা হল কী না শালিকের। সে জেনেছে খুব ছোট ছানা না পুষলে পোষ মানে না। স্কুলে যায়, খেলা করে ,কিন্তু মাথায় সেই শালিকের বাসা। .... একদিন সে শালিক ছানার চি চি আওয়াজ পেল। সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে, বন্ধুদের নিয়ে বট গাছের শালিক বাসা অভিযান।  সবাই প্রায় চেষ্টা করলো। শেষে ক্লাস সিক্সে পড়া ও পাড়ার নলিন, ছানাটা পাড়তে সক্ষম হল। সহজ কাজ ছিল না মোটেই। তখন মা শালিক ছিল না তাই রক্ষে। সে গেছে খাবারের খোঁজে। বাবা তার পাখি পোষা পিঁজরা হাট থেকে কিনে রেখেছে। এখন শ্রীদামের কাজ বেড়ে গেল অনেক। ছানা চোখ মেলতে পারে না এখন । তবে খিদে পেলে বড় হাঁ করে চি চি করে ডাকে। সে বাবার কাছে জেনেছে ছোট ফল আর কীট পতঙ্গ ছানার খাবার। তখন জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি, বট গাছের ফল পেকে লাল হয়ে গেছে।  গাছের নিচে পড়ে বিছিয়ে আছে। টুকরো করে ওই ফল মুখের কাছে ধরলে, কেমন হাঁ করে, তখন টুক করে গালে দিলেই হল। ছানা পাখির খাওয়া সে দেখে বেশ। পাখির বাসায় মা শালিক কিভাবে তার ছানাকে খাওয়ায় শ্রীদাম  দেখেছে। আষাঢ় মাস এলে ধানজমির মাঠে প্রচুর ঘাস। সেখানে পাওয়া যায় ছোট ছোট ধূসর রঙের ফড়িং, শালিক ছানার প্রিয় খাবার। বিকেলবেলা সে মাঠে যায় একটা খেজুর পাতার ' ছাট ' নিয়ে। সবুজ ঘাসের উপর ছাট বুলিয়ে ধরে ফড়িং। রেখে দেয় কৌটোয় ছিপি এঁটে। বাড়ি এসে সেই জ্যান্ত ফড়িঙের পা আর মুন্ডু কেটে ফেলে দিয়ে শুধু দেহটা ছানার হাঁ করা মুখে দেয়। কী মজা করে সে খায়। মন ভরে যায় শ্রীদামের ।

   কয়েক মাস পরে ছানার সারা গায়ে কচি পালক গজায়, চোখও ফুটেছে বেশ। এখন সে দাঁড়ে বসে। কেউ কাছে গেলেই চি চি করে ডাকে বার বার।  স্কুলে গেলে তার মা দেখাশুনো করে ছানা পাখির। পিঞ্জর টি এখন দড়ি বেঁধে ঝোলানো থাকে ঘরের বারান্দার চালে। ফাঁক পেলেই এসে দেখে আর অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখে। মা বলে, - ' শুধু পাখি দেখলে হবে,পড়া লেখা হবে তো! ' 

   ..... সেদিন স্কুল থেকে ফিরতে শ্রীদামের দেরি হল। মা,বাবা, দাদা দিদি কাছাকাছি কেউ নেই। বাড়িতে ঢুকে সে শুনতে পেল, পাখি খুব জোর ডাকাডাকি করছে। সে ডাকে একটা আতঙ্কের সুর। কাছে এসে দেখে সে ভয় পেয়ে গেল। একটা বিশাল ঢোঁড়া সাপ মুখ গলিয়ে ছানার লেজের দিকে কামড়ে ধরেছে। শ্রী দামের আর্ত চিৎকারে সবাই ছুটে এল। একটা লাঠি দিয়ে সাপটাকে আঘাত করতে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল, কিন্তু পাখিটাকে চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না।    ..... তার পোষা শালিকের মৃত্যু দেখে শ্রীদাম ডুকরে কেঁদে উঠলো। সকলের মন খারাপ হয়ে গেল এই করুণ দৃশ্যে। মা তাকে সান্ত্বনা দিলে কী হবে শ্রীদামের কান্না আরো দীর্ঘতর হয় ............।

No comments:

Post a Comment