Tuesday, December 21, 2021

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (পর্ব ১১) - অতনু দাশ গুপ্ত

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (পর্ব ১১)

- অতনু দাশ গুপ্ত


চাকরি বৃত্তান্তের পুরো গল্প সমাপ্তি করার সময় এখনও আসেনি। আপাতত অসমাপ্তই রয়েছে,  কবে নাগাদ এর ইতি টানতে পারবো তা বিধাতা বলে দেবেন। এখন আমরা চাকরি বৃত্তান্তের কোন বিষয়গুলো একটু ভিন্নভাবে হলে হয়তো আজকে এ অবস্থায় পড়তে হতো না সে ব্যাপারগুলো দেখবো। 

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকে শুরু করে চাকরির জন্য যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল তা এখনও পিছু ছাড়েনি! আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও জটিল। কারণ স্টাডি পারমিটে অফ ক্যাম্পাসে(ইউনিভার্সিটির বাইরে) কাজ করার অনুমতি ছিল না! কেন এমনটা হয়েছিল তা আমার জানা নেই, পুরোটাই বর্ডার অফিসার বলতে পারবেন যিনি প্রবেশের সময় আমাকে টরোন্টোর জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে স্টাডি পারমিট ইস্যু করেছিলেন। তবে ওইসময় আমার প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার ছিল। কিন্তু আমি এ বিষয়ে অবগত ছিলাম না মোটেও। আর আমার সাথে থাকা আরও দুই ছেলের কাগজপত্রে হয়তো কোন সমস্যা ছিল, ওদের ওখানেই আটকে রেখেছিলেন বর্ডার অফিসাররা। ওরা আরও কাগজপত্র চাইছিলেন,  ওদেরকে এটাও বলতে শুনেছিলাম যে নিজেদের ইউনিভার্সিটিতে যোগাযোগ করে কতৃপক্ষের সাথে কথা বলিয়ে দিতে। অন্যথায় ফিরে যেতে হবে এখান থেকেই! এসব দেখে অনেক ঘাবড়ে গিয়েছিলাম আর এটাও জানতাম না আমার স্টাডি পারমিটের নিচে শর্তে কিছু লেখা রয়েছে। বিষয়টা আমার দৃষ্টিতে আসে যখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। আসলেও জানা ছিল না কি করতে হবে বা আদও এমন কোন শর্ত আরোপিত হতে পারে!!  

এই গেল প্রবেশপথের ঝঞ্ঝাটের কথা। মূলত এখানে ঢোকার পর থেকে সেই যে একবার চাকরির ভূত আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে তিন বছর কেটে গেলেও এখনো নামেনি! সবার স্টাডি পারমিট থাকে একটা আর আমার হয়েছিল তিনটে...
স্টাডি পারমিটের ঝামেলা কাটিয়ে যখন কাজ করার অনুমতি পেলাম প্রথম চাকরিতেও খেলাম বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা।  কেপ ব্রেটন ইউনিভার্সিটির আর্ট গ্যালারিতে চাকরির দ্বিতীয় দিনের মধ্যেই জানতে পারি চাকরিটা থাকছে না! এক্ষেত্রে বলতে হয়,  আমার ইন্টারভিউ যারা নিয়েছিলেন প্রথমত তাদের গাফিলতির শিকার হয়েছিলাম আমি। এর সাথে যোগ করা যায় খানিকটা নিজের ভুলও। চাকরির পোস্টের সমস্ত খুঁটিনাটি  ভালো করে আদ্যোপান্ত পড়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল আর যদি কোন প্রশ্ন থাকে সেটা অবশ্যই সাক্ষাৎকারের দিন জিজ্ঞেস করে নিলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টা এড়ানো যেতো সহজে! এ গেল প্রথম চাকরির কথা। 

ওয়ালমার্টের চাকরিতে তেমন কিছু বলার না থাকলেও মূল সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল যখন নতুন স্টোর ম্যানেজার কেটির সাথে কাজের সিডিউল নিয়ে ঝামেলা হলো। দুর্ভাগ্যবশত প্রায় আড়াই বছর চাকরির শেষদিন পর্যন্ত সেটা বহাল ছিল। কিভাবে বুঝলাম? যখন দেখলাম আমি বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন পর্যন্ত ওর কোন হদিস নেই! এক্ষেত্রে অবশ্য নিজের খুব একটা দোষ আছে বলে মনে করি না। যেহেতু কেটি নতুন এসেছিল তাই ওর সাথে সামনাসামনি কথা না বললে কেন ও আমার সিডিউল বাতিল করেছিল সেটা বোঝা মুশকিল ছিল! কিন্তু মুখোমুখি কথা বলাটাই হয়তো কাল হয়েছিল। খুব সম্ভবত ওর ব্যক্তিত্বে ঘা লেগেছিল এটাই যে কেন আমি সরাসরি ওকে সিডিউল বাতিল নিয়ে প্রশ্ন করতে গেলাম? অন্য কোন উপায় ছিল না বলেই এমনটা করতে হয়েছিল। তখন পর্যন্ত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ওই স্টোরে কাজ করলেও কখনো আমার সিডিউল কোন ম্যানেজার বাতিল করেনি। আর স্টোর ম্যানেজারের তো আমার সিডিউল নিয়ে ঘাটাঘাটি করার প্রশ্নই আসে না, মূলত এর দায়িত্ব থাকে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারের কাছে। এখনও জানি না কি প্রয়োজনে ও আমার সিডিউল বাতিল করেছিলো বা এর প্রয়োজনই বা কি ছিলো?? যদি কিছু করার প্রয়োজন হতো এর জন্য আমার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারের হস্তক্ষেপ করার কথা। একজন অপরিচিত কর্মীর সিডিউল বিনা কারণে বাতিল করে ওর কি আনন্দ বা কৃতিত্ব অর্জন করার ছিল তা সত্যিই রহস্যজনক! তবে এসব কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ আমার কোন প্রয়োজন ছিল না। যখন আমি সিডনি ছেড়ে হ্যালিফ্যাক্সে আসার পরিকল্পনা করি তখন  কেটির কারণে তা আটকে যায়। শুধু তা-ই নয়, আমি নিজ উদ্যোগে হ্যালিফ্যাক্সে গিয়ে ওখানকার ম্যানেজারদের সাথে দেখা করে কথা বলি বদলির ব্যাপারে, যতদূর প্রথম সাক্ষাতে মনে হয়েছিল ওদের কোন সমস্যাও ছিল না। যে ম্যানেজারের সাথে কথা বলেছিলাম ও ইচ্ছুক ছিল। এতেও ক্ষান্ত হননি ওই মহিলা। পরবর্তীতে ক্যানাডিয়ান সরকারের অল্প সময়ে অভিবাসন প্রক্রিয়ার সুযোগের অংশ হিসেবে দেওয়া টি আর টু পি আর এ আবেদনের জন্য কাগজপত্র জোগাড় করতে গেলেও কেটি সাইন করে স্ক্যান না করে কাগজটা পাঠিয়ে দিয়েছিল। এমনভাবে ছবিটা তুলেছিল যেটা বেশ ঝাপসা আর দেখেই বোঝা যায় কাজটা পরিকল্পিতভাবে করা! 
যা- ই হোক অনেক কুকর্মের সাক্ষী এই মহিলা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন একই জায়গায়। 
ওয়ালমার্টের দায়িত্বে থাকাকালীন অবহেলা জনিত কোন কাজ করেছি এমন কথাও কেউ বলতে পারবে না। মোদ্দা কথায় বলা যায় ব্যাক্তিগত আক্রোশের শিকার হলে সেটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু না! তবে এক্ষেত্রে যদি আমি স্টোর পরিবর্তন করে অন্য কোন স্টোরে আগেই  বদলি হয়ে যেতাম তাহলে হয়তো পরবর্তীতে কেটির কারণে তৈরি হওয়া উটকো ঝামেলায় আর জড়াতে হতো না। আর নর্থ সিডনির দূরত্বও আমার বাসা থেকে ছিল অনেক দূরপথে। মূলত ওই স্টোরের সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্কের কথা ভেবে আমি অমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরে আসি। কর্মক্ষেত্রে আবেগের বশে কখনো কোন চিন্তা করা চলে না। সবসময় নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বা অনাগত সময়ের দিকে তাকিয়ে অনেক জেনে-বুঝে কোন প্রকারের আবেগের বশীভূত না হয়ে যে কোন সিদ্ধান্তের মীমাংসা করুন। কেটির পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে যদি আগেই ঠাহর করতে পারতাম, তাহলে হয়তো বদলি না হওয়ার ভুল করতাম না। 

এরপরের স্বল্পকালীন চাকরির অভিজ্ঞতার কথায় আসি -

 প্রথমেই সিডনিতে রেস্টুরেন্টের চাকরির কথা বলি - অনেকটাই আশেপাশের ছেলেপেলেদের প্রবল উৎসাহে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে যোগ দিই ওখানে। তবে এক দম বন্ধ হওয়া পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে একদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি এখানে এক বছর কাজ করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবো না! বেশ ছোট্ট আকারের একটা জায়গায় গাদাগাদি করে সবাই কাজ করছে, এর উপর টিফিন বা খাবার খাওয়ার ঠিকঠাক জায়গা নেই। নোংরা ওয়াশরুম। কিন্তু যারা 
 ওখানে কাজ করছে তাদের মধ্যে  উৎসাহের কমতি ছিল না মোটেও।  সবাই আমাকে ভীষণভাবে সহায়তা করেছিল। প্রথমবার আমাকে দেখে আলিঙ্গন করে রীতিমতো উষ্ণ  অভিবাদন জানানো থেকে শুরু করে বিদায়বেলাও একইরকম উষ্ণতা দেখিয়েছিল। ম্যানেজার থেকে শুরু করে কর্মী ভাইয়েরা। কিন্তু রান্নাঘরের ওই বদ্ধ জায়গা, দম আটকে আসা পরিবেশ (এটা একান্তই নিজের দৃষ্টিতে), রেস্টুরেন্টের কাজের অনভিজ্ঞতার চাপ - সবকিছুর বোঝা কাঁধে চাপিয়ে  গিয়েছিলাম কাজ করতে। তাই হয়তো শেষমেশ নিজে মানসিকভাবে আর পেরে ওঠা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে একটা কথা বিশেষভাবে বলতে হয় - এখানে আসার পর থেকে সব চাকরির প্রতি আগ্রহ থাকলেও কোন অজ্ঞাত কারণে রেস্টুরেন্ট বা ফাস্টফুড চেইনের জবগুলোর প্রতি অনীহা ছিল চরম। কারণ আমার রেজিউমের সবচেয়ে বেশি জমা দেওয়া হয়েছিল এসব জায়গায়, ইন্টারভিউও দিয়েছি বেশ কবার। কখনো কখনও বলেও দেওয়া হয়েছে চাকরি হয়ে যাবে। পরবর্তীতে হয়নি। কেন? উত্তর কারও জানা নেই। মাঝে সাঝে আমার এটা মনে হয় যিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনিও জানেন না কেন আমাকে বাদ দিয়েছেন! জিজ্ঞেস করেও উত্তর পাইনি! কয়েক দফা পেছনে লেগে থাকার পরও কোন লাভ হয়নি। মাসের পর মাস এভাবে কোন রকম সুরাহা হওয়া ছাড়াই কেটেছে। পরবর্তীতে এসব ব্যাপারের কারণে আমি আর ওমুখো হইনি। আবেদনও করিনি। তবে বি ক্যাটাগরির কথা ভেবে প্রথম থেকেই এদিকে ভাবা উচিত ছিল। ইমিগ্রেশনের বিষয় নিয়ে সবরকম ধারণা থাকলেও এটা জানতাম না যে বাকি চাকরি নিয়ে স্থায়ী অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ঝামেলা এত বেশি!  পরবর্তীতে যখন সুযোগ এল তখন সবকিছু মিলিয়ে আমার বেহাল দশা!  
 সিডনি থেকে হ্যালিফ্যাক্সে আসি টিডির চাকরির সুবাদে।  এখানেও বিধি বাম! পূর্বশর্ত অনুযায়ী লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চাকরি হারাই।
 এক্ষেত্রে যদি আগে থেকে এ সম্পর্কে আমার পূর্ব ধারণা বা পড়াশোনা জানা থাকতো, তাহলে হয়তো পরীক্ষায়  উতরে যাওয়াটা সহজ হতো। যাদের পড়াশোনায় সময় বেশি লাগে বা বিষয় বোধগম্য হতে কিছুটা ধীরগতির, তাদের জন্য ওই লাইসেন্স পরীক্ষার সময়সীমাটা আসলে দুই সপ্তাহ যথেষ্ট নয়। অন্তত আমার জন্য ওই সময় কম মনে হয়েছে।  

এরপরের স্কসিয়া ব্যাংকের চাকরিকে স্বল্পকালীন বলা যায় না। সবকিছুই ভালোই চলছিল, এক্ষেত্রে বাগড়া বাঁধালো ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত নিয়মাবলীর কাগজপত্র!

No comments:

Post a Comment