Tuesday, December 21, 2021

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ক - রূপশঙ্কর আচার্য্য

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ক

- রূপশঙ্কর আচার্য্য


পৃথিবী শ্রেষ্ঠ উপহার হল ভাই ও বোনের পবিত্র মধুর এই সম্পর্ক।

হে ঈশ্বর,ভাই ও বোনের মধ্যে এই মধুরও সম্পর্কের বন্ধন তুমি দিয়েছো এই পৃথিবীতে।

তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হল একটি ভাইয়ের কাছে তার প্রিয় বোন বা প্রিয় বড়ো দিদি।মাতৃতুল্য মায়ের স্নেহ,ভালোবাসা দিয়ে ভাইকে রক্ষা করবে।

ভাইকে সবসময় নিজের কাছে স্নেহাশীষের মাধ্যমে সুস্থ, স্বাভাবিক, সবল রূপে দেখতে চায় তার দিদিভাই।সর্বদা ভাইয়ের কল্যাণ,মঙ্গল কামনার চেষ্টা করে।ভাইয়ের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনার চেষ্টা করে।যেন দিদি বা বোন হল ওই ভাই বা দাদার রক্ষাকবচ।

অনুরূপ ভাবে, ভাইয়ের কাছে যেমন বোন তার মাতৃতুল্য একজন নারী,বোনের কাছেও তার ভাই বা দাদা পিতৃতুল্য একজন পুরুষ।যে দাদা এই বোনের স্নেহ,মায়া,মমতা,ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত পিতার মতো বোনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে।বোনকে শ্রদ্ধা করবে।বোনের লজ্জা রক্ষা করবে।বোনের প্রতিমুহূর্তে যে সমস্যা সেই সেই সমস্যা উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে এবং সেই সমস্যার সমাধান করবে।

অর্থাৎ, ভাই যেন বোনের কাছে এই  ঢাল হয়ে থাকে।ভাইকে চরমভাবে শপথ গ্রহণ করতে হবে আমি  যতদিন বাঁচব মাতৃতুল্য বোনকে রক্ষা করবো। বোনের লজ্জা রক্ষা করা জীবনরক্ষা করা শালীনতা বজায় রাখা আমার দ্বারা সম্ভব।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে যখন তাঁর চক্রের আঘাতে  বা নিজের অস্ত্রের আঘাতেই নিজের হাত রক্তাক্ত হয়েছিল।তখন একটুও দ্বিধা না করে পাঞ্চালি অর্থাৎ দৌপ্রদী তার সুন্দর রেশম কাপড় সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে নিয়ে তার ভ্রাতৃতুল্য শ্রীকৃষ্ণের হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন।তারপর থেকে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দৌপ্রদীর এই ভাই বোনের মধুর পবিত্র সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত হল।

শ্রীকৃষ্ণ ভাইরূপে শপথ গ্রহণ করলেন যে ,আমি আমার জীবন দিয়ে হলেও এই বোনের লজ্জা রক্ষা করব। বোনকে সবসময় সুস্থ,স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করব।বোনের দায়িত্ব গ্রহণ করব।

যখন কৌরব কুল সমস্ত মান্যগণ্য ব্যক্তিদের কাছে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে তাঁদের বধূ, পাঞ্চালির অর্থাৎ দৌপ্রদীর বস্ত্রহরণ করতে যায় তখন দৌপ্রদীর লজ্জা রক্ষা করেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।অর্থাৎ দৌপ্রদীর সেই ভাই।এই হল পুরাণের এক চালচিত্ৰ রাখীবন্ধনের। শ্রীবিষ্ণু বলীরাজের কাছে যখন গিয়েছিলেন, শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে মা লক্ষ্মীর বিরহ ঘটে তখন মা লক্ষ্মী বলীরাজের হাতে রাখী পরিয়ে ভাই পাতিয়ে ছিলেন।

পরবর্তীকালে দেখা যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রত্যেকটি মানুষের সাথে প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করার জন্য জাতি,ধর্ম, বর্ণ সমস্ত কিছুকে এক করে সম্প্রীতির বন্ধনে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন রাখীবন্ধনের মাধ্যমে।

যে তিথিতে তিনি এই রাখীবন্ধনের হলুদ সুতো দিয়ে উৎসবটি পালন করেন সেই তিথি পূর্ণিমা তিথি ছিল বলেই এখনও সেই তিথিকে রাখী পূর্ণিমা বলা হয়।

এই রাখী পূর্ণিমার দিনই শ্রীকৃষ্ণ  ও শ্রীরাধার যুগলবন্দী অবস্থায় ঝুলনযাত্রায় সমাপ্তি দিন হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাখীবন্ধন বিভিন্ন প্রান্তে কোথাও যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পূর্বে মা স্ত্রী তার সন্তানকে বা তার স্বামীকে রক্ষাবন্ধন হিসাবে হাতে এই বন্ধন বেঁধে দেয়।যাতে একজন মা তার সন্তানের এবং স্ত্রী তার স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করে যেন সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে পারে তার জন্য।

বর্তমানে ভাই বোনের মধ্যে পবিত্র সম্পর্ক প্রতিস্থাপন ভাইদের দীর্ঘায়ু কামনা একমাত্ৰ লক্ষ্য বোনের এবং ভাইয়ের বোনের প্রতি দায়িত্ব থাকার শপথ এই রাখিবন্ধন উৎসব। তাই ভাইয়ের শপথ হিসাবে মাতৃতুল্য বোন বা দিদিভাইয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে এই রাখীবন্ধনের দিন।বোন তো তেমন মায়ের মতো সেবা যত্ন ভালোবাসা দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করে।তাই বলি হে ঈশ্বর তুমি আমাকে পৃথিবী শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছো আমার দিদিভাই বা বোনেদের উপহার দিয়ে।ঠিক একইভাবে বোন হিসাবে ঈশ্বরের কাছে বলে যে ঈশ্বর তুমি আমার ভাইকে উপহার দিয়েছো বা দাদাকে উপহার দিয়েছো পিতৃতুল্য দেবরূপে ঈশ্বরের পৃথিবী-শ্রেষ্ঠ এই উপহার ভাইবোনের সম্পর্ক।

স্নেহ, ভালোবাসা রাখীবন্ধনের মাধ্যমে যেন তা চিরকাল অটুট থাকে,চিরকাল তা স্বাভাবিকভাবে থাকে এটা যেন চিরতরে অমর হয়ে থাকে এই রাখীবন্ধন।

No comments:

Post a Comment