Tuesday, December 7, 2021

নারীর সুনির্দিষ্ট আশ্রয় কোথায়?? - রূপশঙ্কর আচার্য্য

নারীর সুনির্দিষ্ট আশ্রয় কোথায়??

- রূপশঙ্কর আচার্য্য


পিতা মাতার খুব ইচ্ছে ছিল আমাদের একটা ফুটফুটে সন্তান হবে।
তা পুত্র সন্তান হোক বা কন্যা সন্তান হোক।
সেই ফুটফুটে সন্তান আমার পরিবারকে উজ্জ্বল করে রাখবে।

পিতা সারাদিনের কাজ শেষ করে ক্লান্ত অবস্থাতেই বাড়ি ফিরে এসে ছোট্ট শিশুটির সঙ্গে নিরলস পরিশ্রমের পরেও একটু সময় কাটাবে।ধীরে ধীরে এই ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।
আর মাতা সারাদিনে বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের কর্মের মধ্যেও উপলব্ধি করতে পারবেন তার ছোট্ট শিশু প্রতিটি মুহূর্তে মাতার কাছে কি চাইছে। মাতা সময়ে সময়ে সেই শিশুটিকে কাজের ফাঁকে লালন পালন করবে, যত্ন করবে।
এইভাবে তাদের সময় কাটবে।

পিতা এবং মাতা এক সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে সন্তানকে বুকে করে নিয়ে ভবিষ্যৎ, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠিত হবে সেই জন্যই অপেক্ষমাণ হয়ে থাকবে।

এই ভাবেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ , করুণা নিয়ে একদিন জন্মগ্রহণ করলাম আমি।

পরিবারের অনেকের হয়তো স্বপ্ন ছিল পুত্রসন্তান হলেই ভালো হয়। কিন্তু সন্তানের পিতা মাতা মনে করতেন ঈশ্বরের দান প্রকৃতির দান পুত্র সন্তান হোক বা কন্যা সন্তান হোক সমান গুরুত্ব নিয়েই আমার কাছে বড় হবে এবং একজন আদর্শ পুরুষ বা নারী হয়ে উঠবে। 
উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কে তারা তাদের সন্তানের মাধ্যম দিয়ে দেখতে পাবে।

কিন্তু, আমি তো কন্যা সন্তান রূপে জন্ম গ্রহণ করলাম। অর্থাৎ নারী রূপে জন্ম গ্রহণ করলাম। পিতা-মাতা ছাড়া পরিবারের আরও সদস্যরা তেমন ভাবে উৎসাহ দেখাল কি দেখালো না পিতা-মাতার সেই বিষয়ে কোনো গুরুত্ব নেই।

সদ্যোজাত শিশুকে পেয়ে তারা আনন্দিত, ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ তারা শুধু চাইছে আমাদের সুখ এই সন্তান যেন সুস্থভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়ে এক বড় মনির ও বড় মানের আদর্শ নারী হয়।
এই প্রার্থনাই প্রতি মুহূর্তে তারা ঈশ্বরের কাছে করছে।
আমি ধীরে ধীরে পিতা-মাতার ছত্রছায়ায় বড় হতে শুরু করলাম। যখন যৌবনে পা রাখলাম অবশ্যই তখন আমি সুশিক্ষিতা হয়ে গেছি। স্বাভাবিকভাবেই পিতা-মাতার স্বপ্ন অনুসারে আমি পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়াও গৃহকর্মে নিপুণ হতে চেষ্টা করছি এবং বুনিয়াদি শিক্ষাতেও পারদর্শী হওয়ার চেষ্টা করছি।

আমার এই শিক্ষা, এই কর্ম, নৈতিক আচরণবিধি দেখে পিতা মাতা একটু সুখ শান্তি পাচ্ছেন ।

আমি মনে মনে অনুভব করতে পারলাম পিতা-মাতার স্বপ্নটা ধীরে ধীরে পূরণ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি হয়তো সাফল্য পেয়ে যাব যদি প্রথম থেকেই ঈশ্বর যে আশীর্বাদ করছেন তা আমার মাথার উপর থাকে।

যেহেতু ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছে শিক্ষা-দীক্ষার পাশাপাশি পিতা-মাতার মনেও এক চাঞ্চল্য ভাব তৈরি হলো আমাদের কন্যার শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে চাকুরীর সঙ্গে সঙ্গে তাকে এক সুন্দর সংসারে তাকে যেন স্থান দেওয়া যায় অর্থাৎ তার শুভ বিবাহের আয়োজন করার সময় হয়েছে।

আমি ভাবলাম এই 18 - 19 বছর ধরে পিতা-মাতার কাছে লালিত পালিত হয়ে আবার অন্য একটা পরিবারে আমায় চলে যেতে হবে।
 কত কষ্ট, যন্ত্রণা, পরিশ্রম করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে কখন তাদের সন্তানের কোনটা প্রয়োজন,অসুস্থ হলে কিভাবে সুস্থ করে তোলা যায় সমস্ত দিক লক্ষ্য রেখে নিজেরা বহু বিষয় ত্যাগ স্বীকার করে আমাকে বড় করে তুলেছেন। 18 -19 বছর ধরে।

তারপর এক সুন্দর, শুভ লগ্ন দেখে আবার শুভ বিবাহ দিয়ে দিতে চাইছেন আমার পিতা মাতা।

সেই সময়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। 
পিতা-মাতার মনের মতই সুন্দর এক পাত্রের সন্ধান তারা পেলেন। 
ধীরে ধীরে বিবাহের আয়োজন শুরু হল, দিনক্ষণ নির্বাচিত হলো অবশেষে তারা তাদের মহামূল্যবান কর্তব্য টি সমাপ্ত করলেন।

বিদায়ের সময় সামাজিক প্রথা অনুযায়ী কনকাঞ্জলি দ্বারা পিতৃ মাতৃ ঋণ শোধ করতে বলা হলো।
 এক লোক প্রথা ,লৌকিক বিধি সমস্ত গুরুজনের কথাকে অমান্য করতে পারলাম না।

 কিন্তু  কোন দিনই পিতামাতার ঋণ আমি কন্যা হয়ে শোধ করা তো দূরের কথা শোধ করার স্পর্ধা দেখাতে পারি না।

এলাম এক নতুন পরিবারে যিনি নিয়ে এলেন তিনি তো নতুন ই এবং যে পরিবারে এলাম সম্পূর্ণ নতুন পরিবার, নতুন সদস্য, নতুন মানুষের নতুন নতুন, পৃথক-পৃথক হৃদয়, পৃথক পৃথক মানসিকতা ,পৃথক পৃথক আচরণবিধির সঙ্গে নতুন করে পরিচয় ।

সত্যিই তো আমি নারী জন্ম গ্রহণ করলাম এক জায়গায় সেই স্থান, সেই আশ্রয় স্থল সুনিশ্চিত হলো না আবার নতুন করে অন্য পরিবারে আশ্রয় নিতে হলো।

 মাঝে মাঝে ভাবি নারীর কি আশ্রয় থাকে? 

সকলকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম প্রত্যেক গুরুজন এবং ছোটদের নিজের আপন করতে শুরু করলাম ।

প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিজে নিজে হৃদয় অনুসারে যা তারা চায় যা তারা পছন্দ করে, তোমার ভালো লাগুক বা না লাগুক এই ভালোলাগা বিষয়টাকে নিজের অন্তরের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রেখে, অব্যক্ত রেখে তাদের কে সুখী করার চেষ্টা করলাম।
কখনো আস্পর্ধা হলো না আমার পিতা-মাতার যে স্বপ্ন সেই স্বপ্ন পূরণ করব কোন কৌশলে সেটা এই নতুন শ্বশুরবাড়িতে বলার।

এখন বর্তমান যুগ তাই অতি সহজেই ফোনের মাধ্যমে পিতা-মাতা কেমন আছেন, পরিবারের আর সকলে কেমন আছেন ,কিভাবে তাদের দিন কাটছে, ভালো আছেন তো এই সকল কিছু খোঁজখবর রাখতে পারি।

একদিন হঠাৎ করেই পরিবারের সকলের কাছেই খুব কষ্ট করেই, যন্ত্রণা নিয়েই ভবিষ্যতের প্রতিক্রিয়া কি হবে?

 তা একটু হলেও উপলব্ধি করে প্রচ্ছন্ন হৃদয় কে ব্যক্ত করলাম।

 শ্বশুরমশাই ও শাশুড়ি মাতা ঠাকুরানীকে আমি বললাম যে আমার পিতামাতা চেয়েছিলেন' আরো কিছুটা পড়াশুনা করে দুস্থ গরিব সন্তানদেরকে নতুন করে শিক্ষা দিয়ে হাতের কাজ বুনিয়াদি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সেই অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগৎ যেন নিয়ে যাই। 

এটাই আমার পিতা-মাতার মূল লক্ষ্য, মূল আদর্শ, মূল স্বপ্ন ছিল। 

যদি আপনারা অনুমতি করেন তাহলে আমি পরিবারের সকলের সমস্ত কাজকর্ম সম্পূর্ণ করে নিজের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ওই দুস্থ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারি।

প্রতিক্রিয়াস্বরূপ, তুমি ঘরের লক্ষ্মী মা তুমি কি এই ধরনের কাজকর্ম করবে তোমার গৃহকর্মে নিপুণা হওয়াই একমাত্র কর্তব্য। 

নিজের স্বামীকে সেবা যত্ন করো, বয়স্ক বয়স্কা শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করো, পরিবারের আর সমস্ত ছোটদের দেখাশোনা করো, বড়দের আদেশ অনুসারে কাজ করো তুমি তো ঘরের লক্ষ্মী, তুমি আমার পরিবারের গৃহলক্ষ্মী গৃহের বাইরে গেলে গৃহের লক্ষ্মী আর গৃহে থাকে না অলক্ষ্মী হয়ে যায়। 
তাই এই অনুমতি দিতে পারলাম না।

আমি কাতর স্বরে অনুনয়-বিনয় করলাম ,বহুবার অনুরোধ করলাম, পতিদেবের কাছে, শশুর শাশুড়িমাতার কাছে শেষ মুহূর্তে যা পেলাম। 

যদি তাই হয়, আমাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হবেই আমরা চাই না তোমার মতো গৃহবধূর কারণে আমাদের পরিবারের এতদিনের মান-সম্মান, ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাক ।

 তাই যদি হতে হয় আমার পুত্রকে ত্যাগ করতে হবে।

 আমরা আবার আমাদের পুত্রের বিবাহ দেব।

আমি মনে মনে ভাবলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তিনি যেমন বাল্যবিবাহ উচ্ছেদ করেছেন ,বিধবা বিবাহ দিয়ে সেই নারী গুলির আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন, তাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে গেছেন তেমনই নারী শিক্ষার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। 

আমি নারী আমার একটা স্বপ্নের কোন  যোগ্যতা নেই, কোন স্বপ্ন দেখার যোগ্যতা নেই, স্বপ্নকে রূপায়ণ করার যোগ্যতা নেই তাহলে নারী শিক্ষা নিয়ে আমি কি করব?
 আমি যদি সেই ছোট্ট ছোট্ট দুস্থ সন্তানদের, আদিবাসীদের ,বস্তিতে থাকে তারও লজ্জা বলে জানেনা, নগ্নতায় তাদের জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আধপেট খাওয়ায় তাদের জীবন সমাজ তাদেরকে এমন ভাবে রেখেছে তাদের মেরুদন্ড  থাকার স্বত্বেও তারা মেরুদণ্ডহীন হয়ে ভিক্ষুক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাদের এই সমাজ থেকে এক নতুন সমাজ তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম, সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম তার জন্য আমাকে আশ্রয় ত্যাগ করতে হবে।

 সত্যিই নারীর কোন আশ্রয় নেই। 

পিতার বাড়িতে কিছুদিন তারপর অন্য পরিবার যদি অন্য পরিবারে মনোমালিন্য হয় তাহলে অন্য পরিবার আমাকে ত্যাগ করবে ।

আর এই ত্যাগের কারণে যদি আবার পিতার বাড়িতে যাই তাহলে পিতা মাতা অলক্ষণে মেয়ে বলে উপাধি দেবে।

এক ভালো পরিবারের তোর বিবাহ দিলাম শেখানেও তুই সুখে শান্তিতে থাকতে পারলি না, ঘর করতে পারলি না।

 অথচ তাদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্যই আমি এই প্রস্তাব রেখেছিলাম শ্বশুরবাড়িতে।

ফিরে আসতে হলো শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজের জন্মস্থান পিতার বাড়িতেও স্থান হল না। 

অবশেষে বস্তির মানুষজন আমাকে সসম্মানে রাখল।

 তাই তাদেরকে নিয়েই আমার এখন জীবন তারাই আমার সন্তান।

মহাভারতে কথিত আছে ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর শত সন্তান।
 আমি সেই রেকর্ড কেউ ভেঙে দিলাম। 

গর্ভে ধারণ করতে পারলাম না ঠিকই কিন্ত সেই বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আমি নিজের সন্তান স্বীকৃতি দিলাম তারা আমাকে মায়ের স্বীকৃতি দিল।
 500,600,1000 সন্তান নিয়ে আমার ওই ছোট্ট বস্তিতে শিক্ষার আলোর মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন চলল।

 ধীরে ধীরে তারা ভবিষ্যৎ খুঁজে পেল আর এই বৃদ্ধা অবস্থাতেও আমার মনে একটা প্রশ্ন রয়েই গেল নারীর কি আশ্রয় থাকে? 
নারীর কি আশ্রয় আছে?
 নারী কি সত্যই আশ্রয়হীন?

সত্যিই কি নারীদের নিজের বাড়ী বা আশ্রয় হয়?

1 comment: