Tuesday, September 21, 2021

মণীশ ঘটকের কবিতা - সৌম্য ঘোষ

মণীশ ঘটকের কবিতা

- সৌম্য ঘোষ



        নদী মাত্রেরই একটি সাধারণ অভিযোগ থাকে; সেই অভিমুখ হলো সমুদ্র। তেমনই কবি মাত্রেরই একটি সাধারণ আকাঙ্ক্ষা থাকে ---- কাব্যরস সৃষ্টি। কাব্যরস অর্থাৎ নন্দন অর্থাৎ আনন্দ সৃষ্টি করা। কবিতা, তা যে একালের হোক না কেন, তাতে ভাব, ভাষা, আঙ্গিক, প্রকরণ ইত্যাদিতে যতই নতুনত্ব সৃজন করা হোক না কেন, কবিতাকে কোনদিন রসহীন করে পরিবেশন করা যায় না।
             কল্লোল যুগেও যখন কাব্যে রোমান্টিক চিন্তা ও ভাষাকে পরিহার করে কঠোর নৈরাশ্যবাদী জীবন বাস্তবতার মধ্যে কবিতার উপাদানের সন্ধান করার চেষ্টা হত, যখন কবি লেখেন -----

"এই যুগের চাঁদ হ'ল কাস্তে"

তখনও কিন্তু তারা কবিতাই লিখেছেন।
          সোভিয়েত রাশিয়ার সাহিত্যে জীবন বাস্তবতাকে যদি গ্রহণযোগ্য করে থাকেন গোর্কি, তবে সে শুধু তাঁর অপরিমেয় বেদনাবোধ, তাঁর জীবন জিজ্ঞাসার জন্য। গোর্কির হৃদয়ে সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণার সঙ্গে  জীবনবোধের গভীরতার সমবায় ঘটেছিল। বাংলা কাব্য সাহিত্যে মণীশ ঘটকের মনন ও চিন্তনে ম্যাক্সিম গোর্কির প্রভাব প্রত্যক্ষ। 

রামায়ণ অনুযায়ী মনুর বংশধর এবং শ্রী রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ যুবনাশ্ব, আর মান্ধাতা যুবনাশ্বের পুত্র। 'মান্ধাতার আমল' বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে, সেটা এই রাজার নামে। যার অর্থ, অতি প্রাচীন বা সেকেলে। নিজের স্বভাবোচিত প্রকৃতি জন্যই নিজের আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন 'মান্ধাতার বাবার আমল'। আর নিজের ছদ্মনাম নিয়েছিলেন --- 'যুবনাশ্ব'।

       মণীশ ঘটক। 
        ১৯০২ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গের রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কবি পরিচিতিই সর্বাধিক; তবুও তাঁকে শুধু এই পরিচয়ে 
সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি ছিলেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক, কবি এবং বাংলা নয়া বাস্তববাদী সাহিত্য চর্চার একজন পথিকৃৎ। কল্লোল যুগের গদ্য কাদের মধ্যে তাঁর নাম প্রথম সারিতে।

           অল্প বয়সে ছ'ফুটের বেশি লম্বা, রোগা-পাতলা গড়ন দেখে, তাঁর সম্বন্ধে একটা কথা প্রচলিত ছিল:
"থেমে থাকলে দাঁড়ি, হাঁটলে চিমটে।’' ইডেন হিন্দু হস্টেলে এ রকমই ছিল তাঁর পরিচয়। যুবক মনীশের ভাষায়: ‘আমি শুধু রোগা নই; বেমানান ঢ্যাঙা। …তিরতিরে সোজা।’ ‘মান্ধাতার বাবার আমল’-এ কারণটাও বর্ণনা করে গিয়েছেন যুবনাশ্ব ওরফে মণীশ ঘটক।   ‘কল্লোলে' আত্মপ্রকাশ করেন  যুবনাশ্বের ছদ্মনাম নিয়ে। "সেদিন যুবনাশ্বের অর্থ যদি কেউ করত ‘জোয়ান ঘোড়া’, তা হলে খুব ভুল করত না, তাঁর লেখায় ছিল সেই উদ্দীপ্ত সরলতা।'’-----  লিখেছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে।

মণীশ ঘটক মানেই কল্লোল যুগের প্রথম সারির মুখ। ‘বলতে গেলে মণীশই কল্লোলের প্রথম মশালচী’ (‘কল্লোল যুগ’)। সাহিত্যের নিত্যক্ষেত্রে সে দিন তিনি এমন সব অভাজনকে ডেকে এনেছিলেন যা ছিল একেবারে অভূতপূর্ব।

"কল্লোলে'’র সংস্পর্শে আসার আগে অবধি তিনি ছিলেন মূলত: সর্বভূক পাঠক এবং টেনিস খেলোয়াড়।   কবিবন্ধু বিজয়ের সঙ্গে এক দিন হাজির হয়েছিলেন কল্লোলের অফিসে। সম্পাদক গোকুল নাগ এবং দীনেশরঞ্জনের অমায়িক, খোলামেলা ব্যবহার সে দিন তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। আসার সময় গোকুল নাগ তাঁর কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘কিছু লিখেছ-টিকেছ?
লেখালেখির শর্তও তো তাই। তবুও গোকুল নাগের কথার একটা অনুরণন মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই টের পেতে লাগলেন তিনি। এ সময় ঘটনাচক্রে পকেটমার ফজলের সঙ্গে গড়ে উঠল একটা সখ্যতার সম্পর্ক। তার হাত ধরে তিনি পৌঁছে গেলেন চোর-ছ্যাঁচর-পকেটমারদের দুনিয়ায়, যা এ যাবৎকাল অব্দি তাঁর ও বাংলাসাহিত্যের পাঠকদেরও অচেনা।
কিন্তু এদের নিয়ে লিখলেই তো হল না, অন্যায়-অবিচার-অসাধুতাকে সাহিত্যের উপজীব্য করা যায় কি না তা নিয়ে ছিল রীতিমতো সংশয়। 

'যুবনাশ্ব' ছদ্মনামে লেখা হল 'পটলডাঙার বৃত্তান্ত'। নড়েচড়ে বসল বাংলাসাহিত্যের পাঠক। সজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হলেন সাহিত্যের অশ্লীলতা নিয়ে। বাংলা সাহিত্য কিন্তু পেয়ে গেল এক বলিষ্ঠ কথাকারকে যাঁর লেখায় প্রথম কথা বলে উঠল ফজলের মতো সমাজের চোখে অপরাধী এবং অপাঙ্‌ক্তেয় মানুষজন।

             কল্লোল যুগের কবিদের মধ্যে একটি সাধারণ সাদৃশ্যতা ছিল, বাস্তববাদী হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। 
এই বাস্তববাদী হওয়ার নিদর্শন স্বরূপ তাঁরা জীবনকে এক নতুন অভিধায় গড়ে তুললেন। গ্রহণ করলেন তার দারিদ্র, দুঃখ যন্ত্রণা সঙ্গে নগ্নতার স্বরূপ। জীবনকে এক দ্বিধাহীন বোহেমিয়ান উৎশৃঙ্খলা তাই তাদের কাম্য বলে মনে হয়েছে।
           কবি মণীশ ঘটক কল্লোল যুগের কবি। যিনি নজরুল, যতীন্দ্রনাথ, মোহিতলালের উত্তর পর্বে এবং সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পূর্ব অধ্যায়ে বাংলা কাব্যে রিয়ালিজমের ধারাকে প্রবাহিত করতে পেরেছিলেন।
           ১৩৪৬-এর মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ হয়েছিল তাঁর প্রথম কবিতা গ্রন্থ "শিলালিপি"। এই  গ্রন্থে আছে তাঁর কবিতা ---- 'পরমা'। 

 "ভাঙাও ঘুম ভাঙাও
 কুহক কাহিল মৃত্যু থেকে সেই জানোয়ারদের
বেয়াল্লিশ হাজার জানোয়ারদের।
জ্বলুক তাদের চোখে
তাজা ইস্পাতের নীল ঝলক,
শিউরে উঠুক বর্বর অত্যাচার।"
           ( 'দোস্ত, তাদের জাগাও')

 'পরমা' কবিতায় লিখলেন----
 
"পূর্ণলোহু যৌবনের মধ্যাহ্ন ভাস্কর
 সেদিন জ্বলিতেছিল এদেহো অম্বরে।"

          তাঁর পরবর্তী কবিতাগ্রন্থ "যদিও সন্ধ্যা" প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। অর্থাৎ দীর্ঘ  ২৮ বছর পর। ১৯৭০ সালে "বিদূষী বাক"। ১৯৭৪ 
সালে পাবলো নেরুদা থেকে অনুবাদ করা কবিতা সংকলন। 
            মণীশ ঘটক আধুনিক ও বাস্তববাদী হয়েও কবিতার ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত নন। যিনি সমকালীন বিশ্বের সাম্যবাদী সাহিত্যের মর্ম উদঘাটন করে তার সাহিত্যাদর্শ গ্রহণ করেছেন, তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অন্তর যন্ত্রণাকে কোনদিন ভুলে থাকতে পারেননি। তাই তিনি পুরোপুরি বাঙালি কবি। 

          যৌবনের উগ্রতা তাঁর জীবনের শেষ পর্বে এক শান্ত জিজ্ঞাসা বহন করে ফিরে আসে।  "বিদূষীবাক" গ্রন্থে তিনি প্রাচীন "হিন্দু পুরাণ"- এর যুগে ফিরে গিয়েছেন। গ্রন্থের সংবেদন গুলি দেবী চণ্ডীর উদ্দেশ্যে রচিত। কোথাও প্রার্থনা, কোথাও প্রশস্তি! জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির মধ্যে থেকে নিজেকে একক চিন্তার গভীরে সমাহিত করেছেন। 

"স্পন্দনময়ী বসুধা লভিছে শক্তি
রূপে রসে গানে মনোলোভা অভিব্যক্তি
পরমাপ্রকৃতি ত্রিবিধ গুণের সাম্য
ইন্দ্রিয়াতীত পরাবাক্ তার কাম্য।"

এক ধ্রুপদী সত্যের অনুভবে কবির হৃদয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। তার সংবেদন--- 
"আমি সচ্চিদানন্দ আমি দেহাতীত
 একাদশ রুদ্ররূপে হই কালান্তক
অষ্টবসু হয়ে করি সাধাকে অন্বিত।"

আবার কখনও তাঁর কাছ থেকে আমরা পাই ----

"পরা প্রকৃতির দেবী সত্বগুণবতী
 হৃদারূঢ়া জ্ঞানময়ী মহা সরস্বতী..."

 যৌবনের উত্তপ্ত মণীশ ফিরে গেছেন হিন্দুত্বের চিরন্তন বোধে।‌ তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ---- 'এই সংবেদনগুলি তার অনুভূতিজাত'।
অচিন্ত্যকুমার, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব বসুর মতোই তার চেতনায় ঐতিহ্য ফিরে এসেছে। জীবন সীমায় এসে তিনি স্থির ও ধ্যানময়; এক জীবনসন্ধানী পুরুষ।।

5 comments:

  1. Joddddddddd🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥🔥

    ReplyDelete
  2. মণীশ ঘটক সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম।
    আপনার প্রতিটি লেখা শিক্ষনীয়। ধন্যবাদ জানাই।

    ReplyDelete