Thursday, December 16, 2021

বাপীর স্মৃতির ডায়েরি - অতনু দাশ গুপ্ত [বিজয় দিবস - শব্দদ্বীপের বাংলাদেশ সংখ্যা]

বাপীর স্মৃতির ডায়েরি

- অতনু দাশ গুপ্ত


তখন স্থানীয় গল্পের পত্রিকা মারফতে জানতে পারি ওরা  মুক্তিযুদ্ধের শোনা গল্প ছাপাতে আগ্রহী। চট করেই মাথায় খেলে যায় বাপির (বাবা) শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়ার কথা! যেমন ভাবা, তেমন কাজ। বাপিকে জিজ্ঞেস করতেই যতদূর স্মৃতিতে আছে, বলতে লাগলেন। 

ঘটনার সূত্রপাত এমন ছিল যে যখন পাক বাহিনীরা গ্রামের দিকে ধ্বংসের তান্ডব চালাতে চালাতে এগিয়ে আসছিলো, পুরো গ্রামের মানুষজন যেদিকে দুচোখ যায়, পালাতে লাগলো। সঠিক দিনক্ষণ বাপির মনে নেই।

আমার বাপি, বয়সে ছোট্ট  কাকুরা, ঠাকুরদা, ঠাকুমা আর তল্পিতল্পা যা গুছিয়ে নেওয়া যায়। দুটো তোরঙ্গের মধ্যে কাপড়চোপড়, থালা-বাসন, পুজোর কোষা-কুষি, ঘটি, শালগ্রাম। ঠাকুরদা, ঠাকুমা দুটো আলাদা পুটলিতে অল্প সোনা-দানা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেন আর বাপিকেও রুমালে বেঁধে দিলেন এই ভেবে যদি পথে সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আঙ্গিনার এক কোণে পড়ে রয়েছে লাঙ্গল, দাদু নিত্যদিনের সঙ্গী ওই লাঙ্গলকে ছেড়ে যেতে বিন্দুমাত্রও ইচ্ছুক ছিলেন না। মূল ভিটে থেকে বেশ অনেকটা দূরে সরিয়ে এক গাদা খড়, নারিকেল গাছের ডাল এসব দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। হয়তো নিজেও জানতেন পরবর্তীতে এসে এসবের কোন চিহ্নও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। মূল মাটির ভিটেটি দেখে কিছুক্ষণ নিভৃতে অশ্রুমোচন করলেন। আজন্ম শৈশব, কৈশোর আর যৌবন  কাটানো পূর্বপুরুষের স্মৃতি বিজড়িত ঠাকুরদার এ বাড়িকে চিরবিদায় বলতে বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে হয়েছিল কি? 

যাত্রাপথ চরম সংকটপূর্ণ, দূরদূরান্তের পথ। কিন্তু এগিয়ে না যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বাবার বয়স তখন আনুমানিক দশ বা বার হবে। আর কাকাদের বয়স পাঁচ কিংবা ছয়। বাপিদের দুর্গম যাত্রাপথের শুরুটা হয়েছিল সুলতানপুর হয়ে প্রথমে নাজিরহাট। এরপর মানিকছড়ির পথে রামগড় হয়ে গহিন বনের রাস্তা ধরে ত্রিপুরা, সাবরুম। সাবরুমের পূর্ব হরিণায় শরণার্থী ক্যাম্প।

 পুরো ঘটনা বাপির স্মৃতিতে যতটুকু আছে, বলে গেলেন।  অনেক জায়গায় মনে করতে না পারলেও অনেক বিষয়ে বেশ স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করার মত। ত্রিপুরায় পৌঁছে সবাই এক রাজার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাজা সবাইকে যতটুকু পেরেছেন দান করেছেন।  এসব যখন বলছিলেন তখন মনে হচ্ছিল বাপির চোখের সামনে সবকিছু স্পষ্ট দৃশ্যমান। কিন্তু এতটাও পথের বা রাস্তার দিক নির্দেশনা দেওয়া ওনার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাপির কথা মনে রেখে গুগল ম্যাপ থেকে খুঁজে বের করলাম ঠিক কোন পথে ওনারা সুলতানপুর হয়ে হরিণা ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছেন। বলা যায় এক কথায় বেশ কঠিন, গহীন বনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল সবাইকে। কাজেই রাস্তা শ্বাপদসংকুল ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপর তখনকার মানুষেরা যাত্রাপথে কিভাবে রাত কাটাতেন, কি খেতেন, কিভাবে বাচ্চা কাচ্চাদের সামাল দিতেন এসবের বিস্তারিত ইতিহাস জানা প্রয়োজন ছিল। গল্পের কাহিনীকে ফুটিয়ে তুলতে যতটা পারা যায় তখনকার বাস্তব ঘটনা জানা প্রয়োজন ছিল খুব। 

বইয়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম জাতীয় গ্রন্থাগারের মুক্তিযুদ্ধ বিভাগে। ওখানে গিয়ে দেখলাম, এক জাদরেল মহিলা বসে রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের দেখভালের জন্য। আমি হন্যে হয়ে শরণার্থী বিষয়ক বই খুঁজতে লাগলাম। প্রথমে উনাকে জিজ্ঞেস করাতে হয়তো আমাকে অনুসরণ করছিলেন, কিছুক্ষণ পর যখন আমার অবস্থা প্রায় বেহাল তখন উনি এসে আমাকে সঠিক জায়গা দেখিয়ে দিলেন। এরপর বেশ কিছু বই সংগ্রহ করে পড়তে লাগলাম। পড়াশোনা চলতে লাগলো পরের সপ্তাহ পর্যন্ত। বেশ কয়েকটা বইয়ের দরকার ছিল। সমস্যা হচ্ছে বাসায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। তাই ফটোকপি করতে হয়েছিল অনেক! তবে সবকিছু জোগাড় করে মূল গল্প লেখা অত সহজ হবে না, জানতাম। যা জোগাড় করেছিলাম, সব নিয়ে মূল অভিযানের কথা লিখে ফেললাম। 


এরপরের স্মৃতিকথা অতটা স্পষ্ট মনে না থাকলেও  বাপী যা বলেছিলেন তা লিখার চেষ্টা করবো- হরিণা ক্যাম্পে থাকলেও ওখানে আয়ের কোন ব্যবস্থা না থাকায় বেশ কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছিল ঠাকুমা, দাদু আর বয়সে ছোট্ট কাকুদেরও।ওখানে পৌঁছে এক জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো বাপীদের। সবার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেরটা নিজেদের বুঝে নিতে হতো। জামাকাপড় বলতে পুটলিতে করে আনা সম্বল।  

 সবার মত প্রতিদিন নিয়ম করে রেশনের খাবার সংগ্রহ করতে হতো, যাদের জামা কাপড় একেবারেই নেই, তাদেরও সাহায্য করা হতো মাঝেমধ্যে। ক্যাম্পের বাইরে শহরে যেতেন কাজের খোঁজে। তবে পরবর্তীতে ক্যাম্প থেকে স্থানান্তরিত হয়ে শহরে ঠাকুরদার এক আত্মীয়ের ঘরে ঠাঁই হয় বাপিদের। 

 দশ-বার বছরের বাপী তখন শহরের পথে পথে  অনেক ঘোরাঘুরির পর পান-সিগারেট বিক্রির কাজ পেলেন। পথের রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করে যা পেতেন তা দিয়ে পকেট খরচ চলতো । এভাবে বিক্রি করার এক পর্যায়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেন। একদিন এক ভদ্রলোককে পান বিড়ি বুঝিয়ে দিয়ে যে ছোট ছোট কাগজের টুকরোতে মুড়িয়ে পান বিক্রি করতেন ওরকম একটা ইংরেজি খবরের কাগজের টুকরো পড়তে লাগলেন। পাশে দাঁড়ানো ওই ভদ্রলোক ব্যাপারটা দেখে বেশ আশ্চর্য হলেন! উনি বাপিকে জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে পান-সিগারেট বিক্রি করেও ইংরেজি খবরের কাগজ পড়ছেন?? তখন যুদ্ধে বিধ্বস্ত গ্রাম আর এখানে শরণার্থী হয়ে আসার পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ভদ্রলোক পুরো ঘটনা শুনে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি বেশ অদ্ভুত এক প্রস্তাব  দিলেন। উনার দুই সুপুত্রকে পড়ানোর দায়িত্ব নিতে বললেন যতদিন বাপি এখানে আছেন ততদিন। পুটু আর টুকু - পুটু পড়ে ক্লাস ফোরে আর পুটু টুতে। বাপি সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলেন। পান-সিগারেট বিক্রি করে যা হাতে আসতো ওদের পড়িয়ে এর চেয়ে ঢের বেশি রোজগার হবে। হয়তো নিজের পকেট খরচ মিটিয়ে ঠাকুমার হাতেও কিছুটা দিতে পারবেন। কয়েকদিনের মধ্যেই পড়ানো শুরু হলো ভদ্রলোকের দুই ছেলেকে। প্রতিদিন নিয়ম করে বাপি চলে যেতেন ওদের পড়াতে। এভাবে চলতে লাগলো দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত। মুশকিল হচ্ছে,যে দয়ার্দ্র ভদ্রলোক এমন সুযোগ করে দিয়েছিলেন তার নাম মনে করতে পারেননি বাপি। নিজের ছাত্রদের নাম মনে থাকলেও মালিকের নাম আর স্মৃতিতে নেই!

পুরো ঘটনা হুবহু না লিখলেও যতটা পারা যায় বাপির স্মৃতি থেকে লেখার চেষ্টা করেছিলাম। তবে কতটা পেরেছিলাম জানি না! ওই গল্পের নাম দিয়েছিলাম, "দূর্গমপথের শরণার্থীরা"। ওই বছরের মুক্তিযুদ্ধ সংখ্যায় নির্বাচিত হয়ে ছাপা হয়েছিল ওই গল্প আর ঘরে একটা সৌজন্য সংখ্যাও পাঠানো হয়েছিল যেটা মাঝেসাঝে উলটিয়ে দেখি এখনও। আসার সময় আমার প্রবাসের সঙ্গী হয়েছে ওই সৌজন্য সংখ্যা। এখানকার সহপাঠীদের দেখিয়েছিলাম। ওরা বাংলা না পড়তে পারলেও বেশ প্রশংসা করেছিল।

বাপিকে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেও বহুদিনের আগের কথা হওয়ায় সবকিছু মিলিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। যতটুকু জানা সম্ভব হয়েছে, গুছিয়ে লেখার প্রয়াস ছিল।

No comments:

Post a Comment