Saturday, December 25, 2021

অশ্রু নদী - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১৬]

অশ্রু নদী

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


   ' সব সময় বলতাম, এমন একটা হোটেল দেখ, যেখান থেকে নদী আর বন দেখা যায় । তোর ছিল পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা। অনেক চেষ্টা করে উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যাওয়া হল। উত্তরের পর্যটন দক্ষিণের মানুষের যেন এক স্বাভাবিক টান। তোর বয়স তখন দশ হবে। হয়তো তোর কিছু স্মৃতি মনে আছে। 'মার কথায় সুকান্তির মনে পড়ে সেই আবছা দিনের স্মৃতি। বিশেষ করে খয়ের বাড়ির সেই ছোট ছোট কটেজ গুলোর কথা। যার সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট নদী । নামটা মনে পড়ে না। দুপুরবেলা সে নদীর ধারে নুড়ি পাথর নিয়ে খেলত। বাবা বলত , দেখিস হাত পা যেন না কাটে ! স্বচ্ছ জলে মা নামতে দিত না। কোথায় ঠান্ডা লেগে যায় , এই ঠান্ডার দেশে ! জ্যোৎস্না রাতে বাবা বসে থাকতো একটা পাথরের উপর। মা বকাবকি করতো, তারপর সে ঘুমিয়ে পড়লে কখন আসতো। এসে খাতা নিয়ে লিখতে বসতো ,মার কাছে সে শুনেছে।

     কলেজে পড়া সুকান্তি তার মায়ের সঙ্গে অনেক দিন পর বেড়াতে এসেছে, সেই উত্তরবঙ্গে । পুরনো অভ্যাস বজায় রেখে। হোটেল পেয়েছে নদীর কাছে। পাহাড়ি নদী, মেচির তীরে। বেশি ভিড় পছন্দ করেনা ওরা। তাই একটু অফ সিজন বেছে নেয়। ঠিক শীতের শেষ পর্বে । এইসব জায়গায় বেড়াতে এলে পুরনো বেড়ানোর দিনগুলোর কথা জীবন্ত হয়ে ওঠে। 

সুকান্তির জন্মের আগে ওরা একবার বেড়াতে এসেছিল। তখন সঙ্গে ছিল সুরমার দাদা, বৌদি আর ওদের পাঁচ বছরের ছেলে। সুকান্তির মা সুরমার বিয়ের প্রথম বছরের শেষের দিকে ছিল এই ভ্রমণ। রোমান্সে ভরা। দাদা বৌদির দেখে লজ্জা করতো খুব। তবুও পাথুরে নদীর তীর ধরে জ্যোৎস্না রাতে কিছুক্ষণ দুজনে হাত ধরাধরি করে ঘুরে আসতো। তখন ওপারে চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া বন। চিক চিক করে বয়ে চলা নদীর জল। নুড়ি আর জলের এক জলতরঙ্গ। যেন এক মায়াবী স্বপ্নের দেশে ওরা হাঁটে। ফিরে এলে সুরমার দাদার আদুরে বকুনি। ওরা তো ছেলের বায়না সামলাতে ব্যস্ত থাকে সারাদিন। সুরমার বৌদি তো খুব হিংসে করে , ননদ ননদাইয়ের নির্জন রোমান্স কথা ভেবে। ওর বাবা ছিল অন্য জগতের মানুষ। সে তো প্রকৃতির প্রেমে আপ্লুত। স্ত্রী সঙ্গী হলেও নিজেকে কেমন করে নদী, বন, আর পাহাড়ি নির্জনতার সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারতো ! দু তিন দিন এই নির্জনতার সঙ্গী হলে, কত আনন্দ আর  লেখার উপাদান পেয়ে যেত সেই জানে।

      বাবার অকালে চলে যাওয়ার পর, এই প্রথম মাকে নিয়ে আসা। বড় মামা মামীমাকে আসার জন্য বলেছিল, কিন্তু তাদের ব্যস্ততার কারণে হয়নি। কলেজের ছুটি বেশি দিনও নেই। তাই এই শর্ট টুর, বিশেষত মায়ের মানসিক প্রশান্তির জন্য। কিন্তু এখানে এসে হল তার উল্টো। ওই পাহাড়ি নদীর কল কল বয়ে যাওয়া, নুড়ি পাথর আর বালির আস্তরণ ধরে, নদীর ওপারে সেই বন, মাকে যেন কোন উদাস পুরে নিয়ে যায়।  প্রাত্যহিক কোলাহল, শহরতলির একঘেয়ে জীবন থেকে, দূরের এই নির্জনতায় একটু ক্লান্তি ও অবসন্নতা মুছে ফেলা ছিল মূল উদ্দেশ্য। তো মাকে নিয়ে সে অন্য বিপদে পড়ে।

      দুপুরে হালকা শীতের মোড়কে কিছু দূরে একটা পাথরের উপর মা বসে রোদ পোহাচ্ছে। সে প্যান্ট গুটিয়ে নদীর মাঝ বরাবর যায়। খাড়াই অঞ্চল থেকে জল নামে দক্ষিণের দিকে।  সে জলের শব্দ একরকম, আর ঝর্নার শব্দ অন্য ছন্দের। কী এক স্বচ্ছ জলের ছল ছলানি । মনে হয় আঁজলা ভরে পান করি ! এখন এই ছন্দিত শব্দ করে অগভীর স্রোতে বয়ে চলা ! তবে বর্ষায় এ নদীর রূপ প্রলয়ঙ্করী । ভারী বৃষ্টিতে এ নদীর দামাল রূপের কথা সবার জানা। সব কিছু খড় কুটির মত ভেসে যায়। কত প্রাণ যে সে নেয় ! এই এখনকার শান্ত নদী দেখে কিন্তু সে সব মনে আসে না।

     যাই হোক না কেন এই নদী আমাদের লাইফ লাইন। সকাল, দুপুর আর রাত এই তিন সময়ের নদীর রূপ দেখে চলে মায় পোয়। কেন যে এই নদী বন আর পাহাড় ওদের ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ তা ওরা হয়তো নিজেরাই জানে না।  তা কিন্তু নয় ! মা বলে , ' এই  পাহাড়ি নদী, বন আর নির্জনতা তোর বাবা খুব পছন্দ করত, ওকে পেতে যেন বার বার এখানে আসতে ইচ্ছে করে। আর মনে হয় খুঁজে পাই সেই  হারানো সময় ! ' সুকান্তি দেখে তার মার চোখে জল। সেও নিজের চোখের জল আটকাতে পারে না !

No comments:

Post a Comment