Saturday, December 11, 2021

গতির প্রতীক - কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা [ছবি দেখে লেখা - পর্ব ১]

গতির প্রতীক

- কৃষ্ণকিশোর মিদ্যা


গ্রাম থেকে রাজধানী শহরে কাজে আসতে বাবার খুব কষ্ট হত। স্বপ্ন দেখতো রেললাইনের ধারে একটা আস্তানার। মাঝে মাঝে বলতো, - 'একটা ফাঁকা জায়গার স্টেশন, যেখানে নেমে পায়ে হেঁটে আমাদের বাড়ি যাওয়া যাবে ! এমনি জায়গায় একটা বাড়ি করবো দেখিস!  ...কথাগুলো খুব মনে পড়ে শতদলের। আর বাবা যে তার স্বপ্নের খুব কাছে এসেছিল, তা ভাবলে সে খুব উদাস হয়ে যায়। খুব বেশিদিন মানুষটা তার স্বপ্নের বাড়িতে থাকতে পারেনি । ওদের মা, দুই ভাই আর বোন কে রেখে প্রায় অকালে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা খুব জ্বালাময়ী। তবু তো জীবন গতিময় ওই দূরান্তের রেললাইনের দুই সমান্তরাল লাইন বেয়ে চলে যাবার মত !

    শতদলের তখন ক্লাস নাইন। শহরতলির স্কুলে একাই যেত। মা নিয়ে যেত ছোট ভাই আর বোন কে অন্য স্কুলে। বাবা ভুবনমোহন সেই ভোরে উঠে কাছের স্টেশনে, সেখান থেকে রেললাইন ঘেঁষা পথ ধরে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে, বাজার করে বাড়ি ফিরত। তারপর দ্রুত চান খাওয়া সেরে প্রায় দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরত। অফিসের তাড়া। কাল ট্রেনের প্রচন্ড ভিড় । ভয় পেত ওঠা নামা করার সময় ঠেলাঠেলিতে। গ্রাম ছেড়ে চলে আসার পর বছর দুই এমনি চললো। স্টেশন কাছাকাছি থাকার একটা সুবিধা, ঘন ঘন ট্রেন পাওয়া যায় । মাঝে মাঝে বলতো, - 'গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না। কত কাজ যে থাকে ওই অফিসে ! ' ... আসলে ফাঁকিবাজি ছিল না তার ধাতে। তাই তার যন্ত্রণা সোজা পথে হাঁটার।

     ছুটির দিন খুব দুপুরে বেরিয়ে পড়ত ভাত খেয়ে । জিজ্ঞেস করলে মাকে বলতো, -' কোথায় আর যাবো, ওই স্টেশনে বসে থাকি। বন্ধু শম্ভু এলে ,সোজা রেল লাইনের পাশ দিয়ে হাঁটা।' মা বলে, - 'তোমার আর কাজ নেই ,শুধু রেললাইন ঘেঁষে হাঁটা !' 'ইচ্ছে করে ওই লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে যাই, কিন্তু সে তো হয় না, কখন ট্রেন এসে পড়ে। কী সুন্দর দু পাশের প্রকৃতি। দু চোখ জুড়িয়ে যায়। একটা নির্জনতার শব্দ শোনার ইচ্ছে হয়। এই পথে অনেকটা সাধ মেটে ।' মা বলতো ,- ' তোমার কথা বাবা আমার মাথায় ঢোকে না ।' ..... শতদল কিন্তু বাবাকে অনেকটা বুঝতে পারতো। তার গতিময় কষ্টকর জীবনে, একটা উদাসী পথের দিকে মন ছিল। তাই বুঝি রেলের ওই সমান্তরাল লাইন দুটো ডেকে নিয়ে গেল ,কোন এক উদাস নগরীতে !   
    সেদিন ছিল ট্রেনের খুব গণ্ডগোল, অগ্রহায়ণ মাসের প্রচণ্ড কুয়াশার কারণে। অথচ বাবাকে যেতে হবে অফিস ঠিক সময়ে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার।  কয়েক ঘণ্টা পর একটা ট্রেন রাজধানীর দিকে যাওয়ার জন্য আসতেই স্টেশনে জনজোয়ার। কোনমতে পা রাখতে পারলেও হাতটা কোথাও শক্ত করে ধরতে পারেনি । ভিড়ের স্রোতের মুখে ভিতরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা নিষ্ফল হল ট্রেন ছাড়ার মিনিট দুই পর। .... গতিশীল ট্রেন থেকে একটা মানুষ পড়ে গেলে জনতার কিছু যায় আসে না আজকের দিনে । ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা প্রাণ কোথায় হারিয়ে গেল! বাবার স্বপ্ন দেখার শুরু এভাবেই শেষ হল । ...…

   শতদল অনেক রাতে ওদের বাড়ির কাছে সেই স্টেশন এসে দাঁড়ায়। আনমনে ভাবে,  - ' বাবা  ওই দূরের গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে  দূরে ---- চলে যাওয়া রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে এখনি হয়তো প্ল্যাটফর্মে পা রাখবে । ' .......

No comments:

Post a Comment