Saturday, June 19, 2021

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস - সৌম্য ঘোষ

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস

- সৌম্য ঘোষ


             বাঙালির জীবনকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শের মিলনভূমিতে স্থাপন করে মননশীল সাহিত্য, কথাসাহিত্য, দেশ ও দশের কথা প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে বাঙালিকে যিনি ঊনবিংশ শতাব্দী জীবন রহস্য ও প্রাণবাণীতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন,  তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর 'বঙ্গদর্শন' বাঙালি সমাজ আদর্শ ও আত্মদর্শনের বীজ মন্ত্র খুঁজে পেয়েছিল। তিনিই বাঙালি মনকে সুদৃঢ় করে, সংস্কারকে যুক্তি দিয়ে, প্রাচীন ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করে,  স্বদেশ মন্ত্র দীক্ষায় নতুন মানববোধের  পন্থা নির্দেশ করেছিলেন। পাশ্চাত্য উপন্যাস ও রোমান্সের প্রভাবে সর্বপ্রথম বাংলা উপন্যাসের রূপরেখাটি সার্থকভাবে নির্মাণ করেছিলেন তিনি। 
        তাঁর লিখিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ টি। যথা, দুর্গেশ নন্দিনী(১৮৬৫), কপালকুণ্ডলা(১৮৬৬), মৃণালিনী(১৮৬৯), বিষবৃক্ষ(১৮৭৩), ইন্দিরা(১৮৭৩), যুগলাঙ্গুরীয়(১৮৭৪), চন্দ্রশেখর(১৮৭৫), রজনী(১৮৭৭), কৃষ্ণকান্তের উইল(১৮৭৮), রাজসিংহ(১৮৮২), আনন্দমঠ(১৮৮৪),  দেবী চৌধুরানী(১৮৭৪), রাধারানী(১৮৮৬), সীতারাম(১৮৮৭)।
           তাঁর উপন্যাসগুলির গঠনগত আভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন,
(১) ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাস;
(২) তত্ত্ব দেশাত্মবোধক উপন্যাস;
(৩) সমাজ ও গার্হস্থ্য ধর্মী উপন্যাস।

            
           এই প্রসঙ্গে সর্বপ্রথমে ইতিহাস ও রোমান্সধর্মী উপন্যাসকে আলোচনা করি। এই শ্রেণীর উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য---- দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর ,রাজসিংহ এবং সীতারাম। দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসে বিমলা-আয়েশা- তিলোত্তমা, আবার কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে কপালকুণ্ডলা-মতিবিবি-নবকুমার, মৃণালিনী উপন্যাসে হেমচন্দ্র-পশুপতি-মৃণালিনী-মনোরমা
চন্দ্রশেখর উপন্যাসে চন্দ্রশেখর, প্রতাপ-শৈবালিনী প্রভৃতি চরিত্র ও তাদের ঘটনা অনেকাংশেই কাল্পনিক। ‌ অসাধারণকে অবলম্বন করে ভাবআশ্রয় উদ্ভুত রহস্য  বাস্তবতার জীবন, সত্য মানুষ সত্যের স্বীকৃতিতে, প্রত্যক্ষ  আনন্দ নিয়ে তাঁর রোমান্সধর্মী উপন্যাস দূর্গেশনন্দিনি রচিত হয়েছে। 
      কপালকুণ্ডলায় রয়েছে নদী ও অরণ্য। কপালকুন্ডলার বিবাহিত সামাজিক জীবনে নানা দুঃখজনক নিয়তি। মৃণালিনী উপন্যাসে অপূর্ব কাহিনী। গ্রন্থ ও চরিত্র বিন্যাসে রচিত যুগের ঐতিহাসিক উপাদানের অনুমান নির্ভর ও ইতিহাস মিশ্রিত কাহিনী। যুগলাঙ্গুরীয় উপন্যাসের কাহিনী এবং চরিত্রগত দিক থেকে উপন্যাসটিতে হিন্দু আমলের একটি রোমান্টিক প্রেমের গল্প। চন্দ্রশেখর উপন্যাসে মীর কাশিমের সময়ের পটভূমিকায় রচিত উপন্যাস, যেখানে নীতির মাপকাঠিতে প্রতাপ ও শৈবালিনীর সম্পর্ক বিচার করে চিত্ত
 সংযমে অসমর্থ শৈবালিনীর নরকযন্ত্রণা ভোগের প্রায়শ্চিত্তের কথা বর্ণিত হয়েছে। রাজসিংহ উপন্যাস বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাস। তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক প্রণয়ের নানা উপকাহিনী ইতিহাস রসকে অক্ষুন্ন রেখে সংযোজিত হয়েছে। সীতারাম উপন্যাসে ইতিহাসের আভাস ক্ষীণতম। রূপের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে অধঃপতনের চিত্র। 

                বঙ্কিমচন্দ্রের তত্ত্ব ও দেশাত্মবোধক উপন্যাস হলো আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী। আনন্দমঠ উত্তরবঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে রচিত। এখানে অন্তর্ভুক্ত বন্দেমাতরম সংগীত পরাধীন জাতির বীজ মন্ত্র!
বঙ্গদেশে মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসটি। মহেন্দ্র, কল্যাণী, ভবানন্দ, সত্যানন্দ, জীবানন্দ, নিমাই প্রভৃতি চরিত্রের উপস্থাপনায় দেশাত্মবোধক এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেশ-সমাজ-ধর্ম ও জাতীয়তা সম্পর্কে নতুন ভাবনা ও আত্মদর্শন প্রকাশ করেছেন।
দেবীচৌধুরানী উপন্যাসে সূক্ষ্ম ধর্মীয় অনুভূতি ও হিন্দু সমাজের সামাজিক আচার আচরণ ও নানা তথ্য ও তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়েছে। 

           বঙ্কিমচন্দ্রের সমাজ গার্হস্থ্য ধর্মের উপন্যাসগুলি হল -----
বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাধারানী। এখানে ইতিহাস বা তত্ত্ব কথা নয়। নর-নারীর মনের বিচিত্র ভাব এবং সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে তাঁর এই শ্রেণীর উপন্যাস গঠিত ও রচিত। বিষবৃক্ষ উপন্যাস বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ, ব্রাহ্ম আন্দোলনের মত সমকালীন নানা সামাজিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ উত্থাপনের পাশাপাশি বৈধব্য সাপেক্ষ মনস্তাত্ত্বিক জটিল ত্রিভুজ প্রেমের ছন্দ অভিঘাতের বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে। ইন্দিরা উপন্যাসে উজ্জল প্রতিভার স্বাক্ষর। এই কাহিনী ক্ষুদ্র অবয়বে দাম্পত্য জীবনের রস সন্ধানী বৃষ্টিদর্শন। বঙ্কিমচন্দ্রের রজনী উপন্যাস লর্ড লিটনের 'the last days of Pompeii' এর অন্ধ ফুলওয়ালী চরিত্রের প্রভাবে রচিত। যেখানে নীতির সমাজ সংস্কার প্রবল হৃদয়বৃত্তির স্রোতে ভেসে যায়,  সেখানে নীতির প্রশ্নে নারী হৃদয়ের দুর্বলতম ব্যথার অমর্যাদা করেননি বঙ্কিমচন্দ্র।
তাঁর রচিত কৃষ্ণকান্তের উইল একটি কালজয়ী গার্হস্থ্য ধর্মের উপন্যাস। এখানেও তিনি অঙ্কন করেছেন ত্রিকোণ প্রেমের জটিল মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। কাহিনী গ্রন্থ ও চরিত্র সন্নিবেশে নারীর আকাঙ্ক্ষা ও প্রকৃতির সঙ্গে সংস্কারের দ্বন্দ্ব ও পুরুষের নৈতিক অধঃপতনের মনস্তাত্ত্বিক জটিল চিত্র প্রকাশ পেয়েছে ভ্রমর-রোহিণী-গোবিন্দলালের ত্রিকোণ চিত্রের মাধ্যমে। রাধারানী উপন্যাসে দেবেন্দ্র নারায়ন-রুক্নিণী কুমারের গল্প। এখানেই জীবন সমস্যার চিত্র নয়, আছে সাধারণ প্রেম কথা।

          প্রাচ্য-পাশ্চাত্য ভাবধারার সমন্বয় সাধন করে বাংলা উপন্যাসের প্রথম যথার্থ শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি দেশ, সমাজ ও জাতি, সামাজিক আন্দোলন, সাংসারিক জীবনের নারীর দৈহিক-মানসিক আকুতিজনিত প্রবৃত্তির জটিলতা, নীতিবাদী দর্শনে ও ঐতিহাসিক মননে চিত্রিত করেছেন বাংলা উপন্যাস। বিষয় নির্বাচন, বাচনভঙ্গির উৎকর্ষতায় প্রাচ্য-পাশ্চাত্য আদর্শে রচিত তাঁর উপন্যাস-শিল্প। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলা উপন্যাসের প্রথম যথার্থ শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র।।

3 comments: