Wednesday, October 20, 2021

ছোট বোনের শেষ ইচ্ছা পূরণ - রূপশঙ্কর আচার্য্য

ছোট বোনের শেষ ইচ্ছা পূরণ

- রূপশঙ্কর আচার্য্য


আজ সকাল থেকে বাড়ীর সকলে ব্যস্ত।
আজ আমার বড় দিদিভাই- এর আশীর্বাদ।
দারুণ আনন্দ বাড়ীতে, কিন্তু এই মাতৃতুল্য দিদিভাই কে আর আগের মতো করে পাবো না।
আমরা তিন ভাইবোন একসঙ্গে সর্বদা থাকি,নিজেদের কাজের পর অবসর সময়ে আমরা তিনজন একসঙ্গে আনন্দ করি।
আমাদের মধ্যে বয়সের তেমন তফাৎ নেই,দিদির বয়স ২৭,আমার বয়স ২৫, আর ছোট বোনের বয়স ২১।

আমার মনটা এই আনন্দের মধ্যেও খারাপ,ছোট বোনের বেশ কিছুদিন জ্বর ও মাথা ব্যাথা।
একজন ভালো চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে,আজ বিকালেই দেখাতে নিয়ে যাব আমি।
শুনেছি ঐ চিকিৎসক একজন  এম.ডি.ও ক্যান্সার স্পেশালিস্ট।

খুব ভালো ভাবেই শুভ অনুষ্ঠানটি কেটে গেল,আত্মীয়রা চলে গেছেন।

আমি তৈরী হয়ে ছোট বোনকে নিয়ে গেলাম চিকিৎসকের কাছে। চেম্বারে গিয়ে দেখি একজন ২৬-২৭ বছর বয়সের     ব্যক্তি রোগী দেখছেন,তিনিই যে চিকিৎসক বুঝতে অসুবিধা হলো না।
আগে থেকে যোগাযোগ করায় দ্রুত দেখানো হলো।
তিনি ব্লাডের কয়েকটি বিষয় টেস্ট করতে বললেন।
আমি আর সময় নষ্ট না করে ক্লিনিকের পাশে একটি ভালো প্যাথলজি আছে,তাঁদের একজন  বললেন এক ঘন্টা পর রিপোর্ট দেবেন।

আমি অপেক্ষমান অবস্থায় বসে আছি বোন কে সঙ্গে নিয়ে ,মনটা অস্থির হয়ে যাচ্ছে।
বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে
দেখে মনে হলো ওর ক্ষিদে লাগছে।
আমি দুটো পেয়ারা দিলাম ওকে।
সময় অতিবাহিত হতেই রিপোর্ট পেলাম।

চিকিৎসক মহাশয় রিপোর্ট দেখে ইতস্তত করছেন,পরে বললেন,
আপনারা কি এর আগে বুঝতে পারেন নি ওর কোনো অসুবিধা ?
আমি বললাম,আসলে স্যার অল্প একটু আধটু ভুগতো,কিন্তু  এটা কিছুদিন আগে থেকেই ভুগছে।বাড়ীতে বড় দিদিভাই এর বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার জন্য আপনার কাছে আসতে দেরি হলো।
তিনি বললেন,ব্লাড ক্যান্সার একেবারে শেষের দিকে।

 এই কথা শুনে আমি আর কি করে স্থির থাকি?নিজেকে আর স্থির রাখতে পারছি না।

দিদিভাই-এর বিয়ের অনুষ্ঠান এদিকে এই রিপোর্ট, কি করব আমি?
এই কথা শুনে আমিই অসুস্থ হয়ে পড়েছি,মন কে শক্ত করলাম এবং অনেক কষ্ট নিয়ে বাড়ী ফিরলাম।

বাড়ীর সবাই আমাকে এমন ভাবে দেখছে,আমি যেন একটা অপরাধী,না কি আসামী?

আমার তখন কিছু বলার শক্তি নেই।
আমি কিছু কাউকে বলতেই পারলাম না।

আমি বাড়ীর সকলকে বললাম ও কিছু নয় সামান্য ভাইরাস জনিত জ্বর।

সন্দেহ না হওয়ার কারণে রাত্রে খেলাম কিন্তু উদরে রাখতে পারলাম না,বাথরুমে গিয়ে বমি করে ফেললাম।
সারারাত ঘুম নেই ঘরের আলো নিভিয়ে কখনো বসে আছি,কখনো পায়চারি করছি আর ভাবছি দিদিভাই-এর বিয়ের কথা শুনে বোনি বলেছিল, আমি খুব সুন্দর করে সাজবো,দিদিভাই কে যা সাজের জিনিস  আমাকেও দেবে ।

কিন্তু ছোট বোনির ইচ্ছা ছিল সেও দিদিভাই-এর মতো সুন্দর করে সেজে শ্বশুর বাড়ী যাবে।
আমার হাতে ঈশ্বর এত সময় দেয়নি তো,আমি কি করবো??
দুদিন কেটে গেল।
প্রায় দিদিভাইয়ের বিয়ের তোড়জোর অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
 কিন্তু ছোট বোনের  শরীরের অবস্থা আসতে আসতে খুব খারাপ হতে লাগলো।
চিকিৎসক বলেই দিয়েছেন আর কোনোভাবেই সুস্থ করার সম্ভাবনা নেই,মৃত্যুর দিকে ক্রমশ বিষয় টা এগিয়ে গেছে।কারন সমগ্র শরীরের অঙ্গে জীবাণু বিস্তার করে গেছে।
এদিকে আমার মা, মা বলে কথা।মা তার সন্তান কে দেখে সবই বুঝতে পারলেন,আমি বিষয় টা গোপন রাখলে কি হবে?
একদিন আমি বাজারে গিয়েছি,অনুষ্ঠানের সবাই ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে তাদের হাতে রিপোর্ট, কি করে সম্ভব?
আমি তো বালিশের ভেতরে রেখেছিলাম।

বাড়ী ফিরে দেখি একি অবস্থা!
সকলে যেন কান্নায় ভেঙে পড়েছে।

মা-ঠাকুমা শুধুই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন।
বাবা ঘন ঘন জল খাচ্ছেন আর দিদিভাই সকলকে সামলাতে ব্যস্ত।

বোন কোথায়?
বোনের কাছে গিয়ে দেখি সে ঘুমাচ্ছে।

কেন বলা হয়নি এই সত্য টা তাঁদের??
বাবা কাঁদছেন আর আমাকে প্রচন্ড তিরস্কার করছেন।

আমি কি করে এই কঠিন সত্য টা বলতে পারি যে দিদিভাই এর বিয়ের আগেই বোনের মৃত্যু ঘটবে।

একটু চুপ করো, শান্ত হও তোমরা ,বোন জানতে পারলে সব শেষ হয়ে যাবে তোমাদের পায়ে ধরি।

দাদাভাই, কে যেন ডাকলো?
ও দাদাভাই, পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি ছোট বোন।

সবাই চুপ,
বোন বলছে তোমরা চুপ কেন??
 ছোট বোনি বলছে,আমি সব জানি,কারন আমি চিকিৎকের ঘাড় নাড়ার পর তোমার আচরণ ও তোমার আমার দিকে তাকানো আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমি আর বাঁচব না।

একদিন পরে আরও শরীর খারাপ হয়ে গেল বোনের।
চিকিৎসক কে ফোন করে জানালাম ,তিনি বললেন আর কিছু করার নেই-ই।আর মাত্র কয়েক ঘন্টা,কারণ আমি খুব ভালো করেই ডায়াগনস্টিক ও এনালিসিস করেই(রিপোর্ট দেখেই)বলছি। তবুও আমি একবার আপনাদের বাড়ী যাচ্ছি,যেটা একজন চিকিৎসকের কর্তব্য।

"দাদাভাই আমি শ্বশুর বাড়ী যাব না?"----এই কথা টা আমার বার বার হৃদয়কে বিষাক্ত সাপের মতো দংশন করছে।
বড় দিদিভাই এর জায়গায় ছোট বোনকে সুসজ্জিত ভাবে সাজাতে হবে?
এই সাজ বিয়ের না শেষকৃত্য-এর?বড় দিদিভাই-এর হব শ্বশুর বাড়ীর সকলে জানতে পেরে এই বিপদের সময় আমাদের পাশে এলেন।
চিকিৎসক এসে দেখে বললেন,আর কিছু করার নেই।

আমার কাছ থেকে ছোট বোনির শেষ ইচ্ছার কথা শুনে সহৃদয় চিকিৎসক বোন কে বিয়ের মাধ্যমে শেষ ইচ্ছা পূরণের প্রস্তাব দেন ।
খুব সুন্দর করে কনের সাজে সাজিয়ে তাকে তার মনের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে না করতেই মৃত্যু কোলে ঢলে পড়লো।
শেষ বিদায় সধবা বেশে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হলো।
এত মানুষের ভিড় আমার সোনা বোনি কে যেন অমর করে তুলল।
চিকিৎসক মহাশয় ছোট বোনকেই তাঁর স্ত্রী রূপে স্বীকার করেন,পরে আর তিনি বিয়ে করেন নি।

2 comments: