Tuesday, December 21, 2021

নকুল পাগলা (পর্ব ৩) - প্রবোধ কুমার মৃধা

নকুল পাগলা (পর্ব ৩)

- প্রবোধ কুমার মৃধা


গ্ৰীষ্মের মাঝামাঝি। ধোষা হাট-কমিটির ব্যবস্থাপনায় চলছে পাঁচ দিন ব্যাপী বারোয়ারি যাত্রানুষ্ঠান।প্রতি বছর হয়। চিৎপুরের নামি-দামি দল এসে খোলা প্যান্ডেলে গান গেয়ে যায়। যাত্রা পেলে নকুলকে ধরে রাখা শক্ত ।সেদিন ভোরে কখন ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে কেউ জানে না।অনেক বেলা হয়ে গেল, নকুল অকাতরে ঘুমিয়ে।সকালে খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেল, শেষে বড়দা গিয়ে অনেক ডাকাডাকির পর নকুলকে জাগাতে সমর্থ হলো,অন্য কেউ গেলে ও কিন্তু উঠত‌ই না ।
'যা, দুটো খেয়ে স্নান করে আবার ঘুমো।'

নকুল আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতে উঠে যায়।আরো যখন ওর কোন কারণে শরীর খারাপ থাকে বা জ্বর হয় তো ওকে আর সোজা করে বসানো যাবে না; দু-এক দিন এক নাগাড়ে শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দেবে, না স্নান ,না খাওয়া। সে এক‌ অস্বস্তিকর অবস্থা, একটা জ্যান্ত মানুষ চোখের সামনে ওভাবে‌ জড়ের মতো পড়ে থাকবে তা যেমন দেখা যায় না, চুপ করে থাকা ও যায় না।ইচ্ছা করলে উঠতে পারে, ডাক্তার বদ্দি দেখিয়ে দুপান ওষুধ পত্র খেতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছাটাই ওর নেই।বাধ্য হয়ে দুটো জ্বরের ট্যাবলেট খাইয়ে দেওয়া হয়। ঘন্টা দুয়েক পরে দিব্যি সুস্থ ভালো মানুষ হয়ে উঠে পড়ে।

একটানা অনেক দিন থাকা হয়ে গেছে, হঠাৎ দুম করে একদিন বড়দার কাছে গিয়ে বায়না ধরল ওর দিদির বাড়ি যাবে।। কোথায় ওর দিদি,আর. কোথায় ওর বোন,আমরা কেউ‌ জানি না।বড়দার সম্মতি ও কিছু পয়সা হাতে পেয়ে খুশি মনে বেরিয়ে গেল।চার-ছ'দিন  এখন ওর ভাঙা বাসাটা ফাঁকাই পড়ে র‌ইলো। আসলে ওর যাযাবর মনটা বেশিদিন এক জায়গার আবদ্ধ থাকতে পারে না, তাইতো লোকে ওকে পাগলা বলে।

     ছোট ছোট ভাই বোনেরা ওকে নকুলদা বলেই ডাকত।বাকিরা ওকে সম্বোধন করত নাম ধরে।নকুল কিন্তু আমাদেরকে বড়ো বাবু, মেজবাবু শব্দবন্ধে পরিচয় করত।একমাত্র কেন জানিনা ,বৌদিকে ও মা বলে ডাকত। বৌদিকে দেখতাম নকুলের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুব সজাগ থাকতে, কোথাও গেলে বা কোন জায়গা থেকে ফিরলে ওকে কিছু -না-কিছু খেতে দিত। নকুল ঘরের বা রান্নাঘরের একপ্রান্তে বসে নিঃশব্দে খুব যত্নসহকারে ‌খাওয়া শেষ করত।মেলা-পার্বণ এলে বড়দা ওর হাতে কিছু কিছু পয়সা কড়ি মনে করে দিত।আমরা কিন্তু কোনদিন ওকে কোন টাকা পয়সা দিতাম না আর নকুল ও কোন সময়‌ আমাদের কাছে কিছু চাইত না ; তবে বড়দা যে ওকে সময় মতো কিছু দেবে সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতাম।আর মা যে ওকে আমাদের খাদ্য-খাদকের অংশ কম হলে ও দেবে সে বিষয়ে সংশয় ছিল না।

  কারো কাছে কিছু হাত পেতে চাওয়া,সে খাদ্যবস্তু হোক বা অর্থকড়িই হোক, এই ভিক্ষার প্রবৃত্তিটা নকুলের ছিল না, তার অভাব ছিল খুব, তাই বলে কোন দাবি বা চাহিদা তার স্বভাবে ছিল না।তবে কিছু দিলে যথেষ্ট আগ্ৰহ সহকারে গ্ৰহণ করতে দ্বিধা করত না।
বেশ কয়েক বছর নকুল রয়ে গেল আমাদের বাড়িতে, একটানা নয়,মাঝে মাঝে কিছু দিনের জন্য কোথায় উধাও হয়ে চলে যেত,আবার ফিরে আসত।এভাবে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরার পরিণাম স্বরূপ তার শরীর ভাঙতে শুরু করল।এখন প্রায় সময় সামান্য কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ার প্রবণতাটা অনেক বেড়ে গেল।

নকুলের আপনজন আর অবশিষ্ট ছিল না, দাদা বৌদি ও মারা গিয়েছে; এখন ভাইপোদের হাতে সংসার।বাস্তুভিটে আর মাঠের কাঠা পাঁচেক জমির অংশীদার ছিল নকুল।তার অংশ পাওয়ার লোভে এক ভাইপো নকুলের সাথে যোগাযোগ শুরু করল মাঝে মধ্যে, শেষটায় ওকে বাড়িতে নিয়ে যেতে আগ্ৰহ দেখাল।এতদিন চলর শক্তি ছিল, সবাই তাকে কাজে কর্মে ডাকাডাকি করত,এখন আর কেউ ফিরে ও তাকায় না।আমাদের সংসারে ও  পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে, কাজের দৌলতে আমরা বেশির ভাগ জন‌ই বাড়ির বাইরে।অত‌এব নকুলের ভাইপোর প্রস্তাবটা আমাদের কাছে সময়োপযোগী বলে সবার সায় পেল।অনেক দিন পর যাযাবর নকুল আবার আপন পৈতৃক ভিটেয় স্থিতি হলো।আজ বহু বছর পরে ও তার কথা, তার ছবিটা স্মৃতিতে বার বার এসে ভেসে ওঠে। সেবার গ্ৰামের বাড়িতে গিয়ে শুনলাম, নকুল আর বেঁচে নেই, সেটাই স্বাভাবিক, কারণ এমন নির্লোভ, নির্লিপ্ত,নির্মোহ আত্মার মানুষকে সৃষ্ঠি কর্তা বিধাতা বেশিদিন ধরার বুকে ফেলে রাখেন না,সময় থাকতে নিজের কাছে টেনে নেন।

No comments:

Post a Comment