Tuesday, July 6, 2021

রবীন্দ্র মূল্যায়নে মহাভারত - সৌম্য ঘোষ

রবীন্দ্র মূল্যায়নে মহাভারত

- সৌম্য ঘোষ


                   পৃথিবীর চারটি প্রধান মহাকাব্যের মধ্যে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের মহাভারত অন্যতম। অন্যদিকে ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারতবর্ষীয় সনাতন ঐতিহ্যের আবহাওয়ায় লালিত রবীন্দ্রনাথের জীবনে মহাভারতের প্রভাব বিপুল। সেই বিপুলতাতেই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য জুড়ে মহাভারতের জয়জয়কার। শৈশব থেকেই মহাভারতের কাহিনীকে শুনতে শুনতে বড় হয়েছিলেন তিনি। তাই তিনি নিজে যখন কলম ধরলেন, তখন মহাভারতের দর্শন ও আখ্যান, ইতিহাস ও চরিত্র প্রভৃতি বিষয় এসে ক্রমে ভিড় করেছিল রবীন্দ্রনাথের  লেখায়ও।

            মহাকাব্য নিয়ে সমালোচনা রচনায় রবীন্দ্রনাথ প্রথম হাত দেন ১৮৭৭ সালে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা। প্রথম সে দীর্ঘ এবং তীব্র সমালোচনাটি শুধু রামায়ণ আশ্রিত হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর রবীন্দ্রনাথ  আর এক মহাকাব্যের  সমালোচনা প্রকাশ করেন। তুলনায়  অধিক পরিশীলিত আলোচনাটি কবির মহাকাব্যিক ভাবনাকে নির্মাণ করেছে। ১২৮৯ বঙ্গাব্দে ভাদ্র সংখ্যায় সাহিত্য পত্রিকা 'ভারতী'তে প্রকাশিত সেই প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ মহাভারতকে একটি মহান ট্রাজেডি হিসেবে ব্যক্ত করেছেন।

 ট্রাজেডির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, "সাধারণভাবে আমরা ধরে নেই যে, ঘটনার শেষে মৃত্যু না হলে ট্রাজেডি হয় না। মহাভারতের শেষে স্বর্গারোহণকালে দ্রৌপদী, ভীম, অর্জুন প্রমুখের মৃত্যু হয়েছিল বলেই মহাভারত একটি ট্রাজেডি তা নয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বড় বড় বীর যেমন ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণসহ হাজার হাজার রাজা ও সৈন্য মরেছিল বলেই মহাভারত ট্রাজেডি নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের যে জয় হল, তখনই তাদের প্রকৃত ট্রাজেডি শুরু হল। কেননা এত দুঃখ, এত যুদ্ধ, এত রক্তপাতের পর তারা দেখলেন যে, যতটা তারা করেছেন সে তুলনায় প্রাপ্তি অতি সামান্য।" 
একুশ বছরের যুবক রবীন্দ্রনাথের এই লেখায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, তিনি মহাকাব্য, বিশেষ করে মহাভারত নিয়ে একটি দার্শনিক বোধে উপনীত হয়েছেন।

            ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাধিক  প্রবন্ধ। আর সে সবকে ছাপিয়ে ১৮৯১ সালে প্রকাশ পায় 'নূতন ও পুরাতন' প্রবন্ধটি। স্বদেশ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত সেই প্রবন্ধে কবি প্রাচীন ভারতবর্ষে জ্ঞানের সঙ্গে বর্তমান ইউরোপের জ্ঞানের একটি তুলনা করেছেন। ভারতীয় পন্ডিতদের পবিত্রতাগত যে শুচিবাই, কবি তাকে বাতিল করেছেন। বলেছেন, বিবিধ বিদ্যা ও মানুষের যাতায়াতের কারণে প্রাচীন ভারতের ঐশ্বর্য বিনষ্ট হয়নি, বরং সেটি উত্তরোত্তর অগ্রগতি লাভ করেছে। উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ মহাভারতকে আশ্রয় করেছেন। বলেছেন, "এক মহাভারত পড়লেই দেখতে পাওয়া যায় আমাদের তখনকার সভ্যতার মধ্যে জীবনের আবেগ কত বলবান ছিল।"  তার মধ্যে কত পরির্বতন, কত সমাজ বিপ্লব, কত বিরোধী শক্তির সংঘর্ষ দেখতে পাওয়া যায়। সমাজে একদিকে লোভ, হিংসা, ভয়, অসংযত অহংকার, অন্যদিকে বিনয়, বীরত্ব, আত্মবিসর্জন, উদার মহত্ত্ব এবং অপূর্ব সাধুভাব মানুষের চরিত্রকে মথিত করে জাগ্রত করে রেখেছিল বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন। প্রাচীন সে সমাজে ভালো-মন্দের আলো-অন্ধকারের ভেতরেই জীবন ছিল বলে কবির ভাবনা। বিপরীত মানবচরিত্রের উপস্থিতির কথা বলতে গিয়ে তিনি উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন যে, সে সমাজে বিশ্বমিত্রর মতো ক্ষত্রিয় ছিলেন, দ্রোণ বা কৃপের মতো ব্রাহ্মণ ছিলেন, দ্রৌপদীর মতো রমণীও ছিলেন।
'নূতন ও পুরাতন' রচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ত্রিশের কোঠায় উপনীত। সে বছরগুলোতেই তিনি ক্রমে মহাভারতের কাহিনীকে আশ্রয় করে নিজে রচনা শুরু করেছেন কবিতা-নাটকে। বোঝা যায় মহাভারতকে নিয়ে নতুন যে সাহিত্য নির্মাণ, তা করতে গিয়েই রবীন্দ্রনাথ ক্রমে হয়ে উঠছেন একজন মহাভারত বিশেষজ্ঞ। তিনি নিজেই শুধু মহাভারত পড়ছেন তাই নয়, মহাভারত যাতে অন্যদের পাঠযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, সে বিষয়টিও তাঁর মাথায় ক্রিয়াশীল। আর সেই কারণেই আমরা দেখি এ সময়ের কিছুদিন পর  তিনি পুত্রকন্যাদের জন্য  রামায়ণ ও মহাভারত এর শিশুতোষ সংস্করণের ব্যাপারেও বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ভাগিনেয় সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে (১৮৭২-১৯৪০) যিনি ইন্দিরা দেবীর (১৮৭৩-১৯৬০) ভাই,  তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন মহাভারতের তেমন একটি সংস্করণ করতে। গ্রন্থটির নাম ছিল কুরুপাণ্ডব। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে প্রকাশিত সে গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ ছাপা হয় ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে। ২৫ বৈশাখ তারিখে রচিত রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাটি মাত্র আধ
পৃষ্ঠার হলেও গ্রন্থের নামপত্রে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নামই মুদ্রিত ছিল। 
সাহিত্য সমালোচনার এই ধারাতে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী প্রবন্ধ 'কৃষ্ণ চরিত'। বাংলা উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) একই শিরোনামের দীর্ঘ গবেষণা গ্রন্থ নিয়ে এই আলোচনা। মহাভারত-প্রাসঙ্গিকতার 'কৃষ্ণচরিত' বিশেষ মূল্যবান। 'বঙ্কিমচন্দ্র' শিরোনামেও রবীন্দ্রনাথের রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ। যেগুলো মহাভারত প্রেক্ষাপটে বিবেচনাযোগ্য। জীবনী স্মৃতিতে রয়েছে 'বঙ্কিমচন্দ্র' নামের একটি রচনা। ১৩০১ বঙ্গাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর পর আয়োজিত শোকসভায় তিনি একই শিরোনামের আরও একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন।
             পরবর্তীকালে 'বঙ্কিমচন্দ্র' শিরোনামের আরও তিনটি রচনা রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত বা লিখিত হয়েছিল।
           যাঁরা 'কৃষ্ণচরিত' শিরোনামে বঙ্কিমের গ্রন্থটি পাঠ করেছেন তাঁদের জানা আছে এটি রীতিমতো তথ্যবহুল, চিন্তা উদ্রেককারী এবং একই সঙ্গে ইতিহাস-নির্মাণকারী একটি প্রবন্ধ। এ বইটিই সম্ভবত প্রথম এমন একটি বই যেখানে হিন্দুধর্মের অবতার শ্রীকৃষ্ণকে একটি ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যেসব হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি রয়েছে সেসবকে অবলম্বন করেই এটির রচনা। মহাভারত, হরিবংশ এবং ভাগবতকে প্রধান বিবেচনায় এনে বঙ্কিম লিখেছেন, ''কৃষ্ণে'র ঈশ্বরত্ব প্রমাণ করা এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য নহে। তাঁহার মানবচরিত্র সমালোচনা করাই আমার উদ্দেশ্য।" ১৮৯২ সালে প্রকাশিত সে গ্রন্থ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আলোচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩০১ বঙ্গাব্দে।

           'কৃষ্ণচরিত' প্রবন্ধটিতে লেখক রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস ও পুরাণ বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের  মিলনকে উপস্থিত করেছেন সাহিত্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে। ভূমিকা সেরেই তিনি বলেছেন "আমাদের মতে 'কৃষ্ণচরিত' গ্রন্থের নায়ক কৃষ্ণ নহেন, তাহার প্রধান অধিনায়ক, স্বাধীন বুদ্ধি, সচেষ্ট চিত্তবৃত্তি"। ইতিহাস সমালোচনায় প্রথম সে গ্রন্থটির বিষয়ে যেহেতু আগে কেউ আলোকপাত করেনি, তাই সেটি ভাঙার ও গড়ার দায়িত্বও যে বঙ্কিমকে নিতে হয়েছে তা রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন।  সমালোচকের মতো তিনি বলেছেন, "কোনটা ইতিহাস, আর কোনটা ইতিহাস নয়  তাহা স্থির করিবার  বিপুল পরিশ্রমের ও বিচক্ষণতার কাজ। আমাদের বিবেচনায় বর্তমান গ্রন্থে বঙ্কিম সেই ভাঙিবার কাজ অনেকটা পরিমাণে শেষ করিয়াছেন। গড়িবার কাজে ভালো করিয়া হস্তক্ষেপ করিবার অবসর নাই।" বুঝতে বাকি থাকে না, রবীন্দ্রনাথ যুক্তির প্রাখর্য দিয়ে ইতিহাসের গভীরতাকে পরিমাপ করার চেষ্টা করেছেন এ প্রবন্ধে।

                      বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গ্রন্থে লিখেছিলেন, মহাভারতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখকের হাত পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ যুক্তি খতিয়ে সেটি মেনে নিলেও প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন সময়ে মহাভারতের বিভিন্ন হাত নির্ণয়ের উপায়হীনতা নিয়ে। বঙ্কিম যেভাবে কৃষ্ণের চরিত্রের অতি প্রাকৃত অংশ বর্জনের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন তাঁর বইতে, রবীন্দ্রনাথ তা মানতে নারাজ। সমালোচক রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, একটি বড় লোক এবং বড় ঘটনা সম্পর্কে দেশে বিভিন্ন জনশ্রুতি তথা মিথ চালু থাকে। আর সেসবের ভিত্তিতেই কৃষ্ণকে কেউ কেউ ধর্মশীল দেবতা আবার কেউ কেউ কূটবুদ্ধি  রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত করতে চান। রবীন্দ্রনাথের মতে 'সম্ভবত উভয়ের চিত্রই অসম্পূর্ণ; এবং পরস্পরবিরোধী হইলেও সম্ভবত উভয়ের রচনাতেই আংশিক সত্য আছে।  ভাবতে বিস্ময় লাগে, ত্রিশ বছর পার করতেই হিন্দুধর্ম, পুরাণ এবং মহাভারত বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের এমন উচ্চতায় উপনীত হওয়া।

          কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি নিজেই একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন প্রবন্ধটিতে। তাঁর মতে ইংরেজি 'ফ্যাক্ট' অপেক্ষা 'সত্য' অনেক বেশি ব্যাপক। তিনি বলেছেন মহাভারতের কবি বর্ণিত কৃষ্ণচরিত্রের প্রত্যেকটি তথ্য প্রকৃত নাও হতে পারে, কৃষ্ণের মুখে যত কথা বলানো হয়েছে এবং তাঁর উপর যত কাজ আরোপ করা হয়েছে সেসবের প্রত্যেকটি প্রমাণিত নাও হতে পারে, কিন্তু কৃষ্ণের যে মাহাত্ম্য তাঁরা পাঠকের মনে এঁকে দিয়েছেন সেটিই সর্বাপেক্ষা মহামূল্য সত্য। আর এভাবেই মহাভারতের লেখকের সঙ্গে আধুনিক বাংলায় লেখকের একাত্মতা ঘটেছে প্রবন্ধটিতে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ''কৃষ্ণ যে কথা বলেন নাই কিন্তু যে কথা কেবল কৃষ্ণই বলিতে পারিতেন, সেই কথা কৃষ্ণকে বলাইয়া, কৃষ্ণ যে কাজ করেন নাই কিন্তু যে কাজ কেবল কৃষ্ণই করিতে পারিতেন সেই কাজ কৃষ্ণকে করাইয়া কবি 'বাস্তবিক কৃষ্ণ' অপেক্ষা 'তাঁহার কৃষ্ণ'কে অধিক সত্য করিয়া তুলিয়াছেন।''  আমরা দেখেছি এ প্রবন্ধ রচনা কালেও রবীন্দ্রনাথ নিজেও তৈরি করে চলেছেন বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি সত্যের। যার ফলে আমরা পেয়েছি চিত্রাঙ্গদা, 'বিদায়-অভিশাপ', 'গান্ধারীর-আবেদন', 'নরকবাস' এবং 'কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ।

                        মহাভারত মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথের যে ব্যক্তিগত উচ্চতা তা সবচেয়ে বেশি গভীরতায় সম্ভবত 'কৃষ্ণচরিত্র' প্রবন্ধেই প্রকাশিত। সে মহাকাব্যের নির্মাতা, তাঁর কাব্যিক উদ্যোগ, চরিত্র সৃষ্টি, ঘটনাপ্রবাহ, যৌক্তিকতা প্রভৃতি সব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ মূল্যায়ন প্রকাশ পেয়েছে এ রচনায়। মহাভারতের বিভিন্ন মহৎ চরিত্রর কাজ সম্পাদনের প্রসঙ্গ তুলে সমালোচক বলেছেন এমন আরোপ 'ছোট কবিদের সাহসে কুলাইত না।

              শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে রবীন্দ্র-মানসের মহাভারত চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায় যেটির অধিকতর পূর্ণ রূপ ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারনা। ১৯১১ সালে প্রকাশিত সে প্রবন্ধের  এ বিষয়ের দর্শনের ছাপ পাওয়া যায় 'ভাষা ও ছন্দ' নামের কবিতায়। নারদ ও বাল্মীকির সংলাপের এক পর্যায়ে নারদ বলেছেন,

"সেই সত্য যা রচিবে তুমি,

ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি

রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।"

                     মহাকাব্যের কাহিনীর পুনর্নির্মাণের এ সময়কালের রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক বোধে সিক্ত  পঙক্তিগুলোতে মূর্ত। রবীন্দ্র মননে মহাভারতের এই ব্যাপকতা 'ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারনায় প্রকাশ লাভ করার আগে তাঁর সুসংহত ভাবনার প্রকাশ ঘটেছিল অন্য আরও যে তিনটি প্রবন্ধে সেগুলো হল 'কাদম্বরী চিত্র' (১৩০৬ বঙ্গাব্দ), 'কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা (১৩০৮ বঙ্গাব্দ) এবং 'রামায়ণ'(১৩১০ বঙ্গাব্দ)। তিনটি প্রবন্ধই কবির প্রাচীন সাহিত্য গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।

           'কাদম্বরী চিত্র' প্রবন্ধের প্রথম বাক্য প্রাচীন ভারতবর্ষের অনেক বিষয়ে অসামান্যতা ছিল সন্দেহ নাই।  রবীন্দ্রনাথ তেমন সব অসামান্যতার উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন অন্য দেশে সভ্যতা নগর থেকে সৃষ্টি, ভারতবর্ষে সেটি হয়েছে অরণ্য থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন সব গুণকীর্তনের এক পর্যায়ে এসেছে মহাভারতের কথা। তাঁর ভাষায় ''ভগবদগীতার মাহাত্ম্য কেহ অস্বীকার করিতে পারিবে না, কিন্তু যখন কুরুক্ষেত্রের তুমুল যুদ্ধ আসন্ন তখন সমস্ত ভগবদ্গীতা অবহিত হইয়া শ্রবণ করিতে পারে, ভারতবর্ষ ছাড়া এমন দেশ জগতে আর নাই।  গল্পের শেষ শোনাটা যেমন অন্যদের বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয় ভারতবর্ষীদের তা নয়, আর তাই আঠারো খন্ডের বিপুলায়তন মহাভারত অকাতর চিত্তে মৃদুমন্দগতিতে পরিভ্রমণ করতে কোনো ক্লান্তিবোধ হয় না।''  মহাভারত বিষয়ে এভাবেই ক্রমে ক্রমে দার্শনিকতার একটি স্তরে পৌঁছে গেছে। যার আধুনিক বাংলা ভাষার সাহিত্য নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মহাভারতের লেখকের বিপুল প্রশংসায় অকাতর তিনি। কাহিনী ও চরিত্রের যেসব স্থানে আমরা সাধারণ পাঠক ব্যাসদেবের ত্রুটি ধরি, সেসব জায়গায় মহাভারত রচয়িতাকে উৎরে দিয়েছেন তিনি। দস্যুদল যখন কৃষ্ণের যাদব রমণীদের অপহরণ করে নিয়ে যায় তখন সে আখ্যান সাধারণের কাছে অস্বাভাবিক। কেননা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিজয়ী বিপুল বিক্রমের যোদ্ধা  অর্জুন কেন সে কাজে ব্যর্থ হবেন? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ''কাহারও উপর কবির মমতা নাই। যেখানে শ্রোতা বৈরাগী, লৌকিক শৌর্য বীর্য মহত্ত্বের অবশ্যম্ভাবী পরিণাম স্মরণ করিয়া অনাসক্ত, সেখানে কবিও নির্মম এবং কাহিনীও কেবলমাত্র কৌতূহল চরিতার্থ করিবার জন্য সর্বপ্রকার ভার মোচন করিয়া দ্রুতবেগ অবলম্বন করে না।''

           পরের প্রবন্ধ 'কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা'য় মহাভারত প্রসঙ্গ সামান্য। কিন্তু তারপরও বোঝা যায় এখানে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসের উপাদান খোঁজার প্রয়াস পাচ্ছেন। মহাকবি কালিদাসের (পঞ্চম শতাব্দীতে) সাহিত্য বিষয়ে কথা বলার আগে কবি বলেছেন রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে। তাঁর ভাষায়, ''মহাভারতে যে একটা বিপুল কর্মের আন্দোলন দেখা যায় তাহার মধ্যে একটি বৃহৎ বৈরাগ্য স্থির অনিমেষভাবে রহিয়াছে। মহাভারতের কর্মেই কর্মের চরম প্রাপ্তি নহে। তাহার সমস্ত শৌর্যবীর্য,  হিংসা-প্রতিহিংসা, প্রয়াস ও সিদ্ধির মাঝখানে শ্মশান হইতে মহাপ্রস্থানের ভৈরব সংগীত বাজিয়া উঠিতেছে।'' রামায়ণ সম্পর্কেও একই রকম ভাবনা রবীন্দ্রনাথের। আর তাই তিনি মনে করেন মহাভারত হল একটি সময়ের কর্ম ও বৈরাগ্যের কাব্য। আর 'রামায়ণ' শিরোনামে কবির যে রচনা সেটি হল দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯) রচিত রামায়ণী কথা গ্রন্থের ভূমিকা।

        এ প্রবন্ধে আমরা রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি করে মহাভারত-নিষ্ঠ হিসেবে দেখি। এখানেই কবি লিখেছিলেন সেই অমোঘ বাক্য ''বস্তুত ব্যাস-বাল্মিকী তো কাহারও নাম ছিল না। ও তো একটা উদ্দেশ্যে নামকরণমাত্র।"  এভাবে মহাভারতের একক রচয়িতা হিসেবে ব্যাসের বাস্তব অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন তিনি, কিন্তু একই সঙ্গে মহাভারতকে তিনি ইতিহাসের মর্যাদার কাছাকাছি নিয়ে যান। বলেন, "রামায়ণ-মহাভারতে ভারতবর্ষ নিজেকে আর কিছুই বাকি রাখেনি। আর তাই শতাব্দী পর শতাব্দী পার হলেও ভারতবর্ষে রামায়ণ-মহাভারতের স্রোত শুকায় না।" রবীন্দ্রনাথের মতে, "এ গ্রন্থ শুধুমাত্র মহাকাব্যই নয়, এটি ইতিহাসও বটে। ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময় বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে"। রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস। আর সে জন্যই রামায়ণ-মহাভারতের আলোচনা যে অন্য কাব্য আলোচনা থেকে ভিন্ন কবি সে ইঙ্গিতও করেছেন। বলেছেন, ''আমি যত বড় সমালোচকই হই না কেন, একটি সমগ্র প্রাচীন দেশের ইতিহাস প্রবাহিত সময় কালের বিচারের নিকট যদি আমার শির নত না হয় তবে সেই ঔদ্ধত্য লজ্জারই বিষয়।"  তিনি মনে করেন ভারতবর্ষের সহস্র বছরের হৃৎপিণ্ড এখানকার মহাকাব্য দুটিতে স্পন্দিত হয়ে আসছে।

                   মহাভারত নিয়ে বিপুল আলোচনা-সমালোচনা করলেও একই শিরোনামে কবির কোনো রচনা নেই, যেমনটি 'রামায়ণ' নামে আমরা পাই। সংস্কৃত সে মহাকাব্যটির দুচারটি ছত্র কবিতায় অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তেমন কিন্তু অনূদিত পঙক্তির সন্ধান মেলে তাঁর রূপান্তরিত গ্রন্থে। তাঁর মৃত্যুর বহু পর সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত বা রূপান্তরিত রচনাগুলোকে সংকলিত করেই রূপান্তর প্রকাশ করা হয়।  কবি দুভাবে অনুবাদ করেছিলেন সেটিকে_ "সুখ বা হোক দুখ বা হোক, /প্রিয় বা অপ্রিয়, /অপরাজিত হৃদয়ে সব /বরণ করিয়া নিয়ো।  এটির অন্য পাঠ হল_ 'সুখ হোক দুঃখ হোক,/ প্রিয় হোক অথবা অপ্রিয়,/ যা পাও অপরাজিত /হৃদয়ে বহন করি নিয়ো।"
       উল্লেখ করা যেতে পারে, এটির সংস্কৃত মূল পঙক্তি 'সুখং বা যদি দুঃখনং' একসময় রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে প্রায়ই দেখা যেত। মহাভারত প্রাসঙ্গিকতায় রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ রচনা 'ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারনা। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে সেটি পরিচয় বইয়ে প্রকাশিত হওয়ার আগেই ১৩১৯ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এ পর্যায়ে এসে রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো বিশ্লেষক। ইতিহাসকে নিজের বিবেচনায় পর্যালোচনা করছেন তিনি। দার্শনিকতা দিয়ে সামগ্রিক বিষয়টিকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন।

                 গ্ৰীস, রোম, ব্যাবিলনের মহাসভ্যতা জাতি সংঘাতের ভেতর দিয়েই শুরু সে কথা বলে আরম্ভ করেছেন তিনি। তেমন জাতি সংঘাতের একটি হল ভারতবর্ষের আর্য-অনার্য সংঘাত। বলেছেন, ''ভারতবর্ষে আর্যরা কালে কালে ও দলে দলে প্রবেশ করিতেছিলেন। তাঁহাদের সকলেরই গোত্র, দেবতা ও মন্ত্র যে একই ছিল তাহা নহে। বাহির হইতে যদি একটা প্রবল আঘাত তাঁহাদিগকে বাধা না দিত তবে এই আর্য-উপনিবেশ দেখিতে দেখিতে নানা শাখা-প্রতি শাখায় সম্পূর্ণ বিভক্ত হইয়া বিক্ষিপ্ত হইয়া যাইত।  তিনি বলেছেন, অনার্যদের সঙ্গে বিরোধের দিনে যাঁরা আর্যবীর তাঁদের আমরা চিনি না, কিন্তু অনার্যদের সঙ্গে আর্যদের মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে যাঁরা অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করে সফল হয়েছেন তারাই আমাদের দেশে দেবতা।"   'দেবতা' সম্বন্ধে এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রবীন্দ্রনাথের চিন্তার প্রসারতাকে প্রমাণ করে, সন্দেহ নেই। হিন্দু সমাজের প্রধান দেবতারা এ প্রবন্ধে আলাদা এক মূল্যায়ন পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কলমে। সে দেবতাদের মধ্যে প্রথমে এসেছে বিষ্ণুর কথা। ভারতের পুরাণে যে দুজন মানব বিষ্ণুর অবতাররূপে পরিচিত অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাম তাঁরা দুজনেই ক্ষত্রিয়।

             রবীন্দ্রনাথের মতে, ''বৈদিক দেবতা যখন মানুষ হইতে পৃথক তখন তাঁহার পূজা চলিতে পারে কিন্তু পরমাত্মা ও জীবাত্মা ভগবদভগবদযখন আনন্দের অচিন্ত্য রহস্যলীলায় এক হইয়াও দুই, দুই হইয়াও এক, তখনই সেই অন্যতম দেবতাকে ভক্তি করা চলে।" এইজন্য  ভারতবর্ষে প্রেমভক্তির ধর্ম আরম্ভ হয়। এই ভক্তিধর্মের দেবতাই বিষ্ণু। সে ধর্মের প্রবক্তারা ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ থেকেই মহাভারতের কাহিনী। কৃষ্ণ যে একজন প্রধান নেতা এবং সমাজকে নিরর্থকতা থেকে মুক্তি দিতেই তিনি জরাসন্ধকে বধ করেছিলেন, যে জরাসন্ধ বহু ক্ষত্রিয় রাজাকে বধ ও পীড়ন করেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ''কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গোঁড়ায় এই সামাজিক বিবাদ। তাহার একদিকে শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে, অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের বিপক্ষে।" সাধারণ পাঠকের মত রবীন্দ্রনাথ মহাভারতের কাহিনীর ভেতর ঘটনাকে খুঁজতে গিয়ে বঞ্চিত হতে রাজি নন, কেননা তিনি মনে করেন, এর মধ্যে তথ্য খুঁজলে ঠকতে হবে, কিন্তু সত্য খুঁজলে পাওয়া যাবে। রবীন্দ্রনাথের মতে দীর্ঘসময় ধরে ভারতবর্ষের যে বিশিষ্টতা তাকে সূত্রবদ্ধ করাই ব্যাসদের কাজ। সে কাজের প্রথম সাফল্য বেদ-সংগ্রহ। আর আর্য সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাহিনীগুলোকে একত্রিত করে যে মহাগ্রন্থ রচিত হল তার নাম জয় তথা বিজয়; পরবর্তীকালে নামকরণ হয় 'মহাভারত'।

             রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট বলেছেন, ''তখনকার যিনি ব্যাস, নূতন রচনা তাঁহার কাজ নহে পুরাতন সংগ্রহেই তিনি নিযুক্ত। এই ব্যাস এক ব্যক্তি নাও হইতে পারেন কিন্তু ইতি সমাজের একটি শক্তি। কোথায় আর্যসমাজের স্থির প্রতিষ্ঠা ইনি তাহাই খুঁজিয়া একত্র করিতে লাগিলেন।"  ব্যাস কিন্তু মহাভারতে শুধু কাহিনীর সমন্বয়ই ঘটাননি, আর্যসমাজে প্রচলিত সব বিশ্বাস, তর্ক-বিতর্ক ও চরিত্রনীতিকে তিনি একত্র করেছেন। রবীন্দ্রনাথ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন ''আধুনিক পন্ডিতদের সংজ্ঞা অনুসারে, মহাভারত ইতিহাস না হইতে পারে কিন্তু ইহা যথার্থই আর্যদের ইতিহাস। এটি কোনো বিশেষ ব্যক্তির রচনা নয়, এটি বরং একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস।"  রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই সমস্ত জনশ্রুতিকে গলাইয়া পোড়াইয়া একটি তথ্যমূলক ইতিহাস রচনার চেষ্টা করত, তবে সেটিতে আর্যসমাজের প্রকৃত রূপটি পাওয়া যেত।

           মহাভারতের এই অভূতপূর্ব ব্যাখ্যার এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তুলেছেন গীতার প্রসঙ্গ। বলেছেন, "আতস-কাচের এক পিঠে যেমন ব্যাপ্ত সূর্যালোক আর এক পিঠে যেমন তাহারই সংহত দীপ্তিরাশি
 মহাভারতও তেমনি একদিকে ব্যাপক জনশ্রুতি রাশি আর একদিকে তাহারই সমস্তটির একটি সংহত জ্যোতি। সেই জ্যোতিটিই ভগবদগীতা। জ্ঞান কর্ম ও ভক্তির যে সমন্বয় যোগ তাহাই ভারত ইতিহাসের চরম তত্ব। "

6 comments:

  1. Darun ��������

    ReplyDelete
  2. অনেক কিছু জানলাম

    ReplyDelete

  3. এত অসাধারণ, এত অসামান্য প্রবন্ধ আমি ইদানিং কালে
    পড়িনি। লেখকের পায়ে হাত রেখে প্রণাম করতে ইচ্ছা হয়।

    ReplyDelete