Tuesday, December 21, 2021

আতঙ্ক - অগ্নিশ্বর সরকার

আতঙ্ক

- অগ্নিশ্বর সরকার


তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর নদীর ধারের বাংলো । এক সন্ধেবেলা বারান্দায় বসে আছি । সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল । কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ । সামনের টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর কাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর জাবর কাটছি । ভোর থেকে ভীমা নিখোঁজ । হঠাৎ নদীর ধার থেকে ভেসে এলো এক হৃদয়বিদারক অমানবিক চিৎকার । হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে চুরমার হয়ে গেল । ভিতর থেকে ত্রস্তপদে হাতে একটা লাঠি  নিয়ে বেরিয়ে এলো অনিন্দ্য । সাথে ভীমার পোষ্য বাঘা ।

- অভীক , তাড়াতাড়ি চলো । আমার মনে হয় ভীমার চিৎকার ওটা ।

কালবিলম্ব না করে বাঘা সহ আমরা দুজনে ছুটলাম নদীর উদ্দেশ্যে । প্রতি মুহূর্তেই একটা  আতঙ্ক ঘিরে আছে আমাদের । জীব-জন্তু সবার আগে যেকোন ঘটনার আভাস পায় , এক্ষেত্রেও হল তাই । হঠাৎ এক জায়গায় স্থবির হয়ে বাঘা চিৎকার করতে লাগলো ।  সামনের দিকে  তাকাতেই আমার আর অনিন্দ্যর হাত-পা অসাড় হয়ে গেল । ঘটনাস্থল আমাদের থেকে কয়েক ফুট দূরে । বাঘার চিৎকার হঠাৎ করেই থেমে গেছে । সামনে একটা ছায়ামূর্তি হাঁটু গেড়ে বসে একটা মানুষের শরীর থেকে খাবলে খাবলে মাংস খাচ্ছে । অন্ধকারেও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছেনা শরীরটা ভীমার । সকাল থেকে নিরুদ্দেশ ভীমাকে এইভাবে খুঁজে পাব বুঝতে পারি নি ।

আমি আর অনিন্দ্য , দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু । কর্ম ও বাসস্থান সূত্রে কোলকাতার বাসিন্দা । একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত । দুজনে ঠিক করলাম , এবার কালীপূজোর সময় আমরা ডুয়ার্সে ঘুরতে যাব । যেমনই ভাবা তেমনই কাজ । তৎকাল টিকিট বুক কালীপূজোর চারদিন আগেই করে চলে এলাম মূর্তি নদীর খুব কাছের একটা বাংলোতে ।  এখানে আমাদের কাজ ছিল খাওয়া-দাওয়া আর ঘুরে বেড়ানো , সাথে আশেপাশের ছবি তোলা ।

ঘটনার সূত্রপাত কাল । আমি আর অনিন্দ্য ছবি তুলতে বেরিয়েছি । সাথে আমাদের কেয়ারটেকার ভীমা আর ওর পোষা অ্যালসেসিয়ান কুকুর বাঘা । পাহাড়ি গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে দুটো সাইকেল চলেছে । একটা সাইকেলে আমি আর অনিন্দ্য , অপরটাতে ভীমা আর কেরিয়ারে বসে আছে বাঘা । চারদিকের চাবাগানের সৌন্দর্যকে সাথে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ সাইকেলিং করার পর আমরা এসে পৌঁছলাম চম্পামারিতে । পাশ দিয়ে মূর্তি নদী বয়ে চলেছে । আশেপাশে আছে কত নাম না জানা পাখিদের মেলা । দূরে গ্রামের মধ্যে দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেয়ে আকশের দিকে উঠে যাচ্ছে । আমরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে এদিকে ওদিকে ছবি তুললাম । বাঘাকে নিয়ে মূর্তি নদী দাপিয়ে বেড়ালাম । হঠাৎ চোখ গেল সেই গ্রামের দিকে । ধোঁয়ার কুণ্ডলী এখন বেশ গাঢ় হয়েছে । অনিন্দ্য কৌতূহলবশত ভীমাকে জিজ্ঞেস করল ,

- ওদিকে কী হচ্ছে ভীমা ?

- উস গাঁওমে এক পূজা হো রাহা হ্যায় । ইসকো ভুত পূজা বোলতে হ্যায় ইধার । কালীপূজাকে প্যাহেলে ইয়ে পূজা হোতা হ্যায় । ইস পূজা করনেসে গাঁওকা ভুত-প্রেত সব চলা জাতা হ্যায় আউর গাঁও মে খুশালী হোতা হ্যায় ।

আমি বলে উঠলাম , তাহলে চলো সবাই । আমরাও একটা নতুন জিনিস এক্সপিরিয়েন্স করে আসি ।

বাঘাও ‘ভৌ......’ এর সাথে আমাদের সাথে সহমত হল । আমরা আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পরলাম সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে ।

গ্রামে গিয়ে দেখি লাল কাপড় পরা এক মহিলা একটা ঘটের সামনে পুজো করছেন । সামনে একটা বড় যজ্ঞকুণ্ড । পাশে রাখা রয়েছে একটা অদ্ভুত পিতলের মূর্তি । পুজো শেষে সেই মূর্তিটা বিসর্জন দেওয়া হল মূর্তি নদীতে । আমার  বইয়ের সেলফের জন্য মূর্তিটা খুব পছন্দ হয়েছিল । ভীমা বলল ,

- আয়সা মাত সোচিয়ে বাবুজী । উস মূর্তিকো ছুনেসে ভুত উসকো মার দেতা হ্যায় ।

শেষপর্যন্ত উপরোধে ঢেঁকি গিলেছিল ভীমা ।  আমার অন্যায় আব্দার পূরণ করার জন্য আজ অজানা শক্তির হাতে প্রাণ দিতে হল ভীমাকে । রক্ষা করতে পারলাম না আমরা ।

No comments:

Post a Comment