Tuesday, December 21, 2021

মাঠকুটির (পর্ব ২) - শওকত নূর

মাঠকুটির (পর্ব ২)

- শওকত নূর


বৃদ্ধ ডাক্তার খানিকটা দেরিতে এসেছেন। তবে আগেভাগে এলেও ফলাফলে বিন্দুমাত্র তারতম্য ঘটার অজুহাত  ছিল  না।  দূরাগত মাঠকুটিরবাসিনী  ভোররাতেই বৈধব্য বরণ করেছেন। তিনি সংজ্ঞাহীন। ছোট ছেলেমেয়ে দুটি কাঁদছে বিরামহীন, দিশাহীন! এ দু বছরে বাড়িটিতে জমে থাকা নির্জনতায় আজ প্রকট চির ধরেছে। দু' বছরে গড়ে ওঠা স্বজন ব্যবধানও ঘুচে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। বাড়ি এখন অভূতপূর্ব জনাকীর্ণ। ডাক্তার একবারমাত্র নিস্পন্দ কুটির মালিকের নাড়ি পরীক্ষা করলেন। এ তার কর্তব্য বলেই। ফি প্রত্যাখ্যানজনিত  মৃদু হৃদপ্রশস্তির সাথে স্বাভাবিক মানবিক বিষণ্ণতায় আঙিনা পেরোলেন তিনি। 

ভোররাতের মৃত্যু কুটির মালিকের যাবতীয় অপরাধ মার্জনা করে দিয়ে  গেছে। হতদরিদ্র হয়ে ধনীর দুলালীকে ফুঁসলে প্রেম বিয়ের অপরাধ। কলজে-ভালব তার আগেই কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? নাকি পিতৃগৃহ ত্যাগের পূর্বেকার ক' বছর ও পরবর্তীতে এখানকার দু' বছরের ধুকপুকানিতে অজান্তে গেছে? যখন তা জানা হয়েছে তখন এই কুলত্যাগী একাকী কুটিরবাসীনির জন্য করণীয় কিছু নেই। আজ ভোরের সূর্যোদয়ে ব্যবধানটি ঘুচে গিয়ে সকল পক্ষের সকল স্বজন কিংবা স্বজনরূপীদের টেনে এনেছে এ মাঠকুটির প্রাঙ্গণে। জানাজা শেষে যখন সমাহিতের প্রশ্ন-তোলপাড় উঠেছে, কুটিরবাসীনির তখন সংজ্ঞা ফিরেছে। শেষযাত্রা পূর্বে কুটিরমালিক তার শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়ে গেছে। সেই ইচ্ছেমতে তাকে কুটির পেছনের নবযৌবনা আতাগাছটির তলেই সমাহিত করা হল। একে একে সমস্ত আগতের প্রস্থান ঘটেছে। কুটিরবাসীনি দুই শিশুসন্তান নিয়ে কুটিরমালিকের অপর শেষ ইচ্ছের দাম দিতে মাঠকুটিরেই থেকে যান।

দিন অতিবাহিতের সাথে কুটির থেকে নিত্য বিলাপের সুর ভেসে আসে। লোকজন কুটিরবাসীনিকে কুটিরের বাইরে ক্বচিৎ দেখতে পায়। এভাবে মাসখানেক অতিক্রান্ত হয়। এক  ভোরে কোনও অজ্ঞাত কারণে কুটিরবাসীনি একদল নারী-পুরুষের সাথে তার শিশু-সন্তান দুটিকে নিয়ে কুটির ছাড়েন। তারপর আর কখনো সেখানে তাকে লক্ষ্য করেনি কেউ। কুটিরটি পরিত্যক্ত হলেও বছরের পর বছর মাঝমাঠে তেমনি  থেকে গেছে। সময় ধারায় পেছনের আতা গাছটি বেশ উঁচু হয়ে উঠেছে । চারদিকে নজর কাড়ার মতো বেড়ে উঠেছে নানা প্রজাতির আরো কতক গাছ। টিংকু শাহরিয়ার এখন পাকাপোক্ত শহরবাসী। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে চাকরি ও সংসারজীবনে প্রবেশ করেছে। সন্তানাদির বাবা হয়েছে। এক ছেলে এক মেয়ে তার। দু'জনই শিশু। তাদের নিয়ে বছরে দু'একবার সে গাঁয়ের বাড়িতে যায়। দু' চারদিন করে সেখানে থাকে। অভ্যাসবশত সময় পেলে সকাল সন্ধ্যা ফসলমাঠটিতে ঢুঁ দেয়। দূর থেকে কুটিরটি দেখে। সেখানকার বেশ কিছু বিশেষ পরিবর্তন ইদানিং তার নজর কাড়ে। জীর্ণ দশার বদলে কুটির পরিসর যেন অনেকটা শক্ত সামর্থ্য হয়েছে। চারদিকে সারিবদ্ধ কাঁটাগাছের বেড়ার সাথে কাঁটাতারের বেষ্টনী উঠেছে। নানা প্রজাতির ফুলের গাছও ফুল সমেত চোখে পড়ে। পাখির বিচরণ ও কলকাকলি আগের তুলনায় ঢের বেড়েছে।                                                        

তেমনি  শীত শেষের এক সন্ধ্যা প্রাক্কাল। টিংকু শাহরিয়ার তার ছেলে মেয়ে দুটিকে নিয়ে শস্য মাঠের কোণায় দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতি জুড়ে সবুজ লালাভার মাখামাখিতে বেশ আপ্লুত  ছেলেমেয়ে দুটি। মটরশুঁটির আল ধরে তারা দৌড়ছুট দিচ্ছে খুব। টিংকু শাহরিয়ার লক্ষ্য করল অদূরের কুটির পেছনের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলেছে একজোড়া  তরুণ  

তরুণী। তাদের গায়ে বেশ বর্ণিল পোশাক পরিচ্ছদ  । কারা এরা? এ এলাকা এখন অনেক পাল্টেছে। খানিকটা দূরেই পাকা সড়ক। যানবাহনে বিচিত্র লোকজন ওঠানামা, আসা যাওয়া করে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত মেঠোপথ ধরে চেনা অচেনা অনেকের  চলাচল সাধারণ । কিন্তু এ মোনাজাতকারীদের কী পরিচয় পরিচিতি বা আবাস গন্তব্য? তারা কি কবরবাসীর ঘনিষ্ঠ কেউ, নাকি নেহায়েত মাঠ অতিক্রম করতে থাকা পথিক মাত্র? 

ভাবতে ভাবতে নিজ ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা চালায়  টিংকু শাহরিয়ার। কিছুক্ষণ হাঁটতে ওই   তরুণ তরুণী  গাছিয়ে পড়ে তার মুখোমুখি। বিনীত সালাম ঠোকে তারা। বেশ কৌতূহল তাদের চোখেমুখে। আপনারা? অস্ফুট প্রশ্ন করে টিংকু শাহরিয়ার। 

অমুক গাঁয়ে বাড়ি। সমস্বরে জানায় তরুণ তরুণী । 

এ কবরস্থানে? 

আংকেল, এটা আমাদের আব্বুর কবর। 

ও -- তা আপনারা-? 

আংকেল,  আমরা বছরে ক'বার এখানে আসি। 

কোত্থেকে? 

শহর থেকে। শহরেই থাকি আমরা। গাঁয়ে যাওয়া আসার পথে এখানে কিছু সময় কাটাই, মোনাজাত করি। 

আপনাদের মা, উনি এখন --

আম্মু বেঁচে নেই। আব্বু মারা যাবার দু'বছর পর তিনিও --

বুঝেছি৷ 

তা আপনারা শহরে --

শহরে আমরা আমাদের মামার বাসায় থেকে পড়ালেখা করি। দু'জনই ডাক্তারি পড়ছি। 

তা সন্ধ্যা তো ঘনালো। যাবেন কিভাবে? থেকে যান আজ? 

না আংকেল, সমস্যা নেই। গাড়ি আছে আমাদের। ওই যে সড়কে দাঁড়ানো। আংকেল, আপনার বাড়ি কি এ গাঁয়েই? 

জি । 

বেশ তো ছেলেমেয়ে দুটি। এই যে বাবু, এই যে সোনা, এসো, এসো, কোলে নেই। নাহ্  ভয় পেয়েছে, থাক। আংকেল, চলি। 

জি!                     

তরুণ তরুণী মেঠোপথ ধরে হেঁটে চলে। হালকা শীতার্ত বাতাস বইছিল। এরই মধ্যে অন্ধকারও খানিকটা ঘনিয়েছে। টিংকু শাহরিয়ারের মনে নানা কথাই এ সময়ে  জমা হয়েছে। তরুণ তরুণীকে তা বলতে গিয়েও সে নিজেকে সংযত করেছে। তাদের  প্রয়াত মায়ের সাথে ক' মুহূর্তের সামান্য কথা পরিচয়, কিছু নিষ্ফল উপকার প্রয়াস -এ আর ঘটা করে তাদের জানাবার কী হলো? অব্যক্ত কথা বুকে সে নিজ ছেলেমেয়ে দুটির হাত শক্ত করে ধরে বাড়ি অভিমুখে হাঁটতে থাকে।

No comments:

Post a Comment