Wednesday, October 20, 2021

ভোজন - শওকত নূর

ভোজন

- শওকত নূর


দীর্ঘক্ষণ হেঁটে যখন এখানে এসে দাঁড়াই, তখন বেলা ঠিক মধ্যাকাশে চলে আসে। এটা ফসলমাঠ। মাঝখানে সম আকৃতির দুটি তালগাছ। উচ্চতা ঢের হলেও অবস্থান নিবিড় হওয়াতে যেটুকু ছায়া নিচে নিংড়ে আসে ক্লান্তি-উষ্ণতায় তা অশেষ লোভনীয় হয়ে ওঠে। মাঝচৈত্র। গত ক'দিন ধরে  Sযে দুঃসহ দাবদাহ যাচ্ছে  তাতে নিয়মিত পিপাসায় ছাতি ফাটার উপক্রম হয়। তামাম দেহ ঘেমেনেয়ে একাকার থাকে।   গাছ দুটোর গোড়ায় ঘন সবুজ ঘাসে শ্রান্ত অবসন্ন   বসে পড়ি। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে তা থেকে পানির বোতল বার করে পরম তৃপ্তিতে গলায় পানি চালি। তখনই গাছদুটির সুউচ্চ মাথা থেকে বাবুইদের মিষ্টি কিচিরমিচির ডাক ভেসে আসে। নিমিষে তন্ময়তা আসে। ভাবি হয়তো এমন হতে পারে যে পাখিগুলো বরাবর এমনই ডাকে, ক্লান্তিহেতু শুরুতে তা খেয়াল করা হয়ে ওঠে না। গলায় ঠান্ডা পানি চালাবার পর  অনুভূতিগুলো যখন চাঙা হয়ে ওঠে  তখনই কেবল তা শ্রবণ ও গোটা অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে যায়। ওপরে বিস্মিত তাকিয়ে থাকি। দুটি গাছেরই শীর্ষ ঝুলন্ত দোল খাওয়া অসংখ্য বাসাতে ঠাসা। কিছু পাখির  ক্রমাগত চিঁচিঁ শব্দে  মাথানিচু তাকিয়ে থাকার বিষয় এতটা নিচ থেকেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওপরে বেশি সময় চোখ ধরে রাখা যায় না। ঘাড় মাথা অবশ হয়ে আসে। ঝিরিঝিরি স্নিগ্ধ বাতাস শীঘ্র চোখে তন্দ্রাচ্ছন্নতা বয়ে আনে। 

এমন পর্যায়ে চোখ নামিয়ে সামনে তাকাতে প্রায় দিনই  খানিকটা নড়ে উঠি। সামনাসামনি বাড়িটার দূরত্ব এখান থেকে কত গজ হবে তা স্পষ্ট ধারনায় ফেলা যায় না। তবে সহজেই বলা চলে  নেহায়েত তা কম নয়। বাড়ির বার আঙিনার ঝাঁকড়া এক গাছের নিচে একদল নানাকৃতির স্ত্রীলোককে দলবদ্ধ দাঁড়ানো দেখি। আমি ভালোমত চিনি তাদের। একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এ গাঁয়ে আমার যাতায়াত বছর দুয়েকের। এই দু বছরে অনেকবারই বাড়িটার আশপাশ দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। এমন কোন দিন যায়নি যেদিন উৎকট ঝগড়া আর কান বন্ধ করে হেঁটে যাবার মতো অশ্লীল অশ্রাব্য গালাগাল  ভেসে না এসেছে। স্ত্রীলোকের এমন বিদঘুটে ঝগড়া গালাগাল, বিশেষ করে নিত্য নৈমিত্তিক- আমি ইহজনমে অন্য কোথাও দেখিনি শুনিনি। বিবাদে অংশগ্রহণকারীগন সংখ্যায় ছয়সাত জন হলেও তাদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন। আজও তিনিই  তেমনই আছেন। গালাগালের তীব্রতাটা আজ যেন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ মহীয়সীর নাম হচ্ছে আঙুরি বেগম। ঝগড়াটে হিসেবে  এ নামটি দিকবিস্তারি এবং বিখ্যাত কুখ্যাত যাই হোক এ গাঁয়ে যাতায়াত ধরার অল্প ক'দিনের মাথায় আমার তা জ্ঞাতিতে এসেছে। অন্যদের মুখ চেনাচেনি চিনলেও কারোরই নাম জানা নেই। আমি এখানে দাঁড়ানো কিংবা বসা মাত্রই তারা হুড়মুড় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দলবদ্ধ দাঁড়ায় । শুরুতে কিছু বলাবলি করে। আর যা করে তা ইতিমধ্যে বলা হয়েছে। 

এ পথ ধরে নিয়মিত চললেও, এখানে নিয়মিত বসলেও, অন্যত্র পরম ব্যস্ততাহেতু  গত ক সপ্তাহে এ পাড়ায় আমার ঢুঁ দেয়া হয়ে ওঠেনি। ধারণা করি, বালাই ব্যাধি, যা তাদের নিত্যসঙ্গী ও প্রকট তাতে সেবা না পেয়েই এখানে আমার বিশ্রামদৃশ্য তাদেরকে সক্রোধ গালাগাল ও আস্ফালনে লিপ্ত করে। আমি জানি কী নিকৃষ্ট ভাষায় তারা গায়ের ঝালমুক্তির পরিত্রাণ খোঁজে। কত জীবজন্তুর বাচ্চা যে বানাচ্ছে, কত স্থান দিয়ে কত কিছুই যে প্রবেশ করাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। ভাবতেই গা শিউরায়। 

'স্বাস্থকর্মী' শব্দটা ইহজনমে তাদের কারো মাথায় ঢুকবে না, নিষ্ফল আমি বৈ কেউ ঢোকাবার চেষ্টাও করেছে বা করবে বলে প্রতীয়মান  হয় না। ডাক্তার শব্দটিই তাদের সুপরিচিত, তবে তার উচ্চারণ ব্যর্থতায় তারা প্রত্যেকে আমাকে অগোচরে দাক্তোর ও গোচরে দাক্তোর সাব/সাপ ডাকে। ও বিষয় কখনো আমাকে ন্যূনতম বিচলিত করেনি, করে না। 

অল্পক্ষণের মাথায় আমি ওদিক থেকে চোখ ফেরাই। অচেনা দূরাঞ্চলের বাসিন্দা  হলেও  জায়গাটার  বিশেষত্বের কারণে একে আমার বেশ লাগে। ঘুম ঘুম চোখেও চারদিকের পাকা কলাই-সরিষার ক্ষেত, কোথাও বা সাদা  ইটার ঢেলার বিস্তৃতিতে নজর করি। অনিচ্ছাতেই তন্দ্রায় ডুবি। সেদিন তন্দ্রা কেটে বাবুইদের কিচিরমিচির খুব জোরেশোরে শুনতে পেলেও সেদিকে নজর না উঠে নজর বিস্তৃত হল সামনে। দেখলাম হাত দুই দূরেই এক লোক পায়ে ভর দিয়ে বসে আছেন। মুখ কাচুমাচু,  উদ্বিগ্ন দৃষ্টি আমার দিকে। কিছুটা বিচলিত হলেও নিজেকে দ্রুত সামলে নিই। ভয়োৎকণ্ঠার কিছু নেই। কারণ, এ গাঁয়ে যাতায়াত সূত্রে আমি তাকে খুব ভালোমত চিনি, যদিও বিশেষ কথাবার্তা হয়নি কোনদিন। উঁচালম্বা শীর্ণ শরীরের গড়ন, মুখমণ্ডল লম্বাটে, নাক চোখা, চোখ খুদে, মাথার চুল ছোট ও খাড়া, থুতনিতে লকমা দাড়ি আছে, রঙ শ্যামলা। মুখমণ্ডলে নিতান্ত সারল্যের ছাপ। আমি দৃষ্টি ধরতেই চট করে হাতখানেক এগিয়ে এলেন তিনি। আবারো কিঞ্চিৎ বিচলিত হলাম। বললাম, কী? কিছু বলবেন? 

ডাক্তোর সাপ, ভালা? 

জি, কী খবর আপনার? 

সোমবাদ বিশেষ সুবিদার না। হেইজোন্তেই আপনের ধারে আগোমোন। 

কেন, কী হয়েছে? 

প্যাডো বিষম বেদনা। কুলাবার পারতাছি না।   

কেন, অসুখটসুখ করেছে নাকি? 

তা করছে। বিষম অসুখ।   

কী ধরনের? 

বিষের লগে বারোমবার পাইখানার ব্যাক। একবার সাইরা ঘরে আইয়া পাও ফেলনের লগে লগে আবার দৌড়ান লাগে।   

খেয়েছেন কী? 

খাওয়া নিয়া সাপ, ম্যালা কথা। কইতো কইতো আবার ---।

সংক্ষেপে বলুন। অবস্থা তো মনে হচ্ছে বেশ খারাপ। 

হ, ভয়াল খারাপ।    

বলুন জলদি। 

উই যে ওই বাড়িডা দেহা যাইতাছে,  বড় বড় যে টিনের গর। 

হ্যাঁ। 

দনিক বাড়ি, গেরামের পোরধান দনিক। 

হ্যাঁ, বলুন। 

কয়দিন ধইরা ওই বাড়িত গর গেরোস্তালির কাম করতাছিলাম। হুদা কাম, খানাখাইদ্যো নাই। গোমাইতাছুন? 


না ঘুমাইনি, বলুন৷  চোখ বুজে আছি। শুনছি সবই, বলে যান। 

দুফার বেলা কামের গোরে তাগোর বাড়ির রান্নাবারির সুবাসে যহন জিবলায় খালি পানি আয়, তহন আমি আর আমার ভাইয়ের ছাওয়াল হুনা মুহে বাড়িত চইলা যাই। বড় আফসোস লাগে মনে। পরের দিনগুলানে বিহান বেলা কামে গিয়াই বাইস্তার লগে খাওন লইয়া নানান আফসোসের আলাপ পাড়ি। এইডা খাওনের সাধ অয় , ওইডা খাওনের সাধ  অয়, নানান শোক গুজারি। নিত্যি তা হুনতে হুনতে গত কাইল পড়শু গেরস্ত দিল তার বাড়িত মেজবানীর নিমোন্তন । গেলাম হেই মেজবানীত।  

বেশ ভালো। তা একাই গেলেন দাওয়াতে, নাকি দুজনাই? 

একলাই? 

তারপর বলুন। 

গিয়া দেহি বেশুমার আয়োজন। নানান পদের খানাখাইদ্যোর সোমাহার। বর্তা, বাজি, শাক, মাসকালাইর ডাইল, মাছ বাজা, মাছের তরকারী, গোরুর মাংস, দই, মিঠাই! 

খুবই ভালো। 

তারাতো শরমাইয়া আমি কোম খামু ভাইবা খাওন সব বুঝাইয়া দিয়া গরের দরজা চাপাইয়া  গেলগা গরেত্তোন বাইর অইয়া। কইয়া গেল আমি জানি ইচ্ছামতোন খাই। খাইতে জানি না শরমাই। 

খেলেন নিশ্চয়ই প্রাণ ভরে? 

নাহ, তা আর খাইলাম কই? 

কেন, কী হলো? 

অত্তোসব খাওন দেইখা আমার কী জানি অইলো, পয়লা যেইডা ধইরা বিসমিল্লাহ কইলাম, হেইডা দিয়াই পুরা এক ডিশ ভাত সাবাড় দিয়া ফালাইলাম। খাওন আমার শেষ!  

কী দিয়ে খেলেন? 

বাগুন বর্তা। পরিমাণে আছিলো ভালোই, ওইডা দিয়াই ঘইষা ঘইষা এক ডিশ ভাত কাবারি দিয়া ফালাইলাম।   

তারপর? 

খাওন শেষে বিদায়কালে গেরস্ত তো দেইখা আহাজারি শুরু করল। পিছে পিছে আইয়া কইতে লাগল, এইডা আপনে কী করছেন? কেমন ব্যাফার অইলো? এত কিছু আয়োজন করলাম, কিন্তুক খাইলেন না। আমি কইলাম, বেশুমার খাইছি, আত্মারে সাতাইয়া খাইছি। যতাইষ্টো পরিমাণে খাইছি। শোক আফসোস নাই। 

তারপর?  

এই যে প্যাডের বেদনা, অতিসারে ধরছে। কুনু কুনু বার টাট্টিত পৌঁনছিবার আগেই কলকলাইয়া বারাইয়া যায়। মেলা বার যাওনের পর এহন একটু  সুকুম দিছে। ভাবলাম এই সুযুকে আপনের লগে দেহা কইরা আই।  

এসে ভালো করেছেন। চিন্তা করবেন না। ওষুধ দিচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে।  

আমার ব্যাগে সবসময় এ্যান্টাসিড বা মেট্রোনিডাজল জাতীয় ওষুধ থাকেই। কটা তাকে দিয়ে ভালোমত সেবনবিধি বুঝিয়ে দিলাম। তিনি দ্রুত চলে যান। 

সপ্তাহ খানেক পরের কথা। সেখানে বিশ্রামকালে লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। জানলাম তার অসুখ ভালো হয়ে গেছে। এরপর তিনি মুখ দিয়ে অনর্গল শোকাফসোস ঝরাতে লাগলেন। ভালো খাবারদাবার খেতে না পারার যত শোকাফসোস। আমি খানিকক্ষণ শোনার পর বললাম, আফসোস তো হবেই। এত কিছু সামনে পেয়েও ছেড়েছেন সেদিন!  অবচেতনে কষ্টটাতো রয়েই গেছে। তা চলুন আমার সঙ্গে। 

তিনি চিন্তিত ফ্যালফেলে তাকিয়ে বললেন, কোনহানে? 

ভালো খাবারের সন্ধানে। 

কোনহানে? উদ্বিগ্ন দেখালো তাকে। 

চলুন দেখি  কতদূর  কোথায় যাওয়া যায়। পৃথিবীর সীমানা তো বহুদূর। খাবারেরও সুনির্দিষ্ট ঠায়ঠিকানা নেই। কত জায়গা, কত রকমফেরের খাবার! চলুন ওঠা যাক।      

আইচ্ছা চলেন জলদি। লোকটা ঢোক চিপলেন। 

আমরা কালবিলম্ব না করে হাঁটা ধরি। হাঁটতে হাঁটতে সীমাহীন এক মাঠে এসে দাঁড়িয়েছি। এখানে যতদূর দৃষ্টি যায় অগণিত খাবারের স্টল চোখে পড়ে। প্রতি স্টলে কাঁচা এবং রান্না করা খাবারের বাহারি সমাহার। লোকটার হাতে সবুজ পতাকা। তার সন্মুখে স্থির দাঁড়ানো বিশাল এক আবালবৃদ্ধবনিতা-

র দল। তাদেরও হাতে রঙবেরঙের পতাকা। প্রত্যেকের দেহ অস্থিকংকালসার। তাদের নিয়ে লোকটার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতে থাকি আমি। থেকে থেকে থামি আর পরম ঔৎসূক্যে স্টলের সব খাবার দৃশ্যে চোখ রেখে পরীক্ষা নিরীক্ষা করি। 

লোকগুলো পরম আগ্রহ-উল্লাসে গোগ্রাসে সব গিলতে থাকে। আমি শুধু দেখি। কত যে বিচিত্র রকমের খাবার, হাজারে বিজার! নানান দেশের নানান সাজের, নানান নামের -অগুনতি প্রকরণঃ ভাত, রুটি, পোলাও, কোরমা, খিঁচুড়ি,বিরিয়ানি, ফ্রাইড রাইস,  পায়েস, নানরুটি, তন্দুরি, ফিরনি, সেমাই, নুডুলস, পাস্তা, মিঠাই, দই, আইসক্রিম, কাবাব, পিজ্জা, হটডগ, বার্গার, ক্ষীর, পায়েস,পুডিং, স্প্যাগেটি, এ্যাসপ্যারাগাস,--- অসংখ্য  জাতের মাছ, মাংস-  মুরগী,খাসি, গোরু, --, ওমলেট, মামলেট, আর যে  কত প্রকারের পিঠার বাহার!ওদিকে  ফলের কথাও  বলে শেষ করবার নয়। আছে আম, জাম, লিচু, কলা, কাঁঠাল, নারকেল, আনারস, আপেল, আঙুর, নাশপাতি, পিচ, আতা, ড্রাগন, পেয়ারা, স্ট্রবেরি, মাল্টা, তাল, বেল, খেঁজুর, আমলকি, সফেদা, গাব, ড্যাপল, ডেউয়া, কদবেল, তরমুজ, বাঙ্গি, করমচা, কামরাঙা, জামরুল -ক'টার নাম আর বলা যায়! সেই  বিস্ময়কর প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে সেই বুভু্ক্ষ নিরীহের দল একের পর এক খেয়ে চলল। কী উল্লাস প্রশান্তিতে যে বুদ তারা, তার প্রকাশ  ভাষা খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন! তন্ময় হয়ে শুধু দেখতে ও তাদের আনন্দে ভাগ বসিয়ে চললাম। মাঝে মাঝে বুক ধরে আসে। এতকাল ধরে দিনের পর দিন যাদের অনাহারক্লিষ্ট শরীর মুখ নীরব বেদনায় ভারাক্রান্ত করেছে, আজ তাদেরই ভোজনতুষ্ট মুখগুলো পরমানন্দে হাসি কান্নায় প্লাবিত করে চলল। আবেগ সংবরণে তাদের মুখ থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্টলখাদ্যে নিক্ষিপ্ত করছি। মুহুর্মুহু কেঁপে উঠছি তাদের হর্ষধ্বনিতে। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে বহুলকাম্য এক সন্তুষ্টি যেন ওপর থেকে কার ইশারায় আজ অকাতরে বর্ষিত হতে চলেছে। একটা অচেনা সুখানুভূতি দোলা দিয়ে যাচ্ছে আপাদমস্তকে। নিঃসীম খোলা প্রান্তরে নিঃসীম খাদ্যবহরে, নিঃসীম মনুষ্যবহর উৎসারিত নিঃসীমানন্দ ইথারে দৃষ্টি ধরে সম্মোহিত  হচ্ছি অবিরত। 

হঠাতই চোখের সামনে থেকে চলমান দৃশ্যটি যাদুমন্ত্রের মতো উধাও হয়ে গেল। বিস্ময়াভিভূত লক্ষ্য করলাম   কানে ভেসে আসছে সেই বাবুই পাখিদের বহুলচেনা, বহুলশ্রুত কিচিরমিচির!  এক পশলা দূরন্ত ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল মাথা ছুঁয়ে। চোখ খুলে অনেকটা  চমকালাম। দেখি একদল শিশু কিশোর দাঁড়িয়ে আছে সন্মুখে হাত দুই দূরে। চোখে সবার বিস্ফারিত দৃষ্টি।  আমার আচমকা ঘুমজাগা তাদের প্রতীক্ষার প্রহরে সুখিতি টেনেছে- এই হয়তো কারণ। চোখ কচলে ভালোমত দৃষ্টি ধরলাম তাদের আপাদমস্তকে। প্রত্যেকের পরনে হাফপ্যান্ট, শীর্ণ গা খালি, অনাহারক্লিষ্ট যত মুখ। কিছু বলতে যাব এরই মধ্যে বাঁয়ে মাঠ শেষের বাড়িগুলোর একটি থেকে আচম্বিত ভেসে এলো মাইক্রোফোনে দুর্বার  গানের শব্দঃ   

আইবানি ভাই বইবানি 

দাওয়াত কবুল করবানি 

নাতিন খাওয়াইবো সাধের মেজবানি!         

ওদিকে চেয়ে দেখলাম দলে দলে পোশাকি লোকজন হেঁটে যাচ্ছে বাড়িটার দিকে। ছেলেপুলেগুলোর দিকে চোখ ফিরিয়ে  বললাম, কী ব্যাপার? কী ওইদিকে? 

মেজবানী! জোরেশোরে বলে উঠল  তারা।   

কার বাড়িতে? 

ভজন মিয়ার বাড়িতে। 

ভজন মিয়া! কে সে? 

ওই যে আপনের কাছ থেইকা ওষুধ নিছে সেটিদিনকা যে! সেই লোক। 

ও সেই ভদ্রলোক! তা উনি এতো লোকজন খাওয়াচ্ছেন! উনি ---।

ছেলেপুলেদের মধ্যকার সবচেয়ে বড়সড়জন চোখ পিটপিট করে বলল, হ্যায় তার মামুর বাড়িত থেইকা গেল হপ্তায় দুই খণ্ড জমি পাইছে, অরিশ। 

হুম, তারপর? 

একখণ্ড দুরতো বেইচ্চা নাতিনের আকিকা দিছে। ম্যালা লোক দাওত করছে। ওই যে যাইতাছে সব দলে দলে। 

ছেলেটির কথা শেষ হতেই গোটা দলটি পেছন ফিরে দৌড় শুরু করে। দেখলাম তারাও একই দিকে ছুটছে। তড়িঘড়ি উঠে পা বাড়াই। ঘুমজাগা শরীর। নিজ অনুভূতির ভালো মন্দ ধরণটা ঠিকঠাকমত ধরা করা  গেল না। শুধু সম্মোহিতের মতো উল্টোপথে এগিয়ে চললাম নিজ বাসস্থানের উদ্দেশ্যে। পেছন থেকে  ভেসে আসছিল জোরালো সে গানের সুরঃ

আইবানি ভাই বইবানি

No comments:

Post a Comment