Tuesday, December 21, 2021

ফ্রি ফায়ার - শান্তনু ঘোষাল

ফ্রি ফায়ার

- শান্তনু ঘোষাল


আজ রবিবারের সকাল। খবরের কাগজ আর চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দায় একটা চেয়ারে এসে বসে দীপন। বর্ষা ধীরে ধীরে বিদায় নিতে চলেছে। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ শরতের আগমন বার্তা নিয়ে আসছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কাগজের হেডলাইনে চোখ রাখে দীপন। ভিতর থেকে গিন্নির গুনগুন গানের আওয়াজ কানে আসছে। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। নিশ্চয়ই অফিস থেকে ফোন করেছে। এই ছুটির দিনে কাজ করতে একদম ভালো লাগে না দীপনের। বেজার মুখে কাগজটা পাশে রেখে ফোনটা রিসিভ করল। ফোনের ওপারে অফিস কলিগ সোমজিৎ। ততক্ষণে স্ত্রী শতরূপা ঘরে এসেছে কিছু বলার জন্য। ফোনে " হ্যাঁ.. হু.. সে কি? .. কবে? কখন?" এই রকম কিছু কথা বলতে শোনা যাচ্ছে দীপন কে। শতরূপা খেয়াল করে দীপনের মুখের এক্সপ্রেশন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ফোন রেখে ল্যাপটপে মেল চেক করে দীপন। হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। শতরূপা র কথায় জ্ঞান ফেরে দীপনের। এক রাশ হতাশা নিয়ে বলে ওঠে - আমাকেও চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল।"

         দীপন মিত্র শ্রীরামপুরে এক বহুজাতিক সংস্থায় দীর্ঘ দিন ধরে কর্মরত। স্ত্রী শতরূপা আর ছেলে সন্দীপন কে নিয়ে তার জমাট সংসার। আগে তারা ভাড়া বাড়িতে থাকত। কিন্তু কর্মে উন্নতির  সাথে সাথে তাদের জীবন যাত্রা বদলেছে। এখন তাদের নিজেদের সুসজ্জিত একটা ফ্ল্যাট আছে। একটা ছোটো ফোর হুইলার কেনার কথা ভাবছিল। লক ডাউন না হলে হয়তো এতদিনে সেটাও কিনে ফেলত। ছেলে একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। স্ত্রী শতরূপা সেই আবাসনের মহিলা সমিতির সদস্যা। তাদের জীবনে বিনোদনের অভাব নাই। দীপন ছুটির দিন পুরো সময়টা নিজের পরিবারের সাথেই কাটাতে পছন্দ করে। জীবনে তার অভিযোগ কিছু নাই।

      কিন্তু এই হঠাৎ করে কর্মহীন হওয়া তারা পায়ের নীচ থেকে মাটি কেড়ে নিল। জীবনে খারাপ অবস্থার জন্য সে তৈরি ছিল, কিন্তু সেটা যে এই ভাবে আসবে সে কল্পনা করেনি। সামনেই দূর্গা পূজা। এই সময় কাজ চলে যাওয়া মানে তো অথৈ জলে পড়া। পরের দিন অফিস গিয়ে সব বিস্তারিত জানতে পারল। অবশ্য এইরকম কিছু একটা গুঞ্জন যে ওঠেনি তা না। লকডাউনে কোম্পানি এমনই তেই লস এ চলছিল। তাই কর্মী ছাঁটাই ছাড়া উপায় ছিল না। প্রথমে একাউন্টস এ যোগ দিলেও এখন সেলস্ আর মার্কেটিং টা ও তাকেই দেখতে হচ্ছিল। চাপ হচ্ছিল প্রচুর কিন্তু সব কিছুই মুখ বুজে মেনে নিচ্ছিল। কিন্তু এখন যেটা হল সেটা সে কল্পনা করেনি। এতদিনের কর্মী দের যে বিনা নোটিসে এই ভাবে স্যাক্ করতে পারে এটা তার ধারণার অতীত ছিল। সে ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে হয়ত আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হল না।

      সময় খুব মারাত্মক জিনিস। কার জীবনে কখন যে কি নিয়ে আসবে কেউ কল্পনাও করতে পারে না। দীপনের মসৃন চলার পথ হঠাৎ করেই দুর্গম হয়ে উঠল। সে খুব ভালো করে ই জানে যে এই মধ্য চল্লিশের বয়সে চাকরি গেলে, চাকরি পাওয়া মোটেও সহজ হবে না। তবু সে তার পরিচিত অফিসে ঘুরতে লাগল। একে লক ডাউন তার উপর এই মধ্যে বয়সী পুরুষ কে কাজে নিতে কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখাল না। এদিকে দূর্গা পূজা ও আগত। জমানো টাকা তার কম ছিল না। তা দিয়ে পুজোটা ভালো করেই কাটাল। ছেলেকে বুঝতেই দিল না যে তারা অসুবিধায় আছে। কিন্তু জমানো টাকা জলভর্তি কলসির মত। একবার জলভরতি কলসি উল্টে গেলে সেটা ফাঁকা হতে যেমন বেশি সময় লাগে না, জমানো টাকা খরচ করা শুরু করলে সেটা ও শেষ হতে বেশি সময় লাগে না। টাকা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসতে লাগল।

       শতরূপা একজন আদর্শ স্ত্রী। সে উচ্চ শিক্ষিতা, রুচিশীল, এবং গৃহকর্মে নিপুণা। স্বামী কর্মহীন হবার পর সে তার সংসারের খরচ অনেক কমিয়ে ফেলেছে। কাজের লোককে আসতে বারণ করে দিয়েছে। বাজার দোকান সে নিজেই করছে। রোজ এখন আর তাদের বাড়ি আমিষ হয় না। ছেলেকে ভুলিয়ে বুঝিয়ে সব খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করেছে। একদিন সে দীপন কে বলল- "আমি চাকরির জন্য একটু চেষ্টা করব? যতদিন তুমি কিছু না পাও ততদিন অন্তত..." কথাটা তাকে শেষ করতেও দেয় নি দীপন, "তুমি চাকরি করলে ছেলেটাকে কে দেখবে? আমাকে আর একটু সময় দাও। দেখবে ঠিক একটা চাকরি জোগাড় করে ফেলব।" এর পর আর কথা বাড়ায় না শতরূপা। বিয়ের পরই শতরূপা চাকরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু দীপন রাজী হয়নি। এটা সেটা বলে কাটিয়ে দিয়েছিল। আজও তাই বলল। 

কিন্তু অনেক সময় চলে যায়। দীপন আর কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে না। রোজ সকালে ফাইল হাতে বেড়িয়ে যায় আর সন্ধ্যা বেলায় গম্ভীর মুখ নিয়ে বাড়ি ঢোকে। একদিন তার এক বন্ধু উপদেশ দেয় চাকরির আশা ছেড়ে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে। বাড়িতে এসে শতরূপা কে কথাটা বলে দীপন। শতরূপা ও রাজী হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টাকা। যেকোনো ব্যবসা শুরু করতে হলে বেশ কিছু অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ কি ভাবে আসবে? তার বন্ধু উপদেশ দেয় ফ্ল্যাট মর্টগেজ রেখে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিতে। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে দীপন তাই করে। এই করোনা পরিস্থিতি তে ভালো চলবে বলে সে মাস্ক আর স্যানিটাইজারের ব্যবসা শুরু করে। প্রাথমিক ভাবে ব্যবসা ভালো চললেও কিছু দিন পরেই ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে। করোনার অভিশাপ কাটিয়ে পৃথিবী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। এদিকে ধারে সমস্ত দোকানে মাল দেবার জন্য টাকা তুলতে পারে না। নতুন স্টক আনতে পারে না। কিছু মাস পর লোনের কিস্তি দেওয়া ও বন্ধ হয়। ব্যাঙ্ক থেকে নোটিস আসতে থাকে। অবশেষে একদিন ব্যাঙ্ক তাদের ফ্ল্যাট টি দখল করে।

তারা উঠে আসে তাদের পুরনো ভাড়া বাড়িতে। জীবন যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক বছর অতিক্রান্ত। এই ক মাসে দীপন যেন বেশি বয়স্ক হয়ে উঠেছে। এখন ও একটু তেই রেগে যায়, সব সময় খিটখিট করে। শতরূপা ও এখন প্রয়োজন ছাড়া দীপনের সাথে কথা বলে না। একবার সে চাকরী করার কথা তুলেছিল। কিন্তু দীপন এত রেগে গিয়েছিল যে সে ভয়ে আর কিছু বলে নি। এখন সে দু বেলা টিউশন করে। যে টাকা টা পায় তাতে কোনো রকমে সংসার চলে। ছেলে সন্দীপনের ও আর পড়াশোনা তে তেমন মন নাই। সে দিন রাত শুধু ফোনে  ফ্রি ফায়ার খেলে। দীপন একদিন ছেলের উপর রেগে গিয়ে তার গায়ে পর্যন্ত হাত তুলল। ফোন টা সে নিজের কাছে রেখে দিল।দিন দিন সে কেমন যেন সংসারের প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে। দীপন আর চাকরি র চেষ্টা করে না। চাকরি যে সে পায় নি তা নয়। কিন্তু তাতে বেতন কম ছিল বলে দীপন সেসব কাজ করতে রাজী নয়। এখন বেশিরভাগ সময়টা সে বাড়ি তেই থাকে।  শতরূপা দেখছে তার চোখের সামনে তার সুখের সংসার কি ভাবে আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসছে। সে আর চুপ থাকতে পারল না। দীপন কে না জানিয়ে ই সে একটা বেসরকারি স্কুলে জয়েন করল। দীপন জানার পর ও তাকে কিছু বলল না। দিন দিন সে কেমন যেন নির্বিকার হয়ে যাচ্ছে।

জীবন হল নদীর মত প্রবাহমান। নদীর চলার পথ যদি কোনো পাথর দ্বারা হঠাৎ করে বাধাপ্রাপ্ত হয় সাময়িক ভাবে নদীর গতি স্তব্ধ হয় ঠিকই। কিন্তু পাথরের পাশ দিয়ে আবার সে নিজের মত করে পথ তৈরি করে নেয়। দীপনের জীবনেও এরকম ই কিছু ঘটল। সেদিন দুপুর বেলা ছেলের ফোনটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ সে ফ্রি ফায়ার গেমটা দেখতে পেল। গেমটা অন করতেই মোবাইলের স্ক্রীনে বন্দুকধারী এক মানুষ ভেসে উঠল সাথে এল বেশ কিছু অপশন্। উৎসাহের বশে 'স্টার্ট' অপশন টাচ করতেই শুরু হল খেলা। কিছু বুঝতে পারার আগেই একজন এসে ঐ বন্দুক ধারী ব্যক্তিকে গুলি করে মেরে দিল। ব্যাস গেম ওভার। বেশ মজার লাগল গেমটা। ভাবতে শুরু করল কি ভাবে সে খেলবে গেমটা। ইউটিউবে সার্চ করল। ব্যাস পেয়ে গেল সে বন্ধ তালার চাবিকাঠি। শুরু হল ফ্রি ফায়ার খেলা। সমস্যা হলেই ইউটিউবের দ্বারস্থ হল। জানতে পারল একের পর এক আক্রমণের কৌশল।

         সেদিন বিকালে শতরূপা স্কুল থেকে বাড়ি এসেই শুনতে পেল বন্দুকের গুলির আওয়াজ। ছেলেকে আবার খেলার জন্য বকতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে পড়ল ছেলে তো এখন পড়তে গেছে। দীপনের ঘরে ঢুকে দেখল দীপন এক মনে খেলে যাচ্ছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় শতরূপা। এটা কোন দীপন কে দেখছে সে। সে যাকে বিয়ে করেছিল তার সাথে এই দীপনের কোনো মিল নাই। কি অবলীলায় সংসারের সব দায়িত্ব কর্তব্য ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বাচ্চাদের মত মোবাইলে গেম খেলছে। রাগে মুখ দিয়ে কথা বলতে পারছে না শতরূপা। সে যে এতক্ষণ এঘরে এসেছে তার দিকে কোনো দৃষ্টিই নাই দীপনের। কিছুক্ষণ পর একবার তার দিকে তাকাল দীপন। শতরূপাকে দেখেই চমকে উঠল। যেন চোর চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। "এই কিছু কাজ নাই তাই একটু টাইম পাস করছিলাম।" বলল দীপন। শতরূপা চলে এল ঘর থেকে শরীর টাকে বিছানা তে ফেলে দিয়ে বালিশটাকে আগলে ধরল। চোখের জল আগেই বাঁধ ভেঙেছে। তার স্বপ্নের রঙিন পৃথিবী কেমন সাদাকালো অগোছালো হয়ে উঠল।

      ফ্রি ফায়ার দীপনের কাছে নেশা হয়ে উঠল। এখন ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা নিয়ে চলে যায় পাড়ার ক্লাবে। সেখানে ছেলেরা সারাক্ষণ মেতে আছে ফ্রি ফায়ার গেমে। তাদের সাথে দীপন ও শুরু করে তার খেলা। দিন রাত বুঁদ হয়ে খেলে যায় ফ্রি ফায়ার। জীবন তার নতুন পথ পেয়ে গেছে। সেই পথেই এখন জীবন এগিয়ে চলে। স্ত্রী পুত্র সংসার তার কাছে এখন গুরুত্ব হীন। তার চিন্তায় এখন- কি ভাবে পারফেক্ট হেড শর্ট মারবে, কাস্টমস্ এ কত জন কে হারাবে, কোন বন্দুক টা নিলে ভালো ড্যামেজ পাবে, কোথায় নাবলে ভালো লুট পাবে এই সব চিন্তায়। যারা পাশ থেকে দেখে তারা হাসাহাসি করে। কেউ বলে শিং ভেঙে বাছুরের দলে এসেছে। কেউ বলে চিন্তা তো নাই বউ রোজগার করছে বর সারাদিন ফ্রি ফায়ার খেলছে। দু একটা কথা শতরূপা র দিকেও ছুটে আসে। স্কুলের ছেলেরা টিজ করে - 'ম্যাডাম আর আমাদের ফ্রি ফায়ার খেলতে বারণ করবেন না। কারণ ম্যাডামের হাজবেন্ডই তো সব সময় ফ্রি ফায়ার খেলে' । জীবন ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। জানেনা এইভাবে কতদিন সে বাঁচতে পারবে।

     আজ বাড়ি তে এসে তুমুল ঝগড়া হল। রাগে ফোন টা ভেঙে ফেলল শতরূপা। তাদের সংসারীর জীবনে এরকম ঝগড়া কখনো হয়নি। এতদিন দুজনেই সর্ব শক্তি দিয়ে প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু আজ একজন এইভাবে হাল ছেড়ে দেবে সে ভাবতে পারে নি। রাগের মাথায় যা তা করে বলে ফেলল। যেটা সে কখনো বলতে চায়নি আজ সেটাও বলল - "দিন রাত বউ এর টাকায় বসে বসে খাচ্ছো আর ঐ বাচ্চা ছেলেগুলোর সাথে ফোনে গেম খেলতে লজ্জা করে না?" অনেক চেঁচামেচি করার পর এই কথাটা শুনে দীপন কেমন যেন চুপ হয়ে গেল। সেদিন বিকালেই পাশের বাড়ির আরতী কাকিমা এসে দীপন কে অনেক কথা শুনিয়ে গেল- সে নাকি পাড়ার ছেলেদের ফ্রি ফায়ার খেলার উৎসাহ দেয়।তার জন্য ই পাড়ার ছেলেরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে।  এটাও দীপন হজম করল।

          আজ রাতে কারোরই খাওয়া হল না। ছেলেটা ও ভয়ে কেমন চুপ করে গেছে। রাতে বিছানায় এসে দেখল দীপন ঘুমিয়ে পড়েছে। আগে তাদের সব কথা এই সময় হত।-সব আলোচনা, সব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ছেলেকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন, আবার উঠে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার সব কিছু। এত প্রতিকুলতার মধ্যে ও তাদের মধ্যে ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু যেদিন থেকে এই পাপী গেমটা খেলা শুরু করেছে সেদিন থেকে শুধু শতরূপা ই বলে গেছে। তার উত্তরে শুধু 'হ্যাঁ, হু, আচ্ছা, ঠিক আছে' ছাড়া আর কোন উত্তর পায় নি। ধীরে ধীরে বিছানায় কথা বলাটাই বন্ধ হয়ে গেছে।

     পরের দিন সকালে উঠে শতরূপা দেখল দীপন তখন ও ঘুমাচ্ছে। কাল রাতে তাকে যাচ্ছেতাই করে বলেছে। সকালে উঠে ভাবল - ইস এতটা খারাপ আমি হলাম কি করে! চাকরি যাবার পর থেকে এই ক বছর কি ভাবে সে পাগলের মত চাকরি র চেষ্টা করেছে সেটা সে নিজের চোখেই দেখেছে। বার বার ব্যর্থতা কি ভাবে তাকে গ্রাস করেছে সেটাও সে দেখেছে। তবু এই দু মাস সামান্য একটা গেম খেলার জন্য তাকে এইভাবে বলল। অনুশোচনা করে শতরূপা। আজ তাদের  বিবাহ বার্ষিকী। আগের রঙিন দিন গুলোর কথা মনের ক্যানভাস থেকে উঁকি মারে শতরূপার। সারাদিন কত আনন্দে কাটত দিন টা। আগের কয়েক বছর তাদের কাছে অর্থ ছিল না ঠিকই, কিন্তু আনন্দে কোনো ভাটা পড়ে নি। না আজকে এই মানুষ টা কে আর কষ্ট দেব না। ও যাতে ভালো থাকে থাকুক। তবু মানুষ টা একটু হাসিখুশি থাকুক।

        আজ বিকালে স্কুল থেকে এসে শতরূপা দেখে দীপন তার পছন্দের খাবার গুলো নিজের হাতে তৈরি করেছে। তাকে দেখে লজ্জায় মিটিমিটি হাসে। অনেক দিন পর আজ শতরূপা র খুব ভালো লাগে। তারিখ টা তাহলে সে ভুলে যায় নি। খাবার পর ব্যাগ থেকে নতুন মোবাইল ফোন টা বের করে শতরূপা। দীপনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শতরূপার মনে পড়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর যখন তার বাপি তাকে প্রথম মোবাইল এনে দেয়, তার মুখ টা ঠিক এরকম ই হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আজ এই মধ্য বয়স্ক স্বামীর মুখে ফোন দেখে এই হাসির মধ্যে শতরূপা তার অতীত কে খুঁজে পায়। 

      রাতে বিছানায় এসে শতরূপা দেখল দীপন আবার সেই ফ্রি ফায়ার এ মত্ত। লাউড স্পীকারে কাদের সাথে যেন কথা বলছে - "এই মার মার মার। তোর  পিছনে... তাড়াতাড়ি আয়... আমাকে একটা এস এম জি দে... আমার কাছে পুরো স্কোয়ার্ড আছে" আজ শতরূপা র রাগ হয় না। কথাগুলো র মাথা মুন্ডু কিছু বুঝতে না পারলেও এক দৃষ্টিতে দীপনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখে দীপন বলে একটু দাঁড়াও এখুনি হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর ই 'বুইয়া' করে আনন্দে চীৎকার করে ওঠে। গেম বন্ধ করে ঘুমাতে আসে দীপন। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শতরূপা প্রশ্ন করে - 'কি পাও এত গেম খেলে?' দীপন বলে-"জানো তো মানুষ যখন স্রোতে ভেসে যেতে থাকে, তখন সে চেষ্টা করে একটা খড়কুটোকে আগলে ধরে বাঁচতে। এটা আমার সেই খড়কুটো।'
-' কিন্তু একটা খড়কুটো কে ধরে কতদিন আর বাঁচা যায় বলো?'
-' জানি না । দেখি কতদিন বাঁচতে পারি'
কিছুক্ষণ পর শতরূপা বলে ওঠে আচ্ছা - কি ভাবে খেলো গেমটা? আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে?'
কথাটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য অবাক হয় দীপন। তারপর তাকে খেলাটা শেখাতে শুরু করে। শতরূপা মন দিয়ে শেখে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক খেলার পর শতরূপা খেলাটা তার আয়ত্তে নিয়ে আসে। অবশেষে ফোন রেখে তারা ঘুমতে যায়। দীপন বলে ওঠে-"এটা আমাদের বেষ্ট এনিভার্সারি। এটা আমি জীবনে কোনদিন ভুলব না। রাতে তুমি ফ্রি ফায়ার শিখেছো।" বলে হেসে ওঠে।
--" আচ্ছা দীপন তোমার কি এই গেমটা কে শুধু গেম মনে হয়েছে? "শতরূপা জিজ্ঞেস করে।
--"মানে? বুঝলাম না।"
--- " আচ্ছা তুমি বলো এই গেমটা  একা খেললে তো খেলা যে কোন মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে। মানে যে কেউ যখন খুশি আমাদের মেরে ফেলতে পারে? "
---" হ্যাঁ তা তো পারে।"
--- তাহলে দুজনে মিলে খেললে তো একে অপর কে সাহায্য করতে পারে? মানে ধর প্রয়োজনে বন্দুক বা অন্যান্য জিনিস দিতে পারে, বা ধরো একজন মারা গেলে অপর জন বাঁচাতে পারে।"
---হ্যাঁ তা তো পারেই। তাই তো এটা বেশি মজার।"
--- আমাদের জীবন টাও এই 'গ্যারিনা' র তৈরি করা গেমের মতই এক ব্যাটেল গ্রাউন্ড। একজনের ক্ষেত্রে এখানে সারভাইব করা খুব কষ্টের। গেমে যেমন অনেক শত্রু আছে আক্রমনের জন্য, আমাদের জীবনেও অনেক বাধা আসে আমাদের শেষ করার জন্য। গেমে যেমন আমাদের অস্ত্র বন্দুক, বাস্তবে আমাদের অস্ত্র বুদ্ধি, ধৈর্য অধ্যাবসায়। গেমে যেমন শুধু আক্রমণ করলেই চলে না, অপরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ও জানতে হয়। বাস্তবে তেমন শুধু উন্নতি করে এগিয়ে গেলেই হয় না, প্রতিকুল পরিস্থিতির জন্য নিজেকে তৈরি ও রাখতে হয়।
--- "বাহ্! সুন্দর বললে তো। এত কিছু তো ভেবে দেখিনি কখনও।"
--- তাহলে ভাবো যদি তোমার সাথে তখন আমি ও চাকরি করতাম, তাহলে আমাদের এতটা খারাপ অবস্থা হত না।
---- বুঝতে পারছি সবই। তোমাকে তখন চাকরি করতে না দেওয়া টা আমার ভুল ছিল। কিন্তু এখন আর কি করা যাবে বলো?
---- এখন ও অনেক কিছু করার আছে দীপন। আমার একার পক্ষে এই সংসারের ভার বহন সম্ভব হচ্ছে না। এখন ও যদি তুমি কিছু না করো আমি কি ভাবে এ জীবনের গেম জিতব বলো?
--- আমি তো জীবনের খেলায় 'ডেড 'হয়ে গেছি। আমি আর কি করব?
---- আমি তোমায় সারভাইব করব।
---- কিন্তু কিভাবে?
----আমাদের স্কুলে একটা কমার্সের টিচার লাগবে। আমি হেড স্যার কে তোমার কথা বলেছি। উনি তোমাকে চেনে ন ও। স্যার রাজী হয়েছেন। এখন যদি তুমি চাও....
--- দীপন বাক্‌ রুদ্ধ হয়ে গেল। দুজনের চোখে আনন্দের অশ্রু। কিছুক্ষণ পর দীপন বলল-
---" বাই দ্য ওয়ে ফ্রি ফায়ার চারজনে খেললে কিন্তু আরো বেশি ভালো খেলা হয়।
----" হ্যা কিন্তু আমাদের তো শুধু একটা ছেলে আছে। ছেলে উপার্জন করতে এখন অনেক দেরী। আর অন্য কোনো সন্তান নেবার সাধ, সাধ্য কিছু ই আমার নাই।"
----" তাহলে চারজন করার জন্য আমিই আর একটা বিয়ে..."
----"কি!! বুড়োর শখ কত!" বলে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে দীপন কে মারতে আসে শতরূপা। দীপন আবেগের সাথে তাকে জড়িয়ে ধরে। মনে মনে বলে ওঠে " বুইয়াআআহ্"।

No comments:

Post a Comment