Monday, December 27, 2021

মলাট ঢাকা মুক্তোখনি - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১৭]

মলাট ঢাকা মুক্তোখনি

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   লোকটা হেঁকে যাচ্ছে,  - ' পুরান কাগজ, বই, খাতা, লোহা বিককিরি আছে............ । ' আঁকা বাঁকা , সোজা গলি বেয়ে সেই আওয়াজ ভেসে আসে। এই চত্বরে সে আসে রবিবার করে। অন্য অনেকে আসলেও ওই নীলরতন বাবুর পুরান সব কাগজ ইত্যাদি নিয়ে যায়। কিন্তু  সকলের মত  তার ওই পাঁচশ গ্রামের বাটখারা তাঁর কোন কালে পছন্দ হয় না। এক কেজি, দু কেজি নয় ওই পাঁচশ ,আর পাল্লার দশাও সেইরকম। সেই ছোটবেলা থেকে  দেখে আসছে এই ব্যাপারটা । কিন্তু রহস্যটা ভাঙা যায়নি। 
    শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহের রবিবার সে এলো। বৃষ্টির দেখা নেই, খটখটে আকাশ।গেটের সামনে ঝুড়ি নামিয়ে সে ডাক দেয়,  - ' বাবু কাগজ  হবে । '  ' দাঁড়াও , আসছি । ' কিছুক্ষণ পর , কেজি চারেক পুরান খবরের কাগজ নিয়ে ভদ্রলোক হাজির।  কাগজ ওয়ালা কাগজ মাপে, সেই ফাঁকে  নীলরতন বাবুর নজর গেল ঝুড়ির দিকে । আজও অনেক গুলো পুরান বই সে কিনেছে। ' তোমার বইগুলো একটু দেখব বাপু ।'

  ' হ্যাঁ হ্যাঁ দেখ না। '  বইগুলো পুরান হলে কী, খুব দুষ্প্রাপ্য, তা নীলরতন বাবু বুঝে গেছে। বেছে বেছে পাঁচটা বই হাতে নিয়ে বলে, এই গুলো আমি নিলে তোমার আপত্তি আছে কি ! কাগজ ওয়ালা বলে, না বাবু এত পুরান বই বিক্রি হবে কী না জানি না। আপনার পছন্দ হলে নেবেন। মনে মনে নীলরতন বাবু ভাবে, এই অমূল্য বই গুলো বেচে দিল কে, সহজে এ বই আজ মেলে না।ক্ষণিকের দৃষ্টিতে গবেষক মানুষ মূল্যবান গ্রন্থ , চিনতে কষ্ট হয় না। 
    ' তুমি কত দামে এইগুলো কিনেছ বাপু । ' ' ওই সবগুলোর ওজন হয় আট কেজি, চার টাকা করে মোট  বত্রিশ টাকা। আমি দিলাম তিরিশ । ভদ্রলোক বলে, জঞ্জাল মুক্ত হলাম ভাই। '  - সে উত্তর দেয়। নীলরতন বাবু বলেন ,  - ' আমি দেব ওই পাঁচটা বইয়ে একশ টাকা । দাও আমায়। ' কাগজ ওয়ালা অবাক হয় । ভাবে এত দাম তো হয়না, বড় জোর পঞ্চাশ টাকা।  ' তোমার তো লোকসান ।' - সে বলে। নীলরতন বাবু হাসতে হাসতে বলে, সে হোক । হাত বাড়িয়ে বইগুলো দেয় । ' আমরা বাবু মুখ্যু মানুষ, চোখ থাকলেও অন্ধ ,ওর মধ্যি কী আছে সে তো জানি না। ' তা তোমার ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় তো। '  ' বড় ছেলে আর ছোট টা যায় , তো স্কুল  বন্ধ এখন , কী নাকি অসুখ ছড়াচ্ছে। সবাই মুখোশ পরে ঘোরে।
আমিও তাই। ' ' তোমার নামটা কি গো ! ' সে উত্তর দেয়,। ' যোগেন, যোগেন হালদার। ' 

      যোগেন চলে গেলে, বইগুলো খুলে দেখে নীলরতন বাবু। পুরান হলে কি, ভিতরের পাতা ,ছবি ভালো আছে। আগেকার দিনের বইতো। উত্তর ষাটের নীলরতন বাবু abthropology-র ওপর লেখালেখি করেন । বইগুলো পেয়ে যেন হাতে চাঁদ পেলেন। সব বইগুলো নাড়া চাড়া করে তাই মনে হল। বইগুলো পেয়ে খুশি হলেও কেমন যেন মনমরা হয়ে গেলেন। কী হবে কষ্ট করে তার এই লেখালেখি ! আবার কিছুক্ষণ পরে মনে হোল, যোগেন আর ওই পুরান বই ওজন দরে বিক্রি করার লোক চিরদিন ছিল , আর থাকবে হয়তো। কিন্তু নীলরতন বাবুদের কাজ করে যেতে হবে । হয়তো বা গবেষণালব্ধ বই তার, কেউ দেখবে না, এই ডিজিটাল যুগে। হয়তো থাকবে তোলা সুন্দর আলমিরাতে। এই রকম হাজার হাজার বই আছে , আমরা সেসবের পাতা উল্টে দেখি না। 
কত মানুষের দীর্ঘদিনের গবেষণা, মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম ওই সব মূল্যবান গ্রন্থের পাতায় পাতায়। যার দৌলতে মানুষ আর সভ্যতা এগিয়ে চলে।

জ্ঞান আর তথ্যের মনিমুক্তো দিয়ে সাজান অমূল্য রতন আমাদের হাতের নাগালে। শুধু মন আর মানসিকতার গোড়ায় একটু জল সিঞ্চন হোক। পুরান হোক আর নতুন, বই হল মানুষ আর সভ্যতার অগ্রগতির হাতিয়ার, একথা ভুলে না যাই। 
     ভাবনার ফাঁকে, অনেকক্ষণ ধরে যোগেন হালদারের মুখটা ,নীলরতন বাবুর মনের মধ্যে ভাসছিল। তারপর সেই পুরান বইগুলো ভালো কাগজ দিয়ে মলাট করতে থাকে। ওদিকে মেয়ে ডাকছে,  - ' বাবা চানের সময় পেরিয়ে গেল ! '

No comments:

Post a Comment