Saturday, December 25, 2021

করুণাধারা - কুহেলী দাশগুপ্ত [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১৫]

করুণাধারা

- কুহেলী দাশগুপ্ত


তিন বছর  হয়ে গেল ম্যালভিন সাথে নেই। তিনটে ক্রিসমাস পার করে প্রৌঢ়া ন্যাটি(নাতাশা)তার  সারা জীবনের সাথীকে ছাড়া। ম্যালভিনের আদরের  দেয়া নাম ছিল  ন্যাটি। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটক। চেষ্টা করার সময় ও দেয়নি। নিঃসন্তান এই দম্পতির জীবনে আনন্দের কমতি ছিলনা। ঘর সাজানো, ঘুরে বেড়ানো, রকমারি রান্নার চেষ্টা-সব নিয়ে মন খারাপের  সুযোগ  পেতোনা তারা। খুব আমুদে ছিল  ম্যালভিন।  ওকে ছাড়া ন্যাটি ব্যস্ততার মাঝে ভুলে থাকার  চেষ্টা করে। ক্রিসমাস এলে বড় বেশি মনে পড়ে তার কথা। খুব যত্ন  নিয়ে তারা ক্রিসমাস ট্রি সাজাতো। অনেক রকম মজার গিফট কিনতো। কাছাকাছি বস্তির  গরীব বাচ্চাদের ডেকে এনে পেট ভরে খাওয়াতো,উপহার দিতো। ন্যাটি কয়েক রকম কেক বানাতো। বাচ্চাগুলোর সাথে সারাদিন  হাসি ,মজা,গান গেয়ে কাটিয়ে ওদের মন ভরে যেত। ন্যাটির বাগান করার শখ তাকে আরো কিছু ব্যস্ত রাখে। নানা জাতের ফুলের গাছ  লাগিয়েছে সে।

            ম্যালভিন চলে যাওয়ার পর  একতলার ঘরগুলি  ভাড়া দিয়েছে ন্যাটি। দোতলা বাড়ির পুরোটা তার  একার পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব নয়। ভাড়াটে পরিবার টি ততটা সঙ্গতি সম্পন্ন নয়। ভদ্রলোক অসুস্থ।  সাথে মিসেস আর দুই বাচ্চা। মার্থা আর মিকি। মার্থা বড়, মিকি ছোট। বড়টি মেয়ে ,ছেলে ছোট। ভদ্রমহিলা প্রচুর  অর্ডারি সেলাই করে সংসার  চালান।  প্রায়ই  ঠিক সময়ে বাড়ি ভাড়া দিতে পারেনা। ন্যাটি বুঝতে পারে সব, তাও তাগাদা দিতে হয়। ওকে ও বাকি জীবনের কথা ভাবতে হয়। বাচ্চা দুটি ভারী  দুষ্টু। বাগানের  আশেপাশে এটা ,ওটা ফেলে নোংরা করে। গাছের  ফুল ছেঁড়ে। ন্যাটি বিরক্ত  হয়ে যায়। ওদের  মা ফ্লোরাকে অভিযোগ জানায়,"বাচ্চাদের সামলে রাখতে পারনা? আমি নিজে সারাদিন খেটে বাগানের কাজ করি। এভাবে ওরা নষ্ট করলে, তোমরা অন্য বাড়ি খুঁজতে পার।"।

---"সরি ম্যাম। আর হবে না আমি ওদের  সাবধান করব"।ফ্লোরা বলে।

 ক্রিসমাসের আগের দিন বিকেলে বাগানে কাজ করার  সময় ন্যাটি ভাড়াটে পরিবারের কথপোকথন শুনতে পায়।

--"মম, এবার  কোন গিফট কিনলে না? মিকি শুধোয়।
-"হ্যাঁ মম, আমাদের  ক্রিসমাস ট্রি ও আনা হয়নি। এবার  কি সান্তা দাদু আমাদের  বাড়ি আসবে না? " মার্থা বলে।
বাচ্চাদের  বোঝানোর  চেষ্টা করে ফ্লোরা। কিন্তু সে জানে, পেমেন্ট  সব আটকে আছে, হাতে একদম টাকা নেই।  তবুও  বলে,"আজ রাতেই  সান্তা দাদু তোমাদের  জন্য  গিফট  আনবে। মন খারাপ কোর না"।

    মন খারাপ হয়ে যায় ন্যাটির।  ম্যালভিন  চলে যাওয়ার  পর  থেকে বস্তির বাচ্চাদের  আর সে বাড়িতে ডাকে না। কেক বানিয়ে ওদের  বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে। সন্ধ্যের দিকে  মার্কেট গেল ন্যাটি। বেশ কিছু কেনাকাটা করে রাতের  দিকে বাড়ি ফিরল।

       সকালে মার্থা মিকির আনন্দ  আর ধরে না। তাদের  দরজার  সামনে কত গিফট!প্যাকিং করা কেক  আর  সাজানো ক্রিসমাস ট্রি। সান্তা দাদু তাদের  অ্যাত্ত  কিছু দিয়েছে! তারা ভাবতে পারেনি। শুধু ফ্লোরা জানে , এসব ন্যাটি ম্যাম এর কাজ। গতকাল  রাত  ন্যাটি মার্কেটিং করে ফেরার সময় ফ্লোরা জানালা দিয়ে দেখতে পেয়েছিল। মনে মনে লজ্জিত হয় সে। এমাসে বাড়ি ভাড়া এখনো বাকি।

         ওপরে ম্যালভিনের  ছবির  সামনে দাঁড়িয়ে ন্যাটি বলছে," মেরী ক্রিসমাস  ডিয়ার। তুমি বাচ্চাদের  কষ্ট  সইতে পারতে না। আমি আজো তোমার কষ্ট  অনুভব করি। বাচ্চাগুলোর আনন্দের  মাঝে তোমার অস্তিত্ব  খুঁজে পাই।  এভাবেই  বাকি জীবন  তোমায় খুঁজে যাব"।

  অশ্রুসজল চোখের  জলধারা গড়িয়ে নেমে চিবুকের কাছে জড়ো হয়ে পড়ে টপ্ টপ্ করে ।

No comments:

Post a Comment